আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৪৩
সালমা খাতুন
কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। মায়ার চিকিৎসা শুরু হয়েছে পুরোদমে, অন্যদিকে আরমানও চিকিৎসাধীন, তবে ভিন্নতর যন্ত্রণায়। মায়াকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিভিন্ন টেস্টের জন্য, আরমানও গিয়েছিল সঙ্গে—চুপচাপ, নিঃশব্দে, কিছু পা দূরে দাঁড়িয়ে। এখন আরমান মায়াকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করে না। সবসময় নিরব পাহারায় থাকে, কিন্তু দূর থেকে, কারণ মায়া তাকে দেখে মাঝেমধ্যে অজানা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।
আর এই অকারণ ভয়, এই চোখের ভাষাহীন আতঙ্ক, যেন আরমানের সমস্ত হৃদয় ছিঁড়ে ফেলে। নিজেকে ওর কাছে অপরাধীর মতো মনে হয়—একটি পরাজিত সৈনিক, যে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকেই নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর সেই হারানোর তালিকায় যোগ হয়েছে আরও একটি ক্ষত—নিজের প্রথম সন্তানকে হারানোর মর্মান্তিক যন্ত্রণা, যা একা একাই বহন করে যাচ্ছে সে, নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে। মায়া তো জানেই না সে আর মা হতে চলেছিল…
মায়া যেন এখন এক অবুঝ শিশুর রূপ নিয়েছে। কোনো কথা মনে থাকে না তার, পরিচিত মুখগুলোও যেন অচেনা ধোঁয়াশায় ঢেকে যায় হঠাৎ করে। আজ যা ঘটছে, কাল সকালেই তা মুছে যায় তার স্মৃতি থেকে। আচরণেও এসেছে ভয়াবহ পরিবর্তন—হঠাৎ রেগে যাওয়া, অকারণে জেদ করা, নিজের আবেগ সামলাতে না পারা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ডাক্তার ক্যামেলিয়া ডিসুজা সমস্ত রিপোর্ট দেখে শান্তভাবে জানিয়েছেন—ভয়ের কিছু নেই। মস্তিষ্কে এক ধরনের চাপ ও ব্যথা থেকে এই অস্বাভাবিক আচরণ হচ্ছে, কিন্তু ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে মায়া নতুন স্মৃতি রাখতে পারবে, পুরনো কিছুই আর মনে পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ওর মধ্যে এখন যে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, তা স্বাভাবিক, সাময়িক। ঠিক মতো মিডিসিন নিলে, সময়ের সাথে সাথে মাথার ব্যথাও কমে যাবে।
এই সামান্য আশ্বাসে আরমান যেন একটু প্রশান্তি খোঁজে, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে জমে থাকে এক বিষাদ—মায়া তাকে ভুলে গেছে। তার মায়াবতী, যে একদিন নিরবে, নিঃশব্দে, গভীর ভালোবেসেছিল আরমানকে, আজ আর কিছুই মনে রাখে না। বিয়ে, স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক, সব যেন ভেসে গেছে। আরমান জানে, মায়া কখনোই আর সেগুলো মনে করতে পারবে না।
ডাক্তার একথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন—মায়াকে কোনোভাবেই পুরনো কথা মনে করাতে চেষ্টা করা যাবে না। এতে ক্ষতি হবে ওর মানসিক অবস্থার। এখন মায়ার মতো করে, ওর ইচ্ছের মতো করেই চলতে দিতে হবে। সে এখন যতই রাগ করুক, যত জেদই করুক, তা মেনে নিতে হবে শান্তভাবে। কোনো ধরনের বিরূপ আচরণ মস্তিষ্কে আরও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। এখন মায়াকে সত্যিই একটি শিশুর মতো করে যত্ন নিতে হবে।
