আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৬
DRM Shohag
সন্ধ্যার সাথে আকাশের চোখাচোখি হয়। কেউ-ই কারো থেকে চোখ সরালো না। আকাশ সন্ধ্যার পানে দৃষ্টি রেখে সিগারেট ফুঁকছে। কপালে ভাঁজ। তার মাঝে কি চলছে একমাত্র সেই জানে। সিগারেটে আরও কয়েকবার টান দিয়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার সামনে দাঁড়ায়।
একদম তার সামনে আকাশকে দাঁড়াতে দেখে সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ক্লান্তির তোড়ে নুইয়ে পড়া সন্ধ্যার মুখটা দেখে। গম্ভীর গলায় বলে,
“দেখতে তো ইনোসেন্ট মেয়ের মতো লাগে। অথচ ভাইয়ের কথায় নেচে ভেতরে ভেতরে বে’য়া’দ’ব মেয়েতে রূপান্তর হয়েছ।”
সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ এটা কেন বলল সে বুঝল না। আকাশ সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া সন্ধ্যার মুখের উপর ছাড়ে। সন্ধ্যা চোখ বুজে নেয়। দ্রুত ঘাড় বাদিকে ঘুরিয়ে কেশে ওঠে। আকাশ ঠোঁট বাঁকালো। বা হাত প্যান্টের পকেটে রাখে। বলে,
“আগে লিপ্স নাড়িয়ে কথা বোঝনোর অভ্যাস ছিল?”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। গলা অপারেশনের আগে সে আকাশকে ঠোঁট নাড়িয়ে অনেক কথা বোঝাতো। আকাশ কি সেটার কথা বলছে? সন্ধ্যাকে চুপ দেখে আকাশ বিরক্ত হয়। ধমকে বলে,
“কি প্রবলেম, চুপ কেন?”
সন্ধ্যা কেঁপে ওঠে। আকাশের রাগান্বিত মুখ দেখে ঢোক গিলল। ছোট করে বলে, “জ্বি।”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?”
সন্ধ্যা অবাক হয়। আকাশ কি সত্যিই জানেনা কেন সে ঠোঁট নাড়াতো কাউকে তার মনের ভাব বোঝাতে? সন্ধ্যা মিনমিন করে বলে, “আমি কথা বলতে পারতাম না।”
আকাশের কপালে ভাঁজ পড়ে। উত্তরটা বোধয় মনমতো হয়নি। চোখেমুখে বিরক্তির আভা দেখা গেল। সন্ধ্যার চোখেমুখে অসহায়ত্ব। আকাশের এরকম অপরিচিতদের মতো আচরণ সে আর নিতে পারছে না। মেয়েটা সাহস করে বলে,
“আপনি আমায় অস্বীকার করছেন কেন?”
আকাশ তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। মুহূর্তেই বিরক্তিতে ভরা মুখাবয়বে রা’গের আভা দেখা যায়। ডান হাতের দু’আঙুল দ্বারা সিগারেটে দু’টো টোকা দিয়ে, সিগারেটের আগায় জমা ছাই ঝেড়ে ফেলে। চোখের পলকে সিগারেটের জ্ব’ল’ন্ত মাথা সন্ধ্যার বাম গালে চেপে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আবার মিথ্যে বলছিস?”
সন্ধ্যা মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে। দ্রুত দু’পা পিছিয়ে যায়। গালটা জ্ব’ল’ছে। বা হাত তুলে গালে রাখল। বিস্ময় দৃষ্টি রাখে আকাশের পানে। আকাশ রে’গে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যার চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। আকাশের এরূপ আচরণ মেয়েটাকে ভীষণ বিধ্বস্ত করে দেয়। অথচ আকাশ কি নির্বিকারভাবে তার সাথে নি’ষ্ঠুর আচরণ করে!
আসমানী নওয়ান তার ঘরে গিয়েছেন৷
ডাইনিং-এ বসা লামিয়া সন্ধ্যার আওয়াজ শুনে দ্রুত এগিয়ে আসে। সন্ধ্যার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়েছে সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যার ছলছল দৃষ্টি আকাশের দিকে। লামিয়া সামনে তাকালে আকাশের রা’গী দৃষ্টিজোড়া দেখে হয়ত কিছু বুঝল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটা। আকাশ না ফিরলেই বোধয় ভালো হত। এই আকাশকে পেয়ে তার বান্ধবীর জীবনটা আরও দুঃখে ভরে গিয়েছে।
আকাশের ফোনে কল আসলে সে কিছুদূরে গিয়ে দাঁড়ায়। কল রিসিভ করে কথা বলায় ব্যস্ত হয়।
সন্ধ্যা বেশ কিছুক্ষণ মলিনমুখে চেয়ে রইল। এই লোকটা তার আকাশ কি করে হয়? কি করে একটা মানুষের মাঝে এতো অমিল হয়? আকাশের বেশভূষা মেয়েটার কাছে একদম নতুন লাগে। লামিয়া সন্ধ্যার কাঁধে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলে,
“নিজেকে শ’ক্ত কর সন্ধ্যা। তুই যে বলতি, নরম মাটি মানুষ পারায় বেশি। কথাটা কি ভুলে গেলি?”
