Home অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৭

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৭

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৭
সুমি চৌধুরী

ক্লান্ত শরীরে নিজের রুমে এসে ঢুকল রিদি। শরীরটা আর এক মুহূর্তও চলছে না, যেন এখনই ভেঙে পড়বে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে নিজেই চমকে উঠল। সারা মুখে থোকা থোকা হলুদ লেগে আছে। নিজেকে ভালো করে দেখে ফিসফিস করে বলল, “মাগো! দেখতে একদম পেত্নীর মতো লাগছে!” সে আর দেরি না করে ড্রেসিং টেবিল থেকে দ্রুত টিস্যু পেপার নিয়ে মুখের হলুদগুলো ঘষে ঘষে মুছতে লাগল।
রুমের এই নিস্তব্ধতা কাঁপিয়ে রিদি আপন মনেই গুনগুন করে গান গেয়ে উঠল,
“ভালোবেসে এইবার আয় কাছে তুই…”
“সব ভুলে একবার আয় তোকে ছুঁই…”
পরের লাইনটা গাওয়ার আগেই আচমকা এক ঝোড়ো বাতাসের বেগে একটা চেনা পুরুষালি কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ভেসে এলো,

“ওহ আমার বুলবুলি সোনার ময়না রে…”
“ভালোবেসে চইলা আছি…”
“সামলাও এখন আমাকে!”
চমকে উঠল রিদি! ভয়ে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল তার। সে সাথে সাথে পেছন ফিরে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই তার চোখ দুটো চড়কগাছ! দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে, রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে খোদ শুভ্র! তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি। এই মাঝরাতে নিজের ঘরে হুট করে শুভ্রকে এভাবে দেখে রিদি যেন আস্ত একটা ভূত দেখল। সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল,
“আআআ…”

শুভ্র আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে শিকারি ইগলের মতো এক ছিটকে ছুটে এসে নিজের দুই হাত দিয়ে রিদির মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ফিসফিস করে ধমকে উঠল,
“স্টুপিড! চিল্লাচ্ছিস কেন? পুরো বাড়ির মানুষকে জাগাবি নাকি?”
রিদি তখনো আতঙ্কে ছটফট করছে। শুভ্রর হাতের নিচে তার মুখ থেকে শুধু অস্পষ্ট শব্দ বেরোলো, “উম… উম…”
শুভ্র আস্তে করে তার হাতটা সরিয়ে নিল। রিদি বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে সাথে সাথে জেরা করার ভঙ্গিতে বলল,
“আপনি! আপনি এই মাঝরাতে এখানে কীভাবে এলেন?”
শুভ্র একটা হালকা দেবদূতের মতো হাসল। তারপর রিদির একদম কাছে এসে ঠাট্টার ছলে বলল,
” হেলিকপ্টার দিয়ে সরাসরি তোর ছাদ বেয়ে চলে এসেছি!”
রিদি রেগে গিয়ে বলল,
“ফাজলামি করছেন আমার সাথে?”
শুভ্র চোখের ইশারায় দুষ্টুমি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“না তো, প্রেম করছি!”
রিদি মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“অসভ্য একটা!”
“অসভ্যতামি তো এখনো করিই নাই, এখন করব। আই, প্রেম করি!”

কথাটা শেষ হতে না হতেই শুভ্র কোনো সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় রিদিকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক এই কাণ্ডে রিদি পড়ে যাওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়ে নিজের দুই হাত দিয়ে শুভ্রর গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর শুভ্রর বুকের ওপর হাত দিয়ে ধাক্কা মারতে মারতে ফিসফিস করে ব্যাকুল গলায় বলল,
“কী করছেন কী? নামান আমাকে! আর আপনি প্লিজ এখান থেকে চলে যান। কেউ দেখে ফেলবে”
শুভ্র রিদিকে কোলে নিয়েই ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগোতে এগোতে বেশ ভাব নিয়ে বলল,
“আই ডোন্ট কেয়ার!”
বলেই শুভ্র রিদিকে নিয়ে বিছানায় চলে আসলো। সে অত্যন্ত আলতো করে রিদিকে বিছানায় শুইয়ে দিল, তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই নিজের মুখটা নামিয়ে রিদির হলুদ মাখা নরম গালের সাথে নিজের গালটা গাঢ়ভাবে মেখে দিল। শুভ্রর এমন হুট করে গা ঘেঁষে আসা আর গাললিপ্টানো ভালোবাসায় রিদি লজ্জায় আর আবেশে তার চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
শুভ্র রিদির শরীরের ওপর আধশোয়া হয়ে এক হাত দিয়ে তার চিবুকটা ছুঁয়ে দিল। রিদির সেই লজ্জায় রাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে তীব্র আকুলতায় বলল,

