Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া পর্ব ৩৯

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৩৯

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৩৯
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

____”ড.মিরাজ।পেশেন্ট এর হার্টবিট ফিরেছে…”
মিরাজ হতাশ হয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলো অনেকটা।নার্স এর উত্তেজিত কন্ঠে লাফিয়ে এসে তাকালো মনিটর এর দিকে।মুখ দিয়ে দুটো শব্দই বেড়িয়ে এলো।
____”আনবিলিভেবল,আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। ”
সবাই আরেকদফা ব্যাস্ত হলে অয়নকে নিয়ে।মিরাজের হাত-পা থরথর করে কাঁপছে এখনো।গোটা চিকিৎসা জীবনের এতো বছরের সফল ক্যারিয়ারে এতো হতাশ তার কখনো লাগেনি।সবটা নিয়ন্রনে এলে ড.মিরাজ অন্য ডাক্তার কে ইশারা করে নিজে ধপ করে বসে পরলেন খানিকদূরের চেয়ারে।বন্ধুর দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকালো।বিরবির করে আওড়ালো,
____”এতবছর পর আমাদের প্রথম দেখা এভাবে হবে ভাবিনি বাডি…একদম ভাবিনি।সুস্থ হয়ে ওঠ।সকল মান অভিমান এর অবসান ঘটুক আমাদের। ”

আচমকা নিথর হলো শিয়া।প্রিয়া আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিলো বোনকে।শিয়ার বোধহয় শ্বাসপ্রশ্বাস ও বন্ধ হলো।প্রিয়া চিৎকার করে উঠলো।পাশেই ছিলো সকলে।রেনুকা রহমান মেয়ের নিথর হাত উঁচু করে ধরলেন।আকাশ এসে ঝড়ের গতিতে কোলে তুলে নিলেন।বাইরের অবস্থান রত নার্স ততক্ষণে ডেকেছেন ডাক্তারকে।মিরাজ দু হাতে মুখ ডলে সবেই উঠে দাড়িয়েছে অয়নের দিকে যেতে।নার্স হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে।
____”স্যার।পেশেন্ট এর ওয়াইফ…
বাকিকথা নার্সকে বলতেও হলো না।মিরাজ ছুটলো বাইরে।আকাশ ততক্ষণে শিয়াকে শুয়িয়ে দিয়েছে স্ট্রেচারে। অ্যাসিসটেন্ট ডাক্তার এর পিছু পিছু ছুটছে অন্য ওটিতে।মিরাজ দ্রুত এসে চেক করলো।চিৎকার করে আদেশ ছুড়লো জুনিয়র ডাক্তারদের।
____”বলতে পারছি না সম্ভবত ম্যাসিভ হার্ট অ্যাাটাক।ওটি রেডি করুন। জলদি।”
ওটিতে ঢোকার আগে বাইরের শোকে পাথর হয়ে যাওয়া সকলের দিকে ফিরে বললো,
____”অয়ন এর পালস পাওয়া গিয়েছে। “

এত এত দুঃসংবাদ এর মধ্যে এই সংবাদে বাইরের অপেক্ষাকৃত সকলে খুশিতে চিৎকার করে উঠলো প্রায়।খোদার কাছে শুকরিয়ায় ব্যাস্ত।তবে সে খুশি মানানের মতো মনের অবস্থা কারোরই হলো না শিয়ার এহেন অবস্থায়।
শিয়ার অপারেশন থিয়েটার এর বাইরে দেড় ঘন্টা হলো অপেক্ষা করছে সকলে।রেনুকা রহমান স্বামী কে জড়িয়ে ধরে কাদছেন অনবরত।আনিসুল রহমান শোকে পাথর। কথা বলতে ভুলে গিয়েছেন।তার ভুলের জন্য এমন হলো আজকে তার কলিজার টুকরো মেয়েটার সাথে! অপরাধবোধে জর্জরিত তিনি।
প্রিয়া দু হাতে মুখ গুজে আছে।তাকে দু পাশ থেকে জড়িয়ে আছে রাকা আর তুষি।তারা এসেছে মিনিট দশেক হলো।আকাশদের ফ্যামিলির সকলের আসতে আনুমানিক আর মিনিট বিশেক সময় লাগবে।আকাশ,রাতুল, রেদোয়ান এরই মধ্যে অয়নকে দেখে এসেছে।কিছুক্ষণ আরও অবজারভেশনে রেখে স্পেশাল কেবিনে দেওয়া হবে।আপাতত সবাই অধীর আগ্রহে শিয়ার একটা ভালো খবরের অপেক্ষায়।
ডাক্তার মিরাজ এবং সাথে অন্য একজন সিনিয়র ডাক্তার বের হতেই ছুটে গেলো সকলে।ডাক্তার মিরাজের চোখ রক্তলাল।একসময়ের ভালোবাসার মানুষ আর প্রিয় বন্ধুর এ অবস্থার চিকিৎসা তাকে নিজ হাতে দিতে হচ্ছে। এর থেকে বড় মানসিক ট্রমা হয়না।
গম্ভীর গলায় আকাশের দিকে ফিরে বললো,

