Home আমরণ প্রেমতৃষ্ণা আমরণ প্রেমতৃষ্ণা পর্ব ৪৪

আমরণ প্রেমতৃষ্ণা পর্ব ৪৪

আমরণ প্রেমতৃষ্ণা পর্ব ৪৪
তানহা ইসলাম বৈশাখী

পুষ্পর জ্ঞান ফিরলো ৩৬ ঘন্টা পর। অর্থাৎ দেড় দিন পর। আজ সকাল ৬ টায় জ্ঞান ফিরেছে । প্রার্থ তখন ওর বেডের পাশে বসে হাতটা মুঠোয় পুরে ঝিমচ্ছে। হঠাৎ হাত নড়ে উঠতেই সজাগ হয় সে। ভালো করে পরখ করে ওকে। চোখগুলোও যখন নড়ছে তখনই ছুটে যায় বাইরে। ডাক্তার তখন ছিলো না হসপিটালে। অন্য এক নার্সকে ডেকে নিয়ে আসে। তখন পুষ্প পুরোপুরি চোখ খুলেছে। চোখ ঘুরিয়ে দেখছে চারপাশ। প্রার্থ ত্রস্ত পায়ে ওর সামনে এলো। হৃৎপিণ্ড প্রবল বেগে উঠানামা করছে। পুষ্পর কৌতুহলী চোখ দেখে ধুকপুকানির অবস্থা নাজেহাল। এত জোরে কারো বুক ধুকপুক করে? ও পুষ্পকে ডাকলো আলতো স্বরে,

“পুষ্প!
পুষ্প তাকায় ওর দিকে। প্রার্থর তখনো ভয় করছে। ওকে কি চিনতে পারবে পুষ্প? যদি চিনতে না পারে। যদিই কোন গড়বড় হয়। মস্তিষ্কের ব্যাপার স্যাপার। সে একটা ঢোক গিলে কাঁপা স্বরে বলল,
” আ..আমাকে চিনতে পারছিস? আমি কে চিনতে পারছিস?”
পুষ্প হেসে ফেলে তখন। ঠোঁট প্রসারিত হয় অল্প পরিসরে। দূর্বল গলায় বলে,
“আমার ‘বউ পাগল জামাই’ আপনি। আপনাকে না চিনলে বউ হলাম কোথায়?”
প্রার্থ হৃদয় শান্ত হলো অবশেষে। শ্বাস নিলো বড় বড়। বুকের উঠানামা কমে এসেছে। পুষ্পর কথায় ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো। প্রনখোলা হাসি। সাথে হাসলো দাঁড়িয়ে থাকা নার্সও।
প্রার্থ ঝুঁকে গিয়ে পুষ্পর কপালে চুমু খায়। মোহনীয় স্বরে বলে,
“ওয়েলকাম ব্যাক মাই ফ্লাউয়ার। আপনার ‘বউ পাগল’ জামাইয়ের জীবন বউ ছাড়া অপূর্ণ। আপনাকে ছাড়া সে খুব কষ্টে দিন পার করছে। জলদি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আমার বুকে আসুন।”
পুষ্প দূর্বল হাতটা তখন রাখলো প্রার্থর দাড়ি খচিত গালে। পাশ থেকে নার্স মেয়েটা পুষ্পকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“এমন বউ পাগল জামাই পাওয়াটাও কিন্তু ভাগ্যের ব্যপার ম্যাম। আপনার হাজব্যান্ড তো মনেহয় আপনাকে ছেড়ে হসপিটাল থেকে নড়েওনি। আপনার দেখাশোনায় থাকার কথা ছিলো আমাদের তবে উনি কিন্তু থাকতে দেয়নি। নিজেই থেকেছে আপনার কাছে। ইয়্যু আর আ লাকি ওয়াইফ টু হ্যাভ আ হাজব্যান্ড লাইক হিম।
কথাটুকু বলে তিনি ওদের একলা ছেড়ে রুম থেকে চলে যান। পুষ্প তার থেকে চোখ ফিরিয়ে প্রার্থর দিকে তাকায়। দূর্বলতার জেরে মৃদু গলায় বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” আপনাকে আমি কি বলে গিয়েছিলাম প্রার্থ? বলেছিলাম না ফিরে এসে যেন এমন ভাঙাচোরা চেহারা না দেখি। তবুও কেন এই হাল?”
প্রার্থ ওর হাতের তালুতে ঠোঁট ছোৃয়ালো। বলল,
“আমার ফুল এখানে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছে আমি তাকে রেখে চেহারা ঠিক করায় নামবো? না ম্যাডাম। আপনি সুস্থ হোন এরপর আমাকে খাইয়ে দায়িয়ে, ঘুম পারিয়ে, যত্ন নিয়ে আমার চেহারা সুরত ঠিক করে দিয়েন। ওটা আপনার উপরেই ছাড়ে দিলাম।”
‘আপনি’ সম্বোধনে পুষ্পর একটু লজ্জা পেলো। কিন্তু প্রকাশ করলো না। বলল,
“তাই বলে এমন শুকিয়ে যাবেন?”
প্রার্থ নিজের বুকের কাছে পুষ্পর হাত নিয়ে ধরে বলে
“গোটা একদিন দুই রাত জালিয়েছিস। এখানটাতে বারবার ঝড় তুলেছিস। পুড়িয়ে ছাই করেছিস। দোষ তো তোরই। এই এত পরিমানে জ্বালালে শুকাবো না?”
পুষ্পর চোখের কোন বেয়ে অশ্রু গড়ালো। এত ভালোবাসা যে কোথায় রাখবে সেটাই খুঁজে পায়না। কে বলবে এই মানুষ টা তাকে কদিন আগেও কত আঘাত দিয়েছে, ঘৃণার চোখে তাকিয়েছে? সেই মানুষটাই কিনা এখন ওকে পাগলের মতো ভালোবাসে। আল্লাহ চাইলে কি-না পারে? তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী। নিজের সুস্থতা ও প্রার্থ ভালোবাসা এতকিছুর জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতে ভুললো না সে।

