আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৫
DRM Shohag
আকাশ সন্ধ্যার মুখ থেকে একবারের জন্য-ও সৃষ্টি সরায়নি। মাথায় প্রচন্ড চাপ লাগছে। তার সাথে কি হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না।
কিছু একটা মনে পড়তেই আকাশের চোখমুখ শ’ক্ত হয়ে যায়। তার মতে, মেয়েরা হয় ছেলেলোভী, একটু ভালোভাবে বলতে গেলে এভির ভাষায় মেয়েরা ছেলেদের টাকা-লোভী। তার মধ্যে সন্ধ্যা তাকে দেখার পর থেকে গায়ের মধ্যে উঠে আসছে, এতে সে সন্ধ্যাকে আরও নিম্নমানের মেয়েদের কাতারে ফেলল। ইচ্ছে করল মেয়েটাকে যাস্ট ছুঁড়ে ফেলতে।
কিন্তু সন্ধ্যার মুখের দিকে তাকালে সে কেমন শান্ত হয়ে যায়। মেয়েটির গায়ের রঙ শ্যামলা। আকাশ মনে করার চেষ্টা করল, চাপা গায়ের রঙ তার পছন্দ কি-না! কিন্তু মনে করতে পারলো না। সে তো কোনো মেয়েকেই পছন্দ করেনা। তাহলে এই মেয়েটা দেখার পর থেকে তার এমন অস্থির লাগে কেন? আকাশ ঢোক গিলল। ধীরে ধীরে ডান হাত তুলে সন্ধ্যার গালে রাখে। ছেলেটির হাত কাঁপছে৷ কারণ জানেনা। হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিক গতিতে আকাশ হাসফাস করে৷ হয়তো সন্ধ্যার এভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা তার হাসফাস অনুভূতির কারণ। অথচ সে বুঝল না। সে কি করছে তা-ও জানে। মস্তিষ্ক যা করতে বলছে সে-ও তাই করছে। অতঃপর আকাশ সন্ধ্যার গালে আলতো থা’প্প’ড় মে’রে বলে,
“এ্যাই মেয়ে চোখ খোলো।”
সন্ধ্যা নির্বিকার। নিশ্চিত মনে আকাশের বুকে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে। মুখজুড়ে বিষাদের ছোঁয়া। জেগে থাকলে হয়ত দু’চোখ বেয়ে অনর্গল নোনাজল গড়িয়ে পড়ত। হয়ত দুঃখে, নয়তো আকাশের একটুখানি ছোঁয়া পেয়ে সুখে। আসমানী নওয়ানের দৃষ্টি আকাশের দিকে। ভদ্রমহিলা আকাশকে বুঝতে চাইছেন৷ কিছুক্ষণ আগে সন্ধ্যার সাথে বলা আকাশের কথাগুলোর অর্থ, আকাশের করা ব্যবহারের মানে খুঁজছেন তিনি।
আকাশ সন্ধ্যাকে কোলে নিয়ে সোফায় শুইয়ে দেয় লম্বা করে। এরপর সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকতে গিয়ে থেমে যায়। খেয়ালে আসে সে কি করছে। নিজের কাজে নিজেই অবাক হয়। দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। পিছিয়ে যায় দু’পা। দৃষ্টি এখনো সন্ধ্যার পানে।
দোতলা থেকে ইরা, লামিয়া বড় বড় পায়ে নিচে নেমে সন্ধ্যার দু’পাশে বসে সন্ধ্যাকে ডাকে।
এদিকে আসমানী নওয়ানের বিস্ময় দৃষ্টি আকাশের উপর। আকাশ সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে ছটফট করছে৷ স্থির নেই সে। মাথা ব্য’থার পরিমাণ তীব্র হাড়ে বাড়ছে। মেয়েটি তার সামনে আসলেই এমন হয়। আকাশ টিকতে না পেরে দু’হাতে মাথার চুল টেনে ধরে। এক পর্যায়ে আকাশ চিৎকার করে বলে,
“এই মেয়েকে আমার সামনে থেকে সরাও। এক্ষুনি সরাও। নয়তো ওকে খু’ন করে ফেলব আমি।”
