ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৮
মেহজাবিন নাদিয়া
হু হু করে ছুটে চলা গাড়িটা একসময় মূল মহাসড়ক ছেড়ে নির্জন একটা শাখা রোডের দিকে মোড় নিল। আরিশান মৃধা গাড়িটা একদম নিঝুম, সুনসান একটা জায়গার সামনে এনে দাঁড় করালেন। চারপাশটা বেশ শান্ত, গাছপালার ছায়া ঘেরা। তবে সেই নীরবতার মাঝেও জায়গাটার কিছুটা দূরে একটা ছোট ফুচকা স্টল দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে ফুচকার সুবাস হালকা বাতাসে ভেসে আসছে। গাড়ি থামতেই জেবা জানালার বাইরে তাকিয়ে সেই ফুচকার দোকানটা দেখল। ব্যস, ওর ভেতরের ছটফটে রূপটা নিমেষেই জেগে উঠল! আরিশান মৃধা গাড়ি থেকে নামতেই জেবাও তর সইছে না এমন ভঙ্গিতে তিড়িং-বিড়িং শুরু করে দিল। গাড়ি থেকে প্রায় লাফিয়ে নামার উপক্রম ওর!
আরিশান মৃধা ওর এই অতি-উৎসাহ দেখে মনে মনে হাসলেও মুখে কঠোরতা ফুটিয়ে তুললেন। জেবা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি ওর নরম হাতটা শক্ত করে ধরলেন। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে আলতো টানে ওকে গাড়ির হেডবোর্ডের ওপর বসিয়ে দিলেন। জেবা বোরকা আর নিকাবের ঘের সামলে গুছিয়ে বসল, ওর চোখ দুটো তখনো ফুচকার দোকানের দিকে চকচক করছে।
ওরা দাঁড়াতেই সেই স্টল থেকে একটা ১০-১২ বছরের বাচ্চা ছেলে ওনাদের দিকে এগিয়ে এলো। আরিশান মৃধা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
_”দুই প্লেট ফুচকা নিয়ে আসো।”
পাশ থেকে জেবা তর সইতে না পেরে চট করে বলে উঠল,
_”এই শোনো, আমার প্লেটটা কিন্তু বেশি মরিচের গুড়ো দিয়ে ঝাল করে বানাবে! একদম টক-ঝাল যেন কড়া হয়।”
আরিশান মৃধা তৎক্ষণাৎ চোখ পাকিয়ে তাকালেন জেবার দিকে। ওনার সেই চশমার আড়ালের চাউনিতে স্পষ্ট বারণ ছিল, কিন্তু জেবা সেসবে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। সে মুখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করতে লাগল, যেন ও কিছুই বলেনি।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে থেকে বিনীতভাবে বলল,
_”সাহেব, আর কিছু লাগবো? আমগো এনে চটপটিও আছে, অনেক ভালো বানাই। ওইটা আনুম?”
আরিশান মৃধা হাত নাড়িয়ে মানা করে দিয়ে বললেন,
_”না, আর কিছু লাগবে না। ফুচকাই যথেষ্ট।”
কিন্তু ওনার কথা শেষ হতে না হতেই পাশ থেকে জেবা আবার আড়মোড়া ভেঙে বলে উঠল,
_”আরে লাগবে লাগবে! এক প্লেট চটপটিও নিয়ে আসো ভাইয়া।”
ছেলেটা হেসে মাথা নাড়িয়ে দ্রুত দোকানের দিকে চলে গেল।ছেলেটা চলে যেতেই আরিশান মৃধা জেবার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। ওনার মুখে চরম বিরক্তি। তিনি বেশ কড়া গলায় জেবাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
_”স্টুপিড! এত আনহাইজেনিক খাবার তুমি কীভাবে খাও? রাস্তার ধূলিবালি মাখা এসব খাবার খেলে পেট খারাপ করবে তো!”
জেবা কোনো রকম ভাবনাচিন্তা ছাড়াই বেশ ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দিল,
_”কেউ না খেলেও আমি খাই। তাছাড়া আমার পেট খারাপ হলে আপনার কী তাতে?”
আরিশান মৃধা ওর কথার পিঠে কথা বলা দেখে এক ভুরু বাঁকালেন। ধীর গলায় বললেন,_”বেশ মুখে মুখে বলতে শিখে গেছো দেখছি।”
জেবা এবার একটু ওনার দিকে এগিয়ে এলো। নিকাবের আড়াল থেকেই মিষ্টি করে হেসে ওনার দিকে একটা চোখ টিপে বলল,
_”বলব না কেন? দুদিন পর আপনার বাচ্চার মা হয়ে যাবো যে! তখন তো আরও বেশি বলতে হবে।”
আরিশান মৃধা পিচ্ছি বউকে এভাবে চোখ মেরে,টিজ করে কথা বলতে দেখে থতমত খেলেন। অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন জেবার সামনে। ওনার মতো একজন গম্ভীর, রাশভারী মানুষের বুড়ো বয়সে এসে নিজের কমবয়সী বউয়ের কাছ থেকে এমন খোঁচা শুনতে হচ্ছে-ভাবতেই ওনার কান দুটো যেন একটু গরম হয়ে উঠল! তার ওপর মেয়েটা ওনাকে এখন আর আগের মতো একটুও সম্মান দিয়ে কথা বলছে না। আরিশান মৃধা নিজের অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকার জন্য গলা খাঁকারি দিলেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠস্বর আরও কিছুটা চড়িয়ে জেবাকে শাসানোর ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
_”তুমি কিন্তু দিন দিন বড্ড মুখে মুখে কথা বলছো জেবা। ভুলে যেও না, বয়সে আমি তোমার চেয়ে অনেক বড় হই। বড়দের সাথে কীভাবে শ্রদ্ধা দিয়ে কথা বলতে হয়, তা শিখো।”
জেবা এবার উপহাসের সুরে খিলখিল করে হেসে উঠল। ওনার গম্ভীর রূপটাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল,
_”আপনি বড্ড নাদান হানি! মনে মনে বাচ্চা চাচ্ছেন, অথচ মুখে আবার বড়দের মতো শ্রদ্ধা খুঁজছেন? আমি তো এখন থেকেই চিন্তা করছি, আমাদের সেই বাচ্চা যখন পৃথিবীতে আসবে, সে আমাদের দুজনকে কী বলে ডাকবে!”এই বলে জেবা চোখ নাচিয়ে মুচকি হাসল।
আরিশান মৃধার মনে এবার তীব্র কৌতূহল জাগল। তিনি নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন,
_”কী বলে ডাকবে শুনি?”