সন্ধ্যা ঝাপসা চোখজোড়া দু’হাতে ডলে স্বাভাবিক হয়। মলিন হেসে বলে,
“ভুলিনি লামিয়া৷ কিন্তু আমাদের মন খুব বেহায়া হয় বুঝলি? এজন্যই তো আমি আজ আকাশের খাতায় পা’গ’ল, সৌম্য ভাইয়ার খাতায় আত্মসম্মানহীন মেয়ে হিসেবে পরিচিতি পেয়েছি।”
কথাটা বলতে গিয়ে সন্ধ্যার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ায়। ডান হাতে অশ্রুটুকু মুছে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় সে। একবার আকাশের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই সে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে।
ধরনীর বুকে রাতের আমেজ। শীতের ঋতু চলছে। চারিদিক থেকে ঠান্ডা বায়ু এসে গায়ে ধাক্কা খায়। সন্ধ্যার গায়ে শুধু পাতলা এক সাদা শাড়ি। খালি পা। ঠান্ডায় সন্ধ্যার কাঁপুনি ধরার কথা। অথচ তার মাঝে তেমন কোনো অনুভূতি দেখা গেল না। গায়ের লোম খাড়া হলো না। কয়েক পা হেঁটে খালি পা দু’টো বাগানে রাখে যেখানে অসংখ্য ঘাষ বিছিয়ে আছে। শিশির ভেজা ঘাষের উপর দিয়ে হেঁটে যায় সন্ধ্যা। পদযুগল থামে বকুল গাছতলার নিচে এসে। চারিদিক থেকে মৃদু আলোর ছিটেফোঁটা ঠিকরে এসে পড়েছে সন্ধ্যার উপর।
লামিয়া সন্ধ্যার পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে। বলে,
“ঘরে যা সন্ধ্যা। বাইরে অনেক ঠান্ডা। তাছাড়া রাত হয়েছে তো। আমাকে বাড়ি যেতে হবে। নয়তো মা অনেক টেনশন করবে।”
সন্ধ্যা ছোট করে বলে,
“তুই বাসায় যা। আমি একটু পর বাসার ভেতর যাবো।”
লামিয়া চুপ থাকলো। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর-ও লামিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা বলে,
“যাচ্ছিস না কেন?”
লামিয়া সন্ধ্যার গালে হাত দিয়ে বলে,
“আল্লাহ তোর কপালে একদিন এতোটা সুখ লিখুক,, যে সুখ দেখে সবাই তোকে হিংসে করবে।”
সন্ধ্যার কি হলো কে জানে। লামিয়ার কথাটা শুনে সে শব্দ করে হেসে ফেলল। লামিয়ার চোখজোড়া ঝাপসা হয়। কি আশ্চর্য! তার বান্ধবী হাসছে অথচ সে বান্ধবীর হাসি দেখে দুঃখ পাচ্ছে! মানুষ দেখলে হয়ত তাকেও পা’গ’ল বলবে। বলতেই পারে। কেউ তো আর বুঝবে না, সন্ধ্যার এই হাসিতে ঠিক কতখানি দুঃখ, য’ন্ত্র’ণা, হাহাকার মিশে আছে। কিন্তু সে বোঝে, সে জানে। বান্ধবীর সব দুঃখ, ক’ষ্ট সে খুব বোঝে।
একসময় সন্ধ্যার বিষাদমাখা হাসি বিলীন হয়। উদাস কণ্ঠে বলে,
“সুখে থাকার দুঃস্বপ্ন আমি কোনোদিনই দেখিনি লামিয়া। কখনো দেখবো-ও না। তুই-ও দেখিস না। বাড়ি যা। আন্টি চিন্তা করবে।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা গাছ বরাবর ঘেঁষে দাঁড়ায়।
লামিয়া মলিন মুখে চেয়ে রইল সন্ধ্যার দিকে। সত্যিই কি সন্ধ্যার কপালে সুখ লেখেনি আল্লাহ? তার বড্ড দুঃখ হয় প্রিয় বান্ধবীর জন্য। কেন সন্ধ্যার জীবন এমন? কেন একটু সুখী হতে পারেনা মেয়েটা?
চলে যাওয়ার জন্য সন্ধ্যা লামিয়াকে আবারও তাড়া দিলে লামিয়া সন্ধ্যাকে তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতর যেতে বলে বেরিয়ে যায়। নয়তো বেশি রাত হয়ে গেলে রাস্তায় প্রবলেম হবে।
সন্ধ্যা দু’হাতে দু’হাতের বাহু আঁকড়ে ধরে। দৃষ্টি দূর আকাশপানে রাখে। যেখানে ছোট্ট ছোট্ট অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। কোনো একদিন সন্ধ্যা-ও তার ব্যক্তিগত আকাশের বুকে এই সন্ধ্যাতারার ন্যায় জ্বলজ্বল করত। সুবিশাল আকাশ যেভাবে তার বুকে তারাগুলোকে আঁকড়ে রেখেছে। তার আকাশ-ও একইভাবে তাকে আগলে রাখত।
কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা হাসল। বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না সে হাসি। মনে পড়ল কোনো একরাতের কথা, যে রাতে আকাশ এই গাছের নিচে তাকে কোলে নিয়ে বসে তার হাত দ্বারা গিটার বাজিয়ে গান গাইছিল তাকে মিন করে। কত ভালোবাসা ছিল আকাশের মাঝে তার জন্য! আজ সেই আকাশ তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে৷ সন্ধ্যা যে মানতে পারছে না। চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে মেয়েটার। আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করা তারাগুলোর দিকে ঝাপসা চোখে চেয়ে সন্ধ্যা গেয়ে ওঠে,
“আমি তোমায় ভালোবাসি…এই জীবনের চেয়েও বেশি….কোনোদিনও বন্ধু ভুলতে পারবো না।
আমি তোমায় ভালোবাসি…এই জীবনের চেয়েও বেশি….কোনোদিনও বন্ধু ভুলতে পারবো না।
একদিন আইবা, তুমি আইবা রে….
