Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৬৯

আমার আলাদিন পর্ব ৬৯

আমার আলাদিন পর্ব ৬৯
জাবিন ফোরকান

চোখের সামনে পিতা…উঁহু, পালক পিতা আহমদের মুখটা দেখেও বিশেষ কিছু বোধ হলোনা সাইবানের। ভেতরকার অনুভূতিগুলো মরে গিয়েছে। কেউ যদি তার বুকে গু*লি করে, তাও ব্যথা অনুভূত হবে কিনা সন্দেহ। তাই ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে আহমদের দিকে শূণ্য চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া সাইবান আর কিছুই করলনা। আহমদ ছেলেকে দেখলেন। তার শুষ্ক চোখের ভেতর খুব সূক্ষ্ম কিছু উঁকি দিল বোধ হয়। সেটা বোধগম্য হওয়ার আগেই হাত বাড়িয়ে সাইবানের বাহু ধরে জোর করে টেনে তুললেন তিনি। বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডায় শরীর অবশ হয়ে যাওয়ায় সাইবান খানিকটা টললেও কলের পুতুলের মতন উঠে দাঁড়াল। আহমদ কোনো কথা বললেন না। হাত তুলে একটা সি এন জি থামিয়ে ছেলেকে ঠেলে ভেতরে তুলে দিলেন।

“আমার সিট ভিজা যাইতেছে, সাহেব।”
অসহায় সি এন জি চালক সিক্ত সাইবানকে দেখে প্রতিবাদ করতে চাইলেও আহমদ চোখ পাকিয়ে বললেন,
“বৃষ্টির দিনে গাড়ি ভিজবে না? যেখানে বলছি নিয়ে চলো, ভাড়া বাড়িয়ে দেব।”
অবশ্যই, ভাড়া বাড়িয়ে দেয়ার সামনে কোনো কথা চলেনা। সি এন জি চালকও আর কিছু বললনা। সাইবান একপাশে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে রইল। না আহমদের দিকে ফিরে তাকাল, না কিছু বলল। তার জীবন কোথায় যাচ্ছে, কে তার সাথে আছে, কে নেই তাতে আর কিছুই যায় আসেনা।
আধ ঘণ্টা বাদে একটা আবাসিক এলাকায় থামল সি এন জি। পাশেই লোহার গেট আর গেটের ভেতরে পনেরো তলা বিশিষ্ট একটি বাসভবন। আহমদ ভাড়া মিটিয়ে ছেলেকে নিয়ে নামলেন। বৃষ্টি ততক্ষণে শেষ হয়েছে। ভেজা আকাশে তরল সূর্য উঁকি দিচ্ছে। সাইবানের বাহু ধরে টেনে টেনে নিয়ে গেলেন আহমদ। লিফটে ঢুকে নবম তলার বোতাম চাপলেন। কিছুক্ষণ বাদে পৌঁছাতেই লিফট থেকে বেরিয়ে একটা কাঠের দরজার সামনে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলে সাইবানকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। অভ্যন্তরে পা রেখে এবার কিছুটা নজরপাত করতে বাধ্য হলো সাইবান। ছিমছাম একটা ফ্ল্যাটবাসা। আধুনিক এবং অভিজাত হলেও আসবাবের বালাই নেই। পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। তবে ফাঁকা ফাঁকা। এটা কার বাসা? মাথায় প্রশ্ন আসলেও সাইবান করলনা। আহমদ আগে বেশিরভাগ সময়েই বাড়িতে থাকতেন না। সবসময় যে বিদেশেই ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকতেন তাও না। তাহলে দেশের কোথাওই বসবাস করতেন। এটাই কী তবে তার আরেকটা সংসার? জানতে আর ইচ্ছা হলোনা সাইবানের। সাদা টাইলসের মেঝেতে দাঁড়িয়ে রইল সে। ভেজা শরীর বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়িয়ে মেঝে ভিজিয়ে তুলল ক্রমশ। অথচ সে সামান্য বিচলিত হলোনা। ভিজলে ভিজুক, তাতে কার কী? আহমদ ভেতরের একটা রুমে গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন। খুব সম্ভবত বেডরুম। সেখান থেকেই মিনিট দুই বাদে তিনি ফিরে এলেন। হাতে একটা ট্রাউজার আর তোয়ালে। ছেলের কাছে সেগুলো ধরিয়ে দিয়ে তিনি শান্ত গলায় বললেন,

