অবরুদ্ধ নিশীথ পর্ব ৭৯
তেজস্মিতা মুর্তজা
আব্দুল আহাদের দেহটাকে জয় ছেড়ে দেবার পরেও পড়ল কয়েক মুহূর্ত বাদে। কে জানে মৃত্যুর আগে কেন আব্দুল আহাদ আরমিণের ওড়নাখানা মুঠোয় চেপে ধরেছিল। হয়ত সব নারীতে মা লুকিয়ে থাকে তাই, আর তাদের আবরণের আঁচলে মমতার গন্ধ! এতিম আব্দুল আহাদ শেষবার সেই মমতাটুকুই অন্তূর ওড়নার প্রান্তে খুঁজেছিল, যে ওড়না জয় আমির বুক ছুঁয়ে ঝুলছিল তখন।
জয় মুরসালীনকে মারল না। মুরসালীনকে অতগুলো ছোট ছোট প্রাণহারা দেহের মাঝে নরকের মেঝেতে শুইয়ে রেখে লুঙ্গির নিচ পৃষ্ঠে হাতের রক্ত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো বড়ঘর ছেড়ে। আরমিণকে নিয়ে তাকে দেশ ছাড়তে হবে আজ রাতেই। তার কাছে এমপির কাজ ছিল বড়ঘরে লাশ বিছানো। তা সম্পন্ন হবার পর এমপি আর কেন ছাড় দেবে তাকে অথবা আরমিণকে?
হঠাৎ জয় ফিরে এলো। এক হাঁটু গেঁড়ে বসে দায়সারা হাতে মুরসালীনের মাথাখানা উরুতে ঠেকিয়ে ঠোঁটের কাছে পানির গ্লাস ধরে বলল, “হা কর।ʼʼ
তিনদিন পর সামান্য একটু পানি খাদ্যনালি পেরোতেই গলগল করে রক্তবমি উঠে এলো। জয়ের লুঙ্গিতেও লাগল। তাতে একটুও হেলদোল হলো না জয়ের। সে আরও খানিকটা পানি মুরসালীনকে পান করালো। উঠে যাবার সময় বিরবির করে বলল, “আত্মত্যাগের কুড়কুড়ানি যাদের থাকে, তাদের তোর মতো দড়ি ছিঁড়ে গোয়ামারা খাওয়া ছাড়া আর কী? কাল পালাসনি কেন? আমি কি মহান? এখন তোকে নিজ হাতে ছেড়ে দেব?ʼʼ
মুরসালীন বুঝল, সে খুব শীঘ্রই চেতনা হারাবে। তার মস্তিষ্কে অতিরিক্ত চাপ ও যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। দম আঁটকে আসছে। তবু সান্ত্বণা পায়–বাকি শিশুরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে মায়ের আঁচল ছুঁয়েছে! বন্দি মুরসালীনকে সত্যি জানাবে কে?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
গতরাতটা শেষ সুযোগ ছিল আনসারী সাহেবের জন্য। হামজা হাসপাতালে, জয়কে অ্যারেস্ট করবে রউফ কায়সার, সেই ফাঁকে কিছু না করতে পারলে জান যাবে সবার। বাড়ি পাহারায় তখনও বেশ কয়েকটা ছেলে থাকার পরেও এলেন তিনি। হাতাহাতি হলো, ধাতব-অস্ত্র চলল টুকটাক। বিশাল প্রাচীর ঘেরা হামজার নগরী ওটা। তার একপাশে সচ্ছ পুকুর, ওপরপাশে বাসভবন, সামনে ওয়ার্কশপ, পেছনে পঁচা পুকুর, যেখানে হামজার মেশিনের বর্জ্য পদার্থ যায়। আশপাশে কেউ নেই ভেতরের আওয়াজ শোনার। রাত দশটা বাজতেই হামজার বাড়ির কয়েক গজ দূরত্বে লোক চলাচল কমে আসে। এসব বাড়ির শব্দরাও জানের শিকারী। এসব বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটতে হয় বোবা ও কালাদের। যে লোক কানে শোনে ও কথা বলতে পারে তার উচিত না রাতে বাড়ির আশেপাশে ঘেষা। কতরকমের শব্দ হতে পারে, সেসব শুনে ফেলার পর আর কোনোদিন দুনিয়ার কোনো আওয়াজ না শুনতে পাবার সম্ভাবনা সিংহভাগ। কারণ প্রাণ না থাকলে কান আর জবান কাজ করে না।
