Home অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১২

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১২

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১২
Sathi

” জেহেফিল সেই যে রেগে বের হয়েছে, একেবারে কলেজের সামনে। তার চোখ-মুখে তীব্র রাগ, বু*কের ভেতর যেন আ*গুন জ্বলছে। কিন্তু কলেজের গেট বন্ধ। চারপাশ নিস্তব্ধ, দিনের কোলাহল যেন অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৫টা ৫৬ মানে কলেজ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
” আশেপাশ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ানের কাছে যায়। মোবাইল থেকে সেতুর ছবি বের করে উনার মুখের সামনে ধরে বলে।
__ ওকে দেখেছেন? আজকে কয়টা বাজে বেরিয়েছে কলেজ থেকে?
” দারোয়ান জেহেফিলকে দেখে একটু ভয় পেয়ে যায়। কম-বেশি সে জেহেফিলকে চেনে,টিভিতে দেখেছে। তাই ভয়ে ভয়ে জবাব দেয়।

__ আসসালামু আলাইকুম। হ্যাঁ, দেখেছি। এই তো সেতু মামনি, কলেজ ছুটি হওয়ার পর বন্ধুদের সাথে চলে গেছে।
” জেহেফিল বুঝতে পারে লোকটা সেতুকে চেনে, তাই তো নাম জানে। ভাবে হয়তো বন্ধুদেরও চেনে। তাই আবারও জিজ্ঞেস করে।
__ ওর কোন বন্ধুর সাথে বেরিয়েছে?
__ এই তো শিফা মামনির সাথে।
” জেহেফিল আর কিছু জিজ্ঞেস না করে সোজা শিফাকে কল দেয়। সে আগে থেকেই সেতুর কাছের সব মানুষের খোঁজখবর নিয়ে রেখেছে। কারণ বর্তমানের কাছের মানুষগুলোই সবচেয়ে ক্ষতিকর, এই ধারণা তার মনে গেঁথে আছে। তাই আজ সেটাই কাজে লেগে গেল।
” ভাবতে ভাবতে দেখে কল যাচ্ছে, কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না। রাগে জেহেফিলের মুখ শক্ত হয়ে যায়, চোয়াল শক্ত করে, আবার কল দেয়।
” এইবার কল দেওয়ার সাথে সাথে রিসিভ করে। জেহেফিল নিজেকে শান্ত করে স্বাভাবিক গলায় বলে।

__ সেতু কোথায়? তোমার সাথে আছে?
__ কে আপনি? সেতুকে দিয়ে আপনার কাজ কী?
__ যেটা জিজ্ঞেস করছি, সেটার উত্তর দাও, বেশি কথা না বলে।
” ধমক শুনে সিফা বুঝতে পারে, এটা জেহেফিল। ভয় পেয়ে যায়, নরম কন্ঠে বলে।
__ আসলে ভাইয়া, আমি বুঝতে পারিনি, সরি। সেতু তো কলেজ ছুটির পর বাড়ি চলে গেছে।
__ ও বাড়ি আসেনি। তোমার সাথে লাস্ট দেখা কোথায় হয়েছে?
__ কলেজ থেকে একসাথে বের হয়েছি, কিন্তু আমাদের গলিগুলো আলাদা। সেতু ওদের বাসার গলিতে নেমে যায়, আমি আমার গলি দিয়ে চলে আসি। বাসায় ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখুন।
” জেহেফিল মিতুর কথায় বুঝতে পারে,সে কিছু জানে না। তবে মিতুর কথায় মাথায় আসতেই আবার প্রশ্ন করে।
__ ও আবার মিতুর সাথে যায়নি তো? লাস্টবার গলিতে কি ওর সাথে মিতু ছিল?
__ না কারণ মিতু ১২ টা বাজে ২ টা ক্লাস করে চলে গেছে খারাপ লাগছিল তাই।
” জাহেফিল বুঝতে পারে, দুইজনের একজনও জানেনা। আর সময় নষ্ট না করে শিফাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কল কেটে দেয়।
” কী করবে, জেহেফিলের মাথায় কিছুই আসছে না। ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। দ্রুত গাড়ি নিয়ে রওনা দেয়, এদিক-ওদিক খোঁজার জন্য।