সেইদিন আইসা বন্ধু আমায় পাইবা না…
গানের কণ্ঠ অনুসরণ করে আকাশ বকুল গাছতলায় এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে পড়ে মৃদু আবছা আলোয় গাছের সাথে হেলান দিয়ে সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে গান গাইছে,
একদিন আইবা, তুমি আইবা রে….
সেইদিন আইসা বন্ধু আমায় পাইবা না…
আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে থমথমে কণ্ঠে বলে, “কার জন্য গান গাইছ?”
আকাশের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তাকায় আকাশের দিকে। ইচ্ছে করল বলতে, ‘আপনাকে ভেবে গাইছিলাম। আপনি কি আমাকে স্বীকার করবেন? ফিরবেন আমার কাছে?’
মনের কথা মনেই চাপা পড়ে রইল। এই আকাশ তো সেই আকাশ নয়। যে তার পা’গ’লা’মি দেখে খুশি হবে! বরং এই আকাশ তার পা’গ’লা’মি দেখে তাকে পা’গ’ল উপাধি দেয়। সন্ধ্যা তার গালে গড়িয়ে পড়া নোনাপানি দু’হাতে মুছে নেয়। মৃদুস্বরে বলে,
“আপনি কেন শুনতে চাইছেন?”
আকাশ সাথে সাথে উত্তর খুঁজে পেল না। একটু পর বলে, “কোনো কারণ নেই। অ্যানিওয়ে, পা’গ’লদের এসব হ্যাবিট থাকে। ক্যারি অন।”
সন্ধ্যার বুক ফেটে কান্না এলো। আকাশের বলা পা’গ’ল শব্দটির ভার এতো বেশি লাগে কেন? আকাশের মুখ থেকেই কেন তাকে বারবার এই শব্দটি শুনতে হচ্ছে? সে আকাশকে ভালোবাসে বলে? নিজের আবেগ, ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রকাশ করে ফেলছে বলে? কিন্তু সে কি করবে? তার শুভ্র-পুরুষকে দেখলে যে তার মাথা ঠিক থাকে না৷ এটা কি তার দোষ?
সে চায়না আকাশের মুখ থেকে পা’গ’ল শব্দটি শুনতে। ভালোবাসার মানুষটার জন্য পা’গ’লা’মি করার কারণে, সেই মানুষটার থেকেই পা’গ’ল উপাধি পাওয়া যে বড্ড বেশি ক’ষ্টের, এটা সন্ধ্যা কাকে বোঝাবে?
সন্ধ্যা নিজেকে শ’ক্ত করতে চাইল। সে বারবার নিজের ভালোবাসার মানুষটার মানুষের কাছ থেকে পা’গ’ল শব্দটি শুনে এই ক’ষ্টের পরিমাণ আর বাড়াতে চায়না।
আকাশ জায়গাটি প্রস্থান করার জন্য এক পা বাড়ালে সন্ধ্যা নিজেকে সামলে শ’ক্ত করে বল,
“আমি পা’গ’ল নই।”
আকাশের পা থেমে যায়। বাদিকে ঘাড় বাঁকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“রিয়েলি? যার কোনো অস্বস্তি নেই তার জন্য কোনো সুস্থ মানুষ পা’গ’লা’মি করে? আর ইউ কিডিং উইথ মি?”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশের কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না তার। তার মনে হলো, তার সামনে দাঁড়ানো মানুষটা তার অপরিচিত। ভীষণ অপরিচিত। আর সে অপরিচিত মানুষদের সাথে কথা বলে না। এক মন আকাশকে অপরিচিত বললেও, আরেক বেহায়া মন যে এই আকাশকেই নিজের স্বামী ভাবে। আশা করে আকাশ তাকে ভালোবেসে একবার বুকে জড়িয়ে নিক। আগের মতো ভালোবাসুক। তাকে বিন্দুমাত্র আ’ঘা’ত না করুক। তার আগের আকাশ হয়ে যাক।
সন্ধ্যাকে এক ধ্যানে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে আকাশ সন্ধ্যার মুখের সামনে ডান হাতের দু’আঙুলের সাহায্যে চুটকি বাজিয়ে বলে, “হ্যালো?”
সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দৃষ্টি সরিয়ে নেয় আকাশের থেকে। নাহ সে দুর্বল হতে চায়না। অন্তত আকাশের সামনে তো নয়-ই। নিজেকে শ’ক্ত করে এখান থেকে চলে যাবার জন্য এক পা বাড়ালে আকাশ সন্ধ্যার হাত টেনে তার সম্মুখ বরাবর এনে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “অ্যান্সার চেয়েছি আমি।”
আকাশের কান্ডে সন্ধ্যা অবাক হয়। একদম তার মুখের সামনে আকাশের মুখে দৃষ্টি রাখে। আকাশের মুখে রা’গ স্পষ্ট। এতো কাছ থেকে আকাশকে দেখে সন্ধ্যা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। আকাশ কত সুন্দর! গায়ের রঙ কত উজ্জ্বল! তার গায়ের রঙ চাপা বলে সে নিজেকে ছোট করলে আকাশ রা’গ করত। আকাশের প্রিয় রঙের তালিকায় তার গায়ের রঙ চলে গিয়েছিল। অথচ আজ…..সন্ধ্যা শুকনো গলা ভেজায়। মাথাটা সামান্য নিচু করে তার হাত ধরে রাখা আকাশের হাতের দিকে তাকায়। বা হাত এগিয়ে এনে আকাশের হাত ধরতে চায়। বিষয়টি আকাশ খেয়াল করতেই সন্ধ্যার হাত ছেড়ে সন্ধ্যার কাঁধে হাত রেখে সন্ধ্যাকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়। চোখেমুখে প্রচন্ড বিরক্তি।
সন্ধ্যার অবাক হলো না। হলো ক’ষ্টে জর্জরিত। আকাশের বিরক্তি ভরা চাহনী তার চোখ এড়ায়না। মলিন মুখে চেয়ে দেখল অপরিচিত এক আকাশকে। ক’ষ্টগুলো চেপে নিজেকে সামলায় সন্ধ্যা। অতঃপর বলে,
“আমি অস্তিত্বহীন কারো জন্য পা’গ’লা’মি করিনা। আমি আমার শুভ্র-পুরুষের জন্য পা’গ’লা’মি করি। যার অস্তিত্ব আছে। পুরোপুরি আছে। আপনি অস্বীকার করলেই সব মিথ্যে হয়ে যাবে না।”
আকাশ থমথমে মুখে তাকায়৷ সন্ধ্যার ঝাপসা চোখজোড়ায় তার দৃষ্টি। সন্ধ্যার অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি কাজে সন্ধ্যার রিয়েকশন, সন্ধ্যার কথাগুলো তার কেন যেন মিথ্যে লাগছে না। একটা মেয়ে এভাবে মিথ্যা বলতে পারে বলে তার মনে হয়না। আকাশ জিজ্ঞেস করে,
“কে সে?”
সন্ধ্যা ধরা গলায় উত্তর করে,
“যদি বলি আপনি?”
সাথে সাথে আকাশ সন্ধ্যার চোয়াল শ’ক্ত করে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“ইউ লায়ার! বারবার একই মিথ্যা বলছিস! একদম জানে মে’রে ফেলব।”
হঠাৎ আকাশের এহেন কাজে সন্ধ্যা অবাক হলো। গালে ব্য’থা পেলেও মেয়েটা টুঁ-শব্দ করল না। আকাশের কথা বলার ধরনে তার বুকে চিনচিন ব্য’থা হয়। ইচ্ছে করল আকাশকে খুব শ’ক্ত করে কয়েকটা কথা শোনাতে। নিজেকে শ’ক্ত করতে চাইল, অথচ পারলো না। তার সামনে দাঁড়ানো মানুষটা তার কথা বুঝবে না জেনেও বোকা সন্ধ্যা নিজের বেহায়া মনের কাছে ব্যর্থ হয়ে আকাশের দিকে করুণ চোখে চেয়ে নিজের হয়ে সাফাই গায়,
“বিশ্বাস করুন, আমি মিথ্যে বলছিনা।”
আকাশ শান্ত চোখে তাকায়। হাত সন্ধ্যার গাল ধরে রাখা হাত শিথীল হয়। আবারও মনে হলো, সন্ধ্যা মিথ্যে বলছে না। আকাশ ঢোক গিলল। চোখ বুজে ফোঁস করে দু’বার শ্বাস ফেলে। এরপর চোখ মেলে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“যদিও আমার মনে হয়, তোমার হাসবেন্ড নেই। বাট যদি থেকেও থাকে, সে অন্যকেউ। আমি না। নেভার।”
কথাটা বলে আকাশ উল্টেদিকে ফিরে দাঁড়ায়। পকেট থেকে সিগারেট, লাইটার বের করে, সিগারেটে আ’গুন ধরিয়ে আবারও সিগারেট ফুঁকতে শুরু করে। সন্ধ্যা অবাক হয় আকাশের কথায়। মেয়েটার বড্ড জানতে ইচ্ছে হয়, আকাশ কেন তাকে এভাবে অস্বীকার করছে। কিন্তু সে এ ব্যাপারে আর কিচ্ছু বলল না। সন্ধ্যা ঢোক গিলে বলে,
“লায়ার আমি নই। আপনি। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই এটা বুঝতে পারবেন।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা আর এখানে দাঁড়ায় না। বড় বড় পায়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে সন্ধ্যার দিকে রে’গে তাকিয়ে আছে। ইচ্ছে করল মেয়েটাকে ঠাস ঠাস করে লাগাতে। আপাতত নিজেকে সংযত করল। বিড়বিড় করল, “হিসাব শুরু হয়ে গেছে। দেখতে থাক বে’য়া’দ’ব মেয়ে।”
ঘড়ির কাটা রাত ১১ টার ঘরে।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে নিয়ে তার ঘরে শুয়েছে। সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। মেয়েটা আজ এতো পরিমাণ কেঁদেছে, চোখমুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় অনেকক্ষণ যাবৎ। প্রায় একঘণ্টার মাথায় সন্ধ্যা ঘুমিয়ে যায়। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার মাথায় একটা চুমু আঁকে। মলিন মুখে মেয়ের দিকে চেয়ে থাকে। কি করবেন এই মেয়েটাকে নিয়ে? সে সত্যিই বুঝতে পারছে না আকাশ কেন এমন করছে। আকাশের বদলে যাওয়ায় যতটা না অবাক হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে সন্ধ্যার সাথে এরূপ অদ্ভুদ আচরণে।