আরমান তাই পিছু হটেছে। মায়ার সামনে আর যায় না। শুধু দূর থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকে। ছেড়ে দিয়েছে তাকে তার মতো, কিন্তু ভালবাসাটা ছাড়তে পারেনি। চোখের আড়ালে হলেও, আরমান নজর রাখে মায়ার—তাকে তো কোথাও ছেড়ে যাওয়া যায় না…মায়া ঘুমিয়ে পড়লে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে ওর মাথার কাছে—পলকহীন চোখে চেয়ে থাকে মায়ার স্নিগ্ধ সরল মুখটার দিকে…
মায়া প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে বসে আছে খাটের উপর। কিছুই ভালো লাগছে না। সব সময় কেউ না কেউ ওর সাথে থাকে, গল্প করে ওরা, গেমও খেলে। কি যেনো নাম ওদের, যাহ আবার ভুলে গেছে। আর এই জন্যই প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে নিজের উপরেই।
মায়া বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে এগিয়ে গেলো ব্যালকনির দিকে। নজর পড়লো সুন্দর সুন্দর বিভিন্ন গাছ পালা দিয়ে ঘেরা বাগান টার উপর, আর বাগান থাকা ফুল ঘেরা দোলনা টার উপর। ইচ্ছে করলো এক ছুটে ওখানে চলে যেতে, কিন্তু ও নিরুপায়। ঘরের দরজা বন্ধ করা আর ও তো জানেনই না ওখানে কোন দিকে দিয়ে যাবে। হ্যাঁ যাওয়া যেত, যদি এই ব্যালকনিতে রেলিং দিয়ে ঘেরা না থাকতো, তাহলে এখান দিয়ে এক লাফ দিয়ে নিচে পৌঁছে যেতে ও। কিন্তু বোকা মায়া কি আর বোঝে? যদি ও এখান থেকে লাফ দেয় তাহলে ওর হাত পা গুলো আর আস্ত থাকবে না।
এখন ওর এই রেলিং গুলোর উপড়েও প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে। ইচ্ছে করছে ভেঙে ফেলতে। অবুঝ মায়া হাত দিয়ে রেলিং গুলোকে টানাটানি শুরু করলো, কিন্তু কিছুতেই ছাড়ছে না এগুলো। রাগে দুঃখে, হাত মুঠো করে জোরে ঘুষি মারলো ও রেলিং এর উপর আর সাথে সাথে প্রচন্ড ব্যাথা পেলো ও। চামড়া ছিলে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। ব্যাথায় চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করলো।
তখনো শোনা গেলো সামিরার বিচলিত গলার আওয়াজ, “একি ভাবী মনি নিজেকে ব্যাথা দিচ্ছো কেনো? দেখি দেখি হাত টা দেখি।”
বলেই সামিরা ছুটে এসে মায়ার হাতটা টেনে নিয়ে দেখতে লাগলো।
সামিরা— “অনেক টা কেটে গেছে তো। ভাইয়া দেখলে আমাই আস্ত রাখবে না।”
মায়া কান্না ভুলে তাকালো সামিরার দিকে। বোকা বোকা গলায় প্রশ্ন করলো, “কোন ভাইয়া? আর কিসের ভাবী মনি? তুমি আমাকে ভাবী মনি বলে ডাকো কেনো? আর ভাবী মনি কাকে বলে?”
মায়ার এতোগুলো প্রশ্নে সামিরা ভেবাচেকা খেয়ে গেলো। কোনটার কি উত্তর দেবে বুঝতে পারলো না। এদিকে ডক্টর মানা করেছে, আগের কোনো কিছু মায়াকে জানানো যাবে না। তাহলে এখন কি উত্তর দেবে ও।
সামিরা বোকা বোকা হেসে বলল, “কোন ভাইয়া বলতে আমার আমার বড়ো ভাইয়া। আর ভাবী মনি ডাকি কারন তুমি আমার ভাবী মনি হও। আর ভাবী মনি ভাইয়ার বউকে বলে।”
মায়া গভীর ভাবনায় ডুবে গেলো যেনো, “ভাইয়ার বউ! বউ কাকে বলে?”
সামিরা— “বিয়ে হলে মেয়েরা বউ হয়ে যায়।”
মায়া— “বিয়ে! কিন্তু সেটা আবার কি?”
