আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩০
সালমা খাতুন
ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবাই চমকে তাকালেন দরজার দিকে। মিসেস সাবিনার সঙ্গে থাকা সেই দুই ব্যক্তি যেন চেনা নয়, আবার একেবারে অচেনাও নয়। তাদের আগমনে ঘরের পরিবেশে নেমে এলো একরাশ জিজ্ঞাসা আর বিস্ময়।
নিঃশব্দ ঘরে তখন একমাত্র কণ্ঠস্বর মিসেস সাবিনা বেগমের—
তিনি কোমল অথচ দৃঢ় গলায় সেই অল্পবয়সী মেয়েটিকে পাশে দাঁড় করিয়ে বললেন,
“হয়তো তোমরা অনেকেই ওকে আগেই চিনো। তবে আজ থেকে ওর আরেকটি নতুন পরিচয় হলো—এই বাড়ির হবু বউ। আমার ছেলে আরমান শাহরিয়ারের হবু স্ত্রী, মাইশা তালুকদার। আমার আরমানের সেই ভালোবাসা… যার জন্য আজও সে জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে পারেনি। বছরের পর বছর যে মেয়েটিকে ও খুঁজে ফিরেছে উন্মাদের মতো—এই সেই মেয়ে…মাইশা তালুকদার।”
ঘরের এক কোণে থমকে গেল মুহূর্তটা। উপস্থিত সবার মুখেই বিস্ময়ের ছায়া। এ বাড়ির সকলেই জানে ‘মাইশা’ নামটা। জানে, এটাই সেই নাম যার টানে একসময় আরমান বিয়েতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিল। জানে, এই নামেই পেছনে ফেলেছিল সংসার, ডিভোর্স দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল মায়াকে।
সামিরা প্রথম নীরবতা ভাঙল, কণ্ঠে স্পষ্ট অবাক ভাব, “মম…এই মাইশাই সেই মাইশা? যার জন্য ভাইয়া মায়া ভাব…মানে মায়া আপুকে ডিভোর্স দিয়েছিলো?”
সাবিনা বেগম মায়া-মায়া চোখে তাকিয়ে মেয়েটির গালে স্নেহভরে হাত বুলিয়ে বললেন,
“এই সেই মাইশা… যে আমার ছেলের প্রাণ বাঁচিয়েছিল আজ থেকে দশ বছর আগে। আর এই মেয়েটার জন্যই ডিভোর্স দিয়েছিল মায়াকে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মায়া যেন হঠাৎ জমে গেল। শরীর ঠান্ডা হয়ে এল, মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল হাজার প্রশ্ন। ওর চাচাতো বোন মাইশার জন্য ওকে ডিভোর্স দিয়েছে আরমান? আরমান, মাইশাকে ভালোবাসে? তাহলে বিয়েটা করল না কেন তখন? ও তো শুনেছিল, তাদের বিয়ে নাকি জোর করে করানো হয়েছিল আরমানের দাদুর ইচ্ছায়।
তবে কি এই বাড়ির সবাই শুরু থেকেই জানত ‘মাইশা’ কে? তাহলে মায়ার সঙ্গে সেই বিয়েটা কেন দিলো?
