Home আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩২

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩২

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩২
সালমা খাতুন

আয়ান হাসি মুখে বলল— “আরে ভাবী আপনি লজ্জা…. তুমি??
নিজের পুরো কথা শেষ না করেই ‘তুমি’ বলেই চিৎকার করে উঠলো আয়ান। ওর পায়ের তলা থেকে যেনো মাটি সরে গেলো। হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেলো ওর। মাথার উপর যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো।
হবু ভাবীর জায়গায় যে, নিজের তিন বছরের ভালোবাসা মাইশাকে দেখবে কখনো কল্পনাও করেনি আয়ান। পুরো থমকে গেছে ও। আশ্চর্য্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না।
মিসেস সাবিনা বেগম অবাক জিজ্ঞাসা করলেন, “আয়ান বেটা! তুমি মাইশাকে আগে থেকেই চেনো? কিন্তু কিভাবে? তুমি তো আজ অনেক বছর ধরে লন্ডন এ ছিলে পড়াশোনার জন্য?”

বাড়ির সবাইও ভীষণ অবাক হয়েছে, আয়ান মাইশাকে আগে থেকেই চেনে এটা বুঝতে পেরে। আয়ান তখন যেনো এই দুনিয়ায় নেই। মাইশা তাড়াতাড়ি উত্তর দিলো, “আমারা বন্ধু। মানে..আসলে আমরা একে অপরকে অনেক আগে থেকেই চিনি। ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল। তখন থেকেই আমরা টুকটাক বন্ধু হিসাবে কথা বলি। তবে আয়ান তোমাকে এখানে দেখে আমিও ভীষণ অবাক হয়েছি তোমার মতো। তুমি যে এই বাড়ির ছেলে তা আমি জানতাম না।”
মাইশা শেষের কথা গুলো আয়ান কে উদ্দেশ্য করে বলল। আয়ান শুধু অবাক হয়ে মাইশার কথা গুলো শুনলো। কি হচ্ছে ওর সাথে ও যেনো নিজেই বুঝতে পারছে না।
মিসেস সাবিনা বেগম— “ওহ আচ্ছা তাই বলো। তাই ভাবছি যে ও তো এতো বছর দেশে ছিল কিন্তু তোমাকে কিভাবে চিনে। এখন বুঝলাম। যাও তোমার তো এবার অনেক ভালো হলো মাইশা, তুমি আমাদের বাড়িতে একটা বন্ধুও পেয়ে গেলে।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মাইশা নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “হ্যাঁ মম, তুমি একদম ঠিক বলেছো। আমি তো আশাই করিনি যে এইভাবে আয়ান কে এখানে দেখতে পাবো।”
আয়ান তখনো বিস্মিত নজরে দেখে চলছে মাইশাকে।‌ যেনো এই মাইশা ওর বড্ড অচেনা।‌ হঠাৎ কেউ একজন ছুটে এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো আয়ানকে।
“হেই ব্রো! তুই কোথা আসলি? আমি তো পুরোই অবাক তোকে দেখে।”
হুম এটা আবির ছাড়া কেউ না। আবিরই জড়িয়ে ধরেছে আয়ানকে। আর কথা গুলো আবিরই বলল।
আবির আয়ানকে ছেড়ে দিয়ে বলল, “কেমন আছিস তুই? আর হঠাৎ এইভাবে কোথা থেকে আসলি?”
আয়ান স্বাভাবিক গলাতেই উত্তর দিলো, “ভালো আছি ব্রো। ভেবেছিলাম সবাইকে সারপ্রাইজ দেবো। কিন্তু নিজের জন্যই যে এতো বড়ো সারপ্রাইজ বাড়িতে অপেক্ষা করছে কল্পনাও করিনি।”

আয়ান শেষের কথাটা মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল। তারপর আনজুমা বেগমের উদ্দেশ্যে বলল, “আম্মু আমি রুমে গেলাম। লাগেজ গুলো পাঠিয়ে দিও। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।‌ আবার পরে কথা হবে সবার সাথে।”
কথা গুলো গম্ভীর গলায় বলে, আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, গম্ভীর মুখেই সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠে গেলো আয়ান। সবাই ভীষণ অবাক হলো আয়ানকে হঠাৎ করেই পাল্টে যেতে দেখে। ও ভীষণ হাসি খুশি প্রাণবন্ত একটা ছেলে। কিন্তু মাইশাকে দেখার পরপরই চুপসে গেলো ও। আবির তো অবাক হয়েই বললো— “কি হলো ব্যাপারটা? হাসি খুশি ছেলেটা লন্ডন গিয়ে এমন গোমরা মুখো হয়ে গেলো কিভাবে?”