____”অয়নের বিষয়টা মিরাকল।আলহামদুলিল্লাহ। হি ইজ আউট অব ডেঞ্জার নাও।কিন্তু…
মিরাজের এক কিন্তুতে নড়েচড়ে উঠলো সকলে।বুকের ভিতরে অজানা আশংকায় ভরে গেলো।আকাশ ব্যাস্ত হলো,
____”কিন্তু কি মিরাজ ভাই? শিয়া ঠিক আছে?”
____”পেশেন্ট নিজে রেসপন্স করতে চাইছে না।”
হু হু করে কেঁদে উঠলেন রেনুকা।আনিসুল রহমানের ধৈর্যেরও বাধ ভাঙলো।প্রিয়া ফুপিয়ে উঠলো রাকাকে জড়িয়ে। ড.মিরাজ নরম গলায় বললো,
____”অয়নের বেচে থাকার খবর ওকে দিতে হবে।না হলে যথাসম্ভব ও চাইবে না। আমরা খানিক পর দুজনকেই আলাদা আলাদা কেবিন এ শিফট করবো।কঠোর মনিটরিং এ রাখা হবে।বাকিটা খোদা জানেন।”
হসপিটালে আকাশের পরিবার যখন পৌছুলো তখন বেশ রাত।আকাশের পুরো পরিবারই এসেছে।তার বাবা চাচারা রওনা দিয়েছেন বিদেশ থেকে।কাল রাতে পৌঁছুবেন দেশে।ছেলের খবর পেয়ে একপ্রকার ছুটে আসছেন তারাও।বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে একমাত্র আরাফই ছিলো।তাই প্লেনের টিকিট কেটে আসার কথা মাথায় আসেনি কারোরই।আমেনা চৌধুরী কেঁদেকেটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে।অবশ্য সকলেরই একই অবস্থা। চিৎকার করতে করতে এসে জড়িয়ে ধরলেন আকাশকে।আকাশ মাকে জড়িয়ে নিলো বুকে।

____”ভাইয়া ঠিক আছে এখন মা।ইট’স ওকে।কাঁদে না।”
____”আমার জন্য আমার ছেলেটার এ অবস্থা। আমি যদি শুনতাম তোদের কথা। একটু শুনতাম।আমার ভুল আব্বা।মাফ করে দে তোরা আমাকে। “
আকাশ দু হাতে মায়ের চোখ মোছে।নরম গলায় বলে,
____”মা বাবারা রা কখনো সন্তানের ক্ষতির কারণ হয়না মা।এটা ভাগ্যে ছিলো।এখন ঠিক আছে তো।”
আমিনা চৌধুরী এদিক ওদিক তাকায়।ব্যাস্ত হয়ে খোঁজে কিছু একটা।
____”কি মা বলো।আমাকে বলো।ভইয়াকে দেখবে?”
আমিনা চৌধুরী নিজের কান্না আটকে বললো,
____”শিয়া কেমন আছে।ওরা বললো মেয়েটা…ওর বাবা মা…?”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।শিয়ার কথাটাও জানানো হয়েছিলো সবটাই বাড়িতে।আকাশ খানিকদূরে ইশারা করলো।কয়েক কামড়া পরেই শিয়ার কেবিন।সেটার বাইরে স্বামীর কাধে মাথা রেখে কেঁদে যাচ্ছেন রেনুকা রহমান। আমিনা চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে গেলো সেদিকে
আকাশের চাচিরাও গেলো পিছন পিছন।রেনুকা রহমান এর হাত ধরে প্রায় বসে পড়লেন তিনি।চমকে উঠলেন রেনুকা। অয়ন বা অয়নের পরিবার এর কারোর সাথে পরিচয় নেই তাদের।আসার পর আকাশকে চিনেছে অয়নের ছোট ভাই হিসেবে, তবে কথা বলার সময় হয়ে ওঠেনি এত এত ঝামেলার মধ্যে। আমিনা চৌধুরী হু হু করে কেঁদে যাচ্ছেন, রেনুকা রহমান এর অবাক মুখ পানে চেয়ে কোনোমতে বললেন,

____”আমাকে ক্ষমা করবেন।আ..আমি অয়নের মা।”
এখানে ক্ষমার প্রশ্ন কোত্থেকে আসছে।দোষ তো তারাও সমান ভাবে করেছে।রেনুকা দ্রুত হাতে টেনে তুললেন আমিনা চৌধুরী কে।জড়িয়ে ধরলেন তাকে।
পরিবার এর সবার মান অভিমান, আবেগের প্রকাশ পর্ব শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। অয়নের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। তবে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণ এ রাখা,একই ঘটনা শিয়ারও।দুই পরিবার বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছে।
মধ্যরাত এখন।ঘড়ির কাটায় রাত দুটো বেজে আঠারো মিনিট।দুই পরিবার এর কেউই হসপিটাল থেকে অন্য কোথাও যেতে রাজি হয়নি।রাকিব রা অনেকবার বলেছে তাদের সবাই নিয়ে কেটেজে যাবে।তবে ছেলেমেয়ে দুটোর এ অবস্থার মধ্যে কারোরই আরামে ঘুম দেওয়ার মন মানসিকতা নেই।রেদোয়ান নিচ থেকে খাবার এনে দিয়েছে।আকাশের ভাইবোন গুলো সেগুলো খেয়েছে হালকা পাতলা।বড়রা বেশিরভাগই কেউ খাবার মুখে তোলেনি।আকাশের মা, চাচি সহ প্রিয়ার মা এখন হসপিটালের নামাজঘরে তাহাজ্জুদ নামাজে ব্যাস্ত।আনিসুল রহমানও নামাজে। প্রিয়া এখনো রাকার কাধে মাথা এলিয়ে বসা।আকাশ অদূরে রাতুল,রাকিব দের সাথে বসে আছে।বারকায়েক তাকালো প্রিয়ার দিকে।প্রিয়া ভুলেও তাকাচ্ছে না তার দিকে।আচ্ছা প্রিয়া কি ভুল বুঝছে তাকে!না হলে তার সাথে একবারও কথা বলতে চাইলো না কেনো।তখন তো তাও বড় রা সবাই ছিলো এখন তো নেই।তাহলে!তাহলে মেয়েটা তার থেকে দূরে দূরে কেনো!বুকটা হাহাকার ভার হয়ে আসলো আকাশের।

