আমার বোবাফুল পর্ব ৩
তৃপ্তি এহসান নাওরা
কাঁধে পুরুষালী শক্তপোক্ত বাহুর ধাক্কাতে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে গিয়েও নিজেকে সংযত করলো সুখ।ব্যাগ চেপে ধরে পিটপিট চোখে চাইলো পিছু ঘুরে।এই নিয়ে তিন দিন হলো পুরুষটির আশেপাশে তো দূর;তার ছায়াও দেখায়নি। চুপচাপ কলেজ গেছে, খাবারটাও রুমে এনে খেয়েছে,নিজের রুমেই থাকার চেষ্টা করেছে পুরোটা সময়। বর্ণ’র ইচ্ছেকে স্বাগত জানিয়ে সেতো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলই।তবে এখন ইচ্ছে করে ধাক্কা দেয়ার কী মানে?বর্ণ সুখের দিকে তাকায়ওনি একবার।পূবের মতো হেঁটেই যাচ্ছিলো।
কাঁধে হাত বুলাতে বুলাতে চোখ কুঁচকে নেয় সুখ। ছিমছাম গড়নের হওয়ায় হাড্ডিতে লেগেছে খুব।রাগ হয় তার। ঘুষি মারার মতো পেছন থেকে হাত উঠাতেই আচমকা ঘুরে গেলো বর্ণ।থমথমে মুখে আড়চোখে একবার কাঁধ সম মুঠ পাকানো হাতের দিকে তাকিয়ে ফিরতি বর্ণের দিকে চাইলো।সাহসের বড্ড অভাব তার। ঘটনা দ্রুত ঘটে যাওয়ায় এখন কী করা উচিৎ বুঝে উঠতে পারে না। বর্ণ এগিয়ে আসে তার মুখোমুখি। ঠোঁট কামড়ে চোখ ছোট ছোট করে সুখকে আগাগোড়া পরখ করে বলে উঠে,
“ মারবি?মার!”
সন্তর্পণে গাল এগিয়ে দিলো বর্ণ। ঠোঁটে ধূর্ত হাসি। মঠোবদ্ধ হাত হঠাৎই শীতল হয়ে আসে সুখের। ঘন পল্লব আঁখিতে পুরুষটির পুরো মুখশ্রী বিচ্ছুরণ করে মেয়েটার কী হলো কে জানে? ইতিউতি না ভেবে আলগোছে পাঁচ আঙুলের থাবা বসিয়ে দেয় বর্ণের ডান গালে।
মূহুর্তেই হাসি মিলিয়ে বিষ্ময় ভিড় করে বর্ণ’র চোখে মুখে।চোখের দৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে উঠেছে অবিলম্বে।বোবা ফুল তাকে সত্যিই মারলো? রকস্টার দ্যা গ্রেড আসফিয়ান বর্ণ’কে চড় দিলো?
সুখ নিজেও হতভম্ব।ভীত সন্ত্রস্ত চোখে অপলক চেয়ে থাকতে থাকতে এক পা দু’পা পিছিয়ে সে দ্রুত পায়ে ছুটে নিজের রুমে ঢুকে দরজা লক করে দেয়।এই প্রথম বার দুঃসাহসিক কাজটা করে ফেলেছে সে।কলিজা এখনো টিপটিপ করছে।দ্বোর মেলে একবার উঁকি দিয়ে বর্ণ ভাইয়ের প্রতিক্রিয়া দেখে নেবে?যদি তেড়ে আসে?
“বোবাফুল!মারতে বললাম আর সাত পাঁচ না ভেবে মেরে দিলি? বাহ্ আজকাল সাহসের ওভার ডোজ পড়েছে দেখছি?একবার কনসার্ট থেকে ফিরি.. তোকে দেখে নেবো!”
গালে মৃদু হাত ঘষতে ঘষতে দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে বিড়বিড় করে বর্ণ। সত্যিই সাহস বেড়েছে মেয়েটার!
“ ভাইয়া.. তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? দ্রুত এসো!”