সামিরা— “আরে ভাইয়া তো একইরকম আছে। এসে থেকেও সব কিছু ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু হঠাৎ মাইশা আপুর সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে এমন মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে নিলো।”
আবির দাঁত কেলিয়ে বলল, “বুঝলি শামুক, তাহলে আমার মনে হয় আয়ানের হয়তো মাইশাকে বড়ো ভাবী হিসাবে পছন্দ হয়নি।”
এটা শুনে বেচারি মাইশার মুখটা চুপসে গেলো। মিসেস সাবিনা বেগম বললেন, “তোমরা একটু বেশিই ভাবছো। ও এতো দুর থেকে জার্নি করে এসেছে। তাই কিছুটা ক্লান্ত। একটু রেস্ট নিতে দাও দেখবে, ও আবার আগের মতো হয়ে যাবে।”

আবির— “আরে আন্টি আপনি তো দেখছি সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছেন। আমি তো মজা করছিলাম।”
সাবিনা বেগম— “হুম। বুঝেছি। তোমাদের মজা করা ছাড়া আর আছে কি? আনজুমা এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? যা ছেলেটার জন্য খাবারের ব্যবস্থা কর। এতো দিন পর ছেলেটা এলো, আর তুই এইভাবে দাঁড়িয়ে আছিস?”
আনজুমা বেগম অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। উনার ভীষণ খটকা লাগলো আয়ানের এমন হঠাৎ পরিবর্তন দেখে। সবই তো ঠিক ছিল, কিন্তু মাইশাকে দেখার পরই কেমন যেনো চুপসে গেলো। উনি উনার ছেলেকে খুব ভালো করে চেনে। নিশ্চয় কোনো ব্যাপার আছে তার ছেলের হঠাৎ এমন করার পেছনে।
অন্যমনস্ক হয়ে নিজের ছেলের বিষয়ে ভাবছিলেন উনি। সাবিনা বেগমের কথায় ধ্যান ভাঙলো।
আনজুমা বেগম— “হুম ভাবী, যাচ্ছি।”
বলেই উনি চলে গেলেন আয়ানের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে।

এদিকে আয়ান ওর রুমে সোফায় বসে আছে। চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। এখনো পরনের পোশাক টাও পাল্টাইনি। দুই জন এসে ওর লাগেজ গুলো দিয়ে গেলো। কিন্তু তাতেও কোনো হেলদোল নেই।
“তুমি যে এই শাহরিয়ার পরিবারের ছেলে, সেটাতো কোই আগে বলো নি তো?”
একটা চেনা অথচ অচেনা রুপের মেয়েলি কন্ঠ স্বর শুনে আয়ান মুখ তুলে তাকালো দরজার দিকে। দেখলো মাইশা দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। আয়ান গম্ভীর গলায় বলল, “কেন? আগে জানলে আমার সাথে ব্রেকআপ করতে না বুঝি? যদিও ব্রেকআপ তুমি করেছো আমি না।”
মাইশা মুচকি হাসি দিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, “জানলেও কিছু করার ছিল না। তবুও ব্রেকআপ করতাম আমি।‌ কারণ এতো বড়ো সুযোগ কিভাবে হাত ছাড়া করি বলো? তোমার থেকে তোমার বড়ো ভাইয়ের নাম, যশ, খ্যাতি, টাকা পয়সা, পাওয়ার সব বেশি।

কথা গুলো বলতে বলতে সোফায় আয়ানের পাশে এসে বসলো, কিছুটা গা ঘেঁষে। তারপর আয়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস গলায় বলল, “এমনকি তোমার থেকেও ভীষণ হ্যান্ডসাম। দেখলেই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।”
এরপর ওর কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে এসে স্বাভাবিক গলায় বলল, “আর এমনিতেও আমি তোমার ভাইয়ের কাছে যাইনি, তোমার ভাই আমার কাছে এসে ধরা দিয়েছে। আমাকে নাকি তোমার ভাই অনেক বছর আগে থেকে ভালোবাসে। আমি ছোটোতে উনার জান বাঁচিয়েছিলাম তাই। আর তোমার বড়ো আম্মু নিজে আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে, তোমার বড়ো ভাইয়ের বউ করার জন্য। আমার মা বাবাও রাজি। তাই ভাবলাম বিয়েটা করেই নিই।”

