Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫২

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫২

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫২
মেহজাবিন নাদিয়া

মিনিট পাঁচেক হলো প্লেনে বসে আছে অরি। সারিম তাকে বসিয়ে রেখে একটা জরুরি ফোন দেবে বলে বাইরে গেছে। এভাবে হুট করে ডাইরেক্ট ট্রিপে যেতে হবে, অরি তা ভাবতেও পারেনি। তার ওপর সাথে কোনো অতিরিক্ত ড্রেস নেই; পরনেও তেমন জমকালো কিছু নেই। বাড়িতে পরে থাকার মতো একটা ওভারসাইজ শার্ট আর প্লাজো-জিন্স-এই সাধারণ পোশাক পরা অবস্থায় লোকটা তাকে নিয়ে কোথায় উড়াল দিচ্ছে, তা ভেবেই পেল না সে।
কমপক্ষে আগে থেকে জানিয়ে আসা দরকার ছিল! এখন ট্রিপে গিয়ে সে কী পরবে, সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। সারিমকে মানাও করতে পারেনি অরি। কারণ, লোকটা নাকি আগে থেকেই অরির পাসপোর্ট বানিয়ে রেখেছিল, যার বিন্দুমাত্র ধারণাও অরির ছিল না। বাধ্য হয়ে সারিমের নাছোড়বান্দা জেদের কাছে হার মেনে একপ্রকার আসতেই হলো তাকে। নয়তো গর্ভবতী অবস্থায় পেটে বাচ্চা নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়ানোর কোনো শখ তার এই মুহূর্তে ছিল না।

অরির মনে পড়ল, কীভাবে আরাফের ওখান থেকে সারিম তাকে নিয়ে এলো। আরাফ মূলত অরিকে এটা বলে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল যে, তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে ঝামেলা হয়েছে। মেয়েটা নাকি এখন আরাফকে ছেড়ে অন্য কোথাও বিয়ে করতে চাইছে, আর অরি যেন গিয়ে মেয়েটাকে আরাফের ব্যাপারে বুঝিয়ে বলে। মেয়েটা আরাফকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছে। দু-এক দিনের মধ্যেই ছেলেপক্ষ তাকে দেখতে আসবে বলেও জানিয়েছে। অরিদের কোচিংয়েই পড়ত মেয়েটা, নাম নীলা। আরাফের সাথে দেড় মাসের পরিচয় হলেও প্রেমটা বেশ ভালোই চলছিল। নীলা আর আরাফের মধ্যকার এই ব্যাপারটা আরাফ শুধু অরিকেই জানিয়েছিল; এই মুহূর্তে আর কাউকে জানাতে চায়নি বলে অরিও জেবাকে কিছু বলতে পারেনি।

কিন্তু আসার পথে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে আরাফ কোথায় যেন গেল, যার কোনো হদিস ছিল না। এক ঘণ্টা বসে থাকার পরও সে ফিরল না। অরি ভয় পাচ্ছিল-সারিম যদি বাড়ি ফিরে তাকে না পেয়ে রেগে যায়! তাই আরাফের আশা ছেড়ে অরি একাই একটা গাড়ি ডেকে চলে যেতে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই পথিমধ্যে আচমকা সারিমের গাড়ি এসে তার সামনে থামে। কোনো কথা না বাড়িয়ে সারিম একপ্রকার জোর করেই অরিকে গাড়িতে তুলে সোজা এখানে নিয়ে আসে।
অরির অজস্র প্রশ্নের জবাবে সারিম শুধু এটুকুই বলেছে-সে তাকে নিয়ে হানিমুনে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, এখনই-বা যাওয়ার কী দরকার, আর পেটের বাচ্চার কথাই-বা কী-এমন নানাবিধ প্রশ্ন করলেও অরির কোনো কথার জবাব দেয়নি সারিম। তাই অরিও আর বাড়তি কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