” সেতু ফিটফিট করে চোখ খুলতেই দেখে,সব কিছু অন্ধকার। চারপাশে এক ধরনের ভয়ার্ত নীরবতা। কোথায় আছে বুঝতে পারে না।হাত-পা নাড়াতে গিয়ে বুঝতে পারে, কিছু জিনিস দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। বু*কের ভেতর ধকধক শুরু হয়, এটা অনুভব করে। চোখের পলক কয়েকবার ফেলতেই একটু স্পষ্ট হয়। সবকিছু ঝাপসা লাগছে। একটু দূরে একটা জানালা, সেখান দিয়ে খুব কম আলো ঢুকছে। আলোটা এতই ক্ষীণ যে চারপাশ আবার অন্ধকারেই ঢেকে যাচ্ছে।
” সেতু মাথায় চাপ দেয়, কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই মনে পড়ে না। সেই যে গলিতে হাঁটছিল, তারপর হঠাৎ কী হলো?ভাবনার মাঝেই কেউ শব্দ করে দরজা খুলে।সামনে তাকিয়ে সেতু অবাক হয়ে যায়।
” মেঘ।
” মেঘ ধীরে ধীরে সেতুর কাছে আসে। এসে সেতুর এমন অবস্থা দেখে একটু থমকে যায়। মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে দৌড়ে সেতুর কাছে আসে।
__ উফফ, ভুল হয়ে গেছে। আমার এদের সাবধান করা উচিত ছিল। কোথাও ব্য*থা লেগেছে?
” দ্রুত হাতে দড়িগুলো খুলতে খুলতে একটানা বলে যায় মেঘ।সেতু বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। মেঘের কথায় স্পষ্ট, সে তাকে কিডন্যাপ করেছে। কিন্তু কেন? আর না থাকতে পেরে প্রশ্ন করে বসে।

__ আমাকে তুমি কিডন্যাপ করেছ?
__ হ্যাঁ।
__ কিন্তু কেন?
__ তোর ভালোর জন্য।
” বলতে বলতে সব দড়ি খুলে দেয় মেঘ। তারপর আলতো হাতে দেখতে থাকে,কোথাও ব্য*থা পেয়েছে কিনা। তার এই আচরণে সেতু অবাক হয় না। তারা ছোট থেকে এমনই,একজন একটু আ*ঘা*ত পেলেই অন্যজন অস্থির হয়ে যায়। সে তো অবাক হচ্ছে মেঘের কথায় ।না-বোঝার মতো করে বলে।
__ আমার কিসের ভালো? আম্মু-আব্বু টেনশন করছে, আমাকে যেতে দাও।
__ টেনশন করছে না। তারা জানে,বরং তারাই আমাকে এইসব করতে বলেছে।
__ কী?

” সেতু চোখ বড় বড় করে তাকায়। অবিশ্বাসে চোখে তাকাই। মেঘ তাকে ধরে উঠাতে উঠাতে বলে।
__ আমি যদি তোকে ধরে না আনতাম, তাহলে আজকে জেহেফিলের সাথে তোর বিয়ে কনফার্ম হয়ে যেত। যা আমি কখনোই হতে দিবো না।, এমনকি তোর বাসার কেউও না।
__ এই জন্য নিয়ে এসেছ?
__ হ্যাঁ। চিন্তার কিছু নেই। কয়েকদিন যাক, সব স্বাভাবিক হোক। টেনশন নিস না,রাতে মিতু আসবে।
” মিতু আসবে শুনে সেতু একটু স্বস্তি পায়। বু*কের ভেতরের চাপ কিছুটা কমে। সাথে একটু খুশিও হয়,জেহেফিল থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু সেই খুশির মাঝেও এক অজানা ভয় থেকে যায়।কারণ জেহেফিল মোটেও সুবিধার মানুষ না।
“রাত ১১ টা”
“” এলোমেলো পায়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকছে জেহেফিল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তি স্পষ্ট,মনে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
” ড্রয়িং রুমে সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছিল। তাকে আসতে দেখে আদনান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরে।
__ লাগবে না, আমি ঠিক আছি।
” বিরক্তি নিয়ে কথাটা বলেই কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সোজা উপরে চলে যায়। সেদিকে তাকিয়ে আদনান একটু দম নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে।