ড.মিরাজ অয়নের রুম থেকে চেকআপ করে এসে ঢুকেছে শিয়ার রুমে।পালস রেট এখনো স্লো চলছে শিয়ার।জ্ঞান ফেরেনি এখনো।এসব ক্ষেত্রে রুগীর মনের জোর টাও খুব ম্যাটার করে।শিয়া একদম সেটা দেখাচ্ছে না।আইসিইউ এর দরজা আটকে শিয়ার পাশে চেয়ার টেনে বসলো মিরাজ।বুকটা জ্বলছে তার।আট বছর আগের শিয়া আর এখন কার শিয়ার মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পরলো না তার।তখনও মেয়েটা অয়ন বলতে পাগল আজও তাই!ভাবা যায়!
মিরাজের আজকে কোনো আক্ষেপ হয়না।বরং কেমন প্রশান্তি লাগছে মনের মধ্যে। শিয়াকে ভালোবাসতো সে।স্টুডেন্ট হিসেবে পড়াতো মেয়েটাকে অয়ন।অয়নের বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার প্রায়সই দেখা হতো শিয়ার সাথে। প্রচন্ড রকমের অবসেসড্ হয়ে পরেছিলো সে তার ওপর।কিন্তু যতদিন এ ভাবলো নিজের মনের কথা শিয়াকে জানাবে।ততদিনে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।অয়ন শিয়া একে অপরকে পাগলের মতো ভালোবাসে।বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ে সে।নিজের ভালোবাসার মানুষ ভালোবাসে তারই বেস্ট ফ্রেন্ড কে।দেশে থাকলে ডিপ্রেশন গ্রাস করতো তাকে।অয়নকেও কখনো সে জানতে দেয়নি শিয়ার প্রতি তার অনূভুতির কথাটা।আজও অজানা।সে ছাড়া এই কঠিন সত্যি কেউ জানেনা।ভাগ্যের কি খেলা!এত এত বছর পর দেশে ফিরে এমন একটা ঘটনার সাক্ষী হতে হলো তাকে।আজ আর কোনো রাগ হচ্ছে না অয়ন শিয়ার ওপর।অয়নের আজকে বাচারই কথা ছিলো না।মিরাকল ঘটেছে।খোদা ওদের দুজনকে বানিয়েছে একে অপরের জন্য। নিজের অজান্তেই গড়িয়ে পরে চোখ থেকে কয়েকফোটা অশ্রু।হাতের উল্টো পিঠে মুছে ফেলে।শিয়ার মাথায় হাত বুলায়।ধীর গলায় বলে,

_____”এইযে আমার না হওয়া ভালোবাসা।এতো সহজে হেরে গেলে চলবে হুম?আপনার জন্য তো সে বেচারা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ঠিক ফিরে এলো।এখন আপনি তাকে ফাঁকি দিতে চাচ্ছেন!লাল শাড়ি সাদা হতে পারে না।কখনো পারে না।ফিরে এসো কেমন?না হলে আমিও অপরাধী হয়ে যাবো তোমাদের একসাথে করে না দেওয়ার অপরাধে।বেঁচে থাকো কেমন?বাঁচিয়ে রাখো ভালোবাসা।”
মিরাজ বের হয়ে এগিয়ে গেলো আকাশদের দিকে।আকাশ উঠে দাড়াতে যাওয়ার আগেই কাধ চেপে আকাশকে বসিয়ে নিজে বসলো আকাশের পাশে।রাতুল,রাকিব,রেদোয়ান ওরাও একসাথে। অনেকবছর পর দেখা হলো সবার সাথে। আকাশ ধীর গলায় বললো,

____”ওদের কি অবস্থা ভাই।”
মিরাজ কাধে হাত রাখে আকাশের।মলিন গলায় বল,
____”আপাতত তো বলা যাচ্ছেনা।অবস্থা তো ঠিক আছে।তবে জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করতে হবে।অয়নের অবস্থা সকালের মধ্যে বেশ উন্নতি হবে বলে আশা রাখছি।কিন্তু শিয়াকে নিয়ে আমরা টেনশনে।”
মুখ চুপসে আসে সবার।মিরাজ ব্যাস্ত হয়ে বলে,
____”তবে আশা হারাতে বলছি না কিন্তু। অয়ন যদি এ অবস্থা থেকে ফিরতে পারে।আল্লাহ যদি ওকে ফেরায়।তাহলে শিয়ার ক্ষেত্রেও অসম্ভব নয়।খোদাকে ডাক।আর আমার শতভাগ চেষ্টা আমি করবো।”
____”আমি ওদের দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছি।”
____”অতোটা ধকল ওদের দুজনের কারোর শরীরই নিতে পারবো না।চিন্তা করিস না ভাই।দরকার হলে বিদেশ থেকে ডাক্তার আনাবো।ডোন্ট ওয়ারি।”
মিরাজ উঠে দাড়াতেই ছুটে সামনে এলো প্রিয়া।পিছন পিছন রাকা আর তুষি।রাকা,তুষি কে চিনলেও প্রিয়াকে চিনতে পারলেন না মিরাজ।প্রিয়া কেঁদেকেটে চোখ ফুলিয়ে একসাড় করে বসে আছে।মিরাজকে পেয়েই বোনের খোঁজ নিতে ছুতে এসেছে।

