আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৩
কায়নাত খান কবিতা
পুরো খান ম্যানশন জুড়ে চলে অন্ধকারের লীলাখেলা।অন্দরমহলের বাতাসটা ও যেন ভারী হয়ে গেছে। মনে হয় দেয়ালটি ও যেন নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে আলো জ্বলছে না।তবু লালচে দাগ ছড়িয়ে আছে মেঝে, কার্পেট, সোফার কিনারায়।
সোফার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে অরিন। দু’হাতের ভাঁজে মুখ ঢাকা তার । ভয়ে সর্বাঙ্গ কাঁপতে থাকে অরিনের।কান্না থামাতে চাইলেও পারছে না।
তার ঠিক সামনের সোফায় গা এলিয়ে খুব আরাম করে বসে রয়েছে কিংশুক। কালো শার্ট এখন প্রায় লালচে দাগে ভরা।হাতে চকচকে ধারালো চাপা’তি।আলোর অভাবেও যার ধার বোঝা যায়।
কিংশুকের পিছনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে দশ-বারো জন লোক। সবার হাতে অ’স্ত্র।দৃশ্যটা যেন কোনো যুদ্ধ’ক্ষেত্রের আগমুহূর্ত।কিংশুক নীরবে তাকিয়ে আছে অরিনের দিকে। হিংস্র বাঘ যেমন শিকারের চোখে ভয় দেখতে চায় সেইরকম।
‘অতীত’
‘আসল কাগজটি কোথায় মা?’ অরিনের সোজাসাপটা প্রশ্নে কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় আইরিন বেগম।আতিয়া বেগম ও কিছুটা ধাক্কা খায়। অরিনের তো তেমন কিছু জানার কথা নয়। বিয়ের কাগজ কীভাবে সরানো হয়েছে, তাকে কীভাবে লন্ডন থেকে দেশে আনা হয়েছে পুরোটাই তার অজানা। তবে হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? কোনো ভনিতা না করে আইরিন বেগম বলে
‘ তুমি জানলে কী করে?’ আইরিন বেগমের পাল্টা প্রশ্নে অরিন উত্তর দেয়
‘ বাইকার বলেছে। আর কিছু লুকিয়ে রেখো না মা।’ অরিনের শক্ত চাহুনি নাজেহাল করে ছাড়ে উপস্থিত সবলকে। যার ফলে না পারতে ও তারা সবটা বলতে থাকে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ট্রায়াল রুমের কথা শুনে। অরিন না পারতে পারতে ট্রায়াল রুমে তার সাথে কী কী হয়েছিলো সবটুকু উগলে দেয়।মন শক্ত রাখলে ও শরীরের অসহ্য ব্যাথা তাকে শক্ত থাকতে দেয় না। তাই পুরোটা বলে ফেলে অরিন। যেটা শোনার পর মোটামুটি সকলের মাঝে ভয় বাস করে। তবে কী এতো কিছু করে ও কোনো লাভ হলো না?
‘ তোকে বিয়ে করতে হবে।’ আইরিন বেগম স্পষ্ট জানান দেয়, অরিনের দ্বিতীয় বিয়ের কথা। যেটা শুনে অস্বাভাবিক ভাবে অরিনের শরীর কাঁপতে থাকে। সে তাকায় তার মনির পানে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে, তার মনি ও একমত। অরিন বলে, ” আমি বিবাহিত মা। দ্বিতীয় বিয়ে কীভাবে করবো?”
আইরিন বেগম অরিনের হাত শক্ত করে ধরে বলেন, ” যেই বিয়ের কোনো প্রমাণ নেই। সেটা কোনো বিয়ের আওতায় পড়ে না। Try to understand Aurin. ”
–” how could i ma?” অরিনের চোখে স্পষ্ট পানির ঝলকানিতে ভরে ওঠে। এটা কী কিংশুকের ভয়? না-কি অন্য কিছু?
পাশ থেকে আতিয়া বেগম এসে অরিনের মাথায় হাত রাখেন, ” কিং স্বাভাবিক মানুষ নয়। অসুস্থ, স্যাইকোপ্যাথ। ও কোনোদিন ও নিজের চিকিৎসা করাবো না।আর সুস্থ ও হবে না। ‘
‘ কিন্তু মনি?’ অরিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই আতিয়া বেগম তাকে থামিয়ে দেন।
‘ ‘যে নিজের মা-কে খুন করতে পারে। সে তোকে কীভাবে শান্তিতে বাঁচতে দেবে অরি” সর্বাঙ্গ জুড়ে একটি শীতল হাওয়া বয়ে যায় অরিনের । নিজের মা-কে কে খুন করতে? কিংশুকের সাইকোলজি সমস্যা রয়েছে এটা অরিনের জানা। কিন্তু কিংশুক নিজের মা-কে খু’ন করেছে এটা সম্পূর্ণ তার অজানা। চোখের সামনে ঝাপসা দেখতে থাকে অরিন। তার স্বামী ভালো মানুষ নয় এটা সত্যি। তাই বলে এতোটাই জঘন্য সে? নিজের মা-কে কেউ কীভাবে মা’রে? কোন বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের কাজ এটা?
