আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ২৭
সালমা খাতুন
নিঃশব্দে কেটে গেছে দুইটি দিন। শোকের আবহে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে মায়াদের বাড়ি। আরমানের ছোটো আম্মু আনজুমা বেগম, ছোটো আব্বু এবং সামিরা—তিনজনেই এই দুইদিন মায়ার পাশে থেকেছেন ছায়ার মতো। বিশেষ করে সামিরা—এক মুহূর্তের জন্যও মায়াকে একা হতে দেয়নি। মেয়েটি যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়েছে বাবাকে হারিয়ে। সেই মানুষটি—যিনি ছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, মাথার উপর ছায়ার মতো ছড়িয়ে থাকা বটবৃক্ষ—তিনি আজ নেই। এই বাস্তবতা মনে পড়লেই হঠাৎ করে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ে মায়া।
সারাদিন বোঝানো, মানানো, জোর করে এক-দু’মুঠো খাবার খাওয়ানোর চেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন আনজুমা বেগম। আবিরও প্রতিদিন বাড়িটিতে এসে পড়ে থাকে। সামিরার সাথে মিলে মায়ার মন ভালো করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় তারা। কিন্তু সত্যিই কি তা সম্ভব? যে ব্যথা কেবল নিজের হৃদয়ে জন্ম নেয়, তাকে কি বাইরের কোনো ভালোবাসা বা সান্ত্বনা ছুঁয়ে যেতে পারে? মায়ার তো আর কেউ নেই—এই বাবা ছিলেন তার একমাত্র আপনজন, তার পৃথিবীর একমাত্র কেন্দ্রে।
আরমানের বাবা এসে কিছুটা সময় কাটিয়ে যান ওদের সঙ্গে। তিনি চুপচাপ, গভীর সহানুভূতির ভঙ্গিতে পাশে থাকেন। মায়াকে বাবার স্নেহ দেওয়ার চেষ্টা করেন। সবাই মিলে চেষ্টা করছে মায়াকে আবারও একটুখানি স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আর এদিকে যে কারো জীবন-মৃত্যু, দুঃখ-বেদনা কিছুই গোনে না—সেই আরমান শাহরিয়ারও যেন বদলে গেছে। কে কী বললো, কে দেখলো, তাতে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে ও এসে খোঁজ নিয়েছে মায়ার। কিছুটা সময় ও নিজেও কাটিয়ে যাই ওদের সাথে। হয়তো মায়াকে শান্তনা দিতে পারে না মুখে কিছু বলে, তবে ও এখানে এসে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, আরমানও মায়ার পাশে আছে। ছোটো আম্মুর থেকে খোঁজ নেয় মায়া খেয়েছে কিনা।
এই অদ্ভুত পরিবর্তনে সবাই বিস্মিত হলেও, একরকম প্রশান্তিও অনুভব করেছে মনে মনে।
আরমানের মা এখনো কিছু জানেন না আরমানের এখানে আসার বিষয়ে। জানলে যে কী বিপর্যয় নেমে আসবে, তা যেন কল্পনাই করা যায় না।
এদিকে মায়ার চাচা, চাচী এবং চাচাতো বোনও এখন মায়াদের বাড়িতেই আছেন। ঘটনাচক্রে শাহরিয়ার পরিবারের আগমন এবং পরিপার্শ্বিকতা দেখে ওরাও খানিকটা বিস্মিত। এমন অভিজাত, প্রভাবশালী এক পরিবারের সঙ্গে মায়াদের আত্মীয়তা—এটা আগে উনারা জানতো না।
আরও বড়ো চমক এলো তখন, যখন আরমানের বাবা নিজে গিয়ে মায়ার চাচারকে পরিচয় দিলেন নিজের। মুহূর্তেই চিনে ফেললেন তিনি সেই মানুষটিকে।
