Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৭

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৭

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৭
DRM Shohag

আকাশের কথাটায় সন্ধ্যা কোনো রিয়েকশন দিল না। তার সৃজনের জন্য ভীষণ চিন্তা হচ্ছে৷ আকাশ কি করেছে তার ছেলেকে? সন্ধ্যা ঢোক গিলে শ’ক্ত গলায় বলে, “আমার ছেলে কোথায়?”
আকাশ নির্বিকার হয়ে সন্ধ্যার পানে চেয়ে। যেটা সন্ধ্যার বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। সে আবারো চেঁচিয়ে বলে,
“আমার ছেলেকে কি করেছেন আপনি? বলুন?”
আকাশ বরাবরের মতোই নির্বিকার। সন্ধ্যার অসহ্য লাগে। বুকটা ছটফট করে তার ছোট্ট প্রাণটার জন্য। কি করবে ভেবে পায়না।
হঠাৎ-ই আকাশের পকেটে থাকা ফোন বেজে ওঠে। অবাক করার বিষয় হলো, ফোনের রিংটোনে কোনো মিউজিক না বেজে, বেজে ওঠে সন্ধ্যার কণ্ঠে বলা কিছু কথা,

‘সন্ধ্যামালতীকে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আমার শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালার নেই।
আমি অস্তিত্বহীন কারো জন্য পা’গ’লা’মি করিনা। আমি আমার শুভ্র-পুরুষের জন্য পা’গ’লা’মি করি। যার অস্তিত্ব আছে। পুরোপুরি আছে। আপনি অস্বীকার করলেই সব মিথ্যে হয়ে যাবে না।’
এটুকু কথা স্বাভাবিক এর চেয়ে একটু দ্রুত বারবার রিপিট হচ্ছে। সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় আকাশের দিকে। বোঝা যাচ্ছে কথাগুলো ফোনে বাজছে। আর সেটা আকাশের দিক থেকেই আসছে।
আকাশ দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করে কল কেটে দেয়। শুকনো ঢোক গিলে সন্ধ্যার দিকে তাকালে, চোখে পড়ে সন্ধ্যার বিস্ময় দৃষ্টি। আকাশ বিব্রতবোধ করে। উল্টো ঘুরে সন্ধ্যার থেকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে ডানদিকে ফিরে তাকায়।

আকাশের করা কান্ডে সন্ধ্যা বিস্মিত’র উপর বিস্মিত হয়। স্পষ্ট দেখল আকাশ ব্যস্ত হাতে ফোন কেটে তার সামনে থেকে যেন পালালো। আকাশ এমনটা কেন করল? সন্ধ্যা বুঝতে পারেনা।
তার মনে আছে, আকাশ হারিয়ে যাওয়ার পর প্রথম আকাশকে খুঁজে পেয়ে সন্ধ্যা আকাশের জন্য এভাবে পা’গ’লা’মি করে আরও অনেক কথা বলতো। সেগুলোর মাঝেই এই কথাগুলো ছিল। কিন্তু তখন তো আকাশ তার সাথে খুব দুর্বব্যবহার করত। কিন্তু এখন সেই কথাগুলো আকাশের ফোনে রেকর্ড হয়ে অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে কি করে? সন্ধ্যা দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে একদম আকাশের সম্মুখ বরাবর দাঁড়ায়। বিস্ময় দৃষ্টি রাখে আকাশের বিব্রতকর মুখপানে।
সন্ধ্যাকে নিজের সামনে দেখে আকাশ গলা ঝাড়ল। বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“কি প্রবলেম? দূরে সরে দাঁড়াও। আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি, জনোনা?”
আকাশের কথা সন্ধ্যা শুনলো কি-না কে জানে! সে তো আকাশের করা কাজে হতবাক হয়ে গিয়েছে। আকাশ মাঝে মাঝে অদ্ভুদ কথা বলে। ওইতো সকালের দিকে ডিএনএ’র ব্যাপারে একটা অদ্ভুদ কথা বলেছিল। আর এখন…সন্ধ্যার মস্তিষ্ক এলোমেলো লাগে। শুকনো ঢোক গিলে বলতে নেয়,

“আপনি…..
এটুকু বলতেই আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার মুখ চেপে ধরে। থমথমে মুখে সন্ধ্যার চোখে চোখ রেখে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। এরপর সন্ধ্যার দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে সন্ধ্যার মুখ বরাবর তার মুখ রেখে চাপা স্বরে বলে,
“সাঁতার না জানা ব্যক্তিটাই কেবল জানে, গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা ঠিক কতখানি! আর সেই যন্ত্রণা বাড়ানোর জন্য সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ানো আপন মানুষগুলোর বিতৃষ্ণা ভরা মুখগুলোই যথেষ্ট,, যারা জেনেবুঝে ভুলে যায়, গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া মানুষটা সাঁতার জানেনা।”
কথাটা বলে আকাশ সন্ধ্যার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। দৃষ্টি ফিরিয়ে হাতের ফোনে নিবদ্ধ করে। সম্পূর্ণ মনোযোগ সেখানে দেয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু আকাশ কথাটা দ্বারা কি বোঝালো? সন্ধ্যা কি বুঝল? বুঝল না বোধয়, আবার মনে হলো খুব বুঝল। আকাশের এক্সিডেন্টে টা যে হবে, এটা তো আকাশ জানতো না৷ আর না তো জানতো সে তার স্মৃতি হারাবে। স্মৃতি হারিয়ে সন্ধ্যা আর তার ভাইয়ের সাথে কতই না অমানবিক আচরণ করেছে। আজ সকালেও তো করেছে। এখন তার বাচ্চাটাকেও ছাড়ছে না। কিন্তু আকাশ থেকে থেকে এমন কথা কেন বলে, যেন আকাশ সবকিছু জেনেবুঝে করছে। এই যে মাত্র বলা আকাশের কথাটা দ্বারা আকাশ কি এটা বোঝালো না যে, সে আকাশের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভুল করেছে। কিন্তু সে আর কত সহ্য করবে? বারবার তার প্রিয় মানুষগুলোকে খু’ন করতে যাওয়া মানুষের দিকে সে ঠিক কতক্ষণ ভালোবাসার নজরে তাকাবে? এসব ভাবনার চেয়ে বেশি ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, আকাশ এমন কথা কেন বলছে, যেখানে আজও আকাশের কিছু মনেই পড়েনি৷ সন্ধ্যা সেই কবেই আশা ছেড়ে দিয়েছে। সে মেনে নিয়েছে তার ভালোবাসার আকাশ হারিয়ে গিয়েছে। ম’রে গিয়েছে। যে আকাশ তাকে ভীষণ ভালোবাসতো। ভীষণ। সে আর ফিরবে না। কিন্তু এতোগুলো বছর পর হঠাৎ কোথা থেকে আকাশ তার সামনে এসে মাঝে মাঝে সেই আগের আকাশের মতো উঁকি দিচ্ছে?