ছেলেরা কয়েকজন ধরাশায়ী ও আহত হলো। কোনোরকমে বাচ্চাগুলোকে বের করে এনে ছোট্ট একখানা মালগাড়িতে তোলা হলো। তখন আনসারীর হৃদযন্ত্রে কেউ হাতুর ঠুকছে। আনসারী সাহেব অতি দুঃখে বোকা বনেছেন কিনা জানা নেই। কিন্তু তিনি ভাবলেন মালগাড়িতে যখন তোলা হয়ে গেছে, ওরা ওদের বাড়ি বোধহয় এবার পৌঁছাবে।
কিন্তু মুরসালীন যাবে না। তিনি কেঁদে ফেললেন। দাড়ি ভিজে উঠল। মুরসালীন উনার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে কপাল ঠেকায়, “চাচা, আজ আমি ওদের সাথে গেলে ওরা বাড়ি ফিরেও স্থায়ী হবে না। আমার খোঁজে খোঁজে ঠিক আবার ওদের জায়গা এরকম কোনো কালকুঠুরী হবে। হামজারা আমাকে বন্দি অথবা মৃত না দেখা অবধি সামান্য শান্তও হবে না। আপনি ওদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না আমায় বাঁচাতে চেয়ে। এই তো বেঁচে আছি আমি। এই চিঠিটা নিয়ে গিয়ে বড় হুজুরসাহেবের কাছে দেবেন, উনি যেন মাদ্রাসাসহ সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। আর একটা প্রাণের ভারও বইবার সাধ্যি আমার এই ভঙ্গুর কাধে নেই। আমি আমার রবের কাছে কী জবাব দেব? ওরা অনেক কোরআন শিখেছে। এবার বেঁচে থাকুক। নারায়ে তকবীর।ʼʼ
বাকিরা উচ্চস্বরে বলে উঠল, “আল্লাহু আকবর!ʼʼ
সবাই উঠল আনসারী সাহেবের সাথে। কেবল গেল না চার আধমরা যুবক ও তিন পাগল কিশোর। মুরসালীন ভাইয়ের সাথে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে তবু ভাইকে না নিয়ে ফিরে যাবে না।
আনসারী সাহেব চোখ মুছে বেরিয়ে গেলেন। তাঁর সেদিন রাতের সরলতার ওপর ধিক্কার দেয়াই যায়–তাঁর মালগাড়ি আটক হলো এমপির কাছে চারমাথার মোড়ের অদূরে। সকাল সকাল পুলিশ এসে তাঁকে এমপির ডেরা থেকে দেশোদ্রোহী হিসেবে ও তাঁর সাথে আসা জোয়ানদেরকে লাল-কমলা ইয়াবা বড়ি পাচারকারী হিসেবে ধরে নিয়ে গেল। মালগাড়ি থেকে বাচ্চাগুলোকে নামিয়ে নতুন নরক এমপির বাড়ির বেসমেন্টে জায়গা দেয়া হলো। মালগাড়িটা থানার হেফাজতে গেল স্মাগলিং-ভেহিকলস হিসেবে। সেদিন রাতের গল্প শেষ।
পরদিন রাতে এমপির সাহেবের মনমতো ঘটনা ঘটতে গিয়েও ঘটেনি। রোজ পরিকল্পনা একমতো কাজ দেয় না, এ এক সমস্যা বটে। আগের রাতে যেভাবে চমৎকারভাবে কতকগুলো জঙ্গি উনি শিকার করেছেন, পরদিন রাতে সেরকম নিখুঁতাভাবে তার লোক জয় আমিরকে আজরাইলের হাতে তুলে দিতে পারেনি। জারজটা এখনও হাসপাতালে পড়ে আছে। সমস্যা হলো, ছোকরারা ঘিরে আছে কেবিন। নয়ত ওখানে গিয়েই শেষ আশাটুকু রদ করে আসলে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন তিনি। এখন জয়ের মরা-বাঁচা গলার কাঁটার মতোন বিঁধে আছে গলায়। এমপি সাহেব তাই খুবই খুশি হতে চেয়েও পারছেন না।
