Home আপনাতেই আমি সিজন ২ আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৫৮

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৫৮

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৫৮
ইশিকা ইসলাম ইশা

চারদিকে আবার পরিবেশ শান্ত হয়ে উঠেছে।থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে রিদির কান্নার শব্দ।আরিফ মিজান চুপ হয়েছে অনেকক্ষণ!তবে তার দৃষ্টি রিদির দিকে।এতো কিছু শোনার পরে মেয়েটা কাঁদছে!কাদবেই তো! স্বামীর অতীত জেনে কাঁদা টা স্বাভাবিক নয় কি? নিশ্চয়ই রিদির মনে তীরা জন্য ঘৃনার জন্ম নিয়েছে।এটাও তো স্বাভাবিক।তীরার অতীত অবশ্যই সুন্দর ছিল না।সে নিজের জেদ বজায় রাখতে কতো গুলো মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছে।আরিফ মিজান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।তীরাকে তিনি মাফ করে দিয়েছেন। মৃত্যু পথযাত্রী মেয়েকে তার ক্ষমা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আরিফ মিজান আবারো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকালো রিদির দিকে।মেয়েটার মুখে অদ্ভুত এক মায়া।চোখের চাহনি হৃদয় পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়। সুন্দর!খুব সুন্দর!এমন মায়াবতী তিনি খুব কম ই দেখেছেন। কাঁদলেও মনে হয় চোখের পানিতেও মায়া জড়ানো!মেয়েটাকে কাঁদলেও যেন দেখতে বেশ মায়াবি লাগে।তীরা হয়তো জাগ্রত হয়ে মেয়েটার মুখে নিজের জন্য ঘৃনা দেখবে।কম পাপ তো আর করেনি।তাই তো স্বাভাবিক বিষয়।আরিফ মিজান চুপ করে শুধুমাত্র দেখে গেলেন।একটু পর রিদি চোখ মুছে বলল,
আম্মুর কি হয়েছে??
এবার মুখ খুললেন আরিফ মিজান এর নাতনি।মিহি মিজান।
তীরা ফুপির ব্লাড ক্যান্সার!!
কিহ!!!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

হ্যাঁ!ঠিক শুনেছো তুমি! ব্লাড ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ।
আম্মুর ব্লাড ক্যান্সার!তাহলে আমরা এখানে কেন আছি বাইরে কেন নিয়ে যাচ্ছি না।নানু আম্মুর চিকিৎসা ভালো জায়গায় করালে আম্মু ঠিক হয়ে যাবে!আমি এখুনি তীব্র…….
ফুপি লাস্ট স্টেজে আছে রিদিতা!
আপনারা জানতেন এসব আগে থেকে তবে কেন আমাদের জানান নি নানু!!আমি না হয় পর তীব্র!! ওনি তো তীরা আম্মুর নিজের ছেলে তবে কেন আপনারা ওনাকে জানান নি!আমি মানছি অতীতে তীরা আম্মু যা করেছে তা করা তার উচিত হয়নি!তাই বলে আমরা…..
আরিফ মিজান অবাক হয়ে তাকালো রিদির দিকে।এতোকিছুর পরেও সে তীরার জন্য চিন্তা করছে।তিনি একটু থেমে বলল,

আমরাও জানতাম না রিদিতা।জেনেছি ২মাস আগে।
রিদিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
২ মাস অনেক সময় নানু! আপনি তীব্র কে জানালে ও নিশ্চয়ই আম্মুকে ভালো করে দিত!!
আরিফ মিজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
তীব্র একজন ডক্টর রিদিতা!সে তার সাধ্য মতো চেষ্টা করেছে।
চেষ্টা করেছে??চেষ্টা করেছে মানে!!ওনি জানতেন সব!!
তীব্র ই আমাকে জানিয়েছে!!
মানে!!

তীরা তার রোগের কথা কাউকে জানাতে চাইনি।ব্লাড ক্যান্সার ধরা পরে আরও মাস পাঁচেক আগে। কিন্তু তীরা চায়নি তার এই রোগ সম্পর্কে কেউ জানুক।এমনকি তীব্র কেও জানাতে চাইনি! ডক্টরকে মানা করেছে যাতে কোন ভাবেই তীব্রর কানে কথাটা না যাই!এই হসপিটাল থেকে সে চিকিৎসা নেয় নি বরং বাইরের হসপিটাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে এতো দিন। তবুও যখন তীব্র ব্যাপারটা জেনে যাই আমাকে জানাই।মেয়ের প্রতি রাগ থাকলেও তার শেষ সময়ে তো আর এভাবে ছেড়ে দিতে পারি না। সেদিন ওর সাথে দেখা করতে চোধুরী বাড়িতে গিয়েছিলাম।তীরা চিকিৎসা করাতে না চাইলে বাধ্য হয়ে তীব্র কে কল করলাম। তীব্র তীরার সাথে কি কথা বলল জানা নেই এরপর তীরা রাজি হয় চিকিৎসা করাতে।দেশ-বিদেশ থেকে বড় বড় ডাক্তার এনে চিকিৎসা শুরু হয়।
তবুও কেন আম্মু সুস্থ হয় নি!!