“ওটা বেডরুম। বাথরুম আছে ভেতরে। গোসল করে নে।”
সাইবান কোনো গাইগুই করলনা। নিঃশব্দে ভেতরে চলে গেল। আহমদ এগোলেন রান্নাঘরের দিকে। বাথরুমে গিজার থাকা সত্ত্বেও সাইবান কনকনে ঠান্ডা পানিতে গোসল করল। গোসল বলতে শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে রইল আধ ঘণ্টা মতন। তারপর পোশাক বদলে শুধু ট্রাউজারটা পরে তোয়ালে ঘাড়ে চেপে বেরোল। বাবা ছেলে আগে নিজেদের পোশাক শেয়ার করতে পারলেও এখন পারেনা। জিমে যোগদানের পর থেকে সাইবান গায়ে গতরে অনেক বেড়েছে। আহমদের ফিনফিনে শরীরের পোশাক তার গায়ে অনেক আঁটসাঁট হয়। শুধু কোমরের সাইজটা মোটামুটি মেলে। বেডরুম থেকে বেরোতেই সাইবান আরেক অভাবনীয় দৃশ্য দেখল। ছোট ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো। খুব সাধারণ খাবার। ভাত, ডিমভাজা আর মরিচের ভর্তা। খুব দ্রুত বানানো হয়েছে স্পষ্ট। কিন্তু বানিয়েছে কে? আহমদ? সাইবান আর সারিকা যখন ছোট ছিল, তখন এই বিষয় মানা গেলেও এখন হজম করতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। তবুও সাইবান বিশেষ প্রতিক্রিয়া না করে চেয়ার টেনে বসল। মাথার চুল ভেজা তার, টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে ঘাড়ে আর বুকে। আহমদ জগ ভরে পানি নিয়ে এসে ছেলের পাশে বসলেন। সাইবান ভাবল আহমদ খাবার প্লেটে বেড়ে এগিয়ে দেবেন, আর সে একটা ঝটকা দিয়ে সব ফেলে দেবে। কিন্ত তার পরিকল্পনা সফল হলোনা। আহমদ প্লেটে বেড়ে নিলেন ঠিকই, কিন্তু সাইবানের হাতে দিলেন না। বরং মরিচ ভর্তা আর ডিম ভাজা ভেঙে ভাতে মিশিয়ে লালচে বানিয়ে গ্রাস তুলে ধরলেন নিজের হাতে, সাইবানের ঠোঁটে ছুঁইয়ে বললেন,
“হা কর, বড় করে।”

বুকে হাহাকার, চোখে বেদনা আর রাজ্যের অসহায়ত্ব অনুভব হলেও সাইবান এর বিপরীতে কেন যেন রাগ দেখাতে পারলনা। হা করল সে, ঠিক ছোট্ট সাইবানের মতন, একটা সময় যার বাবার হাতে একবেলা না খেলে দিন যেত না। সেই দিন বহু বছর বাদে ফিরে এসেছে রোমন্থন হয়ে। আহমদ ধৈর্য্য ধরে সাইবানকে খাইয়ে দিতে লাগলেন। মুখভর্তি খাবার নিয়ে চিবুতে চিবুতে অবাক নয়নে সাইবান দেখে গেল আহমদকে। কাকে কী ভেবেছিল! আর কে কী বেরোল! এত এত রহস্য, এত বেঈমানি, এত ঠকে যাওয়া! অথচ এখানে বসে সে ওই একটা মানুষের সাথে, যার সাথে সম্পর্কটা আর কখনো স্বাভাবিক হওয়ার আশা সে ছেড়ে দিয়েছিল। যার প্রতি তার উত্তাল অভিমান। অথচ দিনশেষে শুধু সেই রয়ে গেল সাইবানের পাশে। সাইবানকে খাওয়ানো শেষ করে আহমদ উঠে গেলেন। হাত ধুয়ে এসে দেখলেন ছেলের চুল থেকে টপটপ করে পানি গড়াচ্ছে তখনো। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে কাঁধ থেকে তোয়ালে টেনে মাথা মুছে দিতে লাগলেন। হালকা আঁচে ধমক দিলেন,

“ঠান্ডা লাগিয়ে নিউমোনিয়া বাঁধাতে চাস ছোটবেলার মতন?”
“বাঁধলেও বা কী? আমি তো তোমাদের ছেলে না। মরলে মরব।”
অবশেষে সাইবানের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো। শীতের কারণে খানিকটা বসে গিয়েছে। আরও গুরুগম্ভীর হয়ে গিয়েছে। আহমদ মাঝপথে থমকালেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এরপর কাজ জারি রেখে গভীর গলায় বললেন,
“যে কথাটা বলতে আমার ২৫ বছর লেগে গেল, সেই কথা তুই আজ ২ সেকেন্ডে বলে দিলি!”
সাইবান অসহায় অনুভব করল। দুহাত মুঠো পাকিয়ে গেল তার। আহমদ তার মাথা মোছা শেষ করে চেয়ার টেনে পুনরায় পাশে বসলেন।
“তোর আমার প্রতি এক আকাশ সমান অভিমান, না রে?”
মুখ ফিরিয়ে নিল সাইবান। ঘুরে অন্যদিকে তাকাল। তাতেই যা বোঝার বুঝে গেলেন আহমদ। সামান্য হাসলেন তিনি, পরিহাসের হাসি।

