আলতারাণীর প্রেম শেষ পর্ব
প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
টুসুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর পুরো আহসান বাড়িতে শোক নেমে এসেছিল। পাগলপ্রায় টুসুর মা অনেকদিন বিছানায় পড়েছিল। বিয়েশাদি এসব নিয়ে মাতামাতি বন্ধ বাড়িতে।
টুসুর মৃত্যুর পর ওইটুকু পরিবর্তন এসেছে বাড়িতে। আর কিচ্ছু না। ওই যে ভোর ভোর দুটো পা বাড়িময় দৌড়ে বেড়াত চায়ের ট্রে হাতে? ওটা দেখা যায় নি।
“চা খাবে চা?” এই কথাটা আর শোনা যায় নি।
মায়ের শাঁড়ির আঁচল হাতে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে এপাড়া ওপাড়া ঘুরেবেড়ানোর অনুমতি কেউ চায়নি। মা জেঠির হাত থেকে ভেজা কাপড়ের বালতি নিয়ে কেউ ছাদে ছুটে যায়নি। জেঠুর কপালে ছোট্ট ছোট্ট আঙুলগুলোর মালিশ পড়েনি। রোদেপুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাকার অফিসে টিফিনবাক্স নিয়ে কেউ হাজির হয়নি। বাবা ধূলোপড়া জুতো পায়ে দিয়ে, কুঁচকানো শার্ট গায়ে চাপিয়ে কাজে বেরিয়েছে। ফেরার পথে আচার চকলেট আইসক্রিম নিয়ে বাড়ি ফিরলে কেউ চো মেরে কেড়ে নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়নি।
জেম্মাকেও আর এটা বলার জন্য তাকে খুঁজে পায়নি যে, মেয়েটা কাজচোর হয়ে গেছে।
ব্যস এটুকুই।
ওহ হ্যাঁ তুলিদের বাগানবাড়ির বিখ্যাত সেই আম গাছটাতে আর কভু অত আমের মুকুল ধরেনি। লবণ মরিচ দিয়ে মাখা আম জাম খাওয়ার জন্য বাড়ির মানুষকে বসার ঘরে একসাথে জড়ো হতে হয়নি কখনো।
যেদিন লাশটা বাড়িতে এল সেদিন কারো মাথা ঠিক ছিল না। মা তো মেয়েকেই চিনলো না। টুসুর বাবাকে বলল,
“আমার মেয়ে সাদা ফ্রক পড়ে গিয়েছে। কালো কাপড়ে এল কেন? এই মেয়েটা আমার না। আমার মেয়েকে যেভাবে নিয়ে গেলে ঠিক সেভাবে এনে দাও।”
তারপর টুসু লাশের কাছে গিয়ে বসে বলল,
“মায়ের সাথে কেউ এমন করে? বাঁদরামির সীমা পার করে ফেলেছিস কিন্তু টুসু।”
জেঠি, জেঠু, কাকা, কাকিয়া, রিশা, পায়েল সবাই কত ডাকলো টুসুকে। এরকম ত্যাড়ার মতো কখনো শুয়ে থাকেনি টুসু। কারো ডাকে সাড়া না দেয়ার মতো মেয়ে তো সে না।
রাইমা তার মুখের দিকে ঝুঁকে বসেছিল একদম কাছে বসে। আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে দেখছিল। টপটপ করে পড়া চোখের জলে ভিজে উঠছিল টুসুর লাশটা। রাইমা ভেবে পেল না, এত ভালোবাসা রেখে মানুষ পালিয়ে যায় কিভাবে? তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করেছিল, তুই একবার ফিরে আয়। আমি তোকে আমার সব সুখ দিয়ে পালিয়ে যাব।
খাটিয়ায় করে টুসু শেষবারের মতো যখন আহসান বাড়ি ছাড়ছিল ঠিক তখনি মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“এভাবে কেউ চলে যায়? এমন কেউ করে রে? নাড়ি ছিঁড়ে এলি আর এখন বুক ছিঁড়ে চলে যাচ্ছিস মা। এভাবে কেউ চলে যায়? মাকে এত কষ্ট কেউ দেয়?”