সমস্যাটা হলো–কবীর যখন কলে রিমিকে বলছে, “বড়ভাবী সর্বনাশ হয়ে গেছে, ভাবী। জয় ভাইয়ের গুলি লাগছে।ʼʼ
কবীরের ভেজা কণ্ঠ ও খবরখানা রিমির তরল মনকে ছলকে দিলো। সে ভুলে গেল সে বসে আছে হামজার চোখের সামনে। তার ওপর তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, “জয়ের…ʼʼ
ব্যাস! ছোঁ মেরে ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে হাতের সেন্সর ক্লিপ খুলে উঠে বসে পড়ল হামজা, “কী হইছে রে, কবীর? জয় কই? কই ও? কী বলছিলি তুই? বল বল!ʼʼ
ওপাশে কবীরের দম আঁটকে গেল। হামজা গর্জে উঠল, “বল হারামজাদা! নয়ত একদম সামনে পেলে জিহ্বাটা একটান মেরে ছিঁড়ে আনব।ʼʼ
কথাটা সত্য। হামজা সত্যিই তা-ই করবে। থরথর করে কাঁপা গলায়, “জয় ভাইরে কারা জানি গুলি করছে ভাই। কিছু হয় নাই তেমন…ʼʼ
-“চুপ, খানকির বাচ্চা।ʼʼ
কবীর থরথরিয়ে উঠল।
-“একদম সত্যিটা বল। যেন ধর আমি এখানে বসে লাইভ দেখতেছি। তোর কি মনেহয় হামজা পুঁটিমাছের জান নিয়ে দুনিয়ায় এসেছিল? একটু হাওয়া দিলেই মরমর কোরে ওঠা ছনের ঘরের মতো ভিতরে আমার কইলজার?ʼʼ
কবীরের কিন্তু এবার একটুও ভয় লাগল না। হামজার এই কথা শুনে যে কেউ ভাববে এ তো বড় শক্ত কথা, কবীর জানে হামজার কলিজা এখন ইতোমধ্যে গুড়িয়ে পড়া ছনের ঘরের মতো অবস্থা। জয় যে খুঁটি সেই ঘরের।
কবীর কেঁদে ফেলল, “ভাই, জয় ভাইয়ের রক্ত লাগবে। রক্ত নাই কুত্থাও। কোনোহানে পাই নাই। আর্জেন্ট রক্ত দরকার।ʼʼ
হামজা কল কাটার আগে শুধু বলল, “যদি আমাকে দেরিতে জানানোর কারণে জয়ের অসুস্থতার এক ফোঁটাও বাড়ে রে কবীর, তোর বংশ আমি দুনিয়া থেকে মুছে তুলব– বলে দিলাম। আর কেউ জন্মাবে না সেইখানে, যারা জন্মেছিল থাকবে না। বাস্টার্ড!ʼʼ
ততক্ষণে সে ক্যানোলা টান মেরে খুলে ফেলায় হাতের পিঠে এক পাঁজা রক্ত, হাতের শিরা ফুলে টসটসে হয়ে উঠেছে। রিমি জাপটে ধরল, “শুনুন আমার কথা, এই!ʼʼ
-“জীবনে আমার হাতে মার খাওনি, রিমি,না? আজ প্রথমদিন হতে পারে। আমার ফতোয়া-পাঞ্জাবী অর এনি আউটফিট কিছু এনেছ?ʼʼ
রিমি ছলছল চোখে হামজার বুকের সামনে পথ আগলে কাছে এসে দাঁড়ায়, “মারুন। তাই মারুন। তবু এই শরীরে ছুটতে ছুটতে যেতে পারবেন না। আমরাও যাব। কাল সকালে রওনা দেব। আপনার ইঞ্জেকশন চলছে। আমি থেরাপির এপয়েনমেন্ট নিয়েছি। অন্তত আর একটা সপ্তাহ থাকতেই হবে এখানে। আপনি বুঝতে পারছেন না।
-“এক সপ্তায় ওদিকে আমার দাফন হয়ে যাবে। তুমি কি মনে করো আমি আমার এই এক দেহের মধ্যে বেঁচে আছি? আমার কর্ষিকাগুলো দিনাজপুর পড়ে আছে, রিমি।ʼʼ
হামজার ইশারায় এগিয়ে এসে দুটো ছেলে হামজাকে শার্ট পরিয়ে দিলো। হামজা রিমিকে থুতনি ধরে চুষে একখানা শক্ত চুমু খেলো ঠোঁটে। এরপর আচমকা তার মনে হলো সে যেন হাজার বছর দাঁড়িয়ে। মেরুদণ্ড অবশ তার, ধুপ করে কোমড় ভেঙে বসে পড়ল বেডের ওপর। নিচু হয়ে হেসে মাথা তুলে বলল, “আমার কী হয়েছে, রিমি? ডাক্তার কিছু বলেছে তোমায়? আমায় তো বলবে না শালারা। কী হয়ে গেছে আমার?ʼʼ