সবকিছুই যেন এলোমেলো মনে হচ্ছে মায়ার। চিন্তা করতে গিয়েও মাথাটা আর সাড়া দিচ্ছে না ঠিক করে…
হঠাৎ সামিরার চোখ পড়লো সদর দরজার দিকে। সেখানে একা, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। ওর চেহারায় এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য, চোখেমুখে অনির্বচনীয় এক দ্বিধা। যেন কিছু বোঝা যাচ্ছে, আবার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মাইশাকে সামনে দেখে ওর মুখে যে প্রকাশ ফুটে উঠেছে, সেটাকে কি খুশি বলা যায়? নাকি বিস্ময়? কেউই নিশ্চিত হতে পারলো না।
সামিরা দরজার দিকে ইঙ্গিত করে হঠাৎ বলে উঠলো, “ওই তো ভাইয়াও চলে এসেছে।”
ওর কণ্ঠে উচ্ছ্বাস থাকলেও ঘরের পরিবেশ এক মুহূর্তে থমকে গেল। উপস্থিত সবার দৃষ্টি চলে গেলো দরজার দিকে। মিসেস সাবিনা বেগম তখনই এগিয়ে গেলেন ছেলের দিকে। কাছে গিয়ে আদরের পরশে ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, “কি হলো আব্বু? এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো, ভেতরে এসো। আমি কিন্তু তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ এনেছি, সেটা নিশ্চয় বুঝে গেছো? আর হ্যাঁ, কালকের মিটিংটা কেমন হলো? হোটেলটা তো অনেক দূরে ছিল, তাই না? সারারাতই তো সেখানে কাটাতে হয়েছে তোমায়।”
মিসেস সাবিনা বেগমের মুখে ‘মিটিং’ আর ‘হোটেলে রাত কাটানো’ কথাগুলো শুনে যেন বাতাস থমকে দাঁড়াল। চারপাশটা এক নিমিষে ভারি হয়ে উঠলো। কারণ সবাই জানে—গতকাল রাতটা আরমান হাসপাতালেই ছিল, মায়ার পাশে। ও যে মাকে মিথ্যে কথা বলেছে, এটা বিশ্বাস করা কারো পক্ষেই সহজ নয়। কারণ মায়ের কাছে ও কখনো মিথ্যে বলেনি। আর এই অসংগতিতেই জন্ম নিল বিস্ময়।
সামিরা কিছু না বুঝেই মুখ খুলতে গিয়েছিল, “কিন্তু ভাইয়া তো কাল সারারাত হাস…..”
বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই আবির ঝট করে ছুটে এসে ওর মুখ চেপে ধরলো হাত দিয়ে। সামিরা বিস্ময়ে উম! উম! আওয়াজ করতে লাগল, নিজের মুখ ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পারল না।
আবির ফিসফিস করে বলল,
“কোথায় কি বলতে হয় এখনো শেখোনি শামুকের বাচ্চা শামুক? মুখটা বন্ধ রাখ, না হলে বাড়িতেই শুরু হয়ে যাবে মহাযুদ্ধ।”
সাবিনা বেগম এবার ঘুরে তাকালেন ওদের দিকে। চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয়েছে আবির? এভাবে মুখ চেপে ধরলে কেন ওর? কী যেন বলতে চাইছিল সামিরা?”
আবির সঙ্গে সঙ্গে ওর হাত সরিয়ে নিল আর মুখে ঝটপট একটা বোকা বোকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এমনি আসলে আমার মনে হলো ওর কথার মাঝে হঠাৎ করে হাঁচি পেয়েছে, তো আমি ভেবেছিলাম কাশবে, তাই একটু… মানে…”
সামিরা তখনো ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। নিজের অজান্তেই কী বলার চেষ্টা করছিল—তা ভেবেই নিজের উপর বিরক্তি জন্মালো ওর। বোকা বোকা একটা হাসি মুখে এনে বলল,
“গুরুত্বপূর্ণ কিছু না মম।”
কথা শেষ করে সামিরা আস্তে করে একবার চোখ তুলে তাকালো আরমানের দিকে। ওর দৃষ্টি পড়লো ভাইয়ের চোখে—তীক্ষ্ণ, জ্বলন্ত। সেই চোখে যেন আগুন লুকিয়ে আছে। সামিরার বুক কেঁপে উঠলো, নিঃশব্দে একটা শুকনো ঢোঁক গিলে নিল।