“আমি যা করেছি সব তোর জন্য করেছি।”
একটুখানি বিরতি, অতঃপর,
“যার গায়ে আমার একফোঁটা র*ক্ত নেই, তার জন্য আমি নিজের র*ক্তের সাথে বেঈমানি করেছি। বাবার অনুভূতি কী এটাকেই বলে, চ্যাম্প?”
এবার সাইবান অবাক হলো। সত্যিই ভীষণ অবাক হলো। বুকের ভেতর আলোড়ন উঠল যেন। ঝট করে ফিরে তাকাল সে। প্রসারিত দৃষ্টিতে দেখল আহমদকে। তার জ্বলজ্বলে চোখে ভাসতে থাকা প্রশ্নটা বুঝে নিলেন আহমদ, নিজে থেকে জানালেন,
“তুই যে আমাদের আসল ছেলে না, আর ইরাম আমাদের মেয়ে এই হিন্ট আমিই অরণ্য মির্জাকে দিয়েছিলাম।”
বেঈমানির আর কিছু বাকি আছে বলে মনে হয়না। সাইবান এখন তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা। আহমদকে একটুও অনুতপ্ত দেখাচ্ছে না, দেখাচ্ছে দুঃখী। কাঁধজোড়া নুয়ে পড়েছে যেন বাস্তবতার ভারে ক্লান্ত তিনি। সাইবানের গলা কাঁপল, ফিসফিস করে সে শুধু একটাই শব্দ উচ্চারণ করতে পারল,

“ক…কেন?”
আহমদ মুখ নামিয়ে নিলেন। নিজের কোলের দিকে তাকালেন।
“যেন আমার মেয়ে তোকে নিজের স্বার্থের জন্য আর ব্যবহার করতে না পারে। যে ভুল ইরাম করেছে, আমি সেটা শোধরাতে চেয়েছি।”
সাইবানের ভ্রু তীব্রভাবে কুঁচকে গেল,
“তুমি জানতে?”
আহমদ একটি নিঃশ্বাস ফেলে মাথা দোলালেন।
“জানতাম। তোর বিয়ের আগে সামিয়া ফোন দিয়ে আমাকে বলেছিল।”
এরপর আর কিছু বলার থাকে না। সবাই আসলে বেঈমান! কেউ ভালো না, কেউ না! নিজের মাথা চেপে ধরল সাইবান দুহাতে। কে কী খেলছে? কেন খেলছে? খেলার জন্য শুধু তাকেই পাওয়া গেল? সবাই শুধু নিজেদের মতন বল নিয়ে মাঠে দৌড়াচ্ছে। সাইবান হচ্ছে সেই বল যাকে যে যেভাবে পারছে লাথি দিয়ে যাচ্ছে! এক সেকেন্ডের বিশ্বাসেরও গুরুত্ব নেই! আহমদ ছেলের প্রতিক্রিয়া দেখলেন। ইতোমধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়া একটা মানুষকে পুনরায় ভাঙতে তার বিবেকে বাঁধল। কিন্তু আর কোনো উপায় নেই, সুযোগ নেই। আজ তাকে সত্যিটা জানাতেই হবে। এই বোঝা বুকে চেপে মৃ*ত্যু হলে পরকালে তার শান্তি মিলবেনা। আহমদ গলা খাঁকারি দিয়ে মুখ খুললেন, তার কণ্ঠ সামান্য কাঁপলেও তিনি বলতে শুরু করলেন,

“তোর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার পর থেকেই আমার আর সামিয়ার সম্পর্কে অনেক দূরত্ব এসেছিল। কেন জানিস? কারণটা পরোক্ষভাবে তুই যদিও তোর দোষ নেই। আমার তোকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। তোর ডাক্তার হওয়াটা আমার জন্যও প্রচন্ড আবেগের ছিল। আমি জানি, তোর উপর জুলুম করে ফেলেছি। আমি নিজেই অগোছালো ছিলাম। তুই মেডিকেলে টিকবিনা এই ব্যাপারটা আমার মাথাতেই আসেনি কোনোদিন। এতটাই বিশ্বাস ছিল তোর উপর। আমি জানি আমি ভুল ছিলাম। সন্তানের উপর এমন প্রত্যাশা জুলুমই। তবুও সেই সময়টায় বোঝাতে পারিনি নিজেকে। রাগের মাথায় তোর সাথে খারাপ ব্যবহারও করে ফেলি। আমি নিজেকে মানাতেই পারছিলাম না। বিজনেসের খাতিরে বড় বড় মানুষজনের সাথে ওঠাবসা। সবাইকে বড়াই করে বলতাম আমার ছেলে ডাক্তার হবে, হবেই হবে। তাদের ছেলেমেয়ে সকলে পাবলিকে টিকে গেল, আমার ছেলেটার কোনো হিল্লে হলোনা। তারাও খোটা দিতে ছাড়লনা। এই নিয়ে আমি কিছুটা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিলাম। সেটা তোর মা সহ্য করতে পারলনা। একদিন চুপচাপ বাগানে বসে ভাবছিলাম কী করা যায়, কীভাবে ধীরে ধীরে সব ঠিক করে নেয়া যায়। তুই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলি। তখন তুই সেকেন্ড টাইমের জন্য সারাদিন, সারারাত রুমবন্দী হয়ে পড়াশোনা করতি। বিষয়টা আমার ভালো লাগতনা। ভাবছিলাম, সেই রাতেই তোর সাথে কথা বলব, সরি বলব। তখন আমার কাছে সামিয়া এলো। এসেই কী বলল জানিস? বলল, তুই আমার নিজের ছেলে না দেখেই তোর সাথে আমি এমন রূঢ় আচরণ করছি। নিজের ছেলে হলে নাকি এমন পাষাণ হতে পারতাম না!”