রিমির সবচেয়ে প্রচলিত ভাষা কান্না। বিশেষ কোরে এই পুরুষটির সম্মুখে। কয়েকটা টিস্যু ছিঁড়ে হাতে চেপে ধরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে যায় হামজা। পিছু নেয় রিমি। তুলি গিয়ে হামজার আরেক বাহু চেপে ধরল। কোয়েল সবার আগে হাঁটছে। হামজা বোন ও স্ত্রীর কাঁধের ওপর বিশাল শরীরের প্রায় সম্পূর্ণটুকু ভর ছেড়ে দিলো। উপায় নেই। তার শরীরে স্নায়ু অকার্যকর লাগছে। পেছনে হামজার ছেলেরা, দুজন ওয়ার্ডবয়। তারা হুইল চেয়াল এনেছিল। হামজা বসল না। ওটা অসম্মানজনক, তার আগে হামজা মরে যাবে তবু পঙ্গুত্ব বরণ তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে মেরুদণ্ড ভেঙে বসে থাকবে পঙ্গুর মতো আর আরেকজন মেরুদণ্ড সোজা কোরে তাকে নিজ শক্তিতে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাবে, এর আগে হামজা মরে যাবে। তবু এই ধরণের সেবা গ্রহণ করা সম্ভব নয় তার দ্বারা। একজন প্রাইভেট ডাক্তার সাথে চলল ভ্রাম্যমান অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য।
নিজস্ব গাড়ির অবস্থা বেহাল। ভাড়া গাড়িতে রিমির কাধ ও বুকের মাঝ বরাবর মাথা রেখে চোখ বুজে পড়ে রইল হামজা। রিমি কিন্তু টের পাচ্ছে হামজার বুকের ধুকপুকানি। সে অবাক হয় সাথে ঈর্ষান্বিত–জয়ের জন্য এই লোকের বুকে এত তোলপাড় চলবে কেন? বাইরে থেকে মুখটা দেখলে মনে হবে দুনিয়ার সকল নিষ্ঠুরতা ওখানে আশ্রয় পেয়ে খুব আরামে আছে। কিন্তু অসুস্থ হামজার বুকের কাঁপুনি রিমিকে অবধি কাঁপিয়ে তুলল।
এখন কি রিমির বলা উচিত লোকটার নিজের শরীরের অবস্থা কী? যে অবস্থা রিমির ঘেন্নায় ভাঙন ধরিয়ে দেবার জোগাড় কোরেছে!
আজ দুপুরের পর ডাক্তার আলাদাভাবে রিমিকে ডেকে নিয়ে বললেন, হামজা মেরুদন্ডে ভয়ানক আঘাত পেয়েছে সেদিন। অর্থাৎ স্পায়নাল কর্ড, যা সরাসরি প্রধান স্নায়ুর সাথে যুক্ত। এবং আঘাতের ফলে মেরুদন্ডে ব্লাড-সার্কুলেশন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে মেরুদন্ডের কোষগুলো মরে যাবে। ইমফ্লেমেশন তৈরি হবে। ইমফ্লেমেশনের ভয়াবহতাই হলো–প্রথমদিকে সাধারণ মনে হয়, ধীরে ধীরে…. অনলি অ্যা হিউম্যান হ্যাজ টু বিকাম সেন্সরিয়ালি-ডেড!
প্রথমবার চেতনা ফিরে পাবার পর থেকেই হামজা পিঠে অনুভূতি টের পাচ্ছিল না ও মেরুদন্ডের আশেপাশের দৈহিক অংশ অবশ অনুভূত হচ্ছিল। এটা কয়েক সপ্তাহ বা কয়েকদিনের ব্যবধানে পারমানেন্ট-প্যারালাইজেশনে রূপ নিতে পারে। হামজার কন্ডিশন সেদিকেই এগোচ্ছে। তারওপর সে সবসময় ভীষণ মানসিক চাপে থাকে, চিকিৎসা নিতেও খুব অনাগ্রহী। এই অসময়ে চিকিৎসা ছেড়ে যাওয়াটা তার জন্য অপূরণীয় ক্ষতিকর হতে পারে।