কথাটা বলতে বলতে টি-টেবিলে জোরেসোরে এক লাথি বসায় আকাশ। টেবিলের স্থায় হয় কয়েক হাত দূরত্বে।
সকলে কেঁপে ওঠে আকাশের চিৎকারে। প্রচন্ড অবাক হয়। লামিয়া যদিও রাস্তায় দেখেছে আকাশের ব্যবহার। তাই সে ততটা অবাক না হলেও ইরা আর আসমানী নওয়ানের অবাকের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। আকাশ সন্ধ্যাকে সহ্য করতে পারছে না? এটা কিভাবে সম্ভব? ইরা বাকহারা হয়ে চেয়ে আছে। আকাশের বেশভূষায় যতটা অবাক হয়েছে, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি অবাক হচ্ছে সন্ধ্যার প্রতি আকাশের ব্যবহার দেখে। তার উপর আবার আকাশের সোনালি চোখ। যা তার কাছে সম্পূর্ণ এক নতুন চোখ।
আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে দাঁড়ায় আকাশের সামনে। জিজ্ঞেস করে,
“তুমি সন্ধ্যাকে নিয়ে এরকম কথা কিভাবে বলছ আকাশ?”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “আমার যতদূর মনে পড়ে আমি কোনো মেয়ের সাথে মধুর সুরে কথা বলিনা। তাছাড়া এই মেয়েটি ভীষণ গায়ে পড়া টাইপ। অসুস্থ হলে ডক্টরের কাছে যাওয়া উচিৎ। পা’গ’ল হলে পা’গ’লাগারদে যাওয়া উচিৎ। বাট এই মেয়ে সব বাদ দিয়ে আমার পিছনে পড়েছে কেন? ওকে এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের করে দাও মা। প্লিজ!”
আসমানী নওয়ান অবাক হয়ে শুধু দেখছেন আকাশকে। বলেন,
“আকাশ তুমি কি বলছ ভেবে বলছ? ও সন্ধ্যা৷ তোমার….”
আকাশ মাঝখান থেকে বলে,
“কে এই মেয়ে? তুমি অরুণ সবাই এরকম রিয়েকশন কেন দিচ্ছ? সবাই মিলে পুরো মুডটাই ন’ষ্ট করে দিয়েছ আমার। মনে হচ্ছে বাংলাদেশে আসাই ভুল হয়েছে৷ এই মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করবে। নয়তো খুব খারাপ হবে বলে দিলাম।”
কথাটা বলে আকাশ একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায়। যে মেয়েটা অচেতন অবস্থায় সোফার এক কোণায় পড়ে আছে। আকাশ দ্রুত চোখ বুজে নেয়। ঢোক গিলল ছেলেটা৷ নাহ্ মেয়েটিকে সত্যিই আর নেয়া যাচ্ছেনা৷ ভীষণ ছটফট লাগে। সে আর এখানে দাঁড়ায় না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলে,
“আমার ঘরে এক কাপ চা পাঠাও। মাথা ব্য’থা করছে। আমি নিচে নেমে যেন দেখি, মেয়েটি এই বাড়িতে আর নেই।”
আসমানী নওয়ান বলার মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছেন না। হাজারটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সেদিন আকাশ বেঁচে গিয়ে এতোদিন কোথায় ছিল? আবারো আকাশের এই বেশভূষা কেন? আকাশ বড় বড় পায়ে উপরে উঠায় ভদ্রমহিলার চোখে পড়ে, আকাশের পিছনে গুঁজে রাখা পি’স্ত’ল। এসবে তিনি সামান্য অবাক হয়, কিন্তু সন্ধ্যাকে নিয়ে আকাশের মন্তব্যগুলো ভাবলে তার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কোথা থেকে আসলে আকাশ?”
