আযদাহা পর্ব ৩৬
সাবিলা সাবি
ভেনাসের ফ্লোরাজ রাজ্যে:
ফ্লোরাজ রাজ্যের ফুলের প্রাসাদ।বাতাসে ল্যাভেন্ডারের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে।প্রাসাদের শীতল মার্বেলের মেঝেতে হেঁটে যাচ্ছিল অ্যালিসা।তার লম্বা লাল চুল উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে।তার চোখে একধরনের অস্থিরতা।পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার ছোট বোন সিলভা,যার চেহারায় কৌতূহল আর চিন্তার মিশ্রণ।
“তুমি কি জানো,সিলভা? প্রিন্স অরিজিন এথিরিয়নকে পৃথিবীতে উদ্ধার করেছে,”অ্যালিসা বলল,তার কণ্ঠে শীতল এক সুর।
“হ্যাঁ,শুনেছি।মাউন্টেন গ্লাস হাউজে নিয়ে গিয়ে রেখেছে।কিন্তু এতদিন তুমি কিছু করোনি কেন আপু? তুমি তো বলেছিলে পৃথিবীতে যাওয়ার কথা,” সিলভা কৌতূহল ভরা কণ্ঠে বলল।
অ্যালিসার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। “প্রিন্স ব্যস্ত ছিল।তার মন পুরোপুরি এথিরিয়নের মুক্তিতে কেন্দ্রীভূত ছিল।আমি যদি তখন পৃথিবীতে যেতাম,সে আমাকে যথেষ্ট মনোযোগ দিত না।কিন্তু এখন…”
সিলভা দ্রুত অ্যালিসার কথার মাঝখানে বলল,”এখন তুমি পৃথিবীতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছো?”
অ্যালিসা সিলভার দিকে ঘুরে তাকাল।তার হ্যাজেল চোখে একধরনের দৃঢ়তা। “হ্যাঁ।আমি কয়েকদিনের মধ্যেই পৃথিবীতে যাব।প্রিন্সের সঙ্গে আমাদের বিয়ের কথা চলছে।এটা আমার দায়িত্ব যে সে আমার কাছে আসুক।”
সিলভা একটু ইতস্তত করল। “তাহলে আমিও যাব।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
অ্যালিসা ভ্রু কুঁচকাল। “তুমি কেন যাবে, সিলভা?পৃথিবী কোনো মজা করার জায়গা নয়।”
সিলভা হেসে বলল, “মজা করতে নয়,আপু।এথিরিয়ন পৃথিবীতে আছে।আমি… আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
অ্যালিসার চোখ সংকীর্ণ হলো। “এথিরিয়ন? তুমি ওকে পছন্দ করো,তাই না?”
সিলভা মাথা নিচু করল,তার গাল লাল হয়ে উঠল। “হয়তো।”
অ্যালিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।”সিলভা,পৃথিবীতে যাওয়া সহজ নয়। প্রিন্স হয়তো তোমার উপস্থিতি পছন্দ নাও করতে পারে। আর এথিরিয়ন?সে আমাদের পরিবারের প্রিয় হলেও ওকে পছন্দ করা… এটা বিপজ্জনক।”
“আমি জানি,”সিলভা শান্ত গলায় বলল।”তবুও আমি যাব।আমার যা বলা দরকার,পাহাড়সেটা এথিরিয়নকে বলতেই হবে।”
অ্যালিসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ঠিক আছে।তবে মনে রেখো,পৃথিবীতে কোনো ভুল করলে তার মাশুল অনেক বড়।”
সিলভা হাসল।”তুমি চিন্তা করো না,আপু।আমি সাবধানে থাকব।”
অ্যালিসা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “প্রিন্সের সঙ্গে আমার বিয়ে হবেই। এটা তার কর্তব্য। সাহায্যআর তুমি যদি সত্যিই পৃথিবীতে যাও,তাহলে আমার ইচ্ছেপূরণে সাহায্য করবে।আমরা দু’জনেই আমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে পৃথিবীতে নামব।”সিলভা মাথা নাড়ল। “আমরা দুজনেই।”
