Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮১

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮১

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮১
Maha Aarat

সন্ধ্যা নামতে নামতে গ্রামের আকাশটা কেমন যেন ধূসর হয়ে এলো।দূরে বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো—আকাশের প্রান্তে ধীরে ধীরে জমে উঠছে ঘন সুনসান মেঘ। পাখিরা যেন বুঝতে পেরে গেছে কিছু একটা আসছে—তারা গাছের ডালে ফিরে এসে একে একে নীড়ে বসে পড়ছে, পাখনার শব্দও যেন আজ ধীর… মৃদু।
পাকা আমে গাছের পাতা নিচু হয়ে এসেছে, বাতাসের হালকা ধাক্কায় পাতাগুলো কাঁপছে, কিন্তু সে কাঁপন যেন ভয় নয়—বরং প্রতীক্ষা।মাটির গন্ধও বদলে গেছে; বাতাসে আজ এক ভিজে-মাটির গন্ধ, যদিও এখনো এক ফোঁটাও নামেনি।

দূরের শালবনে কুয়াশা ছোঁয়ার মতো একরকম ধোঁয়াটে ভাব।পানের পাতা যেমন নরম করে ঝুলে পড়ে, সন্ধ্যার আলোটাও তেমনি একদম নরম—না দিনের মতো কড়া, না রাতের মতো কালো—এক অনিশ্চিত ধূসর।
গ্রামের পুরনো টিনের ছাউনিতে হালকা ধাতব আওয়াজ হয় যখন বাতাস বয়ে যায় তার উপর দিয়ে—“টং টং” শব্দ করে। পাশের নদীর পাড়ে কাশফুল গুলো আজ অস্বস্তিতে দুলছে, বাতাসের ঝাপটায় দুলছে না, বরং নিজে থেকেই যেন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বৃষ্টির জন্য।
আকাশের রং তখন ধূসর-নীল, আর ঠিক মাঝখান দিয়ে একটা কালো রেখা টেনে কেউ যেন বলে দিয়েছে—“বৃষ্টি আসছে।”

আকাশটা সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ করে ঘন মেঘে ঢেকে গেল।দক্ষিণ দিক থেকে হাওয়ার টান যেন ধানক্ষেতে ঢেউ তুলে দিচ্ছিল।মাথার উপর দিয়ে একঝাঁক বক উড়ে গেল কুঁচকে যাওয়া পাখার মত ডানায় করে।দূরে কোথাও ধানগাছের ফাঁকে একটা পাখি ডাকল—অস্বাভাবিক নীরবতার মধ্যে সেই ডাক যেন অদ্ভুত কোমল লাগছিল।
গ্রামের ছোট ছোট কাঁচা রাস্তাগুলোতে ধুলোর বদলে আজ একধরনের স্নিগ্ধতা নেমেছে। মাটির গন্ধে বৃষ্টির পূর্বাভাসের গাঢ়তা মিশে গেছে।বাতাসে শীতল একটা আভাস—যেন প্রকৃতি অপেক্ষা করছে।এই বৃষ্টির স্মৃতি বুকে নিয়েই গ্রামে পা রাখল পুরো তাজওয়ার পরিবার।আরহাম, আহনাফ তাজওয়ার, ,মিসেস আফসানা ,হাফসা, মাইমুনা, আইরা, মাহের উমাইজা, সুস্থ হয়ে ওঠা উমারও।
আহনাফ তাজওয়ার মুখভরা হাসি নিয়ে গ্রামে ঢুকলেন। দীর্ঘদিন পর এমন মিলনমুখর পরিবেশে তাঁর চোখেমুখে তৃপ্তি ফুটে উঠেছে। তিনি আশপাশের মানুষদের সালাম দিচ্ছিলেন, এবং গ্রামের পুরনো মানুষরাও তাঁকে দেখে খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন,
“মাশা আল্লাহ এবার একেবারে মেয়ে জামাই সহ সবাইকে নিয়ে হাজির!”
তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
“জীবন তো আর শুধু শহরের দেয়ালে আটকে থাকা নয় ভাই।মাঝেমধ্যে গ্রামই প্রাণের জায়গা।”

গেটের মুখে এসে গাড়ি থামতেই ছুটে এলেন কাকমণি।উনার চোখে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস—যেন নিজের মেয়েই ফিরেছে বিয়ের পর।হাফসাকে দেখে তিনি চোখের কোণে জল টেনে নিয়ে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমার মেয়েরা ঘরে ফিরেছে!”
আরহাম উমাইজাকে কোলে একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন।উনার মুখে একধরনের প্রশান্তি, কিন্তু গভীরে যেন একটুখানি অনুচ্চারিত কিছু।
আইরার চোখেমুখে এক আলাদা আনন্দ।বাড়িটা আগে ভাইয়ার শ্বশুরবাড়ি ছিল সেই পরিচয়ে আসা হলেও এখন সেটা তার নিজেরও শ্বশুরবাড়ি—বিয়ের পর এই প্রথম আসা সেজন্যই বোধহয় চোখেমুখে এক ধরনের উচ্ছাস, আলাদা ভালোলাগা।

