Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৭

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৭

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৭
কায়নাত খান কবিতা

— ওজন কত তোমার?”
জিজ্ঞেসার দৃষ্টিতে কিংশুক অরিনের পানে তাকায়। কিন্তু অরিন তো কথা বলতে পারছে না। সেটা ও কিংশুকের কৃপায়।তাই চুপ হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তার।
–হুমম। লেমমি গেস। ৪৮?”
মাথা নেড়ে কিংশুকের কথায় সম্মতি জানায় অরিন। তার ওজন ৪৮।
–আমাকে সামলাতে পারবে?”
কিংশুকের কথার কোনো রেসপন্স করে না অরিন। সে চুপচাপ মাথা নামিয়ে দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয়। কিংশুক অরিনের দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নেওয়াকে তার লজ্জার প্রতিচ্ছবি হিসেবে ধরে নেয়। তাই আর ঘাটায় না অরিনকে। এমনিতে ও বিয়েতে আর তিন দিন বাকি।এখন অরিনের সাথে ফ্রী হওয়াটা জরুরি। কিংশুক অরিনকে নিয়ে সোজা গাড়ির উদ্দেশ্যে যেতে থাকে। অরিন ও চুপচাপ কিংশুকের গলা ধরে থাকে।

——যখন আপনি নিজের ভালোবাসাকে মনকে কন্ট্রোলে রাখতে পারবেন, তখন সেটা হবে প্রেম। কিন্তু যখন ভালোবাসা আপনাকে কন্ট্রোল করবে, একজন মানুষকে কাছে পাওয়ার তীব্র বাসনা আপনার মনকে কুড়ে কুড়ে খাবে তখন তাকে আনহেলদি অবসেশন বলে।
আর আনহেলদি কোনো কিছুই কারো জন্য মঙ্গল জনক নয়। একজন সাধারণ মানুষকে সাইকোপ্যাথে পরিনত করতে পারে।
একজন মানুষ যখন আরেক জন মানুষের প্রতি আনহেলদি অবসেশন অনুভব করে তখন তাকে নিজের কাছে রাখার জন্য পুরো পৃথিবীর সাথে একাই লড়াই করতে পারে।
যেমনটা হয়েছিল কিংশুকের সাথে। অরিন কিংশুকের এমন আনহেলদি অবসেশনে পরিনত হয়েছিল যাকে নিজের থেকে দূরে রাখার কথা মস্তিষ্কে আসলে ও মন ঠিক থাকে না। কিংশুক নিজে ও বুঝতে পারে না কি আছে এই মেয়ের মাঝে কেন সে এতো অসসেড এই মেয়ের প্রতি।

–গাড়িতে বসে অরিন বরাবরের মতোই দৃষ্টি রাখে অন্য দিকে। আপাতত কিংশুককে কোনো দিক দিয়েই তার মানুষ মনে হচ্ছে না। এই কয়দিনকে অরিন কিংশুকের এতো রূপ দেখেছে, কোনটা তার আসল রূপ সেটা ও সে জানে না।
প্রায় ৩৫ মিনিটের মতো সময় লাগে তাদের হসপিটাল থেকে খান ম্যানশনে যেতে। গাড়ি থামার সাথে সাথে অরিন বের হয়ে আসতে চাই। খুব দমবন্ধ লাগছে তার। মনে হচ্ছে জীবনটা তার কিন্তু চলছে আরেক জনের ইচ্ছেতে।
হালকা ডোর খুলতেই কিংশুক অরিনের বাহু ধরে তাকে নিজের দিকে টান দিয়ে নেয়।

