আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭
ইশিকা ইসলাম ইশা
আরফিনের কথায় রুপ বেরিয়ে আসে নিজের ভাবনা থেকে। দুটো লুচি শেষ করে আরেকটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই হুট করে থেমে গেল হাত!!চোখ বড় বড় করে চাইল!!চট করেই উঠে দাঁড়াল রুপ!!রুপকে এভাবে উঠতে দেখে সবাই অবাক হল!রুপ ছুটে গিয়ে দাড়ালো সেই ব্যাক্তির সামনে।বাকিরাও বেশ অবাক হল সামনে থাকা ব্যাক্তিকে দেখে!! এতবছর পর এই বাসায় তীব্র কে দেখে সবাই বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে।
তীব্র ভাইয়া!!
তীব্র নির্বিকার ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে থামল। তীব্রর সাদা শার্টের বাম হাতের বাহুর কাছে মোটা ব্যান্ডেজ করা।মোটা ব্যান্ডেজ এর উপর দিয়েও রক্ত ভেসে আসছে!!যা শার্ট ভেদ করে বোঝা যাচ্ছে!কপালে ব্যান্ডেজ করা। সিল্কি চুল গুলো পড়ে আছে ব্যান্ডেজ এর উপর।সাদা শার্ট এর বিভিন্ন জায়গায় রক্তের ছাপ স্পষ্ট।এক হাতে গায়ের কোট হাতে ঝুলছে।এতো কিছুর পরেই তীব্রর ভাবভঙ্গি স্বাভাবিক।নাজমা চৌধুরী তীব্রকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো,
তীব্র!!!!!! এসব কি……………
ঝনঝন আর কিছু ভাঙ্গার শব্দে আর কিছু বলতে পারল না নাজমা চৌধুরী।তীব্রর থেকে নজর সরিয়ে তাকালো রান্না ঘরের দিকে।সেখান থেকে ভেসে এলো জোৎস্না খালার আর্তনাদ!!!
আল্লাহ!!! আল্লাহ!!এইডা কি করলেন বড়বৌ!! আল্লাহ গো!!আল্লাহ!!রক্ত!!আপনার পা থেকে রক্ত পড়তাছে !!কাচ ঢুইকা গেছে!!আপনে মুখ চাইপা আছেন ক্যান??খালাআম্মা! খালাম্মা গো!!
নাজমা চৌধুরী জোৎস্নার এমন কথায় একবার তীব্র তো একবার রান্না ঘরের দিকে তাকালো। ততক্ষণে অভি ছুটে গিয়েছে রান্না ঘরে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ওহহ সিট!!! অনেকখানি কেটে গেছে রিদি!!
অভির চিন্তিত কথার উত্তরে ভেসে আসল রিদির ব্যাথায় কাতর হওয়া ক্ষীণ কন্ঠস্বর।
ভাইয়া পা ধরবেন না প্লিজ!!
রিদির ক্ষীণ কন্ঠস্বরে তীব্র নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকালো রান্নাঘরের দরজায়!!ঠিক একই ভঙ্গিতে ঘার ঘুরিয়ে গটগট পায়ে উল্টা হাঁটা ধরল।রুপ তীব্র কে চলে যেতে দেখে ডাকল,
ভাইয়া!!কি হয়েছে তোমার!!
তীব্র থামো!!
দাদির ডাকে তীব্র দু সেকেন্ড থেমে আবারো হাটতে থাকল।গেট পেরিয়ে চলে গেল তীব্র নিবাসে।রুপ তীব্র কে তীব্র নিবাসে যেতে দেখে চটপট হাতে একটা প্লেটে খাবার তুলে নিল। ড্রয়ের থেকে ফাস্ট এইড বক্স বের করে সার্ভেন্ট কে কফির জন্য বলে ট্রে হাতে পিছু পিছু ছুটল।
পায়ে ব্যান্ডেজ করতে করতেই কিছুটা রাগান্বিত স্বরে অভিক বলল,
নিজের যত্ন নাও রিদিতা। ভাইয়া কোন বাঘ, ভাল্লুক না!!যে এসেই তোমাকে খেয়ে ফেলবে। কতোখানি কেটেছে ধারনা আছে!এতো কেয়ার লেস হয়ে মানুষের আয়ু কেন কমাচ্ছো!