মায়ার চাচা মোশারফ তালুকদার ছিলেন মায়ার বাবার বড়ো ভাই। বহু বছর আগে—তখন মায়ার বয়স মাত্র দশ, আর মাইশার বারো—তীব্র অভিমান আর রাগে ভর করে বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য হয় উনার। সেই রাগেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে, আর কখনও ফিরে আসেননি। ধীরে ধীরে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কিন্তু রক্তের সম্পর্ক কি সহজে মুছে ফেলা যায়? হঠাৎ কোনো এক অদৃশ্য টানে, একান্ত অন্তর্গত অপরাধবোধে কিংবা ভাই হারানোর আশঙ্কায়, বহু বছর পর মন কেমন করে ওঠে তার। রওয়ানা দেন গ্রামের পথে। সেখানে পৌঁছে খোঁজ নিতে শুরু করেন ছোটো ভাইয়ের। কিন্তু কেউই তার খোঁজ দিতে পারে না। অবশেষে এক বৃদ্ধ প্রতিবেশীর মুখে জানতে পারেন তাদের বাবার মৃত্যুর খবর, এবং সেইসঙ্গে পান মায়াদের বর্তমান এই বাড়ির ঠিকানা।
দূরপাল্লার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে পৌঁছান, তখন সকাল গড়িয়ে যাচ্ছে। দোয়েল ডাকছিল দূরের গাছে। কিন্তু সে পাখির ডাককে ছাপিয়ে ওঠে শোকের নিস্তব্ধতা। দোরগোড়ায় পৌঁছে তিনি যা দেখলেন, তা কল্পনাতেও ছিল না—নিজের ছোটো ভাই শুয়ে আছেন বারান্দার মাঝখানে, সাদা চাদরে মোড়ানো নিথর শরীর। নির্বাক, চিরনিশ্চল।
বছরের পর বছর, রাগ-অভিমান, দূরত্ব—সব যেন এক নিমিষে চূর্ণ হয়ে যায় সেই দৃশ্যপটে।
এদিকে মায়ার চাচী মুনজিলা বেগম, মায়াদের এত সুন্দর, সুসংগঠিত বাড়ি দেখে যেন মুগ্ধ হয়ে গেছেন। কলকাতায় এমন পরিপাটি পরিবেশে থেকে জীবন কাটানোর সুযোগ—তা সহজে হাতছাড়া করতে চান না তিনি। শুনেছেন, মায়া নাকি শাহরিয়ার কম্পানিতে খুব বড়ো পজিশনে আছে। তার মানে, এই শহরে থেকে জীবনের বাকি সময়টা কিছুটা স্বস্তিতেই কাটানো যাবে।
এতোদিন ধরে তাঁরা ছিলেন মাইশার মামার বাড়িতে, যেখানে এক ধরনের নির্ভরশীলতা থাকলেও ছিল সীমাবদ্ধতা ও অস্থায়িত্ব। এখন মায়ার এমন স্থিতিশীল অবস্থান ও পরিবেশ দেখে, মুনজিলা বেগম নিজের স্বামী মোশাররফ সাহেবকে বোঝাতে দ্বিধা করেননি—একটা মেয়ে, একা থাক, এত কষ্টের সময়ে তাকে একা ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। আরও অনেক যুক্তি-তর্ক তুলে ধরেছেন তিনি। শেষমেশ মোশাররফ সাহেবও রাজি হয়ে গেছেন এখানে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে।
তবে সত্যিকারের কারণটা অন্যত্র। এই চমৎকার পরিকল্পনার পেছনে মুনজিলা বেগমের যে বড়ো এক কৌশল লুকিয়ে আছে— যখন তিনি নিজের মেয়ের মুখ থেকে শুনলেন, মেয়েটির মনে দাগ কেটেছে একজন, আর তিনি আর কেউ নন—দেশের আলোচিত ও সম্মানিত ব্যবসায়ী আরমান শাহরিয়ার।
আর যখন দেখলেন, মায়াদের সঙ্গে শাহরিয়ার পরিবারের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তখন যেন তার মন আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠলো। এ সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা চলবে না—এমন এক পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্ভাবনা যাঁর সামনে এসেছে, তিনি তো সেটাকে হাতের মুঠোয় নিয়েই ছাড়বেন। যেভাবেই হোক, আরমান শাহরিয়ারকে নিজের মেয়ের জামাই হিসেবে দেখার ইচ্ছায় এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন মুনজিলা বেগম।