“বিশ্বাস কর রিদি, তুই আমাকে পুরো পাগল করে দিয়েছিস! আজ তোকে ভিডিও কলে দেখার পর থেকে নিজেকে কোনোভাবেই আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। তোর এই রূপ আর ভালোবাসার টানে আমি সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে ছুটে এসেছি,রোহিণীশ”
কথাটা শুনেই রিদি ধীরলয়ে চোখ খুলল। তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল, সে খানিকটা ভ্রু কুঁচকে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“রোহিণীশ? এই রোহিণীশ আবার কে?”
শুভ্র ভুবন ভোলানো মায়াবী হাসিটা দিল। তারপর রিদির নরম গালে নিজের আঙুল দিয়ে আলতো করে সুড়সুড়ি দিতে দিতে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
“রোহিণীশ একটা নাম যার অর্থ হলো চাঁদ। আর তুই আমার কাছে ঠিক ওই আকাশের চাঁদের মতোই সুন্দর, যার আলো ছাড়া আমার পুরো জীবনটাই অন্ধকার!”

মুগ্ধ নয়নে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে রইল রিদি। এই মানুষটা দিন দিন তাকে এমন এক মায়ায় বাঁধা ফেলছে যে, সে প্রতি মুহূর্তে তার প্রেমে আরও বেশি বেশি করে পড়ে যাচ্ছে। রিদির এমন অপলক ও আকুল চাহনি দেখে শুভ্রর চোখের চাউনিও বদলে গেল। সে রিদির মুখের আরও কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“এভাবে তাকাস না রিদি… এভাবে তাকালে অন্য কিছু করতে ইচ্ছে করে।”
রিদি যেন এক ঘোরের মধ্যে চলে গেছে, সে শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়েই মায়া জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী করতে ইচ্ছে করে?”
শুভ্র তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে গভীর ভালোবাসার হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তোর এই ঠোঁট দুটোতে কামড় দিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে… তোকে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে ইচ্ছে করে।”
শুভ্রর এমন তীব্র ও পুরুষালি কথায় রিদির বুকের ভেতরটা দুলো উঠল। সে কিছুটা কেঁপে উঠে চোখ দুটো সামান্য নামিয়ে বলল,

“জানেন… আপনি যখন এভাবে একদম কাছে আসেন না, আমার কেমন জানি লাগে! একটা অদ্ভুত ভয় ভয় কাজ করে ভেতরটায়, কেমন যেন নিঃশ্বাস আটকে আসে!”
রিদির মুখে ভয়ের কথা শুনে শুভ্রর দুষ্টুমি মাখানো মুখটা হুট করেই একটু গম্ভীর হয়ে গেল। সে রিদিকে আর জোর করতে চাইল না। সে রিদির গাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে একটু দূরে সরে যাওয়ার ভান করে বলল,
“ওকে ফাইন! তোর যখন ভয় লাগে, আমি আর তোর এত কাছে আসব না।”
বলেই শুভ্র রিদির ওপর থেকে শরীরটা সরিয়ে নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে গেল। কিন্তু শুভ্রর এই দূরে সরে যাওয়াটা রিদির সহ্য হলো না। সে নিজের ভেতরের সবটুকু লজ্জা আর ভয় এক নিমেষে ঝেড়ে ফেলে আচমকা শুভ্রর মাথাটা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে ফেলল! শুভ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই, রিদি তার মুখটা টেনে নিজের একদম কাছে এনে শুভ্রর ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো মিলিয়ে দিল। আস্ত এক টুকরো ভালোবাসার ছোঁয়া নেমে এলো পুরো ঘরে।