শেষে ডাক্তার সাহেব ব্যক্তিগতভাবে বড় আফসোসের সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন, মেরুদণ্ড (স্পায়নাল কর্ড) মানুষের দ্বিতীয় প্রধান স্নায়ুতন্ত্র। যেকোনো ধরণের নিউরোলজিক্যাল, সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম অর প্যারালাইজেশনে স্থায়ীভাবে ভুগতে হতে পারে। খুব তাড়াতাড়ি বড় একটা সার্জারি অথবা থেরাপির ডোজ শুরু না করলে পরে চেয়েও আর কিছু করার থাকবে না।
কিন্তু হামজা যেন পারলে যখন-তখন পালাবে হাসপাতাল ছেড়ে। সে জানে তার অনুপস্থিতিতে সব ভেসে যাচ্ছে ওদিকে। অথচ সে বুঝল না–ধ্বংস ও মৃত্যু অনিবার্য সত্য। এ দুটো থেকে পালিয়ে উল্টোপথে ভাগার পথেই এ দুটোর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে যায়। এটা প্রকৃতি।
জয় নিঃশ্বাসের গতি স্বাভাবিক হলো সন্ধ্যার দিকে। চোখ খুলল না। তবে ডাক্তার বললেন, সে ঘুমন্ত, চেতনা আসছে। হামজার পৌঁছাতে মাঝরাত হবে কমপক্ষে। কবীরের যে আরও একখানা গুরুদায়িত্ব আছে।
সে বেরিয়ে গেল ঘোড়াহাঁটের উদ্দেশ্যে। আমির নিবাসে ঢুকতে গিয়ে গা ছমছম করে উঠল। তখন বেশ রাত অনেক হয়ে গেছে। পা দুটো কেউ পেছন থেকে টানছে যেন ফিরে যাবার তরে। জয়ের পাঠানো দুজনকে কোথাও দেখল না। তাহলে কি অন্ধকারে আরমিণ এত দীর্ঘসময় পার করেছে! আৎকে উঠে জোরে ধাক্কা ও লাত্থি মারতে লাগল সদর দরজায়।
অনেকক্ষণ পর ক্ষীণ স্বর ভেসে এলো, “কে? জয় আমির?ʼʼ
কবীর হাসে, “ভাবী, আমি। আমি কবীর। একটু বিশ্বাস কোরে দরজা খোলেন তো। আমি আইছি।ʼʼ
দশ মিনিট পেরিয়ে গেলেও দরজা খুলল না। কবীর ধাক্কায় আবার। ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে শাল কাঠের ভারী দরজার লোহার বিশাল হুড়কোটা খুলতে আরমিণের শরীরের শেষ শক্তিটুকুও যেন নিঃশেষ হলো। হুড়মুড় কোরে পড়ে যাচ্ছিল মেঝেতে। কবীর জাপটে ধরল, পরক্ষণে দ্রুত ছেড়ে দিয়ে ক্ষমা চাইবার মতো কোরে মাথা নত করল।
টর্চের আলোয় অন্তূকে দেখে বুক কেঁপে উঠল কবীরের। মনে হচ্ছে যেন কোনো দীর্ঘদিনের সাজাপ্রাপ্তা রাজবন্দিনী। মেঝের ওপর থোকা থোকা বমি শুকিয়ে লেপ্টে আছে। দু এক ফোটা রক্তও ভেসে আছে তাতে। কবীরের গা কেপে উঠল ভেতরের নির্জন ও অন্ধকারচ্ছন্নতা দেখে। কীভাবে সম্ভব একলা দিন-রাত কাটানো এই মৃত্যুপুরীতে?
-“ওরা আইছিল, দরজা খোলেন নাই?ʼʼ
অন্তূ জবাব দিতে পারল না। কিন্তু বোঝা গেল সে খোলেনি। দরজা খোলাটা অন্তূর জীবনে সুখকর ঘটনা নয়, এছাড়াও এই নির্জন শিকারী বাড়ি, অপরিচিত নোংরা চরিত্রের পুরুষ ও অন্তূর সচেতন নারীচিন্তা…ওরা বোধহয় ডেকে ডেকে গলা ব্যথা কোরে ফিরে গেছে।
হঠাৎ-ই কবীরের কী হলো কে জানে, সে একটু ভাবনায় পড়ল। অন্তূকে পর্যবেক্ষক নজরে দেখতে দেখতে বুক নিংরে আসা এক চিলতে ছলকানো হাসি তার মুখে ফুটে উঠল। তার আন্দাজ; না না আন্দাজ নয়, সে নিশ্চিত যেন!