সকালের ম্লান আলোতে ‘মাউন্টেন গ্লাস হাউজ’ থেকে ল্যাবে প্রবেশ করেছে জ্যাসপার।গতকাল অক্সিজেন সংগ্রহের পর চেন শিংয়ের ল্যাবে ফিরে প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে।আজকের মিশন:হাইড্রোজেন সংগ্রহ।মিশনের লোকেশন হলো একটি বিশাল জলাধারের গভীর তলদেশে,যেখানে অদ্ভুত ও বিপজ্জনক প্রাণীরা বাস করে।এই হাইড্রোজেন শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন।
কনফারেন্স রুমের দিকে জ্যাসপার অগ্রসর হয়।ল্যাবে চেন শিং তার হোলো-স্ক্রিন প্রজেক্টরে মিশনের বিস্তারিত দেখাচ্ছেন।”এই হাইড্রোজেন পৃথিবীর গভীরতম স্থানগুলো থেকে বেরিয়ে আসে,” বললেন চেন শিং,তার ধূসর ভ্রু কুঁচকে।”তবে সেখানকার প্রাণীগুলো মারাত্মক আক্রমণাত্মক। তোমাদের সাবধান থাকতে হবে।জ্যাসপার,তোমার ড্রাগন ফর্ম নাও।থারিনিয়াস আর আলবিরাকে ব্যাকআপ হিসেবে রাখো।”
লোকেশনটি একটি গভীর জলাশয়ের নিচে অবস্থিত। চারপাশে বিশাল সব পাহাড়,এবং এর কেন্দ্রে একটি কালো-নীল জলাধার।জলাধারটি অন্ধকারে ঢাকা,আর সেখানে সারাক্ষণ অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়।জ্যাসপার, থারিনিয়াস, এবং আলবিরা তাদের মিশনের সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত।থারিনিয়াস ড্রাগনের আকারে জলাধারের ওপরে অবস্থান নেয়।
জ্যাসপার,থারিনিয়াস আর আলবিরা হাইড্রোজেন খুঁজতে জলাধারের গভীরে প্রবেশ করে। তার আশেপাশে ছোট ছোট বুদবুদ দেখা যায়। হঠাৎ সমুদ্রের গভীর তলদেশে থেকে উড়ে আসে একটা মনস্টার।জলাধারের গভীর অন্ধকার থেকে উঠে আসা মনস্টারের নাম অফিড্রাক্স।এটি একটি জল-ড্রাগন প্রজাতির দানব,যার শরীর কালো নীলাভ আভায় জ্বলজ্বল করে এবং চোখ দুটি আগুনের মতো লাল। অফিড্রাক্সের একটি দীর্ঘ,কাঁটাযুক্ত লেজ এবং তিনটি বিশাল মুকুট-আকৃতির শির রয়েছে,যা তাকে আরো ভয়ঙ্কর দেখায়। তার শক্তি শুধু শারীরিক নয়,বরং মানসিক সে ধাঁধা এবং বুদ্ধির খেলা দিয়ে তার শত্রুদের পরাস্ত করে।
জ্যাসপার, আলবিরা, এবং থারিনিয়াস জলাধারের গভীরে প্রবেশ করে।চারপাশের অন্ধকার এমন ঘন যে হাতের পাঁচ আঙুলও দেখা যায় না।হঠাৎ,অফিড্রাক্স তাদের পথ আটকায়।”তোমরা হাইড্রোজেন নিতে এসেছো?তবে তার জন্য তোমাদের প্রমাণ করতে হবে যে তোমরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান,”অফিড্রাক্স গম্ভীর গলায় বলে।তার বিশাল ড্রাগনীয় মুখ থেকে বের হওয়া গর্জন জলের ঢেউ তৈরি করে।
অফিড্রাক্স একটি অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলে,
“তোমাদের তিনটি ধাঁধা দিতে হবে।প্রতিটি ধাঁধার সঠিক উত্তর দিতে হবে।একটি ভুল উত্তর মানেই শাস্তি।”
তিনটি ধাঁধা ধীরে ধীরে তাদের তিনজধের সামনে ভেসে ওঠে।
“আমি আকাশে থাকি, কিন্তু রাতে আমাকে দেখতে পাও। আমার আলোর উজ্জ্বলতায় অনেক পথ খুঁজে পায়।আমি কে?”জ্যাসপার উত্তর দেয়,”তারা।”
অফিড্রাক্স মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
“আমি কোন পাত্র নই,কিন্তু আমাকে ভাঙলে তোমার মুখের শব্দ শোনা যায়।আমি কে?”আলবিরা তৎক্ষণাৎ উত্তর দেয়,”নীরবতা।”অফিড্রাক্স আরেকবার মাথা নাড়ে।
“আমি জন্মাই জল থেকে,তবু শুকনো স্থানে বাঁচতে পারি। আমি অস্তিত্বে আনি আলোও বায়ু।আমি কে?”
থারিনিয়াস হঠাৎ বলে ফেলে,”আগুন।”
অফিড্রাক্স রাগান্বিত গর্জন করে।”ভুল!”