আকাশ উত্তর করে, “ইংল্যান্ড ছিলাম।”
“কে বাঁচিয়েছে তোমায়?”
আকাশের ভ্রু কুঁচকে যায়৷ মায়ের প্রশ্নটা সে ঠিক বুঝল না। এদিক ফিরে জিজ্ঞেস করে, “মানে?”
ভদ্রমহিলা অবাক হয়। আকাশ এরকম রিয়েকশন কেন দিচ্ছে? সে সত্যিই কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। আকাশ বলে,
“লাস্ট অনেকদিন তোমার সাথে কথা হয়নি। রা’গ করে চলে গেলাম। তুমিও আমাকে ভুলে থাকলে। জানি তুমি একটু-আধটু সেলফিশ আছো। বাবার মৃ’ত্যু’র সংবাদ টা পর্যন্ত আমাকে দাওনি। কাজটা তুমি ঠিক করনি মা।”
আকাশের কণ্ঠে রা’গ। আসমানী নওয়ান বিস্মিত হয়। আকাশ এসব কি বলছে? আকাশ নিজে তার বাবার জানাজা পড়িয়ে আজ বলছে, তাকে তার বাবার মৃ’ত্যুর সংবাদ কেন দেওয়া হয়নি? ভদ্রমহিলা আর কত অবাক হবে? আর রা’গ করে চলে যাওয়ার কথা বলছে যে? প্রায় সাড়ে তিন বছর আগের কাহিনী আকাশ আজ কেন টানছে? মাঝে যে এতো কাহিনী ঘটলো, সেসব কেন বলছে না?
আকাশ তার মায়ের দিকে তাকালো৷ নিজেকে সামলে বলে, “অনেক হিসাব-নিকাশ করতে দেশে ফিরেছি। আপাতত তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। তার আগে এই সন্ধ্যা নাকি রাত এই ঝমেলাকে আউট কর।”
কথাটা বলে আকাশ বড় বড় পা ফেলে তার ঘরে চলে যায়।
এ পর্যায়ে এসে আসমানী নওয়ান বোধয় অবাক হতে ভুলে গেল। আকাশের কথার আগামাথা কিচ্ছু বুঝল না। কি হয়েছিল, কি হচ্ছে কোনোকিছুরই আগামাথা খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।
অতিরিক্ত দুর্বলতায় সন্ধ্যা জ্ঞান হারিয়েছিল৷ লামিয়া প্রায় অনেকক্ষণ যাবৎ সন্ধ্যার মুখে পানি ছিটানোর ফলে এক সময় সন্ধ্যার জ্ঞান ফেরে। ধীরে ধীরে চোখ মেললে তার মনে হয় চারপাশটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। মাথাটা ঝিমঝিম করছে।
সন্ধ্যাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে ইরা, লামিয়া দু’জনেই স্বস্তি পায়। ইরা একবার সন্ধ্যার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছিল আরেকবার আকাশের বলা একদম নতুন কথা শুনছিল। যা তার কাছে অযৌক্তিক লেগেছে।
সন্ধ্যা লামিয়াকে ধরে উঠে বসে ধীরে ধীরে৷ হেলান দেয় লামিয়ার সাথে। ঝাপসা দৃষ্টি চারদিকে ঘোরায়৷ কোথাও আকাশকে দেখতে পায়না। আবার কোথায় হারালো আকাশ? কিছুক্ষণ আগে আকাশের বলা কথাগুলো মনে পড়লে সন্ধ্যার চোখজোড়া ভিজে যায়। আকাশ তাকে কেন চেনে না? কেন তাকে আর সোনা বউ বলে ডাকে না? শুধু দূরে সরিয়ে দেয়। অপরিচিতদের মতো আচরণ করে। একবার-ও তাকে কাছে টেনে নেয়না। আগের মতো আর ভালোবাসে তাকায়না। উল্টে সে আকাশকে ধরতে গেলে মানুষটা তাকে মে’রে দেয়। কেন এমন করছে আকাশ? সে কি তার আকাশ নয়? তার আকাশ তাকে কত ভালোবাসত! আর এই আকাশ….মেয়েটা একটুও মেলাতে পারেনা। এখন সে কিভাবে থাকবে আকাশকে ছাড়া? সন্ধ্যা ঘাড় বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে আকাশকে খোঁজে৷ কোথাও আকাশকে না পেয়ে সন্ধ্যা ভীত হয়। সত্যিই কি তার আকাশ আবারো হারিয়ে গেল? সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আসমানী নওয়ানের দিকে চেয়ে দুর্বল কণ্ঠে ডাক দেয়, “আম্মা?”