শুভ্র মৃদু হেসে ওঠে, যেন সে মনে মনে জানতোই রিদি তাকে এভাবে আটকে রাখবে। আর এক মুহূর্তও না ভেবে সে গভীর উন্মাদনায় সাড়া দেয় রিদির ঠোঁটে। দুজনের নিঃশ্বাস আটকে আসে, বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায় দ্বিগুণ। এই নিস্তব্ধ মধ্যরাতে চারপাশের সবকিছু ভুলে তারা একে অপরকে উজার করে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে থাকে।
প্রায় গুনে গুনে ছয় মিনিট পর, দুজনেরই যখন দম আটকে আসার উপক্রম হলো, তখন হাঁপাতে হাঁপাতে তারা একে অপরের ঠোঁট ছেড়ে দিল। শুভ্রর ভারী নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে রিদির মুখে। সে রিদির কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
“এত রোমান্টিক কবে হলি তুই, হুম?”
রিদি তখনো লজ্জায় লাল হয়ে শুভ্রর গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকাল। তারপর খুব মৃদুস্বরে বলল,
“যেদিন থেকে আপনার এই বেসামাল রূপটা দেখেছি, ঠিক সেদিন থেকেই।”
শুভ্রর ঠোঁটে আবার সেই ভুবন ভোলানো হাসি ফুটে উঠল। সে রিদির ঠোঁটে আরেকবার আলতো করে চুমু খেয়ে নিজের নাকের সাথে রিদির নাক ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“সামলাতে পারবি তো আমাকে?”
রিদি শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলল,

“পারব।”
শুভ্র এবার রিদির কানের লতির কাছে নিজের মুখটা নিয়ে আসলো। তার তপ্ত নেশালো গলার ফিসফিসানি রিদির কান ছুয়ে নামল,
“কাল রাতে দেখা যাবে, কতটুকু সামলাতে পারিস এই পাগলটাকে!”
কথাটা শোনামাত্রই রিদির সর্বাঙ্গ জুড়ে এক তীব্র শিউরণ বয়ে গেল। লজ্জায় আর উত্তেজনায় তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল। শুভ্র রিদির এই কাঁপাকাঁপি দেখে আলতো করে হাসল। তারপর বলল,
“এবার তাহলে চলে যাই?”
রিদি শুভ্রর বুক থেকে মুখ না তুলেই অবুঝের মতো বলল,
“না।”
শুভ্র তার চুলে বিলি কেটে দিয়ে পরম মমতায় বলল,
“আই লাভ ইউ।”
রিদিও আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না, শুভ্রর বুকে আরও একটু মিশে গিয়ে বলল,
“আই লাভ ইউ টু।”

শুভ্র রিদির ঘাড়ে মুখ ডুবাল। কাঁচা গোলাপ আর গাঁদা ফুলের এক মাতাল করা ঘ্রাণ রিদির শরীর থেকে শুভ্রর নাসিকায় ভেসে আসতেই পুরুষটা যেন পুরো উন্মাদ হয়ে গেল। সে নিজের সবটুকু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছোট ছোট তীব্র চুমু খেতে লাগল রিদির ঘাড় জুড়ে। রিদিও আর নিজেকে সামলাতে পারল না, তার অজান্তেই দুই হাত উঠে গেল শুভ্রর পিঠে, সে শক্ত করে শুভ্রর শার্ট খামচে ধরে চোখ জোড়া বন্ধ করে অনুভব করতে লাগল শুভ্রর প্রতিটি তপ্ত স্পর্শ।
রিদির এই নীরব সম্মতি পেয়ে শুভ্র নিজের ভেতরের আবেগকে আর কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারল না। সে একদম পাগল হয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল রিদিকে। নিস্তব্ধ ঘরের মাঝে কী হয়ে গেল, তা কেউ জানল না, সময় কতটুকু কেটে গেল, সেই হিসাবও কারও মনে রইল না।
হঠাৎ রিদির চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনতা পানির ছোঁয়ায় হুঁশ ফিরল শুভ্র নামক উন্মাদ পুরুষটির। এক লহমায় তার বুক জুড়ে এক তীব্র অনুশোচনা কেঁপে উঠল। সে নিজের সমস্ত উন্মাদনা ওখানেই থামিয়ে দিয়ে পরম মমতায় জড়িয়ে নিল রিদিকে। তার চোখের পানি মুছে দিয়ে কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল, অপরাধী গলায় রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে শুভ্র বলল,