তারপর কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে মায়ার পাশে গিয়ে বসে পড়ল। একদম গা ঘেঁষে। যেন আশ্রয় নিতে চাইছে মায়ার কাছে।
আনজুমা বেগম তাড়াতাড়ি উঠে এসে সাবিনা বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে বললেন,
“আরে ভাবী, তুমি তো ওদের দুষ্টামির কথায় এত মন দিয়েছো যে খেয়ালই করছো না—তোমার মেহমানেরা সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে! ওদের তো বসতে বলবে।”
সাবিনা বেগম যেন হঠাৎই বাস্তবে ফিরে এলেন। কপালে হাত ঠেকিয়ে হালকা ভঙ্গিতে বললেন,
“আরে দেখো কাণ্ড! আমিও না একেবারে ভুলেই গেছি। এই বয়সে মনটাই যেন গুবলেট হয়ে গেছে! চলুন বেয়াইন সাহেবা, আসুন আসুন বসুন। আর মাইশা বেটা, তুমিও এসো মা। সেই কখন থেকে তোমাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছি, বুঝতেই পারিনি।”
বলতে বলতে উনি নিজেই এগিয়ে গিয়ে মুনজিলা বেগম আর মাইশাকে হাত ধরে টেনে এনে সোফায় বসালেন। কিন্তু বসার মুহূর্তেই মুনজিলা বেগম ও মাইশার চোখে মুখে পড়ে গেল এক অদ্ভুত বিস্ময়ের ছাপ। কিছুক্ষণ আগে যেটুকু শুনেছেন, তার মানে বুঝে উঠতে পারছিলেন না—”আরমান মায়াকে ডিভোর্স দিয়েছে!” কথাটা যেন এক ধাক্কায় চেপে বসেছে তাঁদের কানে।
মুনজিলা বেগম অবাক কণ্ঠে সাবিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ভাবী, একটা কথা ঠিক বুঝলাম না… আরমান বেটা মায়াকে ডিভোর্স দিয়েছে মানে?”
সাবিনা বেগম হালকা গলা নামিয়ে, যেন অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
“আসলে কী বলো বেয়াইন, আমার শ্বশুর মশাই বেঁচে থাকতে জোর করেই আরমানের সঙ্গে মায়ার বিয়ে দিয়েছিলেন। ওই বিয়েতে আরমানের একদমই মত ছিল না। বললে হয়তো বিশ্বাস করবে না, এমনকি ব্ল্যাকমেইল করেও রাজি করিয়েছিলেন উনি। আর যেই না উনি মারা গেলেন, আমার আরমান সঙ্গে সঙ্গে ডিভোর্স দিয়ে দেয় মায়াকে। তবে চিন্তার কিছু নেই—ওদের বিয়ে হলেও একদিনের জন্যও সংসার করেনি তারা। আমার ছেলেটা ওই মেয়েকে এই বাড়ির চৌকাঠ পেরোতে পর্যন্ত দেয়নি। বিয়ের পর থেকেই মায়া ছিল ওর বাপের বাড়িতেই। আর আমার আরমান ডিভোর্স দিয়েছে কেবলমাত্র মাইশা বেটার জন্যই। শুধু অপেক্ষা করছিল মাইশাকে খুঁজে পাওয়ার।”
সব কথা বলার পরও মিসেস সাবিনা বেগমের মুখে ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা এক আশ্বাসময় হাসি। কিন্তু তার প্রতিটি উচ্চারণ যেন বিষের মতো বিঁধে গেল মায়ার বুকে। সোফায় মাথা নিচু করে বসে থাকা মায়ার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো দুই ফোঁটা পানি— ওর নিজের অজান্তেই। ও বুঝলো না কেন এত ব্যথা হচ্ছে, কেন বুকটা এত ভার হয়ে উঠলো। কিন্তু মিসেস সাবিনা বেগমের কথাগুলো যেন কোনো এক দগ্ধ ইতিহাসের গায়ে লবণ ছিটিয়ে দিল।
অন্যদিকে, মাইশা ও মুনজিলা বেগম হতবাক হয়ে শুনছিলেন সবটা। এত কিছু ঘটে গেছে, অথচ তারা কিছুই জানতেন না! তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই অবাক লাগার মাঝেও মুনজিলা বেগমের মুখে যেন এক পরোক্ষ তৃপ্তির আভা খেলে গেল। কারণ যা কিছু ঘটুক না কেন, পরিস্থিতি এখন ওদের পক্ষে। মায়ার মতো একটা অতীত লুকোনো সম্পর্কের মেয়ের জায়গা সরিয়ে দিয়ে যদি নিজের মেয়েকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া যায়—তবে সে সুযোগ হাতছাড়া করার মতো মানুষ তিনি নন।
