আমার বোবাফুল পর্ব ৩৮
তৃপ্তি এহসান নাওরা
সুখের মাথায় ব্যান্ডেজ জড়ানো।জখম শুকিয়ে এসেছিল প্রায়।বেড থেকে পড়ে যাওয়ার ফলে তাতে এখন আবার র-ক্ত ভেসে উঠেছে। অস্বাভাবিক কম্পিত হচ্ছে শরীর। রুবাইয়্যাত মেয়েকে বুকে ভেতরে আগলে রাখে। গালে ঠোঁট দাবিয়ে মমতায় চুমু আঁকে। ডক্টর এখনো এসে পৌঁছায়নি।সাইমা আর আইজা ছুটে গেছে।দুটো নার্স এবং ডক্টর আঁচল এলো কিছুক্ষণ পর।সুখ তখন আম্মুর বুক থেকে ক্ষীণ প্রদীপের মতো পিটপিট চোখ মেলে। নিঃশ্বাসের শব্দ দ্বারের বাহিরে পর্যন্ত ভেসে বেড়াচ্ছে। শ্বাসকষ্ট রুগীর ন্যায় অবস্থা। সুখের অবশ-প্রায় ডান হাত স্বল্প শক্তিতে খামচে ধরে রুবাইয়্যাতের পিঠের শাড়ি।নার্স দুজন অবিলম্বে ধরাধরি করে বেডে শুইয়ে দেয় তাকে।আরো দুজন ডঃ এলো। প্রত্যেকে ছুটোছুটি লাগিয়ে দেয়। কেবিন থেকে স্ট্রেচারে করে সুখকে কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হয়।পুণরায় জ্ঞান হারিয়েছে সে।
রুবাইয়্যাত একহাতে মুখ চেপে স্তব্ধ হয়ে চোখের পানি ছাড়ে। তারই ভুল।যদি সুখকে রেখে কেবিন ছেড়ে না বের হতো –নিশ্চয়ই তার মেয়েটা পুণরায় আঘাত পেতো না।তবে আনন্দও হচ্ছে।সুখ চোখ মেলে চেয়েছে।নিভু নিভু চোখে তাকে দেখেছে।তামিজ শিকদার হসপিটালের নিচেই ছিলেন।তিনিও মেয়ের সংবাদ পেয়ে চলে এসেছেন।
ও.টি’র সামনে তামিজ শিকদার,আইজা আছেন।আযাদ সাহেব গিয়েছেন রংপুর।তামিজ শিকদারের অবর্তমানে তিনিই সেখানের অফিস সামলাবেন।সাইমা ও.টির সামনে থেকে ধীর পায়ে কেবিনে এলেন। রুবাইয়্যাত তখনো থম মেরে ফ্লোরে বসে আছে। এখান থেকেই তার মেয়েকে তার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ডক্টররা কোথাও নিয়ে গেছে সুখকে।কী করা উচিত,কী অনুচিত বুঝে কুল পাচ্ছে না রুবাইয়্যাত।চোখের তারায় কেবল উঠে আসছে সুখ চোখ মেলেছিল নিভু দৃষ্টিতে।মাতৃ হৃদয় ধ্বক ধ্বক করে উঠে তার। মনে হয়,কতো বছর পর মেয়েটি চোখ খুলে দেখলো তাকে।এমন সুখানুভূতি সেদিনও হয়েছিল.. যেদিন ছোট্ট সুখকে কোলে তুলে নিয়েছিল রুবাইয়্যাত। সেদিনও স্বচ্ছ নিষ্পাপ আঁখি পল্লবে সুখ ফ্যালফ্যাল করে তাকে চোখে চোখ রেখে ভুবন ভোলানো হাসি হেসেছিল।
কাঁধে হাতের ছোঁয়া পেতেই চকিতে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন ভদ্রমহিলা।সাইমা দাঁড়িয়ে আছে শুকনো মুখে।চোখের ইশারায় হয়তো আশ্বাস দিচ্ছে –সুখের কিচ্ছু হবে না। রুবাইয়্যাত আড়চোখে একবার কাঁধে রাখা সাইমার হাতের দিকে চাইলো। ইতোপূর্বে এতোটা অধিকার কাটিয়ে তাকে স্পর্শ করার সাহস দেখায়নি সে।তবে আজ কেনো দেখালো?