এদিকে যখনই আরমান এ বাড়িতে পা রাখে, মাইশা যেন অদৃশ্য কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে না চেয়ে গা ঘেঁষে আসে ওর পাশে। তার চোখেমুখে একরকম অদ্ভুত আগ্রহ—আরমান কী খাবে, কফি চাই কি না, কিছু লাগবে কি না—প্রতিটা কথায় অতিরিক্ত দরদের ছোঁয়া। তার কণ্ঠে ন্যাকামি আর আচরণে ঢং যেন মুহূর্তে মুহূর্তে ভেসে ওঠে।
আর তখনই হাজির হন মুনজিলা বেগম, মেয়ের গুণগান নিয়ে যেন ফুলে ভরা এক ঝুড়ি নিয়ে এসেছেন—প্রশংসার ঢালাও বন্যায় আরমানকে ভাসিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর।
সবকিছু মিলিয়ে আরমানের মুখে বিস্ময়ের ছাপ পড়ে, তবে মনে মনে একটা স্পষ্ট বিরক্তি কাজ করে। এক সময় সে চুপিচুপি খুঁজে ফেরে মাইশার ভেতরে নিজের ছোটোবেলার সেই পিচ্চি মায়াবতীকে। কিন্তু বারবার সে ব্যর্থ হয়। মাইশার চোখে-মুখে, কথায়-চলনে, একটুও খুঁজে পায় না সেই মায়াবতীর কোমল ছায়া। মাঝে মাঝে মনে হয় কোথাও একটা ফাঁক রয়ে গেছে যেন—মনের মধ্যে এক অস্থির দ্বন্দ্ব।
কখনো মনে হয়, না, এ মেয়েই তো সেই—শুধু একবারই তো দেখা হয়েছিল ওদের, অত অল্প বয়সে। আর এতদিন ধরে তো শুধু কল্পনার উপর ভর করেই গড়ে তুলেছিল সেই মেয়ের মুখচ্ছবি ও আচার আচরণ। হয়তো বাস্তবের মাইশা তার সেই কল্পনার গড়নে একেবারেই মেলে না, তাই এই অমিল। আর বিরাটও প্রমাণ দেখিয়েছে ওকে, ওই নেমপ্লেট এর অধীকারী একমাত্র এই মাইশাই— সেই দিনের মায়াবতী।
দুপুর এগারোটার দিকে…
মায়া ও সামিরা রুমের বারান্দায় বসে আছে। সামিরা একই বকবক করছে, মায়া তাকিয়ে আছে অনেক দূরে শূন্য দৃষ্টিতে। সামিরার কথায় তার কোনো মন নেই। মন পড়ে আছে বাবার সাথে কাটানো মিষ্টি স্মৃতিতে। আবিরও ছিল ওদের সাথে, এই কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেলো ও অফিসের উদ্দেশ্যে।
হঠাৎ বাইরে চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে সামিরা নিজের বকবক থামিয়ে দেয়। তারপর মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে, “আপু বাইরে কারা যেন চেঁচামেচি করছে। চলো দেখি।”
নাহ মায়ার কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে একই ভাবে চুপচাপ বসে রইল। সামিরা বুঝলো মায়ার অবস্থা তাই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মায়াকে কিছুটা ঝাঁকিয়ে বলল, “আপু নিচে চলো। কারা যেনো চেঁচামেচি করছে।”
মায়া শূন্য দৃষ্টি নিয়েই ঘুরে তাকালো সামিরার দিকে। তারপর কোনো অনুভূতি ছাড়াই বলল, “চলো দেখি।”
এরপর দুজন রুম থেকে বেরিয়ে সোজা উঠানে এলো। দেখলো এখানে সবাই আছে। মায়ার চাচু কথা বলছে কিছু লোকের সাথে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে উনারা কোনো কম্পানি থেকে এসেছে। মায়া এগিয়ে গেলো সেই দিকে। নিজের চাচুকে জিজ্ঞাসা করলো, “কি হয়েছে চাচু? কি বলছেন উনারা?”