রেস্ট নেওয়া শেষে হাফসা, আম্মু রান্না গোছাতে ব্যস্ত,এদিকে বাচ্চারা চারদিক উজাড় করে দিচ্ছে।একবার পুকুরের ধারে, একবার খেজুর গাছের ছায়ায়, একবার ঘোড়াশালার পাশে ঘোড়া দেখে মুগ্ধ।উমার, যে কিছুদিন আগেও শয্যাশায়ী ছিল, আজ সে হাঁটছে, দৌড়াচ্ছে, খিলখিল করে হাসছে!
মাইমুনা দূর থেকে হেসে বললেন,
“উমার তো এখন সুস্থ একেবারে, আলহামদুলিল্লাহ্‌।”
আইরা ও চুপ করে তাকিয়ে আছে ভাইয়ের একমাত্র ওয়ারিশদের দিকে।একটুকরো সুখ যেন ধীরে ধীরে তার ভেতরে গলে যাচ্ছে!

এই গ্রাম, এই কাদামাটির গন্ধ, এই বুনোহাঁসের দল, মাটির ঘরের ধুলোর গন্ধ—সব মিলিয়ে যেন এক অনন্য অনুভব। আরহাম জানেন,এখানেই কিছু সময়ের জন্য হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে, একটা শহুরে জীবনযাত্রার টানাপোড়েন থেকে খানিকটা ছুটি মিলবে।
বৃষ্টির গন্ধ এখন আরও ঘন।মেঘ ভেঙে প্রথম ফোঁটা পড়ল কাঁঠাল গাছের পাতায়। সবাই তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। হাফসা চোখ বন্ধ করে বলল,
“এই বৃষ্টির শব্দটা… আমার খুব প্রিয়।”
আরহাম শুধু তাকিয়ে রইলেন—এই গ্রামের বুকে, এই মেয়েটার মুখে, এই জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তে—একটু শান্তি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টায়।মনে মনে রবের কাছে শুকরিয়া জানাতে ভুললেন না!

এশা আজকাল আর বেশি কথা বলে না। সেই চঞ্চল, প্রাণোচ্ছল মেয়েটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।চোখের নিচে কালি পড়েছে, রাতে ঘুম হয় না ঠিকমতো। কিন্তু তবুও সে চেষ্টা করে – প্রতিদিন ফজরের আজানের সাথে উঠে যায়, রায়ানের পাশে চুপচাপ বসে, কাঁধে মাথা রাখে… কখনো কখনো শুধু একটুখানি বলেই ফেলে –
“আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের জন্য আরও ভালো কিছু রেখেছেন, তাই না?”
রায়ান চুপ করে থাকেন।উনার নিজের বুকটাও জ্বলে, কিন্তু উনি কান্না লুকাতে শিখে গেছেন।স্ত্রীকে ভেঙে পড়তে দেখলে উনি আর নিজেকে ভাঙতে দিতে পারেন না।মাঝে মাঝে, গভীর রাতে, এশা যখন সেজদায় থাকে, রায়ান পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকেন।উনার মনে হয়, এই নারীর ধৈর্যই হয়তো একদিন উত্তম কিছু নিয়ে আসবে।
রায়ান ভেবেছিলেন,পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নাম রাখবেন নিজের সন্তানের, অথচ এখন সেই ছোট্ট প্রাণ এক নামহীন সম্বোধন হয়ে বেঁচে আছে তাদের দোয়ার পরতে পরতে।
এশা মাঝে মাঝে ছোট্ট জামাটা হাতে নিয়ে বসে থাকে — সেই প্রথম কেনা, নীল রঙের। চোখে জল আসে না আর, কিন্তু বুকের ভিতরটা যেন ভার হয়ে থাকে সারাদিন। পাশের বাসার বাচ্চাদের হাসাহাসি শুনলে সে মৃদু হাসে, কিন্তু দীর্ঘশ্বাস চাপা দিতে পারে না।

রায়ান বাইরে থেকে ফিরলে প্রথমেই তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “আজ ভালো লাগছে একটু?”
এশা মাথা নাড়ে।উত্তর দিতে চায় না, শুধু চায় রায়ান পাশে থাকুন।
তারা এখন একসাথে কুরআন পড়ে, বিশেষ করে সূরা আল-বাকারা ও সূরা ইউসুফ। এশা বলেছে, নবী ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তান হারিয়েও ধৈর্য ধরেছিলেন।
“আমরা তো একবারেই ভেঙে পড়ছি না তো?” — তার প্রশ্নে রায়ান কাঁপা গলায় বলেন,
“না। আমরা ধৈর্য ধরছি, একসাথে।”
মাঝে মাঝে তারা দুজনে রাতের বেলা একসাথে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন।এশা চুপচাপ বলে ফেলে,
“আমাদের ছোট্টসোনা বোধহয় এখন কোনো ফেরেশতার কোলে ঘুমোচ্ছে, তাই না?”
রায়ান শুধু মাথা নিচু করেন, চোখের জল পাছে পড়ে যায় বলে।
তারা জানে—আল্লাহ কাউকে সত্ত্বা দিয়ে আবার কেড়ে নেন, কারণ হয়তো জান্নাতে সেই সন্তান তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।এই দুনিয়ায় না হয় একটু অপেক্ষা’ই হলো।