বর্ণ চট করে ফিরে তাকালো ।গিটার আর হেডফোন বাঁধে বাকি সাজ সজ্জা অনেকটা তার মতোই। পাশাপাশি দাঁড়ালে এক দেখায় যে কেউ বলে দেবে এটাই বর্ণ’র ছোট ভাই। লিটল বর্ণ।ভ্রু আড়াআড়ি করে তীর্যক চোখে ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো সে,
“ তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
“ তুমি যেখানে যাচ্ছো!”
গলার কাছের হুডি পিছনে ঠেলে ভাব নিয়েই প্রত্যুত্তর করলো অভ্র। চোখে দুরন্তপনার ছড়াছড়ি।বর্ণ দুধাপ এগিয়ে যাতেই সে একধাপ পিছিয়ে গেলো তড়িৎ।
“ তোমার সাথে নয়। বন্ধুদের সাথে যাচ্ছি ইয়ার..!
বর্ণ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে এগিয়ে চললো সামনে।সময় স্বল্প।যেতে যেতে মুখে মাস্ক পড়ে নিলো সে।ড্রয়িং রুমে এ্যাসিস্ট্যান্ট মাহির কথা বলছিলো হানিফা বেগমের সাথে। বর্ণ কে দেখেই উঠে দাঁড়ালো।
“ দাদুভাই এটা কী হলো?”
বর্ণ পিছু ঘাড় বাঁকিয়ে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টি ফেলে তাকায়। আবার কোথায় কী হলো?চোখের ইশারায় মাহিরকে সামনে আগাতে বলে হানিফা বেগমের দিকে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়ালো সে।মুখে শব্দ করলো না তবে কাঁধ দুলিয়ে “কী” জানতে চাইলো।
“ আমি এ বাড়ির মুরব্বি।একটা প্রোগ্রামে যাইতেছো আর আমারে বলে যাবা না?”
“ সারাদিন টিভির সামনে বসে থাকো। তাছাড়া অনলাইনে হুড়োহুড়ি পড়ছে কাল রাত সাড়ে আটটায় রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’র স্টেজ শো হবে।জানতে না দাদু?”
বর্ণর আগে অভ্র জবাবটা দিলো।এই দাদু সব জায়গায় একটু বেশি বেশিই করছে সম্প্রতি। স্বভাবটা আজকাল প্রচন্ড বিরক্তি দেয় তাকে। বৃদ্ধা খেক খেক করে উঠলেন,
“ তোরে কিছু কইছি আমি? আমার নাতিরেই জিগাইছি”
“ হ্ তোমার একটাই নাতি..আমরা ড্রেনের পানিতে ভাইসা আইছিলাম”
গলার সুর টেনে হানিফা বেগমের ভাষায় বলল অভ্র। বৃদ্ধা অসন্তোষ নিয়ে মুখ ঝামটা দেন।মুড়টাই খারাপ করে দিলো খচ্চরটা। বর্ণ কাছে এসে একহাতে জড়িয়ে ধরে হানিফা বেগমকে। মৃদু স্বরে বললো,
“ যাচ্ছি!দোয়া করে দাও!”