সামিরা— “উফফ! ভাবী মনি তুমি কত প্রশ্ন করো। তোমার প্রশ্নে শেষই হয়না। অনেক হয়েছে প্রশ্ন উত্তর এখন চলো হাতে ওষুধ লাগাতে হবে, তোমার খাওয়ার টাইম হয়ে গেছে খেতে, এরপর মেডিসিনও খেতে হবে। আবার নিয়ে এসেছি।”
কথা গুলো বলেই সামিরা মায়াকে টানতে টানতে ব্যালকনি থেকে রুমে নিয়ে আসলো। মায়া যেতে যেতেই বিরক্ত গলায় বলল, “কিন্তু আমি তো তোমার বলা একটা কথাও বুঝতে পারলাম না।”
সামিরা বলল, “ওই কথা গুলো পরে বুঝবে এখন খাবে চলো।”
মায়া বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল, “ কিন্তু আমার খাবার আর ওই তেঁতো মেডিসিন গুলো খেতে একদম ভালো লাগে না।”
সামিরা— “ভালো লাগে না বললে হবে না, তোমার শরীর এখন ভীষণ উইক। আর এতো পাওয়ারের মেডিসিন খাবার না খেলে সহ্য করবে কিভাবে?”
মায়া— “মেডিসিন খাওয়ার দরকার নেই তাহলে সহ্য করতেও হবে না, আর না তো খাবার খাওয়ার দরকার পড়বে।”
“এগুলো কোনো কথা হলো আম্মু? তুমি এখন অসুস্থ, খাবার বা মেডিসিন কোনোটাই মিস দেওয়া যাবে না এখন।”
মিসেস সাবিনা বেগম কথা গুলো বলতে বলতে রুমে প্রবেশ করলেন। মায়া তাকালো উনার দিকে। এরপর সামিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো, “ওটা আম্মু তাই না? আমি না বারবার সবকিছু ভুলে যাই।”
সামিরা অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে সাই জানালো। মিসেস সাবিনা বেগম ওদের কাছে এগিয়ে এসে বললেন, “সামিরা কই আমার আম্মুর খাবার টা? দাও দেখি, আমি নিজে হাতে আমার আম্মু টাকে খাইয়ে দেবো।”
সামিরা— “ওই তো মম, টেবিলে রাখা আছে খাবার টা। আমি একটু আগেই নিয়ে আসলাম। আর দেখো ভাবী মনির হাতটাও কেটে গেছে, তুমি খাইয়ে দাও আর আমি হাতে মেডিসিন লাগিয়ে দিই।”
মিসেস সাবিনা বেগম আতঙ্কিত গলায় বললেন, “সেকি আম্মু? হাত কিভাবে কাটলো?”
সামিরা অসহায় গলায় বলল, “ভাবী মনি আবার নিজেকে আঘাত করছিল ওই ব্যালকনির রেলিং এ।”
মিসেস সাবিনা বেগমও অসহায় চোখে তাকালো, “আবার?? এমন কেনো করছিলে আম্মু?”
মায়া মাথা নিচু করে মিনমিন করে, বোকা বোকা গলায় বলল, “আমি ওইখান যেতে চাই, কিন্তু আমি জানি না তো, কোনদিক দিয়ে যাবো। তাই ওগুলো খোলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারলামই না। খুলতে পারলে লাফ দিয়ে চলে যেতাম।”
মায়ার এমন কথায় সামিরা, সাবিনা বেগম সহ বাইরে দরজার কাছে পর্দা আড়ালে থাকা আর এক ব্যাক্তি আঁতকে উঠলো। এই মেয়ের ধারণা আছে ও কি বলছে? দু তলা উপর থেকে লাফ দিয়ে বাগানে যাবে, এটা কোনো কথা? তাহলে এই মেয়েকে কি ওরা আর জ্যান্ত অবস্থায় ফিরে পাবে? ভাগ্যিস ব্যালকনিতে রেলিং দেওয়া ছিল, না হলে নিশ্চিত এই মেয়ে আজ কোনো না কোনো দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ছাড়তো।
মিসেস সাবিনা বেগম বললেন, “তুমি বাগানে যেতে চাও সেটা বললেই তো নিয়ে যাবো আমরা। এর জন্য বারান্দার রেলিং ভেঙে লাফ দিয়ে যেতে হবে? খবরদার আর কোনো দিন এমন ভাবনা মাথায় এনো না আম্মু, তুমি যদি অতো দুর থেকে লাফ দাও তাহলে তো হাতে পায়ে ব্যাথা পাবে তো।”
মায়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “কিন্তু আমার যে ওখানে যেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে।”
সাবিনা বেগম— “আচ্ছা চলো আগে খেয়ে নাও তারপর নিয়ে যাবো তোমায়।”
মায়া— “খেতেই হব?”
