Home আমির হাওলাদার আমির হাওলাদার পর্ব ৫

আমির হাওলাদার পর্ব ৫

আমির হাওলাদার পর্ব ৫
ইলমা বেহরোজ

অলন্দপুর জামে মসজিদ থেকে তখন এশার আজান ভেসে আসছে; আজ পবিত্র রমজানের প্রথম তারাবি। গ্রামের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষেরা মাথায় সাদা টুপি চড়িয়ে, হাতে লণ্ঠনের মিটিমিটি আলো নিয়ে ধীরপায়ে মসজিদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
অন্যদিকে মাদিনী নদীর ঘাটে নিঝুম, গা ছমছমে অন্ধকার। ঘাটে নোঙর করে আছে হাওলাদারদের বিশালাকার দুটি মালবাহী কার্গো জাহাজ। ‘দরিয়া কুসুম’ ও ‘দরিয়া সাম্পান’ নামধারী এই দানবীয় নৌযান দুটিতে সওয়ার হয়েছে একদল বাউল; সঙ্গে তাদের হারমোনিয়াম, ঢোল আর খমক। দীর্ঘ জলপথের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এদের আনা হয়েছে৷ তাছাড়া সারারাত উপরের পাটাতনে উচ্চৈঃস্বরে বাদ্যি আর ফুর্তি চললে দূর থেকে একে কোনো বিত্তবান ব্যবসায়ীর প্রমোদভ্রমণ বা জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আনন্দযাত্রা বলে ভ্রম সৃষ্টি হবে। কেউ সন্দেহ করবে না ভেতরে কী আছে।

আমিরের কথামতো রিদওয়ান নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েই পাতালঘর থেকে মেয়েগুলোকে বের করে আনল। তারপর জঙ্গলের পেছন দিয়ে দুটো ট্রলারে করে তাদের নির্দিষ্ট ঘাটে নিয়ে আসা হলো। এক প্রকার জোরপূর্বক ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো কার্গোর অন্ধকার খোল-এ।
খোলের গভীরে নির্মাণ করা হয়েছে এক গোপন কুঠুরি; বড় বড় পাম অয়েলের ড্রাম দিয়ে এমন নিপুণভাবে কৃত্রিম দেয়াল তোলা হয়েছে যে বাইরে থেকে ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় নেই সেখানে কোনো কুঠুরি বা মানুষের অস্তিত্ব থাকতে পারে। ড্রামগুলোর ফাঁকে সূক্ষ বায়ুছিদ্র রাখা হয়েছে।
আটককৃত সাতাশ জন কিশোরী ও তরুণীর বয়স ১৬ থেকে ২২-এর কোঠায়। এদের অধিকাংশকেই গার্মেন্টসে চাকরি কিংবা বিত্তবান পরিবারে গৃহকর্মের প্রলোভন দেখিয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো থেকে ফুসলিয়ে আনা হয়েছে।

কুঠুরির ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, ভ্যাপসা গরম আর কেরোসিনের উৎকট গন্ধ। প্রতিটি মেয়ের হাত পাটের রশি দিয়ে আলগা করে বাঁধা, মুখে গামছা গোঁজা। তাদের প্রাকৃতিক কাজের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র দুটো মাটির বড় চাড়ি, আর পেটপূজার জন্য পড়ে আছে কয়েক বালতি শুকনো চিড়া ও গুড়।
জাহাজ যখন ছাড়া হয় আমির তখন পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে নিবিষ্টমনে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে। তার পরনে দামী সিল্কের পাঞ্জাবি, শরীর থেকে বিচ্ছুরিত উগ্র আতরের সুবাসে চারপাশের বাতাস ম-ম করছে। কিছুক্ষণ আগেই সে মজিদ হাওলাদারের সাথে পাশের গ্রামের সাধারণ মানুষদের কাতারে দাঁড়িয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করে এসেছে। গ্রামবাসীদের অভাব-অভিযোগের ফিরিস্তি শুনেছে, আশ্বাস দিয়েছে দ্রুত সব দাবি পূরণের। পুরো হাওলাদার পরিবারই জনসমক্ষে ছদ্মবেশী সজ্জন হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পারঙ্গম। অলন্দপুরের সব গ্রামে গেলেও আমির সুকৌশলে আটপাড়া এড়িয়ে গেছে৷ পদ্মজা জানে তার স্বামী চট্টগ্রাম যাচ্ছে। যদি কোনোভাবে পূর্ণা চিঠিতে তার অলন্দপুর আগমনের খবর ফাঁস করে দেয়, তবে পদ্মজা সন্দেহ করবে৷ তার মিথ্যাচার প্রকাশ হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে সে ওদিকের ছায়াও মাড়ায়নি। যদিও আম্মা, রানি, পূর্ণা, প্রেমা আর প্রান্তকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল।