এতো এতো কথা ভেবে সন্ধ্যার চোখদু’টো ভরে ওঠে। এতোগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর আজকের দিনগুলোয় দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা মনে হয়, ‘আকাশ তার জীবনে ফিরবে’, এর চেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন আর কিছু হতে পারে না। ভাবনার মাঝেই আকাশ তার ফোন সন্ধ্যার সামনে ধরে। ফোনের ওপাশ থেকে নিয়াজ হাঁপানো কণ্ঠে বলে,
“আকাশ কি করছ তুমি এসব? সৃজনকে কাদের কাছে দত্তক দিচ্ছ তুমি? আমি কিছুতেই বাচ্চা ছেলেটিকে আটকে রাখতে পারলাম না। এতো কাঁদছিল ও। প্লিজ এরকম কর না আকাশ! একটাবার আমার কথা শোনো। আকাশ আ…..
আকাশ কল কেটে দেয়। দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে। সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় আকাশের দিকে। এতোক্ষণের সব ভাবনায় এক বালতি জল ঢেলে পড়ল মনে হলো। যেটুকু জলকণা চোখজোড়ায় ভরে ছিল, এর উপর আরও খানিক জলকণা ভরে গড়িয়ে পড়ে দু’গালে। তার সৃজনকে কার কাছে দত্তক দিয়ে দিয়েছে আকাশ? তার সৃজন কাঁদছিল? খুব কাঁদছিল তাই না? নিশ্চায়ই মা মা বলে খুব করে ডাকছিল তাকে। এখনও হয়ত ডাকছে। সন্ধ্যার দমবন্ধ লাগে। ধরা গলায় বলে,

“আমার সৃজনকে কার কাছে দিয়েছেন আপনি? এমন করবেন না। ওকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন। দয়া করুন!”
কথাটুকু বলতে বলতে সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে আরও কয়েকফোঁটা জলকণা গড়িয়ে পড়ে। আকাশ সন্ধ্যার দিকে নির্বিকার ভঙ্গিতে চেয়ে রয়। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“শর্ত অনুযায়ী তোমার ভাই বাড়ি ফিরছে। আর তোমার ছেলে দত্তক থাকছে। শর্তের বাইরে কিছু করিনি আমি। তাই আমার কাছে অযথা রিকুয়েষ্ট না করাই বেটার। ওকে?”
সন্ধ্যা মানলো না। সে রা’গ করতে চাইলো৷ খুব রা’গ দেখাতে ইচ্ছে করল আকাশকে। খুব শ’ক্ত কথা শোনাতে ইচ্ছে করল। কিন্তু সে কেন যেন এসব পারলো না। ওভাবে সে সৃজনকে পাবে না। কোথায়, কার কাছে তার ছেলে আছে, সে যে কিচ্ছু জানেনা। সন্ধ্যা দু’হাত একসাথে জমা করে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“শুধু আমার বাচ্চাকে ঘিরে শর্তটি তুলে নিন প্লিজ! আমি আপনার সব কথা শুনবো৷ দয়া করে আমার সৃজনকে আমার থেকে কেড়ে নিবেন না। প্লিজ ওকে দিয়ে দিন আমাকে।”

সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। সে কত করে চাইল এই জলকণাগুলো বের না করতে। কিন্তু সে ব্যর্থ। সে ভেঙে যাচ্ছে। আবারো সে ভেঙে যাচ্ছে। তার সৃজন হারিয়ে গেছে। অন্যকেউ তার সৃজনকে নিয়ে গেছে। ও অন্যদের পরিচয়ে বড় হবে? সে যে তার ছোট্ট প্রাণ ছাড়া থাকতে পারে না। তার বাঁচার নতুন পথ তার সৃজন। সে চলে গেলে সন্ধ্যার কি করে চলবে?
আকাশ সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। দ্রুত সন্ধ্যার মুখ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। উল্টোদিকে ঘুরতে নেয়, কিন্তু সন্ধ্যা দু’হাতে আকাশের কোর্টের কলার টেনে ধরে ভেজা কণ্ঠে বলে,
“প্লিজ আমার এই কথাটা রাখুন। সৃজন আমাকে ছাড়া কখনো থাকেনি৷ ও ভীষণ কাঁদছে আমি জানি। দয়া করে আমার বাচ্চাটাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। আমি. আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি আপনার সব কথা শুনবো। দয়া করুন!”