— জানো আমরা ব্যাক সিটে ছিলাম। অনেক কিছুই চাইলে হতে পারতো। আমি কিন্তু পিউর ডার্ক ওটাপ্যাড লাভার।”,
কিংশুকের ইংগিত পূর্ণ কথায় কিছুটা ঘাবড়ে যায় অরিন। ওটাপ্যাডে কোন টাইপের ডার্ক রোমান্সেট বর্ননা থাকে সেটা খুব ভালো মতোই অরিনের জানা। তার উপরে রুশ মা-ফিয়া লাভারের গাড়ির সিন তো মোটামুটি সব ওটাপ্যাড লাভারেরই জানা। অরিন ও তার বাইরে নয়।
শুকনো ঢোক গিলে সে।শেষ কি-না বেছে বেছে সাইকোপ্যাথ + ডার্ক ওটাপ্যাড লাভারই তার কপালে জুটলো। মানুষিক রোগ থেকে কিংশুক ট্রিটমেন্ট নিলেই সেরে যাবে। কিন্তু এই দিক? এটা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি?
কিংশুক আর কিছু না বলে অরিনের হাত ছেড়ে দেয়। আজকের জন্য অরিনকে যথেষ্ট জালাতন করা হয়েছে। তার উপরে তার গলার ও বেহাল দশা।এখন আর তাকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। নিজেকে একটু টাইম দিতে হবে।
হাত ছাড়া পেতেই গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভিতরে চলে যায় অরিন। এতোক্ষণ শুধু বিরক্ত লাগছি তার।কিন্তু এখন এক অজানা ভয় ও মনে জেকে বসেছে। হয়তো এটাই কারো জীবনে আনহেলদি অবসেশন হয়ে যাওয়ার ভয়।
গাড়ির ভিতরে বসেই নিজের হাত এ পাশ ওপাশ করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে কিংশুক। তারপর খুব জোড়ে হাত থেকে স্মেইল নেয় সে। যেনো এখনো অরিনের শরীরের ঘ্রাণ লেগে রয়েছে তার হাতে। অনবরত কি’স করতে থাকে নিজের হাতে।

–আই লাভ ইউ জান।আই রেইলি লাভ ইউ।”
নিজের হাতে কি’স করতে করতে অরিনকে প্রেম নিবেদন করতে থাকে কিংশুক। এই বন্ধ গাড়ির ভিতরে তার উন্মাদনা কেউ না দেখলে, অবসেশন পুরো দুনিয়া প্রায় দেখে ফেলেছে।
সময় চলতে থাকে সময়ের গতিতে। দেখতে দেখতে দুটো দিন অগোচরেই কেটে যায়। অরিন ও এখন বেশ সুস্থ। তার গলা ও মোটামুটি ঠিক হয়েছে। কিন্তু মন আর ঠিক হতে পারলো কই?
আজ যে তার বিয়ে। কথা ছিলো নতুন বছরের ৬ জানুয়ারিতে অরিনের জন্মদিনের সময় বিয়েটা হবে। কিন্তু কিংশুকের অবসেশন এতোটাই বাড়তে থাকে। নতুন বছর পরার এক দিন আগেই বিয়ের ডেট ফিক্সড করে সে।
গত দু-দিন ধরে বাড়িতে নানা আয়োজন চলে। মেহেন্দি থেকে শুরু করে আরো কত কি। কিন্তু এবার আর কোনো গেস্টকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পুরোটাই ছিলো ঘরোয়া ভাবে। এই দু-দিন অরিনকে ও বেশ ফ্রী হতে দেখা যায় কিংশুকের সাথে। কিংশুক যেনো সুখের সর্গ খুঁজে পায়। অরিন যে এতো কিছুর পর ও তার সাথে এতো ফ্রী হবে এটা কল্পনা ও করতে পারেনি কিংশুক। যাকে সে এতো সাধনা করে চেয়েছিল তাকে সে এতো সহজে পেয়ে যাবে এটা স্বপ্নে ও ভাবেনি সে।

সকাল থেকে অরিন এবং কিংশুকের গায়ে হলুদ হওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। দু-জনকে একসাথে বসিয়ে গায়ে হলুদ দিয়ে তারপর বিয়ের আসল পর্ব শুরু করা হবে।
সকাল সকাল লাল জামদানী পরে কিংশুকের পাশে এসে বসে অরিন। তাদের একসাথে হলুদ দেওয়া হবে। কিন্তু ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে। শুধু গালে এবং হাতে হালকা স্পর্শ করা হবে।
বাড়ির সকলে হাসি-খুশি মুখেই হলুদ দিতে শুরু করে। কিন্তু বিঘ্ন ঘটে কিংশুকের বাড়নের ফলে। কারণ সে আগে অরিনকে হলুদ লাগাতে চাই। হলো ও তাই।
কিংশুক উঠে অরিনের সামনে হাঁটু পেরে বসে। তারপর পাশে থাকা বাটি থেকে হলুদ নিয়ে অরিনের দু-গালে লাগায়। তারপর হাতে ও।