দুটি জাহাজে মোট মোতায়েন করা হয়েছে পনেরো জন বিশ্বস্ত ও দুর্ধর্ষ দেহরক্ষী। তাদের পরনে সাধারণ লুঙ্গি আর হাফ হাতা শার্ট থাকলেও, প্রত্যেকের কোমরে গোঁজা আছে রিভলভার এবং বস্তায় মোড়ানো আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।
সারেং(চালক) ঘরের পাশেই আমিরের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে বিশেষ কেবিন, যার মেঝেতে দামী জাজিম আর ধবধবে চাদর বিছানো। জাহাজ যখন কিশোরগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ জলসীমা অতিক্রম করছে, আমির তখন মাস্টার-কেবিনের ছাদসংলগ্ন খোলা অংশে আয়েশ করে শুয়ে আছে। পাঞ্জাবি বদলে সে এখন স্যান্ডো গেঞ্জি আর চেক লুঙ্গি পরিহিত। পিঠের নিচে একটি শীতলপাটি, তার তলায় পুরু জাজিম। মাথার নিচে ধবধবে সাদা নরম বালিশ। পাশেই একটা ছোট কাঠের টেবিলের ওপর রাখা পুরনো রেডিও। মাথার ওপর বিশাল উন্মুক্ত আকাশ; আমির একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থাকলেও মাঝে মাঝে আড়চোখে পাশের ‘দরিয়া সাম্পান’-এর দিকে নজর রাখছে। সেখানে তার অনুচরেরা বিড়ি ফুঁকছে আর রিদওয়ান খালি গায়ে পাটাতনের ওপর অস্থিরভাবে পায়চারি করছে।
আমির সজোরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ঐ শালা, খোলের খবর কী? মালগুলা জ্যান্ত আছে তো?’
ওপাশের জাহাজ থেকে রিদওয়ান হাতের ইশারায় জবাব দিল, ‘ঠিক আছে।’

হঠাৎ তার গা-ঘেঁষে কেউ একজন শুয়ে পড়ল। আমির আকাশের যে নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে তাকিয়ে ছিল, নবাগত ব্যক্তিটিও সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। আমির মাথা না ঘুরিয়েই অনুচ্চ স্বরে শুধাল, ‘ঘুমাচ্ছিস না কেন?’
নবাব কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিরাসক্ত গলায় বলল, ‘এমনি।’
নবাব স্বভাবতই মিতভাষী এবং অন্তর্মুখী। আড্ডা কিংবা অনর্থক বাক্যব্যয় তার স্বভাবে নেই; সে নিজের একাকীত্বের বলয়ে বন্দি থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তবে যখন নিঃসঙ্গতা তাকে চারিদিক থেকে গ্রাস করে ফেলে, তখন ছায়ার মতো আমিরের আশেপাশে চুপচাপ বসে থাকে। আমির প্রশ্ন করলে তবেই সে উত্তর দেয়।
আমির পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘মায়ের কথা মনে পড়ে?’
নবাবের ঠোঁটে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল, ‘না।’
‘তোর জীবনের লক্ষ্য কী?’
‘যা ছিল, তা তো পূরণ হয়েছে। এখন টাইটানের লক্ষ্যই আমার গন্তব্য।’
কথাটি বলতে বলতে নবাব আমিরের দিকে তাকাল। আমিরও দৃষ্টি বিনিময় করে সরাসরি জানতে চাইল, ‘তোর কি আফসোস হয় নিজের বাপকে খুন করার জন্য?’