রিদি ব্যাথা আর ভয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অভির রিদিতার কান্নারত মুখটা দেখে বেশ মায়া হলো।আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে!!রাইফা, আরফিন, রিদিকে আর কিছু বলল না।নাজমা চৌধুরী রিদিকে ওষুধ খাইয়ে আরাম করতে বলল। এখন তীব্রর জন্য চিন্তা হচ্ছে খুব।যদিও এমন আঘাত ওর কাছে কোন ব্যাপার না। তবুও!!
সোফায় শরীর এলিয়ে দিতেই চটপট পায়ে রুমে ঢোকে রুপ!!
তোমার হাতে কি হয়েছে??
তীব্র নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
গুলি লেগেছে!!
রুপের চোখে পানি টলমল করে উঠল। এগিয়ে আসতেই তীব্র বলল,
চলে যা!!
রুপ অসহায় চোখে তীব্রর দিকে তাকিয়ে বলল,
আমি ডক্টর কে কল করেছি ওনি এখুনি চলে আসবে!! তোমার হাত……
তীব্র স্বাভাবিক ভাবে আবার বলল,
রুপালি আমি যেতে বলেছি!!যা!!
সবসময় তোমার ইচ্ছে মতোই কেন চলতে হবে তীব্র!!নাজমা চৌধুরীর কথায় পেছনে ফিরে তাকায় রুপ!! তীব্র তখনো নির্বিকার ভঙ্গিতে শরীর হেলিয়ে আছে। ঠান্ডা আর স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
লাবিব আসবে!!ওকে আমার রুমের আলমারিতে নীল ফাইল টা দিবে!!তুমি ছাড়া আর কেউ রুমে প্রবেশ করতে পারবে না।তাই তোমাকে বলছি!
নাজমা চৌধুরী কিছু বলার আগেই সেখানে উপস্থিত হয় লাবিব সাথে একজন ডক্টর!!তীব্রকে দেখে ডক্টর শুকনো ঢোক গিলে মনে মনে ভাবল,
তীব্র কে চিকিৎসা!! ওনার চিকিৎসার কি দরকার!
তীব্র সবার প্রতি তোয়াক্কা হীন প্রবেশ করল ওয়াসরুমে।যেতে যেতে বলল,
দু মিনিট!!!যাস্ট ২ মিনিটে এ রুম ক্লিয়ার চাই।দুই মিনিট মিনস টু মিনিটস!!
ডক্টর তীব্রর ঠান্ডা কথায় এক মূহুর্ত অপেক্ষা না করে ব্যাস্ত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। লাবিব গেল ডক্টরের পিছু পিছু। রুপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ চোখে চাইল দাদির দিকে।নাজমা চৌধুরী রুপের দিকে তাকিয়ে বলল,
রুপ দিদিভাই যাও তুমি বাসায় যাও! আমার তীব্রর সাথে কথা আছে!!
রুপ ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,
কিন্তু দাদিমা! তীব্র তো!!
নাজমা চৌধুরী রুপের কথা শেষ না হতেই বলল,
তীব্র আমাকে আঘাত করবে না রুপ!যাও!!!
রুপ অসহায় চোখে দাদির দিকে তাকিয়ে বের হয়ে এলো রুম থেকে। তীব্র!! তীব্র নামক মানুষটা কখনো তাকে তার আশেপাশে ঠায় দেয় না।দাদি ছাড়া কাউকে তার রুমে এলাও করে না। মানুষ টা নির্দয়!!আর এই নির্দয় হৃদয়হীন মানুষটাকে সে ভীষণ ভালোবাসে!
তুমি কি মনে করে আজ বাসায় গেছিলে!
দাদির কথায় তীব্র ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,
নীল ফাইল টা দরকার ছিল!!
তাহলে চলে আসলে যে!!
ইচ্ছা!!
নাজমা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।এই ছেলে চাই টা কি?কবে তাকে শাস্তি দিবে!
গুলি কিভাবে লাগল??
গুলি মেরেছে তাই লেগেছে!!
এসব ছেড়ে দাও না কেন তীব্র!!!
বিকজ আই লাইক ইট!!
খাবার খেয়ে নাও!!!
মুড নাই!!
জানো আজ কি কি রান্না হয়েছে!!
পরোটা,মাংস কসা, ক্ষীর!!
জানি!!
কিভাবে??
ঘ্রাণ!!!
তবে খেয়ে বলো কেমন হয়েছে??
মুড হলে খাব!!