জেবা এবার ওর বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে যদিও নিকাবের কারণে তা দেখা গেল না, কিন্তু ওর চোখের কোণ কুঁচকে যাওয়া দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল। হেসে জবাব দিল,
_”আমাকে তো ‘মা’ বলে ডাকবে, সেটা একদম কনফার্ম! তবে আপনাকে ‘বাবা’ বলে ডাকবে কিনা, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।না মানে…” জেবা একটু থামল।
আরিশান মৃধা এবার বেশ রেগে গেলেন। ওনার সন্তান ওনাকে বাবা ডাকবে না-এটা কেমন আজব কথা! তিনি কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
_”না মানে কী, হু? যা বলার পরিষ্কার করে বলো।”
জেবা দুষ্টু হাসিটা মুখে ঝুলিয়েই বলল,
_”আপনি তো আবার আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভাবেন। আমার প্রতি আপনার যা কিছু অনুভূতি, তা তো শুধুই ‘দায়িত্ববোধ’ থেকে করেন! তো সেই হিসেবে হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, লিগ্যালি আমার বাচ্চারা আপনাকে ‘নানা’ বলে ডাকতে পারে। কারণ আপনি তো আমার বাবার মতো, মানে মায়ের বাবা!”
ব্যাস! জেবার এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিল আরিশান মৃধাকে ভেতর থেকে জ্বালিয়ে খাক করে দেওয়ার জন্য। জেবা তো মনে মনে এটাই চাচ্ছিল-আরিশান মৃধা জ্বলুক, ওনার ভেতরের পুরুষালি অহংকার আর লুকিয়ে রাখা ভালোবাসাটা এবার রাগ হয়ে বেরিয়ে আসুক। জেবার সেই উদ্দেশ্য যেন ষোলোআনা পূরণ হলো। ও আশা করেছিল, এবার হয়তো আরিশান মৃধা রেগেমেগে চিৎকার করে স্বীকার করেই নেবেন যে-তিনি জেবাকে শুধু দায়িত্ববোধ থেকে নয়, নিজের আপন ঘরণী এবং ভালোবাসার মানুষ হিসেবেই মানেন!
তবে ওর সেই গুড়েবালি ঢেলে দিয়ে আরিশান মৃধা ওনার মানসিকতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করে ফেললেন। ওনার মুখের অবয়ব মুহূর্তের মধ্যে একদম নরমাল ও শান্ত হয়ে গেল। দেখে মনেই হলো না ওনার ভেতরে কোনো ঝড়ের আভাস গেছে।ঠিক তখনই সেই ছেলেটা ট্রে-তে করে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চটপটি আর মচমচে ফুচকা নিয়ে হাজির হলো। সে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ওপর প্লেটগুলো সাবধানে রেখে আবার নিজের দোকানের দিকে চলে গেল।
আরিশান মৃধা আশেপাশে একবার চোখ বুলালেন। জায়গাটা বেশ নীরব, জনমানহীন। ওনি পাশ ফিরে জেবার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন, জেবা ততক্ষণে দিনদুনিয়া, সব ভুলে ফুচকা গেলাতে মগ্ন হয়ে পড়েছে! অতিরিক্ত ঝাল হওয়ার কারণে মেয়েটার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, নাক লাল হয়ে গেছে, তবুও সে চরম তৃপ্তি সহকারে একটার পর একটা ফুচকা মুখে পুরছে।
জেবাকে এভাবে খেতে দেখে আরিশান মৃধার মনের কোণে পুরোনো কিছু স্মৃতি উঁকি দিল। একটা সময় ছিল যখন তিনি আনতারা মৃধাকে নিয়েও এভাবে ফুচকা খাওয়াতে আসতেন। তিনি ভালো করেই জানেন, মেয়েদের ফুচকার প্রতি এক আলাদা রকমের দুর্বলতা বা নেশা থাকে। আর ওনি সবসময়ই নারীদের সেই ছোট ছোট ইচ্ছাগুলো মেনে চলতেন। শুধু আনতারা নয়, অরিকেও তিনি প্রায়ই রাতে এখানে নিয়ে আসতেন ফুচকা খাওয়াতে। অরিও ফুচকায় প্রচণ্ড ঝাল খেতে ভালোবাসে। ঝাল খেতে বারণ করলে আরিশান মৃধার বকা সে কোনোদিনই শুনত না।হঠাৎ করেই অরিটার জন্য ওনার বুকটা হু হু করে উঠল। অরিকে ভীষণ মিস করছেন তিনি। এই সারিমের করা একের পর এক চক্কর আর নানাবিধ ঝামেলার মধ্যে পড়ে তিনি এই কয়দিন মেয়েটার একদমই কোনো খোঁজখবর নিতে পারেননি। ব্যাপারটা ওনার নিজের কাছেই খুব খারাপ ঠেকল। সেদিন আবার সারিম ওকে জেদ করে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। আনতারা মৃধার রুক্ষ ব্যবহার হয়তো মেয়েটার মনে বড্ড বেশি আঘাত করেছে। অরিটা ওনার মতোই ভীষণ চাপা স্বভাবের-সহজে মুখ ফুটে নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলবে না। একদম ওনার স্বভাব পেয়েছে মেয়েটা।
আজ সকালেই ওনার অ্যাসিস্ট্যান্টের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন,অরি এইচএসসি পরীক্ষায় এ+ পেয়েছে।এত হার্ড কোশ্চেন করার পরেও মেয়েটা এ+ পাবে এটাই ওনার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।তাছাড়া মেয়ের প্রতি সবসময়ই অগাধ বিশ্বাস ছিল, আর অরি সেটা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছে।মেয়ের এই সাফল্যে ওনার বুকটা গর্বে ভরে উঠল।মনে মনে ভাবলেন, সারিম যদি অরির কাছ থেকে সামান্যতম ম্যানার্স শিখতে পারত!তাহলে আজ সারিমটা একটু ভালো হতো। নয়তো ছেলের মুখের ভাষার লাগাম এখনই না টানলেই নয়।