____”ডক্টর আমি কি একবার আপুর সাথে দেখা করতে পারিনা?”
মিরাজ অপ্রস্তুত হলো।আপু! তার মানে শিয়ার সেই ছোট্ট বোনটা।কত্ত বড় হয়ে গেছে! তখন বোধহয় নয় -দশ বছর ছিলো।তখনও পুতুল ছিলো এখনও তাই।ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদছে।মিরাজ প্রিয়ার মাথায় হাত রাখলো,
____”ডাক্তার ছাড়া কারোর তো পারমিশন নেই বোন।”
____”প্লিজ একবার।”
মিরাজ আলতো মাথা নাড়লো।নরম গলায় বললো,
____”অল্পকিছুক্ষন কেমন?”
প্রিয়া সজোরে মাথা নাড়লো।মিরাজ ইশারা করলো তার সাথে যাওয়ার।প্রিয়া ছুটলো পিছু পিছু।
বোনের এমন অবস্থা দেখে দু হাতে মুখ চেপে ধরলো সে।কান্নার শব্দ আটকানোর চেষ্টা। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বসলো ছোট চেয়ারটায়।বুক চিড়ে কান্না আসছে তার।কি থেকে কি হয়ে গেলো এক নিমিষের মধ্যে। কখনো এমন দুর্দিন কল্পনা করেছিলো তারা!ভেবেছিলো এমন কঠিন অবস্থা! ভাবেনি তো।অয়ন আর শিয়ার বিষয়ে সবটা জানার পর কত খুশি হয়েছিলো সে।কত স্বপ্ন সাজিয়ে ছিলো তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।একবাড়ির বউ হবে,আজীবন একসাথে বাচবে।কত কি!মিরাজ ঘরের এক কোনে দাড়ানো।মলিন মুখে তাকিয়ে সেদিকে। প্রিয়া কাঁদছে। মুখ চেপে ধরা।মেয়েটার জন্য ভীষন মায়া হলো মিরাজের।কান্নার তোড়ে ছোট্ট শরীরটা দুলে উঠছে,তাও শব্দ করে কাদছে না।প্রিয়া মুখ নিচু করে ছোট্ট চুমু দিলো বোনের হাতের ওপর।মাথা ঠেকালো হাতের পাশে বিছানার ওপর।আধো আধো গলায় কান্না আটকে বললো,

____”ভালোবাসা মানে একসাথে বাচা,একসাথে মরা।তুই আমার মতো এটা কবে থেকে মানা ধরলি হ্যা?অ্যাই আপু।তুই ও ছেড়ে চলে যেতে চাইবি?হ্যা?এতো স্বার্থপর কেনো হচ্ছিস তোরা সবাই।তুই, অয়ন ভাই একসাথে আমাদের ছেড়ে ওপারে সংসার পাতার প্ল্যান করছিস না?আমি কিন্তু মানবো না সেটা।একদম মানবো না।আমাদপর তো চারজনের এক ছাদের নিচে সংসার হবে বল।গোটা জীবন বোন থেকে জা হয়ে আগলাবি আমাকে তুই।মা বাবা কে ছাড়া আমার দিন কেটে যায়,তোকে ছাড়া চলে না আপু।ডাক্তার বলছে তুই রেসপন্স না করছিস না।কেনো করছিস না?আমার কথা ভাববি না তুই একবারও?হ্যা?আয়না ফিরে। তোকে না জ্বালালে আমি গোটা জীবন পারি দেবো কিভাবে।আপু…অ্যাই আপু।আমি, আকাশ, তুই, অয়ন ভাই।একসাথে একটা সুন্দর সংসার পাতবো।আমদের.. আমাদের ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা হবে।বল!তোর বাচ্চা আমাকে কি ডাকবে?আপু?উঠবি না?হ্যা?”
মিরাজ স্তব্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছে প্রিয়ার মৃদু আর্তনাদ। বুঝতে বাকি রইলো না আকাশ আর প্রিয়ার সম্পর্কে। কি এক দূর্দশা দুই পরিবার এর ওপর এসে হাজির হলো।মিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে খোদাকে ডাকলেন।এ অবস্থায় একমাত্র খোদাই ভরসা..

শেষরাত্রীর এখন।বয়যেষ্ঠ রা সকলেই নামাজের ঘরে নামাজ পরে রেস্ট নিচ্ছে সম্ভবত।রাতুল খাবার দিয়ে এসেছে।এদিককার খবর এখনো ভালো শুনে মায়েরা শান্ত হয়েছে। আকাশের সব ভাইবোন গুলোর জন্য রেস্টরুম ব্যবস্থা করে দিয়েছে মিরাজ।অয়নের অবস্থার উন্নতি হয়েছে বেশরকম।শিয়ারও তাই।।রাকিব,রেদোয়ান, রাকা,তুষি, রাতুল সকলে বসে আছে একসাথে। তাদের ক্লান্তি নেই।বন্ধুর এ বিপদে ঘুমানোর কথা ভাবতেও পারে না তারা।আকাশ ডাক্তার এর রুম থেকে বেড়িয়ে এসে বসলো বন্ধুদের কাছে।এদিক ওদিকে তাকিয়ে প্রিয়াকে খুঁজলো। মেয়েটাকে মনে হচ্ছে জনম জনম ভর হয়ে গেলো কাছে পায়না সে।মনটা ছটফট করছে।বুকের ভিতরটা পুড়ে যাচ্ছে।এতো এতো অশান্তির মাঝে ওই একটা মুখ যেটা দেখলে তার হৃদয় ঠান্ডা হয়।প্রিয়াকে দেখতে না পেরে রাকার দিলে ফিরলো আকাশ।প্রিয়া এতক্ষণ ওদের সাথেই ছিলো।