বলেই ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় বসল!!
নাজমা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে আসলেন!! তীব্র নিজের ছাড়া কারো কথা ভাববে না,শুনবে না সেটা তার জানা।খাবারটা হয়তো সেভাবেই পড়ে থাকবে।যাকে সহ্য করতে পারে না তার হাতের রান্না খাবে!!হাহহহ!! বিলাসীতা!!
রাত বাজে তখন আড়াইটার কাছাকাছি।রিদি পানি খাওয়ার জন্য গ্লাসটা খালি দেখে নামতে চেয়ে পায়ের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো।একটু থেমে ধীরে ধীরে উঠে দরজা খুলে বাইরে এলো।খুরিয়ে খুরিয়ে হেটে কিছুদূর যেতেই ভেসে এলো পুরুষালী চেনা কন্ঠস্বর!এই কন্ঠ ভালো করেই চিনে রিদি। ভয়ংকর মানুষটার আওয়াজ শুনে জমে গেল রিদি ।ভয়ে কেঁপে উঠল পুরো শরীর। কাঁপা কাঁপা হাতের গ্লাস টা পড়ল ঠিক আঘাত পাওয়া জায়গায়! ব্যাথায় টনটন করে উঠলো কাটা জায়গা। একহাতে মুখ চেপে কান্না আটকে ফুঁপিয়ে উঠল।
ওয়েট!!!
ভয়ংকর লোকটার পায়ের ধুপধাপ শব্দ কানে আসতেই তটস্থ হয়ে দাঁড়ালো রিদি। তীব্র এগিয়ে এসে ঠিক রিদির পিছনে কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে থামল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল কম্পিত শরীর। এলোমেলো চুল ছড়িয়ে আছে পিঠ ছাড়িয়ে হাঁটু বরাবর।
তীব্র পিছে এসে দাড়াতেই ভেসে এলো পুরুষালী গন্ধ। কম্পিত শরীর আরো কেঁপে উঠল।ভয়ে নরচর করার মতো শক্তি নেই। এদিকে তীব্র ধীর কদমে রিদির সামনে এসে দাঁড়ালো! কিন্তু রিদি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আঘাত পাওয়া জায়গা থেকে আবারো আঘাত লাগায় রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে।
তীব্র রিদিকে আপাদমস্তক দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
আপনার রান্না আমার পছন্দ হয়েছে!! কিন্তু আজকের পর আপনার রান্না ঘরে প্রবেশ নিষিদ্ধ!!আমি এক কথা দুবার বলতে পছন্দ করি না!যদি দু বার বলতে হয় ত………..
আগে আরো কিছু বলার আগেই ঠিক প্রথম দিনের মতোই ঙ্গান হারিয়ে পড়ল তীব্রর বুক বরাবর!! তীব্র রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চুলের গোছা চেপে ধরে রিদির মুখ বরাবর তাকালো তীব্র!! রাগে হিসহিসিয়ে বলল,
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই কেন আপনাকে ঙ্গান হারাতে হবে!! তীব্র চৌধুরী অধেক কথায় থেমে যাওয়া পছন্দ করে না। ঙ্গানহীন অবস্থায় যা বলব সেটা যদি সঙ্গান অবস্থায় করেন তবে ভুগতে হবে।পরে দোষ দিতে পারবেন না! তীব্র চৌধুরী এক কথা দুবার রিপিট করে না!!কথাটুকু শেষ করে চুলের মুঠি আরো শক্ত করে ধরে আরো একটু কাছাকাছি এসে বলল,
আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৬
খবরদার!! আজকের পর আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন!এরপর আমার আশেপাশে ও যদি আপনার অস্তিত্ত্বের ছিটেফোটাও পায় তবে সেদিন ই হবে শেষ দিন!! একটু থেমে তীব্র আবারো বলল ,”আপনার উড়াউড়ির শেষ দিন!” তীব্র চৌধুরীর শিকলে বাঁধা যেহেতু পড়েছেন মৃত্যুর পরও রেহাই নেই!
এদিকে ঙ্গানহীন রিদিতা এসবের কিছুই জানল।শুনল না তীব্রর ঠান্ডা হুমকি।যে শুনলোই না সে তীব্রর হুমকি সে কি কিভাবে নিজেকে বাঁচাবে।আর তীব্র সে তো এক কথা দুবার বলতে পছন্দ করে না!!