গ্রামবাংলার ঘ্রাণমাখা পরিবেশে আজ দুপুর গড়াতেই উঠানে চটজলদি মাদুর বিছানো হলো। বাড়ির পেছনের নারকেল গাছের ছায়ায় বসে একপাশে বড় হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে খাসির ঝোল—মশলা দেওয়া, পেঁয়াজে ভালো করে কষানো।পাশেই আরেক হাঁড়িতে আলু দিয়ে টাকি মাছের ভুনা ফুটছে, যার গন্ধ বাতাস ছিঁড়ে এসে সবার নাকে লাগছে।
চুলার পাশে বসে আহনাফ তাজওয়ার গ্রামীণ বেশে গামছা দিয়ে ঘাম মুছে বললেন,
“ভাই ,শহরের কেমিকেল দেয়া খাবার খেয়ে আর মানুষ বাঁচে নাকি? খাঁটি সরিষার তেলে রান্না করা হোক।”
আহমাদ মুসতাকিম হাসতে হাসতে হাঁড়িতে নেড়ে দিয়ে বললেন,
“এই গন্ধটা তো শুধু গ্রামেই মেলে, ভাই।”
তবে শুধু ঝোল-ভাতেই থেমে থাকেনি আয়োজনে। ছিল ধানভাঙা আতপ চালের ভাত,টমেটো চাটনি,ধনেপাতা-মরিচ মাখানো বেগুন পোড়া।ঘরে তৈরি সরিষার তেলে ভাজা ইলিশ,চালতার টক,মাটির হাঁড়িতে রান্না করা ঝোল ঝোল দেশি মুরগির তরকারি, তাজা ধনেপাতা ছড়িয়ে গরম গরম ভাইব নিয়ে আছে। কাঁঠালের কোয়া দিয়ে করা মুচমুচে পাকোড়া আর ট্যাংরা মাছের পাতলা সুরুয়া দিয়ে মুখ ভরপুর।
পেটপুরে খাওয়ার পর এক কোণে পাকা কলা, আম আর খেজুর দিয়ে তৈরি করা পায়েস এনেছেন কাকামণি, সঙ্গে বাটিতে করে গরম দুধের সঙ্গে খেজুর গুড়।
সবাই বসে গল্প করছে।আরহাম এক ফাঁকে হাফসাকে ইশারায় বললেন , “এত আদর যত্ন এতদিন পাইনি বলে মোটা হইনি।এবার বোধহয় আর পারলাম না,উমায়ের!”
আরহামের রসিকতায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো হাফসা!
আরহাম বিড়বিড় করে বলেই চললেন, “শ্বশুর বাড়ি, রসের হাড়ি!”

সন্ধ্যার নামাজের পর হাফসা, আর মাইমুনা একসাথে বসেছিল।হাফসা সারাদিনই পরিশ্রম করেছে,তাই মাইমুনা পাশে বসে তাকে পাহারা দিচ্ছেন এখন, আবার কোন ফাঁকে না সে রান্নাঘরে চলে যায়।
এরইমধ্যে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে আইরা আসলো।দেখলো ভারী’রা ঝাল ঝাল চাটনী খাচ্ছেন।সেও মুখে তুলতেই ঝালে চোখ চিকচিক করতে থাকলো।ঘুম উবে গেলো তৎক্ষনাৎ।একসময় স্থির হয়ে হাফসার উদ্দেশ্যে খুব সিরিয়াস হয়ে বলল,
“ভাবি’পু, আপনার ভাবী কিন্তু এই প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি আসলেন।তাই তার আদর-যত্নে যেন কোনও কমতি না হয়, বুঝলেন?”
এই কথা বলার সাথে সাথে হাফসা আর মাইমুনা দু’জনেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে দম ফাটিয়ে হেসে ওঠে।হাসির মাঝে এক মায়া, এক মজার সুর।
মাইমুনা চোখ কুঁচকে, একটু খোঁচা দিয়ে বললেন ,