বাড়ির সকল সদস্যকে খবর দেওয়া হয় তখনই। সবার হসপিটালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ৮ টা বেজে যায়। ডক্টর ইফতেখার এসেও তখন চেক-আপ করে যায়। একদিন পরেই ডিসচার্জ করে দিবে পুষ্পকে। আপাতত দূর্বল সে। বাসায় নিলেও ভারী কাজ করা যাবে না। মাথায় সমস্যা হয় তেমন কিছুও করা যাবে না। প্রার্থ ডাক্তারের সাথে সব কথা সেরে নিলো। সে প্রোপার কেয়ারে রাখবে পুষ্পকে। বিছানা থেকে তো উঠতেই দিবে না।
প্রিয়া তখন পুষ্পকে জরিয়ে ধরে কাঁদছিলো। সুখের অশ্রুতে পরিপূর্ণ পুরো কেবিন। পূর্ণতা মেয়ের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। পূর্ণিমা পাশে বসে কত কথা বলছে। অহনা বেগমও ও আশরাফ সাহেবও আজ অফিসে গেলেন না। পুষ্পর পাশেই রইলেন। মোহ ভার্সিটির নাম করে হৃদয়ের সাথে হসপিটালে এসেছে।
এত এত মানুষের ভীরে প্রার্থ আর জায়গা পেলো না পুষ্পর কাছে বসার। দুদিন সারাক্ষণ ওর কাছেই থেকেছিলো তাই আজ তাকে দূরে বসিয়ে রেখেছে।
একটু পর কেবিনের দরজা ঠেলে প্রবেশ করলো অর্নব। পেছনে গুটিগুটি পায়ে ঢুকলো স্নেহা। অর্নব ফুরফুরে মেজাজে বলল,

“কি প্রিন্সেস, কি অবস্থা? কেমন আছো এখন?”
পুষ্প মৃদু হেসে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া ভালো আছি।”
” সবসময় ভালোই থেকো। তোমার জন্য যে কতজনের জান গলায় ঝুলে ছিলো আল্লাহ ভালো জানেন।”
পুষ্প হেঁসে কিছু বলবে তখন চোখ পড়লো স্নেহার উপর। মেয়েটা ওর দিকে করুন চোখে তাকিয়ে আছে। চোখ ভর্তি জল। আরেকটু হলেই উপচে পড়বে। পুষ্প নরম গলায় বলে,
“স্নেহা। কাঁদছো কেন মেয়ে?”
এইটুকু নরম গলায় স্নেহার নরম মনে কান্নার জোয়ার এলো। মেয়েটা শব্দ করে কেঁদে ফেলে। অর্নবের শার্ট দুহাতে খাঁমচে ধরে। সবাই আশ্চর্য বনে তাকায় ওর দিকে। অর্নব জানে ও কেনো কাঁদছে। ওকে টেনে সামনে নিয়ে এলো। গাল ধরে উচু করে নরম গলায় বলল,
“স্নেহা, কাঁদছো কেন? প্রিন্সেস ঠিক আছে তো। ডোন্ট ক্রায় স্নেহা। ”
সবাই কৌতুহলী চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে। অর্নব পুষ্পকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“তোমার অসুস্থতা দেখে যে কতবার কেঁদেছে ও। আমার মনেহয় প্রার্থও এত কাঁদেনি।”

