Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৮
রিদিতা চৌধুরী

ভোরের প্রথম আলো যখন জানালার ফাঁক দিয়ে এসে রিদির চোখের পাতায় আলতো করে আছড়ে পড়ছে, তখনও চারপাশটা এক অপূর্ব নিঝুমতায় মোড়ানো। বিছানার একপাশে রিদি তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন; তার প্রশান্ত মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব ক্লান্তি যেন এখানেই এসে থেমে গেছে।
সৌহার্দ্য একটু আগেই উঠেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাতে এক কাপ কড়া গরম কফি নিয়ে সে গম্ভীর মুখ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। সকালের এই নিস্তব্ধতায় তার মনে পড়ছে গতকালের সেই উত্তাল মুহূর্তগুলোর কথা। হাসপাতালে রিদিকে নিয়ে যে কাণ্ড সে ঘটিয়েছে, তা এখন ভাবলে নিজের ওপরই এক অদ্ভুত বিরক্তি কাজ করছে। কিন্তু ওই মুহূর্তে রিদিকে নিজের কাছে পাওয়ার যে তীব্র আকুতি তার ভেতরে কাজ করছিল, তা কেবল সেই জানে।

নিজের ভাবনাচিন্তা ছেড়ে সৌহার্দ্য রুমের দিকে পা বাড়াল। ঘুমন্ত বউটার দিকে এক পলক তাকিয়ে সে ল্যাপটপটা নিয়ে বসল রিদির পাশে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে আড়চোখে তাকাচ্ছে মেয়েটার দিকে— যেন ভীষণ ক্লান্তিতে কেমন নিস্তেজ হয়ে আছে শরীরটা!
সকাল প্রায় আটটা। রিদি চোখ মেলতেই দৃষ্টি পড়ল সৌহার্দ্যের ওপর— কেমন গম্ভীর মুখে সে ল্যাপটপে ডুবে আছে। রিদি নিজের গায়ে থাকা কাঁথাটা সরিয়ে উঠতে চাইলে যন্ত্রণায় শরীরটা কুঁকড়ে উঠল, আর তখনই মনে পড়ে গেল গতকালের সব কথা। লজ্জায় তার মুখটা রাঙা হয়ে উঠল।
হঠাৎ নিজের দিকে তাকাতেই থমকে গেল মেয়েটা— শরীরে একটা সুতোও নেই! অস্বস্তিতে চট করে কাঁথাটা টেনে পুরো শরীর জড়িয়ে নিয়ে সৌহার্দ্যের দিকে না তাকিয়ে কাঁথা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে আমতা আমতা করে সে বলল,

— আ- আমার পোশাক কোথায়?
সৌহার্দ্য ল্যাপটপ থেকে মুখ উঁচু করে রিদির দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত বিরক্তি ও চাপা উত্তেজনার মিশ্রণ। রিদির আড়ষ্ট লজ্জা আর কাঁপাকাঁপা কণ্ঠস্বর তার ভেতরের সমস্ত ধৈর্য যেন মুহূর্তেই নিভিয়ে দিল। মেজাজ চড়িয়ে সে রুক্ষ কণ্ঠে বলে উঠল,
— “যা দেখার দেখা শেষ, লজ্জা না পেয়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও। এখানে শাড়ি ছাড়া কিছু নেই, ওই চোদ্দ হাতের কাপড় পরানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না! আর তোমার ড্রেস ওটা পড়ে থাকার অবস্থায় ছিল না!”
রিদি কাঁথা থেকে বিড়ালের মতো নিজের মুখটা বের করে, চোখের পলক নামিয়ে লাজুক ও কাঁপাকাঁপা স্বরে মিনমিন করে বলল,

— “তাহলে আপনি বের হন, প্লিজ আমি চেঞ্জ করব!”
সৌহার্দ্য কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে রিদির দিকে তাকাল, তারপর বেশ ঠান্ডা ও নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
— “তুমি চেঞ্জ করবে, আর আমি বের হব কেন? স্টুপিড মহিলা! পারব না বের হতে, তুমি এভাবে থাকলে আমারই সুবিধা— যখনই মন চাইবে, কিছু-মিছু করে ফেলব!”
বলেই সে আবার উদাসীন ভঙ্গিতে ল্যাপটপে নজর দিল।
রিদি লজ্জা আর অস্বস্তিতে কিছু একটা বলতে চাইল সৌহার্দ্যকে, কিন্তু তার আগেই সৌহার্দ্য ঠোঁট কামড়ে ধরে রিদির দিকে বাজপাখির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শ্লেষের সুরে বলল,
— “এখন লজ্জা পাচ্ছ কেন? গতকাল ওই মুহূর্তে কে জানি আমাকে বলছিল, প্লিজ আ…”
সৌহার্দ্য বাক্যটা সম্পূর্ণ করার আগেই রিদি লজ্জায় ও ভয়ে লাল হয়ে কাঁথাটা শরীরে পেঁচিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে এল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে নিজের ছোট হাত দুটো দিয়ে শক্ত করে সৌহার্দ্যের মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে উঠল,