সে সদরঘরের বিভিন্ন কোণে দশটা-বারোটা মোমবাতি জ্বালালো। দ্বিধা, লজ্জা, ভয়ের কাঁপা হাতে খাবার তুলে অন্তূর সামনে তুলে বলল, “আমারে ক্ষমা করতে পারেন, আপা?ʼʼ
অন্তূ নিভু নিভু চোখে চায়। কবীর বুঝি কেঁদে ফেলবে। সে আবার বলে, “আমার বোন নাই। আমার মতোন পাপীরা আপনাগো মতোন মেয়েলোকের মর্যাদা কী বুঝবো? শিখি নাই তো কুনুদিন। আইজ মাপ করবেন?ʼʼ
অন্তূ হাসে, “আমি কারও কোনো অপরাধ রাখিনি, ভাই। এভাবে বলবেন না। মাফ করার মালিক আমার খোদা তায়ালা। আমি এক নগন্য বান্দি।ʼʼ
-“আমি শুনছি যার সাথে অন্যায় হয়, ওয় মাপ না করলে খুদাও মাপ করে না। আজ আপনে আমার হাতে একটু খাবার খাইলে আমি ধরে নেব আপনে আমারে মাপ করছেন।ʼʼ
অন্তূ খাবার নিলো। দু-একবার। আবার বমি আসছিল। কবীর নিজ হাতে পানি পান করায় অন্তূকে। তাকে ফিরতে হবে। অন্তূ এই বাড়ির সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠবে না, সেই শক্তি নেই তার শরীরে। কবীরেরও সাহস নেই তাকে পাটোয়ারী বাড়িতে নিয়ে আয়। ওদিকে মরণ।
সে বেরিয়ে যাবার আগে অদ্ভুতভাবে হেসে জানায়, -“আপনের দুশমন কইলাম হাসপাতালে, ভাবী। তাই আমি আইছি।ʼʼ
অন্তূ চোখের পাতা কাঁপল।
-“গুলি লাগছে কাল শেষ রাইতে। আমি যাই। সে না আইলে দরজা খুইলেন না। এমপির লোক আপনারে খুঁজতেছে। আমি আবার আসব।ʼʼ
অন্তূর শরীরে কাঁপুনি উঠল। এটা হতে পারে না। জয় আমির এভাবে মরতে পারে না। এটা সময় নয়। অন্তূর থুতনি ভেঙে এলো, থরথর কোরে কাঁপল। আচ্ছা, বড়ঘরেরই বা কী অবস্থা? কেমন আছে ওরা? আছে তো? জয় আমির কী করেছে ওদের সঙ্গে? অন্তূর মনে হলো, সে এখানেই মরে যাবে। বাকি থাকা দায়ভার ও জীবনের পিছুটান তাকে বাঁধতে পারবে না। এত কঠিন হতে নেই জীবন।
হামজা পৌঁছাল শেষরাতে। কেবিনে ঢুকে হুড়মুড় কোরে ঝুঁকে পড়ল জয়ের বুকের ওপর। জয় শুয়ে আছে। বাহুতে ব্যান্ডেজ, উরুতে ব্যান্ডেজ। শরীরের ওপর পাতলা চাদর। অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল চেহারার দিকে। এই মুখটা তার জয়ের। জয় তার ভাই কম, সন্তান। সে জয়ের বাপ, পয়দাকর্তা। কয়দিন পর জয়কে দেখে তার মনে হলো সে বুঝি কতকাল এই মুখখানায় নিজের নাম শোনে না। হাসির ঝংকার শোনে না।
-“জয়! ও জয়! তাকা, তাকা। …….তাকা জয়। আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে। জয় রে?ʼʼ
জয়ের মুখে হাত নেড়ে দেয়, মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলায়। রিমির অবাক লাগে। জয়ের সামনে যে হামজাকে দেখা যায়, ওই হামজা আরেকজন। তার হাতদুটো থরথর কোরে কাপছে, মস্তিষ্কের নির্দেশ যেন হাতের পেশিতে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। হামজার সাথে কী হচ্ছে? জয়ের সুস্থ হতে হবে। দুই ভাইয়ের একবার খুব শীঘ্রই বিদেশ চলে যাওয়া জরুরী। চারদিকের অবস্থা ভালো না। এই সুযোগে দুজনের একচোট জম্পেশ চিকিৎসা সেরে নেয়া যাবে।
ডাক্তার ঢুকতেই থাবা মেরে ধরল, “রক্ত নিন। খবরদার যেন উচ্চারণ করবেন না, আমি অসুস্থ, এ অবস্থায় রক্ত দিতে পারা যাবে না। আমার রক্ত ও নেগেটিভ। নার্স? নার্স কই? ডাকেন!ʼʼ
