আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩৫
সালমা খাতুন
আরমানের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। নিঃশব্দে, স্থির এক মনোযোগে সে গাড়ি চালিয়ে চলেছে। পাশেই বসে থাকা মায়ার মনে গুমোট এক অস্বস্তি জমে আছে, ক্রমশ সেটা বিরক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
এই গাড়িটা তো আবিরের, তাই প্রথমে সে ভেবেছিল আবিরই হয়তো ওর জন্য রয়ে গেছে। তাই সে কিছু না বুঝে, না ভেবেই উঠে পড়েছিল গাড়িতে। কিন্তু যদি জানতো ভেতরে বসে আছে আরমান—তবে জীবনেও পা রাখতো না এই গাড়িতে।
কেনো জানি মানুষটাকে আর একটুও সহ্য হচ্ছে না মায়ার। ভেতরে ভেতরে রাগে, ক্ষোভে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে সে। আজ বাদে কাল লোকটার বিয়ে। তাও আবার… ওরই চাচাতো বোনের সাথে। বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠছে ওর, যেনো আগুনের উত্তাপ ছড়াচ্ছে প্রতিটি নিঃশ্বাসে। আর এই জ্বলন্ত কষ্টের উৎসটা মায়া খুব ভালো করেই জানে।
ভালোবেসে ফেলেছিল সে এই মানুষটাকে। হ্যাঁ… ভালোবেসেছিল। মনেপ্রাণে, বিশ্বাসে, ভরসায়।
কিন্তু কী ভুল করেছিল সে? যে তার শাস্তি হলো এতটা নির্মম? অন্যায় তো করেনি সে। নিজের স্বামীকে ভালোবাসা কি অন্যায়? তবুও, ভুল করেছিল বটে। অনেক বড়ো ভুল। স্বামীকে ভালোবেসেই হয়তো ও নিজের জন্য তিক্ত পরিণতি ডেকে এনেছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কারণ, ওর স্বামীর হৃদয়ে যে আগেই অন্য কেউ ছিল! আর সেই সম্পর্কের মাঝখানে ‘থার্ড পারসন’ হয়ে এসেছিল সে। ভেবেছিল—হালাল সম্পর্ককে সে হৃদয়ে জায়গা দিতে শিখবে। ভেবেছিল—সময় গেলে হয়তো মানুষটা একদিন তাকে ভালোবাসবে। কিন্তু না… সে দিন কোনোদিন আসেনি। বরং একদিন হঠাৎ করেই, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, ঘরে চলে আসে ডিভোর্স পেপার।
মায়া নিজের মনকে ধমক দিতে চায়। না, এসব ভাবা এখন ঠিক নয়। ডিভোর্স হয়ে গেছে।
আরমান কখনোই ওর ছিল না। সে তো প্রথম থেকেই অন্য কারোর ছিল।
তবু, তবু কেন মনটাকে বোঝানো যায় না?
বারবার কেন পুরোনো কথা মনে পড়ে যায়?
মনের এই অবাধ্যতায়, এই বেহায়াপনায় ক্লান্ত মায়া আজ। কেনো যেনো এখনো মনে হয়—যদি মানুষটা একবার… একবার শুধু হাত বাড়িয়ে দিত! যদি ওদের ডিভোর্স না হতো!
যদি মানুষটা একটিবার শুধু বলতো—“চলো, আবার সব শুরু করি…”
পৃথিবীতে ওর আপন বলতে আর কেউ নেই।
বাবাকে হারিয়েছে, আর বাবার পর যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতো, সেই মানুষটাও ওকে ছেড়ে দিয়েছে। ভরসার প্রতিটা দেয়াল ভেঙে পড়েছে।
অজান্তেই, দু’ফোঁটা জল ঝরে পড়ে মায়ার চোখ থেকে। নিঃশব্দে, একাকীত্বে, তা পড়ে কোলে রাখা হাতের ওপর। চোখের সেই নোনতা জল যেনো ওকে হঠাৎ করে বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
না! ও আবারও দূর্বল হয়ে পড়ছে। এটা চলবে না।
এই স্বার্থপর পৃথিবীতে ও একা। একদম একা।
নিজেকেই ওকে শক্ত হতে হবে।
চোখের জল মুছে নিয়ে, সমস্ত কষ্ট, রাগ আর অবহেলাকে গলায় মিশিয়ে মায়া হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “আপনি তো নিজের গাড়ি ছাড়া অন্য কারো গাড়ি ব্যবহার করেন না। আর নিজের গাড়িতে তো কাউকে উঠতেও দেন না। তাহলে আজ কী হলো? নিজের গাড়ি ছেড়ে অন্যের গাড়িতে উঠলেন?”