আকাশের দৃষ্টি এলোমেলো। সে সন্ধ্যার চোখে তার চোখ স্থির রাখতে পারেনা। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। চোখ বুজল সে। বড় করে দু’বার শ্বাস নিয়ে চোখ মেলে তাকায়৷ সন্ধ্যার কান্নামাখা মুখের দিকে চেয়ে ঢোক গিলল আকাশ। ডান হাত বাড়িয়ে তার কোর্টের রাখা সন্ধ্যার হাত দু’টো সরিয়ে দেয়। একটা শব্দও উচ্চারণ করল না মুখ দিয়ে। সন্ধ্যাকে সরিয়ে দিয়ে শক্ত পাথরের ন্যায় উল্টোদিকে ফিরে দু’পা এগোলে সন্ধ্যা চেঁচিয়ে ওঠে,
“একটা জা’নো’য়া’র তুই। মায়ের কোল খালি করতে একটুও বুক কাঁপে না, তাই না?
কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যা আবারো আকাশের সামনে এসে দাঁড়ায়। দু’হাতে আকাশের বুকে গায়ের জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে বলে,
আমার সৃজনকে ফেরত না দিয়ে কোথাও যেতে পারবিনা তুই। আমি ওকে খুব কষ্ট করে বড় করেছি। ও ও আমার খুব যত্নের।
কথাগুলো বলতে বলতে সন্ধ্যা ভেঙে আসে। এগিয়ে এসে আবারো আকাশের কাছে দু’হাত জমা করে জমা করে অনুরোধ করে,

একটু দয়া করুন। আমার সৃজনকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন। ওকে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারিনা। আমি একদম ম’রে গিয়েছিলাম। ও আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছে। ও হারিয়ে গেলে আমি এবার সত্যিই ম’রে যাবো। আমার বেঁচে থাকার একটা অবলম্বনকে কেড়ে নিবেন না। আপনার মায়ের র’ক্ত আপনি। আপনার মা খুব ভালো মনের মানুষ। আপনি তার ছেলে হয়ে একটা মায়ের কোল খালি করবেন কি করে, বলুন? পারবেন না আপনি, তাইনা? ওকে এনে দিন আমার কাছে।
কথাগুলো বলতে বলতে সন্ধ্যা আকাশের পায়ের কাছে বসে পড়ে৷ দু’হাতে আকাশের বাম পা জড়িয়ে ধরে কান্নামাখা গলায় বিড়বিড়িয়ে বলে,

“আমার সৃজনকে এনে দিন। আমার শক্তিকে আমার থেকে কেড়ে নিয়ে আমাকে আর দুর্বল করবেন না। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। দয়া করে আমার বাচ্চাটাকে আমার কোলে দিয়ে দিন।”
এক ছেলের বাবার কাছে, সেই ছেলেরই মায়ের কি করুণ আকুতি! দত্তক দেয়া মানে যে ছেলেকে অন্যের ছেলের নামে দলিল করা, এ কথা তো সন্ধ্যা খুব বোঝে। তার সৃজনকে, তার পেটের সন্তানকে, তার ভালোবাসার অংশকে সে কি করে হারাতে দিবে? আর ক’বছর গেলে যে সে সৃজনকে আর চিনতেও পারবে না।

আকাশ শ’ক্ত রোবটের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি কোন অজানায় কে জানে! চোখদু’টো টকটকে লাল। বুক চেপে আসছে। অথচ উপর থেকে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এক পাথরের মূর্তি, যার নেই কোনো অনুভূতি, নেই কোনো চাওয়া, নেই কোনো পাওয়া। সে শুধু মানুষকে কাঁদিয়ে বেড়ায়। যার মধ্যে অন্যতম তার এককালের সন্ধ্যামালতী। আকাশ লালিত দৃষ্টিজোড়া এদিক-ওদিক ঘোরালে চোখে পড়ে তাদের থেকে কয়েক হাত দূরত্বে জেডি দাঁড়ানো। যার বিস্ময় দৃষ্টি আকাশ আর সন্ধ্যার পানে। জেডি বেশ অনেকক্ষণ আগেই এদের দেখেছে৷ সন্ধ্যার কথাগুলোও শুনেছে, সাথে সবকিছু বুঝেছেও। সে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে আকাশের সামনে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে চেয়ে বলে,
“এভি তুই মেয়েটার বাচ্চাকে কি করেছিস? মেয়েটা আর বাচ্চা ছেলেটা তোর কি এমন ক্ষ’তি করেছে এভি? ওদের সাথে কেন এমন করছিস?”

আকাশ নির্বিকার। দৃষ্টি জেডির পানে। জেডি আকাশকে চুপ দেখে বিরক্ত হয়ে বলে, “এভি সৃজনকে কার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিস? বলে দে। মেয়েটা কাঁদছে।”
আকাশ ঢোক গিলে শক্ত গলায় শব্দ করে বলে, “ইম্পসিবল!”

কথাটা সন্ধ্যার কানে গেল। বুকটা হু হু করে উঠল। তবে কি সে সত্যিই তার সৃজনকে হারিয়ে ফেলল? এবার সৃজন বড় হতে হতে তাকে ভুলে যাবে? তার মাকে ভুলে যাবে? সন্ধ্যার দম আটকে আসে। সে কি করবে এবার? সন্ধ্যা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে। তার সৃজন হওয়ার আগেই তার ম’রে যাওয়া উচিৎ ছিল। অথচ আল্লাহ তাকে দুঃখ দেয়ার জন্য আবারো বাঁচিয়ে রাখলো। সন্ধ্যার চোখমুখ লাল হয়ে আছে। দৃষ্টি আকাশের দিকে রাখে। আকাশ সন্ধ্যার দিকেই চেয়ে ছিল বিধায় দু’জনের চোখাচোখি হয়। সন্ধ্যার শরীরটা ঢুলছে। কিন্তু সে যথাসম্ভব নিজেকে সামলে নিতে চাইল। এই সন্ধ্যা কারো কাছে হাত পাতা তো দূর মুখ ফুটে কিছু চায়ও না। আজ সে তার বাচ্চাকে ফিরে পেতে আকাশের কাছে হাতজোর করেছে। পা পর্যন্ত ধরেছে। সে আকাশের ক্ষমতা সম্পর্কে জানে। এই ক্ষমতাশালী আকাশের কাছে সে আর তার ছেলে টিস্যু পেপারের চেয়েও নগণ্য, সন্ধ্যা এটাও জানে। এমন মানুষের থেকে তার ছেলেকে কি করে পাবে মাথা কাজ করছিল না। একটা অনুভূতিহীন যন্ত্রের মতো রোবটের পায়ে পড়ে ছেলেকে ফিরিয়ে চেয়েছে। নিজের মান কমিয়েছে। এতে তার দুঃখ নেই। দুঃখ একটাই। এতোকিছুর পরও লোকটির মুখ থেকে বের হওয়া ‘ইম্পসিবল’ শব্দটি। সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে, “অ’মানুষ।”

