অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৩
সুমি চৌধুরী
এত কিছু বললেও আর সাহস হলো না দাঁড়িয়ে থাকার রিদির। অচেনা ওই ছেলেদের সামনে দাপট দেখালেও ভেতরে ভেতরে সে বেশ কুঁকড়ে গেছে। ঝট করে ফোনটা ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বড় বড় পা ফেলে ওখান থেকে সে হনহন করে চলে গেল। একটা রিকশায় উঠে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে নিজেই নিজের ওপর অবাক হলো সে।
“রিদি, তুই কবে থেকে এত কথা বলতে শিখলি? ব্যাপার কী বল তো! তুই দিন দিন বড্ড বেশি কথা বলতে শিখে গেছিস। বেয়াদব মেয়ে একটা, তোকে একদম ঝাড়ুপেটা করা দরকার।”
কান ধরে ছেলেগুলো অনেকক্ষণ ধরে ওঠবস করছে। তাদের সামনে যমের মতো নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নির্ভান। তার চোখের চাউনিতে ফুটে ওঠা রাগ দেখে ছেলেগুলোর কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। একটা ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে অতি কষ্টে বলল।
“বস, এবার তো মাফ করেন! আসলে ওই মেয়েটার এত সাহস দেখে আমরাও কয়েক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গিয়েছিলাম।”
নির্ভান দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল।
“চুপ! আর একটা কথা বললে এক একটার দাঁত আমি পাটি থেকে খুলে ফেলব। তোদের কি আমি টাকা কম দিই রে যে তোদের মতো কয়েকটা ধামড়াকে একটা মেয়ের কাছ থেকে এসব কথা শুনতে হবে?”
“বস, মেয়েটা মনে হয় অনেক চঞ্চল আর প্রচণ্ড রাগী।”
“তো রাগী হলে ওখানেই ওরে ধরে নিয়ে আসতি! সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি ওই মেয়ের লেকচার শুনছিলি আর বালের আঙুল চুষছিলি?”
ছেলেগুলো আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। তারা বুঝল আজ নির্ভান চরম ক্ষ্যাপা। কিছুক্ষণ পর নির্ভান নিজের পার্সোনাল রুমে এসে ঢুকল। নির্জন রুমেও তার কানে বারবার রিদির সেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠ আর অদ্ভুত ঝাড়িগুলো বাজছে। তার বুকের বাঁ পাশটা কেন জানি এক অদ্ভুত ছন্দে ধক ধক করছে। নির্ভান দেওয়ালে টানানো বিশাল এক ফ্রেমের ছবির দিকে তাকাল। ছবিতে একটা মেয়ের অমলিন হাসিমাখা মুখ; যে কী না পাগলীটার মতো আইসক্রিম খাচ্ছে আর সেই আইসক্রিম তার থুতনিতে আর মুখে লেগে আছে। ঠিক যেন একটা অবুঝ শিশু। নির্ভান ধীর পায়ে গিয়ে ছবির ওপর হাত বুলিয়ে মায়াবী গলায় বলল।
“জানো প্রিয়দর্শী, আজ তিন বছর পর প্রথমবার তুমি ছাড়া অন্য কেউ আমার এই বুকের হার্টবিট কাঁপিয়ে দিল। ঠিক যেমনটা তুমি আমাকে তিন বছর আগে করেছিলে, আজ হুবহু সেই একই রকম অনুভূতি ওই মেয়েটা দিল। কেন এমন হলো? আমার জীবনে তো তুমি ছাড়া অন্য কোনো নারীর অস্তিত্ব ছিল না, তবুও কেন একটা অপরিচিত মেয়ে আমার হৃদস্পন্দন উলটপালট করে দিল?”
