Home আযদাহা আযদাহা পর্ব ২০

আযদাহা পর্ব ২০

আযদাহা পর্ব ২০
সাবিলা সাবি

রাত পেরিয়ে ভোরের হালকা আলোর আভা ছড়িয়ে পড়লেও ফিওনার মন স্থির নয়, সে এখনো গ্লাস হাউজের স্বচ্ছ কাচের বাইরে তাকিয়ে আছে।য়এই পরবাসে, এই বন্দিত্বে আজ তার মনে পড়ছে গ্রান্ডপা, মিস ঝাং, লিয়া আর লিনের কথা—সেই চেনা মুখগুলো, সেই আন্তরিক হাসি আর পরিচিত যত্নের স্পর্শ। জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই মায়াময় স্মৃতিগুলো আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে, আর তাঁর অন্তরে গভীর শূন্যতা জাগিয়ে তুলেছে।
তার পড়াশোনা, তার ভবিষ্যৎ সবকিছু এই পরাধীনতার অন্ধকারে ম্লান হয়ে গেছে। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছে—এই কাঁচের খাঁচার বাইরে কি আদৌ মুক্তি আছে? সে কি আবারও সেই চেনা পৃথিবীর আলোয় ফিরে যেতে পারবে, নাকি এই বন্দিত্বই তার চিরন্তন পরিণতি?

মনে পড়ছে সেই দিনের কথা, যখন তার বাবা-মায়ের সাথে উৎসবের আনন্দে ছুটে আসছিলো চীনের বেইজিং শহরে গ্রান্ডপার বাড়িতে। সেদিনের সেই বি*ধ্বংসী দুর্ঘ*টনা, সেই রক্তে*র লাল ছোপ আর প্রাণহীন দেহগুলোর মাঝে একমাত্র সে বেঁচে গিয়েছিল।এখন ভাবছে হয়তো সেদিনই মৃ*ত্যু তার জন্য সবচেয়ে সঠিক পরিণতি ছিল। অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকা, এই বেঁচে থাকার বোঝা এখন তাকে আরো ক্লান্ত করে তুলছে। তার অবচেতন মনে প্রার্থনা জাগে, যদি সে বাবা-মায়ের পাশে সেই রাতেই চলে যেতে পারতো, তবে হয়তো আজকের এই বন্দিত্ব আর অসহ্য একাকিত্ব তাকে আর সহ্য করতে হতো না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ফিওনার চোখে ম্লান অশ্রু ঝরছে, ভোরের হালকা আলোয় মিশে যাচ্ছে। এই একাকিত্বে, তার অসহায় হৃদয়ে এক অদ্ভুত অবসাদ নেমে এসেছে, জীবনের প্রতি সবটুকু আশা মুছে গেছে।
ফিওনা এক দফা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ মনে মনে স্বপ্ন বুনলো—যদি এমন হতো, কোনো এক অলৌকিকভাবে তার জীবনে প্রিন্স চার্মিং এসে হাজির হতো। এক দুর্দান্ত, সাহসী মানুষ, যে নির্ভীকভাবে ওই শয়তান ড্রাগ*নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে পরাস্ত করতে পারবে।
তার স্বপ্নে সেই প্রিন্স যেন যুদ্ধের প্রতিমূর্তি, মুখে অপরাজেয় দৃঢ়তা, চোখে অটল বিশ্বাস। সে এগিয়ে এসে শক্ত হাতে তার হাত ধরে নিয়ে যায় তাকে, এই বন্দিত্ব,এই নিরাশার দেয়াল মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে।ফিওনা কল্পনা করে, প্রিন্স চার্মিং তাকে মুক্তির আলোর পথে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে নেই কোনো বাধা, নেই কোনো দ্বন্দ্ব,শুধু স্বাধীনতার নির্মল বাতাস।
তবু,তার মনের কোণায় এক ধরনের সংশয় রয়ে যায়।এমন এক বাস্তবতা,যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে ব্যবধান এক গভীর শূন্যতা। ফিওনার বুকের গভীর থেকে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি এমন কেউ আছে?এই নির্জন পরবাসে কি সত্যিই তার প্রিন্স চার্মিং আসবে তাকে বাঁচাতে?