“আই এম সরি রিদি, নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি, অনেক অনেক বেশি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম, প্লিজ ফরগিভ মি, আই প্রমিস আর কষ্ট দেব না”.
কিন্তু রিদির তরফ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। শুভ্র খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে ভালো করে তাকাল। দেখল রিদি একদম নিথর হয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, তবে বুকটা ওঠানামা করছে আর অবিরাম নিশ্বাস চলছে। শুভ্র আর দেরি না করে রিদির দুই গালে আলতো করে হাত রাখল। আলতো চাপড় দিয়ে বেশ অস্থির গলায় বলল,
“এই বউ! চোখ খোল প্লিজ। বললাম তো আই এম সরি, নিজেকে সামলাতে পারি নাই।”
তবুও রিদির চোখের পাতা নড়ল না। শুভ্রর এবার বুঝতে আর বাকি রইল না যে অতিরিক্ত ধকল, ক্লান্তি আর উত্তেজনার চোটে বেচারি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। জ্ঞানহীন রিদিকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুভ্র চরম আফসোস আর বিরক্তিতে নিজের মাথায় একটা থাপ্পড় মেরে বিড়বিড় করে উঠল,
“ছ্যাহ বাল! বাসর রাতের যে প্ল্যানটা কালকের জন্য জমায় রাখছিলাম, নিজের ধুরন্ধর বুদ্ধিতে সেইটা আজকেই কইরা বসলাম! ছ্যাহ! নিজের ওপর এই কন্ট্রোলটুকুও রাখতে পারলি না শুভ্র?”
শুভ্র বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত নিজের পোশাকগুলো ঠিকঠাক করে পরে নিল। তারপর পরম মমতায় বিছানার পাশে এসে নরম কম্বলটা টেনে রিদির পুরো নিথর শরীরটা ভালো করে ঢেকে দিল। ওভাবে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকা ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে শুভ্রর বুকটা এক অদ্ভুত ভালোবাসায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে আবারও রিদির কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা দীর্ঘ, তীব্র ভালোবাসার পরশ দিল। তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে একদম নেশায় বুঁদ হওয়া এক উন্মাদ প্রেমিকের মতো ফিসফিস করে বলল,

“আই এম সরি সোনা, আই অ্যাম সো সরি! তোকে এতটা ভালোবাসার যন্ত্রণায় ফেলে দেব আমি নিজেই ভাবিনি। নিজেকে আর এক সেকেন্ডও ধরে রাখতে পারি নাই, তোর এই রূপের নেশা আমাকে আস্ত একটা পাগল বানিয়ে ছেড়েছে! প্রমিস করছি জান, আর কখনো তোকে এভাবে কষ্ট দেব না। কালকে রেডি থাকিস, চিরতরে এই শুভ্রের হওয়ার জন্য। আজকের পর থেকে আমাদের জীবনের প্রতিটি সকাল হবে তোর আর আমার, প্রতিটি দুপুর হবে তোর আর আমার, আর প্রতিটি রাত হবে শুধু তোর আর আমার বুকের স্পন্দনের। আই লাভ ইউ আমার রোহিণীশ, আই লাভ ইউ সো মাচ! নিজের জীবনের চেয়েও, এই নিজের অস্তিত্বের চেয়েও অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি তোকে।”
কথাগুলো শেষ করে শুভ্র বালিশের পাশ থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে টাইম দেখল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রাত ২:৪০। এতক্ষণে নিশ্চয়ই রিদিদের বাড়ির মেহমান আর আত্মীয়-স্বজনরা যে যার রুমে চলে গেছে এবং পুরো বাড়িটা নিঝুম হয়ে এসেছে। শুভ্র আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করা ঠিক মনে করল না।

সে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। তারপর চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে পাইপ বেয়ে অত্যন্ত সাবধানে তরতরিয়ে নিচে নেমে এল। নিচে নেমে মেইন গেটের দিকে এগোতেই দেখল রাতের দারোয়ান ব্যাটা চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছে। শুভ্র আলতো করে একটু কেশে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং কোনো কথা না বাড়িয়ে দারোয়ানের হাতে কিছু কড়কড়ে টাকার নোট গুঁজে দিল। মাঝরাতে এমন বকশিস পেয়ে দারোয়ানের চোখের ঘুম এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল! সে খুশিতে গদগদ হয়ে দাঁত কেলিয়ে একটা স্যালুট ঠুকল এবং গেটের তালাটা খুলে দিল। শুভ্র এক বুক প্রশান্তি আর উন্মাদনা নিয়ে মাঝরাতের ফাঁকা, শান্ত রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
২০ মিনিটের মধ্যে বাইক চালিয়ে সোজা বাড়ির সামনে এসে থামল শুভ্র। গাড়ির বিকট শব্দে দারোয়ান তড়িঘড়ি করে দৌড়ে এসে গেট খুলে দিল। শুভ্র বাইকটা রেখে হনহন করে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। হল রুমে তখনো ঝলমল করে আলো জ্বলছে, যার মানে বাড়ির সবাই এখনো জেগে আছে। শুভ্রকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই সোহান চৌধুরী বেশ গম্ভীর গলায় বললেন,