আরমান তাকালো না ওর দিকে। দৃষ্টি জমে রইলো সামনের রাস্তায়। স্টিয়ারিং হালকা ঘোরাতে ঘোরাতে গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলো—
“কিছু কিছু কাজ পছন্দ না করলেও করতে হয়… শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের জন্য।”
মায়া— “হুম, আপনি তো নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। তবে হবু বৌকে নিজের গাড়িতে উঠিয়ে, তারপর নিজে আন্যের গাড়িতে উঠার পিছনের স্বার্থ টা বুঝলাম না।”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হ্যাঁ আমি নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বুঝি না, নিজেকে ভালো রাখার জন্য আমি স্বার্থপর হতেও রাজি। আমার স্বার্থ যদি কারো চোখে নিষ্ঠুরতা মনে হয়, তবে হ্যাঁ আমি নিষ্ঠুর। আর ‘আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা’। যেটা বোঝার সাধ্য সবার নেই।”
মায়া—“যেখানে স্বার্থ থাকে, সেখানে ভালোবাসা নয়—চাহিদা বাস করে। আর যেখানে ভালোবাসার নামে কষ্ট দেওয়া হয়, সেখানে প্রেম নয়, আধিপত্য জন্মায়। ভালোবাসা মানে, প্রিয়জনের সুখের জন্য নিজের খুশিকেও নিঃশব্দে বিসর্জন দিতে পারা।”
আরমান—“তুমি তো দেখছি, আমার দেওয়া ভালোবাসার পুরো সংজ্ঞাই পাল্টে দিলে… তা, কার জন্য এমন নিঃস্ব ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছো মনে?”
মায়া কিছুটা তাচ্ছিল্য হেসে বলল, “কার জন্য এমন নিঃস্ব ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছি, তা আপনাকে জানাতে বাধ্য নয় মিস্টার আরমান শাহরিয়ার। আপনি আপনার নিজের চরকায় তেল দিন, আজ বাদে কাল আপনার বিয়ে। আমাকে নিয়ে নিয়ে না ভেবে নিজের হবু বৌকে নিয়ে ভাবুন।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে আরমানের আঙুল চেপে উঠল। হঠাৎ করেই সে জোরে ব্রেক কষে ধরল। মায়া সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সিটবেল্টের কারণে কোনো আঘাত লাগেনি।
তারপর… মুহূর্তেই বদলে গেল পরিবেশ।
আরমান ঝুঁকে এলো মায়ার দিকে। চোখ দুটো রাগে জ্বলে উঠেছে—শব্দহীন আগুনের মতো।
ঠোঁটের কোণ চেপে ধরে, থুতনির কাছে হাত বাড়িয়ে তার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠল, “বাধ্য! বাধ্য! বাধ্য!
তুমি আমাকে জানাতে বাধ্য, মিস মায়া! একশোবার বাধ্য। তুমি কি ভুলে গেছো? তুমি এখনো আমার কেনা সম্পত্তি। হ্যাঁ! এক মাসের জন্য অনেক গুলো টাকা দিয়ে কিনেছিলাম তোমায়! সে কথা এত সহজে ভুলে যাও কেন তুমি?”