তখনও শরীরের বিভিন্ন স্থানে দগদগে ঘা, ব্লাড-প্রেশার ও হার্টবিট হাই। কিন্তু হামজার কথার খেলাপি করতে নেই। ডাইরেক্ট ব্লাড ট্রান্সফিউশন ব্যবস্থা কোরে ফেলা হলো।
বারবার একজন আরেকজনের রক্ত ভাগাভাগি করতে করতে এখন দুজনের রক্ত গুলে গেছে। কতবার এরকম লক্ত দেয়াদেয়ী হয়েছে হিসেব নেই। হামজা কী করে নিজের রক্তকে অস্বীকার করতে পারে। জয় এখন তার রক্ত। সে-ই জয়ের পরিবার, বংশপরিচয়, আত্মীয়, মা-বাপ, ভাই, অভিভাবক। আর কারও স্থান নেই এখানে।
রক্ত দেবার পর জয় অবজার্ভেশনে রইল। দু-একদিনের মাঝে তার শরীর ঠিক হয়ে উঠবে। তার শরীরে এসব মশা কামড় মারা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। এসবে কাবু হবার মতো ক্যাপাসিটি শরীর বহুকাল আগেই হারিয়ে ফেলেছে। হামজাও বাকি রাতটাসহ গোটা দিনটা হাসপাতালেই আরেকটু চিকিৎসার অধীনে রইল। এ অবস্থায় রক্ত দেবার ফলে তার শরীর আরও ভেঙে এলো। দুজন পাশাপাশি বেডে পড়ে রইল।
কবীর খুশির সংবাদখানা কাকে দেবে কাকে দেবে কোরে উত্তেজনা সামলাতে পারছিল না। কিন্তু সে অন্তত জয়কে দিলো না। একজনকে দেবার সাথে সাথে হাসপাতাল ভেঙে দিনাজপুর এসেছে, এই খবর শুনলে জয় এই মুহুর্তে দুনিয়াদারী ভুলে ছুটতে চাইবে ঘোড়াহাঁট। উন্মাদ হয়ে যাবে। কিন্তু কবীরের ভেতরে চেপে রাখা কঠিন।
রিমি, তুমি ও কোয়েল জয় ও হামজার বেডের মাঝখানে বসা। হামজা-জয় দুজনেই ঘুমোচ্ছে তখন। রাত শেষ হবার পথে। ফজরের আজান হবে। চারদিকে নিশ্চল নীরবতা।
কবীর রিমির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “বড়ভাবী! জয় ভাই বাপ হইলে কেমন হবে, কন তো?ʼʼ
রিমি বিস্ময়ে তাকায়। চোখদুটো চিকিচিক করে উঠল, চোখে জিজ্ঞেস করে, “হবে নাকি?ʼʼ
কবীর ইঙ্গিতে যে ব্যাপারটা বোঝাতে পেরে খুবই গর্বিতবোধ করে নিজের ওপর। রিমির কি কান্না পাচ্ছে। একবার আরমিণকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। খুব।
হামজা পরদিন সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আরেকটু রেস্ট কোরে রাতের ওষুধ খেয়ে কয়েকটা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বড়ঘরে গেল। জয় অনেকগুলো লাশ বিছিয়ে রেখে গেছে। শুধু একটা পতঙ্গের জান এখনও সামান্য ফরফর করছে। পতঙ্গটার নাম মুরসালীন। এটা বিরক্তিকর।
সে মুরসালীনের আধমরা দেহটাকে গলা চেপে ধরে বসিয়ে বলল, “তুমি আমার খুব বড় বড় ক্ষতি করেছ, মুরসালীন। তোমরা নীতির কথা বলে বেড়াও, আমার মতো পাপীর ক্ষতি করো। তোমাদের নীতি কী বলে? পাপীর ক্ষতি করা নীতিবিরুদ্ধ নয়?ʼʼ
দুটো ছেলে বড় চাপাতিখানা ও শাণ এনে রাখল হামজার কাছে। হামজার হাতের পেশি অবশ প্রায়। ওরাই শাণে চাপাতি ঘঁষতে লাগল। ধাতব শব্দ উঠল অবরুদ্ধ ঘরখানায়। আর তিনজন গিয়ে পাশের ঘর থেকে কুকুরের খেয়ে অবশিষ্ট রাখা হাড্ডিসার দেহ-কঙ্কালগুলো এনে ফেলল মেঝের ওপর।
আজ আবার চুল্লি চলবে বড়ঘরে। ভালো আয়োজন হবে আজ। হামজা চাপাতি একহাতে তুলে ধরল, একটু জোর ও জেদ বেশি দিতে হলো শরীরের ওপর। মুরসালীনকে বলল, “আমি আগে আলাদাভাবে তুমি জীবিত থাকতেই তোমার হাত দু-খানা চাই, বুঝলে! তোমার এই হাতদুটো আমাদের বিরুদ্ধে খুব আপত্তিকর কথাবার্তা লিখেছে। আমার পালক বাপকে মেরেছে। আর অনেককিছু।ʼʼ