মাকে সবাই ধরে রাখলো। মা তারপরও মেয়েকে যেতে দিতে চাইলো না।
খাটিয়া ধরা বাবার হাতটা কেঁপে কেঁপে উঠলো। বাবার কাঁধে মেয়ের খাটিয়া এটা কতবড় হৃদয়বিদারক দৃশ্য তার আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। খাটিয়া নিয়ে যেতে যেতে বাবা একটা বাচ্চার মতো কাঁদলো।
ট্রেনে ওঠার সময় মাটির ব্যাংক থেকে পাওয়া দু’হাজার টাকা বাবার হাতে সে দিয়েছিল আপার বিয়েতে খরচ করার জন্য। বাবা তার কপালে চুমু খেলে সে জড়িয়ে ধরে বাবার কপালে আর দুগালেও চুমু ফিরিয়ে দিয়ে চোখ টলমল করা জল নিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে ট্রেনে উঠে গিয়েছিল। আর বলেছিল, তার গাইডগুলো যেন পাঠিয়ে দেয় খালাম্মার বাড়িতে। সে ওখানে পড়াশোনা করবে। বাড়ি ফিরবে অনেক বড় হয়ে।
পকেট হাতড়ে কাফন কেনার যে টাকা দিয়েছিল টুসুর বাবা ওগুলো টুসুরই। নিজেকে মৃত্যু উপহার দেয়ার জন্য বুকের ভেতর শুধু ভালোবাসা জমায়নি, মাটির ব্যাংকে টাকাও জমিয়েছিল নিজের কাফনের কাপড় কেনার জন্য। চিরকাল সবাইকে ভালো রাখার দায়ভার নেয়া টুসু মৃত্যুর পরও কারো উপর কোনো দায়ভার চাপিয়ে দেয়নি। তার কাফনের কাপড়ের চিন্তাও কাউকে করতে হয়নি।
আর তারপর বিছানায় পড়ে থাকা নবম শ্রেণির গাইডগুলোর পৃষ্ঠা উড়লো শূন্য হাওয়ায়। ছাদের রশিতে ঝুলে থাকা টুসুর লাল রঙের জামাটাও। চুলের ফিঁতা, জুতোগুলো, পুতির মালাগুলো।
টুসু চলে গেছে আর সাথে সাথে মা আর বাবাকে এক জীবনের সমস্ত দুঃখ দিয়ে চলে গেছে। মা বাবা তাই তাদের বড় মেয়েটিকে নিজের কাছে রেখে দিতে চেয়েছিলেন পরের ঘরে না পাঠিয়ে। বাড়ির মেয়ে বাড়িতেই থাকবে এরূপ সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত হয়েছিল অনেকগুলো বছর। ওপাশ থেকে কোনো হ্যাঁ না উত্তর আসেনি। কেন আসেনি তা আজও কেউ বলতে পারেনা রাইমা আহসান ছাড়া।
রাইমা মানুষকে মরে যেতে দেখেছে অসুস্থতা নিয়ে, রোগসোগ নিয়ে, শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে। কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে মরে যেতে, ভালোবাসা দিয়ে মেরে যেতে কভু দেখেনি সে।
আর ভালোবাসা দিয়ে সে যাকে মেরে গিয়েছে সে ভালোবাসা, বন্ধন, সংসার এসব থেকে নিজেকে কেন দূরে রেখেছিল তা সবার অজানা থাকলেও রাইমা তো জানে আসল কারণ কোনটা।
টুসু চলে যাওয়ায় বিস্তর পরিবর্তন কিছুই হয়নি। যে যার মতো ভালো আছে। মানুষকে ভালো থাকতে হয়। সবচেয়ে নির্মম সত্য এটাই কেউ মৃত মানুষের জন্য চিরকাল কষ্ট পায় না। আহসান বাড়ির মানুষও সেরকম।
তবে হ্যাঁ পড়ন্ত বিকেলে যখন নির্জনে বসে এক কাপ চায়ের কাপে চুমুক বসায় বিবেক আহসান তখন চায়ের স্বাদটা বড়ো বিদঘুটে লাগে। এই বিদঘুটে চা একজনই বানাতে পারতো।
~রাইদা আহসান~
জীবন যাকে পনেরটা বছরও বাঁচতে দেয়নি। বিবেক আহসানের জীবনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে যে বুকফুলিয়ে গর্বের সাথে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিল।
মানুষ ভালোবাসার কাঙাল। সে যতই বলুক তার জীবনে ভালোবাসার ঠাঁই নেই, আবেগ নেই, মায়া নেই, স্নেহ নেই। আদৌ কি তাই?
সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে মায়ায় ঠিকই পড়ে মানুষ। মায়া এমন একটা জিনিস যা ভালোবাসারও উর্ধ্বে। যে মায়ায় পড়ে তাকে ভালোবাসা জিনিসটাকে পার করে তবেই মায়ায় পড়তে হয়।
আর ওই মায়াটা রাগিনী আর অভিনব শারাফের মধ্যে ছিল। তথাকথিত ভালোবাসারও উর্ধ্বে। টুসুর জীবনে অভিনব শারাফ একটা মায়া ছিল। ওটাকে না পেলেও টুসু অপেক্ষা করতে জানতো। অপেক্ষা ফুরিয়ে গেলেও মায়া অতটুকু কমতো না।
ভালোবাসা পাওয়া শেখায় আর মায়া দূর থেকেও মায়ায় বেঁধে রাখতে। কল্পনার অভিনব শারাফকে টুসু মায়ায় বেঁধে রাখতে চেয়েছে। মায়ায় ফেলতে চেয়েছে। অভিনব শারাফ মায়ায় পড়েছে কিনা সেটা টুসু জানেনা। তবে সবচেয়ে আঘাত হয়তো সেদিন পেয়েছে যেদিন সে দেখেছে তাকে ব্লক করা হয়েছে।
এসব অবশ্য বিবেক আহসান দেখেছিল অনেক পরে টুসুর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা রিকোভার করার পর। অভিনব শারাফের সাথে নিজের মনের কথা বলতে না পারলেও নিজের সাথে নিজে অসংখ্য কথা বলেছে টুসু সেই রাতভর। একটারাতের মধ্যে সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। কে তার মনের কথাগুলো শুনত তখন? কার কাছে গিয়ে সে বলত সে নির্দোষ?
ফোন নাম্বারটা রিকোভার করার পর দেখা গেল যতগুলো কথা টুসু অন্যজনের সাথে বলেছে তারচাইতে হাজারগুণ কথা নিজের ইনবক্সে বলেছে।
অসংখ্য মেসেজ। পড়তে পড়তে বিবেক আহসানের দমবন্ধ হয়ে এসেছিল। টুসু বলেছিল,
“বিবেক ভাই জানো তুমি আমার কাছে কি লজ্জার? অভিনবের জায়গায় তোমাকে যখন দেখলাম আমি তখনই মরে গেলাম নিজের উপর লজ্জায়, ঘৃণায়। আমি চিরটাকাল নিজের অপছন্দের। ওইদিন নিজেকে আরো ঘৃণা হচ্ছিল। এত এত পুরুষ মানুষের ভীড়ে তোমাকেই কেন অভিনব শারাফ হতে হলো?
তুমি তো কোনোদিনও আমার প্রশংসা করলেনা। কিন্তু অভিনব করেছে। আমার জীবনের সমস্ত জটিলতাগুলোকে ও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। সেগুলোকে কেয়ারই করেনি।
কিন্তু তুমি তো নিজেই আস্ত একটা জটিলতা আমার জীবনে। কেন এমন হলো? আমি তো এমনটা চাইনি। আমি তোমাকে ভালোবাসার কথা ভাবতেও পারিনা। আমার ঘেন্না হয়। অস্বস্তি হয়। আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যিটা স্বীকার করতে পারব না বলে কাল চলে যাচ্ছি।
যে চোখে তুমি শ্রদ্ধা দেখে এসেছ সেই চোখে ঘৃণা সইতে পারবে না বলে পালিয়ে যাচ্ছি। তুমি আর আপা ঘর বেঁধো। নইলে এই অপরাধবোধ আমার কোনোদিনও যাবে না। কোনো একফাঁকে আমি তোমাদের সংসার দেখে যাব চুপিসারে।
অনেক বড় হওয়ার পর আসব। আমার জীবনেও একদিন অভিনব শারাফ হয়ে কেউ আসবে। যাকে ভালোবেসেছি কথাটা ভাবতেই আমার ঘৃণা হবে না। অস্বস্তিতে মরে যেতে হবে না।
আমি তো ভালোবাসায় বাঁচতে চেয়েছি। এখন ঘৃণায় কেন মরতে ইচ্ছে করছে?