মিসেস সাবিনা বেগম— “হুম খেতেই হবে। কোনো বাহানা নয় চলো।”
বলেই সাবিনা বেগম মায়াকে সোফায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিলো। এরপর খাওয়াতে শুরু করলো। আর একদিক দিয়ে সামিরা মায়ার হাতে মিডিসিন লাগিয়ে দিয়ে ব্যান্ডেজ করতে লাগলো।
মায়া ধীরে ধীরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুই লোকমা মুখে দিলো। এরপর আর খেতে চাইলো না। মিসেস সাবিনা বেগম অনেক জোড় করার পরেও খাওয়াতে পারলো না। এদিকে মায়া এমনিতেই কম খাই, কিন্তু ওর মেডিসিন গুলো অনেক হাই পাওয়ারের। ঠিক মতো না খেলে হবেই না।
মিসেস সাবিনা অসহায় গলায় বললেন, “এমন করলে হবে আম্মু? এতো অল খেলে তুমি তোমার হাই পাওয়ারের মেডিসিন গুলো সহ্য কিভাবে করবে? তখন শরীর টা আরো খারাপ করবে।”
কিন্তু না মায়া এখন আর কারোর কোনো কথা শুনতে রাজি নয়। ও আর খাবে না মানে খাবে না। এক জেদ ধরে মুখটা দুই হাত দিয়ে ধরে বসে রইল। মিসেস সাবিনা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অসহায় চোখে তাকালো সামিরার দিকে। সামিরাও ওর মমের দিকে একই ভাবে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনি শোনা গেলো এক গম্ভীর গলার আওয়াজ। আর সেই আওয়াজে কেঁপে উঠলো মায়া।
“কি হয়েছে মম?”
আরমান এতোক্ষণ দরজার কাছে পর্দার আড়ালে থেকে ভেতরের পুরো দৃশ্যটাই দেখছিলো। মায়াকে খেতে না দেখে ও নিজের হুইল চেয়ারের চাকা এক হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো।
সামিরা অসহায় গালয় বলল— “ভাইয়া দেখো না, ভাবী মনি কিছুতেই খেতে চাইছে না।”
সামিরার কথা শুনে মায়ার মাথায় প্রথমেই যেটা এলো, ভাইয়ার বউকে ভাবী মনি বলে। আর সামিরা এই গম্ভীর ভয়ংকর মানুষটাকে ভাইয়া বলছে। তার মানে এটাই কি সেই ভাইয়া? ও এই লোকটার বউ?
মায়ার ভীষণ ভাবে ইচ্ছা হলো মনে থাকা প্রশ্ন গুলো জিজ্ঞাসা করতে। কিন্তু এই ভয়ংকর লোকটার সামনে ওর গলার আওয়াজই বের হয় না। কেনো জানি দেখলেই প্রচন্ড ভয় লাগে এই লোকটাকে। মায়া ইতিমধ্যেই নিজেকে সোফার এক কোনে গুটিয়ে নিয়েছে। যা আরমানের দৃষ্টি এড়ায়নি
শোনা গেল আরমানের গম্ভীর গলার আওয়াজ, “তোমরা খাবার টা এখানে রেখে দিয়ে চলে যাও। আমি দেখছি।”
মায়া যেনো এবার আঁতকে উঠলো আরমানের কথাটা শুনে। ও ভাবলো আম্মু হাতেই খেয়ে নেবেন পুরো খাবার টা। কিন্তু ও মুখ দিয়ে আর একটা আওয়াজও বের করতে পারলো না।
মিসেস সাবিনা বেগম, “কিন্তু আব্বু…”
আরমান— “কোনো কিন্তু নয় মম। বললাম তো তোমরা যাও আমি দেখছি।”
মিসেস সাবিনা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, “আব্বু তুই তো জানিস ডক্টর কি বলেছে। মায়ার উপর বেশি প্রেশার দিস না, এমনিতেই মেয়েটা তোকে দেখলে ভয় পাই।”
আরমান ছোটো করে উত্তর দিলো, “হুম।”
মিসেস সাবিনা বেগম চলে যেতে নিলেই, নিজের শাড়ির আঁচলে টান অনুভব করলো। পিছনে ফিরে দেখলেন মায়া তার শাড়ির আঁচলের এক অংশ দুই হাতে মুঠো করে ধরে আছে।