মায়ার চোখে আতঙ্ক নয়, ছিল আগুন। চোখের দিকে ঠাণ্ডা অথচ তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে, গলার স্বর ভারি করে কোনো রকমে বলল, “হ্যাঁ, আমি আপনার কেনা সম্পত্তি—এক মাসের জন্য। কিন্তু আপনি এটা কেনো ভুলে যান মিস্টার আরমান শাহরিয়ার? আপনি আমার দেহকে টাকার বিনিময়ে কিনেছেন, মনকে নয়। আপনি চাইলে আমার এই শরীরটাকে বাধ্য করে যেকোনো কাজ করিয়ে নিতে পারেন… কিন্তু আমার মনটাকে আপনি বাধ্য করতে পারবেন না। আর সেই কারণেই আমি আপনাকে আমার মনের কোনো কথা জানাতে একটুও বাধ্য নই।”
আরমান মায়ার কথার উত্তরে একটিও শব্দ উচ্চারণ করল না। শুধু মুখটা আরও কাছে এনে, আগের অবস্থানে স্থির হয়ে রইল। ঠিক মায়ার মুখের সামনে, নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসের দূরত্বে। তীক্ষ্ণ, তীব্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার চোখে—যেন ওই চোখের ভেতরেই খুঁজে নিতে চাইছে সব প্রশ্নের উত্তর।
মায়ার থুতনিতে আরমানের আঙুলের চাপ তখনও দৃঢ়। ব্যথা হচ্ছিল নিঃসন্দেহে, কিন্তু সেই ব্যথার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই তার মুখে।
তাতে আছে কেবল একরাশ অনড় দৃঢ়তা।
চোখে ফুটে উঠেছে এক অজানা, বেপরোয়া রাগ। সেই রাগের গভীরে লুকিয়ে আছে প্রকাশ না পাওয়া কিছুটা অভিমান—একগুচ্ছ না-বলা অভিযোগ, যেগুলো শব্দ হতে পারেনি কোনোদিন।
চোখে চোখ রাখার এই অসম লড়াইয়ে, দুজনেই বোঝে… কেউ হারছে না, তবু কেউ জিতছেও না।
জানালার কাঁচে ঠকঠক আওয়াজে ঘোর কাটলো দুজনের। আরমান সরে এলো মায়ার কাছ থেকে। তারপর কোনো কিছু না বলেই গম্ভীর মুখে বের হয়ে গেলো গাড়ি থেকে।
মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলো, সামিরা দাঁড়িয়ে আছে। মায়া বুঝলো ওরা পৌঁছে গেছে নিজেদের গন্তব্যে। মায়াও গাড়ির দরজা খুলে বের হলো।
সবাই সপিং মলের বাইরে দাঁড়িয়ে আরমানের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সবাই মায়াকে আরমানের গাড়ি থেকে নামতে দেখে কিছুটা অবাক হলো। একে অপরের সাথে ফিসফিস করতে শুরু করলো।
মাইশা, মায়াকে আরমানের গাড়ি থেকে নামতে দেখে জলন্ত চোখে তাকালো মায়ার দিকে, যেটা মায়া খেয়াল করলো না।
সামিরা কান ধরে মায়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “সরি আপু, আমি ভেবেছিলাম তুমি ওই গাড়িতে উঠে পড়েছো। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম তুমি ওই গাড়িতে নেই। আমি আবির ভাইয়াকে আবার পাঠাচ্ছিলাম তোমাকে আনার জন্য। কিন্তু আবির ভাইয়া বলল, তুমি নাকি বড়ো ভাইয়ার সাথে আসছো।”
মায়া একটু হেসে বলল, “ঠিক আছে সামিরা, এর জন্য সরি বলতে হবে না।”
মায়া কথাটা হেসে বললেও, সেই হাসিতে যেনো প্রাণ নেই। সবার মধ্যে যেই উচ্ছাস দেখা যাচ্ছে তার ছিটেফোঁটাও মায়ার মধ্যে নেই।
সবাই একে একে প্রবেশ করলো সপিং মলের ভিতর। আরমান তার গাড়ির চাবি গেটে থাকা দারোয়ান হাতে ধরিয়ে নিজেও প্রবেশ করলো। সপিং মলের কিছু বড়ো পদের কর্মচারী সহ ম্যানেজার ছুটে এলো আরমানকে ওয়েলকাম জানাতে।
এদিকে বাকি সবাই অবাক, কারণ এই মুহূর্তে ওরা ছাড়া এই সপিং মলে আর একটাও কাস্টমার নেই। পুরো সপিং মল ফাঁকা। নেই কোনো গুঞ্জন, নেই কোনো কোলাহল। সবাই বুঝলো এটা আরমানের কাজ, কারণ এই সপিং মলের মালিক আরমান। এই সপিং মল আরমানের।
সামিরা বিরক্ত হয়ে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ভাইয়া, এটা কি হলো? গোটা মল ফাঁকা করে দিলে! এখানে তো একটা প্রাণও নেই—এমন নির্জনতা নিয়ে কি সপিং হয় নাকি? একটা সাড়া-শব্দও নেই… খুব অস্বস্তিকর লাগছে।”