“এত রাতে তোর কিসের কাজ ছিল শুনি?”
শুভ্র এক সেকেন্ডের জন্যও দাঁড়াল না। সে সিঁড়ি দিয়ে তরতরিয়ে উঠতে উঠতে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“রিদির কাছে গিয়েছিলাম আব্বু। এতক্ষণ ওর কাছেই ছিলাম। একটু পরে এসে কথা বলছি।”
বলেই শুভ্র নিজের রুমে ঢুকে ধড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। এদিকে হল রুমে বসে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সামনে সোহান চৌধুরী লজ্জায় যেন একদম মাটির সাথে মিশে গেলেন! কতটা নির্লজ্জ আর বেহায়া ছেলে হলে সবার সামনে এমন একটা সত্যি কথা এভাবে সটান বলে দেয়।
রুমে ঢুকে শুভ্র আলমারি থেকে একটা তোয়ালে বের করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। শার্ট-প্যান্ট খুলে কোমরে তোয়ালেটা পেঁচিয়ে সে শাওয়ারটা ছেড়ে দিল। কিন্তু শাওয়ারের ঠান্ডা পানিটা পিঠে লাগামাত্রই পুরো পিঠ যেন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল! তীব্র যন্ত্রণায় সে বাথরুমের ভেতর চেঁচিয়ে উঠল,
“আআহ শিট!”

শুভ্র তড়িঘড়ি করে পানির কলটা বন্ধ করল। তারপর ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়নাটার সামনে গিয়ে নিজের পিঠটা ঘুরিয়ে তাকাতেই তার চোখ একদম কপালে উঠে গেল!
পিঠ জুড়ে লম্বা লম্বা নখের বিশ্রী আঁচড়। ধারালো নখের টানে শুভ্রের পিঠের চামড়া ছিঁড়ে লাল টকটকে রক্ত বেরিয়ে এসেছে, কিছু জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে আছে। পিঠের এই ক্ষতবিক্ষত অবস্থা দেখে শুভ্রের বুঝতে আর এক মুহূর্তও বাকি রইল না যে, তার তীব্র উন্মাদনা সামলাতে রিদি তার পিঠে এই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে!সে বিরক্তিতে দাঁত কিড়মিড় করে নিজের পিঠের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শালার শা’লি আবার বড় বড় কথা আমাকে নাকি সামলাবে! এক রাতেই পিঠের যে অবস্থা বানায় দিছে, ওর কাছে আবার গেলে তো আমারে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না! দেখতে একদম পুটি মাছের মতো, অথচ নখের কী ধার! বাপের জন্মেও এমন পুটি মাছ দেখি নাই!”

শুভ্র কোনোমতে শাওয়ার শেষ করে একটা হালকা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে নিচে নেমে আসলো। হল রুমে পা রাখতেই দেখল ড্রয়িংরুমে পুরো চাঁদের হাট বসে আছে। এক কোণায় শুভ্রা, মিহি আর পাখি তিন বান্ধবী মিলে ফিসফিস করে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আরেক কোণায় ঈশান, রিফাত আর তূর্য আড্ডা দিচ্ছে। সোফায় বসে আছেন তূর্যের বাবা-মা, রিফাতের বাবা-মা এবং অন্যান্য দূর-সম্পর্কের আত্মীয়স্বজন। শুভ্রকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই সোহান চৌধুরী বেশ গম্ভীর গলায় ডাকলেন,
“শুভ্র, এদিকে আয়।”
শুভ্র কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ এসে সোফার একপাশে বসলো। তার বসার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বেশ শান্ত। সোহান চৌধুরী গলাটা একটু ঝেড়ে বললেন,

“আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুভ্র।”
শুভ্র কপালে হালকা ভাঁজ ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিসের সিদ্ধান্ত, আব্বু?”
সোহান চৌধুরী তূর্যের বাবার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলেন, তারপর শুভ্রর দিকে ঘুরে বললেন,

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৬

“আমি আর তূর্যের বাবা দুজনে মিলে ঠিক করেছি যে তূর্যের সাথে শুভ্রার বিয়ে দেবো। আমি অনেক ভেবে-চিন্তে দেখেছি, তূর্য ছেলে হিসেবে অনেক ভালো আর গোছানো। তাছাড়া ও তোর নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড, তাই তুই আমার চেয়েও তূর্যকে অনেক বেশি ভালো করে চিনিস। আশা করি এই বিয়েতে তোর অন্তত কোনো আপত্তি থাকবে না।”

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here