সাবিনা বেগম মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আগেই আমি খেয়ে নিতে বললাম, শুনলে না আমার কথা। এখন আটকাচ্ছো কেনো আমায়? আঁচল ছাড়ো, যেতে দাও।”
কেনো জানি মায়ার প্রচন্ড অভিমান হলো মিসেস সাবিনা বেগম এর উপর। চোখ ছলছল করে উঠলো ওর, অভিমান আঁচল ছেড়ে দিলো। সবার দৃষ্টি এড়ালো না মায়ার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ার দৃশ্যটা। সাবিনা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “কাঁদছো কেনো আম্মু? আরমানকে ভয় পাচ্ছো? ওকে আমি বলে দিয়েছি, তোমায় একটুও বকবে যেহেতু না। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।”
মায়া একটাও কথা বলল না, শুধু চুপচাপ চোখের পানি ফেলতে লাগলো। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মায়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে রুম দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। পিছু সামিরাও গেলো।
উনারও যে কিছু করার নেই। এই ভাবে আর কতদিন চলবে? উনার ছেলেটাও যে কষ্ট পাচ্ছে মায়ার এমন অবহেলায়। মায়কেও তো এবার ধীরে ধীরে আরমানের সাথে সহজ হয়ে উঠতে হবে। নতুন স্মৃতি তৈরি করতে হবে আরমানের সাথে। তবে এই স্মৃতি গুলো হবে মিষ্টি, মধুর।
এগুলো ভেবেই উনি মায়ার এমন করুন ভাবে তাকানো কেও ইগনোর করে বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে। উনি খুব ভালো ভাবে বুঝে গেছেন, এই মায়াই হচ্ছে উনার ছেলের ভালো থাকার কারণ। তাই আস্তে আস্তে যেভাবেই হোক ওদের দুজনকে এক করতেই হবে।
আয়ানের রুমে….
আয়ান ওর রুমের ব্যালকনিতে বসে আছে। সামনে ল্যাপটপ চালু রাখা, হয়তো কোনো কাজ করছিল। হাতে ধরা থাকা সিগারেট টা একটু একটু করে পুড়ে শেষ হচ্ছে, কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই ওর। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, দূরে কোথাও।
হঠাৎ একটা মেয়েলি আওয়াজে ধ্যান ভাঙলো আয়ানের।
“সিগারেট এর নেশা কবে থেকে ধরলে আয়ান?”
আয়ান তাকালো সেই আওয়াজ অনুসরণ করে, দেখলো মাইশা দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক ওর পাশেই।
আয়ান তাকালো একবার সিগারেটার দিকে। পুড়ে যাওয়া অংশের ছাই টুকু অ্যাশট্রেতে ফেলে দিলো। তারপর চেয়ারে শরীর টা এলিয়ে দিয়ে সিগারেট টা মুখে নিয়ে একটা লম্বা টান দিলো। ধোঁয়া গুলো ছেড়ে দিলো, ঠিক মাইশার মুখ বরাবর। সেই ধোঁয়া উড়ে গিয়ে মাইশার মুখে লাগতেই কেশে উঠলো ও।
আয়ান গম্ভীর গলায় বলল, “সেটা তোমার না জানলেও চলবে। কিন্তু কারোর রুমে প্রবেশ করলে আগে নক করতে হয় জানো না বুঝি?”
মাইশা— “হুম জানি। তবে, ওই নিয়মটা অন্য কারোর রুমে প্রবেশ করতে প্রযোজ্য। আমার জানামতে একজন ওয়াইফকে তার হাসবেন্ডের রুমে প্রবেশ করতে কোনো অনুমতির দরকার পড়ে না।”
আয়ান হাসলো, তাচ্ছিল্যের হাসি, “বাহ! হাসব্যান্ড? ওয়াইফ? ইমপ্রেসিভ! জানতাম খুব তাড়াতাড়ি তোমার খেলা ঘুরে যাবে, তবে এতো তাড়াতাড়ি সেটা বুঝতে পারিনি। যখন দেখলে আরমানকে আর কোনো ভাবেই পাওয়া সম্ভব নয় তখন ঠিক নিজের খেলা ঘুরিয়ে নিলে তাই না?”