সন্ধ্যার বলা শব্দটি আকাশ আর জেডি দু’জনেই শুনতে পেয়েছে৷ আকাশ কোনো রিয়েক্ট করল না। চুপচাপ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে রইল।
সন্ধ্যা আকাশের শরীর লক্ষ্য করল। কাঙ্ক্ষিত জিনিস চোখে পড়ল না। কিছু একটা ভেবে ঘাড় ঘুরিয়ে জেডির দিকে তাকায়। জেডির কোর্টের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে পি’স্ত’ল। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি সন্ধ্যার চোখে পড়তেই সে চোখের পলকে জেডির কোমরে গুঁজে রাখা পি’স্ত’লটি টান মে’রে, দু’হাতে ধরে রেখে আকাশের দিকে তাক করে ধরে। রাগান্বিত স্বরে বলে,

“আমার বাচ্চাকে আমার কাছে এনে না দিলে, তোকে একদম খু’ন করে ফেলব আমি।”
আকাশ, জেডি দু’জনেই সন্ধ্যাকে লক্ষ্য করছিল। সন্ধ্যা হঠাৎ এমন কাজ করবে কেউই বুঝতে পারেনি। জেডি একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায় তো একবার সন্ধ্যার ধরে রাখা পি’স্তলের দিকে। বিড়বিড় করে, “কি ডেঞ্জারাস!”
এদিকে এতোক্ষণ আকাশ নির্বিকার থাকলেও, এবার সন্ধ্যার কান্ডে সামান্য ঠোঁট বাঁকালো। এগিয়ে এসে একদম সন্ধ্যার মুখোমুখি দাঁড়ায়। সন্ধ্যার তাক করে রাখা পি’স্তলটি তার বুক বরাবর ছুঁইছুঁই। আকাশ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। সে সন্ধ্যার ভেজা শ’ক্ত মুখের দিকে চেয়ে গলা নামিয়ে বলে,

“মেয়ে মানুষ গিরগিটির মতো রঙ বদলায়। কিন্তু মনে একবার ভালোবাসার ফুল ফুটলে, তখন তারাই আবার রঙ বদলাতে ভুলে যায়। মাঝে মাঝে আবার তাদের নীতিও বদলে যায়। এই যেমন, কোনো এক সাহসী মেয়ে সবাইকে শা’স্তি দিতে পারলেও বিশেষ মানুষের কাছে গিয়ে ঠেকে যায়।
মনের মানুষকে যদি অপরাধী হিসেবে শা’স্তি প্রদান করতে হয়, তাহলে সেই মারাত্মক সাহসী মেয়েটাই ভীষণ ভীতু হয়ে যায়। পি’স্ত’ল তাক করলেই হাত কাঁপে। ট্রিগারে আঙুল রাখলে না আবার হার্ট ব্লক হয়ে যায়। একটু সাবধানে হ্যাঁ?”
সন্ধ্যার চোখেমুখে বিস্ময় ভর করে। আকাশ কথাটা দ্বারা কি বোঝালো?
আকাশ একটু থেমে আবারো বলে,

আমাকে মে’রে ফেলার অপশনে পরে যাও। আগে তোমার হাতের কাঁপাকাঁপি স্টপ করতে সাকসেস হও কি-না দেখো। এরপর ট্রিগারে আঙুল রাখতে হবে। চাপ দিতে হবে। দৃষ্টি আমার দিকে রাখতে হবে। এখনো অনেক কাজ বাকি।”
এবার সন্ধ্যা একা অবাক হয়নি, অবাক হয়েছে জেডিও। সে আকাশের উদ্দেশ্যে বলে, “পা’গ’লের মতো কি বলছিস? তুই সন্ধ্যার মনের মানুষ হতে যাবি কেন?”
আকাশ বিরক্ত চোখে তাকায় জেডির দিকে। জেডি অবাক হয়ে আকাশকে দেখছে। আকাশ কিছু বলল না। সে আবারো সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলে,
“শুরু কর। আমি ওয়েট করছি।”
কথাটা বলার সাথে সাথেই একটি বিকট শব্দ হলো। আওয়াজটি যে গু’লির এটা আকাশ আর জেডি খুব ভালো করেই বুঝল। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। তার এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সন্ধ্যাই তার বুকে গু’লি চালিয়েছে। সেইম ভাবনা জেডিও ভেবেছে। সে ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছে,
“এভি???”

কিন্তু অবাক করার বিষয় আকাশ দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। তার বুকেও বিন্দুমাত্র আ’ঘা’ত পায়নি সে। কিন্তু তার সামনে দাঁড়ানো সন্ধ্যার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে বলে মনে হলো। সন্ধ্যার হাত থেকে পি’স্ত’ল ঠাস করে পড়ে যায়। সন্ধ্যার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ আকাশের পানে। মেয়েটা আর দাঁড়ানোর শক্তি পায় না৷ চোখ বুজে আসে। পড়ে যেতে নিলে জেডি সন্ধ্যাকে ধরতে নেয়, তার আগেই আকাশ ডান হাতে জেডিকে একটা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বা হাতে সন্ধ্যাকে তার সাথে চেপে ধরে। কিন্তু তার বা হাতে গু’লি বিঁধেছিল বিধায় সে সন্ধ্যাকে একহাতে ঠিক করে আগলে নিতে পারলো না। সে সহ সন্ধ্যা রাস্তায় পড়ে যায়। আকাশের শরীর থরথর করে কাঁপছে। ডান হাতে সন্ধ্যাকে টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরে। কি হলো, হচ্ছে কিছু বোঝার সুযোগটুকুও পেল না। সন্ধ্যাকে শক্ত করে বুকে চেপে আকাশ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে চিৎকার করে বলে ওঠে,