— “চুপ করুন, লাগামহীন লোক! আমি ওসব কিছু বলিনি, একদম মিথ্যা অপবাদ দেবেন না!”
বলেই চট করে সৌহার্দ্যের মুখ ছেড়ে কাঁথাটা ওভাবেই গায়ে পেঁচিয়ে বাথরুমের দিকে ছুটে পালিয়ে গেল, আর মনে মনে বিড়বিড় করে সৌহার্দ্যকে শতটা গালি দিতে দিতে দরজা বন্ধ করে দিল।
বাথরুমের দরজা বন্ধ করতেই রিদির চোখ আটকে গেল— তার ছড়িয়ে থাকা শাড়ি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিস কী সুন্দর করেই না গুছিয়ে রাখা হয়েছে! মনের কোণে একটা উষ্ণতার ছোঁয়া বয়ে গেল। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে সে যখন শাড়িটা পরে বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়াল, ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল প্রতিবিম্বের দিকে— থমকে গেল সে।
ঘাড়, গলা আর মুখের চারপাশে সৌহার্দ্যের গভীর ভালোবাসার সিলমোহর— দাঁতের স্পষ্ট ছাপগুলো ইতিমধ্যে হালকা নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে। রিদি ধীরেসুস্থে হাত বাড়িয়ে সৌহার্দ্যের দেওয়া সেই মিষ্টি স্পর্শগুলোকে আলতো করে ছুঁয়ে দিল। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজের বাড়িতে ফেরার কথা মনে পড়তেই তার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল; অস্বস্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল মনটা। গলার দাগগুলো হয়তো কোনোভাবে ঢেকে রাখা যাবে, কিন্তু মুখের ঠিক পাশেই এভাবে স্পষ্ট দাগগুলো সে কীভাবে লুকোবে? মানুষটা একটু বেশিই অধৈর্য আর আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল গতকাল!
মনে মনে একরাশ অভিমান আর রাগ জমিয়ে রিদি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। সৌহার্দ্যের পাশে গিয়ে শক্ত হয়ে বসে এক দৃষ্টিতে ঠান্ডা ও রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বউয়ের এমন আকস্মিক মেজাজ বদল দেখে সৌহার্দ্য এক চুলও নড়ল না। তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর মুখানা আরও কঠিন করে, বরফশীতল কণ্ঠে সে বলে উঠল,

— “কী হলো? এভাবে ভিমরুলের মতো তাকিয়ে আছ কেন? আমাকে খেতে চাও নাকি? ওকে বেবি, কাম অন! এমনিতেই আমার মন ভরেনি; হাসপাতালের বেড ছোট ছিল, ওটাতে ম…”
রিদির রাগ একদফা বেড়ে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা অভিমান আর ঠোঁট কাঁপানো ক্ষোভ লুকিয়ে, একটু রাগ দেখিয়ে বিরক্ত হয়ে সে ফুঁসে উঠল,
— “অসহ্য লোক! আপনার বেহায়া মুখটা বন্ধ করেন। দেখেন কী করছেন এগুলো! রাক্ষস একটা! আমি বাড়ি কীভাবে যাবো, সবাই কী ভাববে ছিঃ?”
সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল; সে এক দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার নিজেরও ভীষণ খারাপ লাগছে, মনে হচ্ছে মেয়েটাকে বোধহয় একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে— সেই মুহূর্তে এতটা বেপরোয়া না হলেও হয়তো চলত। কিন্তু তখন পরিস্থিতিটাই এমন ছিল যে চাইলেও সে নিজেকে সামলাতে পারেনি। তবে সৌহার্দ্য কি আর সহজে নিজের দোষ স্বীকার করার পাত্র? নিজের ভেতরের সেই নরম অনুভূতি আর অপরাধবোধ রিদিকে বুঝতে না দিয়ে, সে চোখে-মুখে কৃত্রিম বিরক্তি ফুটিয়ে বলে উঠল,

— “স্টুপিড মহিলা, স্ট্যাম্পগুলো না থাকলে বরং লোকে খারাপ ভাবত, আমার সিস্টেমে সমস্যা আছে ভাবত। কাম ক্লোজ টু মি! কোথাও বাদ পড়ছে কিনা চেক করি!”
বলেই সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না; রিদিকে আলতো টানে নিজের কোলের কাছে টেনে বসাল। পাশের ড্রয়ার থেকে মলম বের করে অতি যত্নে, আলতো ছোঁয়ায় দাগগুলোর ওপর সেটা লাগাতে শুরু করল সে। এরপর রিদির কপালে একটা ছোট চুমু এঁকে স্নিগ্ধ গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
— “বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলছি জান?”
রিদি মুখটা গোমড়া করে ফিসফিস করে বলল,
— “হুম!”