নির্ভান এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আবার বলল।
“তবে তুমি কোথায় আছো প্রিয়দর্শী? তোমাকে তো আমি কম খুঁজলাম না! পুরো শহর, এমনকি বিদেশের মাটিও তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও তোমাকে পেলাম না। জানো, সেদিন তোমার ওই আইসক্রিম মাখা মুখটা দেখে আমার বুকটা এতটাই জোরে কাঁপছিল যে আমি নিজের মধ্যেই ছিলাম না। সেদিন যদি ভালোবাসার এই ব্যাকুলতা বুঝতাম, তবে তোমাকে সেদিনই আমি বুকের ভেতর পিষে ফেলতাম। কোথাও কোনোদিন যেতে দিতাম না তোমাকে।”
নির্ভান কথাগুলো বলে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকার চোখের পাতায় ভেসে উঠল সেই তিন বছর আগের আইসক্রিম মাখা মুখটা। সেই নিষ্পাপ মুখটার মায়ায় নির্ভান আজও একা, আজও “সিঙ্গেল”। কোনো নারী পারেনি সেই মুখটার স্মৃতি মুছে দিয়ে তার মনে জায়গা করে নিতে। তাকে আজও খুঁজে পায়নি সে, তবুও নির্ভান অপেক্ষায় আছে। একবার যদি সেই নারীকে পায়, তবে এক সেকেন্ডও দেরি করবে না সোজা নিজের নামে দখল করে নিবে তাকে।
শুভ্র সব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সাইন নিয়ে রিসেপশন থেকে বেরিয়ে ঈশানের উদ্দেশ্যে বলল।
“শুনো ঈশান, এই সব ফাইল যাদের যাদের কোম্পানি তাঁদের দিয়ে আসবে। আর তুমি কাল আমাদের বাড়িতে আসবে।”
ঈশান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল।
“ওকে বস?”
শুভ্র আর দাঁড়াল না। বাইক স্টার্ট দিয়ে তীব্র গতিতে বাতাসের সাথে মিশে গেল।
রিদি বাড়িতে এসে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হলো। ড্রয়িং রুমে ইমনকে বসে টিভি দেখতে দেখে সেও গিয়ে পাশে বসল। তারপর আয়েশ করে ইমনের চিপসের প্যাকেট থেকে চিপস বের করে খেতে থাকল। হঠাৎ ইমন প্রশ্ন করল।
“আপু, তুমি কি শুভ্র ব্রো-কে ভালোবাসো?”
রিদি মাত্রই একটা চিপস মুখে দিয়ে গিলতে যাচ্ছিল, ইমনের কথা শুনে চিপসটা গলায় আটকে বিষম খেল সে। রিদি ইমনের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে কাশতে কাশতে বলল।
“কে বলছে তোরে যে আমি শুভ্র ভাইকে ভালোবাসি?”
ইমন বাঁকা হেসে বলল।
“তোমার গাইড।”
“মানে?”
“মানে আজ আমি তোমার রুমে গিয়েছিলাম। সেখানে তোমার কিছু গাইড দেখেছি, সেখান থেকে একটাতে স্পষ্ট লেখা ছিল আই লাভ ইউ শুভ্র ভাই।”
কথাটা শুনে রিদির কলিজা শুকিয়ে গেল, সাথে সাথে শুরু হলো জোর হিক্কা। রুম থেকে রাবেয়া এহসান বেরিয়ে রিদিকে হিক্কা তুলতে দেখে তাড়াতাড়ি ডাইনিং টেবিল থেকে পানি এনে দিলেন। রিদি এক নিশ্বাসে গলগল করে পানি খেয়ে হাঁপাতে লাগল। রাবেয়া এহসান চিন্তিত হয়ে বললেন।
“কী হয়েছে? হঠাৎ এমন হিক্কা উঠল কীভাবে?”
ইমন মশকরা করে পাশ থেকে ফোড়ন কাটল।
“গাইডের কথা শুনে!”
রাবেয়া বেগম অবাক চোখে তাকালেন।
“গাইড মানে?”
রিদি এবার চোখ পাকিয়ে ইমনের দিকে তাকাল। ইমন মুখ টিপে হাসছে। সে রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে সত্যটা ফাঁস করতে যাবে, তার আগেই রিদি পরিস্থিতি সামলাতে চিৎকার করে বলল।
“আম্মু! আমার না নুডলস খেতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ প্লিজ, একটু বানিয়ে দাও না!”