“আরে, আমরা তো ভেবেছিলাম—তোমাকে নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করব। খাবার-দাবার, আপ্যায়ন সব যেন ঠিকঠাক হয়, সেটাই ভাবছিলাম। কিন্তু পরে দেখি… এই যাহ… তোমার তো এমনিই কিছুতেই অসুবিধা হচ্ছে না!
অতপর হাসি চেপে নিচুস্বরে বললেন, আদর-যত্ন তো এমনিতেই বেশ পাচ্ছো, আর কী করবো বলো?”
এই কথা শুনেই আইরার গাল লাল হয়ে যায়। সে কিছুটা বিব্রত হয়ে চোখ নামিয়ে বলে—
“সেটা তো একটা এক্সিডেন্ট, ভাবি! ওই… উঠোনে কাঁদার মধ্যে হঠাৎ পিছলে পড়েছিলাম। উনি তো কেবল… সামলে দিয়েছিলেন।তারপর কিন্তু… আমার মুখোমুখিও হননি! আপনার চোখেও এটা পড়ে গেলো!”
এই কথার পর সবাই একসাথে হাসতে শুরু করলো হাফসা, মাইমুনা, এমনকি রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিলেন আম্মু, তিনিও মিটিমিটি হাসলেন।
আইরার মুখে তখন এমন এক অনাবিল লজ্জা, যেনো এক গরম ফুটন্ত রক্তজবা।শ্বাশুড়িমাকে সাহায্য করতে গিয়ে মাহের কিচেন থেকে আইরার কথাগুলো শুনছিলেন, তবে উনার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই,কেবল চোখে হালকা এক কৌতূহল।
বারান্দায় তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক—হাসি আর রান্নার গন্ধ মিশে এক গভীর গ্রামীণ আবেগ ছড়িয়ে দিয়েছে যেন!
পরের দিন~

বাহিরে তখন ঝোড়ো হাওয়া। কালো মেঘে ঢাকা আকাশে হালকা বজ্রের গর্জন, যেন কালবৈশাখীর আগমনী বার্তা। বাজার থেকে ফিরলেন মাহের, আরহাম ও কাকামণি। ক্লান্ত চেহারায়, ধুলোবালি ঝাড়তে ঝাড়তে মাহের সোজা ঘরে ঢুকলেন।ঘরে ঢুকেই আইরাকে ডাকলেন তিনি।
আইরা ছুটে এসে দেখলো ওয়াশরুম থেকে বেরোচ্ছেন মাহের।ভেজা মুখে, চোখ আধখোলা করে হন্তদন্ত হয়ে বললেন,
“দেখো তো চোখে কি পড়েছে?জ্বলছে খুব!”
মাহের একটু ঝুঁকে চোখটা এগিয়ে আনলেন।আইরা পা উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললো।ভালো মতোন দেখার চেষ্টা করছে সে। মাহেরের চোখে কষ্ট স্পষ্ট—নীরব ছটফটানি টের পাওয়া যাচ্ছিল।ঝড়ো বাতাসের উগ্রতায় কোনো ক্ষুদে পোকা এসে পড়েছে।আইরা আলগোছে ওরনার নরম কোণ দিয়ে সেটা বের করে আনতেই হঠাৎ ঘরের দরজার দিক থেকে একটি কাশির শব্দ।খুকখুক করে কারো গলার আওয়াজ যেন ঠাণ্ডা বাতাসের চেয়েও বেশি শীতল হয়ে ভেতরে ঢুকে এলো। দুজনই তৎক্ষণাৎ দূরে সরে গেলেন। বাহ্যিকভাবে কিছু না হলেও, দূর থেকে দৃশ্যটা হয়তো অনেক কিছু বোঝাতে পারতো—ভুল ইঙ্গিতে।
আইরা খেয়াল করলো,আইরার দিকে কেমন অসন্তোষ ও হিংস্র চোখ নিয়ে তাকালেন আয়না শেখ।উনার চোখে তখন একধরনের ঘৃণা আর বিদ্বেষ। তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন , “দিনে দূপুরে দরজা খোলা রাকছো ক্যান!কতজনই যায় আসে!”
আলোকচিত্রের মতো সেই দৃষ্টির আঘাতে স্থির হয়ে গেল মুহূর্তটা।উনার কণ্ঠের ভেতরে স্নেহ নয়, বরং ছিল ইঙ্গিতপূর্ণ তিরস্কার।
আয়না শেখের নেগেটিভ ইঙ্গিত বুঝতেই মাহের যেনো ফুঁসে উঠলেন।শান্ত অথচ বজ্রকন্ঠে জবাব দিলেন, “যায় আসে কিন্তু চোখ রাখে না নিশ্চিয়ই।কারন এটা আমাদের পার্সোনাল রুম।”
দাদী কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন,

“চেতছো ক্যান? আমি তো শুধু সাবধান করলাম!”
“এমন কিছু হয়নি যার জন্য আপনার সাবধানতা প্রয়োজন।”
বলেই দ্রুতপায়ে মাহের প্রস্থান করলেন।আইরার মন খারাপ হলো লোকটার মেজাজ খারাপ হওয়ায়।সারাদিনভর বাইরেই ছিলেন আজ।মাত্র বাসায় এসে খিদে পেটেই এমন একটা বিঘ্ন পরিস্থিতি!
আইরা ঘটনার শুদ্ধ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এগিয়ে এসে বলল, “দাদু আসলে ব্যাপারটা তেমন না যেমন আপনি ভাবছেন।উনি বাইরে থেকে আসছেন মাত্র।চোখে পোকা পড়েছে তাই…
হাত তুলে বিনা বাক্যব্যয়ে আইরাকে থামিয়ে দিলেন তিনি।অতপর হুইল চেয়ারের চাকা টানতে টানতে প্রস্থান করলেন।আইরার চোখে চিকচিক জল জমে এলো।তাকে এতো অপছন্দ করেন কেন তিনি।সে তো কখনোই কোনো খারাপ আচরণ করেনি!