নবাবের চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধের চিহ্নমাত্র নেই। সে নির্বিকারভাবে বলল, ‘ও আমার বাপ ছিল না। কেউ আমার মা-ও নয়। যেখানে কোনো সম্পর্কই নেই, সেখানে আফসোসের সুযোগ কোথায়?’
আমির পুনরায় মুখ ফিরিয়ে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
নবাবের জন্ম ১৯৭৮ সালে। তার জন্মদাতা ছিল ভিনদেশি এক সুদর্শন পুরুষ, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে আসা ভারতের একজন উচ্চশিক্ষিত প্রফেসর। সিলেটের অতি সাধারণ পরিবারের তরুণীকে প্রেমের মায়াজালে আবদ্ধ করে সেই শিক্ষিত পশুটি শেষ পর্যন্ত তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। গর্ভে নবাবকে রেখে লোকচক্ষুর আড়ালে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যায়। লোকলজ্জা আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে নবাবের মা শেষমেশ শহরের নিষিদ্ধ পল্লীতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। নবাবের বয়স যখন মাত্র পাঁচ, তখন তার মা তাকে এতিমখানায় ফেলে দিয়ে চলে যান। সেই এতিমখানার তথাকথিত এক ধর্মীয় লেবাসধারী নরপশুর লালসার শিকার হতে হয় নিষ্পাপ নবাবকে। তখন থেকে তার কাছে পৃথিবীতে বাবা।মানে পলাতক প্রতারক, আর মা মানে সেই জননী যে সন্তানকে নরকের আগুনে ফেলে চলে যায় শুধুমাত্র প্রেমিকের প্রতি ঘৃণা বলে।

নবাবের বয়স যখন নয়, তখন আমির তাকে বলাৎকার থেকে উদ্ধার করে নিজ আস্তানায় নিয়ে আসে। অতি অল্প বয়সেই সে জড়িয়ে পড়ে অন্ধকার জগতের নানা অপকর্মে। তেরো বছর বয়সে নবাব জানতে পারে, তার প্রফেসর পিতা আবারও কোনো দাপ্তরিক কাজে এই অঞ্চলে এসেছে। সংবাদটি শোনামাত্র নবাবের ভেতরে প্রতিশোধের দাবানল জ্বলে ওঠল। আমির উৎসাহের সাথে তার হাতে তুলে দিল অস্ত্র। নিজের জন্মদাতাকে হত্যার মাধ্যমেই নবাবের অপরাধ জগতের অভিষেক ঘটে। তার সাহস আর বুকচেরা ঘৃণা দেখে আমির কখন যেন তাকে নিজের খুব কাছে টেনে নেয়; আর নবাবও হয়ে ওঠে আমিরের একনিষ্ঠ ছায়াদের একজন।
নবাব নিস্তব্ধতা ভেঙে ডাকল, ‘টাইটান?’
আমির কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ মহাকাশের অসীম শূন্যতায়। চারদিকে সাঁ সাঁ শব্দে হু হু বাতাস বইছে।

নবাব পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘এত লোকবল থাকতে ঘর-সংসার ফেলে আপনি নিজে কেন এলেন? এই কাজটা তো আমরাই করতেই পারতাম।’
আমির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এই ব্যবসাই আমার সব, নবাব। এখানে বিন্দুমাত্র ভুল হলে সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। বিদেশের যে প্রভাবশালী খদ্দেরদের কাছে এই মেয়েদের পাঠানো হয়, তারা ক্ষমতাধর, খামখেয়ালি। তাদের নির্দিষ্ট কোনো উৎসব বা ঘরোয়া পার্টির জন্য ঠিক নির্দিষ্ট মুহূর্তেই চালান পৌঁছানো চাই। সময়মতো ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হওয়া মানে তাদের অসম্মান করা, আর সেটা আমি ঘুণাক্ষরেও হতে দিতে পারি না। যখন আরও বড় হবি, সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিবি, তখন এই অস্থিরতা বুঝবি।’
বিজিবি বা কোস্টগার্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা করতে হয়। যিনি হয়তো মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য নজরদারি শিথিল করবেন। ওই নির্দিষ্ট সময়টুকুর মধ্যেই সীমান্ত পার হতে না পারলে পুরো অপারেশন ভেস্তে যাবে। এই টাইট শিডিউলই আমিরকে স্থির হতে দেয় না। একবার ডিল চূড়ান্ত হয়ে গেলে এবং অগ্রিম অর্থ পকেটে ঢুকলে সেখান থেকে পিছিয়ে আসার কোনো পথ খোলা থাকে না। হয় পণ্য পাঠাও, নয়তো মৃত্যুকে বরণ করো। তাইতো চালানের সময় আমির এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পায় না; সামান্য বিচ্যুতি মানেই তার তিলে তিলে গড়া তাসের ঘরে ভাঙন ধরা।