থারিনিয়াসের ভুল উত্তরের কারণে জলাধার থেকে আরেকটি মনস্টার উঠে আসে।এর নাম ইলিফ্র্যাক্স,যা দেখতে বিশাল ইলেকট্রিক ইল-ড্রাগনের মতো।তার শরীর বিদ্যুতের আভায় জ্বলছে,এবং সে তার লেজ দিয়ে থারিনিয়াসকে আঘাত করে।থারিনিয়াস র*ক্তাক্ত ও আ*হত অবস্থায় পড়ে যায়।
জ্যাসপার রাগে ড্রাগনের রূপ ধারণ করে।তার সবুজ চোখে জ্বলন্ত আভা ফুটে ওঠে।ইলিফ্র্যাক্স তার লেজ দিয়ে আক্রমণ চালালে জ্যাসপার শক্তি দিয়ে সেটি আটকে ফেলে।এক শক্তিশালী ড্রাগন ফ্লেম ছুড়ে দিয়ে সে ইলিফ্র্যাক্সকে পিছু হঠতে বাধ্য করে।এরপর সে অফিড্রাক্সের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে,”তোমার ধাঁধার সঠিক উত্তর আগেই জানা ছিল।আমি এটাকে জয় করব।”
জ্যাসপারের লড়াই চলাকালীন,আলবিরা হাইড্রোজেন চেম্বারের দিকে এগিয়ে যায়।তার রুপালী চুলের ঝলকানিতে চারপাশ আলোকিত হয়।চেম্বারে পৌঁছে সে দ্রুত হাইড্রোজেন সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করে।”প্রিন্স,আমি প্রস্তুত!লড়াই শেষ করুন!”
জ্যাসপার ইলিফ্র্যাক্সকে পরাস্ত করার পর,তারা আলবিরার সঙ্গে যোগ দেয়।থারিনিয়াস আহত হলেও সুস্থ হওয়ার জন্য আলবিরা তার ড্রাগন-গোল্ড হিলিং অয়েল ব্যবহার করে।অফিড্রাক্স এবার শান্ত হয়।”তোমরা প্রমাণ করেছো তোমরা শক্তি আর বুদ্ধিতে অদম্য। যাও,হাইড্রোজেন তোমাদের জন্য। কিন্তু মনে রেখো,ভুল কখনো সহজে ক্ষমা হয় না।”
জ্যাসপার, আলবিরা,আর থারিনিয়াস অবশেষে তাদের মিশনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে।ধরা (Hydrotrap-01) নামে বিশেষ এক যন্ত্রের মাধ্যমে তারা হাইড্রোজেন সংগ্রহ করে। এটি একটি শক্তিশালী ড্রাগন টেকনোলজির তৈরি সিলিন্ডার। ধরা-তে একটি ভ্যাকুয়াম চেম্বার রয়েছে যা বায়ুমণ্ডল থেকে কেবলমাত্র হাইড্রোজেন চিহ্নিত করে টেনে নিয়ে যায় এবং একে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত রাখে।
আলবিরা যন্ত্রটি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে।হাইড্রোজেন সিলিন্ডারের ভেতরে জমা হলে একটি হালকা নীল আলো জ্বলতে শুরু করে,যা প্রমাণ করে যে এটি পুরোপুরি সুরক্ষিত।
“এটা ল্যাবে নিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে,” জ্যাসপার বলে।তারা দ্রুত তাদের ফ্লাইং ড্রাগন ডিভাইসে করে ল্যাবের দিকে রওনা দেয়।
ল্যাবে পৌঁছানোর পর,হাইড্রোজেনকে প্রোটেক্টেড স্টোরেজ ভল্ট-09-এ রাখা হয়।এটি একটি শক্তিশালী তাপ-প্রতিরোধী সিস্টেম যা শুধুমাত্র জ্যাসপারের বিশেষ বায়োমেট্রিক্স দ্বারা খোলা যায়।ঠিক তখনই চেন শিং এসে উপস্থিত হয়।”হাইড্রোজেন সংগ্রহ করতে পেরেছ?”তিনি জিজ্ঞাসা করেন,তার চোখে তৃষ্ণার ঝিলিক।
“হ্যাঁ,”জ্যাসপার হিমশীতল গলায় উত্তর দেয়।চেন শিং তখন ফিওনার কথা তুলে বলে,”আজ রাতে ফিওনাকে দেখতে চাই।”জ্যাসপার দৃঢ়ভাবে বলে, “কাল সকালেই দেখা পাবেন।আজকে রাতে সম্ভব না।”
চেন শিং কিছুটা বিরক্ত হলেও সম্মতি জানিয়ে চলে যায়।
গ্লাস হাউজে ফিরে জ্যাসপার শান্তির মুহূর্ত কাটানোর আশা করেছিল।কিন্তু ড্রইং রুমে প্রবেশ করতেই তার চোখে পড়ে এক অভাবনীয় দৃশ্য।
ফিওনা আর এথিরিয়ন বসে আছে একসঙ্গে লিভিং রুমের সোফায়।তারা বাচ্চাদের মতো গল্পে মেতে আছে আর আইসক্রিম খাচ্ছে।ফিওনার মুখে চকোলেট আইসক্রিমের দাগ।আর এথিরিয়নের হাতে স্ট্রবেরি আইসক্রিমের কাপে গলতে থাকা শেষ অংশ।এথিরিয়ন হাসতে হাসতে বলছে,”তুমি জানো,ওনা,ছোটবেলায় আমি একবার পুরো পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়েছিলাম,আর তাতেই ড্রাগনের রূপ পেয়ে যাই!”