অভিনব যখন আমার কাছে অস্তিত্বহীন প্রমাণ হল আমার তখনই ইচ্ছে হল ওর মতো অদৃশ্য হয়ে যেতে। যাতে তোমার মুখোমুখি দাঁড়াতে না হয়। তুমি যে অজান্তেই আমাকে পিঠে চাপড়ে দিতে, মাথা চাপড়ে দিতে, গাল টেনে দিতে ওসব আমার মনে পড়তেই কেমন লাগছে তা বুঝিয়ে বলতে পারব না। তোমার চোখদুটোকে কি মারাত্মক ভয় লাগে আমার তুমি জানো না। চোখদুটোতে আমি ছোট থেকে স্নেহ, মমতা দেখে এসেছি।
ওই চোখদুটোতে চোখ রেখে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি করতে পারব না বলে আমি পালিয়ে গেলাম। আমি যে তোমায় কখনোই ভালোবাসিনি। আমি শুধু শারাফকে ভালোবেসেছি। ও তোমার মতো নয়। তুমি ওর মতো নও। আমি মানতে পারিনা তোমার দুজনেই এক। আমি মানতে পারিনা যে আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। আমি তোমাকে কখনোই ভালোবাসিনি বিবেক ভাই। তুমি যখন জানবে ওই রাগিনী আমিই ছিলাম তখন তুমি কি করবে আমি জানিনা। হয়ত আমাকে বকবে। নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে যাবে। খুব ভুগবে। লজ্জা হবে।
আপাকে কেন মেরেছ তার কারণ আমি বুঝতে পারছি এখন কিন্তু বিশ্বাস করো আপা কিচ্ছু জানেনা। আপার একটা ব্যামো আছে জানো? ও মনের কথা খুলে বলতে পারেনা। কিন্তু তুমি বুঝে নিও। ওর রাগের মাঝখানে ভালোবাসা আছে ওটা খুঁজে নিও। তোমার আর আপার একটা সোনার সংসার হোক।
বিশ্বাস করো ওই সংসার আমি দেখতে পারব না। কিন্তু যেদিন অনেক বড় হয়ে যাব। বয়স চব্বিশ পঁচিশ হবে তখন আমার একটুও কষ্ট হবে না। দশ বছর পর কিচ্ছুটি আর মনে থাকবে না। এই দশ বছরে তোমার আপার সংসার বাচ্চা কাচ্চায় ভরে যাক।”
বিবেক আহসান মেসেজগুলো কতরাত বসে বসে পড়লো একাকী একটা আধো অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে বসে। তখন মনে হয় জানালার পাশেই দাঁড়িয়ে টুসু তাকে সমস্ত কথা বলে যাচ্ছে নিজের মুখে। বলে যাচ্ছে তার আর অভিনবের মধ্যে পার্থক্য ঠিক কোথায় কোথায়।
“তুমি কত কঠিন বিবেক ভাই অথচ অভিনব কত সরল। তুমি কথায় কথায় ধমকাও, বেশি রেগে গেলে মারতে পর্যন্ত উঠে যাও, সোজা কথা বোঝো না। অথচ অভিনবকে কিছু বলার আগেই বুঝে যেত আমার মধ্যে কি চলছে। ও বলতো সব আমার মনের ভুল। আমার ওভার থিংকিং।
তোমাকে কিছু রেঁধে খাওয়ালে তুমি কোনোদিনও আমার আর আপাদের নাম করতে না। তিরস্কার করতে। অথচ অভিনব! ও বলতো মানুষ করতে করতে শেখে। মানুষ সব পারেনা। মানুষের সব পারার বাধ্যবাধকতাও নেই।
তুমি দু’বার কোনো কথা বলতে চাইতেনা অথচ ও? ও সারাক্ষণ কথা বলতো। আমার যে এখন দমবন্ধ লাগছে। ওর সাথে কথা বলতে পারলে আমি স্বস্তি পেতাম। আমি নতুন করে বাঁচতে পারতাম।
কিন্তু তুমি আমার বাঁচার সব রাস্তা বন্ধ করে দিলে। ও যবে আমায় ব্লক করে দিল আমি কথা হারিয়ে ফেললাম। আমি তখনই মরে গেলাম।
তুমি এটা কেন করলে?