“ওই কোন কু’ত্তা’র বাচ্চা আমার জানের দিকে গু’লি চালিয়েছিস?”
কথাটা বলতে বলতে আকাশের গলা ধরে আসে। সন্ধ্যা চোখ মেলে তাকাতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। বহুকষ্টে বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করে, “আ.আ.আমার আআব্বা, আমার সৃজন আআব্বা।”
এটুকু বলতেই সন্ধ্যা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। নিস্তেজ শরীরটার অর্ধেক আকাশের বুকে, বাকিটুকু রাস্তায় পড়ে থাকে। আকাশ সন্ধ্যা একেবারে শরীর ছেড়ে দিতে দেখে ডান হাতে সন্ধ্যার গালে আলতো থা’প্প’ড় দিতে দিতে বলে,
এ্যাই চোখ খোল বে’য়া’দ’ব মেয়ে। তুই না সাহসী মেয়ে! তবে এভাবে চোখ বুঝে ফেললি কেন? তোর বাচ্চাকে দত্তক দিয়ে দিয়েছি আমি। আমাকে গা’লি দে। অ’মানুষ বল, জা’নো’য়া’র বল।”
জেডি আকাশ আর সন্ধ্যার দিকে অদ্ভুদভাবে চেয়ে ছিল এতোক্ষণ। সন্ধ্যাকে নিস্তেজ হয়ে যেতে দেখে ঢোক গিলল। এরপর সে দ্রুত পিছনে দাঁড়ানো তার গার্ডগুলোর দিকে তাকায়। বড়বড় পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেলে সকলে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলে,

“আমরা গু’লি চালাইনি বস।”
জেডি সে কথা শুনলো কি-না! সে গার্ডগুলোকে পাস করে একপ্রকার দৌড়ে সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা তার গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়। দ্রুত ড্রাইভিং সিটে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ঝড়ের গতিতে গাড়িটি আকাশের পাশে এসে দাঁড় করায়। এরপর সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“এভি ওকে গাড়িতে ওঠা। ফাস্ট।”
আকাশ চোখ তুলে তাকায়। চোখদু’টো লাল টকটকে হয়ে আছে। চোখদু’টো ভেজা কি? জেডি ঠিক ধরতে পারলো না। তবে এক মুহূর্তের জন্য জেডির এমনটাই মনে হলো। এমন আকাশকে দেখে সে শুকনো ঢোক গিলল।
আকাশ সন্ধ্যাকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইছে কিন্তু পারছে না। তার বা হাত অবশ হয়ে আসছে। আকাশ সন্ধ্যা নিস্তেজ মুখটার পানে চাইল। দৃষ্টিজুড়ে চরম অসহায়ত্ব।
জেডি বুঝতে পেরে মৃদুস্বরে বলে,

“এভি, আমি হেল্প করি?”
আকাশ শ’ক্ত গলায় বলে, “খবরদার!”
জেডি চুপ হয়ে গেল। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। আকাশ নিজেকে সামলে খুব ক’ষ্টে বা হাতে অল্প ভর নিয়ে, ডান হাতে বেশিরভাগ ভর নিয়ে সন্ধ্যাকে কোলে নিয়ে দাঁড়ালো। এটা দেখে জেডি দ্রুত গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিলে আকাশ সন্ধ্যাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। জেডি গাড়ির দরজা আটকে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
আকাশের স্থির দৃষ্টি সন্ধ্যার মুখপানে। ধরা গলায় বলে,

“জ্যাক, ফাস্ট গাড়ি চালা।”
জেডি হাই স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে৷ তবে আকাশের জ্যাক নাম নেয়ায় ভীষণ অবাক হয়। তাদের মাঝের ঝামেলা মেটেনি। কিন্তু আকাশ সন্ধ্যার জন্য যেন তার সাথে হওয়া ঝামেলাটাও ভুলতে বসেছে৷ জেডি একবার গাড়ির আয়নায় তাকিয়ে আকাশকে দেখে৷ এরপর রাস্তায় দৃষ্টি রেখে জিজ্ঞেস করে,
“মেয়েটি তোর কে এভি?”
আকাশ ডান হাতের বুড়ো আঙুল সন্ধ্যার বাম গালে আলতো করে বুলায় আর ভাঙা স্বরে আওড়ায়,
“ও আমার সব জ্যাক।”
কথাটা শুনে জেডি একটু হাসলো বোধয়। শুকনো ঢোক গিলে গাড়ির স্পিড বাড়ালো।

সন্ধ্যাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গিয়েছে। বাইরে দাঁড়ানো আকাশ আর জেডি। অপারেশন থিয়েটারে নিয়াজ আছে। সে সার্জারীর ডক্টর। এজন্য সে সব কাজ ফেলে সন্ধ্যাকে হসপিটাল আনা মাত্র অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। জেডি একটু পর পর আড়চোখে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশের বা হাত গু’লিবিদ্ধ। কিন্তু আকাশ সে হাতের চিকিৎসা না করিয়ে সেই তখন থেকে স্ট্যাচু হয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কোনো রোবট। জেডি আকাশকে অনেকবার বলেছে হাতের একটু ট্রিটমেন্ট করাতে। কিন্তু আকাশ শুনেও শোনেনি। একপর্যায়ে সে বেশি জোর করলে আকাশের ডান হাতের একটা শ’ক্ত থা’প্প’ড় খেয়ে চুপ হয়ে গিয়েছে।

কিছুক্ষণের মাঝেই নিয়াজ অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসে। একদম সামনে আকাশকে দেখে সে না দেখার ভান করে চলে যেতে নিলে আকাশ ডান হাতে নিয়াজকে টেনে তার সামনে এনে বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ও কেমন আছে? ওর কি লাইফ রিস্ক আছে? কোথায় গু’লি লেগেছে?”
নিয়াজ রাগান্বিত স্বরে বলে,
“ম’রে গেছে ও। তোমার শান্তি হয়েছে? বিশ্বাস না হলে নিজের হাতে গিয়ে গলা টিপে এসো যাও। দরজা খোলা আছে।”
পাশ থেকে জেডি রে’গে বলে,