ফিওনা খিলখিলিয়ে হেসে দেয় আর হাসতে থাকা অবস্থায় বলে,”তাহলে তোমার ড্রাগন হওয়াতো তো পুরোপুরি মজার ঘটনা!”এথিরিয়ন সেটা মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে।
এই দৃশ্য দেখে জ্যাসপারের ভেতরে ক্রোধের ঢেউ উঠতে থাকে। ষতার সবুজ চোখ জ্বলজ্বল করে।মনে মনে সে ভাবে,”ফিওনা কি করে এথিরিয়নের সঙ্গে এতোটা ক্লোজ হতে পারে?আমার হাউজে?আমার সামনেই?
জ্যাসপার চুপচাপ তাদের কাছাকাছি এসে বলে,
“দুজনেই বেশ আনন্দ করছো দেখা যাচ্ছে।।”
ফিওনা চমকে বলে,”ওহ!আপনি কখন এলেন?”
জ্যাসপার এক হিমশীতল হাসি দিয়ে উত্তর দেয়,”কেনো আমি আসাতে তোমাদের আনন্দ মুহুর্তে নষ্ট হয়ে গেলো বুঝি।”
ফিওনা কোনো উত্তর দিলো না। তবে এথিরিয়ন বললো” জ্যাসু ভাইয়া তোমাদের আজকের মিশন কেমন ছিলো?আর সেটা সাকসেস হয়েছে তো?জ্যাসপার একবার ভালো করে দুজনকে দেখে মৃদু কন্ঠে জবাব দিলো “একদমই ভালো হয়নি” বলেই হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে চলে যায় ওপরে।
আর মনে মনে পরিকল্পনা করতে লাগলো,”ফিওনাকে একটা ভালো শিক্ষা দিতে হবে।শাস্তি এমন হবে যে সে আমার নিয়ম ভঙ্গ করতে আর সাহস না পায়।”
জ্যাসপার নিজের কক্ষে যেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়,গ্লাস হাউজের নির্জন রাত।ফিওনা ও এথিরিয়নের হাসি-তামাশার শব্দ যেন জ্যাসপারের কানে ক্রমাগত শাঁ শাঁ করে বাজছে।তার ক্রোধ ধীরে ধীরে শীতল অথচ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।শাস্তির পরিকল্পনা তার মনে পরিষ্কার হতে থাকে।
জ্যাসপার ফিওনার স্বাধীনতাকে লক্ষ্য করে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।সে বুঝতে পেরেছে,ফিওনা তার নিয়ম আর উপস্থিতি উপেক্ষা করার সাহস দেখিয়েছে।তাই সে তাকে শিখিয়ে দিতে চায়—এই হাউজ,এই পৃথিবীতে আর ফিওনার জীবনে শুধু জ্যাসপারের নিয়মই শেষ কথা।”তোমার শাস্তি তোমাকে নিয়ন্ত্রণ শেখাবে,হামিংবার্ড,” জ্যাসপার মনে মনে বলে।
জ্যাসপার আপাতত একটু বিশ্রাম করতে চেষ্টা করে তবে গ্লাস হাউজের রাতটা নীরব। ফিওনার আলাপচারিতা আর এথিরিয়নের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টার স্মৃতি জ্যাসপারের মনের মধ্যে অশান্তির ঝড় তোলে বেড়াচ্ছে ক্রমাগত।নিজের ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিয়ে সে হঠাৎ এক ভিন্ন শাস্তির পরিকল্পনা করে—একটি শাস্তি যা হবে মজার,কিন্তু একইসঙ্গে ফিওনাকে শিক্ষা দেবে।
জ্যাসপার ধীরে ধীরে লিভিং রুমে প্রবেশ করল।
ফিওনা তখনো চুপচাপ বসে ছিল।এথিরিয়ন অনেকক্ষন আগেই নিজের কক্ষে বিয়ে গেছে।
জ্যাসপার ঠাণ্ডা গলায় বলল,”তোমার আইসক্রিম খাওয়ার এত শখ?আজ তোমাকে এই শখের প্রকৃত স্বাদ দিতে চাই আমি হামিংবার্ড।”
ফিওনা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “কী বলতে চাইছেন আপনি?”জ্যাসপার কোনো উত্তর দিল না।হঠাৎ করেই সে ফিওনাকে কোলে তুলে নিল।ফিওনা ভয়ে বলল,”এই!আবার কী করতে যাচ্ছেন আপনি?আমাকে নামান!”জ্যাসপার হেসে বলল,”তোমার শাস্তি শুরু হলো,বোকা মানবী।”
জ্যাসপার ফিওনাকে নিয়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করল।ঘরের মাঝখানে একটি বড় কাঁচের টেবিল,আর তার ওপরে রাখা অসংখ্য রঙিন আইসক্রিম ভ্যানিলা, চকোলেট,স্ট্রবেরি,ম্যাংগো,পিস্তাচিও,ব্লুবেরি…প্রতিটি ফ্লেভার যেন টেবিলের ওপর রংধনু সৃষ্টি করেছে।ফিওনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।”এত আইসক্রিম?আপনি কি পাগল হলেন?”জ্যাসপার হেসে বলল,”তোমার শখ পূরণ করছি,এখন এগুলো সব খাবে তুমি,সবটা।”
ফিওনা কিছুটা দ্বিধায় টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।”আপনি মজা করছেন তাই না?”