মোশাররফ সাহেব বললেন— “দেখ না মা, ওরা নাকি বলছে বড়ো ওদের কম্পানি থেকে নাকি বাড়ির দলিল বন্ধক দিয়ে লোন নিয়েছিল। কিন্তু সময় মতো লোন শোধ করতে পারেনি। তাই নাকি উনারা এই বাড়ি দখল করবেন। কালকের মধ্যে যেনো আমরা এই বাড়ি খালি করে দিই।”
মায়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। চোখের সামনে জমা হলো কতগুলো কাগজ—সবই কড়া নোটিশ আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ছাপ বহন করে। কাঁপা হাতে সমস্ত ডকুমেন্টস একে একে খুলে দেখলো ও।
হ্যাঁ, কিছুদিন আগেই বাবা এই লোনের প্রসঙ্গ বলেছিলেন। কিন্তু এমন নির্মম সত্য—বাড়ির দলিল বন্ধক পড়েছে, নির্ধারিত সময়ে ঋণ শোধ না করতে পারলে এ বাড়ি কম্পানির দখলে চলে যাবে—এটা জানত না সে।
বাবা প্রথমে কিছুই জানাননি ওকে নিজের রোগের কথা। একমাত্র সন্তান, তাকে কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে চাননি। কতখানি ভালোবাসলে একজন বাবা এমনভাবে নিজের যন্ত্রণাকে আড়াল করে যেতে পারে!
নিজের চিকিৎসার জন্য লোন নিয়েছিলেন তিনি, মায়ার অগোচরেই। ভেবেছিলেন সুস্থ হয়ে উঠেই শোধ করবেন ঋণ।
কিন্তু আমরা যা ভাবি, তা কি সব সময় বাস্তব হয়? উপরওয়ালার পরিকল্পনা অনেক সময় আমাদের ভাবনার বহু বাইরে।
মায়া অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলো অফিসারদের। আবেগভরা গলায় বললো—ও লোনের পুরোটা শোধ করে দেবে। শুধু একটু সময় দিতে হবে।
কিন্তু ওদের চোখে ছিল কেবল নিয়মের শীতল ছায়া।
“আমরা এক সপ্তাহ আগেই নোটিশ পাঠিয়েছিলাম। সময়সীমা পার হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী বাড়ি এখন কোম্পানির দখলে। কাল সকাল পর্যন্ত সময় দিচ্ছি, এর মধ্যে যেন বাড়ি খালি করে দেন।”
এই বলে তাঁরা চলে গেলেন।
মায়া নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
তারপর ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সেই চৌকাঠে, বাবার স্মৃতিতে ঘেরা বাড়ির দরজায়।
চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় গড়িয়ে পড়লো কান্না—বুকের মধ্যে কেউ যেন ধারালো কিছু দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে হৃদয়টা।
বাবার মৃত্যুর শোক এখনো দগদগে, তারই ওপর এই আঘাত—বাড়িটা… এই বাড়িটাও থাকবে না?
এই দেয়ালগুলো… এই উঠোন… এই ঘরটা, যেখানে বাবা বসতেন, মায়ার মাথায় হাত রাখতেন—সব কিছু কি হারিয়ে যাবে এক নিমিষেই?