প্লেন আর মিনিট বিশেক পর উড়াল দেবে। সারিমকে এখনো আসতে না দেখে অরি কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সে যখন সারিমের চিন্তায় বিভোর, ঠিক তখনই তার পেটটা ডেকে উঠল। তবে সেটা ক্ষুধার ডাক নয়, ছিল তীব্র ‘ক্রেভিংস’-এর ডাক!
অরির নজর গেল পাশের সারির সিটে বসা একটি বাচ্চার দিকে। বয়স কতই-বা হবে, ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ে বোধহয়। মেয়েটির হাতে একটা আচারের বক্স, যেখান থেকে সে একটু একটু করে আচার বের করে খাচ্ছে। টক-ঝাল আচারের সুবাস পেতেই অরির জিব জল চলে এলো, খুব ইচ্ছে করল তা খেতে। কিন্তু এভাবে অচেনা কারো কাছে চেয়ে তো আর খাবার খাওয়া যায় না! অগত্যা মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল তার। বাচ্চাটির পাশে তার মা ঘুমাচ্ছিলেন। মেয়েটি ফোনে নজর রেখে ফাঁকে ফাঁকে আচার চাটছিল। অরি বারবার নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু লোভাতুর চোখ দুটি যেন আটকে রইল ওই আচারের বক্সেই!
এরই মাঝে প্লেন ছাড়ার ঘোষণা এলো এবং এয়ারহোস্টেস সবাইকে সতর্ক হতে বললেন। সারিম তাড়াহুড়ো করে এসে নিজের সিটে বসল। বসেই দেখল, অরি কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছে। সে অরির চোখের সামনে এক হাত নাড়ল। অরির ধ্যান ভাঙল সাথে সাথেই। এতক্ষণ সে বাচ্চাটির আচারের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল; সারিম বিষয়টা টের পায়নি ভেবে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।
সারিম অরিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে শুধাল,

“ঠিক আছো, চন্দ্রিমা?”
অরি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
“আমি একদম ঠিক আছি। তবে আপনি ঠিক নেই।”
সারিম অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
“কেন মানে কি! বুঝতে পারছেন না, আপনি আমাকে এই অবস্থায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? তা-ও মনে হচ্ছে দেশের বাইরে কোথাও!”
সারিম ঠোঁটের কোণে মৃদু হেসে বলল,
“তুমি একদম ঠিক ধরেছ, আমরা দেশের বাইরেই যাচ্ছি।”
অরি শুধাল,

“কোথায় যাচ্ছি আমরা, সারিম?”
“সময় হলে জানতে পারবে, বউ। এবার একটু রিল্যাক্স হয়ে বোসো। তোমার এই অতি-বালপাকনামির ফল আমার চারটে পোনাকে সহ্য করতে হচ্ছে।”
অরি সারিমের কথার অর্থ বুঝল। হয়তো বাড়ি থেকে একা বের হওয়ার কারণেই লোকটা এখনো তার উপর রেগে আছে। অরি সারিমের দিকে একটু চেপে বসল। দু-হাত সারিমের কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত করে তার বুকে মাথা রাখল। অরির এমন কাণ্ডে সারিম সামান্য হাসল-তবে তা ক্ষণিকের জন্য। অরি সারিমের বুকে নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল,
“সরি! আর কখনো এমন হবে না।”

সারিম মুখে কিছু বলল না; এক হাতে অরিকে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে রাখল, আর অন্য হাতের আঙুলগুলো নিজের কপালে বুলাতে লাগল। মাথাটা ভীষণ ধরেছে তার।
সারিমের বুকে মুখ গুঁজে থাকলেও অরির মন আর চোখ-দুটোই পড়ে রইল সেই আচার খাওয়া মেয়েটার দিকে। ইশ! মেয়েটি যদি তাকে অন্তত এক ফোঁটা আচার দিত! অন্য সময় হলে হাজার সাধলেও হাত বাড়াত না, কিন্তু এই গর্ভকালীন ক্রেভিংসের মুহূর্তে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে তা খেয়ে নিত। অরির এই কাতর চাহনি একসময় বাচ্চাটির নজরে পড়ে গেল।
মেয়েটি অরিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আচারের বক্সটা কেমন চেপে ধরল। বোধহয় অরির মনের ইচ্ছাটা সে টের পেয়ে গেছে! তবে সারিমের চেহারা এখনো তার চোখে পড়েনি। অরি আচারের সুবাস পেতে আরেকটু ঘেঁষে দাঁড়াল। মেয়েটি অরির এই কাণ্ড সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করে ভয়ে তার ঘুমন্ত মায়ের দিকে আরেকটু চেপে বসল। এতে অরির মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
অনবরত অরির ছটফটানি আর নড়াচড়ায় সারিম কিছুটা বিরক্ত বোধ করল। সে কপাল থেকে হাত সরিয়ে সোজা তাকাল অরির দিকে।