সৌহার্দ্য রিদির শাড়ি গলিয়ে উন্মুক্ত কোমরে হাতের এলোমেলো স্পর্শ করতে নরম গলায় বলে উঠল,
— “সরি মাই হার্ট, আই’ল বি মোর কেয়ারফুল নেক্সট টাইম। বিশ্বাস না হয় এখন ট্রাই করতে পারো, করবে?”
রিদি রাগে ফুঁসে উঠে তীব্র বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,
— “দূরে সরুন! দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় না রেখে এখন আবার বাজে কথা বলছেন, লজ্জাহীন লোক!”
সৌহার্দ্য রিদির নাকে হালকা করে কামড় দিয়ে ফিসফিস করে হেসে বলল,
— “বিড়াল একবার মাছের স্বাদ পেলে বারবার চেষ্টা করতে চায়, সুইটহার্ট!”
রিদি মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলে উঠল,
— “হুম! আর সেটা যদি আপনার মতো নির্লজ্জ বিড়াল হয়, তাহলে তো কথাই নেই!”
সৌহার্দ্য এবার একটু গম্ভীর গলায় বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
— “স্টুপিড মহিলা, কথা কম বলে খেয়ে নাও। এখন থেকে বেশি বেশি খেতে হবে, অনেক এনার্জির প্রয়োজন!”

বলেই পাশের টেবিলের ওপর রাখা খাবারের প্লেটটা তুলে রিদির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
— “আমার একটু কাজ আছে মাই হার্ট, তুমি খেয়ে নাও, ওকে?”
রিদি খাবারটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় দিল। সৌহার্দ্য তখন নিজের কাজে মনোযোগ দিল, আর রিদি নিজের খাওয়ার ফাঁকে পরম যত্নে সৌহার্দ্যকেও খাইয়ে দিতে লাগল। সৌহার্দ্যও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে একদম চুপচাপ, বাধ্য ছেলের মতো সে খাবার খেতে লাগল।
বিকাল প্রায় চারটা বাজে। রিদি তাদের নতুন বাড়িটার চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছিল। গতকাল সৌহার্দ্য তাকে এই নতুন বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, আগেরবার যখন এসেছিল যাওয়ার সময় আর ভালো করে চারপাশটা দেখা হয়নি; তাই আজ সময় সুযোগ পেয়ে একা একাই সবটা ঘুরে দেখছিল সে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা চেরি ফল গাছের নিচে এসে দাঁড়াল রিদি। থোকা থোকা ফলগুলো দেখে ভীষণ চেনা চেনা মনে হলেও ঠিক নামটা আর জিভের ডগায় আসছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রিদির ভাবনার জগৎ কাঁপিয়ে সৌহার্দ্য এসে দাঁড়াল ওর পাশে— একদম বউয়ের শরীর ঘেঁষে। রিদি তখন গাছ থেকে কয়েকটা ফল পেড়ে মুখের মধ্যে পুরে নিয়েছে; ফুলকো গাল দুটো উঁচিয়ে সে অবুঝ শিশুর মতো সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
— “এই ফলটার নাম কী জানি, ডাক্তার সাহেব? আমার না ঠিক মুখে আসছে, কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না!”

সৌহার্দ্য রিদির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ফুলকো গাল আর চঞ্চল চোখে মেয়েটাকে এই মুহূর্তে অবিকল একটা চেরি ফলের মতোই মিষ্টি লাগছে। তবে হঠাৎ মোহনীয় সেই দৃষ্টি হঠাৎই বদলে গেল, যখন সৌহার্দ্যের চোখ গিয়ে পড়ল পাশের বাড়ির ছাদের ওপর। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে এক দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সৌহার্দ্যের চোয়াল মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে উঠল। রিদির চোখের দিকে না তাকিয়েই সে ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল,
— “রুমে যাও।”
রিদি হঠাৎ বুঝতে পারল না তাকে হঠাৎ এমন অদ্ভুতভাবে রুমে যাওয়ার কারণ কী! বাইরে খোলা হাওয়ায় তার বেশ ভালোই লাগছিল। তাই ইতস্তত করে মিনমিন করে সে বলে উঠল,
— “এখন রুমে কে…?”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য এবার বেশ কড়া গলায় একটা ধমক দিয়ে বসল,

— “আই’ম টেলিং ইউ টু গো টু ইওর রুম। ডোন্ট আস্ক আ সিঙ্গেল কোয়েশ্চন!”
সৌহার্দ্যের এভাবে হুট করে রেগে যাওয়ার কোনো কারণই মাথায় এল না রিদির। চরম বিরক্তিতে মুখ ফুলিয়ে সে ভেতর বাড়ির দিকে পা বাড়াল। মনে মনে রাগে গজগজ করতে করতে বিরবির করে বলে উঠল,
— “আস্ত একটা গিরগিটি কোথাকার! হুটহাট কেন যে এরকম আগুন হয়ে যায়, কিচ্ছু বুঝি না!”
রিদি আড়ালে চলে যেতেই সৌহার্দ্য আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সোজা হেঁটে সে চলে গেল পাশের বাড়ির ছাদে, যেখানকার ছেলেটা একটু আগেও এক দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে ছিল। ছেলেটা তখনও চারদিকে চোখ বুলিয়ে কী যেন একটা খোঁজার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই সৌহার্দ্য নিঃশব্দে তার পিছু পিছু গিয়ে সজোরে পিঠে একটা হাত রাখল। আচমকা ছোঁয়া পেয়ে ছেলেটা চমকে পেছনে ফিরে তাকাল; আর সামনে সৌহার্দ্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই তার মুখের রং একনিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে আমতা আমতা করে সে বলে উঠল,