আকাশ বাড়িতে নেই। কখন বেরিয়েছে তাও জানেনা। সৌম্য চলে যাবার পর আকাশকেও আর দেখেনি। কোথায় গিয়েছে কে জানে! গত ক’বছর যে আকাশকে পেয়েছিল, সে ছিল তার মনের মতো। আর এই আকাশ…আসমানী নওয়ান ভাবতে পারছে না৷ সামনে কি অপেক্ষা করছে জানেন না। কিচ্ছু ভাবতে পারছেন না তিনি। কলিংবেলের আওয়াজে ভদ্রমহিলার ভাবনায় ছেদ ঘটে৷ তাকে জাড়িয়ে রাখা সন্ধ্যার হাত আস্তে করে সরিয়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। কম্বল দিয়ে সন্ধ্যাকে ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে ঘরের দরজা চাপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
আসমানী নওয়ান অরুণকে দেখে এগিয়ে আসে। কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। অরুণ বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“আন্টি আপনার সাথে ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।”
আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে সোফায় বসে বলে, “আমারো তোমার সাথে কথা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। বসো।”
অরুণ বসল আসমানী নওয়ানের সম্মুখ বরাবর। অরুণ কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। আকাশের স্মৃতি ন’ষ্ট হওয়ায় তাদের উপর যা প্রভাব পড়বে, তা তারা মেনে নিতে পারলেও সন্ধ্যা মানতে পারবে না৷ কি করে মানবে? আকাশ যে সন্ধ্যাকেই অস্বীকার করছে। অরুণ নিজেকে শান্ত করে আসমানী নওয়ানকে নিয়াজের বলা সব কথা বলে। সন্ধ্যাকে না চেনার কারণ যে আকাশের স্মৃতি চলে যাওয়ার কারণে এটা আসমানী নওয়ান বুঝলেও সৌম্য আর সন্ধ্যার সাথে আকাশের করা বিহেভ এর কারণ বুঝল না। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপার নিয়ে তিনি চিন্তিত সেটা ভাবলে তার নিজেরই এলোমেলো লাগছে। অরুণের দিকে চেয়ে বলে,
“অরুণ আমি কোনো ভিডিও পাচ্ছিনা। আকাশ আর জান্নাতের রেজিস্ট্রি পেপার থেকে শুরু করে, এ যাবৎ আমাদের বাড়িতে সিসিটিভিতে যত ফুটেজ ছিল। এছাড়া গত তিন বছরের যত ভিডিও ছিল কিচ্ছু নেই। অনেক খুঁজেছি। কোথাও নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম কাজের মেয়ের বাচ্চা রেজিস্ট্রি পেপার ছিঁড়েছে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছা করে এই কাজ করেছে। কিন্তু কে?”
অরুণ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। এরকম হলে আকাশকে তারা কিভাবে ম্যানেজ করবে? সবচেয়ে বড় কথা এই কাজগুলো কে করেছে? কিছু একটা ভেবে বলে, “জেডি?”
আসমানী নওয়ান তাকায় অরুণের দিকে। থমথমে কণ্ঠে বলে,
“জেডি নিজের স্বা’র্থ ছাড়া কিছু করেনা৷ সন্ধ্যা, সৌম্য’র সাথে জেডির কোনো কানেকশন নেই। এখানে ওর কোনো স্বা’র্থ নেই। ও আকাশকে আবার আগের ন্যায় নিজের মতো বানিয়েছে। কিন্তু এসব জেডি করেনি।”
অরুণ চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“তাহলে কে করল এসব? আকাশের এক্সিডেন্ট টা-ও সে করায়নি তো আন্টি?”
আসমানী নওয়ান ছোট করে বলে,
“জানিনা। কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা।”
আসমানী নওয়ান, অরুণ দু’জনের চোখেমুখেই চিন্তা। কি হচ্ছে এসব? কেন হচ্ছে? কে করছে? সবমিলিয়ে দু’জনের মাথা ব্য’থা শুরু হলো।
সৌম্য আকাশদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস কাউন্টারে এসেছিল। বাস পাচ্ছিল না। বাস পেলেও সব সিট বুক ছিল। সর্বশেষে মাঝরাতের একটি বাসের একদম শেষে দু’টো সিট পায়। এজন্য ঢাকা থেকে বগুড়া আসতে আসতে সকাল হয়ে যায়। বাস থেকে নেমে সৌম্য ইরাকে নিয়ে সিএনজিতে করে গ্রামে আসে। গ্রামের বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল প্রায় ১০ টা বেজে গিয়েছে। বাড়ি থেকে খানিক দূরত্বে সৌম্য আর ইরা ভ্যান থেকে নেমে দাঁড়ায়। পকেট থেকে মানি ব্যাগ বের করে ভ্যানওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে ইরার হাত ধরে বাড়ির দিকে এগোয় সৌম্য৷ গ্রামের পরিচিত অনেকে সৌম্যকে জিজ্ঞেস করে, ‘সে কেমন আছে।’ সৌম্য ছোট করে উত্তর করে। পাল্টা প্রশ্ন করেনা। বাড়তি কোনো কথা-ও বলে না। চুপচাপ এগোয়। ইরা সৌম্য’র দিকে একবার তাকিয়ে দেখে। প্রিয় মানুষের মলিন মুখ দেখে ইরার মুখখানা বিষাদে ভরে যায়। কিছু বলল না। সৌম্য’র হাত ধরে ধীরপায়ে এগিয়ে যায়। কানে মেশিনের শব্দ এসে ধাক্কা খাচ্ছে। বাড়ি করার জন্য যেসব মেশিন ব্যবহার হয়, সেইম সেরকম মেশিনের শব্দ। সামনে যত এগোয়, মেশিনের শব্দ তত গাঢ় হয়। সৌম্য, ইরা দু’জনেই ভ্রু কোঁচকালো। এই গ্রামে আবার কে বাড়ি করছে? কৌতুহলী কণ্ঠে ইরা জিজ্ঞেস করে,
“আমাদের বাড়ির পাশে কেউ কি বাড়ি করছে সৌম্য?”