“কি সমস্যা!এভাবে নড়ছো কেন?
কিন্তু অরির দৃষ্টি তো অন্য কোথাও! সারিম অরির চোখ অনুসরণ করে তাকাতেই দেখতে পেল-তার বউ এক বাচ্চার আচারের বাক্সের দিকে কেমন লোভাতুর চোখে চেয়ে আছে! দেখলে মনে হবে, সুযোগ পেলেই বুঝি আচারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে! সারিম মেয়েটির দিকে তাকাতেই মেয়েটি অরিকে দেখে আরো একটু গুটিয়ে গেল।সারিম হঠাৎ একটু ঝুঁকে অরির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আচার খাবে, জান?”
অরি ঘোরের মধ্যেই এক বাক্যে বলে ফেলল,

“হ্যাঁ! আমাকে ওই মেয়েটার আচারটা এনে দিন না, প্লিজ! আমি ওটাই খেতে চাই।”
কথাটা বলেই অরির মনে হলো-আরে, সে কী বলে ফেলল! লজ্জায় যেন মাটি চাপা পড়তে ইচ্ছে করল তার। সারিম নিশ্চয়ই এখন তাকে ভীষণ নাদান ভাববে! কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটল না; ঘটনা মোড় নিল সম্পূর্ণ উল্টো দিকে।
সারিম ভালো করে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল। আর মাত্র তিন মিনিট সময় আছে প্লেন ছাড়ার, এর মধ্যে বাইরে থেকে অরির জন্য আচার এনে দেওয়া অসম্ভব। সে ধীরস্থিরে ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। আর গম্ভীর গলায় ডেকে উঠল,
“এই পিচ্ছি! এদিকে তাকাও।”
মেয়েটি এবার চোখ তুলে সারিমের দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই তার দুই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! সারিমকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র সময় লাগল না। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী! তবে মন্ত্রীর বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে যে মেয়েটা তার আচারের দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে ছিল, সে যে উনারই স্ত্রী-তা বুঝতে আর বাকি রইল না মেয়েটির।
সারিম মেয়েটিকে সরাসরি বলল,

“তোমার আচারটা বিক্রি করবে আমার কাছে?”
মেয়েটি আচারের বাক্সের দিকে একবার তাকাল, তারপর সোজা মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক সায় দিল-সে বিক্রি করবে না। সারিমের এতে বেশ বিরক্তি লাগল। অরি সব দেখছিল, কিন্তু আচারের লোভে এবার আর টু-শব্দটিও করল না।
সারিম এবার মেয়েটিকে বলল,
“আচ্ছা, বিক্রি করতে না চাইলে আমাদের সাথে একটু শেয়ার করো।”
মেয়েটি আচারের পুরো বক্সটা বুকের সাথে আঁকড়ে ধরল। এটা তার ভীষণ প্রিয় আচার, পুরো প্লেন জার্নিতে একটু একটু করে খাবে বলে সাথে এনেছে। এভাবে শিক্ষামন্ত্রী চাইলেই সে তা দিয়ে দেবে নাকি!
এইটুকু একটা মেয়ের এত বড় সাহস দেখে অবাক হয়ে গেল সারিম। মন্ত্রী চাইছে, তাও সে দেবে না, আবার বেচবেও না! সারিম আশেপাশে তাকাল; সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত, আর মেয়েটার মা-ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
সারিম এবার কিছুটা ধমকের সুরে, গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

“আচার না দিলে কিন্তু এবার পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেব! এবার বলো-দেবে, নাকি দেবে না?”
সারিমের এই ‘ফেল করিয়ে দেওয়া’-র হুমকিটা একেবারে তাসের ঘরের মতো কাজ করল! মেয়েটি ভীষণ ঘাবড়ে গেল। শিক্ষামন্ত্রী যদি সত্যিই তাকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়, তবে তো কেলেঙ্কারি! সেই ভয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে পুরো আচারের বক্সটাই সে অরির দিকে বাড়িয়ে দিল।
অরি যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল! এক টানে পুরো বক্সটা কেড়ে নিল সে। মুহূর্তের মধ্যে ঢাকনা খুলে পেটের ভেতর থেকে আসা তীব্র লোভ সামলাতে না পেরে তা খাওয়া শুরু করে দিল! সারিম চোখ বড় বড় করে শুধু বউয়ের এই কাণ্ড দেখছে-যাক, বউ খুশি তো সে-ও খুশি!
খাওয়া শেষে পাশ ফিরতেই দেখা গেল, মেয়েটি অত্যন্ত অসহায় মুখ করে আড়চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে সারিমের মায়া হলো, সে বাক্সের থেকে একটা প্যাকেটটা মেয়েটির দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু বেচারি পরীক্ষায় ফেল করার ভয়ে কাচুমাচু হয়ে রইল, হাত বাড়িয়ে সেটা আর নিল না।