আয়ানের পুরো শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে। মাইশার প্রতিটা কথা ওর হৃদয়কে পুড়িয়ে দিচ্ছে যেনো। নাহ আর সহ্য করতে পারলো না আয়ান। রাগে এক হাত দিয়ে সোফায় ওর পাশে বসে থাকা মাইশার গলা চেপে ধরে সোফার সাথে ঠেসে লাগিয়ে দিলো। মাইশা ছটফট করতে শুরু করলো। দুই হাত দিয়ে আয়ানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু না, পারলো না। একটা স্বাস্থ্যবান পুরুষ মানুষের কাছে ওর চেষ্টা বৃথা। মাইশার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, মুখ থেকে আওয়াজ বের হচ্ছে না। ধীরে ধীরে ওর চোখ লাল হয়ে গেলো। চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করলো।

আয়ান রাগে হিসহিসিয়ে বলছে, “কেনো করলি তুই আমার সাথে এমন? কি দিইনি তোকে হ্যাঁ? কি দিইনি তোকে? আজ পর্যন্ত তোর একটাও ইচ্ছে অপূর্ণ রাখিনি। বাপ, ভাইয়ের দেওয়া আমার হাত খরচের টাকা দিয়ে তোর সব স্বপ্ন পূরণ করেছি। যখন যেই টা চেয়েছিস সেটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর আজ, আমার বড়ো ভাইয়ের টাকা দেখে আমাকে ছেড়ে আমার বড়ো ভাইয়ের পেছনে পড়েছিস? না এটা আমি কখনোই হতে দেবো না। তুই শুধু আমার, তুই শুধুই আমার। কিছুতেই তোকে আমি অন্য কারো হতে দেবো না।”

কথা গুলো বলতে বলতেই চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো আয়ানের।‌ মাইশার এবার দম বন্ধ হয়ে আসছে দেখে ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিলো আয়ান। মাইশা সোফার হ্যান্ডেল এর কাছে গিয়ে পড়লো। হাঁপাতে শুরু করেছে ও। আয়ান উঠে গিয়ে জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে বাড়িয়ে দিলো মাইশার দিকে। কিছুক্ষন আগে একজন স্টাফ দিয়েছিল পানি, আয়নের রুমে।

মাইশা পানিটা নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। তারপর সোফায় নিজের শরীর টাকে এলিয়ে দিলো। আয়ান ধীরে সুস্থে সোফায় মাইশার পাশে গিয়ে বসলো। তারপর মাইশার মাথাটা নিজের কাঁধে নিয়ে এক হাত দিয়ে এক পাশ থেকে জড়িয়ে ধরলো। মাইশা নিজের শরীর ভর ছেড়ে দিলো আয়ানের উপর। বেচারি এখনো বড়ো বড়ো করে শ্বাস নিচ্ছে। আর একটু যদি আয়ান ধরে থাকতো তাহলে নির্ঘাত ও এতক্ষনে পরপারে পাড়ি জমাতো।

আয়ান— “সরি! তোমাকে ইচ্ছে করে আঘাত করতে চাইনি। আসলে রাগটা কন্ট্রোল করতে পারনি। দেখো, পাগলামি করোনা। আমিও আমাদের বিজনেসে জয়েন করবো। এই যে বাড়িটা দেখছো এটাতেও আমার অধিকার আছে ঠিক যতটা বড়ো ভাইয়ার আছে। তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি বাড়ির সবার সাথে কথা বলবো। সবাই বুঝবে ব্যাপারটা, ভাইয়াও রাগ করবে না জানি। খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেবো তোমাকে।”
মাইশা— “নাহ! কিছুতেই না। কাউকে কিচ্ছু জানাবে না তুমি। আমি চাইনা তোমার হতে। আমার তো ওই আরমান শাহরিয়ার কেই চাই।”

আয়ান রাগে সেন্টার টেবিলে থাকা জগটা তুলে আছাড় মারল মেঝেতে। সাথে সাথে ভেঙে চুরমার হয়ে বিকট একটা আওয়াজ হলো। আর সেই আওয়াজে কেঁপে উঠলো মাইশা। চিৎকার দিয়ে উঠলো আয়ান।
আয়ান— “আরমান!! আরমান!! আরমান!! কি আছে ওই আরমানের মধ্যে? হ্যাঁ? কি আছে যেই আরমানের মধ্যে যে আমাদের তিন বছরের সম্পর্ককে তুমি এই ভাবে পায়ে করে ঠেলছো? কিছুতেই আমি ওই বিয়ে হতে দেবো না। কিছুতেই না। সবাইকে সবকিছু জানিয়ে দেবো আমি। হ্যাঁ, সব কিছু জানিয়ে দেবো।”