__ কিছু হবে না, আমি দেখছি।
” দৃঢ়তার সাথে বলেই জেহেফিলের পেছন পেছন হাঁটা দেয়।
” আদনান রুমে এসে দেখে কেউ নেই। হালকা সিগারেটের গন্ধ ভেসে আসছে।বুঝতে পারে জেহেফিল এখানে আছে। দ্রুত পায়ে বেলকনিতে যায়।
” গিয়ে দেখে, আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে সিগারেট ফুঁকছে জেহেফিল। তার চোখে অদ্ভুত শূন্যতা, যেন মূল্যবান কোনো সম্পদ হারিয়ে গেছে। আদনান পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।
__ কোনো খোঁজখবর পেলি না?
__ না, এতো তাড়াতাড়ি পাবো বলে মনে হয়না।এসব তৃতীয় কেউ করছে। সেতুর বাপ-ভাইয়ের সাহস হবে না, কারণ তাদের দুর্বলতা আমার হাতে।
__ হতে পারে। তারা পারছেনা বলে অন্য কাউকে দিয়ে করাচ্ছে?
” আদনানের কথায় জেহেফিল সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে ফ্লোরে পিষে দেয়। মুখটা মুহূর্তে শক্ত হয়ে যায়। ঠোঁ*ট শক্ত করে বলে।

__ এটাই হয়েছে। তবে যেই হোক, তাদের খুব কাছের মানুষ। নয়তো নিজের আদরের মেয়েকে অপরিচিত কারো হাতে তুলে দেবে না।
” জেহেফিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কথাটা বলে। তার কথায় আদনান সায় জানায়। কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারছে না, লোকটা কে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তার উদ্দেশ্য কী?
__ আদনান, খোঁজ নে, মারুফ চৌধুরীর এমন কোন আপন মানুষ আছে, যাকে সে বিশ্বাস করে নিজের আদরের মেয়েকে তুলে দেবে।
__ ঠিক আছে, আমি খবর নিচ্ছি। তুই টেনশন নিস না।
__ আমি কেন টেনশন নিব?
” আদনানের কথার সাথে সাথে উল্টো জবাব দিয়ে দেয় জেহেফিল। কণ্ঠে বিরক্তি থাকলেও,চোখে অন্য কিছু, অস্বীকার করা অনুভূতি।আদনান গভীরভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করে। ঠোঁ*টে হালকা হাসি ফুটেয়ে শান্ত গলায় বলে।
__ যতই বল ঘৃ’ণা করিস, ঘৃ”ণা করিস,কিন্তু ঠিকই ভালোবাসিস তুই ওকে। এই যে ওর জন্য এত চিন্তা, অস্থিরতা, এসব কি বলে জানিস? তুই তাকে ভালোবাসিস, হারানোর ভয় পা
__ একদম বাজে কথা বলবি না। ওকে নিয়ে আমার কোনো চিন্তা, অস্থিরতা নেই। কিন্তু ওকে আমার লাগবে,তাই এত কিছু।

” আদনানকে অর্ধেক কথায় থামিয়ে ধমক দিয়ে জেহেফিল রুমে এসে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা কানে যেতেই।সেদিকে তাকিয়ে আদনান হালকা হেসে ফেলে, সব বুঝেও না বুঝার ভান ধরছে জেহেফিল।
” অন্যদিকে”
” মিতু বেডে শুয়ে আছে। মুখে ক্লা”ন্তির ছাপ, চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম নেই। পাশে অস্থির হয়ে বসে আছে সেতু। তার চোখে মুখে চিন্তার ছায়া, হাত দুটো বারবার মুঠো করে আবার ছেড়ে দিচ্ছে। আব্বুর সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছে এইসব করতে। তবে একটা কথা ভীষণ রকম টেনশন দিচ্ছে তাকে।……. তা হচ্ছে, ৩ দিন পর মেঘের সাথে তার বিয়ে, তাও এখানে। এই চিন্তায় তার বু*ক কাপছে।।
” সে জানে, মেঘের সাথে তার বিয়ে ছোট থেকেই ঠিক হয়ে আছে। এবং সে নিজেও রাজি ছিল। কিন্তু এখন, এখন সে বিয়ে করতে চায় না। আরো দুই বছর পর, সে আগে কলেজ লাইফটা শেষ করতে চাই। তারপর বিয়ে।কিন্তু যেকোনোভাবে আব্বুকে বোঝানো, এ যেন অসম্ভব।

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১১

” হঠাৎ করে অদ্ভুতভাবে জেহেফিলের কথাও তার মনে পড়ছে। জেহেফিল বিরক্ত করবে না ভেবে যেমন খুশি লাগছে,তেমনি ভয়ও করছে। এতদিনে যা চিনেছে, জেহেফিল এত বেশি ভদ্র নয়। সে যা চায়, তা নিজের করে নেয়।সেদিনও জেহেফিল তাই বলেছে গাড়িতে।
” এই কথাটাই বারবার মনে পড়ছে, আর ভয়টা আরও গভীর হচ্ছে। সেতু জানে, এই কারণেই সবাই এত তাড়াতাড়ি মেঘের সাথে তার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১৩