“না।এটা তোমার শাস্তি।আমি দেখব,তুমি সত্যিই কতটা আইসক্রিম পছন্দ করো যে অন্য কারো সাথে হেসে হেসে তোমাকে আইসক্রিম খেতে হয়।”
ফিওনা প্রথমে একটি চকোলেট ফ্লেভারের আইসক্রিম তুলে খেতে শুরু করল।কিন্তু কয়েকটি স্কুপ খাওয়ার পর সে অসহায়ভাবে বলল,”আমি আর পারব না।”
জ্যাসপার তার সবুজ চোখে মুচকি হেসে বলল,”আরো খেতে হবে তোমাকে।তুমি তো বলেছিলে,আইসক্রিম খেতে তোমার ভালো লাগে।এখন দেখো,শখের আসল পরীক্ষা কীভাবে হয়।”
ফিওনা জানে জ্যাসপার মুখে যতোই হিমশীতল হাসি রাখুক মনের মধ্যে তো জলন্ত লাভা জ্বলছে রাগে আর ফিওনা জ্যাসপারের রাগ সম্পর্কে জানে তাই যথা সাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে আইসক্রিম শেষ করার।ফিওনা ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।জ্যাসপার তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল,সে আর পারছে না।হঠাৎ করেই তার কণ্ঠে এক মৃদু কোমলতা ফুটে উঠল।”তোমার শাস্তি শেষ,ফিওনা।তবে মনে রেখো, পরেরবার আমার অনুমতি ছাড়া আর কিছু করবে না।”
জ্যাসপার টেবিলের সামনে এসে ফিওনার আরো কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কিছুটা ঝুঁকে তার ঠাণ্ডা হাত দিয়ে ফিওনার মাথায় আলতোভাবে চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে লাগল।”তুমি আমার কথা মেনে চলবে,নাকি তোমাকে এভাবেই বারবার শাস্তি দিতে হবে?”জ্যাসপার মৃদু হেসে বলল।ফিওনা কোনো উত্তর দিল না,তার ক্লান্ত চোখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি ফুটে উঠল।
ফিওনা ক্লান্ত হয়ে টেবিলে বসে ছিল।অসংখ্য আইসক্রিম খেয়ে সে যেন আর নড়তে পারছিল না।তার চোখে বিরক্তি স্পষ্ট,কিন্তু জ্যাসপার ঠিক তখনই একটি চঞ্চল পরিকল্পনা করে।”তোমারতো শাস্তি শেষ,” জ্যাসপার বলল তার গভীর অথচ রহস্যময় কণ্ঠে। “কিন্তু আমার শুরু হলো।আমি কখনো আইসক্রিম খাইনি,তবে আজকে খাওয়া শিখে নেব,তবে একটু…আলাদা উপায়ে।”ফিওনা অবাক হয়ে বলল, “আপনার আর কী ধরণের পাগলামি বাকি আছে?”
জ্যাসপার টেবিল থেকে একটি আইসক্রিমের বাটি তুলে নিল। বাটির আইসক্রিমটি প্রায় গলে যাওয়া।তার চোখে যেন দুষ্টুমির ঝিলিক ফুটে উঠল।সে ধীরে ধীরে ফিওনার দিকে এগিয়ে গেল।”ইউ নো হামিংবার্ড,আমি কোনো খাবারকে কখনো শুধু খাবার হিসেবে দেখি না।আমার কাছে সবকিছুতেই একটু বেশি রোমাঞ্চ থাকা উচিত।”
ফিওনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই,জ্যাসপার সেই গলে যাওয়া আইসক্রিমটি ফিওনার গলায় ঢেলে দিল।ঠাণ্ডা আইসক্রিম ফিওনার ত্বক স্পর্শ করতেই সে চমকে উঠল।”এই!আপনি এটা কী করছেন?” ফিওনা অবাক আর রাগে চেঁচিয়ে উঠল।
জ্যাসপার একটি মৃদু হাসি দিয়ে বলল, “শান্ত হও, হামিংবার্ডে।আমি কেবল আমার শাস্তির অংশটা উপভোগ করছি।”সে ধীরে ধীরে ফিওনার গলা থেকে সেই আইসক্রিম নিজের জিভ দিয়ে লেহন করতে শুরু করল।তার ঠোঁট আর জিহ্বার ছোঁয়া ফিওনার শরীর শিরশির করে তুলল।ফিওনা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ল।”আপনি পাগল!এভাবে কেউ আইসক্রিম খায়?” ফিওনা অসহায় গলায় বলল।
“তুমি বলেছিলে,আইসক্রিম খেতে ভালো লাগে।আমিও শিখছি,” জ্যাসপার মৃদু কণ্ঠে বলল।জ্যাসপার এবার ফিওনার কোমড় আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