নবাব সবই জানে৷ এই জগতের সবাই ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। বিদেশের বিত্তশালী খদ্দেরদের কোনো ওজর-আপত্তি শোনে না। তাদের কাছে কথা মানেই কথা।
‘কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, নবাব।’ আমির আকাশের দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই শান্ত গলায় কথাটা বলল। আমিরের অদ্ভুত ক্ষমতা এটা, সে মানুষের উপস্থিতি কিংবা তার ওপর নিবদ্ধ চোখের দৃষ্টি অলৌকিকভাবে টের পেয়ে যায়। নবাব বিভ্রান্ত হয়ে আশেপাশে তাকাতেই আমির নিচু স্বরে যোগ বলল, ‘সারেং ঘরের দিকে।’
নবাব চট করে সারেং ঘরের দিকে তাকাতেই বাবুর্চি দ্রুত আড়াল হয়ে গেল। সে এতক্ষণ একদৃষ্টে আমিরের দিকেই তাকিয়ে ছিল। আমির ভাবলেশহীন কণ্ঠে শুধাল, ‘ও হঠাৎ আমাদের দেখছিল কেন?’
নবাব কিছুক্ষণ সেই অন্ধকার কেবিনের দিকে তাকিয়ে থেকে পরিস্থিতিটা বিশ্লেষণ করল। তারপর খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘ও বেইমানি করবে। বিশ্বাসঘাতক।’

আমির পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘কার কাছে বিক্রি হতে পারে বলে তোর মনে হয়?’
নবাব সময় নিল না, ছোট করে উত্তর দিল, ‘এমপি বজলুল হক।’
এরপর দুজনই অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে গেল। যেন এইমাত্র তারা খুব সাধারণ কোনো আলোচনা সেরেছে। একজন মানুষের এক পলকের চাহনি দেখে সে যে বেইমান এবং কার কাছে নিজেকে বিক্রি করেছে সেটা নিমিষেই ধরে ফেলেও তাদের মধ্যে কোনো দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ল না।
আমির পাটাতন ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগল। সে বাবুর্চিকে এখনই পাকড়াও করতে যাচ্ছে না, তার গন্তব্য সেহেরির দস্তরখান। স্রষ্টার ইবাদত-বন্দেগিতে তার কোনো আগ্রহ নেই। তবুও খেতে যাচ্ছে কেবল একটি নামকে কেন্দ্র করে, পদ্মজা। পদ্মজা সেহরি খেয়ে সারাদিন উপোস থাকবে, আর সে আত্মসুখে মগ্ন হয়ে উদরপূর্তি করবে, এমন বৈষম্য তার প্রেমানুভূতির পরিপন্থী। মূলত প্রিয়তমার ক্ষুধার সাথী হতেই তার সেহরি খাওয়া।
নবাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ তার পুরনো এক স্মৃতি মনে পড়ল। একবার এক ওয়াজ মাহফিলে অভিযান চালাতে গিয়ে এক বক্তার মুখে শুনেছিল, “তুমি আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাকে বা যাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে, আল্লাহ তাকেই তোমার কাছ থেকে আগে কেড়ে নেবেন।”
হঠাৎ কেন এই অশুভ স্মৃতির উদয় হলো, তা নবাবের বোধগম্য হলো না। সে মাথা নেড়ে অমঙ্গলজনক চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল।