সারা বিকাল আইরা তুহফাকে নিয়ে একা একা ঘুরলো।সাথে উমাইজাও।উমারকে অবশ্যি খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।বড্ড মামা পাগল ছেলেটা।মাহের একটু ওয়াশরুমে গেলেই সে পেছন পেছন ঢুকতে চায়। বাজারে যাওয়ার সময় আড়াল করে রাখা হয়েছিল তাকে, কিন্তু ফিরতেই মাহেরের গলায় ঝুলে পড়েছে সে।মাহেরও ভাগ্নে ছাড়া কিছু বুঝছেন না।এমনকি বউ যে সারাদিন মন খারাপ নিয়ে ঘুরেছে,তাঁর ও কোনো খোঁজ নিলেন না।
গেটের ফাঁকে তাকালে দূরের সড়ক দেখা যায়।আইরা দূর থেকে দেখতে পেল, উমারকে কাঁধে চড়িয়ে আসছেন মাহের।উমারের হাতভর্তি রঙিন বেলুনের ঝাঁক। দৃশ্যটা দেখে অদ্ভুত শান্তি লাগল তার—একটা পরিপূর্ণতা, একটা স্বপ্নমাখা মুহূর্ত।ইসস কি হৃদয়জুড়ানো দৃশ্য!
কিন্তু আইরার মন খারাপের অবসান হয়নি।কোনো একটা বিষয় মনে গেঁথে গেলেই হলো।এর সমাধান না পাওয়া অব্দি মনটা ঘন্টা নাড়িয়ে বারবার স্মরন করিয়ে দেয়,এই যে,এ বিষয়ের সমাধান এখনো বাকি!
আইরা মনে মনে মাহেরকে একা খুঁজলো।পেয়েও গেলো।সোফায় বসে ফোন চাপছেন তিনি।উমার দাদার কাছে।এই সুযোগে সে মুখোমুখি এসে বসলো।মাহের স্বাভাবিকদৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন।
আইরা শান্ত কণ্ঠে বলল,

“দাদু মনে হয় আমাকে খুব অপছন্দ করেন।”
আইরার মুখাবয়ব স্বাভাবিক হলেও কোথাও যেনো বিষন্নতার ছায়া,মলিন সুর।কথাটার মধ্যে একধরনের গোপন ব্যথা লুকানো ছিল। মাহেরের আঙুল থেমে গেল স্ক্রিনে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর হালকা গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন,
“তুমি উনার চেয়েও বেশি সুন্দর। সম্ভবত সেই কারণেই…”
আইরার কণ্ঠে বিস্ময়,
“এখানে সৌন্দর্যের প্রসঙ্গ আসছে কেন?”
“জেলাস। ছোটবেলায় উনি বলতেন, আমি বড় হলে উনিই আমাকে বিয়ে করবেন। এখন আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। সো… জেলাসি!”
আইরার চোখে তখনও বিশ্বাসের অভাব।

“আমি এতো বোকা না যে এমন একটা দূর্বল যুক্তি মেনে নিব?কোনো কারণ তো অবশ্যই আছে।”
মাহের এবার গম্ভীর হয়ে গেলেন। গভীর শ্বাস ফেলে বললেন,
“ওকে লিসেন, বাট নেক্সটটাইম যেন এই বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন না করো।অতপর এক গভীরশ্বাস ফেলে বললেন , উনার ইচ্ছা ছিল রিযালের বোনকে আমি বিয়ে করি।তাই নাতবউ হিসেবে তোমাকে সহ্য করতে পারছেন না।”
“ওহ।”
আলতো একটা শব্দ, কিন্তু এর ভেতরে যেন শত শব্দের ভার।
আইরা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। চুপচাপ উঠে কিচেনের দিকে চলে গেল। মাহের জানেন, খুবই সামান্য হলেও, এমন কথা আইরার মনে গভীরভাবে গেঁথে যাবে। সে কাঁদবে না,
হয়তো কাউকে বলবেও না। কিন্তু মন খারাপ নিয়ে একা একা চুপ করে থাকবে।যেটা উনার ভালো লাগবে না!

