আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৩
কায়নাত খান কবিতা
গালের ওপর ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ অনুভব হতেই ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় অরিন।
চোখ পুরোপুরি খুলতেই পাশে কিংশুককে দেখতে পেয়ে অরিন আঁতকে ওঠে।ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে সে,
হঠাৎ জেগে ওঠে কিংশুককে এতো কাছে দেখায় নিঃশ্বাসটাও যেন মুহূর্তের জন্য আটকে যায়।
ভয় আর কিংশুকের হিংস্রতা প্রতি পদে পদে তাকে কুরে কুরে খেতে থাকে।ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে যেন তার ভেতরের সমস্ত শক্তি এক এক করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। গুটিসুটি হয়ে নিজেকে গুটিয়ে বসে থাকে অরিন।
অরিনকে এতটা দূরে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকতে দেখে কিংশুক ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশে বসে পড়ে।ইচ্ছে করেই শরীরটা একটু ঘেঁষে বসে অরিনের সাথে। কিংশুক কাছে বসতেই অরিন আরো গুটিয়ে নেয় নিজেকে।
কিংশুক অরিনের হাত ধরে টেনে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়।
—— জাননন। লুক অ্যাট মি জান।’’
অরিনের হাত ধরে কিংশুক টেনে তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়।ভয়ের চাপে অরিন মুহূর্তেই জড়সড় হয়ে যায়।নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখে,
এক বিন্দু নড়ার সাহসও পায় না নিজের জায়গা থেকে।কিন্তু কিংশুক তো কিংশুকই।
তার ইচ্ছের সামনে প্রতিরোধের কোনো মূল্য নেই।
জোর করেই সে অরিনকে টেনে নিজের কাছে আনে,আর সেই টানেই অরিন এসে পড়ে তার কোলের মাঝখানে। দু-হাতে জাপ্টে ধরে অরিনের কোমর।মুখ রাখে কাঁধে।
—- দেখি।’’
অরিনের থুঁতনিতে হাত রেখে কিংশুক ধীরে তাকে নিজের মুখের কাছাকাছি টেনে আনে।
অস্বস্তিকর সেই নৈকট্যে অরিনের নিঃশ্বাস আরও ভারী হয়ে ওঠে।আর মুহূর্তটা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চাপা এক আতঙ্কের নীরবতা। এই বুঝি কিছু ঘটলো।
—– খুব জোরে লেগেছে জান?’’
নীরবে নিজের মাথা সামান্য নেড়ে সম্মতি জানায় অরিন। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না।ভয়ের ভারে সেই ছোট্ট ইশারাটাই তার ‘হ্যাঁ’ হয়ে ওঠে।
—–সরি জান… আর রাগিয়ো না আমাক প্লিজ।”
অরিন ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।সে আর কিংশুককে রাগাবে না।
—-দ্যাটস মাই লেডি।’’
আলতো করে অরিনের ঠোঁট বরাবর আদুরে পরশ একেঁ দেয় কিংশুক।
—- আই হ্যাভ অ্যা সারপ্রাইজ ফর ইউ বেবি গার্ল। ‘’
সারপ্রাইজ কথাটা শুনতেই অরিনের বুকটা কেঁপে ওঠে।মনের ভেতর হঠাৎ করে ভিড় করে আসে অজানা আশঙ্কা।তাহলে কি আবারও কোনো অঘটন?আবার কি নতুন করে কিছু ঘটতে চলেছে?