তা দেখে অরি বিলম্ব না করে ছোঁ মেরে সেই শেষ প্যাকেটটাও নিজের হাতে নিয়ে নিল এবং বিন্দুমাত্র দেরি না করে তৃপ্তি সহকারে সেটাও চাটতে শুরু করল!সারিম হতাশ হলো বউয়ের কান্ডে।
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বাজে। মৃধা নিবাস পুরো নিস্তব্ধ ও ফাঁকা হয়ে আছে। দোতলার রুমে জেবাকে যেভাবে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, সে ঠিক সেভাবেই আছে। আরিশান মৃধা জরুরি একটা কাজে বাইরে গেছেন।
ফুলের সবেমাত্র ঘুম ভাঙল। রুম ছেড়ে বের হয়ে আশেপাশে কাউকে না দেখে সে বেশ অবাক হলো। দোতলায় উঠে অরির রুমে গিয়ে দেখল, সেখানেও কেউ নেই-পুরো বাড়িটাই কেমন খাঁ খাঁ করছে। এমন সময় তার নজর গেল শাহিন মিয়ার দিকে। ফুল এগিয়ে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল,
“কাকা, বাড়ির সকলে কোথায়? কাউকে যে দেখতে পাচ্ছি না?”
শাহিন মিয়া ভীষণ অবাক হলেন। এত বড় ঝড় বয়ে গেল পুরো বাড়িতে, অথচ ফুল তার কিছুই জানে না! তিনি প্রশ্ন করলেন,

“আপনি জানেন না বাড়িতে কি ঘটে গেছে?”
ফুল আরো অবাক হয়ে শুধাল,
“বাড়িতে আবার কী ঘটল? আমি ঔষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম, তাই কিছু টের পাইনি।”
শাহিন মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ‘ওহ’ বললেন। এরপর তিনি গত কয়েক ঘণ্টার ঘটে যাওয়া আনতারা মৃধার অপকর্ম থেকে শুরু করে সমস্ত বিস্তারিত ঘটনা খুলে বললেন। সব শোনার পর বিস্ময়ে দু-চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ফুলের! আনতারা মৃধা এতটা জঘন্য চরিত্রের মানুষ হতে পারেন, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি।
কথা বলার মাঝেই বাড়িতে প্রবেশ করলেন আরিশান মৃধা। ফোনে কার যেন সাথে বেশ গম্ভীরভাবে কথা বলছিলেন তিনি; তাঁর চোখেমুখে ছিল তীব্র ব্যস্ততা। ফুল তাঁকে সামনে দিয়ে চলে যেতে দেখে প্রথমে ডাক দেবে ভেবেছিল, কিন্তু কাজের ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নিল। আর ডাকল না।

শাহিন মিয়ার সাথে আরও টুকটাক কথা বলে রুমে নাস্তা পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ফুল নিজের রুমে চলে এলো। এসেই বিছানা থেকে ফোনটা খুঁজে বের করে রুবাব মৃধার নম্বরে ডায়াল করল। কিন্তু বেশ কয়েকবার রিং হয়ে ফোনটা কেটে গেল। ফুল বুঝল, তাঁর মা হয়তো এখন ব্যস্ত আছেন।
এরই মাঝে শাহিন মিয়া ফুলের জন্য নাস্তা নিয়ে রুমে এলেন। তিনি ট্রে-টা টেবিলে রেখে চলে যেতে নিলেই ফুল তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,
“কাকা, সারিম ভাই আর ওনার বউকে তো দেখতে পাচ্ছি না?”
শাহিন মিয়া সহজ সুরে জানালেন,
“ম্যাম আর স্যার ট্রিপে গিয়েছেন।”
ফুল চমকে উঠে শুধাল,
“কিন্তু হঠাৎ কেন?”