— “জী… ভাইয়া, কিছু বলবেন?”
সৌহার্দ্য ছেলেটার আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে ঠোঁট কামড়ে ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
— “তোকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না, সোজা করাতে ইচ্ছে করছে!”
ছেলেটা ভয়ে তোতলাতে গলায় বলে উঠল,
— “মা- মানে…?”
সৌহার্দ্য চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে গম্ভীর স্বরে নির্দেশ দিল,
— “ছাদের এই চিকন রেলিংটা ধরে চারপাশ হেঁটে আয়!”
কথাটা শুনে ছেলেটা তো রীতিমতো কুপোকাত! এটা পাঁচতলা বিল্ডিং— এই সরু রেলিং দিয়ে সে কীভাবে হাঁটবে? একবার পা ফসকে নিচে পড়লে তো আর আস্ত রাখা যাবে না, সোজা ইন্নালিল্লাহ কনফার্ম! ভয়ে কাঠ হয়ে সে আমতা আমতা করে বলে উঠল,
— “সরি ভাইয়া! ভুল হয়ে গেছে, আর কখনো এমন হবে না!”
সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল, তারপর একদম গমগমে কণ্ঠে চূড়ান্ত রায় শুনিয়ে দিল,
— “ওকে, দেন! পাঁচশ বার কান ধরে ওঠবস করবি আর সাথে মুখে বলবি— ‘ভাইয়ার বউ আমার মা, কখনো বাজে দৃষ্টিতে তাকাবো না!'”

ছেলেটা অসহায় হয়ে প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলতেও গিয়েছিল, কিন্তু সৌহার্দ্যের চোখের সেই হিংস্র আগুন দৃষ্টি দেখে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। উপায় না পেয়ে সে বাধ্য ছেলের মতো কান ধরে ওঠবস করতে শুরু করল আর ভাঙা গলায় সৌহার্দ্যের শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো আওড়াতে লাগল। এভাবে করতে মাত্র একশবারের মতো টান দিতেই ভয়ে ও ক্লান্তিতে ছেলেটার মাথা ঘুরে সে সোজা ছাদের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে গেল।
দৃশ্যটা দেখে সৌহার্দ্য এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দ্রুত সামনে ঝুঁকে ছেলেটার কলার খপ করে চেপে ধরে পরপর কয়েকটা কষিয়ে ঘুসি বসিয়ে দিল। তারপর ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে উঠল,

— “ওটা আমার পবিত্র ফুল! চোখ দিয়েও যদি কেউ ওর দিকে বাজে দৃষ্টিতে তাকানোর দুঃসাহস দেখায়, কসম খোদার, পুতে ফেলব একদম! আজকের পর থেকে তোর জন্য এই বাড়ির আশপাশও নিষিদ্ধ। ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে এই বাড়ি ছাড়বি, নইলে কিন্তু সোজা দুনিয়া থেকেই ছাড়িয়ে দেব! কথাটা যেন মাথার মধ্যে ভালো করে গেঁথে থাকে!”
বলেই সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না; হনহন করে পায়ে ছাদ থেকে বেরিয়ে গেল।
আসলে পুরো ঘটনার পেছনে কারণটা অন্য কিছু ছিল। একটু আগে রিদি যখন বাগানে দাঁড়িয়ে চেরি ফলগুলো মুখে পুরে মুখ ফুলিয়ে অবুঝ শিশুর মতো সৌহার্দ্যের সাথে কথা বলছিল, তখন আনমনে তার ঠোঁট দিয়ে সামান্য রস গড়িয়ে পড়েছিল। পাশের ছাদ থেকে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটাই ওই ছেলেটা খুব নিচু মানসিকতা নিয়ে দেখছিল এবং কেমন এক বিকৃত ও বাজে ইঙ্গিতে নিজের ঠোঁট চাটছিল— যা নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে গিয়েছিল ঠিক সৌহার্দ্যের তীক্ষ্ণ চোখের নজরে!
রাত প্রায় দশটা। ফারিস নিজের রুমে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু জরুরি ফাইল চেক করছিল। ঠিক তখনই রিভা এসে চুপচাপ ফারিসের পাশে বসল এবং কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে মুখ ফুলিয়ে নালিশের সুরে বলে উঠল,