জ্যাসপারের চোখেও আজকে রাতে একবিন্দু নিদ্রা ছিলোনা। শীতল, ধূসর ভোররাত ধীরে ধীরে তাকে আচ্ছন্ন করে রাখছে এক অদ্ভুত ঘোরের মতো। এই প্রথমবার, তাঁর মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় বয়ে চলেছে অচেনা এক আবেগের প্রবাহ, যা আগে কখনো অনুভব করেনি। মনে হচ্ছে,কোথাও কিছু ছিন্নভিন্ন হচ্ছে ভেতরে কোনো শক্ত বন্ধন আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে যাচ্ছে।
তার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে এক অজানা আকাঙ্ক্ষায়, সেই উপলব্ধির উৎস কোথায়—সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। এক অমোঘ অস্থিরতা তার ভিতর দানা বাঁধছে, কেবলমাত্র যাকে অনুভব করা যায়,কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। এই মনোযোগহীনতার পথে কে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কোথায় তার সেই নির্দয় লক্ষ্য যে উদ্দেশ্যে এতদূর পথ পাড়ি দিয়েছিলো?
সে জানে, তার যাত্রার এক অমোঘ লক্ষ্য ছিলো—তার ভাইকে উদ্ধার, প্রতিশোধ, আর এক রাজ্যের সুরক্ষা।কিন্তু আজ সেই লক্ষ্য কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে,আকাশে উড়ন্ত ধূমকেতুর মতো এক রহস্যময় সুর তার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছে। জ্যাসপারের শক্ত মনের ভিতর আজ এক পলক কম্পন—তাকে দ্বিধার পথে ঠেলে দিচ্ছে,
স্বপ্নের অপূর্ণতার মতো অমোঘ রহস্যে আবদ্ধ করে রাখছে।

জ্যাসপার সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে, কোনো গোপন মিশনে। এটি সেই একই কাজ, যেটা সে এখানে আসার পর থেকে নিয়মিত করছে, অথচ আলবিরা কিংবা থারিনিয়াস কেউই জানে না এর উদ্দেশ্য বা গন্তব্য।
এদিকে ফিওনা আর অ্যাকুয়ারা সকালের নাস্তা সেরে রান্নাঘর গুছাচ্ছে। সূর্যের আলোয় রান্নাঘর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, আর সকালের হালকা হাওয়াকিছুটা স্বস্তি এনে দিচ্ছে। এই সময়ে ফিওনা অ্যকুয়ারার পাশে এসে ফিসফিস করে বলল,
“বলছিলাম যে,অ্যাকু, তুমি আমাকে একটা সাহায্য করতে পারবে?”
অ্যাকুয়ারা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “হ্যাঁ, বলো কী সাহায্য?”
ফিওনার কণ্ঠে একটু নিরাশার ছাপ ফুটে উঠল, “এখানে তো টিভি, মোবাইল কিছুই নেই, সময় কাটানোটা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।তুমি কি কিছু উপন্যাস, নোবেল বা বই এনে দিতে পারবে? সেগুলো পড়ে অন্তত সময়টা কাটানো যেতো।”

অ্যাকুয়ারা মাথা নেড়ে বলল,“হুম,বুঝতে পারছি। ঠিক আছে, আমি তোমার জন্য কিছু বইয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব।” ফিওনার মুখে খুশির আভা ফুটে উঠল একটু মুক্তির স্বাদ পেল সে।
অ্যাকুয়ারা কিছুটা বিস্ময়ের সুরে বলল, “প্রিন্স সকাল সকাল কোথায় চলে গেলো?”
ফিওনা তার মনের মধ্যে এক চিলতে স্বস্তির হাসি নিয়ে ভাবল,”ভালোই হয়েছে। ওই ফায়ার মনস্টারটা যতক্ষণ থাকে, আশেপাশে এক অদ্ভুত অস্বস্তি ছেয়ে থাকে।এমন নয় যে সে তাকে দেখে শুধু আতঙ্কিত হয়,বরং তার উপস্থিতিতে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে যায়।ফিওনার মনে হয়, তার স্বাধীনতা কোথাও হারিয়ে যায়, আর নিজেকে আরো ছোটো মনে হয় সেই অগ্নিসম শক্তির সামনে।
ফায়ার মনস্টার -এই নামটাই তার মন থেকে উঠে আসে। ফিওনার চোখে জ্যাসপারকে কেবল এই নামেই যেন চেনা যায়।

বিকেল গড়িয়ে ধীরে ধীরে সোনালি আভা মুছে সন্ধ্যার নরম আলো এসে মিশল আকাশের গাঢ় নীলের সঙ্গে।পাহাড়ের চূড়ায় বসে মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া নিতে নিতে থারিনিয়াস আর আলবিরা দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে—একটা প্রশান্ত নীরবতা তাদের ঘিরে রেখেছে।
আলবিরা হঠাৎ আনমনে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা,থারিনিয়াস, তোমার কাছে কোথায় বেশি ভালো লাগে? ভেনাসে নাকি পৃথিবীতে?”
থারিনিয়াস একটু হাসল, এ প্রশ্নে কোনো গোপন আনন্দ আছে। “আমার কাছে ভেনাসই ভালো লাগে,” সে ধীরে বলে উঠল, “সেখানেই আমি ড্রাগন রূপে নিজেকে প্রকাশ করতে পারি, নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগের স্বাধীনতা পাই। এই পৃথিবীতে সে স্বাধীনতা কোথায়?”