তুমি আমার কথা বলার, বেঁচে থাকার রাস্তাটুকু বন্ধ করে দিলে কেন? কেন এমন করলে? আপার সামনে ভালোবাসাও স্বীকার করলে না। আমাকেও কেন এত কষ্ট দিলে? তুমি এত পাথর কেন? তোমাকে অভিশাপ দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দেব না। আমার সাথে অভিনয় করার শাস্তি তুমি পেয়ে যাবে। ঠিক পেয়ে যাবে।”
সেই শাস্তি কি বিবেক আহসান পায়নি?
পেয়েছে। বিবেক আহসানের কাছে সবচেয়ে বড় শাস্তি এটাই যে তাকে অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে চিরটাকাল। এই অপরাধবোধ নিয়ে তাকে আরেকজনের সাথে সংসার করতে হবে।
ওই আরেকজনের সাথে তার সম্পর্কটার আজও কোনো নাম নেই। ছোট থেকেই এক বাড়িতে বেড়ে ওঠা দুজনের মধ্যে অতটা ভালো সম্পর্ক কভু ছিল না। ঝগড়াঝাটি, তর্কতর্কি আর কথার পিঠে কথা এসবই ছিল তাদের দুজনের মধ্যে।
কেউ যদি এক পা আগ বাড়িয়ে সম্পর্কটাকে নাম দিয়ে থাকে তাহলে সে রাইমা আহসানই। এতে বিবেক আহসানের কোনো ভূমিকা নেই। তার প্রতি বিবেক আহসানের নির্লিপ্ততায় রাইমাকে ফুঁসিয়ে তুলত। উজাড় করে কেন রাইমার সামনে সে নিজেকে প্রকাশ করেনা তা নিয়ে রাইমার বরাবরই অভিযোগ ছিল। অথচ বিবেক আহসান উজাড় করে ভালোবাসার মতো সুযোগই পায়নি। রাইমার সামনে সে কিছুতেই খোলা খাতা হতে পারেনি কভু। কেন পারেনি সে তা তখনো জানতো না, আজও না।
রাগের বিপরীতে রাগ, জেদের বিপরীতে জেদ, তর্কের জালে তর্ক এভাবেই কেটেছে তাদের দিন। একে অপরকে বোঝার ফুরসত মেলেনি, চেনার অবকাশ আসেনি। কেউ কারো কাছে হার মানেনি, নত হতে রাজি হয়নি কেউই। তবু অজান্তেই এক অলিখিত, অব্যক্ত চুক্তি গেঁথে গিয়েছিল যে সব দ্বন্দ্ব শেষে তারা একসঙ্গেই থাকবে। ভালোবাসা তখনো একেবারেই উপেক্ষিত। আজও।
ওই ভালোবাসাটা পাকাপোক্ত হতো। মান অভিমান ফুরিয়ে গেলে অভিনব শারাফ বলে নিজেকে পরিচয় দিত বিবেক আহসান। রাইমা আহসানকে হারিয়ে দিয়ে নিজেকে জাহির করতো শ্রেষ্ঠ প্রেমিক হিসেবে।
মনে মনে এটুকু আশা ছিল যার সাথে সে সংসার করবে, চিরটাকাল থাকবে সে তার ছায়া চিনতে ভুল করবে না।
একটাসময় গিয়ে কথা বলতে বলতে শারাফকে সে সন্দেহ করবে, হঠাৎ করে চিনে ফেলবে, তারপর ঠিক তার মতো অভিনয় করবে নিজেও।