সন্ধ্যার কণ্ঠে আসমানী নওয়ানের ধ্যান ভাঙে। ছেলের এতোটা পরিবর্তিত রূপ দেখে সব খেয়াল হারিয়ে বসেছিলেন৷ আকাশকে ছাড়া সন্ধ্যাকে এই কয়টামাস তারা কীভাবে সামলেছে শুধু তারাই জানে। আজ হঠাৎ আকাশকে দেখে সন্ধ্যার পা’গ’লামি গুলো কি স্বাভাবিক নয়? কিন্তু আকাশ? সে যে সন্ধ্যাকে চিনছেই না। সন্ধ্যার বিধ্বস্ত মুখ দেখে আসমানী নওয়ানের বুকটা মুচড়ে ওঠে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার সামনে দাঁড়ায়। তখনই সন্ধ্যা কান্নামাখা গলায় বলে,
“তোমার ছেলে কোথায় আম্মা? উনি আমাকে চেনে না কেন বলো তো? উনাকে একটু বোঝাবে? আজ দেখা হওয়ার পর থেকে তোমার ছেলে আমার সাথে এমন করছে। আমার খুব ক’ষ্ট হয় জানো?”
আসমানী নওয়ান বলার মতো কিছু খুঁজে পায়না। চোখেমুখে অসহায়ত্ব, দুশ্চিন্তার গাঢ় ছাপ। কি বলবেন এই মেয়েটাকে? কিভাবে সান্ত্বনা দিবে মেয়েটাকে? তার নিজেরই অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে।
আসমানী নওয়ান বসলেন সন্ধ্যার পাশে। ভেঙ্গে যাওয়া সন্ধ্যাকে তার সাথে আগলে নেয়। সন্ধ্যা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে।
ইরা জিজ্ঞেস করে, “আকাশ ভাইয়া এসব কেন বলল ফুপি?”
আসমানী নওয়ান ইরার দিকে তাকায়। ছোট করে বলে, “জানিনা।”
“আকাশ ভাইয়ার চোখগুলো এরকম কেন? মণিগুলো একদম সোনালি। এটা কিভাবে?”
ইরার দ্বিতীয় প্রশ্নে লামিয়াসহ সন্ধ্যা-ও তাকায় আডমানী নওয়ানের দিকে। সন্ধ্যা ভাঙা গলায় বলে,
“হ্যাঁ আম্মা। আমিও দেখেছি। উনার চোখগুলো তোমার ছেলের মতো নয়। একদম অন্যরকম। উনি কি তবে আকাশ নয় আম্মা? এজন্যই আমার সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করছে?”