— “নির্লজ্জ এমপি, আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না! আমাকে একটুও সময় দেন না! অথচ আগে তো আমার পেছনে সারাদিন ঘুরঘুর করতেন!”
ফারিস তখন এমন একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত, যেটা খোদ সৌহার্দ্য তাকে দায়িত্ব দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। ফাইলের স্তূপের দিকে তাকিয়ে থেকেই সে একটু বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
— “শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে, আমি নির্বাচন পর্যন্ত প্রচারণা করি— নির্বাচন শেষ, প্রচারণাও শেষ! এখন আমার মাথা না খেয়ে যা, গিয়ে চানাচুর খা! তোর ভাই যে কাজের দায়িত্ব দিছে, সেটা সময়মতো শেষ করতে না পারলে ওই ভেজাল প্রোডাক্ট আমার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে!”
বলেই সে আবার সম্পূর্ণ মনোযোগ দিল ফাইলের লেখাগুলোর ওপর।
রিভা নাক-মুখ কুঁচকে সন্দেহপ্রবণ গলায় বলে উঠল,
— “আমি সব বুঝি, পরকীয়া এমপি! আমাকে ইদানিং আপনি অনেক ইগনোর করছেন। সত্যি করে বলুন তো, পেছনে পেছনে কোথায় কী চালাচ্ছেন? সত্যি বলছি, খুন করে ফেলব আমি আপনাকে একদম!”
রিভার এমন আজেবাজে অভিযোগে ফারিস এক লহমায় চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকাল এবং ফোঁস করে উঠে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,

— “এই ভেজাল প্রোডাক্টের নির্ভেজাল প্রোডাক্ট বোন, আমার চরিত্রে একদম দাগ লাগাবি না! সবাই মাঠে স্লোগান দেয়, তুই শুনিস না? ‘ফারিস ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র! ফোকলা দাঁত!’— ওগুলো তো কানে তুলবি না! তোদের ভাই-বোন দুটোর ভালো জিনিস কখনোই ভালো লাগে না!”
রিভা এক লহমায় রেগে গিয়ে ফারিসের চুলে এক টান মেরে তিরতির মেজাজে ফুঁসে উঠল,
— “একদম সব কিছুতে ভাইয়ার দোহাই দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবেন না, ফারিস ভাই! আমার ভাইয়ার মতো ভালো মানুষ এই দুনিয়ায় একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না!”*
ফারিস নাক-মুখ কুঁচকে চরম বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
— “হুম! তোর ভাই যা ভালো মানুষ… তার ওই ভালো মানুষির আসল কীর্তি শুনলে তোর তো এক্কেবারে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে!”

রিভা রাগে গজগজ করতে করতে সোফা ছেড়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু ফারিস বিদ্যুৎ গতিতে তার হাত টেনে ধরে মেয়েটার নরম কোমর জড়িয়ে কোলে বসিয়ে ফেলল। তারপর মুচকি হেসে স্নেহের সুরে বলে উঠল,
— “সোনা, ময়না পাখি, পকেট সাইজের ঝড়! আমার কথায় কথায় এভাবে ফোঁস ফোঁস করতে নেই সোনা। চল, আমরা একটু বৃন্দাবন থেকে ঘুরে আসি!”
বলেই সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না; রিভাকে এক টানে পাঁজা কোলে তুলে সরাসরি বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজের ভারী শরীরের সম্পূর্ণ ভর তখন রিভার ওপর ছেড়ে দিয়ে, মেয়েটির নরম ওষ্ঠের ভাঁজে নিজের পুরুষালি ওষ্ঠ গুঁজে দিল। এরপর ধীরে ধীরে সমস্ত বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে মেয়েটিকে নিয়ে হারিয়ে গেল একদম অন্য একটা জগতে!

রাত প্রায় দুটো বাজে। সৌহার্দ্য সবেমাত্র বাড়ি ফিরল। রাত এগারোটার দিকে রিদিকে চৌধুরী বাড়িতে রেখে সে জরুরি কাজে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে চলে গিয়েছিল। অন্ধকার ঘরটায় পা রেখেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। তার জানামতে, তার বউ গুটগুটে অন্ধকারে থাকতে পারে না; সবসময় হালকা ডিম লাইট জ্বালানো থাকে।
সৌহার্দ্য সুইচ টিপে রুমের আলো জ্বেলে চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল— রিদি কোথাও নেই! মুহূর্তেই তার মাথায় বিষয়টি খেলে গেল। রিদি নিশ্চয়ই রাগ করে নিজের রুম বদলে অন্য রুমে চলে গেছে। বিকালে ধমক দেওয়ার পর থেকে মেয়েটা তার সাথে একটাও কথা বলেনি; তখন তার নিজের মাথাও গরম থাকায় সে আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এখন বুঝতে পারল, বউটা রাগ করে অন্য রুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
রাগে চোয়াল শক্ত করে একহাতে মুঠি পাকিয়ে সে হিসহিস করে বলে উঠল,