এটুকু বলে থামলেন আহমদ। মাথায় হাত ঠেকিয়ে দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলেন।
“সারিকা আর তোকে আমি কোনোদিন আলাদা চোখে দেখিনি। আরে তুই যখন আমার বুকে এসেছিলি তখন তোর বয়স তিন দিন! পুলিশের সাথে কথা বলেছি, কাগজপত্র ঠিক করেছি, তোর নাম ভেবেছি, কত না স্বপ্ন বুনেছি তোকে নিয়ে! এখন বলতে লজ্জা নেই, কিন্তু তখন আমি ভেবেছিলাম তোর মধ্য দিয়ে আল্লাহ আমার কোলে ইরামকে ফিরিয়ে দিয়েছেন! তোর বাবা তো আমিই, শুধু আমি! অথচ সামিয়া কী অবলীলায় দোষারোপ করে ফেলল আমাকে! যেন আমার তোর প্রতি অভিমান করারও অধিকার নেই। আঠারো বছরের পিতৃত্ব এক সেকেন্ডে প্রশবিদ্ধ হয়ে গেল! সেদিন আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনি আর। সামিয়ার প্রতি আমার তীব্র ক্ষোভ জমা ছিল। ওকে আমি এতটাই ভালোবাসতাম, এতটাই চাইতাম যে কোনোদিন ওর হ্যাঁ তে না বলিনি। ও যা বলেছে, যা চেয়েছে, তাই করেছি। বিনিময়ে শুধু ওর ঠোঁটে সবসময় হাসি দেখতে চেয়েছি। অথচ ও সেদিন কী করল? আমায় কাঠগড়ায় দাঁড় করাল। আর পারিনি নিজেকে আটকাতে। এমন সব তিক্ত সত্যি সেদিন বেরিয়ে গিয়েছে যা ফেরানোর কোনো উপায় ছিলনা। আমাদের মাঝে ভীষণ কথা কাটাকাটি আর দোষারোপ হয় সেদিন। ধরে নে আমি তোর মাকে এমন কিছু বলেছি, আর তোর মা আমাকে এমন কিছু বলেছে যা মেনে নিয়ে আমাদের আর সুখী দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নেয়া সম্ভব ছিলনা।”

সাইবান চুপটি করে সব শুনে গেল। ধীরে ধীরে পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হচ্ছে তার সামনে। কী অদ্ভুত পৃথিবী! প্রত্যেকটা মানুষ কতকিছুর ভেতর দিয়ে যায়! আমরা বুঝতেও পারিনা। আহমদের পরিবার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া, অভিমান, সামিয়ার সঙ্গে দূরত্ব এসবকিছুর কারণ এখন স্পষ্ট। কিন্তু দোষটা আসলে কার? সামিয়ার? আহমদের? সাইবানের? নাকি সবার? সেই হিসাব সাইবান করতে পারলনা। আহমদ বেশ অনেকটা সময় চুপ রইলেন নিজেকে ধাতস্থ করতে। চোখে বুঝি অশ্রুও জমলো। হাতের আঙুলে চোখের কোণ মুছে খানিকটা নাক টেনে তিনি জানালেন,