চেষ্টা তো করেছে! কিন্ত অনেক দেরী হয়ে গেছে। কিছু পাপের শাস্তি দুনিয়া থেকেই পেতে হয় মেয়ে।
জানো যখন ও তোমার সাথে কথা বলত!তখন ওকে অনেক খুশি খুশি লাগত।সারাদিন ঘরকুনে পড়ে থাকা সে তোমার সাথে কথা বলার অপেক্ষা করত।জানো কেন??
রিদি মাথা নেড়ে না বলতেই নানু একটু থেমে আবারও বললো,
দুই দুটা সন্তানের জননী হলেও মা ডাক শোনা পার হয়েছে তার বহু বছর।ছোট ছেলেটার মুখে হয়তো আদো আদো মা ডাক শুনেছে।তবে তীব্র কখনো তাকে মা বলে ডাকেনি।তীরা যতক্ষনে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।তুমি তীরা কে ঘৃনা করছ না কেন?
রিদি টলটলে চোখে চাইল আরিফ মিজানের দিকে,

আমি তো মায়ের ভালোবাসার কাঙাল নানু!সে কোন ছোটবেলায় মা আমাকে রেখে চলে গেছে।অথচ আম্মু বলেছিল সে সবসময় আমার কাছে থাকবে।তীরা আম্মুও বলেছিল সে আমার সাথে থাকবে।তারা কেউ তাঁদের কথা রাখেনি।আমি তীরা আম্মুর উপর হয়তো রাগ করতে পারি নানু ঘৃনা না।অল্প সময়ের জন্য হলেও তাকে যে মায়ের আসনে বসিয়েছি। মায়ের উপর রাগ হয়, অভিমান হয়,অনেক অভিযোগ থাকে কিন্তু ঘৃনা থাকে না।
আরিফ মিজানের বুকের উপর থেকে ভারি পাথর টা যেন সরে গেল।হালকা লাগলো নিজেকে।সে তো ভেবেছিল তীরা তার ঘৃনার খাতায় আরো একটা নাম লিখালো।তবে রিদির কথা তাকে অবাক করলেও সে খুশি হলো।তিনি মিষ্টি হেসে বলল,
তুমি খুব ভালো মেয়ে!
রিদি তাকালো আরিফ মিজানের দিকে।আরিফ মিজান স্নেহের হাত মাথায় রাখলেন রিদির।

দেখতে দেখতে সময় পেরিয়েছে চার ঘন্টা।১০টার বাংলাদেশে আসলে এখন বাজে ২ টা।নাজমা চৌধুরী রিদিকে বার বার খাওয়ার জন্য বললেও রিদি খেতে চাইনি।অথচ সে সকাল থেকে না খাওয়া। দূর্বলতা তাকে গ্রাস করলেও খাওয়ার যেন মুখ দিয়ে নামছে না।নাজমা চৌধুরী জোর পূর্বক একটা স্যান্ডউইচের এক অংশ কোন মতে খাওয়ালেও বমি করে দিয়েছে।রিদিকে বাড়ি গিয়ে আরাম করার কথা বললেও রিদি যাইনি।বসে আছে তীরার শিউরে।
একটু পর তীরার ঙ্গান ফিরল।আদো আদো চোখে প্রথমেই নজর এলো রিদির ক্লান্ত মুখখানা। তিনি মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে বলল,

আমাকে ঘৃনা করিসনা রিদি!
রিদি চটপট বলল,
আপনাকে আমি ঘৃনা করি না আম্মু।আর না করব!
তীরা হাসল! মলিন হাসি!সবটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে রিদি।আর যখন বুঝতে পেরেছি তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আচ্ছা তীর কি এসেছে তোর সাথে?
জি!!!
ও হয়তো আমাকে ঘৃনা করে।তিশা আমার ছেলেকে নিজের ছেলের চেয়ে বেশি ভালোবাসলেও আমি পারিনি তীরকে মায়ের ভালোবাসা দিতে। ওকে দেখলে বার বার মনে হতো তিশার জন্যই আমার সব শেষ হয়েছে।অথচ তার সম্পন্ন দায়ভার তো আমারই।