–তোমাকে একদম আমার বউ বউ লাগছে।”
হালকা হেসে অন্য দিকে তাকায় অরিন। কিংশুক ও উঠে অরিনের পাশে বসে। তাদের পুরো মুহুর্তটি লেন্স বন্দী করা হয়। কিংশুক উঠে অরিনের পাশে বসে। তারপর তাদের অজস্র ছবি তুলা হয়।তার কিছু ক্ষণ পরই তাদের হলুদের প্রোগ্রাম সমাপ্ত করা হয়। কারণ ডিসেম্বরের শীতকাল। এখন এভাবে থাকলে অরিনের ঠান্ডা লেগে যাবে।তাই তাড়াতাড়ি করে প্রোগ্রাম শেষ করে বিয়ের আয়োজন শুরু করা হয়।
খুব তোড়জোড় করেই বিয়ের আয়োজন চলছিল। কিন্তু তার মাঝে বিপত্তি বাধে অরিনের মেকআপ আর্টিস্টকে নিয়ে। সে তখন ও আসেনি। কল দিলে ও ফোন বন্ধ দেখায়।

— জীবনে একবারই তো বিয়ে করবো মনি। তাও মন মতো সাজবো না?
,– আচ্ছা অন্য মেকআপ আর্টিস্টকে আনি?
–নোপ মনি। আমি সাজিয়া সাজির কাছেই সাজবো। তুমি প্লিজ পারমিশন দাও তার ওখানে যাওয়ার। প্লিজ
–কিন্তু কিং তো রাজি হবে না।
আতিয়া বেগম কিছুতেই অরিনকে বাইরে যাওয়ার জন্য পারমিশন দেয় না। আর অপর প্রান্তে অরিন ও বায়না করে বসেছে সে নিজের বিয়েতে খুব করে সাজবে। তার জেদের কাছে আতিয়া বেগম ও হার মানে। সে কিংশুককে রাজি করায়। প্রথমে না করলে ও পরে অরিনের জেদের কাছে সে ও হার মানে। মেয়ে মানুষ বিয়েতে সাজবে এটাই তো নিয়ম। তাই কিংশুক ও অরিনকে আটকাই না।
৯ জন গার্ডদের পাঠানো হয় ক্যাটরিনা এবং অরিনের সাথে যাওয়ার জন্য। কিংশুক ও একটু নিশ্চিত থাকে।কারণ অরিন এই দুই-দিন তার সাথে এতোটাই ফ্রী থাকে যে কিংশুক এখন তাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে।

—মনি, আমি তোমার মেয়েকে খুব যত্নে রাখবো। চিন্তা করো না।
আতিয়া বেগমের হাত ধরে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় কিংশুক।কারণ তাকে নিয়ে আতিয়া বেগমের মনে সংশয় কিছুতেই দূর হচ্ছিল না। অরিন মেকআপ আর্টিস্টের স্টুডিও তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হওয়ার কিছু ক্ষণ পরই কিংশুক আসে আতিয়া বেগমের কাছে। এবং তাকে ভরসা দেয়। তার মেয়ের খুব যত্ন করবে সে।
—আমার মেয়ে ছোটোবেলা থেকে তার মা-বাবাকে পায়নি কিং। তাকে আমি কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দেয়। ফুলের টোকা ও দেয়নি। আশা করি তুই ও তাকে সেভাবেই রাখবি।
অশ্রু সিক্ত নয়নে কিংশুকের পানে তাকায় আতিয়া বেগম। কারণ কিংশুক তো স্বাভাবিক নয়। তাই তাকে সহজে ভরসা করতে মন চাইছে না তার।
–মনি! মেয়ে জাতির প্রতি ছিলো আমার এক আকাশ সমান ঘৃণা। সবাই নোংরা লাগতো। কিন্তু তোমার মেয়েকে দেখার পর। পবিত্র মনে হয়েছে। মনে হয়েছে সদ্য ফুটা গোলাপ।মাই রোজ। ওর নামের মতোই ওকে মনে হয়েছিল মনি।
টিশার্টের হাতা সরিয়ে নিজের বাহুতে থাকা অরিনের ছবির ট্যাটু দেখায় আতিয়া বেগমকে।