খাবার খেতে খেতে নিজের অজান্তে আমির অতীতে ডুবে গেল।
পদ্মজাকে প্রথম দেখার লগ্নটি তার সাজানো-গোছানো, নিস্তরঙ্গ পৃথিবীটাকে এক নিমেষেই লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। বাড়ি ফেরার পর রাত যত গভীর হচ্ছিল, তার চোখের ঘুম ততই যোজন যোজন দূরে সরে যাচ্ছিল। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল; এপাশ-ওপাশ করেও কোথাও স্বস্তি মিলছিল না। তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে তখন কেবল সেই ষোলো বছরের কিশোরীর অধিকার। পদ্মজার ভীত মায়াবী চোখের চাহনিতে কী যে এক জাদু ছিল, তার দীর্ঘদিনের অর্জিত কাঠিন্য আর হিতাহিত জ্ঞানকে তছনছ করে দিয়েছিল।
অস্থিরতা যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন মাঝরাতে সে অনেকটা উন্মাদপ্রায় হয়ে বিছানা ছাড়ল। দ্রুত পায়ে মজিদ হাওলাদারের ঘরের সামনে গিয়ে উন্মত্তের মতো দরজায় করাঘাত করতে শুরু করল, ‘আব্বা… আব্বা! দরজা খোলেন আব্বা!’

ভেতর থেকে ফরিনা বেগম আতঙ্কিত হয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। সামনে বিধ্বস্ত, আলুথালু আমিরকে দেখে তিনি শিউরে উঠে ব্যস্ত হয়ে শুধালেন, ‘কী হইছে বাবু? শরীলডা খারাপ লাগতাছে?’
আমির মাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে সোজা ঘরে ঢুকে মজিদ হাওলাদারের খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মজিদ হাওলাদার নাকে চশমাটা এঁটে বিমূঢ় বিস্ময়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমির হুকুমের সুরে বলল, ‘আব্বা, কালকের সালিশ আমি মানি না। কোনো বিচার-আচার হবে না। আপনি যেভাবেই হোক পদ্মজাকে এই ঘরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।’
মজিদ হাওলাদার কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘তোর কি মাথা ঠিক আছে? সন্ধ্যায় গ্রামবাসী তোদের এক বাড়িতে হাতেনাতে ধরছে। পুরো এলাকায় ছিঃ ছিঃ পড়ে গেছে। আমি এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, অথচ কলঙ্কটা খোদ আমার নিজের ঘরেই এসে পড়ছে। তুই এই অবস্থায় বিয়ে করতে চাচ্ছিস?’

আমির উন্মত্তের মতো বলে চলল, ‘ঠিকই শুনছেন, লোকে যারে নিয়ে অপবাদ দিচ্ছে, সেই কলঙ্কিনীকেই আমি সসম্মানে এ ঘরের বউ করে তুলব। আপনি ব্যবস্থা করেন। ওরে দেখার পর থেকে আমার শরীরে আগুন জ্বলতেছে। আমি নির্ঘাত মরে যাব আব্বা! আমার ঠান্ডা কলিজায় আগুন লেগে গেছে। আম্মা, কিছু বলেন!’
ছেলের বিধ্বংসী রূপ দেখে ফরিনা বেগম ভড়কে গেলেন। অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘কস কী বাবু? ছেড়ি তোর কত ছোট, আচ্ছা হেইডা ব্যাপার না৷ লোকে কী কইব? ভাবব, ঘটনা সইত্য। এজন্যি তুই তড়িঘড়ি কইরা বিয়ে করে মুখ ঢাকতে চাইতেছস।’
আমির পাশের টেবিলের ওপর সজোরে এক থাবড়া বসাল। বলল, ‘কেলেঙ্কারি হলে হোক! সব ওলট-পালট হয়ে যাক, তাতে আমার কি! আমি কিচ্ছু জানি না, কিচ্ছু বুঝতে চাই না। আমার শুধু পদ্মজাকে চাই, এখনই চাই!’
মজিদ হাওলাদার এবার শাসনের সুরে ধমক দিয়ে উঠলেন, ‘মাঝরাতে ঘরের ভেতর এসব কী তামাশা শুরু করছিস তুই?’