আয়ান— “আর এতে তো তোদেরই সুবিধা হবে সামিরা। ইচ্ছে মতো সপিং করতে পারবি, না আছে ভীড়, না হবে হুটুপটি। কেউ ডিস্টার্ব করার জন্য নেই তোদেরকে।”
এরপর আরমান সবাইকে যে যার ইচ্ছা মতো সপিং করতে বলল। সবাই যে যার মতো চলে গেলো। আরমান ব্যাস্ত হয়ে গেলো ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে।
মায়া একপাশে, বড়ো কাঁচের দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে এক মনে তাকিয়ে আছে। সবাই যে যার মতো ঘুরে ঘুরে জামা কাপড় পছন্দ করতে ব্যস্ত। কিন্তু এইসবে মায়ার কোনো খেয়াল নেই।
কিছুটা দূরেই আরমান একটা সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। দৃষ্টি তার মায়াতে আবদ্ধ।
হঠাৎ একটা মেয়ে কর্মচারীর আওয়াজে ঘোর কাটলো মায়ার। মেয়েটি বলছে, “ম্যাম ওই দিকে আপনাকে সামিরা ম্যাম ডাকছে।”
মায়া ছোটো করে উত্তর দিলো, “হুম যাচ্ছি।”
কর্মচারীটি চলে গেলো, মায়াও এগিয়ে গেলো মেয়েটির দেখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করে।
কিন্তু প্রচন্ড অবাক হয়ে গেলো। কারণ হঠাৎই মনে হলো সপিং মলের এই ফ্লোর টা পুরোই ফাঁকা। ও অনুভব করলো, এই ফ্লোরে ও ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই। ভয়ংকর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে পুরো ফ্লোর জুড়ে। এরপর হঠাৎই পুরো জায়গাটা অন্ধকার হয়ে গেলো। হয়তো লোডশেডিং হয়েছে। কিন্তু লোডশেডিং হলেও সপিং মলের বড়ো বড়ো কাঁচের জানালা গুলো তো খোলা ছিল, তা দিয়ে আলো ঢোকার কথা। কিন্তু না, কোথাও থেকে কোনো আলো আসছে না। হয়তো বড়ো বড়ো কাঁচের জানালা গুলোতে পর্দা টেনে দেওয়া হয়েছে। মায়া প্রচন্ড ভয় পেলো এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে। ভয়ে ঘামতে শুরু করলো ও।
মায়া চিৎকার করে ডাকতে যাচ্ছিল সামিরাকে। কিন্তু তার আগেই ও অনুভব করলো, একটা শক্ত পুরুষালী হাত ওর মুখ চেপে ধরেছে। আর তার পরপরই আর এক হাতে সেই পুরুষটি মায়ার পেট সহ কোমর জড়িয়ে ধরে তুলে নিলো মেঝে থেকে। মায়া নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটপট শুরু করলো। কিন্তু পারলো না, সেই ব্যক্তি কোথায় যেনো নিয়ে আসলো মায়াকে। এরপর মায়াকে নামিয়ে দিয়ে, সেই ব্যক্তি মায়ার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিতেই মায়া আবারও চিৎকার করতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই ব্যাক্তিটি নিজের পুরুষালী ঠোঁট মায়ার নরম ঠোঁটের সাথে মিশিয়ে দিলো। যার ফলে মায়া আর কোনো আওয়াজ করতে পারলো না। কিন্তু ধস্তাধস্তি শুরু করলো ব্যাক্তিটির সাথে।
ব্যাক্তিটি মায়ার ঠোঁট গভীর ভাবে চুষতে থাকলো, যেনো কোনো অমৃত সুধা পান করছে। আর এক দিয়ে মায়ার শরীরে থাকা ওরনা খুলে নিয়ে মায়ার হাত, কোনো একটা স্টিলের স্ট্যান্ড এর সাথে শক্ত করে বেঁধে দিলো। এরপরেই ব্যাক্তিটি মায়ার মুখ থেকে নিজের মুখ সরিয়ে আনলো। আর সাথে সাথেই রুমাল জাতীয় কিছু একটা দিয়ে মায়ার মুখটাও বেঁধে দিলো যাতে মায়া কোনো আওয়াজ না করতে পারে। এরপর পা টাও বেঁধে দিলো মায়ার।
এদিকে মায়া ওর সাথে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। প্রচন্ড ভয়ে ঘামতে শুরু করেছে ও। চোখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে অশ্রু। মায়ার পরনে ছিল থ্রিপিস। এরপরই মায়া অনুভব করলো, ওর পেটের কাছের কাপড় টা সরিয়ে, গুটিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত করে দিলো পেট ও কমোড়। মায়া ভয়ে গুটিয়ে গেলো। দ্বিগুন হারে বেড়ে গেলো ওর ছটফটানি।