আরহাম মাইমুনার কক্ষে ঢুকতেই দেখলেন, সে মনোযোগ দিয়ে উমাইজার ছোট চুল দু’ভাগ করে ঝুঁটি করে দিচ্ছে। তিনি নরম পায়ে এগিয়ে এসে হালকা নক করে জানালেন নিজের উপস্থিতি, তারপর মেয়ের কপালে আদরভরে একটি চুমু আঁকলেন মাইমুনার গালে হালকা স্পর্শ দিলেন ভালোবাসার পরশে।
উমাইজা থমকে গেল।বাবার মুখের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন কিছু ভাবছে। তারপর হঠাৎ কোমরে হাত রেখে নরম অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
— “আব্বু, আপনি আম্মুকে গালে তুমু দিনেন, আমাতে কেন দিনেন না?আমাতে কেন কপালে দিনেন?”
আরহামের মুখ যেন মুহূর্তেই থমকে গেল।মেয়ের সরল প্রশ্নেও যেন হাজার প্রশ্নের দায় উঠে এলো।বুঝতে পারলেন,এখন সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।যেখানে সেখানে যেকোনো সময় স্ত্রীকে চুমু খাওয়ার স্বাধীনতা হরন হয়ে গিয়েছে,এখন আর আগের মতো নির্বিঘ্নে স্ত্রীকে আদর করার স্বাধীনতা নেই।সন্তান আছে, জবাবদিহি আছে।
উমাইজা সেই ইনোসেন্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে—উত্তরের আশায়। আরহাম মাইমুনার দিকে অসহায়ভাবে তাকালেন সহায়তার খোঁজে, কিন্তু তিনি তো ঠোঁট চেপে হাসছেন, চোখে শ্লেষের ছায়া। কোনো সাহায্য নেই সেখানেও।
অগত্যা আরহাম নিজেই মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বললেন,

— “মামণি, ব্যাপারটা এমন না। আমি তো আসলে তোমার আম্মুকে কপালে দিতে চেয়েছিলাম… কিন্তু ভুল করে গালে দিয়ে ফেললাম।”
বলে মাইমুনার গালে আবার চুমু খেয়ে কৈফিয়তের ভঙ্গিতে বললেন , ‘এই তো, ওটা ফেরত নিয়ে এসেছি।বলে উমাইজার সারা মুখে ঠোঁট ছোঁয়ালেন আরহাম।এবার সে এয়ারব্যান্ড নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।হয়তো বাবার আলাভোলা যুক্তি সে মেনে নিয়েছে।
আরহাম আর মাইমুনার কাছাকাছিও আসলেন না।বেশ দূরত্ব রেখেই বসলেন।মাইমুনা উমাইজাকে কাছে টেনে নিয়ে হালকা হাসি দিয়ে ভ্রু নাঁচিয়ে বললেন, “মেয়েটা কিন্তু আমার।ছেলে না হয় আপনাদের।”
আরহাম মুচকি হাসলেন।
উমার ঘুমিয়ে পড়েছে।মিসেস আফসানা এসে উমাইজাকে নিয়ে যেতেই তখন যেন একটু নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ পেলেন আরহাম। মাইমুনার কোলে মাথা রাখলেন, অনেকটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে,গম্ভীর সুরে বললেন,

— “দিনকাল এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে… যেন চারপাশে সারাক্ষণ সিকিউরিটির পাহারা।নিজের স্ত্রীর সঙ্গে একটু আদর-ভালোবাসাও সাবধানে করতে হয় এখন।”
“আপনি তাদের সামনে এমন করলে তো হবেই।”
আরহাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“আপনার সঙ্গে কথা বলার সময়—কি বলা উচিত, কি নয়, তা মাথায় থাকে না।শুধু মন চায়, আপনি পাশে থাকুন।আর আমি… একটু নির্ভার হয়ে থাকি।”
মাইমুনা এবার উনার চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন।গলার স্বর একটু কোমল হয়ে এলো,
“আমি তো আছিই পাশে। কিন্তু… সেই ‘নির্ভার’ সময়ের জন্য আপনাকেও কিছু ছাড় দিতে হবে, বুঝলেন?”
আরহাম চোখ বন্ধ করে রইলেন, যেন এই কোমল মুহূর্তটুকু নিজের মধ্যে ধরে রাখতে চাইছেন।বাইরে ঝিরঝিরে বাতাস বইছে। ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন তাদের হৃদয়ের কথা শোনার উপযুক্ত সময় হয়ে উঠেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পেরোলো।আরহাম চোখ বুজে আছেন।মাইমুনা ভাবলেন তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন।বাহিরে দৃষ্টি ফেললেন তখন।গ্রামীণ পরিবেশ যে এতো প্রশান্তি ও মনোমুগ্ধকর হতে পারে,তা কল্পনাতীত ছিল মাইমুনার।উনার ইচ্ছে করছে,এখানেই থেকে যেতে।বেপরোয়া মনের ইচ্ছেয় লাগাম টানতে হলো আরহামের হঠাৎ প্রশ্নে,
“মাইমুনা… আপনি কি মনে করেন,আমি বদলে গেছি?”
মাইমুনা চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন,