এটুকু বলতে গিয়ে সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে টুপটুপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। মনে হচ্ছে আসমানী নওয়ানের উত্তর যেন পজিটিভ হয়। আবার মনে হয়, উত্তর পজিটিভ হলে, এটাই আকাশ। আর তার আকাশ তার সাথে এতোটা অমানিক আচরণ করে, এটা সে কি করে মানবে? মেয়েটা কি চাইছে জানেনা। শুধু জানে, তার ক’ষ্ট হচ্ছে।
এদিকে ইরার কথায় আসমানী নওয়ান ঢোক গিলল। সন্ধ্যার দিকে তাকালে দেখল মেয়েটা মায়া মায়া মুখে তার দিকে চেয়ে আছে৷ ভদ্রমহিলা দু’হাতে সন্ধ্যার ভেজা গাল মুছে দেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“জন্ম থেকেই আকাশের চোখের মণি সোনালি।”
আসমানী নওয়ানের কথা শুনে সন্ধ্যা, ইরা, লামিয়া প্রচন্ড অবাক হয়। আকাশের চোখ জন্ম থেকে সোনালি হলে তাদের চোখে কেন পড়লো না এটা? আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাদের কৌতুহলী চাহনীর উত্তর স্বরূপ বলে,
“আকাশ সবসময় লেন্স পরতো। তাই ওর চোখ সবসময় কালো দেখাতো।”
এবার সকলে আকাশের চোখের ব্যাপার বুঝল। ইরা জিজ্ঞেস করে,
“ফুপি আকাশ ভাইয়া কি সোনালি চোখ পছন্দ করে না?”
আসমানী নওয়ান বোধয় একটু হাসলেন। উত্তর দেয়,
“সোনালি রঙ আকাশ আর আকাশের বন্ধুর ভীষণ পছন্দ ছিল। আকাশ তো দিনের কয়েক ঘণ্টা আয়নার সামনে কাটিয়ে দিত নিজের আনকমন চোখের মণি দেখতে দেখতে।”
“তাহলে লেন্স পরতো কেন?”
সন্ধ্যার প্রশ্নে আসমানী নওয়ান তাকায়। মুখে মলিনতার ছোঁয়া ফুটে ওঠে। কিছু বললেন না তিনি। সন্ধ্যা এবার ফোঁপানি কণ্ঠে বলে,
“তাহলে এটাই তোমার ছেলে আম্মা? তবে সে আমায় চেনে না কেন?”
আসমানী নওয়ান অসহায় চোখে তাকায়। সন্ধ্যাকে বুকে আগলে নিয়ে স্নেহের হাত বুলায় মেয়ের মাথায়। তিনি যে নিজেই বুঝতে পারছেন না আকাশের এরূপ আচরণের পিছনে কারণ।
জেডি হসপিটাল থেকে বের হলে, পিছু পিছু নিয়াজ-ও বেরিয়ে আসে। জেডিকে জোর করে টেনে একটি ক্যাফেতে এনেছে। সাথে অরুণ আছে। সামনে তিন কাপ কফি। যার দু’কাপ ইতিমধ্যে শেষ করেছে জেডি। অরুণ বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে৷ নিয়াজ ধৈর্য নিয়ে বসে আছে।
জেডি তৃতীয় কাপ টেনে নিয়ে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলে, “খাবে তোমরা? একা একা খেতে বোরিং লাগছে।”
অরুণ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“গেল্ খাদকের বাচ্চা৷ গিলে আমাদের সত্যটা বলে উদ্ধার কর।”
জেডি রে’গে তাকায়। ডান পা ডানে-বামে নাচিয়ে টেবিলের নিচ দিয়ে জায়গা মতো একটা লাথি বসায়। অরুণ চোখ বড় বড় করে তাকায়। চোখমুখ লাল করে বলে,
“ভালো হ জেডির বাচ্চা।”
জেডি কফির কাপে দু’বার চুমুক দিয়ে হেসে বলে,
“আমার ভালোর ধোঁয়ায় তোর চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে। আর ভালো হতে পারবো না ডেয়ার।”
নিয়াজ অরুণের দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। অরুণ অদ্ভুদ রিয়েকশন দিচ্ছে বলে মনে হলো। জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়েছে অরুণ?”