নতুন করে নতুন পরিচয়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে রাইমা আহসান আর সে প্রেমিক প্রেমিকা হতে চেয়েছিল সম্পর্কের দায়ে। দুয়েক পা নিজেও বাড়িয়েছিল সাহস করে। আর এই সাহসটা এসেছিল রাগিনীর আগ বাড়িয়ে মেসেজ দেয়ার নিমিত্তে।
কিন্তু যখন বুঝতে পারলো রাইমা আহসান বুঝতেই পারছেনা সেই বিবেক আহসান বরঞ্চ অন্য ছেলে ভেবে কথা বলছে তখনি মনে খটকা লাগলো। অথচ তখন অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। বসন্তরাণী আর অভিনব শারাফের আলাপ তখন অনেকদূর। অনেক। ততটা দূর যতটা দূর থেকে ফেরার কথা বিবেক আহসান আর ভাবতে পারেনি বলে বিয়ের কথা শুনে রাগ মাথায় বাড়ি ফিরে উরুধুরা পিটিয়েছিল কাউকে কোনো কথা বলতে না দিয়ে।
যখন সে নিজেই এগিয়ে এল তখন রাইমা আহসান তার সাথে প্রতারণা করলো? অথচ গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাকে ঘিরে লাল নীল স্বপ্ন দেখা মেয়েটা যে রাইমা আহসান ছিল না তা জানার পর দমটা বন্ধ হয়ে যায়নি এইতো বেশি।
মাঝেমধ্যে এমন হয় না যে মনে আসে কথাটা কিন্তু প্রকাশ করা যায় না? অথচ পরে গিয়ে সেটাই হয়। বিবেক আহসানের সাথে ঠিক সেটাই হয়েছে। মাঝেমধ্যে মনে হতো এ রাইমা নয়। রাইমা এমন না। কিন্তু মনের ভুল ভেবে সে বিষয়টাকে নিজের মনেই আড়াল করে ফেলেছিল।
আর তারপর যখন মনে হলো রাইমার সাথে এখানে বেশ সহজ হতে পারছে সে তখন নিজের ভেতরের রূপটাকেও অভিনব শারাফ নামক প্রেমিক রূপ দিতে কষ্ট হয়নি তার।
কঠোর, পাষাণ, কাঠকাঠ কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিবেক আহসানের প্রকৃত সত্তাই তো অভিনব শারাফ। যে নিজেকেও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি আর অন্যদেরও বিভ্রান্ত করে রেখেছিল।
কিন্তু সত্যিটা কি মেনে নেয়ার মতো ছিল? মানতে না পারলেও টুসুর সামনে দাঁড়িয়ে তার কতকথা জিজ্ঞেস করার ছিল। হাজারটা প্রশ্ন। হাজারটা কৌতূহল। বুকের ভেতর এতটা কখনো তড়পায়নি। এতটা এতটা দমবন্ধ পরিস্থিতিতে বিবেক আহসান কখনো পড়েনি।
তাকে একটা কথাও বলতে না দিয়ে, একটা সুযোগও না দিয়ে টুসু চলে গেল।
মারের ভয়ে? মেয়েটাকে তো সে মারতো না। অভিনব শারাফের বড়ো আদরের মানুষ ছিল সে। একটুও মারতো না। গায়ে একটা আঁচড়ও দিত না। একটা বেতের বাড়ি ভুলেও না।
ভুল করে ভালোবাসলে সেটা পাপ হয় না। ভালোবাসায় পাপ থাকলে সেটাই ভুল।
সে শুধু একটা প্রশ্নই জিজ্ঞেস করতো।
টুসু কি চায়?