— “স্টুপিড মহিলা! আমার সাথেই তেজ দেখানো হচ্ছে! ইচ্ছে তো করছে…!”
পুরো কথা শেষ না করেই সে শক্ত হাতে মুঠো পাকাতে পাকাতে রিদির রুমের দিকে লম্বা পায়ে হেঁটে গেল। রুমের দরজার সামনে গিয়ে হাতটা হ্যান্ডেলে রাখতেই সে থমকে দাঁড়াল। আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, রিদির পাশে বিছানায় অন্য কেউ একজন শুয়ে আছে। সৌহার্দ্য সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেল, এটা নিশ্চয়ই পৃথা! কারণ রিভা তো এখন চৌধুরী বাড়িতে নেই, সুতরাং এই সময়ে পৃথাই রিদির সাথে থাকার কথা।
এই বুঝতেই সৌহার্দ্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেল। তার জীবনে মা ছাড়া আর কেবল রিদি — এই দুই নারী ছাড়া সে কখনো অন্য কোনো নারীর দিকে চোখ তুলেও তাকায়নি। রিভাকে সে নিজের ছোট বোনের মতো ভালোবাসে ও তার থেকেও সে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখে। আর পৃথার সাথে তো প্রয়োজন ছাড়া সে কোনোদিন কথাই বলেনি! এখন ঘুমন্ত অবস্থায় মেয়েটার জামাকাপড় ঠিক আছে কি না, সেটাও তো সে নিশ্চিত নয়!
এই অস্বস্তি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ভেবে সে দ্রুত নিজের রুমে ফিরে গেল এবং পকেট থেকে ফোন বের করে সোজা আরবানকে ডায়াল করল। ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হতেই আরবানকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে একরাশ বিরক্তিমাখা কণ্ঠে হুকুম ছাড়ল,

— “দ্রুত বাড়ি আয়, আর্জেন্ট!”
বলেই সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ফোন কেটে দিল।
ওদিকে ফোন কেটে যাওয়ার পর আরবান রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। সে ভাবল, নিশ্চয়ই বাড়িতে মারাত্মক কোনো ইমার্জেন্সি সমস্যা হয়েছে! না হলে তার এই ভাই তো কখনো ডিউটি ফেলে হঠাৎ এভাবে বাড়ি চলে যাওয়ার মানুষ নয়। টেনশনে তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল— কে জানে বাড়িতে কী বিপদের ঝড় বয়ে গেছে! তার ওপর তার নিজের বউটাও তো অসুস্থ! সব মিলিয়ে এক অজানা আশঙ্কায় সে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের ডিউটিটা পাশের এক কলিগকে বুঝিয়ে দিয়ে পাগলের মতো বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটে চলল।
প্রায় বিশ মিনিট পর আরবান হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়িতে প্রবেশ করল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সে দেখল সৌহার্দ্য একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে মোবাইল টিপছে। চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় বুক তখনও কাঁপছে তার। তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে সে জানতে চাইল,
— “কী হয়েছে ভাইয়া? কার কী সমস্যা হয়েছে?”

সৌহার্দ্যের চেহারায় তখন বিরক্তি আর রাগের মিশ্রণ। সে চোখ তুলে শীতল গলায় বলল,
— “তোর বউকে তোর রুমে নিয়ে রেখে আয়! আমার বউয়ের সাথে চিপকে ঘুমিয়ে আছে!”
সৌহার্দ্যের কথা শুনে আরবান তো রীতিমতো তাজ্জব বনে গেল! এই সামান্য একটা ব্যাপারের জন্য তাকে হাসপাতাল থেকে এভাবে জরুরি তলব করে নিয়ে আসা হলো? সে তো ভয়ে বুক চেপে ধরে ভেবেছিল না জানি বাড়িতে কোনো বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে গেছে!
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আরবান যখন হাঁফ ছেড়ে রিদির রুমের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই সৌহার্দ্যের গমগমে কণ্ঠ আবার পিছু ডাকল,
— “আমার বউয়ের দিকে ভুলেও তাকাবি না! বউকে নিয়ে সোজা নিজের রুমে যাবি, এক সেকেন্ডও দেরি করবি না।”
সৌহার্দ্যের এই অতিরিক্ত হুকুম শুনে আরবান নাক-মুখ কুঁচকে চরম বিরক্তি প্রকাশ করল। রিদির রুমের উদ্দেশ্যে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
— “ধুর! নির্ভেজাল বউ পাগল একটা!”
মুখে বলে, — “বউ মানিনা!”
আরবান পৃথাকে তার রুমে পৌঁছে দিয়ে ড্রয়িংরুমে নেমে এল। তারপর সোফায় বসে থাকা ভাইয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দুষ্টু হাসিতে বলে উঠল,

— “তোমার বউয়ের রুম এখন একেবারে ক্লিয়ার, ভাইয়া!”
একটু থেমে, চোখের কোণায় তীর্যক এক খোঁচা দিয়ে আবার যোগ করল,
— “তা ভাইয়া… তুমি না মুখে বলো রিদুকে নিজের বউ বলে মানো না? তাহলে আজ এক রাত রিদু ছাড়া থাকতে পারছো না কেন বলো তো?”
সৌহার্দ্য তখন আনমনে নিজের ফোন স্ক্রিনে কিছু একটা দেখছিল। ছোট ভাইয়ের এমন কথায় সে গম্ভীর হয়ে গেল। কোনো উচ্চবাচ্য না করে, নির্বাক কণ্ঠে শীতল অথচ শান্ত গলায় জবাব দিল,
— “মানিনা ওটাকে আমার বউ আর মানবোও না। তুই বাড়ি ফিরে তোর বউকে রুমে না দেখলে টেনশন হতি, তাই তোর বউকে তোর রুমে নিয়ে যেতে বলছি। এখন বাজে কথা না বলে নিজের কাজে যা ইডিয়েট!”
সৌহার্দ্যের এমন কাঠখোট্টা আচরণ দেখে আরবান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাইটার এমন জেদ আর আড়ষ্টতা দেখে মনে মনে চরম হতাশা জমল তার। ভাইয়ের পাশ দিয়ে নিজের রুমের দিকে এগোতে এগোতে সে বিড়বিড় করে উঠল,