“ম্যাম তো এখন গর্ভবতী, তাই হয়তো মনটা একটু হালকা করতেই স্যার ওনাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছেন। বিস্তারিত তো আর সঠিক জানি না,” বলেই শাহিন মিয়া চলে গেলেন।
ফুল যেন নিজের জায়গায় বরফ হয়ে জমে রইল। তার দু-চোখ মুহূর্তে অনুভূতিশূন্য হয়ে গেল। তার প্রিয় সারিম ভাই,সে নাকি এখন বাবা হতে চলেছে! যেই পুরুষটিকে ঘিরে ফুলের জীবনের সব রূপকথা, সব জল্পনা-কল্পনা বোনা ছিল-সেই পুরুষটির সন্তান এখন অন্য এক নারীর গর্ভে বেড়ে উঠছে!
এই সত্যটা শোনার পর আর মৃধা নিবাসে থাকা ফুলের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুঝতে পারল-এই জন্মে আর তার সারিম ভাইকে পাওয়া হলো না তার, আর পাওয়া সম্ভবও নয়। হৃদয়ের সমস্ত ব্যাকুলতা চেপে ধরে সে সিদ্ধান্ত নিল, সব কিছু পেছনে ফেলে কাল সকালে সে নিজের বাড়িতে ফিরে যাবে। আর কোনোদিন পা রাখবে না এই মৃধা নিবাসে।
তার ভালোবাসার সারিম ভাই তার বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে থাকুক-এই প্রার্থনাই রইল।
ফুলের করুণ চোখের কোণে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুকচাপা দীর্ঘশ্বাসে সে বিড়বিড় করে উঠল-

“কাউকে নিজের করে না পাওয়ার নাম,অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; কখনো কখনো কেবল সুখে থাকতে দেখার নামই তো ভালোবাসা।”
ঘুম ভাঙতেই জেবা অনুভব করল-কারো বলিষ্ঠ হাত তাকে খুব শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে আছে। সে আস্তে আস্তে পিটপিট করে পাশ ফিরতেই চমকে উঠল। আরিশান মৃধা তার একটা হাত নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বেডে সাথে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে আছেন।
জেবা কী ভেবে যেন তড়িঘড়ি করে এক ঝটকায় উঠে বসলো! আরিশান মৃধা হঠাৎ জেবার এভাবে সরে যাওয়াতে ঘুম ভেঙে গেল। তিনি সামান্য চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন মেয়েটার দিকে। জেবা ব্ল্যাঙ্কেটটা বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে, শরীরটা কেমন কাঁপছে তার।
আরিশান মৃধা এক মুহূর্তেই বুঝে নিলেন ভয়টা আসলে কিসের। আনতারা মৃধাকে ধাক্কা দেওয়ার অপরাধে তিনি হয়তো তাকে ভুল বুঝবেন কিংবা কঠিন কোনো শাস্তি দেবেন-এই আশঙ্কায় মেয়েটা ভয়ে জমে গেছে।

আরিশান মৃধা ধীরপায়ে উঠে জেবার দিকে এগিয়ে এলেন। ওনার তপ্ত নিঃশ্বাস জেবার গালে এসে আছড়ে পড়তেই মেয়েটা ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল, যেন শ্বাস নিতেও ভুলে গেছে সে! আরিশান মৃধা তাঁর গভীর, গম্ভীর চোখে তা পরখ করে আরো একধাপ কাছে এগিয়ে আসতেই জেবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হুট করে ফুঁপিয়ে উঠে ভাঙা ভাঙা গলায় বলে উঠল,
“দেখুন… আমি ইচ্ছে করে ওনাকে ধাক্কা দিইনি! উনি আমাকে আর আমাদের বাচ্চাটাকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন, বিশ্বাস করুন…”
কথাটা শেষ হতে পারল না, তার আগেই আরিশান মৃধা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। জেবাকে প্রায় এক টানে বুকের কাছাকাছি এনে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে শুধালেন,

“কোথায় আঘাত করেছে সে? তুমি কোথায় ব্যথা পেয়েছ? বলো আমাকে, কষ্ট হচ্ছে কোথাও?”
জেবা হঠাৎ থমকে গেল। আরিশান মৃধার আচমকা এমন ব্যাকুল আর কোমল ব্যবহারে সে চরম অবাক হলো! অদ্ভুত এক বিস্ময় নিয়ে সে তাকাল লোকটার দিকে।
জেবার এই একদৃষ্টিতে তাকানো দেখে আরিশান মৃধা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। এবং দ্রুত নিজেকে সামলে আগের মতো গম্ভীর ও স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। জেবা অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে আপনার? আপনি ঠিক আছেন তো?”
আরিশান মৃধা ইতস্তত করে চারপাশে নজর বোলালেন। জেবার নিষ্পাপ চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা বলার সাহস যেন মুহূর্তে হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
“আমার আবার কী হবে?”
“আপনার ব্যবহারটা কেমন বদলে গেল হঠাৎ, সে কারণেই বলছিলাম…”