ওনার এই গভীর ভাবনায় হঠাৎ ছেদ পড়ল জেবার কনুইয়ের এক সজোরে গুঁতো খেয়ে!আরিশান মৃধা চমকে তাকিয়ে দেখলেন, জেবা একহাতে চটপটির প্লেটটা ধরে অন্য হাত দিয়ে ওনাকে গুঁতো মারছে। ঝালের চোটে ওর চোখ-নাক লাল হয়ে পানি আর ঘাম মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ও কাঁপতে কাঁপতে ওনার দিকে চটপটির চামচটা এগিয়ে দিয়ে ইশারায় বলছে ওনাকেও একটু মুখে দিতে। জেবার ঝাল-লাগা মুখের অদ্ভুত করুণ দশা হয়েছে।
–চলন্ত গাড়ির অন্ধকার ডিকির ভেতর শুয়ে সোলেমান শেখের নিঃশ্বাসটা তখন যায় যায়। শরীর থেকে সমস্ত শক্তি যেন কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে, বুজে আসা চোখ দুটো জোর করে মেলে রাখাও দায় হয়ে পড়েছে ওনার। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে, এই বুঝি প্রাণ পাখিটা খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। বুকের ভেতর তীব্র, অসহ্য যন্ত্রণা; মনে হচ্ছে কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে ওনার হৃৎপিণ্ডটাকে ক্রমাগত আঘাত করে চলেছে। তবুও, মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসার জন্য মনের ভেতর একটা শেষ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শুধু নিজের কলিজার টুকরো জেবাটার জন্য!অত্যন্ত কষ্ট করে, কাঁপতে কাঁপতে নিজের রক্তাক্ত হাতটা বাড়ালেন তিনি। উদ্দেশ্য-যদি ডিকির ভেতরের লকটা কোনোভাবে আলগা করা যায়। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না। শরীর আর ওনার আদেশ মানছে না। ঠিক তখনই গাড়ির ভিতর থেকে আনতারা মৃধার তীক্ষ্ণ গলার আওয়াজ ওনার কানে ভেসে এলো।আনতারা মৃধা বেশ নির্লিপ্ত সুরে বলছে,
_”দেলোয়ার, রিল্যাক্স! অত চিন্তা করো না, কিচ্ছু হবে না। সোলেমান যদি মরেও যায়, তাহলেও আমাদের কাছে দ্বিতীয় অপশন অলরেডি আছে। ওর মেয়ে তো এখনো বেঁচে আছে!”
দেলোয়ার নিজেকে কোনোভাবে শান্ত করছে পারছেননা কেন জানি।বেশ বিরক্ত হয়ে আনতারা মৃধাকে উত্তর দিল,
_”ওর মেয়েকে দিয়ে আমাদের কী কাজ হবে? ও কীভাবে লকেটের ঠিকানা জানবে? ও তো এসবের কিছুই জানে না।”
আনতারা মৃধা কুটিল হেসে বলল,
_”না জানলেও, ওর বাবা নিশ্চয়ই এমন কোনো চেনা জায়গায় লকেটটা লুকিয়ে রেখেছে, যা উদ্ধার করতে ওই মেয়েটাকেই আমাদের টোপ হিসেবে কাজে লাগবে।”
দেলোয়ার তাও আশ্বস্ত হতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
_”কিন্তু সোলেমান- মানে ওর মেয়ে যে লকেটের হদিস বলবে, সে বিষয়ে তুমি এতটা শিওর হচ্ছো কীভাবে?”
_”জোর করে বলাতে বাধ্য করব!” আনতারার কণ্ঠে চরম নিষ্ঠুরতা ঝরে পড়ল। _”ওকে বলতেই হবে। না বললেও মরতে হবে, আর বললেও মরতে হবে। খালি একবার সেই লকেটটা হাতে চলে আসুক। তারপর সেগুলো থেকে প্রফিট হওয়া আমরা আমাদের ভাগের টাকা নিয়ে এই অবৈধ ব্যবসা চিরতরে ছেড়ে দেবো। এরপর আরিশান আর আমার একটা সুন্দর,সাজানো সংসার হবে।”
পাশের সিটে বসা অনুপমা। এতক্ষন যাবত ওনাদের কথা শুছিলো। সে আনতারা মৃধার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”তাহলে আমার কী হবে আন্টি? সারিমের জীবন থেকে ওই অনাথ মেয়েটাকে কবে বের করছো? আমি কিন্তু পরিষ্কার বলে দিলাম, সারিম শুধু আমার! ওকে না পেলে আমি কিন্তু তোমাকে ছেড়বো না।”
আনতারা মৃধা অনুপমার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
_”আমি কথা দিচ্ছি, সারিম শুধু তোমারই হবে। খালি সঠিক সময়ের অপেক্ষা করো। এরপর তুমিই আমার ঘরের একমাত্র পুত্রবধূ হবে। আগে ওই জেবাকে শেষ করে নিই, তারপর সারিমের জীবন থেকে ওই অনাথ মেয়েটাকেও চিরতরে সরিয়ে দেবো।”
ডিকির ভেতর শুয়ে সোলেমান শেখ ভয়ে আর আতঙ্কে শিউরে উঠলেন তাদের কথোপকথনে। অবচেতন মনটা চিৎকার করে উঠল তার। তিনি নিজেকে বোঝালেন-এখন ভেঙে পড়লে চলবে না, ওনার একটা ভুলের জন্য মেয়েটার জীবনটা একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে!নিজের ভেতরের শেষ সর্বোচ্চ শক্তিটুকু এক জায়গায় জড়ো করলেন। শুধু নিজের মেয়েকে শেষবারের মতো দেখার এক তীব্র আকুলতায় তিনি ডিকির দরজাটায় ধাক্কা দিতে লাগলেন।বাবার মন তো! আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সব ভুল বুঝতে পেরেছেন তিনি। যে স্ত্রীর জন্য, যার স্মৃতি বুকে নিয়ে মেয়েটাকে ছেড়ে।নিজের জীবনের সোনালী কয়েকটা বছর অস্ট্রেলিয়ায় একা কাটাল, সেই স্ত্রী আসলে একটা আস্ত মিথ্যা ছিল! ওনার ‘রিমা’ পুরোপুরি এক মরীচিকা ছিল। আজ কোনো ভুল না করেও ওনার নিষ্পাপ মেয়েটাকে আর ওনাকে এই পৈশাচিক নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে। পরকালে যদি সত্যিই স্রষ্টার দরবারে মুখোমুখি হওয়ার হয়, তবে তিনি অবশ্যই জাহরিমার কাছে এর জবাব চাইবেন-কীভাবে একজন মা হয়ে সে এমন জঘন্য অন্যায় করতে পারল? কীভাবে দিনের পর দিন ওনার সামনে ভালোবাসার এমন নিখুঁত অভিনয় করে গেল? অথচ তিনি তো জাহরিমাকে সত্যিই নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলেন!সবকিছু এখন ফিকে অর্থহীন লাগল এখন তার কাছে।
শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা ধাক্কা দেন তিনি ডিকিতে। চলন্ত গাড়ির ডিকিটা সামান্য ওপরে উঠে একটুখানি ফাঁক হয়ে গেল! সোলেমান শেখ অবচেতন মনে, অসম্ভব কষ্ট করে সেই ফাঁকটা ধরে রাখলেন। বাইরের সূর্যের আলো সামান্য এসে ওনার ঝাপসা নজরে পড়ল। পৃথিবীর এই পার্থিব সৌন্দর্য শেষবারের মতো দেখার জন্য তিনি বহু কষ্টে চোখ জোড়া মেললেন।
ওনার চলন্ত হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতরের সমস্ত শারীরিক যন্ত্রণা ছাপিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি আর স্বস্তি ওনার আত্মাকে ছুঁয়ে গেল।যেন খুব বড় কিছু তিনি দেখে ফেলেছেন। শেষ সময়ে এসে এইরকম দৃশ্য ওনার পিতৃত্ব মনে একটা গভীর দাগ টেনে দিলো।হয়তো আর কখনো এই মুখগুলো তিনি দেখতে পারবেন না।এটাই হয়তো শেষ দেখা,তবুও সকল দুঃখের মাঝেও খুব সুখি মনে হলো এই মূহর্তে নিজেকে।ওনিতো এমনটাই চাইতেন সবসময়।ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে পরম তৃপ্তির হাসি।
সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে আছে আরিশান মৃধা,জেবা ফুচকার অতিরিক্ত ঝালে হাত-পা ছুড়ে চিল্লাচ্ছে।আর আরিশান মৃধা পরম ব্যাকুলতায় ওকে বোতল থেকে পানি খাওয়াচ্ছেন,ঝাল কমানোর জন্য মুখে ফুঁ দিচ্ছেন। জেবা ঝালের চোটে আরিশান মৃধার কোটের হাতাটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে। ওর চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ, চোখ দিয়ে টপাটপ পানি পড়ছে।আরিশান মৃধা তা অতি সন্তর্পণে আলতো হাতে নিজের রুমালটা দিয়ে ওর চোখের পানি মুছে দিচ্ছেন। আর বারবার ধমকাচ্ছেন এতো ঝাল খাওয়ার জন্য। ওনার চোখে-মুখে জেবাকে আগলে রাখার তীব্র ব্যাকুলতা স্পষ্ট।
দৃশ্যটা দেখতে দেখতে সোলেমান শেখের চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। মেয়েকে নিয়ে ওনার মনের সমস্ত ভয়, সমস্ত সংশয় নিমেষেই উড়ে গেল। আরিশানের মতো একজন বিশ্বস্ত বন্ধু পাওয়া ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভাগ্য ছিল। ওনার মেয়ে আসলেই নিজের জন্য একদম সঠিক মানুষটাকে বাছাই করেছে। লোকে ঠিকই বলে-বয়স তো আসলে একটা সংখ্যা মাত্র! যে ভালোবাসতে জানে, যে আগলে রাখতে জানে, সে বয়স দেখে নয়, মনের গভীরতা দেখে আগলে রাখে।
সোলেমান শেখের মনে আর কোনো বিন্দুমাত্র চিন্তা রইল না। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ওনার কলিজার টুকরোকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ হাত দুটোর ওপর সঁপে দিয়ে যাচ্ছেন। এখন তিনি একদম নিশ্চিন্তে, হাসিমুখে এই নশ্বর দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে পারবেন।
আস্তে আস্তে চোখ জোড়া পুরোপুরি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল ওনার। চোখের কোণে চিকচিক করছে জল-যার কিছুটা আনন্দের, আর কিছুটা হয়তো অতীত ভুলের আফসোসের। জীবন আসলেই বড্ড বিচিত্র! এই তো আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপর ওনাকেও এই পৃথিবীর মায়া কাটাতে হবে। আসলে আমরা কেউ কারও জন্য চিরকাল থাকি না; পৃথিবীতে একাই আসি, আবার আপনজনদের দেওয়া গভীর দুঃখ-কষ্ট বুকে চেপে একা একাই পরকালের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাই।
সোলেমান শেখের ঝাপসা চোখ জোড়া এবার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। ডিকি ধরে রাখা ওনার অবশ হাতটা টুপ করে খসে মেঝেতে পড়ে গেল। ডিকির ভারী দরজাটা আবার সশব্দে বন্ধ হয়ে ওনাকে ঘন অন্ধকারে মুড়িয়ে নিল।শেষ নিঃশ্বাসটা সেখানেই থমকে গেল… পৃথিবীর সমস্ত নিষ্ঠুরতা আর মায়া ত্যাগ করে ওপারে চলে গেলেন তিনি।অথচ, ওনার আপনজনেরা জানলই না যে ওনি নামক জীবন্ত প্রাণ এখন লাশ হয়ে গেছে।
কিন্তু জেবা? জেবা কি কখনো জানতে পারবে যে তার বাবার মনে আর তার আর আরিশান মৃধার এই অসম সম্পর্ক নিয়ে কোনো অসন্তোষ ছিল না? ওর বাবা মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছিল ওদের পবিত্র বন্ধনটাকে। নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তে আরিশানকেই সে নিজের মেয়ের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে মনে স্বীকৃতি দিয়ে গেছে।
হয়তো জেবা কোনোদিনও তা জানতে পারবে না। কারণ, বাবা তো নিজের মনের এই পরম সত্যটা মুখে প্রকাশ করার আগেই পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেলেন। মনের কথা মনেই রয়ে গেল, আর জেবা কোনোদিনও জানতে পারল না যে ওনার বাবা ওদের ওপর কতটা ভরসা রেখে শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করেছিলেন!