পুষ্পর মায়া হলো ভীষণ মেয়েটার প্রতি। বয়সে খুব হলে দুই এক বছরের ছোট হবে স্নেহা। তবে চোখ মুখে কেমন বাচ্চা বাচ্চা ভাব। মনটা বোধহয় একটু বেশিই নরম। মিষ্টি মেয়েটাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো সে।
পাশে বসিয়ে জরিয়ে ধরলো। পিঠি হাত বুলিয়ে দেয়। এরপর ছেড়ে স্নেহার ছোট মুখটা হাতে তুলে বলে,
“কাঁদছো কেন মেয়ে? জীবন কি আর সবসময় আনন্দের হয়? মাঝে মাঝে জীবনকে দুঃখের পাতায়ও উৎসর্গ করতে হয়। নয়তো সুখের দেখা মেলে না। এই যেমন এত এত দুঃখের পর এই দেখো আমার কত সুখ। আমার পরিবার আমাকে কত ভালোবাসে সেটা এই দুঃখ নামক পাতায় না আসলে কখনো জানতে পারতাম? সুখগুলো কি এভাবে আমার ঝুলিতে এসে ধরা দিতো? হ্যাঁ মাঝে ওই বিভীষিকাময় পাতাগুলো জীবন থেকে অনেক মূল্যবান জিনিস কেড়ে নিয়েছে। তাতে কি ? আল্লাহ যখন আবার দিবেন তখন নাহয় সেটুকুও পুষিয়ে নিবো। এত সহজেই ভেঙে পড়ো না মেয়ে। জীবনে অনেক দূর যাওয়া বাকি। জীবন সম্পর্কে জানা বাকি। আরো বড় হও। দুঃখরা তোমাকে অভিশাপ হিসেবে না ছুঁক। সুখ হয়ে ছুঁয়ে দিক। অবশ্য যার বউ তুমি সে তোমাকে দুঃখ দিতে পারেই না। অনেক সুখী হও।”
কথাগুলো শুনে গর্বে বুক ফুলে উঠে সকলের। এইত কদিনকার মেয়ে। সবার কত আদরের। সে মেয়ে জীবনের এমন একটা পর্যায় এসে দাঁড়িয়েছে তাকে ভাঙা যেন কোন সহজ কাজ নয়। যেন কয়েকদিনেই কয়েকশো গুন বেশি বড় হয়ে গেছে। বুঝদার হয়ে গেছে।

অর্নব পুষ্পর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে স্নেহাকে বলে,
“বলেছিলাম না স্নেহা, প্রিন্সেস ইজ আ রিয়েল চ্যাম্প। এই নরম মনের মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে দেখলে? কাল অব্দিও কত ছোট ছিলো, আদুরে ছিলো। আজ তাকে কতবড় লাগছে।”
অর্নব বলতে বলতে কতকিছু বলল। কিন্তু প্রার্থর তা পছন্দ হলো না। জেলাস ফিল হলো বোধহয়। এতক্ষণ পর সে উঠে দাঁড়ালো। অর্নবের পাশে গিয়ে এক হাতে কাঁধ পেঁচিয়ে ধরলো। কথা ছাড়াই ওকে ঘুরিয়ে অন্য দিকে নিয়ে গেলো। বাকি সবাই তেমন মনোযোগ দিলো না তাতে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলো পুষ্পর ম্যাচিউরিটি দেখে।
প্রার্থ একটু সরে এসে দাঁতে দাঁত পিষে ছোট আওয়াজে বলে,

“তোকে না বলেছি প্রিন্সেস ডাকবি না ওকে। আমার বউয়ের এত প্রসংশা কে করতে বলেছে তোকে?”
অর্নব অবাক হয়। ও কি করলো? যা সত্য তাই তো বললো। এতদিন ধরে প্রিন্সেস বলে এসেছে এত তারাতাড়ি অভ্যেস বদলানো যায় নাকি। ও-ও স্বল্প স্বরে দাঁত চেপে বলল,
“যা সত্য তা বলতে পারবো না?”
“না পারবি না। আমার বউয়ের ক্ষেত্রে পারবি না। তোর বউ নেই?”
“আছে। বউ থাকবে না কেন? ওইতো আমার বউ তোর বউয়ের সাথে গলায় গলায় ভাব করছে। দেখতে পারছিস না?”
“হ্যাঁ, আমারই খুঁজে দেওয়া বউ। আমার বউয়ের দিকে যাতে নজর না দিস এজন্য তোকেও বউ এনে দিলাম তবুও পিছে পড়ে আছিস, শালা। ”
“তাই বলে এমন বউ খুজলি? এত নরম বউ আমার কপালেই জুটলো। পুষ্পর মতো বউ পেলে ভালো লাগতো।”
অর্নব ইচ্ছে করে খুঁচিয়ে বলল কথাটুকু যাতে খেপে যায় ও। প্রার্থ খেপলোও। হাত বাড়িয়ে ওর পেটে জোরে চিমটি কেটে বলল,

আমরণ প্রেমতৃষ্ণা পর্ব ৪৩

“ভুলে যা। পুষ্পর মতো কোনকিছুই তোর কপালে জুটবে না। আমি অন্তত জুটতে দিবো না। এরপর আমার বউয়ের দিকে তাকালো শালা তোর চোখ খুলে তোর বউয়ের হাতে তুলে দিবো।
” না তাকালে কেমনে কি? চোখ বন্ধ করো রাখবো নাকি?
“প্রয়োজনে তাই রাখবি। আমার বউয়ের সামনে আসলেই তুই অন্ধ হবি। ”
অর্নব ওর পেটে কুনুই দিয়ে গুঁতা মেরে বলল,
” তুই শালা অভার পসেসিভ, টক্সিক।”
প্রার্থ এ্যটিটিউটের শোহিত বলল,
“আই নোও”

আমরণ প্রেমতৃষ্ণা পর্ব ৪৫