‘তামাশা না আব্বা! ওই মেয়েরে দেখার পর থেকে আমার জান আর খাঁচায় টিকতেছে না।’
ছেলের কথায় ফরিনা বেগম হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন। যে আমিরকে হাজার চেষ্টা করেও বিয়ের পিঁড়িতে বসানো যায়নি, সে আজ এমনভাবে আকুলিবিকুলি করছে যেন বহু জনমের প্রেম! হাঁপানি রোগীর মতো তার শ্বাসপ্রশ্বাস ওঠানামা করছে। বিস্ময় সামলে নিয়ে তিনি বললেন, ‘আইজ হানজাবেলা না দেখলি ওই ছেড়িরে!’
‘তাতে কী হয়েছে আম্মা? আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না? ওরে ছাড়া আমার দম আটকে আসতেছে। এই যে দেখেন, নিজের হাতটা আমার নাকের কাছে ধরেন, দেখেন আমার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক নাই। আপনারা কেন বুঝতেছেন না? ওরে আমার এই ঘরে চাই, আমার বুকের ভেতর চাই। ওরে না পাওয়া পর্যন্ত আপনাদের ছেলে কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বুজবে না। রাজি হয়ে যান আব্বা, দয়া করে রাজি হন!’

মজিদ হাওলাদার পাথরের মতো গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আগামীকালকের সালিশেই এর একটা বিহিত হবে।’
‘বিহিত মানে কী? ওরে অন্য কোথাও পার করে দেবেন? নাকি কোনো শাস্তি দেবেন? খবরদার আব্বা!’ আমির বিদ্যুৎবেগে বাবার পায়ের কাছে বসে পড়ল, ‘আপনি সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। কাল বিচারের আসরেই ফয়সালা হবে যে পদ্মজা এ বাড়ির বউ হয়ে আসবে। আব্বা, আম্মা আপনারা কি চান আপনাদের এই জওয়ান ছেলেটা একটা মেয়ের জন্য রাস্তায় রাস্তায় পাগল হয়ে ঘুরুক? আমাকে তো চেনেন, আমি যা একবার মনে ধরি, তা না পেলে কী ঘটাতে পারি! ভালোয় ভালোয় বলছি, রাজি হয়ে যান।’

ছেলের লাগামহীন উন্মাদনা… চোখের হিংস্ত্র আকুতি দেখে মজিদ হাওলাদার ও ফরিনা বেগম নির্বাক হয়ে একে অপরের দিকে চাইলেন। এই তুফান থামানোর সাধ্য তাদের নেই।
খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে আমির আপনমনেই হেসে ফেলল। তৃষ্ণায় সেদিন তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। পরদিন সালিশের আসরে পদ্মজাকে একবার দেখার অপেক্ষায় পুরো রাত সে চোখের পাতা এক করতে পারেনি। কী অদ্ভুত পাগলামিই না তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল! আটাশ বছরের পোড়খাওয়া পুরুষ আমিরকে সেদিন প্রথম প্রেমে পড়া কিশোরের মতো দেখাচ্ছিল।
বিয়ের তারিখ পাকাপাকি হওয়ার পর আমিরের অস্থিরতা কমার বদলে যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। বাড়ির বিশ্বস্ত কাজের লোক মগাকে বগলদাবা করে সে দিনরাত মোড়ল বাড়ির আশেপাশে টহল দিতে লাগল। ধবধবে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরে রাজপুত্রের বেশে টইটই করে ঘুরত। উদ্দেশ্য একটাই, যদি দৈবাৎ পদ্মজার এক ঝলক দেখা মেলে!

মাঝেমধ্যে টিনের বেড়ার ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করত। কিন্তু কপাল তার সহায় ছিল না; প্রতিবারই সে পদ্মজার মা হেমলতার তীক্ষ্ণ, তেজস্বী চাউনির সামনে পড়ে যেত।
আমির তখন আমতা আমতা করে লাজুক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে ‘আম্মা’ বলে নিচু হয়ে হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করত। এমনও দিন গেছে, দিনে আটবার মুখোমুখি হওয়ায় সে আটবারই কদমবুসি করেছে! হেনলতা ভ্রু কুঁচকে বলেছিলেন, ‘একদিনে আটবার সালাম করলে সওয়াব বাড়ে কি না জানি না, তবে বিরক্তি ঠিকই বাড়ে। তোমার কি কোনো কাজ নেই?’

পরদিন ভরদুপুরে উঠান জনশূন্য দেখে আমির পা টিপে টিপে প্রায় ঘরে ঢুকেই পড়েছিল; ঠিক তখনই আড়াল থেকে হেমলতার গমগমে কণ্ঠস্বর তীরের মতো ধেয়ে এলো, ‘বাড়ি যাও আমির!’
আমির থতমত খেয়ে চোরের মতো কাষ্ঠহাসি হেসে কোনোমতে বলল, ‘জি।’ বলেই দ্রুত পায়ে বাড়ির সীমানা পার হয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ পর আবার ঠিকই ফিরে এলো নির্লজ্জের মতো।
সেদিনই বিকেলের মরা রোদে গ্রাম্য পথটা তখন মায়াবী হয়ে উঠেছিল। আমির পাঞ্জাবির খুঁট সামলাতে সামলাতে মগাকে নিয়ে হাঁটছিল বাড়ির পথে, এমন সময় হঠাৎ সামনে পড়ে গেল পূর্ণা। আমিরকে দেখামাত্রই পূর্ণার নাক কুঁচকে গেল, ঠোঁট উল্টে সে সজোরে এক মুখ ভেংচি দিল। তারপর গটগট করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
আমির হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। মগার কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল, ‘দেখলি, তোরে কেমন সুন্দর করে মুখ ভেংচি দিল!’

‘জ্বে না আমারে না, ওটা আপনারেই দিছে।’
এক নিমেষে আমিরের ঠোঁটের কোণ থেকে হাসিটা কর্পূরের মতো উবে গেল। বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে পেছন ফিরে তাকাল। পূর্ণাও কয়েক কদম দূরে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আমিরের দিকে তীক্ষ্ণ নজর হানছে। পদ্মজার মতো রূপবতীর জন্য আমিরের মতো কালো পাত্রকে সে কিছুতেই দুলাভাই হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। আমিরের চাহনি চোখে পড়তেই পূর্ণা পুনরায় জিহ্বা বের করে আরও একবার বিকটভাবে মুখ ভেংচি দিয়ে তার অসন্তোষ জানান দিল। আমির এবার সত্যিই থতমত খেয়ে গেল।
আত্মবিশ্বাসে খানিকটা টান পড়ায় সে বিড়বিড় করে বলল, ‘আমাকে কি ওর পছন্দ হয়নি?’
মগা নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল, ‘জে না।’
‘কেন? আমার কি সমস্যা?’ বলতে বলতে আমির বেশ অস্থির হয়ে নিজের অবাধ্য চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিকঠাক করার চেষ্টা করল।
মগা খানিক ভেবে বলল, ‘হেও কালা, আপনিও কালা। কালায় কালায় অমাবস্যা। এইডাই সমস্যা।’