টানা এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল, আলভি কড়া রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কপাল বেয়ে অনবরত ঘাম ঝরছে, তবুও সে সানগ্লাসটা চোখে এঁটে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজ সে একপ্রকার পণ করেই এসেছে-তার সোনার টুকরো বউ নওমিকে সে দেখেই ছাড়বে!সেদিন বিয়ে করার পর হসপিটালে থেকেই নওমি তাকে ওই অবস্থায় ফেলে রেখে বাপের বাড়ি চলে এসেছে।
এরপর থেকে এই পরম দরদী সোনার বউয়ের আর কোনো খোঁজ নেই জামাইকে নিয়ে। আলভি বেচারা ভাঙা আর অসুস্থ হাত নিয়ে দৈনিক এখানে আসত বউকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভিলেন মীর জাফর হলো তার শ্বশুর আব্বা তৌসিফ খান, সাথে আছে শাশুড়ি আম্মা।পাশে আছে ওরফে ঘষেটি বেগমের নাতনি আর তার নিজের বিয়ে করা আস্ত এক ডাইনি বউ নওমি!
বাপ-বেটি দুটোই সমান তালের বজ্জাত, এই বিয়ে তারা কোনোভাবেই মানছে না। শ্বশুর তো আবার আইনি উপায়ে ছাড়াছাড়ির কথাও ভাবছেন। এসব ভেবে আলভির এখন মাঝরাস্তায় শুয়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আর কিছুদিন পর তার ভরা যৌবনটাই চলে যাবে। তখন সে বাসর করবেটা কার সঙ্গে, এটাই তো মোক্ষম সময় বউকে নিয়ে যৌবনের গণ্ডিতে একটু লাড়া-চাড়া খাওয়া! কিন্তু তার কপাল খারাপ, বউ তার সারা দিন অন্য বেডারে নিয়ে ভাবে। আহ্! বড্ড হতাশ সে, বড্ড হতাশ!অনেকক্ষণ হয়ে গেল, নওমির বারান্দায় আসার কোনো নামগন্ধ নেই। এবার আলভি বেশ অধৈর্য হয়ে পড়ল। সে চারপাশটা দেখে বিড়বিড় করে বলল,
_”গেল কই এই ডাইনিটা? আমার মনের ভেতর আগুন লাগিয়ে দিয়ে নিজে বাপের বাড়িতে থাকার ফুর্তি দেখাচ্ছে!”
এখন একদম তপ্ত দুপুর। এই সময়ে তৌসিফ খান বাড়িতে থাকেন না, আর নওমির মা আফরোজা খাতুনও হয়তো কোর্টের কাজে বাইরে আছেন। আলভির মনে হঠাৎ ডিংকা-চিকা গান বেজে উঠল! সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। প্রধান ফটকে অনেক সিকিউরিটি গার্ড থাকায়, সে চুপিচুপি বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকে কোনোমতে নওমির ঘরের বারান্দার গ্রিল ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা করল। তবে ভাঙা হাত নিয়ে সে কিছুতেই ওপরে উঠতে পারছিল না। ব্যস, কোনো উপায় না দেখে সে ওখানেই ঝুলে থেকে নিচ থেকে জোরে চিল্লিয়ে উঠল,
_”নওমি! বউ আমার, ঘষেটির নাতনি! রুম থেকে ঝটপট বেরিয়ে এসো সোনা, তোমার জামাই নিজের জীবন বাজি রেখে তোমাকে নিতে এসেছে!”
নওমি নিজের রুমে এতক্ষণ হাই ভলিউমে ডিসকো গান ছেড়ে মনের সুখে নাচছিল। হঠাৎ করেই ওর কানে আলভির কর্কশ চিৎকার এসে পৌঁছাল। সে বিরক্তি নিয়ে মিউজিক অফ করে হনহন করে বারান্দায় চলে এলো। বারান্দায় এসেই গ্রিলে বাঁদরের মতো ঝুলে থাকা আলভিকে দেখে রাগে ওর নাক-মুখ কুঁচকে গেল। এই অসভ্য ইতর বেয়াদপ ছেলেটা ওকে আবার জ্বালাতে এসেছে! একে যেভাবেই হোক ঘাড় থেকে নামাতে হবে।
নওমিকে বারান্দায় আসতে দেখেই আলভি খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবল, যাক-তার ডাইনি অবশেষে চলে এসেছে! তবে পরক্ষণেই নওমির পরনের একটা ছোট শর্ট প্যান্ট আর স্লিভলেস গেঞ্জির দিকে চোখ যেতেই আলভি চট করে আশেপাশে তাকাল।দেখল আশেপাশে কেউ নেই।হাফ ছেড়ে বাচলো আলভি।তবুও তীব্র অধিকারবোধে আর রাগ সামলাতে না পেরে আলভি হঠাৎ নওমিকে কড়া ধমক দিয়ে বলল,
_”এই ডাইনি! এসব কী ফালতু ছোট পোশাক পরে বারান্দায় এসেছিস? যা, এক্ষুনি গিয়ে দ্রুত চেঞ্জ করে আয়! শালি, তোর সাহস কত বড়, আমার নিজস্ব সম্পত্তি অন্যকে দেখাতে চাস?”