অবশ্য এখন বিবেক আহসান সব জানে। টুসু অভিনব শারাফকে ভালোবেসেছে। আর তাকে করেছে ঘৃণা। এই মুহূর্তে এসে বিবেক আহসানের মনে হয় তাকে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে বলেই টুসু চিরতরে চলে গিয়েছিল। মেয়েটা তার পরিবারের মানুষকে বড্ড ভালোবাসে। যাকে ভাইয়ের চোখে দেখে এসেছে তাকেও। তাই ঘৃণা করতে পারবে না বলে চলে গিয়েছে।
বছর দু তিনেক পর বিবেক আহসানের অবশ্য একটা বড়সড় কোম্পানিতে চাকরি হয়েছিল সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে। রাইমা আহসানের চাকরি হয়েছে একটা প্রাইমারি স্কুলে। মাসে দুয়েকবার বাড়িতে আসে বিবেক আহসান। বাবা, কাকারা নানান কথা বলে। আলোচনার টপিক গড়ায় রাজনীতি, থেকে সমাজ, রাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থায়। তারপর এসে থমকায় সংসার নামক শব্দে।
“কি হবে তোদের?”
প্রশ্নটা শুনে মেজাজ বিগড়ে যায় বিবেক আহসানের। কি হবে মানে? জীবন চলে যায়। শুধু চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়।
কিন্তু সবাই ধরেবেঁধে বোঝায়। জীবন এভাবে চলে না। যারা জীবনকে এভাবে চালিয়ে নিয়ে যায় তাদের জীবনটা বড়ো দুঃখে কাটে।
রাইমার জন্য কত ভালো ভালো পাত্র এল। সে একবার চাইলো অনেকদূরে চলে যাবে। বিবেক আহসানকে নিজের মতো করে বাঁচতে দেবে। নিজেকে তার জীবনের সাথে জড়াবে না। তাদের একসাথে থাকার নয়।
কিন্তু পরক্ষণেই সে সবাইকে ফিরিয়ে দিল তার বোনের রেখে যাওয়া আবদার পূরণ করতে। রাগিনী আইডিটা দেয়ার অপরাধে বোনটা তাকে এতবড় শাস্তি দিল যে আজীবন একটা পাথরের সাথে সংসার করার স্বপ্ন নিয়ে দিনাতিপাত করতে হলো তাকে।
এরিমধ্যে বছর দশেক পেরিয়ে গেছে। বিবেক আহসানের ঘাড়ে এখন পরিবারের সবার দায়িত্ব। স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, মা বাবা, ভাইবোন, কাকা, কাকী সবার। পরিবারের বড় ছেলে সন্তান সে। টুসুর মৃত্যুর দুয়েক বছর পর অবশ্য ছোট কাকার একটা ছেলে সন্তান হয়েছে।
ভরপুর সংসারে এখন টুসুর অস্তিত্বই নেই। যে যার মতো ভালো আছে।
ইতোমধ্যে পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে উঠেছে দুই সন্তানের জননী রাইমা। তার সংসারে সুখের অভাব নেই। এত সুখী সে হবে কখনো কল্পনা করেনি। মাঝেমধ্যে স্বামী তাকে এত ভালোবাসে সে চিনে উঠতে পারেনা এই মানুষটা কে? এত ভালোবাসার সংসার তো তার হওয়ার ছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে এটা তার বোনের চাওয়া। তাই তো তার এতবড় পাওয়া।
জীবন থেমে থাকে না। স্বপ্নরা থেমে থাকে। টুসুর স্বপ্নগুলোও থেমে গিয়েছিল মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপ অব্দি। ঠিক তেমন অভিনব শারাফের স্বপ্নগুলোও।
অফিস থেকে এসে ছেলে মেয়েদের সাথে সময় কাটানোর সময় হঠাৎ একটা কাগজ কুড়িয়ে এনে বিবেকের দিকে বাড়িয়ে দেয় রাইমা। বলে,
“এটা কি দেখো তো।”
বিবেক কাগজটা দেখে কপাল কুঁচকায়। মনে হলো যেন অনেক বছর আগের লেখা কারো হাতের চিঠি। কাগজটা বিবেকের হাতে দিয়ে রাইমা ঘর ছাড়লো ব্যস্তপায়ে। সংসারের সব কাজ এখন তার।
কাগজটা পরিচিত মনে হতেই বিবেক আহসানের বুক কেমন কেঁপে উঠলো হঠাৎ। এটা তো তার নিজের হাতে লেখা অভিনব শারাফের একটা চিঠি! কাগজের ভাঁজ খুলতেই ঘন লেখাগুলোর অক্ষরগুলো আর অক্ষরে অক্ষরে লেপ্টে থাকা আবেগগুলো বুকের কাঁপুনি বাড়িয়ে দিল তার। লেখাগুলো ছিল ঠিক এমন..
