Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৫

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৫

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৫
শ্রাবণী ইয়াসমিন

থমথমে মুখে গাড়িতে বসে আছে আনায়া।
পেছনের সিটে তাদের দুই মেয়ে আর এক ছেলে।
আজ সকালে জেভিয়ার নিজেই এসে ওদের নিয়ে চলে এসেছে।
আনায়া চেয়েছিল আরও দু’দিন থেকে তারপর যাওয়া যাবে,কিন্তু জেভিয়ারকে কোনোভাবেই রাজি করানো সম্ভব হয়নি। তাই গোমড়ামুখেই গাড়িতে বসে আছে সে।
পেছনে বাচ্চাগুলো কেমন আনন্দে মেতে আছে,
“পাপা! পাপা!” করে ডাকছে অবিরাম। যেন তারা তাকে জন্মের পর থেকেই চেনে। আসলে ওরা তো সবসময়ই তাকে ছবিতে দেখেছে।
সেই ছবির মানুষটা আজ সামনাসামনি, জীবন্ত হয়ে বসে আছে তাদের পাশে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি শিশুই কি আশ্চর্যভাবে পাপার বাঁধনে জড়িয়ে ফেলেছে নিজেদের। পেছন থেকে একটার পর একটা ডাক, “পাপা!”

“পাপা!”।
পুরো গাড়িটা যেন তাদের কণ্ঠে ভরে উঠেছে।
আনায়া তাদের দিকে একবার তাকায়। তাদের ছোট মেয়ে জেনিফা একটু আলাদা।
তার চুল হালকা লালচে, নিচের অংশ কোকড়ানো কিছুটা। চোখের মণি একদম নীল। আর বড় মেয়ে জেসিকার চেহারাটা অনেকটাই জেভিয়ারের মতো
চুল কালো খয়েরি, চোখে শান্ত গম্ভীরতা।
তবে এদের সবার মধ্যে যদি কেউ তার পাপার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিজের মধ্যে ধারণ করে থাকে, তবে সে হলো আভিয়ান। তার চোখ হুবহু জেভিয়ারের মতো ধূসর, গভীর, তীক্ষ্ণ।
প্রায় ঘণ্টা কয়েকের দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে গাড়িটি এসে থামে জেভিয়ারের বাড়ির সামনে।
রাত নামার আগমুহূর্ত, চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।
দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ,

বাড়ির সামনের লাইটগুলো একে একে জ্বলে উঠছে আলোয় ভেসে উঠছে বিশাল প্রাসাদের ছায়ামূর্তি।
বাচ্চাগুলো এতক্ষণে প্রায় ঘুমে ঢুলে পড়েছে।
জেনিফা মাথা হেলিয়ে রেখেছে জেসিকার কাঁধে,
আর আভিয়ান মায়ের কোলে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে, চোখে আধো ঘুমের কুয়াশা।
জেভিয়ার গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দুই মেয়েকে আলতো করে কোলে তুলে নেয়।
তার চলার ভঙ্গিতে এক অদ্ভুত কোমলতা,
যে মানুষটা এতদিন পর্যন্ত নিঃশব্দ কঠোরতায় ডুবে ছিল, সে আজ যেন ভেতরে ভেতরে গলে গিয়েছে একদম।
আনায়া আভিয়ানকে বুকে নিয়ে নেমে আসে ধীরে ধীরে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, শরীরের দুর্বলতা তার চোখে কেমন এক ক্লান্ত ছায়া নেমে এসেছে।
বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই একটা পুরনো, চেনা ঘ্রাণ ছুঁয়ে যায় আনায়ার নাকে মেঝেতে জেসমিনের হালকা গন্ধ, পর্দায় জমে থাকা স্মৃতিময় দিনগুলো।

সবকিছু যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কেবল সময়টা বদলে গেছে।
জেভিয়ার ওদের রুমের পাশের ঘরে গিয়ে দুই মেয়েকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
জেনিফা আধো ঘুমের ঘোরে বাবার হাত চেপে ধরে রাখে, জেভিয়ার কিছুক্ষণ চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়।
ঠিক তখনই আনায়া আভিয়ানকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। জেভিয়ার তার দিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলে,
“তুমি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হও। আমি ওকে শুইয়ে দিয়ে আসছি।”
আনায়া কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে আভিয়ানকে তার কোলে তুলে দেয়। জেভিয়ার ছেলেটাকে বুকের কাছে টেনে নেয়, তার ছোট্ট নিঃশ্বাসের শব্দ বুকের ভেতর কেমন উষ্ণতা জাগায়।
আনায়া একবার তাকায়, তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

মাথায় টাওয়াল পেচিয়ে আনায়া গোল থেকে বেরিয়েছে সবে। তার পরনে ঢিলাঢালা একটা টিশার্ট আর প্লাজু। ভেজা চুল থেকে পানির ফোটা পড়ে টিশার্ট এর কিছু কিছু অংশ ভিজে গিয়েছে।
জেভিয়ার হাত পা ছড়িয়ে সোফায় বসে আছে। বুকে পেটে ফোটা ফোটা পানির বিন্দু। সেও হয়ত গোসল করে ফেলেছে।

জেভিয়ার প্যান্ট পড়ে দরজা খুলতেই চোখ পড়ল ভিক্টরের ওপর। ভিক্টরের কোলে রয়েছে আভিয়ান।
ভিক্টর একটু হেসে বলল, “ভুল সময়ে এসেছি মনে হয়।”
জেভিয়ার ভিক্টরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে উত্তরে বলল, “এসে পড়ে বলছিস, ‘ভুল সময়ে এসেছি মনে হয়?”
ভিক্টর আরও গা ছাড়া ভাব নিয়ে হেসে বলল, “আমি তো জানতাম ৩৬ বছর বয়স হওয়ার পরও, তোর উত্তেজনার পারদ কমেনি। বরং আরও বেড়ে গেছে।”
জেভিয়ার ধীরে ধীরে আভিয়ান-এর দিকে তাকাল। হঠাৎ মনে হলো, সে নিজের ছোট বেলার অবয়ব দেখছে তেমনই সরল, তেমনই পূর্ণ অমায়িকতা।
আভিয়ান জোর করে ভিক্টরের কোলে থাকা থেকে উঠে এসে বাবার কোলে ঝাঁপ দিল। ভিক্টর হেসে হেসে ছেলেটার মাথায় হাত এলোমেলো করল।
“অল দ্য বেস্ট, মাই লাইয়ান বয়,” ভিক্টর হাসি থামাতে না পেরে ফিসফিস করে বলল, “আজ রাতে মাম্মাম আর পাপার মাঝে থাকবে কেমন?”
জেভিয়ার চোখে অসহায়তার ছাপ। সে ধীরে ভিক্টরের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর শালা মেশিন নষ্ট। তোর পার্সোনাল প্লাগ নেই বলে কি আমারও নেই প্লাগ, কানেক্ট করার জন্য? শালা ফা/কা/র কোথাকার।”

খাটের মাঝখানে বসে আছে আভিয়ান। কেমন যেন এইখানে তার ভালো লাগছে না।সে বাবার দিকে তাকিয়ে উদাস কন্ঠে বলল,
“পাপা, আমার ভালো লাগছে না কিছু।”
জেভিয়ার ধীর, হতাশ চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“হ্যা, পাপা, আমারও ভালো লাগছে না। চলো, তোমাকে একটা বিয়ে করিয়ে দেই। তুমি তোমার ওয়াইফের সঙ্গে রাতে ঘুমাবে কেমন?”
আভিয়ান কুঁচকে চোখে জিজ্ঞেস করল,
“ওয়াইফ কি, পাপা?”
জেভিয়ার সরল, স্থির কণ্ঠে বলল,
“যার সঙ্গে তোমার ভবিষ্যতে বিয়ে হবে, সেইটাই তোমার ওয়াইফ। যেমন তোমার মাম্মাম আমার ওয়াইফ।”
আভিয়ান কিছুক্ষণ মাথা চেপে ধরে চিন্তা করল, তারপর বলল,
“আমারও তাহলে কি মাম্মাম এর এত কিউট ওয়াইফ হবে?”
জেভিয়ার ধীরে আনায়ার দিকে তাকালো। মেয়েটা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, নিস্তব্ধ অথচ অমায়িক। তার নিখুঁত, শান্ত মুখজুড়ে এমন নিষ্পাপতা যা জেভিয়ার-এর অন্তরকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে দিল।
মুচকি হেসে জেভিয়ার বলল,

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৪

“ইয়েস, পাপা, তোমার ওয়াইফও ঠিক তোমার মাম্মাম এর মত কিউট হবে।”
কথা বলতে বলতেই আভিয়ান হঠাৎ জেভিয়ার-এর বুকে ঢলে পড়ে। কখন যে তার ছোট্ট দেহ ঘুমের গভীরে হারিয়ে গেছে, তা জেভিয়ার টেরও পায়নি।
জেভিয়ার ধীরে আভিয়ানকে কোলে ধরে, তাদের মাঝের খাটে শুইয়ে দেয়। তারপর ছেলের কপালে আলতো করে একটি গভীর চুমু দেয়।
নরম কণ্ঠে জেভিয়ার ফিসফিস করে বলল,
“তোমরা সকলে আমার কাছে আমার চাঁদ। সেই চাঁদকে আমি কোনো কিছুর বিনিময়েও হারাতে চাই না।”

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা শেষ পর্ব