“যখন ইরামের সাথে তোর বিয়ের খবরটা শুনেছি, আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিছুতেই যুক্তি মিলছিলনা। আর সামিয়ার কথাগুলো শুনে মনে হলো সে মেয়ের ভালোর জন্য সবকিছু লুকাতে প্রস্তুত। আমার প্রতিবাদে আর কিছু যায় আসতনা। কারণ ততদিনে এই পরিবারের কাছে আমি মূল্যহীন হয়ে গিয়েছি। প্রথমটায় ভেবেছিলাম, কিছু বলবনা। শুধু দেখে যাব দূর থেকে। কিন্তু এই বোকা মন সেটাও পারলনা। আবার পা দিলাম ওই বাড়িতে। নিজেকে বোঝালাম, দূরে দূরে থেকেই চুপচাপ দেখে যাব। সেই দেখাটাও হলো না। যখন তোকে ইরামের সাথে হাসিখুশি দেখতাম, আমার ভালো লাগার চেয়ে ভয় হতো বেশি। তোকে নিয়ে। সবার মুখে মুখোশ। সবাই তোকে ব্যবহার করে যাচ্ছে স্বার্থের বশে। আমার হাতে দুটো উপায় ছিল, এক, সব জেনেবুঝে চুপচাপ থাকা। তোকে ব্যবহার হতে দেয়া। দুই, কোনোভাবে সত্যিটা তোর সামনে নিয়ে আসা। যেন তুই সবার আসল চেহারাগুলো দেখতে পাস। তোর এখন মনে হতে পারে, এটা আবার কেমন বাবা? যে নিজের মেয়ের সুখই দেখতে পারেনা! হ্যাঁ, আমি নিজেও জানি আমি বাবা হিসাবে খুব জঘণ্য। আমি আমার সন্তানদের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়েছি। অন্যজনকে তো বহু আগেই উৎসর্গ করে দিয়েছি ভালোবাসার নামে। যবে থেকে উৎসর্গ করেছি, তবে থেকে মনকে সামলে নিয়েছিলাম, কোনোদিন ওই সন্তানের উপর লোভ করবনা। অরণ্যর সাথে আমার দুবার ব্যবসায়িক কাজে দেখা হয়েছিল। তাই হালকা পরিচিতি ছিল। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছি। চেয়েছিলাম, গভীর গর্তে ফেঁসে যাওয়ার আগেই যেন তুই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসিস। যে পর্যায়ে গেলে আর ফিরে আসার উপায় থাকবে না, সেই পর্যায় পর্যন্ত তোকে যেতে দিতে চাইনি। এইতো। এটাই একজন স্বার্থপর, জঘণ্য, ব্যর্থ আর খারাপ বাবার কাহিনী। যার আদতে বাবা হওয়ার যোগ্যতাই নেই।”

মুখ নত করে ফেললেন আহমদ। আর সামলানো গেলনা। চোখ গড়িয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু টপটপ করে তার কোলের উপর পড়তে লাগল। সাইবান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। একদিনে এত সত্য হজম করাটা দুষ্কর। কাকে বিচার করবে সাইবান? কীভাবে করবে? এক মা কে? যে তাকে নিঃস্বার্থভাবে আগলে নিয়ে নতুন জীবন দান করেছে? একটা পরিবারকে? যারা তাকে এতটাই ভালোবেসেছিল যে দুই যুগেও তার সামান্যতম সন্দেহ হয়নি আত্মপরিচয় নিয়ে? নাকি এক বাবাকে? যে এক সন্তানের স্বার্থ বলি দিয়ে অপর সন্তানকে সত্য চিনিয়েছে? কেউ স্বার্থহীন না, সবাই স্বার্থপর। যে যার নিজ ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে গিয়েছে। ফলাফল ভাবেনি। পরিণতি চিন্তা করেনি। অথচ যারা কাজগুলো করেছে তাদের কিছু হয়নি, ফেঁসেছে শুধু সাইবান। হেরেছে সে, হারিয়েছে সে, ধ্বংস হয়েছে সে। অন্য কারো একটা চুলও বাঁকা হয়নি। এত নিষ্ঠুর কেন এই পৃথিবী? আহমদ তার পাশে বসে নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষণে ক্ষণে বিড়বিড় করে একটা কথাই বলছেন,

“যদি পারিস, কোনো একদিন আমাকে ক্ষমা করে দিস।”
ক্ষমা? শুনলেই এখন হাসি পায় সাইবানের। কতজন মানুষকে ক্ষমা করবে সে? এই পর্যন্ত সবাই নিজের জন্য করে গেছে। নিজের মনের শান্তির জন্য। আহমদের মধ্যে ব্যতিক্রম একটাই। তিনি নিজের স্বার্থের জন্য করলেও তার স্বার্থসিদ্ধির কারণে সাইবান সত্যের মুখোমুখি হয়েছে। ঠিক সেই কারণে নাকি পিতৃত্ববোধের টান থেকে সাইবান দূর্বল হলো, সে জানেনা। একটা হাত বাড়িয়ে সাইবান আলতো করে রাখল আহমদের কাঁপতে থাকা পিঠের উপর। অতঃপর ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো, ড্যাড। সবকিছু থেকে দূরে। অনেক দূরে।”