“তোর বয়স আরও দশ বেড়ে চব্বিশ হত। আমার চৌত্রিশ। বাসন্তী রঙের শাড়ি, লাল চুড়ি তখন তোকে কত মানাত। আমার গালের দাঁড়ি না হয় একটু বাড়ত, চুল দু একটা পাক ধরত, কয়েক বাচ্চার বাপের মতো লাগত। তাতে কি হত? তুই বড় হয়ে আসতি আমার কাছে লাজুক লাজুক চেহারা নিয়ে।
তুই বললে অভিনব শারাফ তোর অপেক্ষায় থাকতো। জীবনকে সুযোগ দিতে হয় গাধারাণী। তুই আমায় এত ঘৃণা করলি যে আমাকে তোর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগটুকু দিলি না। আমি এতটা ঘৃণ্য যে তুই আমায় বারবার করে বলে গেলি তুই আমায় ঘৃণা করিস। আমায় কেন এত যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে গেলি রে? এত এত অপরাধবোধ, অনুশোচনা, অনুতাপ আর আত্মগ্লানিতে ডুবিয়ে মারলি অথচ একফোঁটা ভালোবাসলি না।”
বিবেক আহসানের হাত কেঁপে উঠলো। এই লেখাগুলো ঠিক তখনকার যখন রাইমার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল অন্য কোথাও। প্রায় বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। আর তখন একাকী নিজের ঘরে বসে চিঠিখানা লিখেছিল বিবেক আহসান। টুসুর কাছে পাঠানোর ডাকপিয়ন পায়নি বলে এভাবে অনাদরে, অবহেলায় পড়েছিল ঘরের এককোণায়।
সেই পুরোনো লেখা অথচ তাজা অনুভূতি।
সেই পোড়া লাশ! অনবরত ধেয়ে আসা মেসেজগুলো। স্বপ্নগুলো। প্রতিশ্রুতি গুলো। জন্ম মৃত্যুর মতো বসন্তরাণীকেও নিজের জীবনের সত্যি ভেবে নেয়াটা। ওসবে কোনো ভুল ছিল না।
এটা সত্যি যে ভুল করে ভালোবাসায় কোনো পাপ থাকে না। কিন্তু ভালোবাসায় পাপ থাকলে তা ভুল।
বিবেক ভাইকে ভালোবাসার মতো পাপ টুসু করতে পারত না বলে মরে গিয়েছিল। পারত না ভালোবাসতে। টুসু কোনোদিনও ওই চোখে তাকাতে পারত না বিবেক ভাইয়ের দিকে।
আলতারাণীর প্রেম পর্ব ৮
সংসার জীবনের নানান দুশ্চিন্তা, চাকরিজীবনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে দিয়েও বিবেক আহসানের পাথরকঠিন মন আজও সেই প্রশ্নে ভাসে যে, তাকে একটু ভালোবাসলে কি হতো? ওকে মরতে হত না। রাইমা আরও ভালো জীবনসঙ্গী পেত। তার বুকছিঁড়ে দীর্ঘশ্বাসটা বের হতো না। হঠাৎ করে জানালার পর্দাটা দুলে উঠলে তার বুকটা ধড়ফড়িয়ে উঠত না। কানের কাছে ফিসফিস করে কেউ বলে যেত না,
“শোনো আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারব না বলে চলে গেলাম। অভিনবকে ভালোবেসে অবশেষে সত্যি সত্যি মরে গেলাম।”
সমাপ্ত