আরিশান মৃধা কোনো প্রতিউত্তর করলেন না। খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে ধীরপায়ে বারান্দার দিকে চলে গেলেন। ওনাকে একা চলে যেতে দেখে জেবাও পিছু পিছু বারান্দায় গিয়ে হাজির হলো। আরিশান মৃধা সোফায় বসে একমনে রাতের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। জেবা কোনো দ্বিধা না করে ওনার পাশে গিয়ে বসল। দুজনেই নিরবে আকাশ দেখতে লাগল।
জেবা নিরবতা ভেঙে হঠাৎ বলে উঠল,
“আকাশের তারাগুলো কত সুন্দর, তাই না?”
আরিশান মৃধার চোখ আকাশেই রইল। চাঁদের বুকে একফালি রুপালি আলো-আজ যেন অর্ধচন্দ্রটা পূর্ণতা পেতে চলেছে। সেদিকে তাকিয়েই তিনি ধীরগলায় বললেন,
“আমার তেমনটা মনে হয় না।”
জেবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু কেন?”

আরিশান মৃধা বুকের ভেতর থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“শত তারার মাঝে একটা তারা খসে পড়লে বিশাল আকাশের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ একদিন চাঁদের দেখা না পেলে রাতের রূপটা বড্ড ফ্যাকাশে হয়ে যায়।”
জেবা শুনল কথাটা। মনে মনে কিছু একটা হিসাব কষে গভীর প্রশ্ন করে বসল,
“আপনিও তো আনতারা আন্টিকে ‘তারা’ বলে ডাকতেন! এখন আপনার সেই তারা যদি খসে পড়ে, তবে আপনার হৃদয় কি নিঃস্ব হয়ে যাবে না?”
আরিশান মৃধা শান্ত সুরে জবাব দিলেন,
“তারা খসে পড়ার দাগ ভেতরে থাকে, যা বাইরের কেউ সহজে বুঝতে পারে না। কিন্তু চাঁদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন-সে ভিতর-বাইরে দুদিকেই আলো ছড়ায়। সে চলে গেলে তার অনুপস্থিতির গভীর ক্ষত ভিতর-বাইরে সবখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা চাইলেও কখনো আড়াল করা যায় না।”
জেবা এবার হুট করে জিজ্ঞেস করে ফেলল,

“আচ্ছা, আপনার জীবনে কি কখনো চাঁদের আগমন ঘটেছিল?”
আরিশান মৃধা জেবার দিকে তাকালেন। ওনার জীবনের ‘চাঁদ’ বলতে তো একজনই এসেছে, অথচ সেই বোকা চাঁদটাই চাঁদের আলো গায়ে মেখে তাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে!
আরিশান মৃধা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন,
“ওই বোকা চাঁদটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো-তার আগমন ঘটেছে কি না।”
জেবা ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“চাঁদ আবার বোকা হয় নাকি! আজব তো!”
আরিশান মৃধা হালকা হেসে বিড়বিড় করলেন,
“লুনা… ভীষণ বোকা তুমি!”

তবে কথাটা যেন শুনে ফেলল জেবা।’লুনা’ নামটা শুনতেই তার কৌতূহল দ্বিগুণ হয়ে গেল। এই লুনা আবার মাঝখান থেকে কোথা থেকে এলো? সে আরিশান মৃধার আরেকটু কাছে ঘেঁষে বসল। ওনার কাঁধে কখন যে এক হাত ভর দিয়ে বসেছে, তা মেয়েটা নিজেও খেয়াল করেনি। তবে আরিশান মৃধা ঠিকই তা অনুধাবন করলেন। জেবার এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ওনার হৃদয়ের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে দোলা দিয়ে গেল।
জেবা অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করল,
“আপনি কোন লুনার কথা বলছেন? কে সে? আপনার এক্স-গার্লফ্রেন্ড বুঝি? আনতারা আন্টির আগে সে কি আপনার জীবনে চাঁদ হয়ে এসেছিল? খুব বোকা ছিলেন বুঝি তিনি?”
জেবার এমন বোকা বোকা প্রশ্নে আরিশান মৃধার ভীষণ হাসি পেল, কিন্তু তিনি মুখ গম্ভীর রেখে বললেন,
“উঁহু, লুনা আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নয়।”
“তাহলে কে সে? ওয়ান-সাইডেড লাভ নিশ্চয়ই? আই অ্যাম রাইট, তাই না?”
আরিশান মৃধা মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝালেন। জেবা বেশ হতাশ হয়ে বলল,
“তাহলে কে, বলুন না প্লিজ!”