— “না, বদলে যাননি। কিন্তু… আপনি নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছেন। আগে যেমন আপনাকে খোলা মনে পাওয়া যেত, এখন যেন একটা দেয়ালের আড়াল থেকে কথা বলেন।”
“সত্যিই?”
“হুমম।”
“আমি তো সবসময় চাই আমার দায়িত্ব , কর্তব্য, ভালোবাসায় কোনো এুটি না হোক,আল্লাহ যেনো সব সহজ করো দেন।”
“ইন শা আল্লাহ।”
আরহাম চোখবুঁজে শুয়ে রইলেন।একসময় লেগে এলো চক্ষুদ্বয়।আর মাইমুনা মুগ্ধ চোখে দেখতে থাকলেন, উনার প্রিয় পুরুষকে।তাদের প্রথম সাক্ষাতে আরহামকে দেখেই চোখ কপালে উঠার উপক্রম হয়েছিল মাইমুনার।কিছুক্ষণের জন্য যেনো ভাবতেই পারেননি, এই চমৎকার পুরুষ উনার প্রিয়তম হবেন।মাইমুনা মুচকি হাসলেন,আজও সেই দৃষ্টির ন্যায় শীতল চোখে তাকালেন, আর ফিসফাস সুরে দোয়া করে নিলেন, আরহামের এমন ভালোবাসা যেনো আমৃত্যু থাকে!

মাইমুনা ছিলেন নিঃসন্তান—এই শব্দটি শুনলেই যেন একটা নীরব ভার বুকের কোথাও গেঁথে বসে।তবু ভাগ্য যেন এক অন্যরকম প্রশ্রয় দিয়েছে উনাকে।উমাইজা যেন মাইমুনার হৃদয়েরই এক অংশ হয়ে গেছে।
উমাইজা যেমন চঞ্চল, তেমনি কোমল। সেই কোমলতাতেই মাইমুনার ভেতরটা গলে যায় প্রতিদিন। উমাইজা একটু আড়াল হলেই মাইমুনার অস্থিরতা চোখে পড়ে—চোখদুটো উদ্বিগ্ন হয়ে চারপাশে খোঁজে। যেন মনের ভেতর থেকেই ডাকে, “উমাইজা কোথায় গেল?” উমাইজা যখন ফিরে আসে, মাইমুনার মুখে যেন এক প্রশান্তির আভা ছড়িয়ে পড়ে। তারা দুজন মিলে গল্প করে, খেলনা সাজায়, একসাথে চুল বাঁধে, এমনকি নামাজের সময়ও তারা একসাথে আদায় করে,সে নিকাব নিয়ে ছুটে এসে বলব, “আম্মু পলিয়ে দাও।” মাইমুনা নিকাব পরিয়ে দেন—সব কিছুতেই এক গভীর মমতা।
মাইমুনা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন উমাইজাকে নিয়ে।কখনো তাকে গুছিয়ে দিচ্ছেন, খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন, কখনো জামাকাপড় ভাঁজ করে সযত্নে গুছিয়ে রাখছেন।যেন নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখছেন শিশুটিকে।

উমার যদিও সারাদিন দাদা, দাদী আর বাবার সঙ্গেই ছুটোছুটি করে, তবু দিনে একাধিকবার সে মাইমুনার কোলে ফিরে আসে—কখনো একটু আদর পাওয়ার বাহানায়,কখনো গল্প শোনার ছুতোয়।মাইমুনার কণ্ঠে যখন দোয়া শেখানো হয়, উমার বোঝে না সব কথা, কিন্তু তার চোখেমুখে ঝলমলে বিস্ময় খেলে যায়।
আরহাম এই দৃশ্য দেখেন, আর উনার ভেতরটা অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। কেমন যেন একটা শান্ত ভরসা বুকের গভীরে জমে ওঠে—এই ভালোবাসার বন্ধন অমূল্য। তিনি গভীর হৃদয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন এই সন্তানেরাই হয়ে উঠুক মাইমুনার জীবনের পূর্ণতা। যেন কখনোই মাইমুনা সন্তানের অভাবটুকু আর অনুভব না করেন। যেন তাদের মধ্যেই তিনি খুঁজে পান মাতৃত্বের পূর্ণতা, ভালোবাসার অবাধ ছায়া।
এই ত্রয়ীর সম্পর্কের গভীরতা কোনো সামাজিক সংজ্ঞায় বাঁধা পড়ে না—এ এক আত্মার টান, যেটি সময়ের আগেও জন্ম নেয়, সময়ের পরেও থেকে যায়। এ এক আজব গোলকধাঁধা!

মাহেরকে গেটের ভেতর ঢুকতে দেখেই আইরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো।পুরো একটা দিন উনার খোঁজ নেই,এমনকি একটা টেক্সট ও না।মাহের একটু বাইরে গিয়েছিলেন,গত কয়েকদিনের দকলে বেশ হাঁপিয়ে উঠছিলেন তাই হালকা বৃষ্টিতে হেঁটে আসলেন,খানিকটা ক্লান্তি কাটানোর প্রয়াসে।
“সারাদিন কোথায় ছিলেন আপনি?আমি সেই সকাল থেকে আপনাকে খুঁজছি!” -আইরার কন্ঠে তীব্র উৎকন্ঠা,শঙ্কা!
মাহের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “খুব ক্লান্ত লাগছিল তাই..
“ক্লান্ত লাগছিল আপনি আমার কাছে আসতেন?”
মাহের শান্ত দৃষ্টি ফেললেন।আইরাকে বোধহয় খুব করে অস্বস্তিতে ফেলতেই ঠান্ডা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন , “কি করতে?”
আইরা থতমত খেয়ে গেল।ইসস তাঁর কথাবার্তা গুলো কেমন হয়ে যাচ্ছে আজকাল।মাথা নিচু করে জবাব দিল, “স্ স্বান্তনা দিতাম,স্বান্তনা!”