মাইশা অসহায় গলায় বলল, “হুম জানি আমি ভুল করেছি, এই কথা গুলো আমাকে শুনতেই হবে। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি, এখনো তোমাকেই ভালোবাসি আমি। আল্লাহর কাছে এখন আমি শুকরিয়া জানাই, যে সেদিন তোমার সাথে আমার বিয়েটা হয়েছিল।”
আয়ান— “এখনো ভালোবাসো আমাকে? তুমি বলবে আর আমি বিশ্বাস করে নেবো? তুমি তোমার ভুল বুঝতে পেরেছো? বাহ? খুব সুন্দর নাটক শুরু করেছো তুমি। তোমার এই নাটকে একশোর মধ্যে একশো দেওয়াই যাই। তবে তোমার এই নাটকে এই আয়ান শাহরিয়ার আর গলবে না। খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্স দিয়ে দেবো আমি তোমায়। সেই দিনের সেই রেজিস্ট্রি ম্যারেজ টা ছিল তোমাকে ছোট্ট করে একটা শাস্তি দেওয়ার জন্য। ভেবেছিলাম তোমাকে নিজের কাছে রেখে আরো কঠিন কঠিন শাস্তি দেবো, বোঝাবো একজন মানুষের হৃদয়ে আঘাত দেওয়ার মূল্য। কিন্তু এখন আর এসবের কোনো ইচ্ছে নেই। খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি দিয়ে দেবো তোমায়। খুব তাড়াতাড়ি।”
মাইশার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো টপটপ করে, সোজা গিয়ে ও আয়ানের পায়ের কাছে বসে পড়লো।
“প্লিজ আয়ান, প্লিজ এমন টা করো না। তাহলে যে আমি শেষ হয়ে যাবে। বিশ্বাস করো আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি। হ্যাঁ আমি জানি আমি ভুল করেছিলাম। আমি আমার ভুল গুলো বুঝতে পেরেছি। সব, সবকিছু আমি আমার আম্মুর কথায় করেছিলাম। আম্মু আমায় অতিরিক্ত লোভ দেখিয়ে ছিল, আমার ভুল, আমিও তাতে সাই জানিয়ে ছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো আরমানকে আমি পেতে চেয়েছি লোভে পড়েই। কিন্তু মন থেকে ভালো তোমাকেই বাসি। আমি আমার ভুল গুলো বুঝতে পেরেছি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
কথা গুলো বলতে বলতেই মাইশা কন্নায় ভেঙে পড়লো। আয়ান প্রচন্ড বিরক্ত হলো। মাইশা আয়ানের দুই পা ধরে আছে, আয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বিশ্বাস করো মাইশা তোমার এই কুমিরের কান্না আর নাটক একদম সহ্য হচ্ছে না আমার। বিরক্ত লাগছে।”
কথা গুলো বলেই আয়ান ওর পা ঝাড়া দিয়ে মাইশাকে ফেলে দিলো। মাইশার মাথা গিয়ে পড়লো পাশেই থাকা ছোটো টেবিল টার উপড়। কপালটা কিছুটা ফুলে গিয়ে কেটে গেলো। কিন্তু আয়ানের আর একবারও ফিরেও তাকালো না মাইশার দিকে। সোজা বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
আর মাইশা অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই দিকে। চোখে অপরাধ বোধের অশ্রু।
আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৪২
অন্যদিকে অজানা কেউ….
পুরো রুমে এলোমেলো। চারিদিকে কাঁচের টুকরো পড়ে। পুরো রুমের সমস্ত জিনিস একের পর এক ভেঙে চলেছে। চিৎকার করছে রাগে।
“নাহ!! নাহ!! নাহ!! এটা কিছুতেই হতে পারে না। হেরে যাচ্ছি আমি। হেরে যাচ্ছি আমি। এতোকিছুর পরও আরমান আর মায়া ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে। এটা কিছুতেই হতে পারে না। কিছুতেই আরমান সুখে থাকতে পারে না। কিছুতেই না। আমি থাকতে দেবো না। ওদেরকে যেভাবেই হোক আলাদা করতেই হবে। করতেই হবে। ওই মায়াকে, আরমানের মায়াবতীকে কেড়ে নেবোআমি, হ্যাঁ। ওই মায়াবতীকে কেড়ে নেবো আমি। ওই মায়াবতী শুধু আমার হবে, শুধু আমার হবে….”