অরুণ বহুক’ষ্টে উচ্চারণ করল, “কিছু না।”
নিয়াজ জেডির দিকে তাকিয়ে বলে,
“জেডি প্লিজ আকাশের ব্যাপারটা ক্লিয়ার কর। আমার চেম্বারে যেতে হবে।”
জেডি বাঁকা চোখে তাকায়। ভাবলেশহীনভাবে বলে, “মুড নেই। তুমি চেম্বারে যাও।”
অরুণ কটমট চোখে তাকায়। এক ঘণ্টায় দু’কাপ চা খেয়ে, তাদের বসিয়ে রেখে এখন বলছে, মুড নেই। ইচ্ছে করছে একে যাস্ট খু’ন করে ফেলতে।
নিয়াজের চোখেমুখে বিরক্তি। ঠান্ডা মাথার মানুষ সে। তাই নিজেকে সামলায়। মৃদুস্বরে বলে,
“জেডি আমি হয়ত তোমার উপকারে আসতে পারি।”
জেডি খুব মনোযোগ দিয়ে কফি খাচ্ছিল। নিয়াজের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে যায়। হেসে বলে,
“এভির শ’ত্রু আমার উপকারে আসবে? ইন্টারেস্টিং!”
নিয়াজ একটু হেসে বলে,
“আকাশ আমাকে দেখলে পথ পরিবর্তন করেনা। তবে তোমাকে দেখলে পথ পরিবর্তন করে। আর আমার কনভিন্স করার ব্যাপারে বেশ দক্ষ। মনে আছে?”
জেডি থমথমে মুখে তাকায়। তার মাঝে আগ্রহ দেখা গেল। স্মৃতির পাতায় কিছু দৃশ্য উঁকি দিল। তখন তাদের ভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ার।
এভি, জেডি দুই বন্ধু নিয়ম করে প্রতিদিন কার রাইডে বের হয়। জেডি গাড়ি চালাতে পারতো না। শিখেছে ভার্সিটি ওঠার পর। শিখিয়েছে আকাশ নিজেই। প্রথম প্রথম গাড়ি চালানো শেখার পর জেডি খুব আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন গাড়ি চালাতো। সাথে সবসময় আকাশ থাকতো। প্রতিদিন গাড়ি চালাতে চালাতে এটা তার অনেকটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। দিনে সুযোগ না পেলেও রাতে যেত। একদিনের ঘটনা ~
রাত তখন ১২ টার কাছাকাছি। জেডি আজ অনেক ছোটাছুটির ফলে দিনে গাড়ি নিয়ে বের হতে পারেনি। তাই এই রাতে গাড়ি নিয়ে বের হয়। পকেট থেকে ফোন বের করে এভিকে কল করে। দু’বার রিং হলেও কল রিসিভ হয়না। জেডি উপায় না পেয়ে একাই গাড়ি নিয়ে বের হয়।
গাঠি চলছে তার মতো৷ জেডি-ও রিল্যাক্স মুডে একদম ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাতে ব্যস্ত। গাড়ির স্পিড হাই। হঠাৎ-ই জেডির খেয়ালে আসে অনেকক্ষণ যাবৎ তাকে একটি গাড়ি ফলো করছে। প্রথমে জেডি পাত্তা না দিলেও এখন ভাবাচ্ছে। সে যেদিকে যায়, পিছনের গাড়িটি-ও সেদিকে যায়। জেডি আয়নায় তাকিয়ে সূক্ষ্ম চোখে দেখছে তার পিছু পিছু আসা গাড়িটিকে। একসময় জেডি গাড়ির ব্রেক কষে। একই সাথে পিছনের গাড়ি-ও থেমে যায়। জেডি বেশ অবাক হয়। সময় ন’ষ্ট না করে সে দ্রুত গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। এগিয়ে গিয়ে পিছনে দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালে ভেতর থেকে আকাশ বেরিয়ে আসে। জেডি অবাক হয়ে বলে,
“তুইই??”