–আই লাভ হার মনি। ওকে ছাড়া আমি অসহায় আমি। আই ডেস্পারেটলি নিড হার মনি।”
অরিনের প্রতি কিংশুকের এতো অবসেশন দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় আতিয়া বেগম।কিংশুক অরিনকে এতোটা ভালোবাসে এটা কল্পনা ও করতে পারেন নি উনি।
জড়িয়ে ধরে কিংশুককে। কিংশুক ও আতিয়া বেগমকে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলে। আজ এতো গুলো বছর পর নিজের ফুপিকে আর নোংরা মনে হচ্ছে না তার। মায়ের পরকীয়ার জন্য নিজের ফুপির থেকে ও দূরে থাকতো কিংশুক। মনে হতো তার ফুপি বোন সবাই নোংরা। কিন্তু আজ। আজ আর কাউকে নোংরা লাগে না কিংশুকের সবাইকে পবিত্র মনে হচ্ছে তার।

—তোর থেকে ভালো স্বামী আমার মেয়ে খুজে পাবে না কিং। সিইজ রেইলি লাকি টু হ্যাভ ইউ এ্যজ অ্যা হাসবেন্ড।
–আমি তোমার মেয়েকে দুনিয়ার সকল খুশি এনে দিবো মনি। ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি।
–আই ট্রাস্ট ইউ বাবা।
আজ অনেকটা বছর পর কিংশুককে সেই ১৩ বছরের শান্ত শিষ্ট নরম স্বভাবের কিংশুকের মতো লাগছে। আতিয়া বেগম পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যায় কিংশুক তার মেয়েকে যথেষ্ট সুখে রাখবে। কোনো কষ্ট সে দিবে না।
কথোপকথনের মাঝেই কিংশুকের ফোনে কল আসে তার বিশ্বস্ত গার্ড টাইগারের। যেহেতু তারা অরিনের সাথে গেছে, সেহেতু কোনো কলই মিস করে না কিংশুক।
ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে কিংশুকের। ফ্লোরে খুব জোড়ে আছাড় মারে ফোনটি।
আঁতকে উঠে আতিয়া বেগম।

তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে পরে কিংশুক।আতিয়া বেগমের কোনো কথার রেসপন্স করে না সে। প্রচন্ড বিচলিত হয়ে পরে আতিয়া বেগম। হঠাৎ হলোটা কি কিংশুকের?
অশান্ত মন নিয়ে যখনই সে কিংশুকের পিছু নেয় তখন ই ক্যাটরিনার কল আসে। জানতে পারে তাদের গাড়ির একটা বড়সড় এক্সিডেন্ট হয়েছে। তারপর থেকে অরিনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এক্সিডেন্ট টা ও হয়েছে এমন ফাঁকা জায়গায় সেখানে কেউ পরে থাকলে সহজেই তাকে খুজে পাওয়া যাবে। কিন্তু অরিনকে পাওয়া যাচ্ছে না। হাত থেকে ফোন পরে যায় আতিয়া বেগমের। মাথা চক্কর দিয়ে উঠে তার। ধ্বংসের প্রথম পর্বের কি সুত্রপাত হলো তাহলে?
লোকেশন অনুযায়ী নিজের হেলিপ্যাড নিয়ে তাড়াতাড়ি করে চলে যায় কিংশুক। তাকে এখন শুধু মাত্র অরিনের চিন্তা ভাবাচ্ছে। তার সুস্থতার কথা ভাবাচ্ছে।
লোকেশানে গিয়ে কোনো তাড়াতাড়ি করে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় কিংশুক।

–ব্রো স্টপ। আ গুন রয়েছে।
ক্যাটরিনা এবং টাইগার কিংশুককে জাপ্টে ধরে আগুনের কাছে যাওয়া থেকে। কিন্তু তাকে সহজে ধরা রাখা মুশকিল।
–লিভ মি গাউসস। আমার বউ পু’রে যাচ্ছে। লিভ মিমমমমম।
জোড়ে ধাক্কা দিয়ে জলন্ত গাড়ির কাছে ছুটে যেতেই , খুব জোড়ে বিস্ফোরণ হয়। মুহুর্তের মধ্যে সব তচনচ হয়ে যায় । অসহায়ের মতো রাস্তার পাশে বসে পরে কিংশুক। তার প্রান পাখি কি তাহলে আগুনে পু রে ছাই হয়ে গেলো?
জলন্ত গাড়ির সামনে হাঁটু পেরে বসে পরে কিংশুক। তার মন থেকে শুধু একটাই কথা বের হয়

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৬

—বলো কীভাবে?
রবো এভাবে?
আমায় গোছাবে কে দু-হাতে?
ফিরে আসো না ।
আর তো পারি না ।
বাঁচি চলো না… আবার একসাথে।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৮