কিংশুকের এই ভয়ানক অতীত শুনে অরিন দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। সারাজীবন এমন একজন মানুষের সাথে থাকা কখনোই সম্ভব নয়। তাও যে নিজের মায়ের খু’নি।
—অরিনের বিয়ে রাজের সাথে ঠিক করা হয়। রাজ অরিনকে পছন্দ করতো মোটামুটি সকলের জানা। তার ওপরে রাজ যথেষ্ট ভালো ছেলে। কোনো বাজে নে’শা বা খা’পার গুন তার মাঝে অবশিষ্ট নেই। আধুনিক যুগের তুলনায় যথেষ্ট মার্জিত এবং ভদ্রলোক সে। অরিনের মন বার বার কু ডাকলে ও শেষ মেষ না পারতে রাজি হয়ে যায় অরিন। কোনো আয়োজন ছাড়াই সম্পূর্ণ বিয়ের কাজ শুরু হয়ে যায়। যেখানে শুধু, দুটো পরিবার, কাজী এবং রাজ-অরিনের হাতে গনা কয়েকজন ফ্রেন্ড সার্কেল আসে। বর যাত্রী আসে একদম ফরমাল ড্রেসে।খান ম্যানশনে যে বিয়ে হচ্ছে এটা ঘুন অক্ষরে কারো পক্ষে টের পাওয়া সম্ভব নয়। সব কিছু এতোটাই স্বাভাবিক এবং অতি সাধরণ ছিলো।
ঘর ভরা আলো। কাজি কাগজ বের করে সব কিছু ঠিক করতে থাকে। । সবাই হাসিমুখে বসে থাকে। অরিনকে তার দু-জন ফ্রেন্ড এবং বাইকার মিলে রেডি করে নিচে নিয়ে আসে। তেমন কোনো আয়োজন না করায় অরিন ও তেমন একটা সাজেনি। একটা সিম্পল শাড়ি, হালকা গয়না এবং হালকা মেকআপ দিয়ে নিজের লুক কম্পলিট করে অরিন।মুখটা বরাবরের মতোই মলিন। হাসির ছিটে ফুটো নেই সমস্ত মুখমণ্ডল জুড়ে। কোন অজানা ভয় তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে সেটা এক মাত্র সেই জানে বোধ হয়।
অরিনকে রাজের পাশে বসানো হয়। আতিয়া বেগম গিয়ে অরিনের পাশে বসে পড়েন। আইরিন বেগম এবং বাইকার তাদের সামনের ডিভানে বসে থাকেন। কাজী সমস্ত কাগজ রেডি করে সামনে ধরতেই, সদর দরজা খুব জোড়ে খোলার আওয়াজ হয়। সারি সারি লোক মাঝের লাইন ফাঁকা রেখে দু-পাশ দিয়ে চলে আসতে থাকে। সকলের আর্কষণের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে ওঠে সদর দরজা। কিন্তু উপস্থিত কয়েকজন ভয়ে একজন আরেকজনের পানে তাকাতে ব্যস্ত।
–বর ছাড়া বিয়ে হবে?”
কিংশুকের বজ্র কণ্ঠে পুরো খান ম্যানশন যেন গরম হয়ে ওঠে। মাঝের ফাঁকা লাইন দিয়ে একদম রাজা বাদশাহদের মতো করে হেঁটে আসতে থাকে কিংশুক। তার হাঁটার ভঙ্গি,ঠোঁটে ব্যঙ্গত্ব, চোখে আগুন, সবকিছুই যেন সবাইকে পুড়িয়ে মা’রার জন্য যথেষ্ট।
“আমার বউয়ের বিয়ে, আর আমাকে কেউ ইনভাইট করলো না?”
ভয়ে অরিনের হাত পা জমে যায় ।চোখাচোখি হতেই সে চোখ নামিয়ে ফেলে।কিংশুক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে অরিনের সামনে।তার সাথে গার্ডরা ও।কিংশুক সোজা আইরিন বেগমের সামনে দাড়ায়। আইরিন বেগম কিংশুককে দেখতেই শুকনো ঢোক গিলে। তারপর জায়গা ছেড়ে চলে উঠে দাড়ায়।নিজের মা-কে এভাবে পাশ থেকে সরে যেতে দেখে অরিনের মন আরে কু-ডাকতে থাকে। কিছু ক্ষণ আগে ও সে তাকে ভরসা দিচ্ছিলো। সাহস জুগাচ্ছিল তার। তবে এখন এমন কেন? আর কেনই বা সরে গেলো? হাজারটা প্রশ্নের বিজ বপন হতে থাকে অরিনের মনে। ঠিক তখনই কিংশুক এসে অরিনের পাশে বসে পরে। অরিনের পাশে বসে সে মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকায়। পরক্ষণেই তার কবজি ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয় কিংশুক।গাল শক্ত করে চেপে ধরে।
–কয়বার বিয়ে করো বউ? আমাকে দিয়ে পোষাচ্ছে না?”
কিংশুকের হাতের শক্ত চাপে অরিনের গাল দাঁতের সঙ্গে লেগে প্রায় কে’টে যাওয়ার উপক্রম হয়ে আসে। চোখ দিয়ে অটোমেটিক পানি ঝড়তে থাকে। অরিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাজ পাশ থেকে বলে ওঠে, –অরিনকে ছেড়ে দিন কিং!”
কিংশুক তাকায় রাজের পানে।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪২
—আমার বউ আমি ধরবো না ছাড়বো।সেটা কী তুই ঠিক করে দিবি?”
রাজ কোনো কথা না বলে অরিনের অপর হাত শক্ত করে ধরে উঠে দাড়ায়।
—অরিন আমার হবে। আমার বউ হবে।”
কিংশুক কিছু না বলে শুধু রাজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের কাটা হয়ে যায় রাজের হাত, কারণ সে অরিনকে ধরেছে।
— বাইরের আলো পর্যন্ত ওর শরীরে স্পর্শ করতে দেয় না। সেখানে তুই হাত ধরলি? Interesting. ”