সাথে সাথে জেডির ডানগালে শক্তপোক্ত এক থা’প্প’ড় পড়ে। জেডি মৃদু আর্তনাদ করে উঠল, “উহ্!”
আকাশ জেডির কলার ধরে রে’গে বলে,
“তোর সাহস কি করে হয়, একা একা গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার?”
জেডি গালে হাত দিয়ে থমথমে মুখে বলে, “মনে হচ্ছে দাঁত পড়বে।”
আকাশ চোখ পাকিয়ে তাকায়। জেডি সাফাই গায়, “সত্যি বলছি। মুখের ভেতর চারটে দাঁত নড়ে উঠল। উপরে দু’টো, নিচে দু’টো।”
আকাশ বিরক্ত হয়। এর ১০ টা কার্যকরী কথার মাঝে ৯ টা ভিত্তিহীন কথা থাকবেই। আকাশ জেডির কলার ছেড়ে গাড়িতে উঠে বসতে নিলে জেডি আকাশের হাত টেনে ধরে বলে,
“এভি রা’গ করছিস কেন? আমি তোকে কল করেছিলাম, কিন্তু পাইনি।”
আকাশ রে’গে তাকায়৷ জেডি এভির হাত ছেড়ে দ্রুত তার দু’গালে হাত রাখে। ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,
“আর মা’রিস না। আমি মারাত্মক ভালো গাড়ি চালানো শিখেছি। যেহেতু শিক্ষক তুই। দেখলি তো অনেকদূর চালিয়ে আসলাম।”
আকাশ উত্তর করে,
“বিশ্বাস হচ্ছে না।”
জেডি হতাশ হয়। খুব বুঝল আকাশ তাকে নিয়ে রিস্ক নিতে চায়না। ভ’য় পায়। মানুষের বাবা-ও এতো ভাবেনা, আকাশ তার জন্য যতটা ভাবে। তার মনে হয়, আল্লাহ কাউকে একদিক দিয়ে অপূর্ণ রাখলে, আরেকদিক দিয়ে পূর্ণ করে দেয়। আকাশ তার লাইফে সেরকমই এক পাওনা। জেডি হাসল আকাশের দিকে তাকিয়ে। বলে,
“আরে ভাই, আমাকে কি তোর পাঁচ বছরের বাচ্চা মনে হয়? আমার এক্সিডেন্ট-ফেক্সিডেন্ট হবেনা। চাপ নিস না।”
আকাশ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“প্রুভ দে। যদি হে’রে যাস তবে তোর গাড়ি চালানো একেবারে অফ। সাথে হাত-পা আমি নিজ দায়িত্বে ভেঙে হসপিটাল ভর্তি করাবো।”
জেডি অসহায় চোখে তাকালো। সে আকাশের সাথে পারবে না খুব ভালো করে জানে। মিনমিন করে বলে,
“এটাই লাস্ট। এরপর থেকে তোকে কলে না পেলে আমার গাড়ি চালানো ক্যান্সেল। যা কনফার্ম।”
আকাশ ছোট করে বলে,
“গুড। কথার এদিক-ওদিক হলে…..
জেডি দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বলে,
“হবে না জান।
আকাশ চোখমুখ কুঁচকে বলে,
“এসব ফা’ল’তু নামে ডাকবি না।”
জেডি হেসে বলে,
“ওকে জান।”
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৪
আকাশ তেড়ে গেলে জেডি দৌড় দেয়। পিছু ফিরে ডান হাত দিয়ে ফ্লায়িং কিস দিয়ে হেসে বলে,
“এ্যাই জান ধর ধর। আমার খাঁটি ভালোবাসা উড়ে গেল।”
আকাশ ডান পায়ের জুতো খুলে জেডির দিকে ছুঁড়ে মা’রে। কটমট চোখে তাকায়।