____”প্রিয়া কোথায়?”
রাকা হাতের ইশারায় দেখালো কিছু দূরেই একটা বেলকনি।হসপিটালের ব্যাক সাইট ওটা।
____”ওখানে দাড়িয়ে। “
রাতুল এগিয়ে এসে টেনে দাড় করালো আকাশকে।গম্ভীর গলায় বললো,
____”মেয়েটার মন খারাপ।তোকে দরকার ওর।যা কাছে যা।আমরা এদিকে আছি।খেয়াল রাখবো এদিকটা।”
মাথা নাড়ে আকাশ।ধীর পায়ে এগিয়ে যায় করিডর পার হয়ে।এপাশটায় রুগী নেই কোনো।সম্ভবত হসপিটালের কাগজপত্রের ভান্ডার আশপাশের সবগুলো রুম জুড়ে।অপ্রোয়জনীয়, পরিত্যাক্ত।এদিকটায় সিসিটিভিও নেই!।আলো নেভানো এদিকটার।আকাশ শব্দহীন এগিয়ে গিয়ে দাড়ায়। প্রিয়া চুপচাপ দাড়িয়ে আছে।বেলকনি থেকে সামনেই রাস্তা। প্রচুর গাছপালা চোখে পরছে।আকাশে চাঁদ উঠেছে।বিধায় একদম অন্ধকার নয়।আকাশ স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো।বুকের বা পাশে ঢিপঢিপ করছে।আচ্ছা আজকের এ অবস্থার জন্য কোনোভাবে সে দায়ি!সে পারতো না সবটা সামলে নিতে!প্রিয়াও কি তাই মনে করবে।

____”কাছে আসুন।”
আচমকা প্রিয়ার কন্ঠে চমকে গেলো আকাশ।প্রিয়া যেমন দাড়িয়ে আছে তেমনই দাড়ানো এখনো।সে প্রিয়ার আশেপাশে থাকলে প্রিয়া নাকি টের পায়।আকাশের শরীরের ঘ্রানে,কখনো বা বুকের বা পাশের ছটফট দেখে।কথাটা প্রিয়া আগেও বলেছে।বারবার প্রমানও পেয়েছে আকাশ।তার সাথেও একই বিষয় হয় কিনা আবার!সেও তো টের পায় প্রিয়ার অস্তিত্ত।আকাশকে কাছে আসতে না দেখে ঘুরে দারালো প্রিয়া।রেলিং এ পিঠ ঠেকিয়ে দাড়ালো।তাকালো আকাশের দিকে।অস্বাভাবিক বিধ্বস্ত অবস্থা। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। গায়ের সাদা শার্টটা এলোমেলো, ওপরের বোতাম দুটো খোলা।চোখমুখ শুকনো,।ফর্শা মুখটা লাল, কালচে হয়ে আছে।চোখদুটো খেয়াল করলো প্রিয়া।ইশশশ মানুষ টাকে এভাবে দেখে অসহ্যকর অনূভুতি হলো তার।
গম্ভীর গলায় বললো,

____”কাছে আসতে বললাম না?”
আকাশ যেনো বাধ্য পুরুষ।ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো প্রিয়ার কাছে।তবে বেশ দুরত্ব রেখেই দাড়ালো।প্রিয়া চোখমুখ কুচকে ফেললো।আকাশ তাকালো তার মুখের দিকে।হালকা কাজের একটা থ্রি পিচ পড়া।ওড়না টা গলায় ছড়িয়ে দেওয়া।চুলগুলো খুব ঢিলে করে খোপা করা।সামনের বেবি হেয়ারগুলো সে খোপা ছেড়ে বেড়িয়ে বাইরের বাতাসে উড়ছে।ফোলা ফোলা ফর্শা মুখটা কান্নার চোটে ফুলে আছে,নাকের ডগা লাল।এতক্ষণও কাদছিলো সম্ভবত। আকাশকে ওভাবে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ভালো লাগলো না প্রিয়ার।সে অন্য কিছু চাইছে এখন।

____”কাছে আসছেন না কেনো?অগোছালো, নোংরা লাগছে আমাকে?”
আকাশ দুদিকে মাথা নাড়লো।প্রিয়ার মানুষ টাকে দেখে ভীষন কষ্ট হচ্ছে।কেমন অসহায় হয়ে দাড়ানো।
____”তাহলে কাছে আসছেন না কেনো আমার।”
____”যাওয়ার পারমিশন আছে এখনো?”
প্রিয়া অবাক হয় আকাশের কথায়!এ আবার কি ধরনের কথা!পরক্ষণেই মনে পরে সন্ধ্যায় আকাশের সাথে তার করা খারাপ ব্যবহার এর কথা।ছ্যাত করে উঠলো বুকের বা পাশে।আকাশ রাগ করেছে তার কথায়!চোখ ছলছল করে উঠলো।টুপটাপ দু ফোটা পানি গড়িয়েও পরলো।আকাশ এগোলো না তবুও।ওভাবেই দাড়িয়ে রইলো।প্রিয়া ফুঁপিয়ে উঠলো এবারে। আকাশেরও আর সহ্য হলো না।দুরত্ব ঘোচালো।একদম মিশে গিয়ে দাড়ালো।ব্যাস্ত হাতে মুছে দিলো প্রিয়ার চোখের পানি।

____”কাঁদছেন কেনো ম্যাডাম?বকলামই তো না।”
প্রিয়া দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আকাশকে। বুকের মধ্যে মুখ লুকালো যেনো।ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে বললো,
_____”আর জীবনেও আপনার ওপর ওভাবে কথা বলবো না আমি।তখন আপনার সাথে আমি…আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
আকাশের হাত এখনো তাকে স্পর্শ করেনি।প্রিয়ার অস্থির লাগলো। এত রেগে আছে আকাশ তার ওপর!মুখ তুললো না বুক থেকে বরং নাক ঘসলো আকাশের উন্মুক্ত বুকে।আকাশ চোখ বন্ধ করে ফেললো।বোকা মেয়েটা কি বোকা বোকা কথাই না বলে!সে থাকবে রেগে!তাও তার প্রেয়সীর ওপর!এও হয়!সম্ভব! প্রিয়ার নাকের পানি,চোখের পানিতে ভিজে একাকার হচ্ছে আকাশের বুক।ঠান্ডা অনূভব হচ্ছে।
____”নাকের পানিতে তো আবার জামাকাপড় একেবারে…
প্রিয়া চট করে মুখ তুললো।সত্যিই তাই।নাকের পানিতে আকাশের বুকের ওপরের যা তা অবস্থা। দ্রুত হাতে নিজের ওড়না দিয়ে মুছে দিলো সেখানটা।আকাশ নিশব্দ হাসলো।প্রিয়া ওড়না দু হাতে খামচে ধরে দাড়িয়ে রইলো।ধীর গলায় বললো,