ভাবনার ঘোরে নিজেকেই যেন শূন্যতার মধ্যে আবিষ্কার করে অরিন। হঠাৎ করে কিংশুক তাকে কোলে তুলে নেয়।অরিন কোনো শব্দ করে না নীরবে শুধু তার গ্রীবা জড়িয়ে ধরে।ভয়ের চাপে সে ভাষা হারিয়ে ফেলে।অরিনকে কোলে নিয়েই সোজা নিচের দিকে নামতে থাকে কিংশুক।তার প্রতিটি পদক্ষেপ অরিনের ভেতরের ভয়টাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কিংশুকের সারপ্রাইজ মানেই অন্য কারও জন্য ক্ষতির ইঙ্গিত।নিজের মনে অশুভ আশঙ্কা কু-ডাকতে থাকে অরিনের। এই নীরব পথচলার শেষে আবার কার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে,
সে ভেবেই তার বুকটা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
কিংস ম্যানশনের বিশাল গাড়ির গ্যারেজে অরিনকে নিয়ে এসে পৌঁছায় কিংশুক।
ভেতরে ঢুকেই তাকে ঠিক মাঝ বরাবর দাঁড় করায় সে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে একটি আধুনিক শো-রুম ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না অরিনের। অবশ্য দ্বিতীয় রিচ পার্সনের বাড়ি তো এমনই হওয়ার কথা ছিলো। অরিন চুপচাপ দাড়িয়ে পরে।
তার ঠিক সামনে রাখা একটি বিশাল অবয়ব, লাল সিল্কের কাপড়ে সম্পূর্ণ ঢাকা।গ্যারেজ হওয়ায় অরিন বুঝে যায়, এর নিচে নিশ্চয়ই কোনো গাড়ি।তবু অজানা আশঙ্কা বুকের ভেতর কাঁপন তোলে।কিংশুকের একটুখানি ইশারাতেই কাপড়টা সরিয়ে ফেলা হয়।
ঠিক তখনই কিংশুক অরিনের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
—-Do you like it jaan?Exactly my love-bite colour’’
চোখ কপালে উঠে যায় অরিনের।লাভ বাইটের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে গাড়ি।এইভাবেই কি উপহার দেওয়া যায়?মুহূর্তের জন্য যেন সে কোনো কথা খুঁজে পায় না।এই মুহূর্তে কি তার খুশি হওয়া উচিত?নাকি আগের স্মৃতিগুলো মনে করে নিজেকে আরও গুটিয়ে নেওয়া উচিত ?দ্বিধা আর আশঙ্কা মিলেমিশে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন তৈরি করে তার ভেতরে।অসংখ্য চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে অরিনের মস্তিষ্ক জুড়ে।
উপহারের ঝলকানির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থটা বুঝে উঠতে না পেরে, সে শুধু নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,নিজের অনুভূতির সঙ্গেই যেন যুদ্ধ করতে থাকে অরিম।
—-Jaan? Don’t you like it?’’
—- হু…হুম..!’’
নীরবে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয় অরিন। সে পছন্দ করেছে তাকে দেওয়া কিংশুকের উপহারটি।
—–I knew it jaan’’
অরিনের গালে চু’মু একেঁ দেয় কিংশুক।
—Come on, jaan. Let’s go for a drive.’’
খুব রোমান্টিক ভঙ্গিতে অরিনকে নিয়ে গাড়িতে বসায় কিংশুক।তারপর নিজেও গিয়ে ড্রাইভিং সিটে জায়গা নেয়।কোনো গার্ড সঙ্গে না নিয়েই, অরিনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে কিংশুক।এক দীর্ঘ ড্রাইভের পথে।চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে ম্যানশন থেকে।আর অরিনের ভেতরে জমে ওঠে অচেনা এক টানাপোড়েন। কিংশুককে এতো ঠান্ডা হতে সে দেখেনি।কিছু ক্ষণ আগে ও সে রেগে ছিলো। হঠাৎ এতো ঠান্ডা? আসলে কিংশুকের মনে যে কী চলে এটা কিংশুক ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না।
দেখতে দেখতেই তারা এসে পৌঁছায় এক জনশূন্য প্রান্তরে।লেকের ধারে, সবুজে ঘেরা এক নিস্তব্ধ জায়গা।চারপাশটা যেন হাতে আঁকা কোনো ছবির মতো , নির্মল, শান্ত, অবাস্তব সুন্দর।কিংশুক আগে নেমে আসে, তারপর অরিনকে নামিয়ে দেয়।জায়গাটির সৌন্দর্যে অরিন কিছুক্ষণ নীরব হয়ে থাকে।চোখ জুড়ে ওঠে সবুজ,কতদিন পর এমন খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে।মুক্তির স্বাদটা যেন অচেনা লাগতে থাকে।কিংশুক তার কটিদেশ জাপ্টে ধরে।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩২
— Do you like this place, jaan?’’
— Hmm.’’
কিংশুক অরিনের কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়।
অরিন আর কিছু বলে না।চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে,
— I love you so much, jaan.’’
নিজের অনুভূতির কথা বলতে না বলতেই হঠাৎ কিংশুকের ফোনে কল আসে।সে অরিনকে সেখানেই রেখে কয়েক পা দূরে সরে যায়।আর অরিন দাঁড়িয়ে থাকে।
সবুজের মাঝে, লেকের ধারে,মনের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নগুলোর ভার নিয়ে। কেন তার সুন্দর জীবনটা এমন হয়ে গেলো।
—-আরেহ। অরিন?’’