চোখ ঝাপসা হয়ে এলো… চারপাশ কুয়াশার মতো ঘোলাটে। অতিরিক্ত কান্না, দিনের পর দিন ঠিকমতো খাওয়া না-খাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা আর মানসিক ধাক্কা একসঙ্গে হঠাৎ এসে আছড়ে পড়লো ওর উপর।
দুলতে দুলতে এক পা এগিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো মায়া—জ্ঞান হারিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেল তার ছোট্ট পৃথিবী।
হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় শুয়ে আছে মায়া। স্যালাইনের পাতলা সুঁচটা ওর হাতে স্থির হয়ে গেঁথে আছে, ধীরে ধীরে ওর শরীরে ঢুকছে স্যালাইন এর পানি। ডাক্তারের কথায় সামান্য স্বস্তি ফিরেছে চারপাশে—“ভয়ের কিছু নেই। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, নির্ঘুম রাত আর অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়ার কারণেই এমনটা হয়েছে। ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে পেসেন্টকে। আজ সারা দিন ও রাত স্যালাইন চলবে। কাল সকালে ছাড়পত্র দিয়ে দেব আমরা। ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন।”
সামিরা এই খবর পৌঁছে দিয়েছিল তার বাবা এবং ভাইকেও। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ছুটে এসেছে হাসপাতালে। বাবার চোখে ছিল চিন্তার রেখা, ভাইয়ের মুখে একরাশ গম্ভীরতা।
তাঁরা আর দেরি করেননি। সামিরা যেই নোটিশের কাগজ দেখিয়েছিল, তা সঙ্গে নিয়ে আরমানের বাবা ও চাচা চলে গিয়েছিলেন সরাসরি সেই কম্পানির অফিসে। ভদ্রতায় আবৃত বহু অনুরোধ, বোঝানোর চেষ্টা—সবই করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু ওরা ছিল নীতির বেড়াজালে বন্দি।
“আশরাফ তালুকদার নিজেই সব শর্ত মেনে এই লোন নিয়েছিলেন। তাঁর স্বাক্ষর সহ সমস্ত কাগজ বৈধ এবং যথাযথ। আমরা শুধু চুক্তি অনুযায়ী আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। এখন বাড়ি কোম্পানির সম্পত্তি।”
একটি কড়া অথচ নির্লিপ্ত জবাব—তার বাইরে যেন কিছু ভাবতেই রাজি নয় ওরা।
চোখেমুখে ক্লান্তি নিয়ে ফিরে এসেছেন আরমানের বাবা ও চাচা। অন্তরে দুঃখ, মুখে নিঃশব্দ পরাজয়ের ছায়া।
হাসপাতালের এসেছিলেন মায়ার চাচা, চাচী এবং মাইশাও।
ডাক্তারের মুখে যখন শুনলেন—মায়া ভালো আছে, শুধুই শারীরিক ও মানসিক ধকলের কারণে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল—তখনই যেন মুনজিলা বেগমের মুখটা কঠিন হয়ে উঠলো।
আর এক মুহূর্তও দাঁড়াননি। মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন চুপচাপ।
সবকিছু যেন উল্টে যাচ্ছে তাঁর ভাবনার বাইরে। যেই ছক কষে চলেছিলেন, সেই পরিকল্পনাগুলো যেন একে একে ভেঙে পড়ছে নিজের ভারেই।
চোখে মুখে বিরক্তি মিশ্রিত হতাশা। এখনকার প্রতিটা দৃশ্য, আরমানের ছোটো আম্মুর কান্না—সবকিছুই তাঁর কাছে শুধুই অভিনয়, একরাশ নাটক ছাড়া আর কিছু নয়।