____”রেগে আছেন আমার ওপর?
____”উহু।”
____”তাহলে?”
____”তাহলে কি?”
____”এমন করছেন কেনো?সরি বললাম তো।”
আকাশ ধীর গলায় বলে,
____”আমি কেমন করলাম।তুমিই তো ভুলেও একবার তাকাচ্ছিলে না আমার দিকে।”
প্রিয়ার নিচু মাথা সহসা উচু হয়।নজরে নজর মিলায় না।সে পারে না।আকাশের ওপরের খোলা বোতাম দুটোর দিকে তাকিয়ে বলে,
____”আমি তখন আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। তাই তাকাতে পারছিলাম না।তাছাড়া..
আকাশ সঙ্গে সঙ্গেই বলে,
____”তাছাড়া কি?”
প্রিয়ার হাত শক্ত করে ধরা তার ওড়না টা।মৃদু গলায় বলে,
____”তাছাড়া আপনি কষ্ট পাচ্ছিলেন।আমি আপনার কষ্ট দেখতে পারছিলাম না।আমার বুকটা…আমার বুকটার ভিতর ঝড় হচ্ছিলো আপনাকে ওভাবে দেখে।”
আকাশের বুকের পাথর বোধহয় অনেকগুলো নেমে গেলো প্রিয়ার এ দু লাইনের কথায়।শিথিল হয় শরীর।নরম গলায় বলে,

____”একই অপরাধবোধে আমিও যাইনি তোমার কাছে।তাছাড়া এতো এতো ঝামোলয় সময় কোথায় পেলাম বলো।”
প্রিয়ার বুকটাও শান্ত হয় আকাশের নরম গলায়।আকাশ তার মানে রেগে নেই তার ওপর। হাতের উল্টোপিঠে চোখ মোছে।বাইরের আবহওয়া টা এই মূহুর্তে চমৎকার। দূরে ঝি ঝি পোকার ডাক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে,আকাশের চাঁদ তারার খেলা।তারা দাড়িয়ে আছে হাসপাতালের সাত তালার বেলকনিতে।স্তব্ধ এদিকটাম একদম।আকাশ আর সে ছাড়া এই মূহুর্তে কেউ নেই।অশান্ত বুকটা শান্ত করতে আকাশকে কাছে দরকার তার।লজ্জা লাগছে তার খুব।তবে আকাশের মুখের দিকে তাকাতেই সব জড়তা কেটে গেলো।আকাশ দু হাত পকেটে গুজে অসহায় এর মতো আকাশের ওই চাঁদটার দিকে তাকানো।কি যে মায়াভরা মুখটা এই পুরুষ এর।প্রিয়া দু হাত বাড়িয়ে দিলো।ধীর গলায় বললো,

____”কাছে আসবেন একটু?”
আকাশের ধ্যান ভাঙলো। নির্বিকার তাকালো প্রিয়ার দিকে।প্রিয়া তখনো দু হাত বাড়ানো তার দিকে।আকাশ এর আচমকা ঘন হলো শ্বাস প্রশ্বাস।ঝট করে একদম ঘেষে গিয়ে দাড়ালো প্রিয়ার সাথে। আকাশের বুকে এসে ঠেকলো প্রিয়ার মাথা।প্রিয়া মাথা তুলে তাকালো।আকাশের ঘোরলাগা দৃষ্টি দেখলো।পায় ভর দিয়ে উঁচু হলো।মুখ ডোবালো আকাশের কন্ঠদেশে।আলতো চুমু একে ঘনঘন শ্বাস টেনে নিচ্ছে।আকাশের চোখ বুঝে এলো।দু হাত আকড়ে ধরলো প্রিয়ার কোমড়।উঁচু করে বসালো প্রস্যস্ত রেলিং এ।প্রিয়ার কে তার কাজ করতে দিলো।প্রিয়া আকাশের শার্টের আরেকটা বোতাম খুলে ফেললো।আকাশ বাধা দিলো না।তবে ঝট করে খেয়াল করলো আশেপাশে সিসিটিভি আছে কিনা..নেই।আসার আগে কি মনে করে খেয়াল করে।এসেছে।এদিকাটায় সত্যি সিসিটিভি নেই।সম্ভবত এপাশটা পরিত্যাক্ত বলে।প্রিয়া অনবরত ঘ্রান টেনে নিচ্ছে আকাশের শরীরের।চোখ বুঝে আছে আকাশ।প্রিয়ার নরম ঠোঁটের স্পর্শ তার বুক,কন্ঠদেশ, ঘার সবখানে।আর সহ্য করতে না পেরে উন্মুক্ত ঘাড় চেপে ধরলো নিজের শক্ত হাতে।পিছিয়ে আনলো প্রিয়াকে।হাস্কিস্বরে বললো,