আরমান তাকিয়ে ছিল মায়ার দিকেই, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। কারোর চোখে না পড়লেও ওর চোখে ঠিকই পড়লো, মায়ার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া দুই ফোঁটা পানি। আর এটাই কেন জানি সহ্য হলো না ওর। ভীষণ বিরক্ত লাগলো নিজের প্রতি, আবার ওর মায়ের প্রতিও। সবকিছু এখন এলোমেলো লাগছে ওর কাছে। ও তো চাইনি, মাইশাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসতে। মাইশাকে এই বাড়িতে দেখে ভীষণ বিরক্ত লাগছে ওর, কিন্তু কেন সেটা হচ্ছে বুঝতে পারছে না ও। ঠিক এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। ও মাইশাকে খুঁজে পেলে নিয়ে আসবে এই বাড়িতে। তারপর বউ করে নিজের ঘরে তুলবে। কিন্তু কেন সব কিছু এলোমেলো লাগছে ওর? হ্যাঁ ও ভালোবাসে পিচ্চি মায়াবতীকে। এখনো ভালোবাসে ও। তবে মাইশাকে দেখে সেই অনুভূতি কেন আসছে না ওর? কেনো মনে হচ্ছে মাইশা সেই মেয়ে নয়, যার জন্য এই অনুভূতি?
মিসেস সাবিনা বেগম— “আর একটা কথা, মাইশাকে আমাদের আরমানই খুঁজে বের করেছে। কিন্তু ও হয়তো লজ্জায় আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। আমি বুঝি আমার ছেলেকে। আর তাই মাইশাকে ডাইরেক্ট এই বাড়িতে নিয়ে এসেছি আমার ছেলের জন্য।”
এই কথার প্রতিউত্তরে কেউ কিছু বলল না। শুধু আরমান শান্ত গলায় বলল, “মম আমি রুমে গেলাম। রুবির কে ঠান্ডা পানি দিয়ে যেতে বলো এক গ্লাস।”
আর দাঁড়ালো না আরমান, গটগট পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠে গেলো। সবাই কিছুটা অবাক হলো আরমানের কোনো রিয়্যাকশন না দেখে। আরমানতো মাইশাকে না দেখেই ভালোবেসে এসেছে এতোদিন। কিন্তু কই তার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে না। সবসময় যেমন থাকে তেমনই স্বাভাবিক। মিসেস সাবিনা বেগম কিছুটা হেসে মুনজিলা বেগমের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, “কিছু মনে করবেন না বেয়ান। আমার ছেলেটা এমনই। সবসময় গম্ভীর থাকে। এটাই ওর স্বভাব। মনের কথা মুখে প্রকাশ করতে পারে না।”
মুনজিলা বেগম— “হ্যাঁ বেয়ান! বুঝতে পেরেছি। আরমান বেটা হয়তো লজ্জা পাচ্ছে। মাইশা তুই যা আরমান বেটাকে পানি দিয়ে আই। ঠান্ডা পানি চাইলো তো। এই বাড়ির বউ হবি তুই। তাই এখন থেকে দায়িত্ব নিতে শিখতে হবে তোকে।”
সাবিনা বেগম— “হ্যাঁ একদম ঠিক বলেছেন। যাও মাইশা বেটা, আরমানকে পানি দিয়ে আসো এক গ্লাস আর এই ফাঁকে দুজনের কথা বলাও হয়ে যাবে।”
এরপর সাবিনা বেগম রুবিকে বলে দিলো এক গ্লাস পানি দিয়ে মাইশাকে আরমানের রুমটা দেখিয়ে দিতে। রুবি একবার বলল, “কিন্তু ম্যাম স্যার যদি রেগে যাই। উনি পছন্দ করে না উনার কোনো কাজ অন্য কেউ করুক।”
সাবিনা বেগম— “আরে রুবি কি সব বলছো? মাইশা আর অন্য কেউ এক হলো নাকি? মাইশা হচ্ছে আরমানের হবু বৌ। তাই চিন্তা করো না, আরমান রাগ করবে না বরং খুশি হবে।”
এরপর উনি মাইশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যাও মাইশা বেটা। তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো? যাও। কোনো ভয় নেই।”
মাইশা হালকা হেসে জবাব দিলো— “ওকে আন্টি।”
মিসেস সাবিনা বেগম মৃদু রাগ দেখিয়ে বললেন, “এই মেয়ে! কে তোমার আন্টি হ্যাঁ? মম বলবে মম। ঠিক আছে?”