সৌম্য উত্তর দেয়, “জানিনা তো।”
দু’মিনিটের মাথায় ইরা, সৌম্য দু’জনেই তাদের বাড়ির আঙিনায় এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সামনে তাকিয়ে কেউই আর এগোনোর শক্তি পায়না। দু’জনেই বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তাদের স্বপ্নের বাড়িটির দিকে। এতোক্ষণ ভাবছিল, তাদের বাড়ির আশেপাশে কেউ বাড়ি করছে, অথচ তাদের ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো, বাড়ি ভাঙার মেশিন দ্বারা তাদের বাড়ি ভাঙতে দেখে।
সৌম্য এক সেকেন্ড সময় ন’ষ্ট করল না। একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে বলে, “আমার বাড়ি কেন ভাঙছিস তোরা? কোন সাহসে আমার বাড়ি ভাঙছিস?”
সৌম্য’র চিৎকারে কিছু শ্রমিক ভ্রু কুঁচকে তাকায়। দু’জন কাজ ফেলে এগিয়ে এসে বলে, “কিছু বলছেন?”
সৌম্য যাথাসম্ভব নিজেকে শান্ত করে। বলে, “আমার বাড়ি কেন ভাঙছেন?”
ভদ্রলোক জানায়,
“আমরা তো মালিককে চিনিনা ভাই। আমরা শ্রমিক। আমাদের এখানে এনে কাজ করতে দেয়া হয়েছে।”
সৌম্য কি বলবে বুঝল না। কে তার বাড়িতে শ্রমিক পাঠিয়েছে বাড়ি ভাঙার জন্য? তখন-ই চারপাশে গুমগুম শব্দে সকলে উপরদিকে তাকায়।
সামান্য উঁচুতে একটি হেলিকপ্টার ঘুরছে। ধীরে ধীরে হেলিকপ্টারটি একটি ফাঁকা জায়গায় ল্যান্ড করে। একজন হেলিকপ্টারের দরজা খুলে দিলে ভেতর থেকে আকাশ বেরিয়ে আসে। পরনে সাদা প্যান্ট, শার্ট। তার উপর সাদা ওভারকোর্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। জুতোজোড়া-ও সাদা। আকাশ হেলিকপ্টারের পাশে দাঁড়িয়ে। দু’হাত ওভারকোর্টের পকেটে রাখে। দৃষ্টি সৌম্য’র পানে। আকাশের দু’পাশে দু’জন করে লোক দাঁড়ানো। যাদের পরনে কালো পোষাক।
সৌম্য, ইরা বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সৌম্য’র সম্মুখ বরাবর দাঁড়ায়। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে, সেটি ভাঁজ করে বুকের কাছে ঝুলিয়ে রাখে। এরপর সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,
“ফিলিংস কেমন?”
সৌম্য ঢোক গিলল। ভাঙা ভাঙা স্বরে বলে, “আপনি আমার বাড়ি…..
মাঝপথে আকাশ বলে,
“এটা তোর নয়। আমার বাড়ি। আমার জায়গা। বাড়িটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। ভেবেছি, এই দু’টাকার বাড়ি ভেঙে একটি ফ্যাক্টরি বানাবো এখানে। বুঝলি?”
সৌম্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কথা বলার ভাষা হারায় ছেলেটি। ছেলেটার অবুঝে ভরা মুখ দেখে আকাশ বাদিকে হাত বাড়িয়ে দু’আঙুলের সাহায্যে কিছু ইশারা করলে, একজন গার্ড আকাশের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দেয়। আকাশ কাগজটি সৌম্য’র সামনে ধরে হেয়ালি স্বরে বলে,
“হেই অবুঝ বালক, দেখে নে এটা কার জায়গা।”
সৌম্য কাগজটিতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। দলিলে আকাশের নাম যেমন জ্বলজ্বল করছে, তেমনি জ্বলজ্বল করছে তার সাক্ষর। সৌম্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। এই সাইন সে কবে করেছে? হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলো না। অবাক চোখে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি লেপ্টে। সৌম্য জমির দলিলটি ধরতে গেলে আকাশ হাত সরিয়ে ফেলে। আফসোসের সুরে বলে,
“লাভ নেই। এখান থেকে চলে যা। আমার জায়গার ত্রিসীমানায় তোকে দেখতে চাইনা। কথা বোঝা গেল?”
সৌম্য খুব করে হাতড়ালো একটা শব্দ উচ্চারণ করার জন্য। কিন্তু একটা ছোট্ট শব্দ-ও খুঁজে পেল না। শ’ক্ত পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে কেবল আকাশকে দেখল। যে আকাশকে সে চুল পরিমাণ চেনেনা। বহুক’ষ্টে উচ্চরণ করে,
“আমার সাথে কেন এমন করছেন?”