আলবিরা একটু দূরে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “কিন্তু থারিনিয়াস, আমার তো পৃথিবীতেই ভালো লাগে।এখানকার প্রকৃতি, এর হাওয়া, এর জলবায়ু অনেক সুন্দর।ৎআর… এর সাথে একটা জিনিসও ভালো লাগে।”
থারিনিয়াস ভ্রু কুঁচকে তাকাল, কিছুটা কৌতূহলী হয়ে বলল, “কোন জিনিস?”
আলবিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল,তারপর তার চোখে এক বিষণ্ণ আলোর ঝিলিক ফুটে উঠল। “এই পৃথিবীর মানুষের জীবনধারা। তাদের সরলতা,আর সেই ছোটখাট স্বপ্নগুলো যা কখনো পূর্ণ হয়,আবার কখনো শুধু কল্পনায় রয়ে যায়।এখানে প্রকৃতির সাথে সেই মানুষগুলোর আবেগ মিশে গিয়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টি করেছে, যা ভেনাসে কখনো পাইনি।”
থারিনিয়াস আলবিরার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল—একটা গভীর প্রশান্তি তাদের দুজনকে অব্যক্তভাবে সংযুক্ত করে রেখেছে।
আলবিরা চুপ করে মাথা নিচু করে ফেলল।সন্ধ্যার হালকা বাতাসে তার চোখের কোণে জমে থাকা জল চিকচিক করে উঠল।

“দেখো,থারিনিয়াস,” আলবিরা কাঁপা কণ্ঠে বলল, “এখানে পৃথিবীর মানুষ নিজেদের মনের গভীরতম চাওয়াগুলোকে অবলম্বন করেই পথ চলতে পারে। যখন দুজন মানুষ একে অপরকে মন থেকে চায়,তখন তাদের মিল হয়ে যায়—অভ্যন্তরীণ সংযোগ, হৃদয়ের শক্তি… স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু ঘটে যায়। আর আমাদের দেখো, আমাদের তো সেই সংযোগ খুঁজে পাওয়ার জন্যই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়! যদি সেটা একশো শতাংশ না মেলে, তবে কিছুই হয় না।আমাদের অস্তিত্বের এই কৃত্রিমতায় সবকিছু আটকে আছে।”

থারিনিয়াস বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল,সে কখনো আলবিরাকে এমনভাবে দেখেনি।আলবিরার চোখে জমে থাকা অশ্রুথারিনিয়াসের মনের গভীরে গিয়ে আঘাত করল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার কথাগুলো আটকে রইল।
আলবিরা তার চোখ মুছতে মুছতে বলল, “কখনো কখনো মনে হয়, যদি আমরাও পৃথিবীর মতো সহজে ভালোবাসতে পারতাম! আমাদের এই কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা না থাকলে… হয়তো আমাদের জীবনটা ভিন্ন হতো।”
থারিনিয়াস তার কাঁধে হাত রাখল,কিন্তু কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। সেই মুহূর্তে,দুজনেই বুঝতে পারল তাদের মাঝে এক অপূর্ণতা বাসা বেঁধে আছে—একটা আকাঙ্ক্ষা যা তারা স্পর্শ করতে পারে না।
থারিনিয়াস দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইল আলবিরার দিকে।তার চোখে বেদনার এক গাঢ় ছাপ ফুটে উঠেছে, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

“তুমি ঠিকই বলছো,আলবিরা,” থারিনিয়াস শান্তভাবে বলল। “আমরা মন থেকে একে অপরকে চাই, কিন্তু এই সফটওয়্যারের প্রাচীর আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের মধ্যে শতকরা পূর্ণ মিল না থাকলে আমাদের এক হতে দেওয়া হয় না। যদি পৃথিবীর মানুষ হতাম, তবে হয়তো এই বাধা ভেঙে পালিয়ে যেতে পারতাম আমরা, নিজেদের মতো করে জীবন গড়ে নিতে পারতাম।”
আলবিরা মাথা নাড়ল, তার চোখে গভীর আক্ষেপ। “কিন্তু আমাদের তো পালানোর উপায় নেই, থারিনিয়াস।আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ এক কৃত্রিম অ্যালগরিদমের হাতে। পৃথিবীর মানুষদের মতো নিজেদের ইচ্ছেমতো জীবন গড়তে পারা আমাদের জন্য শুধুই এক স্বপ্ন। আর আমাদের যদি ড্রাগন বংশের পরম্পরা ধরে রাখতে হয়, তবে এই সফটওয়্যার বাধ্যতামূলক।”