মাইশা মুচকি হেসে জবাব দিলো— “আচ্ছা ঠিক মম।”
মায়ার পাশে বসে থাকা সামিরা মুখ বেঁকিয়ে মাইশাকে নকল করে বিরবির করে বলে উঠলো, “আত্তা ঠিকাতে মম! হুঁ 😏 😏 ঢং দেখলে বাঁচি না।”
সামিরার কথা শুনে আবির ফিক করে হেসে দিলো। ও ওদের কাছাকাছিই বসে ছিল তাই শুনেছে সামিরার কথা। আর মায়াও হাসলো কিছুটা, কিন্তু সেই হাসিতে নেই কোনো প্রাণ। কেমন যেনো মরা মরা লাগলো সেই হাসি।
সামিরা মায়া এবং আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “মায়া আপু আবির ভাইয়া চলো আমার রুমে চলো। আড্ডা দেবো।”
আবির— “নারে শামুক সময় নেই আমার। এরপর আবার অফিসে যেতে হবে। তোর জল্লাদ ভাইয়া ছাড় দেবে না।”
সামিরা— “ভাইয়া তুমি আবার শামুক বলছো? যাও আমি তোমার সাথে আর কথায় বলবো না। চলো তো আপু আমরা যাই।”
বলেই সামিরা টেনে নিয়ে গেলো মায়াকে উপড়ে নিজের রুমের দিকে।
আরমান একবারে গোসল করে বেরোলো ওয়াশরুম থেকে। আর বেরোতেই দেখতে পেলো অচেনা মানুষের উপস্থিতি। সত্যিই কি অচেনা? নিজের মনকেই প্রশ্ন করলো আরমান।
এদিকে মাইশা ওয়াশরুমের দরজা খোলার আওয়াজে ঘুরে তাকালো আরমানের দিকে। আর তাকাতেই নির্লজ্জের মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো। আরমানের কোমড়ে শুধু একটা টাওয়েল পেঁচানো। আর কোনো বস্ত্র নেই শরীরে।
আরমানের ভীষণ রাগ হলো, এভাবে মেয়েটা হুট করে রুমে এসে বসে থাকাই। ও গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে, খাটের উপর রেখে যাওয়া জামা প্যান্ট তুলে নিয়ে আবারও গটগট পায়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো। তারপর জোড়ে আওয়াজ করে ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দিলো।
আর এই শব্দে কেঁপে উঠলো মাইশা, সহ বাইরে দরজার কাছে থেকে উঁকি দেওয়া সামিরাও। আরমানের রুমের দরজার কাছ থেকে কিছুটা দূরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মায়া। আর ওর হাত শক্ত করে ধরে রেখে দরজা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সামিরা। মায়া সামিরাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সামিরা, এই ভাবে কারোর ঘরে উঁকি দিয়ে তাদের পার্সোনাল কথা শোনা ঠিক না।”
সামিরা ফিসফিস করে বলল, “আরে আপু কিছু হবে না। দেখতে দাও কি চলে ভেতরে।”
মায়া— “আচ্ছা, তাহলে তুমি দেখো। কিন্তু আমাকে যেতে দাও। কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।”