লাগেজ দুটো রেখে কলিংবেল বাজাল ইহান। তার পিছনেই দাঁড়ানো ইরাম। ইযান সারাটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে দূর্বল হয়ে মায়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেকে দুই বাহুতে আগলে রেখেছে ইরাম। তার দুই চোখ শূণ্য। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরই কারুকাজ করা কাঠের দরজা খুলে গেল। ওপাশে দেখা মিলল এক তরুণীর। চেহারা দেখেই বোঝা সম্ভব কৈশোর পেরিয়ে সদ্য তারুণ্যে পা দিয়েছে। ফর্সা চেহারা, কোকড়ানো বব কাট চুল। পরনে বেগুনী রঙের টি শার্ট আর চেক পাজামা। ঠোঁটে অকারণেই বিরাট হাসি লেগে আছে।
“ইরাম আপু! আসো আসো।”
ইহান সরে আগে বোনকে ঢোকার জায়গা করে দিল। ভেতরে প্রবেশ করল ইরাম। ছেলেকে বুকে আগলে রেখে আশেপাশে তাকাল। অতঃপর সৌজন্যসূচক জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো, রাবেয়া?”
মেয়েটি চোখ উল্টে কপাল চাপড়ে বলল,
“ওহ গড! রাবিয়া, আপু, আমি রাবিয়া, নট রাবেয়া!”
“সরি সরি। ভুলে যাই বারবার। রাবিয়া।”
ইহান ভেতরে ঢুকে একপাশে দুটো লাগেজ রেখে তীর্যক হেসে আনমনে বলল,
“বাংলায় রাবেয়া ভালো লাগে না, উর্দুতে রাবিয়া ভালো লাগে। রাজাকার।”
রাবিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। ইহানকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল সে। বয়সে ইহান ছোট হলেও ছেলে হওয়ার দরুণ উচ্চতা আর ওজন দুটোই রাবিয়ার চাইতে বেশি। উপরন্তু ইহানের মাঝে একটা ভাবগাম্ভীর্য আছে। রাবিয়া চোখ সরু করে বলল,

“মিস্টার লম্বু, আপনি মনে হয় খুব মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন! ডিম ফুটে বেরিয়েছিলেন ৭১ এ?”
ইহান কপালের বলিরেখায় রাগ ফুটিয়ে তীব্র চোখে তাকাল,
“লম্বু বলছেন কাকে? আমি পারিবারিকভাবে স্ট্রং গ্রোথ হরমোনের অধিকারী। নিজেকে দেখেছেন? চার ফুটের চমচম!”
উচ্চতা নিয়ে এমন খোটা গায়ে লাগল রাবিয়ার। কোমরে দুহাত রেখে হুংকার দিল,
“বের হন! এক্ষুণি বের হন আমার বাসা থেকে। সে আপনি যেই হোন না কেন! আউট! গেট আউট!”
ইরাম এতক্ষণ নির্বিকার থাকলেও এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাইকে ধমক দিল,
“ইহান। এটা কেমন ব্যবহার? অপরিচিতের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে হয়? তাছাড়া রাবিয়া তোর এক বছরের বড়। সরি বল।”
ইহান চাইলে ঝগড়া আরও লম্বা করতে পারতো কিন্তু বোনের ক্লান্তির কথা ভেবে কথা বাড়ালনা। চোখ উল্টে অস্ফুট স্বরে গজগজ করল,

“ওকে ফাইন। সরি! এবার দয়া করে বলুন লাগেজ দুটো কোন রুমে রাখব?”
রাবিয়া রাগটুকু গিলে ফেলল। ইরামের দিকে চেয়ে নরম গলায় বলল,
“এদিকে আসো আপু। সাবধানে।”
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু জিনিস টপকে ভেতরের একটা রুমে ইরামকে নিয়ে গেল রাবিয়া। খুটখুট শব্দ আসছে ভেতর থেকে। দরজাটা হালকা চাপানো। রাবিয়া খুলে দিতেই ভেতরের দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হলো। রুমে গুটিকতক আসবাব। একটা কাঠের বিছানা, একটা আলমারি, টেবিল চেয়ার। বিছানার পায়ার কাছে বসে হাতুড়ি আর স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে কিছু ঠিকঠাক করছে এক পুরুষ। ফিনফিনে শরীরে জড়ানো কালো টি শার্ট আর ট্রাউজার। চোখে রিমলেস চশমা। ইরামকে দেখেই চোখ তুলে চেয়ে মৃদু হাসল সে।

“ওহ। অবশেষে এলে।”
ইরাম অবাক হয়ে শুধাল,
“তুমি ওখানে কী করছ, কায়সান?”
কায়সানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল। হাতুড়ি দিয়ে বিছানার পায়ায় ঠকঠক করে দুটো বাড়ি মে*রে উঠে দাঁড়াল সে। হাত পা ঝেড়ে জানাল,
“তেমন কিছু না। শিফট করার সময় বিছানার নিচে একটু ঘষা খেয়েছে তো, তাই ঠিকঠাক করছিলাম। এখন কোনো সমস্যা নেই। তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।”

ইরাম একটা ঢোক গিলল। এমন নিঃস্বার্থ আবেদনের বিপরীতে কী বলবে বুঝতে পারলনা। রাহাত আর মিথিলার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকা একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে যেত। তাছাড়া মিথিলার হাতে তো এখন আরও বড় অ*স্ত্র চলে এসেছে। ইরামের দ্বিতীয় সংসারও টিকলনা। এলাকায় ছড়াতে বেশিদিন সময় লাগবেনা। আলাদা থাকা ছাড়া উপায় ছিলনা। তবে সিঙ্গেল বাসা পাওয়া দুষ্কর। অতীতের চেনাজানা আর কায়সানকে বাসা খোঁজার ব্যাপারে সে জানিয়ে সাহায্য চেয়েছিল। সেখান থেকেই রাবিয়ার সঙ্গে বন্দোবস্ত। রাবিয়াকে ইরাম আগে থেকেই চেনে কারণ মেয়েটা কায়সানের টিমের একজন যে টিমে ইরাম কাজ করে। সেখান থেকেই প্রথম পরিচয়। রাবিয়া সম্পর্কে কায়সানের মামাতো বোন হয়। অ্যাডমিশন টেস্টে গত বছর কোনো পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স হয়নি। এই বছর ঢাকায় থেকে কোচিং করে আবারও পরীক্ষা দেবে।