থারিনিয়াস চুপ করে রইল, তার মধ্যে এক গভীর কষ্ট জমা হতে লাগল। তাদের এই সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা,এই বাধা… তার হৃদয়ের এক অজানা অংশে আঘাত হানল।আলবিরা ভেবেছিল হয়তো থারিনিয়াস কোনো কথা বলবে, কোনো আশ্বাস দেবে। কিন্তু সে বুঝতে পারল—এই কঠোর বাস্তবতার সামনে, তাদের কিছুই করার নেই।
“এই নিয়মগুলো আমাদের ইচ্ছেগুলোকে কখনোই বোঝে না,” থারিনিয়াস মৃদুস্বরে বলল, “কিন্তু আমি জানি, আলবিরা, কোনো একভাবে… আমাদের মধ্যে এই মনের মিল, এই চাওয়াটা হয়তো কখনো মিথ্যে নয়।তবুও, নিয়তির খেলা আমাদের সেই ইচ্ছেকে অস্বীকার করে দেয়।

হঠাৎ আলবিরা প্রশ্ন করলো “তাও ভালো আমরা এই ভালোবাসার অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারি কিন্তু প্রিন্স তার মধ্যে তো এসব কিছুই নেই, যদি তার মধ্যে ও এমন অনুভূতি থাকতো তাহলে কি হতো?”
থারিনিয়াস আলবিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “তুমি কি বলছো,আলবিরা? প্রিন্সের মধ্যে এই অনুভূতি অসম্ভব, সে শুধু দায়িত্ব পালন করেন, ভালোবাসার ধারণা তাঁর কাছে একেবারেই অজানা। আর তাছাড়া,তাঁর জন্য তো পার্টনার ইতোমধ্যেই ঠিক করা আছে—প্রিন্সেস অ্যালিসা। তাঁকে ভালোবাসা বা মায়া-মমতার মতো জটিল অনুভূতিতে জড়ানোর কোনো প্রয়োজনই নেই।”

আলবিরা মৃদু শ্বাস ফেলল। “তবে থারিনিয়াস, এমন যদি হতো প্রিন্সের মধ্যে হঠাৎ করে ভালোবাসার বোধ জেগে উঠতো? যদি কোনো অলৌকিকভাবে তাঁর হৃদয়ে অনুভূতির সঞ্চার হতো, তাহলে কী হতো?”
থারিনিয়াস একটু থেমে বলল, “তা হলে হয়তো তিনি বুঝতে পারতেন যে এই অনুভূতিটা কেমন শক্তিশালী আর কেমন বিপজ্জনকও। কিন্তু প্রিন্স তো এমন কিছু অনুভবের জন্য তৈরি নন, আলবিরা। তার মধ্যে লাভ ফাংশনাল ডিলিট করে দেয়া হয়েছে —যেখানে অনুভূতির কোনো স্থান নেই।”
আলবিরা মাথা নাড়ল, “হয়তো তুমি ঠিকই বলছো।প্রিন্স যদি কখনো কাউকে ভালোবাসার মতো দুর্বল হতেন তবে তাঁর এই শক্তি ও দায়িত্বের ভার হয়তো তাঁর জন্য বোঝা হয়ে যেত। তবু, মাঝে মাঝে ভাবি… হয়তো এই কঠোরতায়ও একধরনের শূন্যতা আছে। হয়তো তাঁর মধ্যেও কোথাও লুকিয়ে আছে ভালোবাসার মতো কোমল অনুভূতি, যা আমাদের মতো সাধারণ ড্রাগনও বুঝতে পারে না।”
থারিনিয়াস আবার চুপ হয়ে গেল।প্রিন্সের জীবন আর তাঁর দায়িত্বের কথা ভাবতে গিয়ে তাদের নিজেদের জীবনকেই আরও নিরানন্দ,আরও সংকীর্ণ মনে হলো।

রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙার মতো আর কোনো শব্দ নেই।ফিওনা একা একা ডাইনিং টেবিলে বসে খাবারের শেষ কাটা চালাচ্ছে। কক্ষের শূন্যতায় সে বারবার তাকিয়ে দেখে, কিন্তু জ্যাসপার এখনো ফেরেনি। দূরের গুমোট অন্ধকারে, ফিওনার মনে শঙ্কার একটি ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, জ্যাসপার নিঃসঙ্গ পায়ে হাঁটছে চীনের নির্জন,শীতল রাস্তায়।চারপাশে এক অমোঘ অন্ধকার মেঘালির মতো জড়িয়ে রয়েছে।হঠাৎ,অন্ধকারের মধ্যে থেকে ছায়া-আঁধারে ঢাকা কিছু অবয়ব তার চারপাশে ঘিরে ধরে। জ্যাসপার তাদের শনাক্ত করতে চেষ্টা করে, কিন্তু সে দ্রুতই অনুভব করে তাদের অভিসন্ধি। একে একে, তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে এক অশুভ কণ্ঠে বললো, “যা যা আছে,সব বের কর। মোবাইল, টাকা— সবকিছু এখুনি দে আমাদের কাছে।”

জ্যাসপার স্থির চোখে তার চারপাশের মুখগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তার চোখে সানগ্লাস, মুখে মাস্ক,তবুও তার মুখের রেখায় কোনো ভয় বা উদ্বেগের চিহ্ন নেই। একজন তীক্ষ্ণ ছুরির ঝলক তুলে ধরেছে তার দিকে, আরেকজন বন্দুকের নলের আঘাতে তাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
হাতের ছুরি ঝলকাচ্ছে চাঁদের কিরণে,তাদের চোখে এক আগ্রাসী হিংস্র*তা ফুটে উঠেছে রাতের অন্ধকারে এদের রক্ত*পিপাসা শীতল বাতাসকে আরও শীতল করে তুলছে।
জ্যাসপার একদৃষ্টিতে তাদের চোখে তাকিয়ে আছে একটা অদৃশ্য শক্তি তার চারপাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে সেই রহস্যময় দৃষ্টি, যা দেখে অপারাধীরা এক মুহূর্তে থমকে যায়।

আচমকাই জ্যাসপারের চোখে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো, আর এক মুহূর্তেই সে ভুলে গেলো ভেনাসের সেই কঠোর নিয়ম—মানবজাতির প্রতি কোনো ক্ষতি না করার আদেশ। ফুরফুরে মেজাজের এক বদলে যাওয়া রূপে সে দ্রুততার সাথে নিজের কপালে ঠেকানো বন্দুকের দিকে হাত বাড়ালো। শক্ত হাতে বন্দুকসহ আক্রমণকারীর হাতটা মুচড়ে ধরলো,কোনোমতেই তার মাথায় এই অস্ত্রের হুমকি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
আকাশের গর্জনের মতো তার ক্রোধ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো, চোখে ঘনীভূত মেঘের গাঢ় ছায়া—এ এক আদিম আর ভয়ংকর শক্তি,যার সম্মুখে কোনো মানুষকে দাঁড় করানো বিপজ্জনক।
জ্যাসপারের শক্ত হাতে মুচড়ে ধরা আক্রমণকারীর কণ্ঠ থেকে অসহায় গোঙানির শব্দ বের হলো, কিন্তু এর মধ্যেই আরেকজন সাহসী এগিয়ে আসতে শুরু করল।তার চোখের পলকে জ্যাসপার সজোরে লোকটার বুকের মধ্যে এক লাথি মারলো, যার শক্তিতে লোকটি ছিটকে গিয়ে পাশের লোহার খাম্বার সাথে ধাক্কা খেলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে জ্যাসপারের সানগ্লাস চোখ থেকে নিচে পড়ে গেল।আশেপাশে দাঁড়ানো সব ছিনতাইকারী হতবাক হয়ে গেলো—তার চোখদুটো ঠিক সবুজ পান্নার মতো, সৌন্দর্যে অভিভূত কিন্তু তাতে প্রগাঢ় ভয় ছড়িয়ে আছে, এক আদিম হিং*স্রতা।

এমন সময় আরেকজন লোক ছুরি হাতে এগিয়ে এসে তাকে আঘাত করতে উদ্যত হলো। জ্যাসপার ঝট করে নিজের হাত বাড়িয়ে ছুরিটা ঠেকিয়ে দিলো। কিন্তু তার নিজের হাতে আঘাত লেগে গেল, আর হাতের কাটা থেকে ধীরে ধীরে রক্তের মতো এক ধরনের তরল বের হতে শুরু করল—লাল নয়, সবুজাভ, বিষাক্ত শৈলীর এক তরল। সে নিজেই বুঝল, এই রক্ত কোনো সাধারণ মানবীয় নয়, বরং এক ভিনগ্রহের রহস্যপূর্ণ প্রমাণ।
সবুজ রক্তের অদ্ভুত ঝলক দেখে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে গেল। তাদের চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল, কারণ তখনই স্পষ্ট হলো—জ্যাসপার কোনো সাধারণ মানুষ নয়। বুঝতে পেরে ভয় তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু জ্যাসপারও বুঝল, এই মানুষগুলোকে ছেড়ে যাওয়া তার জন্য আরও বিপদ ডেকে আনবে।
এমন সময়,একজন লোক সাহস করে গালি ছুঁড়ে দিলো, “বাস্টার্ড, কে তুই?!”
শব্দগুলো আগুনের মত জ্বলন্ত তীর হয়ে তার রাগের স্ফুলিঙ্গে এসে পড়ল। মুহূর্তেই জ্যাসপারের ভেতর ধিকিধিকি জ্বলে ওঠা ক্রোধের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না।হঠাৎ তাদের সামনে তার মানবসত্তার সব বাঁধ ভেঙে গেল, আর সে ধারণ করল নিজের আসল রূপ—এক ভয়ঙ্কর, মহাকায় সবুজ ড্রাগন!