“নিয়াজ লিমিট ক্রস করনা।”
নিয়াজ জেডির দিকে চেয়ে রে’গে বলে,
“আমি লিমিট ক্রস করছি? তোমার বন্ধু আজ কয়টা বছর হলো মেয়েটার শান্তি ভেজে ভেজে খাচ্ছে। আর কত? ও মানুষ না? ওর মন নেই? কষ্ট হয়না ওর?”
জেডি কি বলবে বুঝল না। সে বোধয় উত্তর দিতে চাইলেও পারলো না।
এদিকে আকাশ নিয়াজের কথায় কোনো রিয়েক্ট করল না। উল্টে নিয়াজের দিকে চেয়ে বেঁধে আসা গলায় বলে,
“তোমরা সবাই কেন ভাবো, আমি খুব শান্তিতে আছি!”
কথাটা শুনে নিয়াজের রা’গের ঘোর কাটে। অবাক চোখে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশের মুখে এমন কথা সে এক্সপেক্ট করেনি। আকাশ নিয়াজকে ঠেলে থিয়েটারের ভেতর দিয়ে চায় আর বলে, “ওকে সুস্থ কর। ফাস্ট করবে। নয়তো তুমি জিন্দা থাকবে না।”
লাস্ট কথাটা শক্ত শোনালো। নিয়াজ বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “মানুষকে মারার কাজটা খুব ভালো পারো। এটা ছাড়া আর কিছু কি পারো?”

আকাশ এবার ডান হাতে নিয়াজের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আমি জানি, আমি খারাপ মানুষ, এটা বারবার মনে করাতে হবে না তোমাকে। তুমি তোমার কাজ কর। আমার ওয়াইফকে সুস্থ কর, গো।”
কথাটা বলে নিয়াজের কলার ছেড়ে নিয়াজকে একটা ধাক্কা দেয়। নিয়াজ এক পা পেছায়। বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“সন্ধ্যা তোমার ওয়াইফ?”
জেডিও বিস্ময় চোখে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশ খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর করে,
“ও সুস্থ হলে আমাদের বিয়ে হবে। আপাতত আমার মনের ওয়াইফ।”
নিয়াজ বিদ্রূপ হাসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তুমি কি জানো, সন্ধ্যাকে দু’দু’টো গু’লি করা হয়েছে। ওর অবস্থা একটুও ভালো নয়, বুঝলে?”

কথাটা বলতে গিয়ে নিয়াজের গলা বেঁধে আসে। এদিকে আকাশের কথাটা হজম হয়না। সে ডান হাত এগিয়ে নিয়ে নিয়াজের গলা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
“ওর অবস্থা ভালো নয় মানে কি? অবস্থা ভালো করবি তুই। কানে শুনতে পাস না? ওকে আজকের মধ্যে সুস্থ করে দিবি। আজকের মধ্যে…
জেডি আকাশকে টেনে সরিয়ে আনে নিয়াজের থেকে। নিয়াজ গলায় হাত দিয়ে কাশছে। আকাশ জেডিকে ধাক্কা দিতে চাইলেও পারলো না। বা হাতের ব্য’থা বেড়েছে, যদিও সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তবে শক্তি পাচ্ছে না ঠিকঠাক।
জেডি নিয়াজকে তাড়া দেয়,
“নিয়াজ তুমি এখানে টাইম নষ্ট করছ কেন? ভেতরে যাও।”

নিয়াজ নিজেকে সামলায়। রাগান্বিত আকাশের দিকে তাকায়। রাগ হয় নিয়াজেরও। সন্ধ্যার মূলত এক ব্যাগ র’ক্ত লাগবে। কিন্তু সে সন্ধ্যাকে বাঁচিয়ে কি করবে? সৃজনের জন্য সন্ধ্যা নিশ্চয়ই অনেক কেঁদেছে। সে সন্ধ্যাকে বাঁচিয়ে কি জবাব দিবে? বলবে, তোমার স্বামী তোমার বাচ্চাকে দত্তক দিয়ে দিয়েছে? কোন মা মানবে এটা? সন্ধ্যা সেই শোক কিভাবে সামলাবে? তার কাছে থেকে সৃজনকে যেভাবে কেড়ে নিয়ে গিয়েছে আকাশের লোক। সৃজনের কান্না তার কানে এখনো বাজছে। তার নিজেরই কান্না পাচ্ছে। সন্ধ্যা, সৌম্য এদের জীবন তো নরক ছিলই। সাথে সন্ধ্যার গর্ভে জন্ম নেয়া সৃজন, সেই বাচ্চা ছেলেটিরও জীবন থেকে সুখ হারাতে বসেছে। ওইটুকু বাচ্চা এখন থেকেই কত স্ট্রাগল করছে। আর এর পিছনে অন্যকেউ নয়, বরং সৃজনের আপন বাবা এই আকাশ আছে। নিয়াজ নিতে পারছে না। সন্ধ্যা মেয়েটা এতো কিভাবে সহ্য করে? সৃজন যখন বড় হবে, যদি কখনো জানতে পারে তার নিজের বাবা তার সাথে কি করেছে, সেদিন তার কি আর বাঁচতে ইচ্ছে করবে? কথাগুলো ভেবে নিয়াজ ঢোক গিলল। আকাশের পানে দৃষ্টি রেখে শক্ত গলায় বলে,

“সন্ধ্যাকে ভুলে গিয়েছ ভালো কথা। এখন আবারো ওর কাছে এসে কেন ওর সুখ কাড়তে চাইছ? ওকে কি এই দুনিয়াতেই জা’হা’ন্নামের স্বাদ দিতে চাইছ? আর কত? এবার থামো প্লিজ! সন্ধ্যাকে ভুলে গিয়েছ, ভুলেই থাকো। একটু শান্তি দাও ওকে। রিকুয়েস্ট করছি, প্লিজ!”
কথাগুলো বলে নিয়াজ একজন নার্সকে বলে, ‘ইমিডিয়েটলি AB+ গ্রুপের ১ ব্যাগ র’ক্ত ম্যানেজ করতে।’
এরপর সে থিয়েটারের ভেতরে চলে যায়। আকাশ নির্জীব দৃষ্টিতে চেয়ে নিয়াজের বলা কথাগুলো শুনলো। দু’বার শুকনো ঢোক গিলল। জেডি আকাশের দিকে চেয়ে।
আকাশের পকেটে ফোন ভাইব্রেট হয়। আকাশ কাঁপা হাতে পকেট থেকে ফোন বের করে নোটিফিকেশন চেক করে। যেটা দেখে মুখে ভ’য়ের ছাপ ফুটে ওঠে। ফোন পকেটে রেখে দ্রুতপায়ে উল্টোদিকে যেতে গিয়েও আবারো ফিরে এসে জেডির সামনে দাঁড়ায়। ডাকে, “জ্যাক?”