মাহের তাকিয়েই থাকলেন কেবল।পরমুহূর্তেই খানিক ভাবুক হয়ে বললেন , “এই চিন্টু টা আসলে কে? আমার তো মনে হয় না বিড়াল।তোমার কোনো প্রাক্তন-টাক্তন আছে না কি?”
আইরাও একটু জেলাস করার উপায় খুঁজে পেয়ে গেল চট করেই।মুখ ভার করে বলল, “আসলে স্যার কেউ একজন ছিল।আজকাল খুব মনে পড়ে তোহ, তাই নিজের অজান্তেই তাকে স্মরণ করে বসি!”
আইরার চোখেমুখে বিষণ্ণতা! সে খুব করে চোখেমুখে আঁধার নামিয়ে আড়চোখে মাহেরকে দেখলো।দেখলো, উনি খুব স্বাভাবিকই আছেন,উনার চোখেমুখে কোনো জেলাসি টেলাসি নেই।”
আইরা চরম হতাশ! এবার এসব ছেড়ে সত্যটা বলতে উদ্যত হলেই উনার ভারী কন্ঠে আসে,
“আচ্ছা আচ্ছা।আমার সাথে যদি ভালো না লাগে , যাও।থাকো যার সাথে ইচ্ছে।আমি তো আটকাচ্ছি না তোমাকে।”
আইরা জিভে কামড় দিয়ে অবাক কন্ঠে বলেন, “কি যে বলেন স্যার, বিয়ে হয়ে গিয়েছে এখন কি করে যাই?মানুষ কি বলবে?”

“অনেককিছুই বলবে।বাট ইউ সুড গো হয়ার ইউ উইল ফাইন্ড পিস!”
কথাগুলো বলে মাহের খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেলেন।আইরা বিমর্ষমুখে তাকিয়ে রইলো।এই লোকটাকে কোনোদিনও কি একটু জেলাস করানো যাবে না?
সে স্থির করলো,সত্য টা বলে দিবে।সেই উদ্দেশ্য ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো।দরজায় দাঁড়িয়েই দেখতে পেলো ধোঁয়ার কুন্ডলী।আইরা চুপিচুপি হেঁটে এসে দেখতে পেলো, মাহের একহাতে ধুমাধুম সিগারেট টানছেন,অন্যহাতে মাথার চুলগুলো শক্ত হাতে চেপে আছেন।আইরার ভ্রু কুঁচকে এলো আপনাতেই।মনে প্রশ্ন জাগলো, উনার হুট করে এত রেগে যাওয়ার কারন কি! রেগে গেলেই তো লুকিয়ে সিগারেট টানতে দেখা যায় উনাকে!

“স্যার!”
মাহেরের কোনো ভাবাবেগ নেই।আইরা বেশ কড়াসুরে বলল,
“আপনি আবারও সিগারেট খাচ্ছেন?”
মাহের ওর দিকে না ফিরেই বললেন , “তোহ?”
“আমার কথা রাখলেন না?”
“না রাখলাম না।”
“আমি যাচ্ছি এবার,সত্যি সত্যিই।”
“যাও তোমার তো জায়গা আছে।”
“মানে?”
“প্রাক্তনের কাছে!”
আইরা মুখটিপে হাসি আটকে চুপচাপ বেরিয়ে এলো।কলিজায় আগুন জ্বালাতে সক্ষম হয়েছে ভেবেই খুশিতে লাফাচ্ছে সে! উনি তাহলে এজন্যই পুড়ছেন! সে কি আবার যাবে আগুনে একটু ঘি ঢেলে আসতে! না থাক,বেচারাকে স্বান্তনা দেওয়ার কেউ নেই।তবুও তাঁর মন মানছে না।একটু গেল।
আক্ষেপের সুরে বলল, “উনি তো বিশাল বড়লোক,নাম যশ খ্যাতি সবই আছে,কিন্তু আব্বু আম্মুকে কি বলবো? ভাইয়া তো আমাকে মেরেই ফেলবে তাঁর সাথে পালালে?”
মাহেরের কোনো জবাব নেই।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮০

“স্যার একটু আইডিয়া দিন!”
এবারও মাহের নিশ্চুপ।
“ও স্যার!”
….
“স্যার কিছু বলুন না!”
“এখান থেকে যাও।”- মাহেরের ভরাট কন্ঠস্বরে আইরা কেঁপে কেঁপে উঠলো।ফিরে আসার আগে আরেকবার আড়চোখে তাকালো।উনাকে এর আগে তো এত এলোমেলো লাগেনি কখনো!

অপেক্ষা সিজন ২ শেষ পর্ব 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here