নওমি ওখান থেকে এক চুলও নড়ল না। উল্টো বারান্দার একটা আরামদায়ক চেয়ার টেনে আয়েশ করে বসে বলল,
_”আমার শরীর, আমি যাকে ইচ্ছে দেখাবো! তোর তাতে কী, শুনি? আর এখানে আবার কেন এসেছিস?”
আলভি অবাক চোখে আরও রেগে গিয়ে চেঁচাল,
_”আমার বাল করতে এসেছি! দেখাবি মানে কী হু? ভুলে যাস না আমি তোর লিগ্যাল স্বামী!”
নওমি রেগে আগুন হয়ে বলল,
_”তোর মতো একটা ছোটলোক ছেলের আমার স্বামী হওয়ার কী যোগ্যতা আছে, শুনি?”
আলভি গ্রিল ধরে ঝুলতে ঝুলতেই বলল,
_ “যোগ্যতার কী দেখবি বল, সব আছে আমার! খালি একবার বাইরে বের হ, তোরে এমন ডলা দেবো না! স্বামীর সাথে বেয়াদবি করছিস, মহিলা? বেশি বাড়াবাড়ি করলে একদম মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে দেবো!”
নওমি এবার একটা শয়তানি হাসি হাসল। সে চেয়ার থেকে উঠে এসে আলভির গ্রিল ধরে থাকা হাতটাকে নিজের পা দিয়ে ঠেলতে লাগল, যাতে সে নিচে পড়ে যায়। আলভি হাত পিছলে পড়ে যেতে নিয়েও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। সে আতঙ্কিত হয়ে নওমিকে বলে উঠল,
_”এই এই ডাইনি! করছিস কী? স্বামী লাগি তোর! আমি যদি এখান থেকে পড়ে মরে যাই, তবে কিন্তু সমাজে বিধবার তকমা তোর গায়েই ঝুলবে।”
নওমি মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
_”আমি নিজে থেকেই ওই তকমাটা লাগাতে চাই ! ক্যান ইউ ইমাজিন? তুই মরলে আমি সাদা শাড়ি পরব, একটা সুন্দর নিউ ট্র্যাডিশনাল লুক দেবো! কী গর্জিয়াস লাগবে আমাকে! তখন ভালো প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবি তুলে ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে টাঙিয়ে দেবোনে!”
আলভি বুক ফাটানো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”ডাইনি! এই ছিল তোমার মনে? বলি হায়, এতটা ছলনা না করলেও পারতি! চল না বেডি, বাড়ি গিয়ে একটা সুন্দর সুখের সংসার করি।”
আলভি বলতে বলতে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ভেতরে থাকা নওমির পা-টা খপ করে ধরে সেখানে একটা জোর করে চুমু খেয়ে বসল!নওমি আচমকা পায়ের ওপর আলভির ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে তীব্র ঘেন্নায় তাড়াহুড়ো করে পিছু হটতে গেল। কিন্তু ভারসাম্য হারাতে না পেরে সে পেছনের চেয়ারটা সহ উল্টে ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে গেল!
নওমির এই আকস্মিক পড়ে যাওয়াতে আলভি নিজেও আর টাল সামলাতে পারল না। ওর হাত গ্রিল থেকে ফস্কে গেল এবং সে দেয়ালের সাথে ঘষা খেয়ে নিচে পড়ে যেতে যেতে কোনোমতে দেয়ালের একটা উঁচু কার্নিশ ধরে ঝুলে রইল। আলভি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে চিল্লিয়ে বলল,
_”নওমির বাচ্চা! তুই আর পড়ার সময় পেলি না? শুধু শুধু তোরে আমি ঘষেটির নাতনি বলি না! তোর ওই মীরজাফর বাপের কসম, আমার যদি এখান থেকে পড়ে হাত-পা ভেঙে কিছু একটা হয়, তবে তোদের বাড়ি আমি পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেবো!”
ওদিকে বারান্দার ভেতর থেকে নওমির মিনমিন করে কাঁদার শব্দ শোনা গেল। চেয়ার থেকে উল্টে পড়ে গিয়ে ওর নাকটা সরাসরি ফ্লোরের শক্ত টাইলসের সাথে বাড়ি খেয়েছে। ব্যথায় নাক ফেটে ওখান থেকে গলগল করে তাজা রক্ত ঝরছে। নওমি দুই হাতে নাক চেপে ধরে বারান্দার মেঝেতে বসে জোরে জোরে কাঁদতে লাগল।
_”সারিম কি হচ্ছে কি এসব?
গাড়ি থেকে নামার আগে সারিম অত্যন্ত আলতো করে অরির চোখে নিজের হাত চেপে ধরল। এক হাত দিয়ে অরির চোখ ঢেকে, অন্য হাতে ওকে সাবধানে ধরে ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় অরি কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। সে সারিমকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল,
_”সারিম, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? চোখ থেকে হাত সরান প্লিজ!”