আকাশের কণ্ঠে নিজের সেই নাম শুনে জেডির বুকটা কেমন যেন করে ওঠে। গত পাঁচ-ছয় বছরে যে নাম আকাশ উচ্চারণ করেনি। আজ একদিনেই সেই নামে তাকে কতবার ডেকে ফেলল! জেডি মৃদুস্বরে বলে, “হ্যাঁ বল?”
আকাশের অসহায় কণ্ঠ, “ওর আপডেট জানাবি।”
কথাটা বলে আকাশ আর দাঁড়ায় না। ব্যস্ত পায়ে উল্টোপথে হাঁটতে থাকে। জেডি জিজ্ঞেস করে,
“কোথায় যাচ্ছিস?”
আকাশের ছোট্ট উত্তর, “শান্তি কুড়াতে।”
এরপর ফোনে কাউকে মেসেজ করে,
‘এই হসপিটালে যেন কেউ বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে! সাথে পুরো হসপিটাল পুলিশ আর গার্ড দ্বারা ঘেরাও করা হয়।’

একটি বিলাশবহুল ঘরে বেশ কয়েকজন বসে হাসাহাসি করছে। হঠাৎ-ই বাইরে থেকে কেউ একজন জোরেসোরে দরজায় একটা লাথি দিয়ে দরজাটা একদম খুলে ফেলে। ঘরে বসা লোকগুলো অবাক চোখে তাকায় দরজার দিকে। সামনে অধীরকে দেখে তারা ভ’য়ে গুটিয়ে যায়। একজন আধবয়স্ক লেক শুকনো ঢোক গিলল। অধীর দৃঢ়পায়ে ভেতরে প্রবেশ করে। কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে দু’হাত প্যান্টের পকেটে রেখে ঘাড় এদিক-ওদিক নাড়ায়৷ ফলস্বরূপ মড়মড় করে শব্দ হয়। সাদা চোখের মণি বিশিষ্ট শক্ত দৃষ্টি লেকগুলোর দিকে ঘুরছে। ঘরে থাকা প্রত্যেকের শরীর শিউরে ওঠে অধীর দৃষ্টি সাথে অদ্ভুদ ভঙ্গিতে শরীর নাড়িয়ে শব্দ করায়। অধীর আধবয়স্ক লোকটির দিকে দৃষ্টি স্থির করে বলে,

“কাকে গু’লি করে যেন এখানে এতো মাস্তি চলছিল?”
লোকটি শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“অধীর দেখ, তুমি মেয়েটির জন্য নিজেকে ভুলে গিয়েছ। মেয়েটি না ম’রা পর্যন্ত তুমি থামবে না। তাই আমি হেল্প করছিসলাম৷ তাছাড়া তোমার বাবা সন্ধ্যাকে কোনো কালেই পছন্দ করতো না। তিনি যদি উপর থেকে দেখে তুমি ওই সন্ধ্যা মেয়েটিকে পেয়েছ, তাহলে সে উপরে থেকেও অশান্তিতে ভুগবে। যেটা আমি হতে দিতে পারিনা। তাই যা করেছি বেশ করেছি। তুমি বরং এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও।”
কথাটা শেষ করার সাথে সাথে অধীর তেড়ে গিয়ে টেবিলের উপর থেকে ডান হাতে মদের বোতল নিয়ে টেবিলে একটা বারি মেরে, ভাঙা চৌকা কাঁচের বোতল লোকটির পেটে ঢুকিয়ে দেয়। কাজটি এতো দ্রুত হলো কেউ বুঝতেই পারলো না। অধীরের মুখ বাঁধা। তবে চোখ দু’টো জ্বলজ্বল করছে। সে চোখ লোকটির ব্যথাতুর চোখে রেখে হিসহিসিয়ে বলে,

“নিজের বাপকে মে’রে বছরের পর বছর জেল খেটেছি। সেখানে তুই কোন বা’ল ছেড়া মা’ল বে?”
কথাটা বলে অধীর বা হাতে লোকটিকে ধাক্কা দেয়। ডান হাতে গেঁথে দেয়া ভাঙা কাঁচের বোতলটি লোকটির পেট থেকে বের করে। লোকটি ঠাস করে পাকা মেঝেতে পড়ে যায়।
অধীর সকলের উদ্দেশ্যে আদেশের বাণী ছুড়ে দেয়,
“এ্যাই ওকে হসপিটাল নে। ও যেন বেঁচে থাকে। ও ম’রলে তোদেরও ম’রতে হবে।”
কথাটা বলে হাতের র’ক্তা’ক্ত বোতল ছুড়ে ফেলে অধীর। ডানদিকে ঘাড় কাত করে মেঝেতে পড়ে থাকা লেকটির দিকে চেয়ে শক্ত গলায় আওড়ায়,
“যদি আমার প্রাণের কিছু হয়, তবে তোকে এমনভাবে মারবো, যে তোর নিউজ পুরো পৃথিবী কাঁপিয়ে তুলবে।”