____”কি করছো? “
প্রিয়া দু হাতে খামচে ধরলো আকাশের শার্টের কলার।হু হু করে কেঁদে ফেললো।আকাশ টেনে এনে মেয়েটার মাথা চেপে ধরে নিজের কাধে।প্রিয়া মুখ গুজে থাকে আকাশের গলায়।দু হাতে জাপটে ধরে রাখে গলাটা।কাঁদতে কাঁদতে বলে,
____”আ..আপনি..আমি…
আশকারা দিলো আকাশ।ধীর গলায় শুধালো,
____”আমি কি?হু?কাদছো কেনো?”
প্রিয়া আরও কিছুক্ষন কাদলো।মুখ তুললো না।
____”আপনারা দু ভাই কেমন ছন্নছাড়া। সেদিন আপনি ওভাবে আমার রাগ ভাঙাতে চলে এসেছিলেন। অয়ন ভাইয়ের মতো।ভাবতেই গা সিওড়ে উঠছে।আপনার…আপনার যদি আল্লাহ না করুক এমন কিছু হতো।আমিও…আমি মরে যাবো।”
প্রিয়ার ভয়,কান্নার কারণ বোঝে আকাশ।হাতের বাধন দৃঢ় করে।মানসিক ভাবে ভেঙে পরাটাই স্বাভাবিক মেয়েটার।আলতো হাত বুলায় প্রিয়ার পিঠে।নরম গলায় বলে,

____”সেসব হয়নি তো তাইনা?আর অয়ন ভাই,শিয়া ওরাও সুস্থ হবো ইনশাআল্লাহ। ডাক্তার বলেছে।দে আর বোথ আউট অব ডেঞ্জার নাও।”
প্রিয়া খুশি হলো ভীষন খুশি হলো।শক্ত করে আকাশের গলায় জড়িয়ে রাখলো।আকাশ হাসলো এবার।বাঁকা গলায় বললো,
____”সারাদিন ঘেমে নেয়ে একাকার আমি।এভাবে যে শ্বাস টানছো।ঘামের গন্ধ লাগছে না?”
প্রিয়া আকাশের কথায় দু দিকে সজোরে মাথা নাড়ে। উল্টো আরও গভীর ভাবে টেনে নেয় আকাশের ঘ্রান।
____”এই ঘ্রান আমার আজীবন লাগবে চৌধুরী সাহেব। নেশা চড়িয়ে দিয়েছেন এটার।এ ঘ্রান নিতে না পারলে আমার সব শূন্য লাগে। “
আকাশ হাসে নিশব্দ।প্রিয়া আচমকা মুখ তোলে।আকাশের শার্টের আস্তিন চেপে ধরে।চোখে চোখ রাখলো। এই বার দিয়ে হাতে গোনা তিনবার চোখে চোখ রাখলো প্রিয়া।বুকের ভীতর কিসের একটা ইশারা পেলো আকাশ।প্রিয়া এ সাহস কখন পায় জানে সে।তাই স্থির হয়ে সেও চোখে চোখ রাখলো।প্রিয়া টুপ করো একটা ছোট্ট চুমু খেলো আকাশের বা গালে।একে একে অন্যগাল,কপাল,নাক,গলা,বুক।সব জায়গায় ঠোটে ছোয়ালো। আকাশ চুপচাপ সায় দিলো মেয়েটার কার্যকলাপে।সোজা হয়ে বসলো প্রিয়া।আকাশ ঘোরলাগা চোখে পরখ করলো তিরতির করে কাঁপা প্রিয়ার চোখ,নাক,ঠোঁটজোড়া। কোমড় একহাতে শক্ত করে ধরে অন্য হাতে মুখের ওপরের ছোট ছোট চুলগুলো কানে গুজলো।শব্দ করে চুমু খেলো প্রিয়ার কপালে।আচমকা এবার নিজে মুখ গুজলো প্রিয়ার বুকে।আগলে ধরলো প্রিয়ার কোমড়।প্রিয়া ভয়ার্ত নজরে একবার ঘাড় কাত করে পিছনে দেখতে চাইলো।রোমান্সে চক্করে সাততালা থেকে পরে অপমৃত্যু না হয়।তবে তা হবে না।একে তো আকাশ তাকে ধরে আছে,অন্যদিকে রেলিঙ যথেষ্ট চওড়া।প্রিয়া হাত রাখলো আকাশের মাথায়।আকাশ চুপ করে আছে।

____”আজ সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করেছেন।রেস্ট নেবেন চলুন।মিরাজ ভাইয়া আমাদের সবার জন্য কেবিন দিয়েছেন।”
আকাশ উঠলো না।ধীর গলায় বললো,
____”আজ শরীরের ধকলের থেকে মানসিক ধকল বেশি হয়েছে।ওইসময় যখন ভাইয়ার পালস পাওয়া যাচ্ছিলো না…আমি তখন…তারপর আবার শিয়া…মনে হচ্ছিলো পাগল হয়ে যাবো আমি।”
প্রিয়ার চোখ টলমল করলো।আকাশের মতো পুরুষও এমন ভয় পায়!কষ্ট পায়!কখনো লোকটা প্রকাশ করেনা কারোর কাছে।অথচ আজ কি অবলিলায় প্রকাশ করে ফেললো তার কাছে।
____” আমাকে ছেড়ে যাওয়ার বায়না কখনো করবে না কেমন?আমিও ধ্বংস হয়ে যাবো প্রিয়া।কখনো যদি মনে হয় আমার সাথে সম্ভব হচ্ছে না থাকা, আমাকে আর ভালোবাসতে পারছো না।আলগোছে বিষ খায়িয়ে রেখে যেয়ো।ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারবনা কিন্তু আমি…
আচমকা আকাশের এহেন কথার কারণ ধরতে পারলো না প্রিয়া।অবাকই হলো বলা যায়।মিহি গলায় বললো,