কেউ তোমাকে ঘৃনা করে না আম্মু।সবাই হয়তোবা অভিমান করেছে!
তীরা হাসল!তোর মতো সবাই হয় না রে রিদি! আচ্ছা তীব্র কে আমি শেষ বারের মতো দেখতে পারব না তাই না।হয়তো জানবেও না তার জন্মদাত্রী মা আর দুনিয়াতে নেই।
আচ্ছা রিদি তীব্র তোকে অনেক ভালোবাসে তাই না!!একবার বলবি!আমাকে একবার মা বলে ডাকতে!
রিদি ফুঁপিয়ে উঠে তীরা কে জরিয়ে ধরলো।তীরা মলিন হেসে রিদির মাথায় কাঁপা কাঁপা হাত রেখে বলল,
কাঁদতে নেই পাগলি।আমি মেনে নিয়েছি সব।আমি চলে গেলে আমাকে মাঝে মাঝে মনে করিস কেমন!
তোমার কিছু হবে আম্মু!!
রিদির কথায় তীরা হাসল।ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে নিল।ঘুম পাচ্ছে তার।হয়তো ওষুধের ইফেক্ট নয়তো চির নিদ্রায় শায়িত হচ্ছে। তবে মৃত্যু কি এতোই সোজা। উহু!!

ঘড়িতে তখন ২টা বেজে ৪৫।তীরাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়াই সে ঘুমাচ্ছে।করিডরে এতো মানুষ থাকলেও চারদিকে নীরবতা।রিদি নাজমা চৌধুরীর কাঁধে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।শরীর বড্ড খারাপ করছে তার।নাজমা চৌধুরী অনেকবার রুমে আরাম করতে বললেও রিদি যায় নি।হয়তো অনেক ঘন্টা জার্নির জন্য এমনটা হয়েছে তার উপর সকাল থেকে না খাওয়া।

রুপ এসেছে ভারত থেকে।ভারতে ফ্যাশানের জন্য একটা অনুষ্ঠানে গেছিল সে।করিডর দিয়ে আয়ানের সাথে হেটে আসছে।আয়ান এতক্ষণ এখানে থাকলেও ঘন্টা খানেক আগেই রুপ কে নিতে গেছিল সে।রিদি আসা পর্যন্ত রূমেই ছিল তাই তার সাথে দেখা হয়নি আয়ানের।আয়ান করিডর দিয়ে হেঁটে যেতেই সবার আগে নজরে এলো ক্লান্ত মায়াবী মুখখানা।নাজমা চৌধুরীর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে।আয়ান কিছুক্ষণ রিদির দিকে চেয়ে এগিয়ে গিয়ে বসল চেয়ারে।একদম রিদির অপজিট চেয়ারে। কিছুক্ষণ আবারো দেখল মায়াবতী কন্যা কে।বেশ উন্নতি হয়েছে।আগের চেয়ে একটু মোটা হয়েছে।চেহেরাও অনেক উজ্জ্বল হয়েছে।চোখের পাপড়ি গুলো ভেজা ভেজা।আয়ান চোখ সরিয়ে নিল।সে তো তার নয় তবে দেখা টা অনুচিত। কিন্তু মন!ঐ যে একটা গানের লাইন আছে না,”তবু মন মানতে চায়না”।আয়ান উঠে চলে এলো খানিকটা দূরে। এদিকে রুপ রিদিকে অসুস্থ দেখে এগিয়ে এলো।

দাদিমনি রিদিতা ঠিকাছে???
নাজমা চৌধুরী একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
শরীর দূর্বল। অনেক কান্নাকাটি করেছে। ঘুমাচ্ছে মনে হয় ঘুমাক!
রুপ আর কথা না বাড়িয়ে চেয়ারে বসল।রিদি একটু পর চোখ পিটপিট করে খুলল।বাতাসের তীব্রতায় ঘুমটা হালকা হয়ে এলো।বাতাস যেন হুট করে বৃদ্ধি পেল।সই সই করে বাতাস চলল কিছুক্ষণ।রিদির ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।চোখে মুখে পানি দেওয়া দরকার।রিদি নাজমা চৌধুরীর কাঁধে থেকে মাথা উঠিয়ে বলল,

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৫৭

দাদি আমি ওয়াসরুম থেকে আসছি!
নাজমা চৌধুরী যেতে চাইলে রিদি মানা করে।সে পারবে যেতে।চেয়ার থেকে উঠে ধীর পায়ে হেটে এলো কয়েক কদম।হুট করেই গা গুলিয়ে মাথা ঘুরে উঠল। একহাত দেওয়ালে রেখে ব্যালেন্স রাখতে চাইলেও পারল না। অন্ধকার হয়ে এলো চারপাশ।নেতিয়ে পড়ার আগেই শক্ত একটা হাত আঁকড়ে ধরল তার কোমর। ততক্ষণে রিদি সেন্স হারিয়েছে।

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৫৯