না পারলে আই ই এল টি এস করে বিদেশের পথ ধরবে। বাবার আহ্লাদী মেয়ে। গ্রামে জমিজমা আছে ভালোই। তাই টাকা পয়সার সমস্যা নেই খুব একটা। স্বাধীন বিহঙ্গ, যা মনে চায় তাই করে। কায়সানের সাথে কাজ করে শখ আর শেখার উদ্দেশ্যে। রাবিয়া দুই বেডরুমের একটা বাসা নিয়ে একাই থাকত এতদিন। কায়সান পরে মেয়েটার সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করে দিয়েছে। দুই বেডরুমের একটায় এখন ইরাম থাকবে। মানা করার কারণ ছিলনা। একা থাকতে হচ্ছে না। উপরন্তু চেনা মানুষ। সবদিক দিয়েই সুবিধা। তাই ইরাম বেশি গাইগুই করেনি।
“কী ভাবছ?”
কায়সানের প্রশ্নে বাস্তবে ফিরে এলো ইরাম। মাথা দুলিয়ে দ্রুত বলল,
“তেমন কিছুনা। তুমি এত কষ্ট করতে গেলে কেন? আমি নিজেই নিজের ব্যবস্থা করে নিতাম।”
“জানি। তুমি করতে পারতে। আমি শুধু একটু সহজ করে দিলাম। ক্ষতি কী তাতে?”
ইরাম কায়সানের দিকে খানিকটা অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। এই লোকটা অদ্ভুত। অদ্ভুত বলবে নাকি সরল তাও বলা মুশকিল। যখন ইরাম বাসার কথা তুলেছে, তখন কায়সান একবাক্যে রাজী হয়ে গিয়েছে। জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি কী হয়েছে, কেন হয়েছে। লোকটার এই স্বভাব ইরামের পছন্দের। খুব বেশি কথা বলতে হয়না। ব্যক্তিগত বিষয়কে সম্মান করতে জানে সে।

“ধন্যবাদ।”
ইরাম ছোট্ট একটা শব্দ বাদে আর কিছুই বলতে পারলনা। ধীরে সুস্থে হেঁটে আস্তে করে বিছানায় বসল। ঘুমন্ত ইযানকে শুইয়ে রাখল। কায়সান এক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থেকে তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“এনিওয়ে। আজকে কারো রান্নাবান্নার ঝামেলা করতে হবেনা। বাইরে থেকে কাচ্চি নিয়ে আসছি, মাই ট্রিট। ইরাম, রেস্ট নাও। রাবিয়া, কাজে যা তো, বেশি বিরক্ত করিস না ওকে।”
বোনের মাথায় অহেতুক একটা চাটি দিয়ে মৃদু হেসে কায়সান চলে গেল। ভাইয়ের পিছনে পিছনে গজগজ করতে করতে দরজা লাগাতে গেল রাবিয়া। রয়ে গেল শুধু ইহান। পরিবেশটা শান্ত হতেই সে এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে বিছানায় বসল। ইরাম লাগেজ খুলে জিনিসপত্র বের করছে। ইহানও সেই কাজে হাত লাগাল। কিছুক্ষণ চুপচাপ কাজ করে হঠাৎ শুধাল,

“উনি তোমার বস?”
ভাইয়ের প্রশ্নে ইরাম খানিকটা অস্বস্তিবোধ করল। শেষমেষ সৎ জবাবই দিল,
“বলতে পারিস। বসও আবার বন্ধুও। আমরা ছোটবেলায় একই স্কুলে পড়েছিলাম।”
“ওহ। তাইতো বলি! চেনা চেনা লাগছে কেন!”
“তুই চিনবি কীভাবে? তুই তো আগে কায়সানকে দেখিসনি। আমাদের যখন বন্ধুত্ব ছিল তুই তখন দুধের বাচ্চা ছিলি।”
“তবুও চিনি। মুন্সীবাড়িতে এসেছিল একবার।”
এবার ইরাম থমকাল। তার স্মৃতিতে যতদূর আছে, বন্ধুত্ব থাকলেও কায়সান কখনো তার বাড়ি অব্দি যায়নি। একবার বন্ধুরা হাঁটতে হাঁটতে গেট পর্যন্ত এসেছিল, ইরাম অনুরোধ করলেও ভেতরে ঢোকেনি কায়সান। তাহলে ইহান তাকে দেখল কখন? বড় বোনের চোখে সন্দেহ দেখে ইহান জানাল,