রাত হয়ে এসেছে। মায়া এখনো ঘুমিয়ে। দুজনের বেশি কাউকে থাকতে দেবে না হসপিটালে। আরমানের বাবা, চাচা এবং মায়ার চাচাও অনেক আগেই চলে গেছেন। শুধু হসপিটালে ছিল সামিরা আবির আর আনজুমা বেগম। সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরমানের ছোটো আম্মু ও আবির থাকবে হসপিটালে। একটা বেটা ছেলেকেও প্রয়োজন হসপিটালে তাই আবিরই থাকবে। আরমান অনেক আগেই চলে গেছে হঠাৎ করে। কিছুক্ষন পরেই সামিরাকে আবির বাড়িতে দিয়ে আসবে।
হঠাৎ করেই আনজুমা বেগমের মাথা ঘুরে উঠলো। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আবির। এখনি সামিরাকে দিতে যাবে ও। তাই আনজুমা বেগমের সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ উনাকে টলে পড়তে দেখে কোনো রকমে ধরে উনাকে করিডোরে রাখা চেয়ারে বসালো। সামিরাও ছুটে এসে পানি খাওয়ালো তার ছোটো আম্মুকে। তখনি আরমান আসলো ওখানে।
আনজুমা বেগমও মায়ার চিন্তায় আজ সারাদিন ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করেনি। তাই প্রেশার কমে গেছে।
সামিরা— “ছোটো আম্মু! তোমারও শরীরটা খারাপ হয়ে গেছে। তুমি বাড়ি চলে যাও, রেস্ট নাও। আমি থাকছি মায়া আপুর কাছে।”
আনজুমা বেগম তাড়াতাড়ি নাকোচ করে বলে উঠলেন— “না না মা! তুই ছোট মেয়ে। তুই হসপিটালে থাকতে পারবি না। আমি থাকছি এখানে।”
আরমান গম্ভীর গলায় বলল— “তুমি যাও ছোট আম্মু। সামিরা থাকুক আর আমি থাকছি এখানে। কোনো অসুবিধা হবে না।”
আনজুমা বেগম— “কিন্তু আব্বু…”
আরমান উনাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিয়ে বলল, “আর কোনো কথা না ছোটো আম্মু। তুমি যাও রেস্ট নাও। আবির যা ছোটো আম্মুকে নিয়ে বাড়ি চলে যা। তোরও আসার দরকার নেই। আমি থাকছি এখানে। কোনো দরকার হলে ডেকে নেবো।”
আবিরও থাকতে চেয়েছিল এখানে। কিন্তু কি যেনো একটা ভেবে আরমানের কথায় সাই জানিয়ে চলে গেলো ছোটো আম্মুকে নিয়ে।
এদিকে আরমান এই হসপিটালে এর ম্যানেজার এর সাথে কথা বলে একটা ফাঁকা এবং পরিস্কার কেবিনের ব্যবস্থা করলো। তারপর সেই কেবিনে সামিরাকে নিয়ে গিয়ে বলল, “তুই এখানে রেস্ট কর। আমি মায়ার কেবিনের কাছে থাকছি। কোনো দরকার হলে তোকে ডেকে নেবো। আর তোর কিছু লাগলে বলে আমি আনার ব্যবস্থা করছি।”
সামিরা দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল— “না ভাইয়া। আমার কিছু লাগবে না। আমি মাঝে একবার বাড়ি গিয়েছিলাম। ফ্রেশ হয়ে এসেছি। তুমি চিন্তা করো না।”
আরমান— “আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোর জন্য খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। খেয়ে নিয়ে এই বেডেই কোনো রকমে আজকের রাতটা ম্যানেজ করে ঘুমিয়ে পড়িস। আর কোনো দরকার হলে ভাইয়াকে ডাকিস।”
সামিরা— “তুমি চিন্তা করো না ভাইয়া। আমার কোনো অসুবিধা হবে না। তুমি মায়া আপুর কাছে যাও। আপুর কোনো অসুবিধা হতে পারে। এখন কেউ নেই আপুর কাছে।”
আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ২৬
আরমান সাই জানিয়ে বেরিয়ে গেলো সামিরার কেবিন থেকে। তারপর ক্যান্টিনে গিয়ে সামিরার জন্য খাবার অর্ডার করে আসলো। ক্যান্টিন এর কর্মচারীরাই খাবার পৌঁছে দেবে কেবিনে। তাই আরমান এবার হাঁটা দিলো মায়ার কেবিনের উদ্দেশ্য। তারপর আস্তে করে দরজা খুলে প্রবেশ করলো মায়ার কেবিনে।