মাইশা মুচকি হেসে বলল— “জানিয়ে দেবে? ঠিক আছে জানিয়ে দাও। সবাইকে জানিয়ে দিলেও আমি তোমার হবো না কিছুতেই। আর তুমি তোমার বড়ো ভাইয়ের কথা একবারও ভাববে না? তুমি আমাকে ভালো বেসেছো তিন বছর ধরে। আর তোমার ভাই আমাকে ভালো বেসেছে 10 বছর ধরে। শুনেছি পাগলের মতো খুঁজছে আমায়। তার এতো বছরের অনুভূতির কথা ভাববে না? শুনেছি তোমার বড়ো ভাই নাকি তোমাকে ভীষন ভালোবাসে। তোমার জন্য নিজের জানটাও দিয়ে দিতে পারে, আর তুমি? তুমি তার এতো বছরের ভালোবাসার মানুষটাকে কেড়ে নেবে? তোমার ভাই মানতে পারবে তো এটা? ভাবো তো এই তিন বছরের সম্পর্কে তোমার যদি এতোটা কষ্ট হয়, তাহলে তোমার ভাই যে আমাকে দশ বছর ধরে ভালোবাসছে, তাহলে তার কতটা কষ্ট হবে?

শুনলাম আমার জন্য নাকি মায়াকেও মানেনি বউ হিসাবে, তাকেও ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে। তাহলে এতো কিছুর পরেও পারবে তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে বেইমানি করতে?”
মাইশার কথা গুলো শুনে আয়ানের রাগী মুখ ধীরে ধীরে অসহায়ে পরিনত হলো। মাইশা বুঝলো ওর কথা গুলো ঠিক জায়গায় গিয়ে লেগেছে। ও একটা বাঁকা হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সোফা ছেড়ে। তারপর আবারও বলল— “ঠিক আছে, তুমি যদি চাও তোমার বড়ো ভাই কষ্ট পাক তাহলে জানিয়ে দিও সবাইকে। কিন্তু মাথায় রাখবে, ঠিক এখন তুমি যতোটা কষ্ট পাচ্ছো তার থেকেও হাজার গুণ কষ্ট তোমার ভাই পাবে। ঠিক এখন যতটা ভেঙে চুরমার হচ্ছো তুমি তার থেকেও বেশি তোমার ভাইও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।”

কথা গুলো বলে এক নজর আয়ানের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো মাইশা। ও খুব ভালো করে চেনে, আয়ানকে। ওর কথা গুলো ঠিকই কাজে দেবে।
এদিকে আয়ান অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকলো মেঝের দিকে। হ্যাঁ ঠিকই বলছে মাইশা। আরমান সেই দশ বছর ধরে ভালোবাসে তার মায়াবতীকে, আর এটা এই বাড়ির সবাই জানে। অনেক পাগলামি করেছে ও সেই মেয়ের জন্য। আর আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই মেয়ে হচ্ছে মাইশা। যার সাথে আয়ানের তিন বছরের সম্পর্ক। হ্যাঁ, ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল ওদের। একে অপরের পোস্টে লাইক, কমেন্ট, কমেন্ট এর রিপ্লাই এরপর টুকটাক ম্যাসেজ এ কথা বলা। তারপর শুরু হয় বন্ধুত্ব, আর সেই বন্ধুত্ব থেকেই গড়ে উঠে ভালোবাসা।

আর আজ? আজ সেই তিন বছরের ভালোবাসা হেরে গেলো ওর ভাইয়ের দশ বছরের ভালোবাসার কাছে। হ্যাঁ জেদের বশে প্রথমে সবাইকে জানিয়ে মাইশাকে বিয়ে করবে বললেও ও এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে এটা সম্ভব নয়। কিছুতেই সম্ভব নয়। ও এতো বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা কিছুতেই করতে পারবে না ওর ভাইয়ের সাথে। ও নিজের চোখে দেখেছে সেই মেয়ের জন্য ভাইকে ছটফট করতে। অনেক জায়গায় পাগলের মতো খুঁজ বেরিয়েছো মেয়েটাকে। নাহ, এটা ও কিছুতেই পারবে না। ওর বড়ো ভাইয়াকে কিছুতেই কষ্ট দিতে পারবে না ও।
কারোর পায়ের আওয়াজে মুখ তুলে তাকালো আয়ান। দেখলো ওর আম্মু এসেছে রুমে, হাতে খাবারের প্লেট। আয়ান তাড়াতাড়ি ওর চোখের পানি গুলো দুই হাত দিয়ে মুছে নিলো। হ্যাঁ, এতোক্ষণ কথা গুলো ভাবতে ভাবতে চোখ থেকে পানি পড়ছিল ওর।