“অরণ্য মির্জার সাথে তোমার বিয়ের কিছুদিন পর আমাদের বাড়ি এসেছিল, তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। রাহাত ভাইয়া জানিয়েছে, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। এরপর চলে গিয়েছিল। এটুকুই।”
ভাইয়ের কথা শুনে ইরাম রীতিমত আকাশ থেকে পড়ল। কায়সান? বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল? তার বাড়িতে? রাহাত তো কিছু জানায়নি! অবশ্য জানানোর মতন বিষয় নয়, বিব্রতকর। তার থেকেও বড় কথা, কায়সান? তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল? সত্যিই? বিষয়টা ইরাম এই মুহূর্তে ঠিক কেমনভাবে নেবে বুঝতে পারলনা। মাথা নিচু করে সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“ঠিক আছে। আর কাউকে বলার দরকার নেই।”
ইহান মাথা নেড়ে প্রসঙ্গ বদলালো। বোনকে যতটুকু জানানোর জানিয়েছে। বাকিটা ইরামের ব্যক্তিগত বিষয়। সে কথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আর কী কী জিনিস লাগবে, কী বাজার লাগবে লিস্ট করে দাও আপু। আমি যাওয়ার আগে দিয়ে যাব।”
ইরাম মাথা দোলালো,

“ওহ হ্যাঁ, দাঁড়া।”
ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা কাগজ আর কিছু টাকা বের করে নিল ইরাম।
“ইযানের জন্য আপাতত এগুলো লাগবে। আর কিছু এখনি দরকার নেই, পরে বলব লাগলে।”
কাগজটা নিলেও ইহান টাকাগুলো নিলনা। উঠে দাঁড়াল চট করে। ইরাম বিস্মিত হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল। ইহান কাগজটা জিন্সের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল,
“তোমার ভাই একটু হলেও বড় হয়েছে আপু। তুমি রেস্ট নাও আপাতত, আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে আসছি।”
ইহান রুমের দরজা সাবধানে চাপিয়ে দিয়ে চলে গেল। ইরাম কিছুক্ষণ সেখানেই থম মেরে বসে রইল। সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এই সময়ে বাইরে আবারও বৃষ্টি শুরু হলো। ইরাম রুমে বসেই বাইরে ইহানের হাকডাক শুনতে পেল,

“চার ফুটের চমচম! ছাতা হবে একটা?”
“চমচম কাকে বলছ লম্বু? এমন জায়গায় লাথি দেব যে কাউকে বলতেও পারবেনা!”
রাবিয়া ইহানকে ছাতা দিল কী দিলনা ইরামের জানা হলোনা। সে ঠাঁয় বিছানায় বসে রইল। রুমের সাথে লাগোয়া সরু একটা বারান্দা আছে। সেই বারান্দা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল একমনে। যেন ওই বৃষ্টি বাইরে নয়, তার মনে পড়তে শুরু করেছে। সম্মোহিতের মতন কতক্ষণ চেয়ে ছিল ইরাম জানেনা। বাইরে থেকে মিউজিক বক্সে ছাড়া একটা গানের সুর ভেসে এলো। রাবিয়া ছেড়েছে বোধ হয়, বৃষ্টি দেখে মন খুলে গাইছে। মেয়েটার কন্ঠস্বর মন্দ নয়। কিন্তু সেই কন্ঠ আর সুরকে ছাপিয়ে গেল ঘুমন্ত ইযানের বিড়বিড় ধ্বনি,
“বাব্বা….বাব্বা….”

আমার আলাদিন পর্ব ৬৮

সন্তানের উচ্চারণ করা প্রথম অর্থপূর্ণ শব্দটা মায়ের বুকে কী ভয়ংকর তান্ডব চালালো সেটা বোঝা আরেকজন গর্ভধারিণী মায়ের পক্ষেই সম্ভব। ইযান ঘুমের মাঝে হাত মুঠো পাকিয়ে নড়চড় করছে আর ডেকে যাচ্ছে বাবাকে। যে বাবা আর তার কাছে নেই। ইরাম নিজ হাতে সন্তানকে পিতার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে এসেছে। এত সময় যাবৎ নিটল, শান্ত, নিষ্ঠুর, নিশ্চল থাকা ইরাম এবার ভূমিধ্বস নামা পাহাড়ের মতন ভেঙে পড়ল। বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে দেখেনি কেউ তাকে, আজও দেখবে না, শুনবে না। তার কান্নার শব্দ মিইয়ে যাবে বৃষ্টির ঝুমঝুম ছন্দে। মিলিয়ে যাবে বাইরে থেকে ভেসে আসা গানের সুরে,
~দু’টো মানচিত্র এঁকে দু’টো দেশের মাঝে
বিঁধে আছে অনুভূতিগুলোর ব্যবচ্ছেদ~

আমার আলাদিন পর্ব ৭০