সাইমা হাত গুটিয়ে মাথা নিচু করে নেয় হঠাৎ। সেদিন ঝোঁকের বশে চরম সত্যিগুলো বলার পর প্রতি মূহুর্তে অনুশোচনা হচ্ছে –হয়তো সে ভুল করে ফেলেছে। এতো গুলো বছর গোপনে মনের ভেতরে পুষে রাখা সত্যিটা এভাবে বলে দেওয়া উচিৎ হয়নি।
রুবাইয়্যাত চাপা শ্বাস ছেড়ে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ায়।
ডক্টর মেহরাবের কাজ ছিল অন্য এক হসপিটালে।এখান থেকে তিন কি.মি দূরে । আঁচলের তাগাদা পেয়ে পুণরায় এখানে আসে। যেহেতু শুরু থেকে সুখের ট্রিটমেন্ট তিনিই করেছেন।সুখ তারই পেশেন্ট। আঁচল কেবলমাত্র মেহরাবের সহযোগী।
মেহরাব নিশ্চিত করে সুখ কোমা ছেড়ে উঠেছে। ধারণা করা যায়, মস্তিষ্ক সক্রিয় হওয়ার পরপরই –সজ্ঞানে থাকতে তার সাথে ঘটে যাওয়া শেষ ঘটনা স্মৃতিতে এসেছিল।অতিরিক্ত ভয় কিংবা চাপ থেকে এতো কিছু হয়ে গেলো।এই যেমন –ছটফট করতে করতে বেড থেকে পড়ে যাওয়া, মাথার আঘাতে পুণরায় রক্ত/ক্ষরণ, চোখ মেলে ফের জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।
ঘন্টা কয়েকের মাঝে সুখের জ্ঞান ফিরবে বলা হয়েছে।ঘড়ির কাঁটা যেনো আজ থমকে গেছে। রুবাইয়্যাত উশখুশ মনে উদগ্রীব মুখে ফোন পাশে রেখে হঠাৎ কিছু মনে পড়ার মতো সাইমার দিকে চাইলো।ওই যে.. খানিক দূরে গুটিয়ে বসে থাকা মহিলাটিও তার মেয়ের মা –ভাবতে গেলেই একটা চাপা হিংসে হানা দেয় মানসিকতায়। রুবাইয়্যাত খুব করে মনকে বুঝাতে চায় –ওই মহিলাটি সুখকে বিধাতার কাছ থেকে পৃথিবীতে এনেছিল বলেই সুখ আজ তার বুকে,তার কোলে। মস্তিষ্ক এমন বললেও কিন্তু মন এসব যুক্তি শুনতে অপ্রস্তুত। সন্তানের ভাগ কাউকে দেয়া যায়?যদি সেই সন্তান হয় দুচোখের মণি,মায়ের অন্তপ্রাণ!!
যদিও সাইমা তেমনি আচরণ করছে, যেমনটা পূর্বে করে এসেছে। নিশ্চুপ মনিবের সেবা করছে, ফ্লাটে গিয়ে রান্না-বান্না করছে,সুখের প্রতি কোন অধিকার বোধও দেখাচ্ছে না।তবু রুবাইয়্যাতের মন আনচান আনচান করে, যেনো বুকের উপর শক্ত পাথর চেপে আছে। অযথা ভয় জেঁকে বসে–সুখকে যদি সত্যিটা বলে দেয়?যদি সুখ তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়?মা বলে ডাকতে অস্বীকার করে?
রুবাইয়্যাতের গা ঘেঁষে আছে নূরা।টমি’কে আদর করতে করতে বলে মুখ তুলে বলে,
“ আমার ফ্রেন্ড বলেছে সুখ খুব শীঘ্রই জেগে উঠবে।তুমি আর কেঁদো না কাম্মা।”
দুটো কেবিনের অন্য একটাই সুখকে শিফ্’ট করা হয়েছে খানিক আগে।জ্ঞান ফেরার আগ অবধি কারো প্রবেশ নিষেধ।ডক্টর ইতোমধ্যে দুবার চেক করে গেছে। মূলত,ঘুমের ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে তাকে।
সুখ চোখ খুলে দুপুর আড়াইটার দিকে। নিঃশ্বাসের শব্দ এবার স্বাভাবিক থাকলেও ভয়ার্ত চোখে গুটিসুটি মেরে থেকেছিল। ডক্টরের অনুমতি পেয়ে রুবাইয়্যাত কাছে যেতেই ঝাপ্টে ধরে বুকে মুখ লুকায় সুখ।হাতে স্যালাইন চলছিল, টান লেগে ব্যাথা পায়। অথচ সেই ব্যাথা তাকে ছুঁতে পারলো না আজ। আম্মুকে দুহাতে জাপটে রেখে ঠোঁট কামড়ে অঝোরে চোখের পানি ঝরিয়েছে। রুবাইয়্যাত কান্না দমিয়ে রাখে।মেয়েকে বুকের খাঁচায় ছোট্ট শিশুটিকে চুপিয়ে রাখার মতো আগলে রাখে,
“ এইতো আম্মু আছে।কোন ভয় নেই সোনা। কিচ্ছু হবে না।”
বর্ণ ঢাকায় নেই।সুখের জ্ঞান ফেরার কথা এখনো সে অবগত নয়।জানলে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতো কে জানে!শিকদার নিবাসে হৈ হৈ লেগেছে।সকলের ঠোঁটে উপচে পড়া খুশির ঝিলিক।এমনকি হানিফা বেগমেরও। সুখকে দেখতে ঢাকা যেতে বাহানা ধরেন বৃদ্ধা।তামিজ শিকদার মানা করে দিলেন।এই বয়সে শহরের এতো কোলাহল, জমজমাট হাঁক ডাক আম্মা নিতে পারবেন না।দেখা গেলো উল্টো নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি আশ্বস্ত করেন খুব দ্রুতই সুখকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন ।
তখন রাত। শহরজুড়ে ধূসর কালো আঁধারের হাতছানি।চার দেয়ালে আবদ্ধ কক্ষে ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে পায়ে পা তুলে কাউচে বসে আছে মিশ্মি।কোলের উপর ল্যাপটপ।নজর সেখানেই স্থির।হাত ঘড়িতে আরো একবার সময় দেখে ঠোঁটে বাঁকিয়ে বললো আপনমনে,
“ আর মাত্র দু ঘন্টা। এরপর…’ —ঠোঁট কামড়ে হেসে বিদ্রুপ স্বরে বলে,-“ টাইম ইজ আপ!”