সবাই বলে, ছেলেদের কান্না মানায় না।
কিন্তু কেউ ভাবে না—যখন হৃদয় টা ভেঙে চুরমার হয়ে যাই, সেটা তো ছেলে হোক বা মেয়ে, রক্ত তো একই রকম ঝরে। পুরুষ বলে কি তার কষ্টের কোনও শব্দ হবে না?
আয়ান মুখ হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল, “আরে আম্মু, এসো এসো বসো। আজ আমি তোমার হাতে খাবো। কতদিন খাইনি তোমার হাতে।”

আনজুমা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাবার থালাটা সোফার সামনের টেবিল টাই রাখে আয়ানের পাশে বসলো। তারপর ছেলেকে টেনে নিজের কোলে মাথা দিয়ে শুইয়ে দিলেন। তারপর মাথায় আদুরে স্পর্শে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলেন। আয়ানও নিজের গর্ভধারিনী মায়ের স্নেহ পেয়ে আরো ভেঙে পড়লো যেনো। আবারও চোখ থেকে বেরিয়ে এলো অবাধ্য নোনা জল। আর সেগুলো লুকাতে মায়ের কোলে মুখ গুঁজলো আয়ান।
আনজুমা বেগম— “ভালোবাসিস মাইশাকে, তাই তো?”

আয়ান তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে উঠে বসলো। তারপর মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে বলল— “কি সব বলছো আম্মু? তোমাদের সবাইকে এতোদিন পর দেখে ইমোশনাল হয়ে পড়েছি। আর মাইশা আমার ভালো বন্ধু হয়।”
আনজুমা বেগম স্নেহ মাখা কন্ঠে বলে উঠলো— “আমি তোর আম্মু, আয়ান। দশ মাস গর্ভে ধারণ করেছি তোকে। সবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও নিজের মায়ের চোখকে ফাঁকি দিতে পারবি না।”
আনজুমা বেগমের এমন কথায় আয়ান যেনো নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। আরো ভেঙে পড়লো ও। আবারো মায়ের কোলে শুয়ে পড়ে কোমর জড়িয়ে ধরে, কোলে মুখ গুঁজে হুহু করে কান্না করে দিলো।
কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বলল— “ভীষণ ভালো বাসি আম্মু। ভীষণ ভীষণ ভালো বাসি।‌ ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না আমি।”

আনজুমা বেগম কিছুক্ষণ কাঁদতে দিলেন ছেলেকে। ছেলের কষ্ট দেখে নিজের চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পড়লো আনজুমা বেগমের। স্নেহ ভরা স্পর্শে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন ছেলের মাথায়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন— “এটা হতে পারে না আব্বু। মাইশার সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আরমানের। আর সবাই জানে আরমান মাইশাকে সেই দশ বছর থেকে ভালোবাসে। আর তোর জন্য আমি একটা খাঁটি মেয়ে ঠিক করে রেখেছি। তাকে তোর আব্বুরও খুব পছন্দ। আর আমি জানি সেই মেয়েকে তোরও পছন্দ হবে। আর সত্যি বলতে মাইশা মেয়েটাকে আমার একটুও পছন্দ না। তাই চেষ্টা কর মাইশাকে…..”

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩১

কথাটা শেষ করলেন না আনজুমা বেগম। দরজার দিক থেকে চোখ পড়তেই থেমে গেলেন উনি। দরজার কাছে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। আয়ান নিজের কান্না থামিয়ে দিয়ে তার আম্মুর কথা শুনছিল। কিন্তু হঠাৎ ওর আম্মুকে থেমে যেতে দেখে মুখ তুলে তাকালো। দেখলো ওর আম্মু ঘাবড়ানো চেহারা নিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ানও ঘুরে তাকালো দরজার দিকে। আরমানকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজেও চমকে উঠে বসলো ও। তাড়াতাড়ি দুই হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলো ও।

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩৩