আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১১
DRM Shohag
সময় চলমান। সে কারো সুখ-দুঃখে থেমে থাকেনা। বরং সে তার নিজ গতিপথে চলতে থাকে। ঠিক যেমন সন্ধ্যার দুঃখে থেমে থাকেনি। পেরিয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস। মেয়েটার পেট আগের চেয়ে অনেক উঁচু হয়েছে। নড়াচড়া করতে ক’ষ্ট হয় এখন। এক জায়গায় বসলে সহজে উঠতে পারেনা। পাতলা শরীরটা ভারী হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যার শরীর খারাপ লাগলেও মনটা ভালো হয় এই ভেবে আর ক’দিনের মধ্যেই তার মাঝ থেকে একটি প্রাণ বেরিয়ে আসবে। যার জন্য সন্ধ্যা একা একা প্রতিনিয়ত কত ল’ড়াই করেছে!
ধরনীর বুকে আঁধার নেমেছে অনেক আগেই। সন্ধ্যা বেলকনিতে পাতানো একটি চেয়ারে বসে আছে। দৃষ্টি অজানা আন্ধারে নিবদ্ধ। পরনে একটি ঢিলেঢালা পোষাক। তার উপর পাতলা একটি চাদর জড়ানো। শীতের আমেজ বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। পুরোপুরি বিদায় নেয়নি এখনো। থেকে থেকে মিটিমিটি বাতাস ভেসে আসছে। সন্ধ্যা গায়ের চাদরটি আরেকটু টেনে নিল। কি যেন ভেবে মলিন মুখটায় একখানা বিদ্রূপ হাসি ফুটল।
আকাশ সেই যে সাড়ে পাঁচ মাস আগে রাতের আঁধারে কাউকে না জানিয়ে ইংল্যান্ড পাড়ি জমালো, আর ফিরল না। আসমানী নওয়ান কল করে কত আসতে বলেছিল। আকাশ শোনেনি। ফেরেনি আর বাংলাদেশ। সন্ধ্যার টানেও আর ফেরেনি। শিমুরা তার দাদি বাড়ি থেকে ফেরার পর তাদের সাথে আকাশ ভিডিও কলে কথা বলেছে, আসমানী নওয়ানের সাথে কলে কথা বলেছে। দূরে থেকে আকাশের কণ্ঠ শুনেছে সন্ধ্যা। সে মেনে নিয়েছিল, আকাশের মাঝে বিদ্যমান তার প্রতি ভালোবাসা মুছে গিয়েছে। কিন্তু নিয়াজের বলা, ‘ভালোবাসা কখনো ম’রে যায় না। স্মৃতি ন’ষ্ট হলেও ভালোবাসা সতেজ থাকে।’ এই কথাটা সন্ধ্যার মাথায় সবসময় ঘুরতো। এর রেশ ধরে সন্ধ্যা চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে থাকত, আকাশ তাকে ভুলে গিয়েও সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার টানে তার খোঁজ করবে, তার কথা জিজ্ঞেস করবে, তাকে এতোখানি আ’ঘা’ত করে চলে যাবার পর, আকাশ নিজেও ব্য’থা পেয়ে তার কাছে ফিরবে। কিন্তু সন্ধ্যার ভাবনার সাথে কিচ্ছু মেলেনি। উল্টে নিয়াজের বলা সেদিনের কথাগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
সন্ধ্যা তার বুকে মিথ্যে আশা বেঁধে এ ক’মাস পার করেছে। চোখ বুজলেই শেষবার আকাশের দেয়া থা’প্প’ড়গুলো ভেসে উঠত। সন্ধ্যা আবার কাঁদত। আকশকে মনে না রাখার সেই প্রতিজ্ঞা ভুলে গিয়ে দু’হাত পেতে আবারও চাইত,, আকাশ তার কাছে ফিরে আসুক। সে সব ভুলে যাবে। আকাশের দেয়া সমস্ত আ’ঘা’ত মুছে ফেলবে। খুব ইচ্ছে করত, আকাশ তার মাথায় একটাবার হাত রাখুক। একটুখানি ভরসা দিক। তার পেটে তাদের অংশ বেড়ে উঠছে ভেবে আকাশ খুশিতে আগের চেয়েও অনেক বেশি পা’গ’লামি করুক। যখন সন্ধ্যার সাত-আটমাস চলে,, তখন বাচ্চাটি মাঝে মাঝে নড়ে উঠলে সন্ধ্যা ব্য’থা পেয়েও ভীষণ খুশী হত। কিন্তু সে খুশি স্থায়ী হতে পারতো না পাশে আকাশ না থাকায়। সন্ধ্যা হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান সোনার ন্যায় হাতড়াতো, মিথ্যে মিথ্যে আকাশকে ডাকত। কোথাও না পেয়ে সন্ধ্যার সুখগুলো মুহূর্তেই দুঃখে রূপান্তরিত হয়ে অশ্রু আকারে ঝড়ে পড়তো। সন্ধ্যা নিজের কাছে হেরে গিয়ে, নিজেকে দেয়া কথা খানিকের জন্য ভুলে গিয়ে আসমানী নওয়ানের কাছে গিয়ে বলত, আকাশকে একবার বাংলাদেশে আসতে বলতে। সে যাবে না আকাশের সামনে। শুধু দূর থেকে একটু দেখবে।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার আহাজারী দেখে আকাশকে কল করত। খুব জরুরি তলবে ডাকত। একবার আসতে বলত। আকাশ প্রতিবার নাকোচ করে দিয়েছে। শেষবার আসমানী নওয়ান আকাশকে দেশে ফেরার জন্য অনেক জোর করলে আকাশ বলে,
“ওই সন্ধ্যা মেয়েটাকে আগে বাড়ি থেকে বের কর। নয়তো ফিরব না। যতদিন ওই মেয়েকে বাড়িতে জায়গা দিবে ততদিনের জন্য ভুলে যাও তোমার একটা ছেলে আছে।”
সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের পাশে বসে ছিল। আসমানী নওয়ান কথা বললেই সন্ধ্যা তার আম্মার পাশে বসত। আসলে সন্ধ্যার বড্ড মানসিক শান্তির প্রয়োজন ছিল। যা তার আকাশকে ঘিরে ছিল। এজন্যই মেয়েটা আকাশের কণ্ঠ শুনতে পাওয়ার সুযোগ কখনো হাতছাড়া করত না। একটুখানি শান্তি পাওয়ার আশায় দূর থেকে আকাশকে একনজর দেখার আর্জি করত। আসমানী নওয়ানকে ঠেলত, তার ছেলেকে বলতে, সে যেন দেশে ফিরে আসে। কিন্তু গত একমাস আগে আকাশের বলা সেই কথাটা সন্ধ্যাকে একদম পাথরে রূপান্তরিত করে দিল। আকাশের বলা সেই কথাটা শুনে সন্ধ্যা সেদিন আর কাঁদল না। একটা কথাও বলল না। কি দারুণ নিরব থেকে আসমানী নওয়ানের পাশে দখল করে বসা জায়গাটি থেকে প্রস্থান করেছিল। এরপর আর আকাশকে ফিরতে বলেনি। উল্টে সে চলে যেতে চেয়েছিল এই বাড়ি থেকে। আসমানী নওয়ানকে বলেছিল,
‘আম্মা আমি ভাইয়ার কাছে চলে যাবো। তুমি তোমার ছেলেকে ফিরতে বলো।’
আসমানী নওয়ানের সেদিন কি হয়েছিল কে জানে! সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলেছিল। বেঁধে আশা গলায় বলেছিল,
“আমার সবাই হারিয়ে গেছে জান্নাত। কয়টা ছেলেমেয়ে আছে আমার। সবাইকে ছাড়া আমি অপূর্ণ। তোরা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। তার মধ্যে তুই আমার একটা মা। আমাকে রেখে যাস না মা। আমি সব ঠিক করে দিব। আমায় একা করে দিস না।”
সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের চোখের পানি দেখে নিভে গিয়েছিল। মেনে নিয়েছিল আসমানী নওয়ানের কথা। কি করে ফেলত এই মানুষটার কথা? তার ভাইয়ার পর এই মানুষটা তার ২য় আশ্রয়স্থল। যে তাকে কতশত বিপদ থেকে বাঁচিয়ে বুকে আগলে নিয়েছে। সন্ধ্যা তার আম্মার বুকে আবারো থেকে গিয়েছে।
তবে সেদিনের পর থেকে সন্ধ্যা ‘আকাশ’ শব্দটাও মুখে উচ্চারণ করেনি। কিভাবে যেন কাঁদতেও ভুলে গেল। আজ থেকে সাড়ে পাঁচ মাস আগের বলা কথাগুলো প্রায় সাড়ে চার মাস পর সত্যি সত্যিই বাস্তবায়ন করে ফেলল বোধয়। দারুণ এক শ’ক্ত মানবীতে পরিণত হয়ে গেল সন্ধ্যা। কি জানি কতটুকু পেরেছে। তবে সেই পা’গ’লামি গুলো আর করা হয়না। শিমু বা কেউ আকাশ নামটা উচ্চারণ করলে সে নিরবে জায়গাটি প্রস্থান করে। ইদানিং অপ্রয়োজনেই হাসে। কিন্তু প্রয়োজনেও আর কাঁদে না। আসে না কান্না। হয়ত, চোখদুটো মরুভূমি পছন্দ করে ফেলেছে। বারোমাস বৃষ্টি কার ভালো লাগে? সন্ধ্যার চোখদুটো-ও মুষলধারে বৃষ্টির অ’ত্যা’চারে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। আর তাই হয়ত এখন তাদের মরুভূমি এতো পছন্দ! ফলস্বরূপ প্রয়োজনেও চোখদুটোয় আর পানি জমেনা।
আকাশের ভালোবাসার দিনগুলোর কথা ভাবলে সন্ধ্যার মনে হয়, আর পাঁচজন মানুষের সুখময় জীবনে কিছু খারাপ স্মৃতি থাকলে তাকে তারা স্মৃতির পাতায় দুঃস্বপ্ন হিসেবে আখ্যায়িত করে রাখে। আর তার দুঃখময় জীবনে অল্পকিছু সুখময় স্মৃতি ছিল, যা আকাশের ভালোবাসা ঘিরে, নাম দুঃস্বপ্ন। ভেঙে গিয়েছে সেই দুঃস্বপ্ন, আকাশের ভালোবাসাও হারিয়ে গেছে। ফিরে এসেছে,, না পাওয়া, দুঃখভরা জীবন। যা তার ভাগ্যের খাতায় মোটা কালিতে লিপিবদ্ধ।
পুরনো কিছু স্মৃতিচারণ করে সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রাণহীন দৃষ্টিজোড়া তারায় জ্বলতে থাকা আকাশপানে। আর এক সপ্তাহ পর তার ডেলিভারির ডেট দিয়েছে। সন্ধ্যা কাপড়ের উপরেই তার উঁচু পেটটায় হাত রাখে। চোখ বুজে শ্বাস নেয় প্রশান্তির৷ আর এক সপ্তাহ পর এই প্রাণটাকে সে ছুঁতে পারবে৷ তার জীবনের সবকিছু। তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। তার পিছুটান। তার সবকিছু। এই প্রাণ ছাড়া আর কোনো পিছুটান নেই। আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে জানা গিয়েছে তার ছেলে হবে। সন্ধ্যা আকাশকে ঘিরে বিষাদটুকু গিলে, আগাম ছেলের জন্য এক বুক প্রশান্তির শ্বাস টেনে আওড়ায়,
“আমার আব্বা। আমার বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা তুমি। আমার রাজপুত্র।”
আরও কিছুক্ষণ পেরোলে সন্ধ্যা ঘরে চলে আসে। বসে বসে এশার নামাজ আদায় করে। এরপর শরীরটা বিছানায় মেলে দেয়। আজকাল বড্ড দুর্বল লাগে শরীর। ক্লান্তিতে ভরপুর থাকে৷ কিছুক্ষণের মাঝেই সন্ধ্যা ঘুমিয়ে যায়।
ঘটির কাটা তখন ১২:৩০ এর ঘরে। সন্ধ্যা বারবার এপাশ-ওপাশ করে। নড়েচড়ে ওঠে। চোখেমুখে অসম্ভব বিরক্তি। গলায় ব্য’থা অনুভূত হয়। এক পর্যায়ে সন্ধ্যার ঘুম ছুটে যায়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে সোনালি রঙের দু’টো চোখের মণি। সন্ধ্যা বিস্মিত হওয়ার সুযোগ টুকু বোধয় পেল না। বুঝতে পারে সর্বশক্তি দিয়ে তার গলা চেপে রেখেছে একটি হাত। সন্ধ্যার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। দু’হাত তুলে তার গলা চেপে ধরা হাতটি খামচে ধরে সরিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু সে বরাবর ব্যর্থ হচ্ছে। একসময় কানের কাছে আকাশের শ’ক্ত কণ্ঠ ভেসে আসে,
“তোর সাহস কি করে হয় আরেকজনের বাচ্চার মা হওয়ার? বেঈমান! তোর বাচ্চাকে না মে’রে দম নিব না আমি।”
সন্ধ্যা ছটফট করে। দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। নিঃশ্বাস চিরতরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তখনই সন্ধ্যার গলা থেকে হাত সরে যায়। সন্ধ্যা সমানে কাশতে থাকে৷ কয়েক সেকেন্ডের মাথায় সে কাশতে কাশতে আশেপাশে তাকায়। কাউকে দেখতে পায়না। পাশে আসমানী নওয়ানের ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসেন তিনি। এগিয়ে এসে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“জান্নাত কি হয়েছে তোর?”
কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যাকে টেনে বসাতে নিলে সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। সন্ধ্যার এহেন কান্ডে ভদ্রমহিলা থমকায়৷ সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়েছে মা? কি হয়েছে বল?”
সন্ধ্যা কিছু বলতে পারেনা। মেয়েটা শুধু কাঁদছে তো কাঁদছেই৷ হঠাৎ-ই কিছু একটা ভাঙার শব্দ ভেসে আসে৷ আসমানী নওয়ান দরজার দিকে তাকায়। আবছা আলোয় দেখল দরজা পুরোপুরি খোলা। ভদ্রমহিলা অবাক হয়। সিনি সবসময় দরজা ভিড়িয়ে ঘুমায়। তাহলে এভাবে খুলে গেল কিভাবে? আর ডায়নিং এর দিকে ওটা কি ভাঙল? আসমানী নওয়ান চেঁচিয়ে ওঠেন, “কে????”
সন্ধ্যার কান্নার তোড় কমে এসেছে৷ আকাশের বলা কথাটা কানে বাজছে। মেয়েটার দমবন্ধ লাগে। সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের বুক থেকে মাথা তোলে। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। আসমানী নওয়ান তাকায় সন্ধ্যার দিকে। সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ঘরের লাইট জ্বালায়। সন্ধ্যার দিকে খেয়াল করলে দেখল মেয়েটার শরীর কাঁপছে। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে আসার আগেই সন্ধ্যা চিৎকার করে বলে,
“তোমার জা’নো’য়া’র ছেলে আমার বাচ্চাকে মা’র’তে এসেছিল আম্মা। আমার বাচ্চাকে বাঁচতে দিবেনা সে।
এটুকু বলতে গিয়ে সন্ধ্যা আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে। আজ কতগুলো দিন পর চোখের বাঁধ ভাঙল তার। তার ছোট্ট প্রাণ পৃথিবীতে আসার আগেই, নিজের স্বামীর মুখে যখন বাচ্চাকে মে’রে ফেলার হুমকি আসে, তখন সে নিজেকে কিভাবে সামলাবে? সে তো আকাশকে ঘিরে বিষাদ গিলে তার ছোট্ট প্রাণ নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। এখন সেই বাচ্চার দিকেও আঙুল উঠে গেল। সন্ধ্যা ভেতরে ভেতরে গলা কাটা মুরগির ন্যায় ছটফটাল। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আমি তোমার ছেলের কি ক্ষ’তি আম্মা বলতে পারো? আমি তো বলেছি আমি আর তার সামনে যাবো না। আর কোনোদিন চাইব না আমি তাকে। আর কোনোদিন পা’গ’লা’মি করবনা। করিওনা আমি। তাহলে সে কেন আমার বাচ্চাটার দিকে হাত বাড়ায় আম্মা? আমার জীবনটা আর কত নরক বানালে তোমার ছেলের শান্তি হবে? আম্মার বাচ্চার কিছু হলে আমি ম’রে আম্মা। আমি ম’রে যাবো।”
কাঁদতে কাঁদতে সন্ধ্যার হেঁচকি উঠে গিয়েছে। আসমানী নওয়ান স্তব্ধ হয়ে শোনে সন্ধ্যার কথাগুলো। সন্ধ্যা এসব কি বলছে? তার মাথায় কিছু ঢুকছেনা। ঢোক গিলে বলে,
“এসব কি বলছিস মা? আকাশ তো এখানে নেই। তোর হয়ত এগুলো মনের ভুল।”
সন্ধ্যা রে’গে হাতের কাছে একটি জগ পেয়ে, পানি ভর্তি জগ ছুঁড়ে ফেলে চেঁচিয়ে বলে,
“একদম আমাকে পা’গ’ল বানানোর চেষ্টা করবেনা। আমি স্পষ্ট দেখেছি তোমার ছেলের সোনালি চোখ। স্পষ্ট শুনেছি তোমার ছেলের কণ্ঠ। আমার.আমার গলা চেপে ধরে বলছিল, আমার বাচ্চাকে না মে’রে দম নিবেনা। আমার বাচ্চার কিছু হলে আমি কিন্তু তোমার ছেলেকে বাঁচতে দিব না আম্মা। আমার বাচ্চা….
সন্ধ্যার কথা জড়িয়ে আসে। পেটে য’ন্ত্র’ণা শুরু হয়। ডান হাতে পেট চেপে ধরে। চোখমুখ কুঁচকে নেয়। বা হাতে দেয়াল ঠেস দিয়ে ধরে।
আসমানী নওয়ান কিছু কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় মেঝেতে দৃষ্টি গেলে। সন্ধ্যার পায়ের কাছে র’ক্তের ছড়াছড়ি। যা ইতোমধ্যে গড়িয়ে মেঝেতে অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছে। ভদ্রমহিলা ভ’য়ে আঁতকে ওঠে। দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসে সন্ধ্যার দিকে।
এদিকের সন্ধ্যার পেটের য’ন্ত্র’ণা বেড়ে যায়। টিকতে না পেরে সে দেয়াল ধরে ধরে বসে পড়ে। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার পাশে বসে দু’হাত গালে রেখে ভীত কণ্ঠে বলে,
“এসব কি হচ্ছে মা? কি হয়েছে তোর?”
তীব্র ব্য’থায় সন্ধ্যার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। বহুক’ষ্টে ব্য’থাতুর আওয়াজে উচ্চারণ করে,
“আমার অনেক পেট ব্য’থা করছে আম্মা। মনে হচ্ছে আমি ম’রে যাব। আমার বাচ্চাকে বাঁচাও আম্মা।”
কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যা মোচড়ামুচড়ি শুরু করে৷ এক পর্যায়ে শব্দ করে চেঁচিয়ে ওঠে। মেয়ের এমতাবস্থায় আসমানী নওয়ানের দিশেহারা লাগে। হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“একটু দাঁড়া মা৷ আমি অরুণকে ডাকছি।”
কথাটা বলে আসমানী নওয়ান দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। বড় বড় পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে অরুণের ঘরের দিকে যেতে নিলে সামনে আকাশকে দেখে আসমানী নওয়ানের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। বিস্ময়ে চোখদুটো বড় হয়ে যায়।
আকাশের পরনে স্যুট, প্যান্ট। পাশে একটি লাগেজ। দেখে বোঝা যাচ্ছে সে মাত্র লাগেজ নিয়ে বাসার ভেতর প্রবেশ করেছে। এতোদিন এতো করে বলত, অথচ আকাশকে দেশে আনতে পারেনি৷ আজ হঠাৎ আসার কারণ কি? সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সন্ধ্যার বলা কথাগুলো তার কানে বাজছে। তবে কি আকাশ সত্যিই সন্ধ্যার বাচ্চাকে মা’র’তে…..আসমানী নওয়ান আর ভাবতে পারেন না।
আকাশের কপালে ভাঁজ। দৃষ্টি একবার তার মা তো একবার তার মায়ের ঘরের দিকে। মায়ের ঘর থেকে চেঁচানোর আওয়াজ আসছে। আকাশ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “চিৎকার করছে কে?”
আসমানী নওয়ান কথা বলার ভাষা হারিয়েছে। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। মায়ের নিরবতায় আকাশ বিরক্ত হয়। মায়ের পাশ কাটিয়ে আকাশ এগিয়ে যায় আসমানী নওয়ানের ঘরের দিকে৷ ঘরের ভেতর দু’পা আসলে দৃষ্টি আটকায় মেঝেতে আধশোয়া হয়ে থাকা সন্ধ্যার দিকে। যে ডান হাতে পেট চেপে কাতরাচ্ছে। মেয়েটার চারিদিকে র’ক্তের ছড়াছড়ি। যা সাদা টাইলসে স্পষ্ট বিদ্যমান। আকাশ বিস্মিত নয়নে চেয়ে আছে। সন্ধ্যার অবস্থা দেখে তার মস্তিষ্ক ফাঁকা মনে হলো। বুকের বা পাশটায় সেই চিরাচরিত ব্য’থার সঞ্চালন হয়। যে ব্য’থা থেকে বাঁচতে এই কয়মাস ইংল্যান্ড শহরে ঘুরে হাজারটা উপায় খুঁজেছে৷
ওদিকে এতো চিৎকারে অরুণের ঘুম ভেঙেছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আওয়াজটি আসমানী নওয়ানের ঘর থেকে আসছে বুঝতে পেরে অরুণ দ্রুত পা চালায়। দরজায় দাঁড়ানো আসমানী নওয়ানের উদ্দেশে বলে,
“আন্টি কি হয়েছে? চিৎকার করছে…..
কথাটা বলতে বলতে অরুণ ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। প্রথমে আকাশকে দেখে অবাক হয়। তবে সে অবাকতা চাপা পড়ে সামনে সন্ধ্যার এমন করুণ অবস্থা দেখে। অরুণ বিস্ময় কণ্ঠে আওড়ায়,
“সন্ধ্যা?”
ততক্ষণে আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার পাশে এসে বসে সন্ধ্যার ঢিলেঢালা পোষাকের উপর একটি ওড়না ফেলে দেয়। এরপর আকাশকে অগ্রাহ্য করে অরুণের উদ্দেশ্যে বলে,
“অরুণ জান্নাতকে এক্ষুনি হসপিটাল নিতে হবে। দ্রুত ওকে কোলে নাও।”
অরুণ মাথা নেড়ে এগিয়ে আসে সন্ধ্যার দিকে। আকাশ শ’ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি চোখমুখ খিঁচিয়ে রাখা সন্ধ্যার পানে। গত প্রায় ছয় মাস আগে এমন সন্ধ্যাকে না দেখার জন্য দেশ ছাড়ল। আর আজ ফিরে এসে সর্বপ্রথম সন্ধ্যার সেই একই করুণ চিত্র দেখে আকাশের বুক পু’ড়’তে শুরু করল।
ব্য’থা বা’ড়’ছে মারাত্মক হাড়ে। মস্তিষ্কে অরুণকে মায়ের বলা ‘সন্ধ্যাকে কোলে নেয়ার’ কথাটা খেলে গেল। মোটেও পছন্দ হলো না এই কল্প দৃশ্য।
আকাশ খেয়াল করল, অরুণ মেয়েটিকে কোলে নিতে এগোচ্ছে। চোখমুখ শ’ক্ত হয়ে আসে আকাশের। সে তার পরনের সাদা রঙের কোর্ট খুলে ছুড়ে ফেলল। দু’হাতের শার্টের হাতা একটানে কনুই এর উপর পর্যন্ত গোটালো। এরপর সামনে এগোলো।
অরুণ সন্ধ্যাকে কোলে নেয়ার জন্য মাত্র নিচু হয়েছে, তখনই আকাশ পিছন থেকে অরুণের টি-শার্টের কলার ধরে ডানদিকে জোরেসোরে একটা ধাক্কা দেয়, যেন অরুণকে আঁচড়ে ফেলল। অরুণ খাটের সাথে গিয়ে জোরেসোরে ধাক্কা খায়৷ চেঁচিয়ে ওঠে বেচারা। খাটের কোণার সাথে কোমর ধাক্কা খেয়েছে।
আসমানী নওয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। বলেন, “আকাশ কি করছ?”
শব্দ সাথে অরুণের চেঁচানোয় সন্ধ্যা আদোআদো ঝাপসা চোখ মেলে তকায়। আকাশ ঝুঁকে এসেছে সন্ধ্যাকে কোলে নেয়ার জন্য। সন্ধ্যা মুখের সামনে আকাশকে দেখে ভীত হয়। কিছুক্ষণ আগেই আকাশ তার গলা চেপে ধরেছিল। তার বাচ্চাকে মা’র’তে চায়৷ সন্ধ্যা পেছাতে চায়। কিন্তু শরীরের ভীষণ অবনতি হয়েছে তার। সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলে,
“আমাকে ছোঁবেন না। ছোঁবেন না আমাকে।”
আকাশ কানে নিল না সে কথা। চোখের পলকে সন্ধ্যাকে কোলে তুলে নেয়। সন্ধ্যা ভ’য় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। ডাকে,
“আম্মা? আমাকে বাঁচাও। আম্মা?”
আকাশ দিক পরিবর্তন করেছে। ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়ায় সামনের দিকে। আসমানী নওয়ান বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। অরুণ কোমর ধরে আকাশের গমনপথের দিকে চেয়ে আছে। এই বে’য়া’দ’বকে বাংলাদেশে আনার জন্য তারা কত কি করেছে, বিনিময়ে সন্ধ্যাকে শুধু কাঁদিয়ে আজ পিরিত দেখাচ্ছে। ইশ! তার সাধের কোমরটা! কোমরের পিছে ডলতে ডলতে অসহায় কণ্ঠে বিড়বিড় করে,
“আমার কোমর ভাঙলে তোর পিন্ডি চটকাবো শা’লা দুমুখো সা’প কোথাকার।”
সন্ধ্যার একে তো পেট ব্য’থা, এর উপর তার বাচ্চাকে হারানোর ভ’য়। সন্ধ্যার চোখ বেয়ে অনর্গল পানি গড়ায়। তীব্র ছটফটানিতে দু’হাতে আকাশকে খামচায় আর কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“ছাড় আমায়। ছাড় বলছি। ছাড় আমায় জা’নো’য়া’র।
এরপর আবারও ডাকে, “আম্মা? আমার বাচ্চাকে মে’রে ফেলবে আম্মা।”
আসমানী নওয়ান বিস্মিত হয় আকাশের প্রতিটি কান্ডে। পিছু পিছু আসে আকাশের। আকাশ অরুণকে সন্ধ্যাকে টাচ করতে দেয়নি, এর কারণ বোধয় সে বুঝেছে। সন্ধ্যার ব্যাপারে আকাশ এমনই, এই আকাশকে সে চেনে। একসময় সন্ধ্যার জন্য আকাশ অরুণকে বাড়ি আসতে দিচ্ছিল না পর্যন্ত। আজ আকাশের সামনে অরুণ সন্ধ্যাকে কোলে নিতেও সফল হয়নি। কিন্তু সন্ধ্যার বলা কথা যে মেলাতে পারছেনা। তিনি অরুণকে বলে, নিয়াজকে সব খবর দিতে। তারা সন্ধ্যাকে নিয়ে আসছে। নিয়াজ যেন সব ব্যবস্থা করে রাখে।
এরপর সে তার ফোন নিয়ে আকাশের পিছু দ্রুত পা চালায়।
সন্ধ্যা পেট ব্য’থা সাথে আকাশের থেকে ছাড়া পাবার জন্য ছটফট করে। চিৎকার করে। দু’হাতে কতশত খামচি দেয় আকাশের গালে, গলায়, ঘাড়ে। অথচ আকাশ নির্বিকার। সে কেবল এগোয় সামনের দিকে। চোখেমুখ শ’ক্ত। অনুভূতিহীন দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনের দিকে।
সন্ধ্যা ছটফাটতে ছটফটাতে হঠাৎ-ই আকাশের গলায় কা’মড়ে ধরে শরীরে যেটুকু শ’ক্তি ছিল সবটুকু দিয়ে। ঘাড়ের দিকে দু’হাতের নখ বসিয়ে দিয়েছে। আকাশ এবারেরও নির্বিকার। দু’পা থেমে নেই তার। বাড়ির মেইন গেইট থেকে বের হয়।
সন্ধ্যা একপর্যায়ে আকাশের গলায় বসানো দাঁত আলগা করে ফুঁপিয়ে ওঠে।
আজ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে যেমন পরাজিত সৈন্যের ন্যায় আকাশের সামনে থেকে ফিরে গিয়েছিল। তেমনি আজ বোধয় হেরে গিয়ে ছেলেকে নিয়ে এই দুনিয়া ছাড়তে হবে৷ সন্ধ্যা আরেকবার মুচড়ে ওঠে আকাশের কোলে। আকাশের হাতের গতিবিধি শ’ক্ত করে। রোবোটের ন্যায় গ্যারেজের দিকে এগিয়ে যায়। বাইরে দাঁড়ানো গার্ডগুলো আকাশের কোলে এক মেয়েকে দেখে অবাক হয়। আকাশ গার্ডদের উদ্দেশ্যে কঠিন বাণী ছুড়ে দেয়, “বাঁচতে চাইলে গাড়ির দরজা খোল। ফাস্ট।”
দু’জন গার্ড আকাশের আগে আগে দৌড়ে যায় গ্যারেজের দিকে। গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিলে আকাশ সন্ধ্যার গাড়ির ব্যাক সিটে সন্ধ্যাকে শুইয়ে দেয়। সন্ধ্যার নাজেহাল অবস্থা। দু’চোখ বেয়ে জল গড়ায়। অসহায় কণ্ঠে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“আমার বাচ্চাকে মা’রবেন না। দয়া করুন। দয়া করুন। আমি আপনাকে আর চাইবনা।”
আকাশ কি শুনলো সন্ধ্যার কথা? কি যে! তার মুখাবয়ব দেখে বোঝা যায়না। ইতোমধ্যে চোখদু’টো লাল হয়ে গিয়েছে। লালিত চোখ দিয়ে একবার কাতরানো সন্ধ্যার দিকে তাকায়। এরপর সে দ্রুত গাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। শব্দ করে গাড়ির দরজা লাগায়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ির অপর পাশে দাঁড়ানো গার্ডদের দিকে তাকায়৷ ডান হাত তুলে ক্যাচ ধরার ভঙ্গি করলে, একজন গাড়ির চাবি ছুড়ে দেয়। কিন্তু অবাক করা বিষয় গাড়ির চাবি আকাশের হাতে আসল না। তার হাত বরাবর আরেকটি হাত উঁচিয়ে দেয়ায়, সেই হাত চাবিটি ক্যাচ ধরে নেয়। আকাশ ডানদিকে ফিরলে তার মাকে দেখে অবাক হয়। আসমানী নওয়ান চাবিটি ডান হাতের মুঠোয় শ’ক্ত করে ধরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“স্যরি মাই সন! আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনা। আমার মেয়ের জন্য যেটুকু করেছ এর জন্য অবশ্যই আমি কৃতজ্ঞ। এখন দূরে থাকো।”
কথাগুলো বলে আসমানী নওয়ান বড় বড় পায়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। সময় ন’ষ্ট না করে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দেয়। পিছনের সিট থেকে সন্ধ্যার আহাজারি ভেসে আসলে আসমানী নওয়ানের বুকটা ভারী হয়। গাড়ি ব্যাকে নিয়ে গিয়ে গতিপথ ঘোড়ায়। স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে সন্ধ্যার উদ্দেশ্যে সান্ত্বনা বাণী ছুড়ে,
“এইতো যাচ্ছি মা। একটু ধৈর্য ধর।”
সন্ধ্যা বা হাতে গাড়ির সিট শ’ক্ত করে ধরে রেখেছে। ডান হাতে পরনের কাপড় ধরেছে। অসহনীয় ব্য’থায় মুখ নীলবর্ণ হয়ে উঠেছে। চোখের পানি ফেলে আর করুণ কণ্ঠে আওড়ায়,
“আমি মনে হয় বাঁচবো না আম্মা। দয়া করে আমার বাচ্চাকে বাঁচাও।”
আসমানী নওয়ানের চোখ ঝাপসা হয়। গাড়ির গতি বাড়ায়। বুকটা কাঁপছে তার। সন্ধ্যা আর তার বাচ্চা ঠিক থাকবে তো? আল্লাহর কাছে খুব করে চাইল, তার মেয়ে নাতি যেন সুস্থ হয়ে এই দুনিয়ার বুকে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে।
আকাশ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, মায়ের চালানো গাড়িটি অদৃশ্য হতে। অবাক হলো, মাকে গাড়ি চালানো দেখে। তার মা গাড়ি চালাতে পারতো না বলে তার ভীষণ আফসোস ছিল৷ আকাশ গত ছয় মাস আসে যখন বাংলাদেশে ফিরেছিল, তখন মাকে গাড়ি চালানো শেখাবে বলে ঠিক করেছিল। গাড়িও কিনেছিল। বলেছিল সারপ্রাইজ এর কথা। কিন্তু এসব ঝামেলা, তার হঠাৎ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় সব রেখে আবারো ইংল্যান্ড পাড়ি জমালো। মায়ের গাড়ি চালানোর ব্যাপারটি যতটা অবাক করল তাকে, তার চেয়ে হাজার গুণ অবাক করল, সন্ধ্যার উঁচু পেট দেখে। মনে হলো এতোবড় শক সে এর আগে কখনো খায়নি।
আপাতত এসব ভাবনা চেপে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করলে, একজন আরেকটি চাবি এগিয়ে দিলে আকাশ চাবিটি নিয়ে দ্রুত অপর গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে।
তখন অরুণ বাড়ি থেকে বের হয়। আকাশকে গাড়িতে বাসতে দেখে সে একপ্রকার দৌড়ে এসে পাশের সিটে বসে পড়ে।
আকাশ গাড়ি স্টার্ট দেয়। স্পিড বাড়ায় দ্রুত৷ অরুণ আকাশের দিকে তাকায়। আকাশের পরনের সাদা শার্ট র’ক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। যা থেকে একটা বাজে দু’র্গন্ধ ভেসে আসছে। তবে আকাশের মাঝে কোনো ভাবান্তর নেই।
অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার সাথে করা আকাশের কান্ডেই বুঝেছে এর মাথায় আপাতত সন্ধ্যা ছাড়া অন্যকিছু নেই। এ যাচ্ছেও হসপিটাল। অরুণ,, নিয়াজ আর সৌম্যকে সন্ধ্যার ব্যাপারে জানিয়েছে। এজন্যই বাড়ি থেকে বেরতে দেরি হলো। আকাশকে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। আকাশের চোখমুখের অবস্থা ভালো না। কিছু বললে আবার কোন লাথি কোথায় লাগবে কে জানে! তাই নিরব থাকলো। তাছাড়া সন্ধ্যার জন্য ভীষণ টেনশন হচ্ছে।
আসমানী নওয়ান হসপিটালের সামনে গাড়ি দাঁড় করায়। এরপর দ্রুত গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। গাড়ির পিছনের দরজা খুলে সন্ধ্যাকে দেখল, মেয়েটার অবস্থা ভীষণ খারাপ। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে একা নিতে পারবে না। নিয়াজকে কল করে আসতে বলবে ভাবল। নিয়াজের নাম্বার ডায়াল করে ফোন কানে ধরে আশেপাশে তাকালে দেখল সৌম্য আর ইরা দ্রুত হসপিটালের ভিতর প্রবেশ করছে। আসমানী নওয়ান কল কেটে গলা উঁচিয়ে ডাকে,
“সৌম্য?”
আসমানী নওয়ানের কণ্ঠে নিজের নাম শুনে সৌম্য পিছু ফিরে তাকায়। সামনের একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে, “আমার বোনু কোথায়? আমার বোনু?”
এটুকু বলতেই গাড়ির ভেতর থেকে বোনুর আওয়াজ পেয়ে সৌম্য আর আসমানী নওয়ানের উত্তরের অপেক্ষা করেনা। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দু’হাতে সন্ধ্যাকে কোলে তুলে নেয়। দ্রুত পা চালায় হসপিটালের ভেতর। সৌম্য হাঁটতে হাঁটতে তাকায় তার বোনুর দিকে। সন্ধ্যার লাল চোখমুখ, ব্য’থায় নীলবর্ণ হয়ে আসা মুখ দেখে সৌম্য’র বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। সন্ধ্যা ভাইকে পেয়ে দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরে ফোঁপায়। বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ভাইয়া আমাকে বিশ্বাস কর, উনি আমার বাচ্চাকে মে’রে ফেলতে চায়। ভাইয়া??”
সৌম্য শুনতে পায় সন্ধ্যার কথা। সন্ধ্যার বলা কথার মানে না বুঝলেও সৌম্য তার বোনুকে বুকে চেপে বলে,
“তোদের কারোর কিচ্ছু হবে না বোনু। আমি আছি তো।”
সৌম্য’র পিছু পিছু ইরা আর আসমানী নওয়ান এগোয়। ওদিক থেকে খবর পেয়ে শিমু আর শিমুর মা-ও হসপিটাল এসেছে। মাত্র সিএনজি থেকে নেমে দাঁড়ায়। শিমু দৌড়ে এসে তার খালামণির হাত সাপ্টে ধরলে আসমানী নওয়ান শিমুকে আগলে নেয়। মেয়েটার মুখ শুকিয়ে গিয়েছে সন্ধ্যার খবর পেয়ে। যেভাবে ছিল সেভাবেই ছুটে এসেছে। শিমুর মা ‘তাঁরা’ ভাড়া মিটিয়ে তাদের পিছু পিছু আসে।
সৌম্য সন্ধ্যাকে নিয়ে দোতলায় এসে পৌঁছায়। যেখানে নিয়াজ স্ট্রেচার নিয়ে পায়চারি করছিল আর ঘড়ি দেখছিল। দেখে বোঝা যাচ্ছে, বাড়িতে যেভাবে ছিল সেভাবেই বেরিয়ে এসেছে। সৌম্য’র কোলে সন্ধ্যাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সৌম্য দ্রুত এগিয়ে এসে স্ট্রেচারে সন্ধ্যাকে শুইয়ে দেয়। দু’টো নার্স স্ট্রেচার নিয়ে যেতে নেয়, তখন সন্ধ্যা সৌম্য’র হাত টেনে ধরে। নিয়াজ ব্যাপারটি খেয়াল করে নার্সদের দাঁড়াতে বললে তারা দাঁড়ায়।
সৌম্য সন্ধ্যার দু’হাত তার হাতের মাঝে আগলে নিয়ে সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকে ধরা গলায় বলে, “কি হয়েছে বোনু?”
সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ভাইয়ের দিকে করুণ চোখে চেয়ে আদোআদো ব্য’থা’তু’র স্বরে বলে,
“আমি বেঁচে ফিরলে আমার বাচ্চার দায়িত্ব আমি একাই নিব। যদি আমার হায়াত এ পর্যন্ত-ই থাকে, তবে তুমি আমার বাচ্চাকে নিজের বাচ্চার মতো করে বড় কর ভাইয়া। তা না পারলে ওকে এতিমখানায় দিয়ে দিও। কিন্তু কোনো নিমকহারামের স্পর্শ যেন আমার বাচ্চার শরীরে না থাকে। যদি কেউ আমার কথার হেরফের করে, তবে তার সাথে আমার হাশরের ময়দানে কঠোর হিসাব-নিকাশ হবে।”
এটুকু কথা বলতে গিয়ে সন্ধ্যা কতবার যে থেমেছে৷ বহুক’ষ্টে কথাগুলো উচ্চারণ করে চোখ বুজে নেয়। সকলে সন্ধ্যাকে ঘিরে থাকায়, সন্ধ্যার বলা কথাগুলো সবাই শুনতে পায়। নিমকহারাম দ্বারা যে আকাশকে বুঝিয়েছে এটা সবাই বুঝেছে। সন্ধ্যা আকাশকে নিয়ে আর পা’গ’লামি না করলেও এ ধরনের কথা বলেনি। আজ হঠাৎ এমন কথা বলার কারণ বুঝল না। তবে আসমানী নওয়ান বোধয় বুঝল। কান্নারা উগলে আসতে চাইল। চোখ বুজে নিজেকে সামলে নিতে চায়।
সৌম্য সন্ধ্যার মাথায় একটা চুমু খেয়ে বেঁধে আসা গলায় বলে, “আমার বোনুর কিচ্ছু হবে না। আমি অপেক্ষা করছি। তুই ফিরে আয়৷”
সন্ধ্যা চোখ বুজে নিয়েছে। এই কঠিন মুহূর্তে এসেও নিজের উপর বিদ্রূপ হাসতে ভুলল না মেয়েটা। খুব করে চাইল, সে না বাঁচলেও তার বাচ্চাটা বাঁচুক। আর সে খুব সৌভাগ্য নিয়ে আসুক। তার মতো যেন তার সন্তানের ভাগ্যে এতো দুর্ভোগ না থাকে।
নিয়াজ তাড়া দিলে নার্সরা স্ট্রেচার নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়, যেখানে ডক্টররা অপেক্ষারত সন্ধ্যার। তারা সিচুয়েশন শুনেই বলেছে ইমিডিয়েট সিজার করতে হবে। নয়তো মা-বাচ্চা দু’জনের জীবন-ই ঝুঁকিতে।
সৌম্য ছটফটাল। বোনুর গলা অপারেশনের সময়-ও এতো ছটফট লাগেনি৷ তার বোনুর কিছু হলে সে নিঃশ্বাস নিবে কি করে? সৌম্য পরনের র’ক্তমাখা শার্ট খুলে ছুড়ে ফেলল। উদাম গায়ে ছুটল। যেখানে গেলে তার বোনুর জীবন ভিক্ষা পাবে, সে তো সেখানেই যাবে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে কি করে! বোনু জীবনের সাথে লড়বে, সে এই দু’হাত কাজে লাগাবে না? এ হয়? ঝাপসা চোখজোড়া বারবার দু’হাত দ্বারা ডলে পরিষ্কার করতে করতে সৌম্য বেরিয়ে যায় হসপিটাল থেকে। ইরা নিরবে দেখল সৌম্য’র প্রস্থান। সে বোধয় জানে, সৌম্য কোথায় ছুটল!
আকাশ হাসপিটালের সামনে এসে গাড়ি থামালে অরুণ কিছু না বলেই বেরিয়ে যায়। আকাশ সময় নিয়ে বের হয় গাড়ি থেকে। হসপিটালের দিকে তাকায়। মেয়েটি এখানেই আছে। ওর অবস্থা ভালো ছিল না। আকাশের ছটফট লাগে৷ সে দ্রুত পা চালায় হসপিটালের দিকে।
দোতলার করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছে আকাশ। তার ফ্যামিলির সবাইকে এখানে দেখল। কেন যেন আর সামনে এগোলো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আশেপাশের অনেকে বাঁকা চোখে আকাশকে দেখছে। আকাশের সেসবে ধ্যান নেই। ধ্যান বোধয় আপাতত অদৃশ্য সন্ধ্যাতে।
অপারেশন থিয়েটারে গাইনির ডক্টর আছে তিনজন। তাছাড়া নার্স। নিয়াজের সেখানে প্রয়োজন নেই। সে গাইনির ডক্টর নয়। তবে গাইনির ডক্টর হলেও সে থাকতো না। কারণ চক্ষুলজ্জা। সন্ধ্যাকে সে বোনের চোখে দেখে। সন্ধ্যাও তাকে ভাই মানে। দু’জনের জন্যই ব্যাপারটি ল’জ্জাজনক হত। এজন্য সে সব ব্যবস্থা করে দিয়ে বাইরে সবার সাথে অপেক্ষা করছে। আসমানী নওয়ানের থেকে বাসায় ঘটে যাওয়া কাহিনী শুনল নিয়াজ৷ সে নিজেও বুঝতে পারল না। সন্ধ্যার কাছে কেউ তো এসেছিল। আর সন্ধ্যার কথা অনুযায়ী আকাশ-ই। নিয়াজ একবার ভাবল, সন্ধ্যার মনের ভুল। আবার ভাবছে,, আসমানী নওয়ান-ও বুঝেছে কেউ এসেছিল তার ঘরে৷ আর ঘর থেকে বেরিয়ে আকাশকেই দেখেছে৷ কিন্তু আকাশ সন্ধ্যার বাচ্চাকে কেন মা’র’তে যাবে? তাও আবার লুকিয়ে? সৌম্য’র সাথে শ’ত্রু’তা-ই যেখানে সবাইকে দেখিয়ে করে। সেখানে এই কাজ লুকিয়ে করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সবচেয়ে বড় কথা আকাশের ক্যারেক্টারের সাথে এটা যায়না। নিয়াজ আকাশকে এতোটুকু তো চেনে।
ভাবনার মাঝেই নিয়াজের দৃষ্টি করিডোরের দিকে পড়লে আকাশকে চোখে পড়ে। সে উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে এসে আকাশের সামনে দাঁড়ায়।
আকাশ নিয়াজকে দেখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “মেয়েটি কোথায়?”
নিয়াজ তাকালো আকাশের ব্য’থিত মুখের দিকে। খেয়াল করল দু’র্গ’ন্ধযুক্ত র’ক্তমাখা শার্ট আকাশের পরনে। অথচ আকাশের ধ্যান-জ্ঞান এদিকে নেই।
নিয়াজ অবাক হলো না। আকাশ চলে যাবার পর সন্ধ্যা সবসময় বলত, ‘নিয়াজ ভাইয়া আপনি আমাকে মিথ্যে বলেছিলেন। আকাশ আমায় আর ভালোবাসেনা।’
নিয়াজ চুপচাপ শুনত। তার কাছে উত্তর ছিল না। কিন্তু এই আকাশকে দেখে মনে হলো তার কথা শুধু ১০০% নয় এক হাজার % সঠিক।
নিয়াজকে চুপ দেখে আকাশ নিয়াজকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে, “ও কোথায়, বল?”
নিয়াজ উত্তর দেয়, “অপারেশন থিয়েটারে।”
আকাশ ঢোক গিলে বলে,
“ও সত্যিই প্রেগনেন্ট ছিল?”
নিয়াজ উত্তর দেয়, “হুম
এরপর কণ্ঠে অবাকতা ফুটিয়ে বলে, তুমি জানতে না সন্ধ্যা প্রেগনেন্ট?”
নিয়াজের হুম শব্দটি শুনে আকাশের বুকে চিনচিন ব্য’থা হলো। ঢোক গিলে বলে, “জানতাম না।”
“কখন জেনেছ সন্ধ্যা প্রেগনেন্ট?”
“ঘরে গিয়ে ওকে মেঝেতে পড়ে কাতরাতে দেখে বুঝেছি।”
নিয়াজ অবাক হয়ে বলে,
“তুমি সত্যি বলছ?”
আকাশ রে’গে বলে,
“আমি মিথ্যা বলিনা।”
নিয়াজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে এই আকাশকেই চেনে। ওই ছেলেটা তবে আকাশ নয়। তাহলে ও কে? আর এই কথা সন্ধ্যা বিশ্বাস করবে তো!
আকাশ ছটফটানি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ও এখন কেমন আছে?”
নিয়াজ তাকায় আকাশের দিকে। ছেলেটা নিজেও জানেনা ও সন্ধ্যাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে! নিয়াজ যেমন হতাশ হয়, তেমনি খুশিও হয়।
তখনই একজন নার্স এসে নিয়াজকে জানায় সন্ধ্যা আর বাচ্চা আউট অফ ডেঞ্জার। তবে টাইম লাগবে সন্ধ্যা আর বাচ্চাকে কেবিনে দিতে। কথাটা শুনে নিয়াজ স্বস্তি পায়। আসলে নিয়াজ বলে রেখেছিল কিছুক্ষণ পর পর তাকে আপডেট জানাতে৷
আকাশ এপাশ-ওপাশ হাঁটছিল আর বুক ডলছিল। নার্সিটির কথা শুনে আকাশ দ্রুত এগিয়ে আসে। জিজ্ঞেস করে, “তুমি সত্যি বলছ?”
নার্সটি ছোট করে বলে, “জ্বি।”
আকাশ পকেট হাতড়ে একটা চেক পেয়ে না দেখেই সেটি নার্সটির দিকে বাড়িয়ে দেয়। নার্স চেকটি নিয়ে দেখল একটা ৫০ হাজার টাকার চেক। অবাক হয় সে। প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। আকাশ কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করল না। যেন কাউকে পাওনা মিটিয়ে দিল।
নিয়াজ আকাশের কান্ড দেখে হেসে ফেলে। নার্সটির উদ্দেশ্যে বলে,
“এটা তোমার। রাখো। আর সন্ধ্যাদের খবর বাড়ির লোকদের গিয়ে দাও।”
নার্সের মুখ চকচকে হয়ে ওঠে। একটা সামান্য খবর দিয়ে এমন মোটা অঙ্কের টাকা এই প্রথম পেল। সে খুশি মনে চলে যায়।
আকাশ বিরক্ত চোখে নিয়াজের দিকে চেয়ে আছে। নিয়াজ নিজেকে সামলে বলে, “ভালোই। চালিয়ে যাও।”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কি চালাবো?”
নিয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আকাশকে কিছু বললে স্বীকার করেনা। উল্টে রে’গে যায়। আকাশকে দোষ দেয়না সে। সবই ভাগ্য। অতঃপর গলা ঝেড়ে বলে,
“নাহ! কিছু না।”
আকাশ প্রশ্ন করে,
“মেয়েটির হাসবেন্ড কে? আর বাচ্চার বাবা কে?”
নিয়াজ মৃদু হাসল। আকাশের কাঁধে হাত রেখে বলে, “দেখা যাক, সন্ধ্যার হাসবেন্ড আর বাচ্চার বাবা নিজ থেকে কবে ওদের সামনে আসে। যেদিন আসবে, সেদিন তোমার সাথে সন্ধ্যার হাসবেন্ডকে পরিচয় করিয়ে দিব।”
আকাশের বুকের বা পাশটায় চিনচিন ব্য’থার পরিমাণ বাড়লো। নিয়াজ বলে,
“সন্ধ্যার হাসবেন্ড প্লাস সন্তান সত্যিই আছে ভেবে তুমি কি দুঃখ পাচ্ছো?”
আকাশ হসপিটাল থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, “মেবি, মেবি নট। আমি ভেবেছিলাম ও সিঙ্গেল।”
নিয়াজের হাসি দীর্ঘ হয়। আকাশ ভাবে তার জীবনের একমাত্র শ’ত্রু সৌম্য। এর কারণও জানে নিয়াজ। তাই এখানেও আকাশকে দোষ দিতে পারল না। অতঃপর বলে, “সিঙ্গেল ভেবে শ’ত্রুর বোনকে মনে জায়গা দিয়ে দিলে?”
আকাশের কাছে উত্তর নেই। বোবা মানবের ন্যায় সে এলোমেলো পায়ে সামনে এগোলো।
পেরিয়েছে প্রায় দু’ঘণ্টা। সকলে সন্ধ্যা আর বাচ্চার অপেক্ষায়। সৌম্য এখনো ফেরেনি।
এদিকে আকাশ বারবার সিঁড়ি উঠানামা করছে। তার ছটফট লাগছে অন্য কারণে। ছেলেটার হিসাবের খাতা আরো এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। আকাশের মাথা কাজ করেনা৷ তার হিসাবে তার মায়েদের প্রতিটি কথা মিথ্যা। মেয়েটি তার বউ নয়। আর তার বউ না হলে মেয়েটি অবশ্যই সিঙ্গেল। কিন্তু সিঙ্গেল মেয়ে তো কখনো প্রেগনেন্ট হয়না। তাহলে তো তার মায়েদের কথা সত্যি হলো। কিন্তু সবাই তাকে কেন এই মেয়েট হাসবেন্ড বানিয়ে দিচ্ছিল? দুনিয়া উল্টে গেলেও এই কথাটা আকাশের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। সে বিয়ে করার মতো ছেলেই নয়। তাহলে?
আকাশের হিসেবে,
সৌম্য তার বাবাকে খু’ন করেছে। কারণ সৌম্য লোভী। আর এই মেয়ে ওই ছেলের বোন। মেয়েটি ভাইয়ের কারসাজির ব্যাপারে কিছু জানেনা। মানুষ হিসেবে মেয়েটি ভালো। কিন্তু ছেলেটি অর্থাৎ সৌম্য ভালো নয়। সে তার বোন আর বউকে ভালো রাখতে তার বাবাকে খু’ন করেছে। কারণ তার বাবা সৌম্য’র কারসাজি অর্থাৎ সব সম্পত্তি নিজের নামে করার ব্যাপারে সবকিছু জেনে গিয়েছিল। এরপর তার বাবা মা’রা যাবার পর এরা তাদের বাড়ি থাকতে শুরু করেছে। আর এদের সাথেই তার ফ্যামিলির সবাই নাচে। আকাশ এসব মানতে পারেনা। এই হিসাবগুলো আকাশের মিললেও সন্ধ্যার প্রেগনেন্ট হওয়ার ব্যাপারটি কিছুতেই মিলছে না। আর সবচেয়ে বড় কথা সে মানতেই পারছেনা, সন্ধ্যার হাসবেন্ড কেন থাকবে? থাকা যাবে না। আকাশ মানতে পারছেনা। তার মাথা ব্য’থা শুরু হয়। রে’গে সিঁড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির রেলিঙে একটি জোরেসোরে লাথি দেয়।
নিয়াজ আকাশের পিছু পিছু আসছিল। আকাশকে এমন করতে দেখে দ্রুত পা চালিয়ে এসে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে,
“আকাশ কি হয়েছে?”
আকাশ নিয়াজের কলার ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে, “ওর হাসবেন্ড কোথায়?”
নিয়াজ থমথমে মুখে তাকায়। ঠিক কি রিয়েকশন দিবে সেটাই ভাবছে। নিজেকে সামলে বলে, “নেই।”
আকাশের হাত ঢিলে হয়৷ ভ্রু কুঁচকে বলে, “নেই মানে?”
নিয়াজ কি বলবে বুঝল না। আকাশ-ই সন্ধ্যার স্বামী এটা বললে আকাশ অনেক রিয়েক্ট করে। ভাবে, সবাই তাকে মিথ্যা বলছে। আকাশকে দেখে তার হাসিও লাগছে, দুঃখ-ও লাগছে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“মানে সন্ধ্যাকে রেখে চলে গেছে।”
“কোথায়?”
“তা তো জানিনা।”
“ডিভোর্স দিয়েছে?”
“না।”
আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “কেন?”
আকাশের প্রশ্ন সাথে বিরক্তিটুকু ধরতে পেরে নিয়াজ মনে মনে হেসে বলে, “জানিনা। তবে সন্ধ্যার হাসবেন্ড ওর কাছে ফিরতেও পারে, আবারও না-ও ফিরতে পারে।”
আকাশ চরম বিরক্তি নিয়ে বলে,
“ফিরতে হবেনা।”
আকাশের কথায় নিয়াজ এবার জোরে হেসে ফেলল। আকাশের দৃষ্টি দেখে নিজেকে সামলে বলে,
“স্যরি হ্যাঁ! সন্ধ্যা আর ওর বাচ্চার সুসংবাদ পেয়ে খুশিতে শুধু হাসি বেরিয়ে আসছে।”
আকাশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“ঠোঁটে সুপার গ্লু লাগাও। তাহলে আর অন্যের বউকে নিয়ে হেসে লা’জ’ল’জ্জা বিসর্জন দিতে হবেনা।”
নিয়াজের মুখ চুপসে যায়। তাকে অপমান করল আকাশ। সে বলে,
“তুমিও তো অন্যের বউকে নিয়ে সেই কখন থেকে ভাবছ।”
আকাশ বিব্রতবোধ করে। তবে খুব দ্রুত নিজেকে সামলে কাটকাট জবাব দেয়, “ভাবছি না।”
নিয়াজ হতবাক হয়ে যায়। কিভাবে মুখের উপর অস্বীকার করে! সে হতাশ কণ্ঠে বলে,
“এরকম সত্য কথা রোজ দু’একটা করে শুনলে আমার মনে হয় আর কটন কিনতে হবে না৷ কানের সব খোল তোমার সত্য কথার জোরে একা একাই বেরিয়ে আসবে।”
আকাশ বিরক্ত হয়। তবে কিছু বলে না। নিয়াজ আকাশের হাত ধরে টেনে উপরদিকে নিয়ে যায়। আকাশ বাঁধ সাধলে নিয়াজ বলে, “আরে এসো। সন্ধ্যা রিলেট কথা বলব।”
সন্ধ্যার কথা শুনে আকাশ আর কিছু বলল না। নিরবে নিয়াজের পিছু গেল। নিয়াজ তখন সবাইকে বলে গিয়েছে, সন্ধ্যা আর বাচ্চাকে কেবিনে দিলে সে আগে আকাশকে ওখানে নিয়ে যাবে। আসমানী নওয়ান বাঁধ সাধলে নিয়াজ বলেছে, তার উপর ভরসা রাখতে। সে সবকিছু সামলে নিবে। এরপর আর কেউ কোনো কথা বলেনি। মেনে নিয়েছে। আকাশ অস্বীকার করলেও কি? সন্ধ্যা আকাশের বউ, ছেলেটি আকাশের ছেলে,, এই সত্য তো আর বদলাবেনা।
নিয়াজ দোতলায় এসে শোনে, কয়েক মিনিট আগে সন্ধ্যা আর বাচ্চাকে কেবিনে দেয়া হয়েছে। দু’জনের কারো অবস্থাই তেমন ভালো নয়। এজন্য সবাইকে কেবিনে গিয়ে দেখে আসতে হবে। সন্ধ্যার অবস্থা বেশি খারাপ। ভীষণ দুর্বল হয়ে গিয়েছে মেয়েটি। পুরো চার ব্যাগ র’ক্ত লাগবে সন্ধ্যার। ম্যানেজও হয়ে গিয়েছে। প্রথম র’ক্তের ব্যাগ ঝুলিয়ে সন্ধ্যার হাতে ক্যানুলা লাগিয়ে ডক্টর ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
নিয়াজ আকাশকে নিয়ে ক্যাবিনের দরজা ঠেলে ভেতর প্রবেশ করে। আকাশ কিছু বলার আগেই তার দৃষ্টি আটকায় ডানপাশের বেডে শয়নরত সন্ধ্যার দিকে। দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি ঘুমিয়েছে। চোখমুখ ফোলা ফোলা। আকাশ ঢোক গিলল। ঘরের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। কি ভয়া’ন’ক অবস্থা হয়েছিল। আকাশ ভাবতেই পারেনা। কেমন যেন শিউরে ওঠে। নিজের ভাবনা প্লাস অনুভূতিতে বিরক্ত-ও হয়। কত বিভৎস দৃশ্য সে নিজে ক্রিয়েট করেছে, অথচ তখনকার ওইটুকুতে সে কেমন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। বিরক্তিতে আকাশ সন্ধ্যার দিকে দৃষ্টি রেখেই দু’দিকে মাথা নাড়ল।
নিয়াজ আড়চোখে আকাশের কান্ড দেখল। একটু হেসে মৃদুস্বরে বলে,
“এসো তোমাকে ওই বাচ্চাটাকে দেখাই। একটা ইউনিক ব্যাপার আছে বাচ্চার মাঝে। তুমি দেখলে ছোটোখাটো শক পাবে। এসো।”
আকাশের ভ্রু কুঁচকে যায়। কি এমন আছে ওই বাচ্চার মাঝে, যে সে শক পাবে? নিয়াজের কথামতো সে বাদিকে এগোয়।
ওদিকে সন্ধ্যা ঘুমায়নি, চোখ বুজে ছিল। কারো কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা চোখ মেলে তাকায়। ডানদিকে ঘাড় বাঁকালে চোখে পড়ে আকাশ তার বাচ্চার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে জানে ওপাশে তার বাচ্চা রাখা। সন্ধ্যার বুক কাঁপল। তার মনে হলো, আকাশ তার বাচ্চাকে মা’রার’র জন্যই এখানে এসেছে।
মেয়েটার শরীর ভীষণ দুর্বল, তবে কণ্ঠে ঝাঁঝ ঢেলে যেটুকু পারল চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার আমার বাচ্চার দিকে এগোবেন না।”
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১০
আকাশের পা থেমে যায়। ঘাড় ঘুরে যায় সন্ধ্যার দিকে। কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে।
নিয়াজও সন্ধ্যার দিকে তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও বলল না। দেখুক আগে এরা কি করে! তারপর নাহয় সে অ্যাকশন নিবে।
আকাশ তার গতি বামদিক থেকে ঘুরিয়ে ডানদিকে অর্থাৎ সন্ধ্যার বেডের দিকে নেয়। কয়েক পা এগিয়ে এসে দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে দাঁড়ায়। দৃষ্টি সন্ধ্যার চোখে নিবদ্ধ রেখে গম্ভীর গলায় বলে,
“বাচ্চা, বাচ্চার বাবা কারো প্রতি আমার ইন্টারেস্ট নেই। ইন্টারেস্ট বাচ্চার মাকে ঘিরে।”
আকাশের কথায় নিয়াজ কেশে ওঠে। ডান হাত তুলে ঘাড় চুলকে বিড়বিড় করে, “ক্যালকুলেশনটা খারাপ না!”