আরিশান মৃধা এবার কিছুটা ঝুঁকে জেবার একদম কাছাকাছি এলেন-দুজনের মাঝে মাত্র এক ইঞ্চির দূরত্ব! আরিশান মৃধাকে এতটা কাছে পেয়ে জেবা নিমেষেই নার্ভাস হয়ে গেল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন লাফাতে শুরু করেছে। সে দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে কিছুটা দূরে সরল। জেবা সরে যেতেই আরিশান মৃধা আবার সোজা হয়ে বসে রাতের চাঁদের উজ্জ্বলতার দিকে তাকালেন। জেবা ওনাকে আর উত্তর না দিতে দেখে চেপে গেল।তবে মনে মনে খটকা আর হাজারো সংশয় থেকেই গেল।
এতসব ভাবনার মাঝেই আচমকা আরিশান মৃধা জেবার কোলের ওপর নিজের মাথাটা হেলিয়ে দিলেন! বিষয়টা বুঝতে জেবার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। তার পুরো শরীর শিউরে উঠল এক অজানা অনুভূতির জোয়ারে! জেবার শরীরের সেই মৃদু কম্পন আরিশান মৃধা স্পষ্ট অনুভব করলেন, তবে কিছু বললেন না। এই মুহূর্তে জেবার একটুখানি সান্নিধ্য, একটুখানি ওম পাওয়া ওনার ভীষণ প্রয়োজন।
জেবা কাঠ হয়ে বসেই রইল। আরিশান মৃধার মতো একজন গম্ভীর পুরুষ নিজে থেকে তার কোলে মাথা রাখছে-এটা তার কাছে এক অলৌকিক স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে!
আরিশান মৃধা চোখ বন্ধ রেখেই এক অদ্ভুত আবদার করে বসলেন,

“একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে, জেবা?”
জেবার কানে কথাটা যেন মন্ত্রের মতো বাজল। নিজ অজান্তেই তার নরম হাত দুটো চলে গেল আরিশান মৃধার সিল্কি চুলের ভাঁজে। এক পরম শান্তিতে চোখ বুজলেন আরিশান মৃধা। জেবার চোখ দুটি তখন একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওনার মুখের দিকে-চাঁদের মায়াবী আলোয় ওনাকে অপূর্ব সুন্দর লাগছে! ইচ্ছে করল ওনার গালে একটু হাত ছুঁয়ে দিতে, কিন্তু লোকটা জেগে আছে ভেবে সেই ইচ্ছেটা চেপে গেল সে। ধীর হাতে আরিশান মৃধার কালোর মধ্যে রুপালি আভা মিশেল চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল জেবা।
চোখ বন্ধ রেখেই হঠাৎ আরিশান মৃধা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“আমার এই পৃথিবীতে এত আগে আসা উচিত হয়নি, তাই না জেবা?”
জেবা হুট করে এমন অদ্ভুত কথা শুনে থমকে গেল। সে কথার অর্থ বুঝতে না পেরে কী বলবে ভেবে পেল না। এই লোকটাকে সে কখনোই বুঝে উঠতে পারে না-কখন যে কী বলে ফেলেন!
আরিশান মৃধা আবার বললেন,
“আমাকে বুঝতে না পারার এই এক দীর্ঘ আফসোস রয়ে গেল তোমার।”
জেবা চমকে উঠল! লোকটা কী করে তার মনের কথা জেনে গেল? সে কি মন পড়তে পারে নাকি!
আরিশান মৃধা চোখ খুলে সোজা তাকালেন জেবার চোখের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই জেবা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল-যা আরিশান মৃধার মোটেও পছন্দ হলো না। তবে তা গোপন রেখে তিনি আবার বললেন,