সামিরা আবারও ফিসফিসিয়ে বললো, “আরে কেউ খারাপ ভাববে না। আর এই সব কাজে একা একা মজা পাওয়া যাই না। তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।”
মায়ার নিজেকে ভীষন অসহায় ফিল হলো। যদি কেউ এই অবস্থায় ওদেরকে দেখে তাহলে বিষয়টা যে কতটা খারাপ দেখায় সেটা এই মেয়ে বুঝতে চাইছে না। এমনিতেও ওর মনটা ভালো নেই। কিচ্ছু ভালো লাগছে না ওর। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে যেনো। এখনো মাইশা এবং আরমানের বিষয়টা ক্লিয়ার নয় ওর কাছে। আবার এটা ভেবেও কষ্ট হচ্ছে যে, ওর চাচী বা মাইশা আপু একবারও এখনো পর্যন্ত ওকে জিজ্ঞাসা করলো না যে ও কেমন আছে।
মায়ার ঘোর কাটলো আরমানের গম্ভীর আওয়াজে। যা রুমের দরজা খোলা থাকার জন্য স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে বাইরে থেকে।
আরমান— “কারোর রুমে ঢোকার আগে যে নক করতে হয় সেটা জান নেই?”
আরমানের গম্ভীর গলার আওয়াজে মাইশা ওর মাথা নিচু করে নিলো। তারপর মিনমিন করে বলল, “আমি নক করেছিলাম। আপনি ওয়াশরুমে থাকায় হয়তো শুনতে পাননি।”
আরমান আবারও গম্ভীর গলাতেই বলল, “তার জন্য সাড়া না পেলেই এইভাবে পারমিশন ছাড়াই রুমে ঢুকে যাবেন?”
মাইশা এবার মুখ তুলে তাকালো আরমানের দিকে— “আরে আপনি রাগ করছেন কেন? আপনাকে ওই অবস্থায় দেখে ফেললাম বলে? এতে রাগ করার কি আছে? আর আমি আপনার জন্য ঠান্ডা পানি এনেছিলাম।
আরমান শান্ত গলায় বলল, “আমি কি একবারও আপনাকে বলেছিলাম আমার জন্য পানি আনতে? আর আমার রুমে আমার পারমিশন ছাড়া কেউ প্রবেশ করুক এটা আমার পছন্দ না। আর আমি চাইনা আমার কাজ অন্য কেউ করুক। তাই দ্বিতীয় বার আর এসব করার চেষ্টা করবেন না। এখন যান এখান থেকে।”
মাইশা— “আপনি আমায় এইভাবে অপমান করছেন কেন? আমি তো কিছুদিন পরেই আপনার বৌ হবো।
আরমান— “বৌ হবেন কিন্তু হননি তো। আরো কেই বা গ্যারান্টি দিলো যে আপনি আমার বৌ হবেন?”
মাইশা— “আপনি আমার সাথে এইভাবে কথা বলছেন কেন? আপনি না আমায় ভালোবাসেন অনেক বছর আগে থেকে?”
আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ২৯
আরমান— “ হ্যাঁ ভালোবাসি! ভালোবাসি সেই ছোট্ট মেয়েটাকে, যেই মেয়েটা আমকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল…আর যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে চিনে নিতে চোখের দরকার হয় না, হৃদয়ের কম্পনে চেনা যায় তাকে। তুমি মাইশা, আমি মানি…কিন্তু আমার হৃদয় যে ‘মায়াবতী’কে চায়, যার কোনো প্রতিচ্ছবি তোমাতে পাই না।
তাই তো, তুমি মাইশা হয়েও আমার পিচ্চি মায়াবতী না…।”