তার ডানা বিশাল, আকাশ আচ্ছন্ন করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে,আর তার দাতগুলো তীক্ষ্ণ,হিং*স্রতার এক নগ্ন প্রকাশ। এ ভয়াবহ রূপ দেখে গুন্ডারা প্রায় বোবা হয়ে গেল, তাদের ঠোঁট থেকে কোনো শব্দ বের হল না। তারা কাঁপতে শুরু করল, মনে হলো,দম বন্ধ হয়ে আসছে তাদের।
জ্যাসপারের চোখের কঠিন সবুজ দৃষ্টিতে তারা বুঝে গেল—এ মৃত্যু,যা ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে,এক মহাশক্তির অবিস্মরণীয় শাস্তি।
গুন্ডাদের মুখে আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠল,হাত-পা কাঁপতে শুরু করল,আর তারা প্রাণভয়ে উল্টো পায়ে ছুট লাগালো। কিন্তু তাদের সেই নিরর্থক পালানোর চেষ্টায় মুহূর্তেই ইতি টানল জ্যাসপারের নৃশংস প্রতিশোধ। তার বুকের গভীর থেকে এক গর্জনের সাথে সে আগুনের বিশাল গোলা ছুঁড়ে দিল তাদের দিকে, যেন দহনের শুদ্ধতায় তাদের সমূলে ভস্ম করে দেবার সংকল্পে।

আগুনের গোলাটি ধেয়ে গেলো বাতাস চিরে,আর তাদের শরীর ছুঁতেই জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গের কণা তাদেরকে চারদিকে ছড়িয়ে দিলো।মুহূর্তের ভেতরেই সেই গলন্ত অগ্নিশিখা তাদের শরীরকে গ্রাস করল,চিৎকার করার মতো সাহসটুকুও তাদের হারিয়ে গেল।জ্যাসপারের চোখে আগুনের আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল,সে মৃত্যুর দেবতা রূপে নেমে এসেছে এই নির্বোধ মানুষগুলোর দম্ভকে চূর্ণ করতে।
ভেনাসের কঠোর শাসন ভঙ্গ করে ছয়জন মানুষকে হ*ত্যা করায়,জ্যাসপারের ঘাড়ের ট্যাটু সতর্ক সংকেতের আলোয় ধকধক করতে লাগল। প্রতিটি সিগন্যাল জানান দিচ্ছিল, পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের সময়সীমা ফুরিয়ে আসছে—তার শরীরের জন্য এখনই প্রয়োজন একমাত্র বায়ো-কেমিক্যাল, যা তার রক্তকে স্থিতিশীল রাখতে পারে।
কিন্তু এই সংকটময় মুহূর্তে কী করবে,তা স্থির করতে পারছিল না জ্যাসপার।মাথার ভেতর ঝড় বইছিল, প্রান্তরাহিত এক শূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা নিজেকে অসহায় বোধ করল। শেষমেষ, নির্জনতা ভেঙে হঠাৎ এগিয়ে চলল সামনের দিকে।

ঝড়ো পায়ে চলতে চলতে লেইকের ধারে এসে পৌঁছল সে। সেখানে এক তরুণী দাঁড়িয়ে ছিল,গভীর রাতে একাকী, কোনো গাড়ির জন্য অপেক্ষমাণ। তার অবুঝ চোখে পৃথিবীর নিষ্পাপতা আর নির্বুদ্ধিত মূর্ত হয়ে উঠেছিল। জ্যাসপার পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে, আর ক্রমশ তার মনের গহীনে ছায়া ফেলতে শুরু করল অশুভ এক অভিপ্রায়।
“হাই, বিউটিফুল,” জ্যাসপারের কণ্ঠস্বর রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে মেয়েটির অন্তরে ঢুকে পড়ল।
মেয়েটি তাকিয়েই থমকে গেল, বিস্ময়ে অভিভূত। জ্যাসপারের সবুজ চোখদুটো অনন্ত রহস্যে ভরা, আর রক্তিম-বেগুনি ঠোঁট দুটো তার হাসিতে শীতল আগুনের মতো জ্বলছে। এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যের অবতার তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটির মনে হলো, এ বুঝি কোনো দেবতার মূর্ত প্রতিমা, কোনো স্বর্গীয় রাজকুমার।
জ্যাসপার হালকা হেসে বলল, “বলছিলাম, এতো রাতে গাড়ি পাবেন না। আমার গাড়ি ওখানে দাঁড়ানো আছে… আসুন, পৌঁছে দিই আপনাকে।”