খানিক পর ব্যালকনির দরজায় ঢোকা পড়ে আলতো শব্দে। হতচকিতে তাকালো মিশ্মি। দরজা ভেতর থেকেই অফ।বাহির থেকে কে টোকা দেবে?কেউ তো ছিল না সেখানে।
সে ভাবলো এটা তার মনের ভুল।পুণরায় টোকা পড়ে।আরো একবার.. আবার..!বুকে ফুঁ দিয়ে মিশ্মি উঠে গেলো। ব্যালকনির কাঁচের দরজাটি খুলতেই সে বিষ্ময়ে স্তব্ধ চেয়ে রয় অযাচিত কিছু দেখার মতো। অস্ফুট স্বরে বললো বোধহয়,
“ বর্ণ!”
বর্ণ ঠোঁট এলিয়ে হাসলো, কাঁধ বরাবর হাত উঁচিয়ে আঙ্গুল নেড়েচেড়ে বলে,
“ হাই!”
মিশ্মির নাকে টোকা দিয়ে পরপরই পাশ কাটিয়ে রুমে প্রবেশ করে। বেপোরোয়া চোখে আশেপাশে নজর ছিটায়।অবাকতার শীর্ষে পৌঁছে গেলো মিশ্মি। আনমনেই নাকে হাত উঠে যায়।বর্ণ স্বেচ্ছায় তাকে ছুঁয়েছে। কিন্তু.. উদ্দেশ্য ছাড়া বর্ণ নিজের ব্যক্তিত্ব খুইয়ে এমন কিছু এমনি এমনি করবে না। একথাটি সেই মিথ্যে বিয়ের দিন মিশ্মি বেশ ভালো মতোই উপলব্ধি করেছিল ।স্তম্ভিত ফিরতেই পিছু ফিরে আশ্চর্যান্বিত গলায় প্রশ্নঃ করলো থেমে থেমে,
“ ত্_তুমি! আমার.. রুমে.. কীভাবে?”
চট করে বর্ণ তার মুখোমুখি ঘুরে গেলো ঘাড় বাঁকিয়ে।ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে ঠোঁট ঘঁষে বললো বাঁকা হেসে,
“ ফাইব চড়ে উঠে এসেছি ইয়ার।অনলি ফর ইউ্যু!” —শেষোক্ত করার সময় দু হাতের তর্জনী মিশ্মির দিকে তাক করে।মেয়েটি থমথম খায় ভেতরে ভেতরে।তা অ-প্রকাশিত রেখে জানতে চাইলো মৃদু হেসে বিষ্ময় ভরা চোখে,
আমার বোবাফুল পর্ব ৩৭ (২)
“ বাট হোয়াই?”
“ নিজেই তো চ্যালেঞ্জ দিলে সাত দিনের ভেতরে যাতে তোমায় খুঁজে বার করি!পেরেছি না?”
মোমের শেষ আলোর মতো মিশ্মির হাসির ঝলকানি খানিক ম্লান হয়ে আসে।তবে, পুরোপুরি আদর ছড়ানো হাসি মিলিয়ে যায় না। বুকে দুহাত গুঁজে অল্পক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে থেকে ভনিতা ছাড়াই বলে উঠে,
“ নিজ থেকে যখন খুঁজে আমার কাছে, আমার বেডরুমেই এসে পড়েছো।দ্যাট মিন্স.. আমার শর্ত এক্স্যাপ্ট করতেও রাজি?”