সৌম্য’র কথাটা আকাশের কাছে নিছকই এক কৌতুক মনে হলো। সে অদ্ভুদভাবে হেসে ফেলল। হঠাৎ-ই হাসি থামিয়ে আকাশ সৌম্য’র কলার ধরে, চোখমুখ শ’ক্ত করে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“ড্রামাবাজ! হিসেব ক’ষতে মাত্র শুরু করেছি। আরও অনেক বাকি। দেখতে থাক।”
কথাটা বলে আকাশ সৌম্যকে ধাক্কা দেয়ার মতো করে সৌম্য’র কলার ছেড়ে উল্টোদিকে ফিরে গটগট পায়ে এগিয়ে গিয়ে হেলিকপ্টারে উঠে পড়ে। একজন হেলিকপ্টারের দরজা বন্ধ করে দিলে হেলিকপ্টারটি জায়গা প্রস্থান করে।
ইরা দৌড়ে এসে সৌম্য’র হাত শ’ক্ত করে ধরল। চোখ বেয়ে তখন থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আকাশ কেন এমন করছে তাদের সাথে? সে বুঝতে পারেনা। ইরা বাড়িটির দিকে তাকায়। তাদের কত শখের বাড়ি আজ নিমিষেই ধ্বংস হয়ে গেল। এই বাড়িটি সৌম্য ঠিক তার পছন্দের মতো করে বানিয়েছিল। তার ইচ্ছে ছিল এরকম একটি গ্রামে সে আর সৌম্য খুব সুখে-শান্তিতে সংসার করবে। সৌম্য একটু একটু করে টাকা জমিয়ে এইখানে জায়গা কিনে বাড়ি করেছিল। কত ভালোবেসে সৌম্য এই বাড়ি বানিয়েছিল। সেই বাড়ি আজ এভাবে আকাশ ভেঙে ফেলল! ইরা ফুঁপিয়ে কাঁদে। বড্ড ক’ষ্ট হচ্ছে তার। এবার তারা কোথায় থাকবে?
সৌম্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতো বড় শক তার জন্য অপেক্ষা করছে, সে কল্পনাও করেনি। বুকটায় অস্বাভাবিক ব্য’থার উৎপত্তি হচ্ছে। কেমন মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। যেন সে সত্যিই প্রাণহীন এক মূর্তি!
প্রিয় মানুষটার জন্য গড়ে তোলা শখের বাড়ি আজ অস্তিত্বহীনের পথে। আহ! জীবন!
আকাশ আর সৌম্য’র ঘটনার পুরো ভিডিও এক যুবক তার ফোনে রেকর্ড করে। এরপর রেকর্ডটি সন্ধ্যার কাছে পাঠিয়ে দেয়। কাজ শেষে ছেলেটি বুক ভরে শ্বাস নিল। ছেলেটির পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো জুতো। মাথায় কালো ক্যাপ, কালো মাস্ক। পরিহিত কালো হুড়ির পকেটের মাঝে দু’হাত রাখা। মাস্কের আড়ালে সাদা চোখের মণি দু’টো জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। আকাশপানে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“স্যরি সন্ধ্যা! আমার প্রাণ তুই! আমার সোনাপাখি।”
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যা নামাজ পড়ে শুয়ে বসে ছিল। মাত্র ফোনটি হাতে নিলে একটি ভিডিও তার হোয়াটসঅ্যাপে আসে। কৌতুহলবশত সন্ধ্যা ভিডিওটি অপেন করে। প্রায় ১০ মিনিটের ভিডিও দেখে সন্ধ্যার মাথায় বাজ পড়ে। হাত থেকে ফোন পড়ে যায়। হাত-পা কাঁপছে তার। আকাশ এসব কি করে করতে পারে? তার ভাইয়ের মাথা রাখার ঠাঁই কি করে কে’ড়ে নিতে পারে? মেয়েটা মানতে পারেনা। সৌম্য ভাইয়া ভীষণ ক’ষ্ট পাচ্ছে। সন্ধ্যার সবকিছু এলোমেলো লাগে। এক পর্যায়ে সন্ধ্যা দু’হাতের মাঝে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আর পারছে না সে। আর কত সহ্য করবে? তার সৌম্য ভাইয়ার কথা ভেবে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ে মেয়েটা। বিড়বিড় করে,
“আমায় ক্ষমা কর সৌম্য ভাইয়া। আমায় ক্ষমা কর।”
বাড়িতে আসমানী নওয়ান নেই। কোথায় গিয়েছে সন্ধ্যা জানেনা। ভদ্রমহিলা বাড়ি থাকলে এতক্ষণে মেয়েটিকে আগলে নিতে দৌড়ে আসত। সন্ধ্যা কাঁদে। খুব কাঁদে। তার যে বড় ক’ষ্ট! তার স্বামী,, তার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন, বাবা-মায়ের মতো আগলে রাখা সৌম্য ভাইকে একের পর এক ক’ষ্ট দিচ্ছে। সন্ধ্যার দমবন্ধ লাগে। দমবন্ধকর অনুভূতি নিয়ে খুব ক’ষ্টে ডাকে, “আল্লাহ?”