দ্বিতীয় রাত। দিগন্তবিস্তৃত কালো জলের বুক চিরে দুটো বিশাল জাহাজ তীব্র বেগে ছুটে চলছে। উপরের খোলামেলা পাটাতনে বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে শরীরে। সেখানেই একপাশে টিমটিমে আলোর নিচে রাতের খাবার নিয়ে বসেছে আমির আর নবাব।
নবাব বলল, ‘মঞ্জু বাবুর্চির ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নিলেন?’
আমির ধীরস্থিরে জবাব দিল, ‘বেইমানটাকে এতো সহজে মারব না। দেখি, ও কতদূর যায়।’
নবাব নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে খেয়ে যাচ্ছিল। আমির আচমকা তার দিকে তাকিয়ে যোগ করল, ‘ওর শেষটা তুই-ই করবি। কিন্তু এখন নয়, সময় এলে আমি বলব।’
নবাব মৌনসম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়াল। বেইমানি শব্দটার প্রতি তার আজন্ম ঘৃণা।
কিছুক্ষণ পর আমির নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল, ‘তোকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।’
বিস্ময়ে নবাবের হাতের গ্রাস থমকে গেল। আমির এক লোকমা ভাত মুখে পুরে বলতে লাগল, ‘আমার একটা প্রতিশোধ বাকি নবাব। কিন্তু শত্রু যে জায়গায় আছে, আমি চাইলেই হুট করে তার টুঁটি চেপে ধরতে পারব না। তাকে হারাতে হলে আগে আমাকে তার সমান হতে হবে, বা তার চেয়েও বড়। সেই জায়গায় পৌঁছাতে দশ-বিশ বছর লাগলেও আমি ধৈর্য ধরে যাব।’

প্রতিশোধের কারণ বা শত্রু কে, সেসব কিছুই না জেনে নবাব ভাত ঝোলে মাখাতে মাখাতে নিচু সুরে বলল, ‘আপনি যেখানে পৌঁছাতে চান, আমরা সেখানেই পৌঁছাব। আপনি যেখানে যেতে বলবেন সেখানেই যাব।’
‘তোকে বিদেশ না যুদ্ধের ময়দানে পাঠাচ্ছি। এ বছরই ব্যাংকক চলে যাবি। ওখান থেকে পুরো বিশ্বে। আমার হাত হবি, আমার শক্তি হবি। ব্যাংককের আন্ডারগ্রাউন্ড তোকে দখল করতে হবে।’
‘আপনার মেয়ের রক্তের বদলা নিতে আমাদের যতদূর যেতে হবে, যাব।’
আমির মনে মনে কিছুটা চমৎকৃত হলো। সে একবারও স্পষ্ট করে বলেনি কিসের প্রতিশোধ তার বুকে চেপে আছে। শুধুমাত্র তার ভেতরের তপ্ত তৃষ্ণা আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লড়াই করার সংকল্প দেখেই নবাব সত্যটি আঁচ করে ফেলল! বিস্ময়টুকু সে নিজের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেতে দিল না। চুপ হয়ে গেল।

নবাব সাধারণ কথা বলছে এমনভাবে মাছের কাঁটা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, ‘আপনি থাকলে আপনার ছায়া হয়ে লড়ব, আপনি না থাকলে আপনার প্রতিশোধ হয়ে জ্বলব। আপনার মেয়ের খুনিকে নরক পর্যন্ত ধাওয়া করার কসম খেলাম।’
আমিরের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। সে হাসিতে মায়ার রেশমাত্রও নেই। সে জানে, এই বয়সের ছেলেদের রক্ত টগবগ করে ফোটে, নেতার প্রতি এদের থাকে অন্ধ আবেগ। আমিরের কাছে হিসাবটা খুব সহজ, নবাব যদি কখনো বেইমানি করে, তবে কুকুর-বিড়ালের মতো তাকেও শেষ করে দিতে তার হাত তিলমাত্র কাঁপবে না। তবুও, নবাবের আনুগত্য আমিরকে মুগ্ধ করে। সে নবাবকে ঠিক ভালোবাসে না সত্য, তবে তাকে ভীষণ পছন্দ করে।

আমির হাওলাদার পর্ব ৪

ওর পুরো নাম নবাব আল কায়রো৷ দুই চোখের মণি দুই রঙের। চশমা পরে। আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ে যদি আবার কখনো কোনো চরিত্র লিখি। তবে ও ই হবে প্রধান। পরবর্তী পর্ব লেখা আছে৷ কিছু অংশ ছাড়া৷ আগামীকাল দেব যদি শরীর ভালো থাকে৷ নয়তো তার পরদিন।
আর নবাবের বাবা হত্যার ঘটনাটা দুই-তিন বছর আগের এক ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা৷ সম্পত্তির জন্য বা ব্যক্তিগত কিছুর জের ধরে এক ছেলে তার বাপকে খুন করেছিল।

আমির হাওলাদার পর্ব ৬