মনটা পুলকে উঠলো যেনো বৃদ্ধার।মাথার হাত রেখে গদগদ কন্ঠে বললো,
“ হ্যাঁ হ্যাঁ! সাবধানে যাইও…
বর্ণ চোখের ইশারায় আইজা,পরপর রুবাইয়্যাতের কাছে বিদায় নিয়ে কী মনে করে সিঁড়ির দিকে তাকালো। সুখ তড়িৎ আড়াল করে নেয় নিজেকে।এক মূহুর্ত ব্যয় না করে কক্ষে ফিরে আসে। এখানেই শেষ.. আর কখনো ব্যক্তি হোক বা সিংগার –আসফিয়ান বর্ণ’র দিকে একটু ভালোবাসার আশায় চাইবে না সে।কারণে অকারণে পিছু ঘুরবে না তার,নাই বা ভালোবাসি বলে সামনে দাঁড়াবে,সে আর হাতজোড় করে বলবে না “ প্লিজ বর্ণ ভাই.. আপনি বিয়েটা ভেঙ্গে দিন! আপনার পাশে অন্য কাউকে দেখলে আমার বড্ড হিংসে হয়”
স্থান –আর্ন্তজাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা!বড় বড় স্টেজ।রঙ বেরঙের ঝিকিমিকি আলো।চতুর্দিকে দর্শকের ছড়াছড়ি।ভিড়ের মাঝে একবার ধরে রাখা হাত ছেড়ে দিলে তাকে পুণরায় খুঁজে পাওয়ার চান্স কমই বটে। পিঁপড়ের ঝাঁঁকের মতো দেখতে লাগছে সবাইকে।এখানে মেয়েদের সংখ্যাই তুলনামূলক বেশি।তাদের স্বপ্ন পুরুষ রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’কে দেখবে যে আজ!তাহলে ছেলেরা কাকে দেখবে?আছে তো একজন।তাদের ঘুম উড়িয়ে দেওয়া –সানারা সাহ্’। এখানে আরো অনেক শিল্পীদের মিলনমেলা হবে আজ।
বর্ণ’র গাড়ি এসে থামতেই ঘিরে ধরা হলো চারপাশ থেকে।গগনও যেনো হৈ হৈ কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠলো মূহুর্তেই।গার্ড ডোর খুলে দিলেই বর্ণ বেরিয়ে এলো সহাস্যে।মাহির তার পিছু গিয়ে ঠাঁই নেয়।ফোন হাতে বর্ণকে ঘিরে ধরে কেউ কেউ। ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গি ভঙ্গিতে কয়েকজনের সাথে সেলফি তুলে চোখের চশমা আঙুলে ঠেলে দিয়ে ভেতর পথে গমন করলো সে। দর্শকের উম্মাদনা ,ফোনের ফ্লাশ, ক্যামেরা আর ক্লিক ক্লিক শব্দে পরিবেশ রমরমা।
পছন্দের কালো জামাটি গায়ে জড়িয়ে আয়নায় নিজেকে বেশ কতোক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো সুখ। সাদা ওড়নাটা কাঁধের একপাশে ফেলে দিয়ে চুলগুলো উপর করে ঝুটি করে বেঁধে নেয়। কপালের দুপাশে ছোট ছোট কিছু চুল ছেড়ে দিয়ে আরো একবার নিজেকে পরখ করে নিলো মেয়েটা।ঘন পাপড়ি ,মায়াময় দীঘল কালো আঁখি পল্লবে কতো অব্যক্ত কথার ফুলঝুরি; আফসোস,সেই ভাষা পড়ার ক্ষমতা সবার নেই। পাতলা সরু অধর যোগল,যার চিরচিরে মুচকি হাসিতে দু গালে টুল পড়ে।সে মিশ্মির মতো ওতো স্মার্ট নয় কিন্তু তার চেয়ে কোন অংশে কমও নয়। নিষ্পলক চোখে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখার ফাঁকে মন্ত্রমুগ্ধ হাসি টুকু সরে এলো ধীরে ধীরে।এই কয়দিনে যেই শব্দ গুচ্ছ মস্তিষ্ক তাড়া করে বেড়িয়েছিল,তা যেনো আবারো কানের কাছে এসে বাজতে শুরু করে। সুখ ঢোক গিলে গুটিসুটি মেরে ফের আরশিতে চোখ রাখে করুন দৃষ্টি মেলে। পরপরই চোখ খিচে নেয় হঠাৎ। বর্ণ যেনো কানের কাছে এসে চিৎকার করে বলছে, ‘তুই আশ্রীতা,তুই জন্ম পরিচয় হীন,তুই বোবা, আমাকে কেনো কাউকে ভালোবাসার অধিকার তোর নেই’!
আমার বোবাফুল পর্ব ২
অচিরেই চোখের কৌটায় অশ্রু হানা দেয় তার। কিন্তু সে অশ্রু দানা গড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিলো না,
ত্রস্ত উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে গেলো করিডোর পেরিয়ে নিচ তলায়।মাকে আবারো প্রশ্ন করবে।যদি সে রুবাইয়্যাত আর তামিজ শিকদারের কন্যা হয়ে থাকে তবে….