মায়া অন্ধকারের মধ্যেও অনুভব করলো ব্যাক্তিটি ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। এরপর মায়া ওর পেটে ও কোমরে অনুভব করলো ঠান্ডা কিছু একটা জড়িয়ে যাচ্ছে। ওই ব্যাক্তিটি, কোমর বন্ধনীর মতো কিছু একটা পরিয়ে দিচ্ছে মায়াকে।
মায়া হঠাৎ তার ছটফটানি থামিয়ে দিয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেলো। এখন আর মায়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে না। অতিরিক্ত অবাক হওয়ার কারণে চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে ফেললো। ব্যাক্তিটির ঠান্ডা হাতের স্পর্শ নিজের পেটে অনুভব করলো মায়া। আর এই ঠান্ডা স্পর্শে কিছুটা কেঁপে উঠলো মায়া।
এরপর ব্যাক্তিটির কাজ শেষ হতেই, পরিয়ে দেওয়া জিনিসটির উপর হালকা স্পর্শে ঠোঁট ছোঁয়াল। সেই স্পর্শ কিছুটা পেটেও পরলো। আরো একবার কেঁপে উঠলো মায়া।
এরপর ব্যাক্তিটি মায়ার জামা গুটানো থেকে খুলে দিয়ে, ঢাকা দিয়ে দিলো পেট। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে, মায়ার মুখেল বাঁধন খুলে দিলো। হালকা করে নিজের ঠোঁটের স্পর্শ দিলো মায়ার কপালে। তারপর মায়ার হাতের বাঁধনও খুলে দিয়ে, ওরনাটা সুন্দর করে জড়িয়ে দিলো মায়ার গায়ে। এরপরই ব্যাক্তিটি চলে গেলো।
আর এদিকে মায়া যেনো এই দুনিয়ায় নেই। পুরো হতভম্ব হয়ে আছে ও। ওর ঘোর কাটলো হঠাৎ চারপাশ আলোকিত হয়াই। অবাক হয়ে দেখলো চারিদিক। কিচ্ছু বুঝতে পারছে না ও। এখন এই মুহূর্তে ও একটা ট্রায়াল রুমে আছে। ওর হাত দুটো বাঁধা ছিল কাপড় রাখা স্টিলের স্ট্যান্ডে।
মায়া তাড়াতাড়ি ওর পেটের কাছের কাপড়টা সরিয়ে দেখলো, আর ওর কোমরে থাকা জিনিসটি দেখে অবাকের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলো ও।
ডায়মন্ড ও গোল্ডের অসম্ভব সুন্দর কারুকার্যের চকচক করা কোমর বন্ধনী। অসম্ভব সুন্দর ওই কোমড় বন্ধনী, আজ পর্যন্ত মায়া চখে দেখেনি। চারিপাশে গোল্ডের উপর ছোটো ডায়মন্ড বসানো, এবং মাঝখানে, মানে ঠিক মায়ার নাভির কাছে বড়ো একটা গাঢ় লাল রঙের চোখ ধাঁধানো রুবি পাথর।
মায়া যেনো ওর মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে কোমর বন্ধনীটি দেখে। মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। মাথায় ঘুরছে, কে ছিল লোকটি? কেনই বা ওকে এতো দামি একটা কোমর বন্ধনী পরিয়ে দিলো? কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। সব কিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
মায়া হাত দিয়ে আলতো হাতে স্পর্শ করলো কোমর বন্ধনী টিকে। তারপর দুই হাত দিয়ে চেষ্টা করলো ওটাকে খোলার, কিন্তু পারলো না। মায়া খেয়াল করে দেখলো ওটাতে কোনো কড়া জাতীয় কিছু নেই, ভালো করে দেখে বুঝলো ওটা লক সিস্টেম। নিশ্চয় এটার কোনো চাবী আছে। আর কোমর বন্ধনী টি একবারে মায়ার কোমরে ঠিকঠাক বসে গেছে। যেনো ওটা ওর কোমরের মাপেই বানানো হয়েছে।
মায়া অনেক চেষ্টা করেও ওটা খুলতে পারলো না। হাল ছেড়ে দিলো। হঠাৎ মনে পড়লো, সেই ব্যাক্তিটির দেওয়া ওর কপালে স্পর্শ। মায়া ঠিক ওই জায়গাতেই হাত ছোঁয়ালো। মনে হলো স্পর্শ টা ওর খুব চেনা।
মায়া এখনো হতবাক। কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না ওর। সামিরাদের গলার আওয়াজ ভেসে আসছে বাইরে থেকে। মায়া তাড়াতাড়ি নিজের পায়ের বাঁধন ও খুলে ফেললো।
অন্যদিকে….