মেয়েটি নিজের মুগ্ধতা সামলাতে পারছিল না। কোনো কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে তার সঙ্গেই হাঁটতে শুরু করল, প্রতিটি পদক্ষেপে এক অপরিচিত তীব্র আকর্ষণের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছে। তার মনে পড়লো না এমন অপরিচিত কারো প্রতি এত গভীর মোহের শিকলে বাঁধা পড়ার অনুভূতি। জ্যাসপারের পেছন পেছন এগিয়ে চলল, তার উপস্থিতিতে রাত আরও গভীর, আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
জ্যাসপার ধীরে ধীরে গাড়ির দরজা খুলে ধরল,এ যেনো এক রাজকীয় আমন্ত্রণ। মেয়েটি তন্ময় হয়ে গাড়ির ভেতরে বসে পড়ল, তার হৃদয় এক অপার কৌতূহলে আটকে গেছে। জ্যাসপার নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল, চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিনে প্রাণ দিল, আর এক চমৎকার বাঁকা হাসি তার ঠোঁটে খেলে গেল।
“তা… এড্রেস কোথায়?” জ্যাসপার চোখের কোনায় রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, কণ্ঠে একধরনের গভীর সুর।

মেয়েটি একটু থমকালো,তারপর মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, “আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন।”
জ্যাসপার শুনে সামান্য মুচকি হাসলো,মনে হলো এই ছোট্ট পৃথিবীতে এই অনুরোধ তার বহু পরিচিত। সেই হাসিতে ছিল অন্ধকারে মোড়ানো এক নিষ্ঠুর আমন্ত্রণ, যা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তার সবুজ চোখের গভীরে।গাড়ি ধীরে ধীরে সামনে এগোল, আর রাত আরও রহস্যময় হয়ে উঠল।এ এক অজানা যাত্রা,যেখানে প্রত্যেকটি মুহূর্তে ঝুঁকি, অথচ একই সাথে এক অপ্রতিরোধ্য মোহ।
অবশেষে গাড়িটি এসে থামল মেয়েটির বাড়ির সামনে। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ স্তিমিত হয়ে চারপাশের নীরবতা আরও গভীর হলো। মেয়েটি দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল, হঠাৎই জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, “ধন্যবাদ আপনাকে।”

জ্যাসপার তাকিয়ে রইল তার দিকে,চোখে রহস্যময় মায়ার ছায়া। তার ঠোঁটে সেই বাঁকা হাসির ঝিলিক,যা মনে করিয়ে দেয় গভীর রাতের দুর্বোধ্য কোনো মায়াজালকে। তারপর শীতল অথচ গাঢ় কণ্ঠে বলল, “আই ডোন্ট নিড থ্যাংকস…আই নিড ইয়োর লিপস।”
তার কণ্ঠস্বরের প্রতিটি শব্দ ঝড় তুলল মেয়েটির মনের গভীরে। এমন সরাসরি তীক্ষ্ণ আবেদন, যা কোনো নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ নয়, যা কোনো মানবিক ভদ্রতার সাথে পরিচিত নয়। এই কথা শুনে মেয়েটির গাল রক্তিম হয়ে উঠল, চোখের দৃষ্টিতে একরকম বিস্ময় আর আকর্ষণের দোলাচল। জ্যাসপারের মুখে সেই অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস রাতের ছায়ার মতো রহস্যময়,যা কেউ বুঝতে পারে না, তবু যা থেকে দূরে থাকা অসম্ভব।