সারিম হাত সরাল না, বরং অরির কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
_”আরেকটু অপেক্ষা করো চন্দ্রিমা। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
সারিমের মুখে সারপ্রাইজের কথা শুনে অরি মনে মনে একটু হাসল। ভেতরে ভেতরে সেও ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। লোকটা ওকে এমন কোন জায়গায় নিয়ে আসলো, সে বিষয়ে অরির বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। তবে সারিমের ওপর ভরসা করে সে তার পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে গুটিগুটি পায়ে চলতে থাকলো। কিছুক্ষণ হাঁটার পর একটা লোহার গেট খোলার শব্দ হলো। সারিম অরিকে নিয়ে সেই গেটের ভেতরে ঢুকল। এরপর অরির চোখ থেকে হাত সরানোর ঠিক আগের মুহূর্তে সাবধান করে দিয়ে বলল,
_”আমি বলা না পর্যন্ত একদম চোখ খুলবে না কিন্তু চন্দ্রিমা! আমি তিন পর্যন্ত গুনব, তারপর চোখ খুলবে।”
অরি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়াল। সারিম অরিকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনি পেছন থেকে ভারী কোনো গেট লক হওয়ার একটা খটাস শব্দ অরির কানে এল। অরির মনে তখন কৌতূহলের শেষ নেই, সারপ্রাইজটা দেখার আশায় আর তর সইছে না তার। ওদিকে সারিম গেট পার হয়ে বেশ কিছুটা দূরে রাখা একটা চেয়ারে গিয়ে আরাম করে বসল। তারপর অরির উদ্দেশ্যে চড়া গলায় বলল,
_”ওয়ান… টু… থ্রি! ওপেন ইউর আইজ, চন্দ্রিমা!”
অরি এক মুখ হাসি নিয়ে অত্যন্ত উৎফুল্ল নয়নে চোখ মেলল। কিন্তু তার সেই মুখের হাসি আর চোখের আনন্দ এক সেকেন্ডের জন্যও স্থায়ী হলো না! সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার প্রাণীটিকে দেখার পর অরির কলিজা যেন শুকিয়ে কোণায় চলে গেল। সে ভয়ের চোটে _”মাগো!”
বলে এক আকাশ কাঁপানো চিৎকার দিল। আর কিছু না ভেবে, চোখের পলকে পাশে থাকা একটা চিকন গাছের ডাল বেয়ে একদম আগায় গিয়ে উঠে বসল! অরির শরীরের ওজনে বেচারা চিকন গাছটা তখন মটমট শব্দে দুলতে শুরু করেছে।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামক এক বিশাল মহিষটি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গাছের দিকে! মহিষটার গলায় কোনো দড়ি বা বাঁধন নেই, সে একদম মুক্ত হয়ে ঘাসের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ নিজের এলাকায় অরিকে এভাবে আবিষ্কার করে মহিষটা যেন খেপে গেল। সে তেড়ে এসে সজোরে নিজের শিং দিয়ে সেই চিকন গাছটায় একটা ধাক্কা মারল। যেন এই নতুন মানুষের উপস্থিতি সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না।
গাছের ওপর বসে অরি তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অনবরত ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালেমিন’ দোয়া পড়া শুরু করে দিয়েছে। আর মনে মনে সারিমের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে গালি দিচ্ছে। ওদিকে দূরে চেয়ারে বসে সারিম বউয়ের এই করুণ দশা দেখে চরম মজা নিচ্ছে। সে নিজের হাসি চেপে রাখতে না পেরে একদম উচ্চস্বরে শব্দ করে হেসে উঠল।সারিমের হাসির আওয়াজ পেয়ে অরির নজর গেল তার দিকে। লোকটা তাকে রোমান্টিক কোনো জায়গায় না এনে ডাইরেক্ট একটা চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। সারিম দূর থেকে অরির উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়ে বলে উঠল,
_”কী ব্যাপার বউ? পছন্দ হয়নি বুঝি তোমার বরের দেওয়া সারপ্রাইজ?”
অরি রাগে ফেটে পড়ে গাছ থেকে সারিমের দিকে চিৎকার করে বলল,
_”সারিম! আপনি একটা অত্যন্ত জঘন্য এবং খারাপ লোক! আর জীবনে কোনোদিন আমি আপনাকে বিশ্বাস করব না। আপনি যে এতটা ‘জাউরা’ হতে পারেন, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমাকে এক্ষুনি এখান থেকে বের করুন!”
সারিম অরির রাগের কোনো পরোয়া না করে বেশ করুণ সুর বানিয়ে বলল,
_”বের হবে মানে কী চন্দ্রিমা? আগে ওই মহিষটার একটু ট্রিটমেন্ট করো। ফিউচার অ্যানিমেল ডাক্তার হিসেবে একটা রিচেক তো করাই যায়! তাছাড়া আমিও একটু দেখি, তুমি এই প্রফেশনের জন্য কতখানি যোগ্য।”
অরি রাগে মুখ লাল করে বলল,
_”আমি অ্যানিমেল ডাক্তার হতে চেয়েছি তার মানে এই নয় যে আমি এখন এই আজব প্রাণীর চিকিৎসা করব!”
সারিম কাঁধ নাচিয়ে বলল,
_”আজব প্রাণী নয় বউ, অ্যানিমেল তো প্রাণীই। হোক না সেটা একটু আজব!”
অরি আরও রেগে গিয়ে বলল,
_”ও কোনো সাধারণ প্রাণী নয়, ও ডোনাল্ড ট্রাম্প!”
সারিম হেসে বলল,
_”সে যেই ট্রাম্পই হোক, জাত হিসেবে তো সে অ্যানিমেলই! দেখছ না বউ, বেচারা দুদিন ধরে কিচ্ছু খাচ্ছে না। দেশের একজন দায়িত্বশীল সরকারি মন্ত্রী হিসেবে তো আমার একটা কর্তব্য আছে, নাকি? জাতীয় সম্পদ রক্ষা করার জন্যই তো তোমাকে এত কষ্ট করে ওর চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসলাম। আমি জানি, তোমার চেয়ে ভালো ডাক্তার এই ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আর কেউ হতে পারবে না।”
সারিমের এই লজিক শুনে অরি আর রাগ ধরে রাখতে পারল না, বাচ্চাদের মতো ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল। কী এক মুসিবতে যে পড়ল বেচারি! একে তো এসব মোটকা এবং শিংওয়ালা প্রাণী দেখলে অরির ভীষণ ভয় লাগে, সে তো মনে মনে ভেবেছিল কিউট কিউট বিড়াল আর কুকুরের ডাক্তার হবে! আর এই খবিস লোকটা তাকে এনে ডাইরেক্ট এক আস্ত রাগী মহিষের খাঁচায় পুরে দিল!