এক কোপে মুরসালীনের ডানহাতখানা কেটে ফেলল হামজা। চামড়ার সাথে ঝুলছিল হাতখানা, হামজা টান মেরে ছিঁড়ে নিলো। মুরসালীনের চিৎকার বড় শ্রুতিমধুর লাগছে, এটা শুনবে বলে সে মুখে কিছু গুঁজে দেয়নি। মুরসালীনের চোখে তখনও অভয়। একটুও আঁকুতি নেই। সে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাতখানার দিকে তাকিয়ে হাসল।
ওই হাতদুটো শেষবার তার মায়ের কাছে চিঠি লিখেছে। ওই হাতদুটো ধরে মা কতবার বলেছে, শোন মুরসালীন, ভার্সিটিতে পড়তে দিছি বলে জাহিল হবি, তা কিন্তু না। ইকদম ত্যায্য করব। তোর এই হাত যেন কারও কষ্টের কারণ না হয়। তোর হাতেখানা যেন কখনও মিথ্যা ও মজলুমের বিপক্ষে না লেখে। আল্লাহ পাক হাশরে প্রতিটা অঙ্গের হিসাব চাইবেন। অঙ্গরা নিজেরা নিজেদের কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে।
বলতে বলতে মরিয়ম কেঁদে ফেলতেন। মুরসালীন হেসে জড়িয়ে ধরতো আম্মাকে ওই হাতখানা দিয়েই। আজ এই অবস্থায় তিনি দেখলে নিশ্চয়ই মুরসালীনের বুকে জায়গা নিতেন, কিন্তু মুরসালীনের হাতখানা নেই উনাকে জড়িয়ে নেবার জন্য। মুরসালীন তাই হাসল। তার খুব পিপাসা পাচ্ছে। এক গ্লাস ঠান্ডা পানির জন্য বুক চিড়ে আসার মতো অনুভূত হলো। সে অবাক হলো, মৃত্যু পূর্ববর্তী প্রভাব তাকেও ঘিরে ধরতে সক্ষম হয়েছে। মৃত্যুর তো আসলেই অনেক শক্তি। মানুষ কেবল সান্ত্বণা পেতে বলে মৃত্যুকে আমি ডরি না। মৃত্যুর আগ মুহুর্ত মৃত্যু মুহুর্তের চেয়ে কঠিন বুঝি!
বাম হাতখানাও কেটে নিলো হামজা। মুরসালীনকে দেখতে অদ্ভুত লাগল। জীর্ণ হয়ে আসা লম্বা শরীরে লম্বা লম্বা সাহসী হাত দু-খানা নেই আর। টপটপ করে রক্ত পড়ে যাচ্ছিল মেঝেতে। হামজা একটা ছেলের ওপর ভর দিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে মেরুদন্ড সোজা কোরে উঠে দাঁড়ায়। উঠতে গিয়ে চারবার মতোন মেরুদণ্ড মুড়ে এলো, ঝুঁকে পড়ল অর্ধঙ্গ রোগীর মতো।
পিস্তলখানা বুক বরাবর তাক করল মুরসালীনের, “কোনো শেষ ইচ্ছা আছে তোমার, মুরসালীন? আছে? বলো।ʼʼ
মুরসালীন পাঠ করে—’আশশাহাদু আল্লাহ্ ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলূহ্! আশশাহাদু আল্লাহ্ ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ওয়া….ʼ
ভোঁতা চারটে আওয়াজ উঠল। পরপর চারটে গুলি মুরসালীনের বুকের প্রায় একই জায়গা ফুঁড়ে পেছনের দেয়ালে গেঁথে রইল। একটা গুলি বিঁধে রইল মুরসালীনের বিদ্রোহী বুকের হৃদযন্ত্রের পেশীতে।
অবরুদ্ধ নিশীথ পর্ব ৭৮
চুল্লিতে কয়লা ও কোক অল্প ঢালা হলো। অনেকগুলো তাজা দেহ আছে আজ। কোক অত না হলেও চুল্লি জ্বলল। মুরসালীনের শরীরখানা গলে লাল টকটকে লাভা হয়ে উঠল। তার বিদ্রোহ, বিপ্লবের পিপাসা, টগবগে রক্তের স্ফূলিঙ্গ, এক অসহায় মায়ের শেষ প্রতীক্ষা এক মেটাল-মেল্টিং চুল্লিতে কিছু সময়ের কারবারে গলে গেল।
ফুরিয়ে গেল মুরসালীনও। মুরসালীনের মায়ের অপেক্ষা যদিও ফুরোয়নি। তিনি যে আনসারী মোল্লার কাছে কথা নিয়েছেন মুরসালীনকে নিয়ে আসবেন।
হামজার কাজ ফুরোলো বড়ঘরে। তাকে এখন একবার ঘোড়াহাঁটে যেতে হবে।