আর কোনো সময় অপচয় না করে,জ্যাসপার তীব্র আবেগে তার ঠোঁট মেয়েটির ঠোঁটে মিশিয়ে দিল। সেই স্পর্শ এক বিদ্যুৎপ্রবাহ,যা শরীরের প্রতিটি কোষে চমক তুলে দিল মেয়েটির। ঠোঁটের ওপর ঠোঁট, সেই গাঢ়,গভীর চুম্বনে ছিল একধরনের অপ্রতিরোধ্য অধিকার, এক অবর্ণনীয় শক্তি যা তাকে মুহূর্তেই জড়িয়ে ধরল।
মেয়েটির চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল, বাস্তবতার সবটুকু অস্তিত্ব সে হারিয়ে ফেলল।তার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দনে জ্যাসপারের স্পর্শ অগ্নিকণার মতো জ্বলছিল, সেই ছোঁয়ায় ছিল আকাঙ্ক্ষার অতল গহ্বর, ছিল নিষিদ্ধতার মাদকতা।পৃথিবীর সমস্ত শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর, জ্যাসপার অনুভব করল তার ঘাড়ের ট্যাটুটি এখনও সিগনাল দিচ্ছে, এক অশনি সংকেত হিসেবে। মনে হলো, তার শরীরে বায়ো ক্যামিকেল প্রবেশ করছে না, যা তার জন্য বাঁচার একটি আবশ্যকীয় উপাদান। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে একটি অদ্ভুত বার্তা ভেসে উঠল—এটা প্রমাণ করছিল যে, তার দুর্বলতা হ্রাস করতে হলে অন্য কোনো মানবীর চুম্বনে নয়, কেবল ফিওনার চুম্বনে রয়েছে তার আকাঙ্ক্ষিত জীবনদায়ক তরল।
তাকে এক অদ্ভুত অশান্তি গ্রাস করল। ফিওনার প্রতি একটি গভীর আর স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ অনুভব করে, তার উপস্থিতি জ্যাসপারের ভেতরের এক দুর্লভ নিদ্রা জাগিয়ে তুলেছে। সে ভাবতে লাগল, কেন শুধুমাত্র ফিওনা? কেন তার চুম্বনেই এই জাদুকরী ক্ষমতা বিদ্যমান?এ যেন একটি পুরনো গল্পের মতো—একজন কিংবদন্তি, যেখানে কেবলমাত্র একজন নির্দিষ্ট নারীই পারে তার দুঃখের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে।
ফিওনার সঙ্গে প্রথম চুম্বনের সেই মুহূর্তটি এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা,যা তার ভিতরের গভীরতায় অনন্য এক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।জ্যাসপার বুঝতে পারছিল,তার জীবন এখন ফিওনার জীবন থেকে আবদ্ধ, যে ফিওনা শুধুমাত্র একজন মানবী—তাঁর কোমলতা, তাঁর উষ্ণতা,আর সেই চুম্বন,যেখান থেকে বায়ো ক্যামিকেল প্রবাহিত হবে,তাকে আবার নতুন জীবন দেবে।এ এক অদৃশ্য বাঁধন,যা তাকে চিরকাল ফিওনার কাছে আবদ্ধ করে রাখবে,এক অতল অনিশ্চয়তার মাঝে।

মুহূর্তেই জ্যাসপার সেই মেয়েটির ঠোঁট থেকে বিচ্ছিন্ন হল,আচমকাই তার আবেগের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে, কঠোর এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সে মেয়েটিকে প্রচণ্ড ধাক্কা মেরে গাড়ি থেকে ফেলে দিল। মেয়েটি হতবুদ্ধি হয়ে পিছন ফিরে দেখার আগেই, জ্যাসপার গাড়ির সিটে বসে মৃদু চাপ দিয়ে গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ বাড়িয়ে দিল।

আযদাহা পর্ব ১৯

গাড়ি দ্রুত গতিতে সমুদ্রের পাড়ে চলে গেল। জ্যাসপারের মনে এক তীব্র আগ্রাসন;একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ফিওনা।গাড়ি থেকে নামার পর,সে নিজেকে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত করতে শুরু করল।শরীরের প্রতিটি কোষে অনুভূত হল শক্তির একটা ঢেউ—সে এক ভয়ঙ্কর সবুজ ড্রাগনে পরিণত হল,তার বিশাল ডানা আর কাঁপন সৃষ্টিকারী দাত নিয়ে।
সমুদ্রের জলরাশি তার পায়ের নিচে চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগল, ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে সে একজন সমুদ্রের দানবের মতো তার পথ অতিক্রম করল। পুষ্প রাজ পাহাড়ের দিকে যাত্রা শুরু হল, যেখানে মাউন্টেন গ্লাস হাউজ তার জন্য অপেক্ষা করছিল। সেখানে তার একমাত্র উদ্দেশ্য—ফিওনার কাছে পৌঁছানো, সেই মানবী,যার মাধ্যমে সে আবার বায়ো ক্যামিকেল লাভ করতে পারবে।

আযদাহা পর্ব ২১