____ “এ কথা কেনো বলছেন?”
____”ভাইয়া আর শিয়া কে আমরা সবসময় বলতাম মেড পর ইচ আদার।আমার জীবনে সেরকম কখনো কেউ আসেনি।আসবে কল্পনা তেও ছিলো না।ভাইয়ার অ্যাক্সিডেন্টের পর শিয়ার আর্তনাদ আমরা সকলে দেখেছি।ভাবতে পারো কতটা ভালোবাসা ওদের মধ্যে। মাঝখানে ছয় ছয়টা এবছর কেউ কারোর সাথে ছিলোনা।সামান্য যোগাযোগ টুকু অবধি ছিলো না।তার পরও…
দম নিলো আকাশ।জোরে জোরে শ্বাস টানলো প্রিয়ার বুকে।
____”শিয়ার যখন ওই অবস্থা হলো আমার মনে হলো এবার দুনিয়াটা আমাদের থমকেই যাবে।এমন জীবন আমরা কেউ চাইনি বলো?না ওদের আর না তো আমর তোমার…ভাইয়ার যখন পালস পাচ্ছিলো না তোমার যেমন মনে হয়েছিলো,একই ভাবে আমার চোখও তোমাকেই খুজছিলো তখন।মনে হলো ভাইয়ার কিছু হলে যেমন শিয়া বাচবে না।আমার কিছু হলে তোমাকে এতোটা কে ভালোবাসবে।তুমি বুঝি অন্য কারোর হয়ে যাবে!”
আকাশ মুখ তুললো।যেনো শেষ লাইনটা প্রশ্নই করলো প্রিয়াকে।প্রিয়া নিজের মাথা নিচু করে ঠেকালো আকাশের মাথার সাথে। চোখ দিয়ে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পরলো। আকাশের এমন অসহায় কথা কখনো শোনেনি সে।প্রিয়া দু হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে নেয় বিধ্বস্ত আকাশকে।আকাশ ছোট বাচ্চাদের মতো দু হাতে প্রিয়ার কোমড় জড়িয়ে বুকে মুখ গোজে।প্রিয়ার বুকটা প্রশান্তি তে ভরে ওঠে।আকাশের চুলে হাত বুলিয়ে আলতো চুমু খায় মাথায়।তারপর মুখটা আকাশের কানের কাছে এনে আচমকা ভীষন মিষ্টি গলায় গেয়ে উঠলো,

____ “তোমায় ছেড়ে বহু দূরে
যাবো কোথায়!
এক জীবনে এতো প্রেম
পাবো কোথায়! ”
আকাশের হাতের বাধন দৃঢ় হলে আরও।চোখটা জ্বালা করছে।এই মেয়েকে ছাড়া আকাশ এহনাজ এর মৃত্যু নিশ্চিত।প্রিয়া গান থামিয়ে আরেকটা চুমু আকলো আকাশের কানের লতিতে।নরম আর ভীষন আদুরে গলায় বললো,

____আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে আমার মৃত্যু হোক আকাশ এহনাজ চৌধুরী। গোটা একটা জীবন আমি আপনার নামে করে দিতে চাই,আপনার স্ত্রী পরিচয়ে বাচতে চাই।মৃত্যুর পর সেই হালাল স্ত্রীর অধিকারে খোদার কাছে আপনাকে চেয়ে নিতে চাই।দেবেন না আমাকে সে অধিকার, রাখবেন না আমার এই বায়না টা?হু?আমার কিন্তু একটা সংসার চাই।”
আকাশ প্রিয়াকে রেলিং থেকে নামিয়ে দাড় করায়।কোমড় ধরে উচু করে নেয়।প্রিয়াও গলা আকড়ে ধরে থাকে।
____”সব বায়না পূরন করবো পাখি।সব…আমাদের চারজনেরই সংসার হবে।তোমার আমার সংসার।প্রিয়া…তোমার সব বায়না আমি আমৃত্যু পূরণ করে যাবো।তুমি আমার,গোটা একটা জীবনে আমি তোমাকে হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারবো না।আর না তো মৃত্যুর পর যে অধিকার ছাড়বো আমি।”
____”ভালোবাসি আমি আপনাকে।পাগলের মতো ভালোবাসি।আপনাকে ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের ছোয়া আমি এ শরীরে পরতে দেবো না কখনো।আর না তো আপনি ছাড়া কখনো কারোর নামে কবুল পড়বো।আপনি আমার,পুরোটা আমার।”
আকাশ রক্তিম চোখজোড়া তোলে প্রিয়ার দিকে।দু হাতের আজলায় নেয় প্রিয়ার কান্নামাখা মুখখানা।শব্দ করে ছোট্ট চুমু খয় কমলার কোয়ার মতো গোলাপি অধরে।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৩৮

____”আমি খুব জলদি তোমাকে আমার নামে করে নিতে চাই প্রিয়া।ভাইয়া,শিয়া সুস্থ হলেই সাথে সাথেই।ধুমধাম করে আমরা দু ভাই তোমাদের দু বোনকে বৈধ স্বীকৃতি দিয়ে চৌধুরী বাড়িতে নেবো কথা দিলাম।”
প্রিয়া মাথা নাড়লো। কান্নাভেজা মুখটা এগিয়ে নিয়ে গাল ঠেকালো আকাশের গালের সাথে।
____”আমি কিন্তু একদম ভীতু চৌধুরী সাহেব। আজকে আমাদের সাথে যা ঘটলো তারপর থেকে আরও।হারানোর ভয় নিয়ে আমি বাচবো না কিন্তু। আমাকে নিজের হালাল স্বীকৃতি না দিয়ে যদি পালানোর বায়না করেন।আমিও কিন্তু ছাড়বো না আপনাকে বলে দিলাম।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৪০