আকাশ বেশ কসরত করে জেডির গাড়ি চালিয়ে একটি বাড়ির সামনে এসে থেমেছে। সময় নষ্ট না করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে একপ্রকার দৌড়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। কোনোদিকে না তাকিয়ে দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে তার কাঙ্ক্ষিত ঘরে এসে পৌঁছায়৷ পা থেমে যায় নরম তুলতুলে বিছানার মাঝে ছোট্ট সৃজনের নির্জীব দেহটা পড়ে থাকতে দেখে।
পাশে একজন মহিলা আর একজন আধবয়সী লোক দাঁড়ায়। যার মধ্যে মহিলাটি আকাশের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“এখানে আনার পর থেকে বাচ্চাটি মা মা করে জন্য খুব কাঁদছিল। একবারের জন্যও কান্না থামায়নি। অনেক খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি। খাওয়াতে পারিনি। এরপর কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে গিয়েছে।”
আকাশের স্থির দৃষ্টি ঘুমন্ত সৃজনের পানে। কতক্ষণ চেয়ে থাকলো কে জানে! পকেট থেকে দু’টো টাকার বান্ডিল বের করে ভদ্রলোক আর মহিলাটির দিকে বাড়িয়ে দিলে তারা খুশি মনে টাকা নিয়ে নেয়। জিজ্ঞেস করে,
“স্যার আমাদের আর কোনো কাজ….
আকাশ সৃজনে দৃষ্টি রেখে ধীরে পায়ে সৃজনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে, “কাজ শেষ। গেট আউট, রাইট নাউ।”

আকাশের কথা মেনে তারা সুড়সুড় করে বেরিয়ে যায়।
আকাশ এসে দাঁড়ায় সৃজনের পাশে। দেখে বোঝা যাচ্ছে, অতিরিক্ত কান্নার ফলে নাক, মুখ লাল হয়ে আছে বাচ্চা ছেলেটির। আকাশ সৃজনের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে। ডান হাত তুলে সৃজনের মাথায় রাখে, আলতো করে বুলায়। সৃজন নড়েচড়ে ওঠে। ঘুমের মাঝেই ফোঁপানো কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
“মা, মা, মাআ?”
আকাশ সৃজনের চুলের ভাঁজে আলতো করে হাত চালায়। সৃজন আবারো ঘুমে তলিয়ে যায়। শান্ত হয়ে পড়ে থাকে। আকাশের দৃষ্টিজুড়ে অসহায়ত্ব। ঢোক গিলল দু’বার। মাথাটা নিচু করে সৃজনের কপালে একটা চুমু আঁকে। কপালে ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে রেখেই ছোট্ট করে বলে, “স্যরি!”

এরপর আকাশ মাথা তুলে দ্রুত সৃজনকে কোলে তুলে নেয়। এখানে আর দাঁড়ায় না। ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যায় বাড়িটি থেকে। গাড়িতে এসে বসে। সৃজনকে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসিয়ে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়। প্রায় অনেকটা সময় ড্রাইভ করার পর একটি জায়গায় গিয়ে আকাশ গাড়ি থামায়। গাড়ি থেকে থেমে নেমে অপর পাশের দরজা খুলে ঘুমন্ত সৃজনকে আবারো কোলে তুলে নেয়। সৃজনের ঘুম ভাঙেনি। আকাশ বুঝেছে, অতিরিক্ত কান্নার ফলে বাচ্চাটি দুর্বল হয়ে গিয়েছে৷ এজন্য কিছু ঘুম ভাঙছেনা সহজে। আকাশ এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। সে সৃজনকে কাঁধে নিয়ে এগোলো সামনের দিকে। এক মিনিট, দু’মিনিট এভাবে প্রায় ৩০ মিনিট শুধু রাস্তাতেই হাঁটলো আকাশ। দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ি অনেক আগেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। ৩০ মিনিট হাঁটার পর আকাশ সেজা রাস্তা থেকে মোড় ঘুরিয়ে নেয় ডানদিকে৷ যেটা কোনো রাস্তা নয়। একটা জঙ্গল। আকাশ এগোয়। জঙ্গলের ভেতরে হাঁটতে শুরু করারা পর থেকে প্রায় ১৫ মিনিট পেরিয়েছে। রাতের অন্ধকারে ঘন জঙ্গলের মাঝ বরাবর আকাশ হাঁটছে। পাতার মড়মড় শব্দ কানে ভেসে আসছে। ঘুমন্ত সৃজনকে তার কোর্টের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়েছে। মিটিমিটি বাতাস ভেসে আসছে চারিদিক থেকে।

একটানা এতোক্ষণ হেঁটেও আকাশের দেহের ক্লান্তি নেই, কিন্তু মনটা বড্ড ক্লান্ত। ডান হাতে ফোন। সে যেখানে আছে, সেখানে নেটওয়ার্ক নেই। কিন্তু দৃষ্টি ফোনের দিকে। সন্ধ্যার একটা খোঁজ পাবার আশায়। সে জানে এখানে সারাদিন বসে কাঁদলেও নেট পাওয়া যাবে না। যাকে বলে অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু আকাশের অবুঝ মন সেই অসম্ভব ব্যাপারটি জেনেও মিথ্যে আশায় ফোনের দিকে চেয়ে আছে। দৃষ্টি ফোনের শূণ্য নেটওয়ার্কের দিকে। কি ভেবে যেন ফোনের মেইন ওয়ালপেপারে আসলো। সাথে সাথে ভেসে উঠল সন্ধ্যার হাস্যজ্বল একটি মুখ। পরনে, লাল শাড়ি মাথায় ওড়না টানা। ডান হাত কোমরে রেখে ভার্সিটির মাঠের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।
আকাশ ডান হাতে বুড়ো আঙুল সন্ধ্যার পিকের উপর আলতো করে বুলালো। হসপিটালে নিয়াজের বলা কথার মাঝে দু’টো কথা কানে বাজলো,

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৬

‘সন্ধ্যাকে ভুলে গিয়েছ, ভুলেই থাকো।’
কথাটি ভেবে আকাশ হাসল। একটু শব্দ করেই হাসল। অথচ সে হাসিতে প্রাণ নেই। একটু পরেই সেই নির্জীব হাসি মিলিয়ে যায় ঠোঁটের কোণ থেকে। বা হাতে সৃজনকে আরেকটু শক্ত করে ধরল। টকটকে লালিত চোখদু’টো ফোনের ওয়ালপেপারে সন্ধ্যার ছবিতে নিবদ্ধ রেখে আকাশ ভাঙা স্বরে দু’টো লাইন গায়,
“ভুলিনি তেমায়, আজও ভুলিনি আমি।
মনেরি মাঝে আজো আছো তুমি।”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৮