“তুমি শুধু খেতে জানো না, হামিংবার্ডে।আমি শিখিয়ে দিচ্ছি কিভাবে উপভোগ করতে হয়।”ফিওনা লজ্জায় লাল হয়ে গেল,কিন্তু কিছুই বলতে পারল না।
ফিওনা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল জ্যাসপারের দিকে।তার মন অস্থির,শরীর শিরশির করছে।জ্যাসপারের চোখে একধরনের গভীর খেলা,যেন সে জানে কীভাবে ফিওনার প্রতিটি অনুভূতিকে তীব্র করে তুলতে হয়।
“তোমার গায়ে এত মিষ্টি স্বাদ লেগে আছে যে,মনে হয় আমার আইসক্রিম এভাবেই খাওয়া উচিত,”জ্যাসপার একধরনের মৃদু হাসি দিয়ে বলল।সে ধীরে ধীরে আরেক ধাপ এগিয়ে এল। তার আঙুলে একটু আইসক্রিম তুলে নিয়ে ফিওনার গালে ছোঁয়াল।ঠাণ্ডা স্পর্শে ফিওনার শরীর কেঁপে উঠল।তারপর জ্যাসপার মাথা নিচু করে আলতোভাবে তার ঠোঁট দিয়ে সেই আইসক্রিম খেয়ে নিল।
ফিওনার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। তার গাল তখন লালচে হয়ে উঠেছে।জ্যাসপার আবার তার আঙুলে আইসক্রিম তুলল,এবার ফিওনার ঠোঁটে র ছড়িয়ে দিল। ফিওনার নিশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল,আর জ্যাসপারের স্পর্শ তাকে যেন জাদুর মতো ঘিরে ধরছিল।
“এত সুন্দর স্বাদ কোথায় ছিল লুকিয়ে?” জ্যাসপার আলতোভাবে বলল,তার চোখ ফিওনার চোখে স্থির। জ্যাসপার ফিওনার ঠোঁটের আইসক্রিমটুকু খেয়ে নিলো।
জ্যাসপারের ঠোঁটের স্পর্শে শিহরিত হয়ে ফিওনা তার শার্ট খামচে ধরল। যেন তাকে ছেড়ে যেতে দেওয়া অসম্ভব। তার চোখে অজানা এক আকাঙ্ক্ষা,আর বুকের ধুকপুকানির শব্দ যেন গোটা ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
জ্যাসপার হালকা হাসল। “এতটা অধীর কেন,হামিংবার্ড?” তার কণ্ঠে ছিল একধরনের গভীর খেলা,যা ফিওনার শরীরের প্রতিটি কোষকে যেন জাগিয়ে তুলল।
সে টেবিল থেকে আরেকটা আইসক্রিমের বাটি তুলে নিলো। “তোমার শাস্তি এখনো শেষ হয়নি,”বলেই সে আইসক্রিমের ঠাণ্ডা তরল ফিওনার বুকের ওপরে আলতোভাবে ছড়িয়ে দিল। ঠাণ্ডা অনুভূতিতে ফিওনার শরীর কেঁপে উঠল।
জ্যাসপার ধীরে ধীরে ঝুঁকে আইসক্রিমের চিহ্নগুলো নিজের ঠোঁট দিয়ে লেহন করতে লাগল।তার উষ্ণ স্পর্শ ঠাণ্ডা আইসক্রিমের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করল। ফিওনার শ্বাস ধীরে ধীরে দ্রুত হতে লাগল,তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল।ফিওনা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বলল,”আপনি…এভাবে…”তুমি আমাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলে,তাই না আমকে জেলাসি দিয়ে? জ্যাসপার গভীর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল। “এটা আমার পাল্টা শাস্তি।”এই কথায় ফিওনার চোখ আরও বড় হয়ে গেল,আর তার মন যেন একধরনের মধুর অস্থিরতায় ভরে উঠল।
ফিওনার বুক ধড়ফড় করছিল।তার শ্বাস যেন আটকে আসছে।জ্যাসপার এতটাই কাছে ছিল যে তার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যেন তীব্র উত্তেজনার ঢেউ খেলে গেল।ফিওনা বুঝতে পারছিল যে জ্যাসপারের প্রতি তার অনুভূতি দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
“আপনি …আপনি আমাকে পাগল করে দিচ্ছন,”ফিওনা মৃদু স্বরে বলল। তার কণ্ঠস্বর ভাঙা,,যেন নিজের মনের আবেগকে সামলাতে পারছেনা।
জ্যাসপারের সবুজ চোখে এক ধরনের মজা ফুটে উঠল।সে ঠোঁটের কোণে একটি তীক্ষ্ণ হাসি এনে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।ফিওনার দিকে তাকিয়ে বলল,”এই হলো তোমার আসল শাস্তি,হামিংবার্ড।আমি জানি তুমি আমাকে কাছে চাইছো।কিন্তু…”
ফিওনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।তার হাত যেন নিজেই জ্যাসপারের দিকে এগিয়ে গেল তাকে ছুঁতে।কিন্তু জ্যাসপার এক পা পেছনে সরে গেল।”তোমার শাস্তি এখানেই শেষ নয়,” জ্যাসপার গম্ভীর কিন্তু গভীর সুরে বলল। “এখন তুমি আমাকে ছুঁতে চাইবে,কিন্তু পাবে না।তুমি ছটফট করবে,কষ্ট পাবে।আর আমি দেখব,কীভাবে তুমি আমার স্পর্শের জন্য আকুল হয়ে উঠছো।”
ফিওনা হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।তার মন যেন হাজার টুকরোয় ভেঙে পড়ছে।জ্যাসপার আবারও তার দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,”তুমি যদি মনে করো আমি তোমার ইচ্ছামতো তোমার কাছে থাকব,তবে তুমি ভুল ভাবছো।এখন থেকে তুমি আমার ইচ্ছায় চলবে।আর আমার ইচ্ছা হলো…তোমাকে আরও অস্থির করা।”
এই বলে জ্যাসপার এক ঝটকায় চলে গেল। তার উপস্থিতির শূন্যতা যেন ফিওনার চারপাশে এক ধরণের শীতল নিঃসঙ্গতা এনে দিল। ফিওনা তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তার মনে অসীম প্রশ্ন আর হৃদয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
জ্যাসপারের চলে যাওয়ার পর ফিওনা স্থির বসে থাকল। তার বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলছে। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। “এই ড্রাগনটা নিজেকে কী ভাবে! দাঁড়াও, জ্যাসপার, এবার আমার পালা,” ফিওনা মনে মনে বলল।
সে টেবিলে পড়ে থাকা এক টুকরো আইসক্রিমের দিকে তাকাল।আইসক্রিম এখন গলে এক ধরণের মসৃণ বস্তুর মতো হয়ে গেছে।পুরো টেবিলে গলে যাওয়া আইসক্রিমের বন্যা।তবে আপাতত ফিওনার চোখে খেলা করল একধরনের শয়তানি।
ফিওনা জ্যাসপারের কক্ষ থেকে বেরিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে করিডোরে এল।তার চোখে মিশ্রণ ছিল ক্ষোভ আর দুষ্টু খেলার ইচ্ছা। মনে মনে বলল,”এই ড্রাগনটা নিজেকে কী ভাবে!এবার দেখ,তোমাকে কীভাবে ছটফট করাতে হয়!”
জ্যাসপার তখন ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছে,তার হাতের স্মার্ট ঘড়ির দিকে তাকিয়ে।তার চোখে নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি,যেন কিছুই ঘটেনি।ফিওনার দিকে একবার তাকালও না।ফিওনা এটা দেখে আরও রাগে ফেটে পড়ল।
সে দ্রুত জ্যাসপারের সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাত দুটো কোমরে রাখা,ভ্রু কুঁচকে তাকাল।”আপনি কি ভেবেছেন? আমাকে এভাবে শাস্তি দিয়ে সবকিছু শেষ?আমি কি খেলনার মতো আপনার ইচ্ছেমতো চলব?”
জ্যাসপার তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।”তোমার মুখে এমন রাগতো বেশ মানায়,হামিংবার্ড।তবে তুমি আমাকে কী করবে,সেটাই দেখার বিষয়।”
ফিওনা তার ঠোঁট কামড়ে নিজের রাগ চেপে রাখল।তারপর তার ভেতরের দুষ্টু বুদ্ধিটা মাথাচাড়া দিল।সে হঠাৎ এগিয়ে এসে দু’পা উঁচু করে জ্যাসপারের শার্টের কলার ধরে নিজের দিকে টেনে আনল।জ্যাসপার অবাক হয়ে তার দিকে তাকানোর আগেই, ফিওনা তার ঘাড়ে জোরে একটা কামড় বসাল।জ্যাসপার হতভম্ব আর ব্যাথাতুর কন্ঠে বললো। “তুমি কী করছো?”
ফিওনা তার ঘাড় থেকে মুখ সরিয়ে একগাল হাসল।”এটা আপনারা জন্য আমার শাস্তি এবার আপনি বুঝবেন ছটফট করার মানে কী!”
জ্যাসপার তার ঘাড়ে হাত রেখে চমকে উঠল। “তুমি… আমাকে লাভ বাইট দিলে?”