এক ব্যাক্তি ফোনে কথা বলছে।
অজনা ব্যাক্তি— “খোঁজে লাগাও। আজ রাতের মধ্যেই অল ডিটেইলস চাই আমার। ওই মাইশা মেয়েটা কি আদেও সেই মেয়ে? যে আরমানের জান বাঁচিয়েছিল। নাকি ওই মেয়েও কোনো ছলনাময়ী?”
কল এ থাকা অপর পাশের ব্যাক্তিটি বলল, “হ্যাঁ বস। আজ রাতের মধ্যেই আমি আপনাকে সঠিক খবর দিচ্ছি।”
অজনা ব্যাক্তি— “হ্যাঁ আজ রাতের মধ্যেই খবর চাই আমার। আর যে সময় নেই হাতে। কাল ওদের বিয়ে। ওই মাইশাই যদি আরমানের সেই প্রাণ ভোমরা হয়, তাহলে ওই মেয়েকে আমি কিছুতেই আরমানের জীবনে আসতে দেবো না। কিছুতেই আমি আরমানকে সুখী হতে দেবো না। আমি ওর প্রাণ ভোমরার প্রাণ কেড়ে নেবো। নিঃস্ব করে দেবো ওকে।”
কথা গুলো বলেই লোকটা ফোন কেটে হাসতে শুরু করলো। ভয়ংকর এক হাসি। যেনো ওই হাসি তছনছ করে দেবে আরমানের জীবন।
এদিকে মায়া নিজেকে গুছিয়ে ট্রায়াল রুম থেকে বেরোতে যাবে তখনি দেখলো একটা টুলের উপর চিরকুট রাখা। মায়া সেটা হাতে তুলে নিয়ে ভাঁজ খুলল। সেখানে লেখা আছে, “ওই ছোট্ট মাথায় এতো চাপ নেওয়ার দরকার নেই। একটা ছোট্ট উপহার দিয়ে আবদ্ধ করলাম আমার ভালোবাসায়। এটা খোলার চেষ্টা করো না, তাতে লাভ নেই। কেননা, এটা খোলার চাবি আমারই কাছে, আর তোমার—আমার থেকে পালানোর কোনো পথ নেই।”
আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩৪
বেরিয়ে এসেই অবাক হলো ও। আবারো সবকিছু আগের মতোই আছে। কর্মচারী গুলো নিজের কাজে ব্যাস্ত। সামিরা দের বাড়ির সবাই যে যার মতো সপিং করতে ব্যস্ত। কিন্তু কিছুক্ষন আগেই কেউ ছিল না এই ফ্লোরে। অন্ধকার আর নিস্তব্ধতায় ঘেরা ছিল চার পাশ। মায়া দেখলো, বড়ো বড়ো কাঁচের জানালা গুলো থেকে এখন পর্দা সরানো।
মায়া বুঝলো, ওর সাথে যেটা হলো সেটা পুরোপুরি প্ল্যান করে সাজানো হয়েছিল। কিন্তু কে করলো এমনটা? কি লাভ পেলো মায়াকে একটা এতো দামি জিনিস এই ভাবে দিয়ে।