— “এক হালি বাচ্চা পয়দা করে ও বলবে বউ মানিনা! ফারিস ভাই ঠিকই বলে, এটা একটা আজব জিনিস!”
আরবান নিজের রুমের দিকে চলে যাওয়ার পর সৌহার্দ্য এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেটে ফোনটা গুঁজে দিয়ে সে সোজা রিদির রুমের দিকে এগিয়ে গেল। দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা রাগটা যেন এক লহমায় দ্বিগুণ হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল! কী অদ্ভুত দৃশ্য— তার বউটা কী মায়াবী ভঙ্গিতে একটা তুলতুলে বিড়ালছানাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। দেখলে মনে হবে আস্ত কোনো নিজের বাচ্চা!
সৌহার্দ্য বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে আলতো করে বিড়ালছানাটাকে তুলে নিতে গেল। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল তখনই; ওইটুকু একটা ছানার মিষ্টি ঘুমটা এভাবে হুট করে ভেঙে যাওয়ায় সে জ্বলজ্বলে চোখে সোজা সৌহার্দ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চাইল।
সৌহার্দ্য চোখ ছোট করে, চরম বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে হুমকি দিয়ে উঠল,

— “স্টুপিড বিড়াল! তোর এত বড় স্পর্ধা হয় কী করে আমার বউয়ের বুকে এভাবে ঘুমোনোর? নিজের বউটাকে তো এখনো ঠিকমতো বুকে জড়িয়ে ঘুমাতেই পারলাম না, আর তুই কিনা…!, এরপর যদি আর একবার তোকে আমার বউয়ের আশপাশেও দেখি, সোজাসুজি অ্যামাজনের জঙ্গলে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসব!”
কিন্তু ছানাটা যেন সৌহার্দ্যের সেই রক্তচক্ষু বা হুমকির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করল না! উল্টো ঘর কাঁপিয়ে সশব্দে মিউ মিউ করে ডেকে উঠল। সৌহার্দ্য কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই রিদি ধরফরিয়ে বিছানা থেকে জেগে উঠল। মিকিকে সৌহার্দ্যের কোলে এভাবে ঝুলতে দেখে পলকে তন্দ্রা কেটে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন গলায় সে বলে উঠল,

— “একি! আপনি বাচ্চাটার সাথে কী করছেন?”
সৌহার্দ্য এক পলক রিদির দিকে তাকাল। সদ্য ঘুম ভেঙে যাওয়ায় মেয়েটার মুখটা সামান্য ফুলে একদম তুলতুলে রসগোল্লার মতো হয়ে আছে। রাগ লাগলেও বউয়ের আদুরে চেহারা দেখে সৌহার্দ্য জোর করে নিজেকে দমিয়ে ফেলল। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিড়ালছানাটার তুলতুলে গায়ে একটা আঙুল বুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
— “আর কী করব তোমার এই স্টুপিড বিড়ালের সাথে? দেখতে পাচ্ছ না, আমি ওকে ইম্পর্টেন্ট হেলথ টিপস দিচ্ছি!”
সৌহার্দ্যের এমন আজগুবি ও বানোয়াট কথা শুনে রিদি একদম বেকুব বনে গেল। নাক-মুখ কুঁচকে সে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,

— “আশ্চর্য! একটা অবুঝ প্রাণী এসবের কী বোঝে যে আপনি ওর সাথে ডাক্তারি ফলানো শুরু করেছেন?”
আর এক মুহূর্তও ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না সৌহার্দ্য। বিড়ালছানাটাকে একপাশে বিছানায় আলগোছে নামিয়ে রেখে সে চরম তিরিক্ষি মেজাজে খাপছাড়া কণ্ঠে হুকুম ছাড়ল,
— “রুম ছেড়ে এখানে এসেছ কেন, স্টুপিড? ফাস্ট রুমে চলো, আমি ঘুমাব!”
রিদিও নাছোড়বান্দা। সেও মুখ ফুলিয়ে নিজের রাগ জাহির করে বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
— “যাব না আমি আপনার সাথে! একটুও ভালো লাগে না আমার! সারাক্ষণ শুধু আপনার ওই উগ্র মেজাজ আর ধমকাধমকি! যেদিন থেকে আমাকে ধমক দেওয়া বন্ধ করবেন, শুধু সেদিনই আপনার রুমে যাব, তার আগে নয়!”

একটানে পুরো কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলে মেয়েটা হাঁপাতে লাগল। সৌহার্দ্য কপাল কুঁচকে একদৃষ্টিতে বউয়ের এই তেজ দেখে যাচ্ছিল; এতক্ষণ বেশ মন দিয়েই সে রিদির সব নালিশ শুনছিল। কিন্তু শেষমেশ আর সহ্য হলো না। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে এক ঝটকায় রিদিকে সোজা পাঁজা কোলে তুলে নিল।
হঠাৎ এমন আকস্মিক কাণ্ডে রিদি পড়ে যাওয়ার ভয়ে আঁতকে উঠে দুহাতে শক্ত করে সৌহার্দ্যের গলা জড়িয়ে ধরে প্রতিবাদ করে উঠল,
— “ছেড়ে দিন আমাকে! নিচে নামান বলছি, নামান… মেজাজের মন্ত্রণালয়!”
সৌহার্দ্য রাগী দৃষ্টি রিদির ওপর ফেলে ধমক দিয়ে হুংকার ছাড়ল,
— “আর একবার হাত-পা ছোড়াছুড়ি করলে সোজা ছাদ থেকে নিচে ছুড়ে ফেলব, স্টুপিড!”
বলেই সে রিদির আরও একটু কাছে ঝুঁকে এল। তারপর ঠোঁট কামড়ে একদম তার কানের কাছে মুখ নিয়ে অদ্ভুত এক নরম অথচ গম্ভীর স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল,
— “ছুড়ুন শব্দটা আমার ডিকশনারিতে নেই, বউ! এখন থেকে মুখে শুধু একটাই শব্দ বলবে— ‘ধরুন আমাকে, ওকে সুইটহার্ট!'”

কথাটা শেষ করেই সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না; রিদিকে ওই অবস্থায় কোলেই জড়িয়ে ধরে সোজা নিজের রুমের দিকে লম্বা পায়ে পা বাড়াল।
রিদিকে বিছানায় আলগোছে শুইয়ে দিয়ে সৌহার্দ্য নিজের পরনের শার্টটা খুলে ফেলল। কিন্তু তার ঠিক পরেই যখন সে রিদির দিকে এক পা বাড়াল, অমনি মেয়েটা ভয়ে একদম ছিটকে বিছানার অপর প্রান্তে সরে গেল।
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে, কণ্ঠে খানিকটা আলতো বিরক্তি মিশিয়ে বলে উঠল,
— “হোয়াট? এমন হুলো ব্যাঙের মতো ছিটকাচ্ছ কেন?”
রিদি বুক কাঁপানো ভয়ে ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে উঠল,
— “আপ-আপনি… এভাবে এগোচ্ছেন কেন আমার দিকে?”
সৌহার্দ্য এবার ঠোঁটে এক ফালি বাঁকা হাসি টেনে বলল,
— “তুমি মনে মনে যা ভাবছ ঠিক সেটাই, বেবি! তাই বেশি কথা না বাড়িয়ে সোজা কাছে এসো, রাতের বাকি কাজটুকু সেরে নিই!”

কথাটা কানে যেতেই রিদি ভয়ে একেবারে গুটিয়ে গিয়ে নিজেকে আরও দূরে সরিয়ে নিল। ভয়ে কেঁপে ওঠা গলায় সে বলে উঠল,
— “একদম না! দূরে সরুন বলছি, রাক্ষস একটা! এখনো আমা…”
রিদির মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। তাকে আর একটাও সুযোগ না দিয়ে সৌহার্দ্য যেন একটু কৃত্রিম বিরক্তি দেখিয়ে বলে উঠল,

— “স্টুপিড! আমি স্রেফ ঘুমানোর কথা বলছি, তোমার মাইন্ড এত খারাপ কেন, বউ?”
তবে পরমুহূর্তেই কেমন যেন দুষ্টুমি মাখা চোখে বউয়ের দিকে তাকিয়ে সে আবার যোগ করল,
— “এক মিনিট… তুমি নিজে থেকে ইনিয়ে-বিনিয়ে আমাকে অন্য কোনো প্রস্তাব দিচ্ছ নাতো? শোনো, দিলেও আমার এখন বিন্দুমাত্র মুড নেই; এসে ঘুমোবো!”
সৌহার্দ্যের এমন বেপরোয়া ও নির্লজ্জ কথা শুনে রিদি রীতিমতো তাজ্জব! রাগে-অভিমান ফুলিয়ে সে ফায়ার হয়ে বলে উঠল,

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৭

— “ছিঃ! অসভ্য লোক! শুধু বাজে কথা! মুখ না… যেন শয়তানের ফুল-টাইম অফিস!”
বউয়ের এত অভিমান আর বকবকানির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করল না সৌহার্দ্য। সে বিছানায় শুয়ে পড়ে এক হ্যাঁচকা টানে রিদিকে সোজা নিজের শক্তপোক্ত বুকের ওপর টেনে নিল। তারপর তার নরম চুলে হাত বুলিয়ে, একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে গভীর ও উষ্ণ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,
— “অনেক হয়েছে। ক্লোজ ইয়োর আইজ, সুইটহার্ট।”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here