এভাবে সন্ধ্যা প্রায় ৩০ মিনিটের মতো কাঁদে। ধীরে ধীরে কান্নার বেগ কমে আসে। আস্তে করে সে উঠে দাঁড়ায়। গাড়ির শব্দ পেয়ে সন্ধ্যা দ্রুত বেলকনিতে যায়। আকাশকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে সন্ধ্যা আর এক সেকেন্ড এখানে দাঁড়ালো না। একপ্রকার দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বড় বড় পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে।
তখনই আকাশ বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। সন্ধ্যা থেমে যায়। তাকায় আকাশের দিকে। এই মানুষটা তার আকাশ? এই নি’কৃ’ষ্ট মানুষটা? নাহ্ এই লোকটা আর যাই হোক, তার আকাশ নয়। তার আকাশ মোটেও এমন ছিল না। সে বড্ড ভালো ছিল। তাদের দু’ভাইবোনকে কত ভালোবাসত আকাশ? আর এই লোক? এই লোকটা এসেছে শুধু তাকে আর সৌম্য ভাইয়াকে ক’ষ্ট দিতে। তার সৌম্য ভাইয়াকে যে ক’ষ্ট দিবে, সে কোনোদিন তাকে ক্ষমা করবেনা। সন্ধ্যা আকাশের মতো দেখতে এই নি’কৃ’ষ্ট লোকটাকে কোনোদিন ক্ষমা করবেনা। কোনোদিন না। তার আকাশ ম’রে গিয়ে গিয়েছে। যে আকাশের তাকে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আছে কেবল তাকে ভালোবাসার। আকাশ সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল। তখন-ই সন্ধ্যা এগিয়ে গিয়ে আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। কান্নামাখা মুখটায় রা’গের আভা ছড়িয়ে।
বাঁধা পেয়ে আকাশ বিরক্ত হয়ে সামনে তাকায়। সন্ধ্যাকে দেখে ভ্রু কোঁচকালো। সন্ধ্যা শ’ক্ত গলায় বলে,
“সন্ধ্যামালতীকে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আমার শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালার নেই। আপনি ঠিকই বলেছিলেন, আমি আপনার সঙ্গে আমার শুভ্র-পুরুষকে গুলিয়ে ফেলেছি। আপনি আমার শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালা নয়। আপনি এভি। যার চেহারা অবিকল আমার শুভ্র-পুরুষের মতো হলেও আপনাদের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাৎ। আমার শুভ্র-পুরুষ ছিল শুভ্র রঙের মতো স্বচ্ছ। আর আপনি অস্বচ্ছ! যাকে বলে মানুষরূপী জা’নো’য়া’র।
আকাশ রা’গে কাঁপছে। সন্ধ্যার বলা জা’নো’য়া’র শব্দটি সে হজম করতে পারলো না। এক সেকেন্ড-ও সময় নিল না। বা হাত তুলে সন্ধ্যার ডানগালে একটা দাবাং মার্কা চড় মে’রে দেয়। সন্ধ্যা বাদিকে সামান্য হেলে যায়। গালটা জ্ব’লে উঠল। আকাশের থা’প্প’ড়ে আজ আর অবাক হলো না৷ তবে বুকের বা পাশটায় ব্য’থার সঞ্চার হয়। চোখদু’টো ভিজে ওঠে। সন্ধ্যা শ’ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিন্দুপরিমাণ জায়গা থেকে সরে যায় না।
আর ইচ্ছে করেনা নিজেকে সস্তা বানাতে। কার কাছে নিজেকে ছোট করবে? যার কাছে তার বিন্দু পরিমাণ মূল্য নেই? যে তাকে দু’পয়সা দাম দেয় না তার কাছে? নাহ, সন্ধ্যা আর নিজের মূল্য কমাবে না।
আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার চোয়াল শ’ক্ত করে ধরে রেখে সন্ধ্যার চোখে চোখ রেখে ফোঁসফোঁস করতে করতে হিসহিসিয়ে বলে,
“এতো সাহস কোথায় পেয়েছিস? আমাকে জা’নো’য়া’র বলিস? আমাকে? এই এভিকে?”
সন্ধ্যার মুখে ব্য’থার ছাপ। সে আকাশের রা’গে লালিত হওয়া চোখজোড়ায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আগের চেয়েও শ’ক্ত কণ্ঠে বলে,
“যে যেমন, তাকে তেমন নামে সম্মোধন করতে আমি বরাবরই সাহসী। আমার সৌম্য ভাইয়ার সাথে করা অন্যায়ের সকল হিসাব আমি গুনে গুনে নিব মিস্টার এভি ওরফে জা’নো’য়া…
আকাশ রে’গে সন্ধ্যাকে আরেকটা থাপ্পড় মা’রা’র জন্য হাত উঠালে সন্ধ্যার কথা থেমে যায়। ভ’য় পেয়ে দ্রুত চোখ বুজে নেয় মেয়েটা। জায়গা থেকে সরলো না, তবে মাথাটা সামান্য বাদিকে সরিয়ে নেয়। বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে নোনাজল গড়ায়। যেই আকাশ তাকে একটা থা’প্প’ড় মে’রে কত দুঃখ করত। আজ সেই আকাশের হাতে একটার পর একটা থা’প্প’ড় খেতে হচ্ছে। এই থা’প্প’ড় সন্ধ্যার গালের আগে বুকে গিয়ে লাগে। মেয়েটার দুঃখের অশ্রু থামলো না। কিন্তু সে শ’ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে আর নরম হবে না। এই লোকটার জন্য সে বুক ফেটে ম’রে গেলেও আর ফিরে তাকাবে না। বরং সে তার ভাইয়ের সাথে করা অন্যায়ের হিসাব নিবে।
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৫ (২)
এদিকে আকাশের হাত মাঝপথেই থেমে গিয়েছে। সন্ধ্যার বন্ধ চোখ বেয়ে অনবরত নোনাজল গড়াতে দেখে আকাশ ঢোক গিলল। থা’প্প’ড়ের কারণে উজ্জ্বল শ্যা’মলা গাল হালকা লাল হয়ে উঠেছে। আকাশ ভেতরে ভেতরে ছটফটালো। থা’প্প’ড় মা’রা’র জন্য যে হাত তুলেছিল, সে হাত ফিরিয়ে এনে তার গলায় ঝুলানো চেইন শ’ক্ত করে ধরে। দৃষ্টি সন্ধ্যার দৃঢ় অথচ ব্য’থার ছাপ যুক্ত মুখাবয়বে। আকাশ হাসফাস করে। তার অস্থির লাগছে।
এক পর্যায়ে নিজের অজান্তেই আকাশের মুখ থেকে থমথমে কণ্ঠে বেরিয়ে আসে তিনটে শব্দ,
“কান্না অফ কর।”