রাবেয়া এহসান আর কিছু জিজ্ঞেস না করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। মা আড়ালে যেতেই ইমন রিদির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
“আপুউউ, গাইডটা কিন্তু এখন আমার কাছে!”
রিদি চোখ পাকিয়ে বাঘিনীর মতো গর্জে উঠে বলল।
“তুই আমার গাইড নিছস কোন সাহসে? এখুনি দে বলতেছি!”
ইমন দমল না, বরং দাঁত বের করে হেসে বলল।
“উহু, অতো সোজা নাকি! তোমার কাছে ওইগুলা গাইড মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এই গাইডটার দাম এখন হাজার টাকা।”
রিদি ভ্রু কুঁচকে বিষ্ময় নিয়ে বলল।
“টাকা মানে? কী বলতে চাইছিস তুই?”
ইমন এবার সোফায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে বলল।
“মানে সোজা। কচকচে এক হাজার টাকা না দিলে এই গাইড সোজা আব্বুর হাতে চলে যাবে। এবার বোঝো ঠেলা!”
রিদি ভয়ে সজোরে একটা ঢোক গিলল। নিজের বাবার হাতে ওই লেখাটা পড়া মানেই আত্মাহুতি দেওয়া। সে আমতা আমতা করে কাঁদোকাঁদো গলায় বলল।
“এ… এ ভাই, এতগুলা টাকা আমি কই পামু?”
ইমন পা নাচাতে নাচাতে বলল।
“সেইটা কি আমি জানি? টাকা দাও গাইড নাও। টাকা দিবা না, তো অনলি বাঁশ খাবা ঝাকানাকা!”
রিদি এবার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল।
“ইমন, তুই কিন্তু বড্ড বেশি করছিস!”
“আমি আবার কম কবে করি? এখন বলো, টাকা কি পাবো নাকি আব্বুর হাতে গাইডটা দেব?”
রিদি বুঝল, তার এই ঘাড়ত্যাড়া ভাই সুযোগ পেলে সত্যি সত্যি বাপের কাছে সব ফাঁস করে দেবে। সে শেষমেশ বিরক্ত হয়ে নিজের জমানো দুই হাজার টাকা থেকে এক হাজার টাকা এনে ইমনের হাতে ধরিয়ে দিল। ইমন টাকাটা নিয়ে তাতে একটা শব্দ করে চুমু খেল। তারপর হাসতে হাসতে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে বলল।
“বোনরে ফাঁসাও, টাকা কামাও! বড়লোক হইবা আর সিলুট পাইবা!”
ইমন গাইডটা এনে রিদিকে দিতেই রিদি ওটা একরকম ছিনিয়ে নিল। রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমে চলে এল সে। গাইডটা খুলে সেই নামটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল, যেখানে দুই বছর আগে নিজের মনের সবটুকু আবেগ দিয়ে লিখেছিল “আই লাভ ইউ শুভ্র ভাই”। এই নামটা দেখলেই ওর ভেতর কেমন জানি এক অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূত হয়। কেবল মন বলে, মানুষটাকে কবে নিজের করে পাবে!এসব আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতে রিদি সিঁড়ি দিয়ে আনমনে নিচে নামছিল। মনের অজান্তেই সুর তুলে সে গেয়ে উঠল।
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১২
~ মিলন হবে কত দিনে ~
~ মিলন হবে কত দিনে ~
~ আমার মনের মানুষেরও সনে ~
ঠিক তখনই ইমনের কর্কশ কন্ঠ ভেসে এল।
“মিলন হবে না কোনো দিনও!”
রিদি চমকে উঠে মাথা তুলে ড্রয়িং রুমের দিকে তাকাল। আর তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া! সে কি সত্যি দেখছে নাকি মনের ভুল? বারবার চোখের পলক ফেলল, কিন্তু দৃশ্যটা বদলাল না। সোফায় বসে থাকা মানুষটা রক্তমাংসের…..!