ডোনাল্ড ট্রাম্প অরিকে এভাবে গাছে বসে চিৎকার করতে দেখে আরও বেশি ক্ষেপে গেল। সে অনবরত নিজের শক্ত মাথা আর শিং দিয়ে গাছটাকে ধাক্কাতে লাগল। গাছটা এবার সত্যিই ভেঙে পড়ার জোগাড় হলো। অরি আর পারল না, সমস্ত রাগ ভুলে শেষমেষ হাল ছেড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
_”সারিম, বাঁচান প্লিজ! আমি মরতে চাই না!”
সারিম বুঝল এবার একটু বেশিই হয়ে গেছে। মহিষটা যেকোনো সময় খেপে গিয়ে অরির বড় কোনো ক্ষতি করে দিতে পারে। সে আর দেরি না করে ইশারায় দুজন রক্ষীকে ডাকল। লোক দুটো ঝটপট মেইন গেট খুলে ভেতরে ঢুকল এবং দড়ি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে টেনে ধরে একপাশে বাঁধতে লাগল।মহিষটা দূরে সরে যেতেই অরি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সে কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে আস্তে আস্তে গাছ থেকে নামতে নিচ্ছিল, ঠিক তখনি পায়ের জুতো স্লিপ করে সে নিচের দিকে পড়ে যেতে লাগল। কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই সারিম ছুটে এসে দুই হাত বাড়িয়ে ওকে লুফে নিল এবং নিজের শক্ত বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
অরি সারিমকে সামনে পেয়ে রাগে একদম রি রি করে উঠল। লোকটার এই অহেতুক ফাজলামির চক্করে আজ তার হাড়গোড় সব ভেঙে আলাদা হয়ে যেত! অরির রাগের সাথে এবার অভিমানের পাল্লাটা ভীষণ ভারী হলো। সে সারিমের সাথে আর একটা কথাও বলল না। ওর কোল থেকে জোর করে মোচড় দিয়ে নেমে গেল। এরপর মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে হনহন করে মেইন গেটের দিকে হাঁটা ধরল।সারিম বুঝতে পারল বউ এবার আসলেই মারাত্মক চটেছে তার অভিমান হয়েছে। সে অপরাধীর মতো অরির পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে ডাকল,
_”ও বউ… সরি! আর কখনো এমন করব না, প্রমিস।”
অরি কোনো জবাব দিল না, নিজের গতি বাড়িয়ে হাঁটতে লাগল। সারিম আবার ডেকে উঠল,
_”একটু কথা বলো জান! আমি তো জাস্ট একটু মজা করছিলাম তোমার সাথে।”
অরি এবার হুট করে থমকে দাঁড়াল। অত্যন্ত রাগী চোখে পেছনে ফিরে সারিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
_”মজা? সব ব্যাপারই আপনার কাছে মজা মনে হয়, তাই না? কোনোদিন যেন আবার ভালোবেসে বলে না বসেন যে আপনি আমার সাথেও প্রেমের নামে জাস্ট মজা করেছিলেন!”
অরির মুখের এই কথাটা শুনে সারিম একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। এতক্ষণের হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল তার। অরিকে নিয়ে সে টুকটাক ফাজলামি করতেই পারে, কিন্তু অরিকে নিয়ে তার হৃদয়ে যে গভীর অনুভূতি আছে, সেটা নিয়ে কোনো রকম ঠাট্টা বা তামাশা সে কখনোই বরদাশত করতে পারে না। অরির এই অনাকাঙ্ক্ষিত কথাটা সারিমের মনের কোনো একটা নরম জায়গায় গিয়ে খুব শক্ত করে আঘাত করল।
সারিমকে এভাবে হঠাৎ চুপ হয়ে যেতে দেখে অরিও আর কোনো কথা বাড়াল না। সে চুপচাপ গিয়ে গাড়ির ভেতর ধপাস করে বসে রইল। ওর পিছু পিছু গিয়ে সারিমও কোনো কথা না বলে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল।
সারিম গাড়ি স্টার্ট দিল। দুজনের মুখে কোনো টু-শব্দ নেই। গাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃধা নিবাসের বিশাল সীমানার ভেতর প্রবেশ করল। গাড়ি থামতেই অরি তাড়াহুড়ো করে নেমে বাড়ির ভেতর চলে গেল। সারিমের দিকে একবার ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও সে বোধ করল না।বউয়ের এমন তীব্র অভিমান দেখে সারিমের নিজের ভেতরের অনুভূতি কেমন ছিল, তা তার গম্ভীর মুখ দেখে বোঝার উপায় রইল না। সে দারোয়ানকে গাড়ির চাবিটা দিয়ে পার্ক করে রাখতে বলল। এরপর শান্ত পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
ঠিক তখনই তার সামনে দিয়ে আরিশান মৃধা হেঁটে বাইরের দিকে যাচ্ছিলেন। পরনে অফিসের পোশাক, হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজেই বের হচ্ছেন। সারিম আরিশান মৃধাকে আগে কখনো এই অসময়ে বাড়িতে দেখেনি। আজ হঠাৎ এই টাইমে ওনাকে বাড়িতে দেখে সারিমের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক মুহূর্তেই এর আসল কারণটা ধরে ফেলল।আরিশান মৃধা ছেলেকে না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই সারিম শুনিয়ে শুনিয়ে,ওনার উদ্দেশ্য হঠাৎ করেই টিটকারি মেরে গেয়ে উঠলো_
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৭
“বাপ আমার বুইড়া কালে করছে একখান বিয়া,
বাপের বউ পিয়া আবার করে রঙ্গলিলা!
বুইড়া কালে জোয়ান বেডি পাইয়া আমার বাপে,
ভুইলা গেছে আমি নামক আবাল একখান আছে!
আমার বাপের যৌবনে যে দিছে লারা রে”
সারিমের মুখে এমন সুরের গান শুনে আরিশান মৃধার যাওয়ার পা দুটো থমকে গেল। তিনি চরম অস্বস্তি আর রাগে থমথমে মুখ করে নিজের ছেলের দিকে ফিরে তাকালেন…