ফিওনা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, “হ্যাঁ, দিলাম। এবার বুঝতে পারলেন,মিস্টার ড্রাগন?আমার সঙ্গে খেলতে গেলে আমিও খেলায় নামতে জানি।”
ফিওনা জ্যাসপারের শার্টের কলার চেপে ধরে তখনো তার চোখে অদম্য জেদ।সে কোনোভাবেই সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়।কিন্তু জ্যাসপার হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।কোনো কিছু না বলেই সে হালকা ভাবে ফিওনাকে কোলে তুলে নিল।
“আপনি ..আপনি কী করছেন?” ফিওনা বিরক্ত গলায় বলল,কিন্তু তার গালের রঙ তখনও লজ্জায় লাল হয়ে ছিল।
“তোমাকে শান্ত করতে নিয়ে যাচ্ছি,”জ্যাসপার ঠান্ডা গলায় বলল।তার চোখে এক ধরনের দৃঢ়তা ছিল,যা ফিওনার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিল।
জ্যাসপার ধীরে ধীরে ফিওনাকে তার কক্ষে নিয়ে গেল। সেখানে এসে ফিওনাকে বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দিল। ফিওনা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।
“আপনি কি সত্যিই এখন আমাকে ঘুমাতে বাধ্য করবেন?” ফিওনা অবিশ্বাসের সুরে বলল।
জ্যাসপার তার পাশে ঝুঁকে এসে চোখে চোখ রেখে বলল, “হামিংবার্ড সময় এখনো আসেনি।নিজের উপর কন্ট্রোল রাখো।আমাকেও কন্ট্রোল হারাতে বাধ্য কোরো না।কারণ, আমি যদি একবার নিয়ন্ত্রণ হারাই…”
সে হঠাৎ থেমে গিয়ে ফিওনার ঠোঁটের দিকে এক মুহূর্ত তাকাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “…তাহলে তুমি আমার পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকবেনা।”
জ্যাসপার ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।ফিওনা হতবাক হয়ে বিছানায় বসে রইল।তার মনে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি—একদিকে সে রাগান্বিত,অন্যদিকে যেন অজানা এক উত্তেজনা তার ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিল।
“এই ড্রাগনটা একদিন আমাকে পাগল করে ছাড়বে”ফিওনা ধীরে ধীরে নিজেকে বলল।তার ঠোঁটের কোণে তখন মৃদু হাসি ফুটে উঠল কারন সে জানে জ্যাসপার এখন তার প্রেমে পড়েছে আর সে নিজেও।
করিডোরের স্নিগ্ধ আলোয় থারিনিয়াস হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটি যেন তার বোধ-বুদ্ধি সবকিছু স্থির করে দিয়েছে।দূর থেকে সে দেখেছে—জ্যাসপার,এল্ড্র রাজ্যের গর্বিত ড্রাগন যোদ্ধা,যার হৃদয় বরফের মতো ঠান্ডা,যাকে কখনো আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায়নি,সেই জ্যাসপারই ফিওনার সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
থারিনিয়াসের কপালে ভাঁজ পড়ে।”প্রিন্স?এই রকম কিভাবে সম্ভব?” নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল সে।
তার চোখ এখনও জ্যাসপারের দিকে আটকে ছিল। জ্যাসপার তখনো ফিওনাকে কোলে করে নিয়ে যাওয়ার সময় সংযত গলায় কথা বলছে।থারিনিয়াস তার কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিল না,কিন্তু জ্যাসপারের মুখে এক অন্যরকম কোমলতা ধরা পড়ল,যা থারিনিয়াস কখনো কল্পনাও করেনি।
“একটা হিউম্যান গার্ল…”থারিনিয়াসের মনে যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।তার মাথার ভেতর চিন্তার ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল।যে ড্রাগনরা কখনো মানুষের কাছাকাছি আসতে চায় না,সে ড্রাগন প্রিন্স হয়ে কীভাবে এমন আবেগ প্রকাশ করতে পারে?
তার শরীর ঝিমঝিম করতে লাগল।হঠাৎ তার মনে পড়ল, জ্যাসপার সবসময় বলত,”ড্রাগনদের হৃদয় ভালোবাসার জন্য নয়।আমাদের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করতে হয়, আবেগের জন্য নয়।”
কিন্তু এখন?থারিনিয়াসের মনে যেন বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের এক অদ্ভুত সংঘর্ষ চলছিল।তার মাথা ঘুরতে লাগল, যেন করিডোরের দেয়ালগুলোও তার চারপাশে ঘুরছে।
সে দেয়ালে হাত রেখে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।”এটা কি সত্যি?নাকি আমি ভুল দেখছি,প্রিন্সের তো লাভ ফাংশনাল নেই?”
জ্যাসপার তখন করিডোরের দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।থারিনিয়াস তাড়াহুড়ো করে সরে দাঁড়াল,যেন কেউ তাকে দেখে ফেলে না।কিন্তু তার হৃদয় ধুকপুক করছিল।
আযদাহা পর্ব ৩৫
“এটা কি সেই প্রিন্স,যাকে আমি চিনি?” থারিনিয়াস নিজের মনে বলে উঠল। তার মনে একটাই প্রশ্ন জেগে উঠল—জ্যাসপারের এই পরিবর্তন কি শুধু ফিওনার জন্য?আর এই পরিবর্তন যদি সত্যি হয়,তাহলে এর শেষ কোথায়?
থারিনিয়াস তখন ধীরপায়ে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগল। কিন্তু তার মনের অস্থিরতা যেন তাকে ছাড়ছিল না। জ্যাসপার এবং ফিওনার সম্পর্কের রহস্য তাকে ভেতর থেকে ধাক্কা দিতে শুরু করল।