“কখনো যদি মনে হয়-আমি নিজের ক্ষমতার জোড়ে তোমার সব স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছি… তুমি কি তখন খুব বেশি রাগ করবে আমার ওপর? ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলবে?”
জেবার মাথায় কাজ করছিল না-আজ লোকটার হয়েছেটা কী? একের পর এক অদ্ভুত আর অসংলগ্ন প্রশ্নের পসরা সাজিয়ে বসেছেন! জেবা আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি জানি আপনি আমার সাথে কখনো এমন করবেন না। কারণ আপনার ব্যক্তিত্বে সেই নিষ্ঠুরতা নেই।”
আরিশান মৃধা চুপ করে রইলেন, আর কোনো কথা বাড়ালেন না। ওনার মনটা এখনো এক অদ্ভুত বিষণ্নতায় ডুবে আছে। বয়সের বিশাল সমীকরণটা ওনাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আজ থেকে দুই বা তিন বছর পর তিনি যখন প্রবীণত্বের দিকে আরো একধাপ এগিয়ে যাবেন, তখন জেবা সবেমাত্র তার যৌবনের সূচনালগ্নে থাকবে! যদি সে সময় জেবা ওনার থেকে মুক্তি চায়? ওনার মতো এত বয়স্ক একজন পুরুষের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে দূরে সরে যেতে চায়?
এই চিন্তাটা আরিশান মৃধা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। এক অদ্ভুত ঈর্ষায় ওনার মনে হলো-ইচ্ছে করছে জেবাকে এখনই এমন কিছু খাইয়ে ওনার মতো এক লাফে বুড়ি বানিয়ে দিতে! যাতে দুজনকে সবসময় সমান দেখায়! কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আরিশান মৃধা। যাই হয়ে যাক না কেন, নিজের সমস্ত সামর্থ্য দিয়ে তিনি জেবাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আটকে রাখবেন-মেয়েটা না চাইলেও না! এক জীবনে কারো প্রতি তিনি কখনো এতটা তীব্রভাবে আসক্ত হননি, যতটা এই মেয়েটা তাকে পাগল বানিয়ে ছেড়েছে।জেবা তখনো একমনে আরিশান মৃধার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, আর আরিশান মৃধা পরম শান্তিতে চোখ বুজে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা উপভোগ করছিলেন।দুজনের সময়টা যেনো সেখানেই একটু একটু করে থেমে গেলো।আরিশান মৃধার জেবাকে আজ আর বলা হলোনা আনতারা মৃধার ব্যাপারটা। ভাবলেন পরে বলা যাবে।এখন শুধু মূহর্তটা উপভোগ করতে চান তিনি।

প্লেন ল্যান্ড করেছে কিছুক্ষণ আগেই। অরি আর সারিম বিমান থেকে নেমে এসেছে। সারিম অরির একটা হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে হাঁটছে, আর অন্য হাতে ফোনে কিছু একটা ঘাঁটাঘাঁটি করছে।
অরি চোখ বড় বড় করে আশেপাশে নজর বোলাচ্ছে আর পুরো পরিবেশটা পর্যবেক্ষণ করছে। এরপোর্টটা কেমন যেন একটু পুরনো ধাঁচের, খুব বেশি আধুনিক মনে হচ্ছে না। চারিদিক দেখে অরির মনেই হলো না যে তারা খুব উন্নত কোনো ধনকুবের দেশে এসেছে!
হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে ওখানকার কৃষ্ণবর্ণের নাগরিকরা অদ্ভুত এক কৌতূহল নিয়ে অরির দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো এই ভিনদেশে ধবধবে ফর্সা, সুন্দরী এক মানবীকে দেখে তাদের এই চরম কৌতূহল! অরিও বোকার মতো তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। অরির মেস বাঙ্ক করা চুলের খাঁজ থেকে বেবি হেয়ারগুলো বাতাসে আলতো করে দুলছে। এক হাত জিন্সের পকেটে গুঁজে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ ই অসাবধানতা বশত তার পা আটকে গেল নিজের জুতার ফিতায়!
অরি সঙ্গে সঙ্গে হাঁট থামিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। অরিকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে পিছু ঘুরল সারিম। নজর নিচে যেতেই দেখল, অরির জুতার ফিতা খুলে গেছে। অরি নিচু হয়ে সেটা বাঁধতে যাবে, ঠিক তখনই সারিম তাকে আটকে দিল। নিজের হাত থেকে ফোনটা অরির হাতে ধরিয়ে দিয়ে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই সারিম হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রাস্তায়!

ঝুঁকে অত্যন্ত যত্নসহকারে অরির জুতার ফিতাটা বেঁধে দিতে লাগল!
আশেপাশের পথচারীরা হাঁ করে সেই দৃশ্য দেখতে লাগল। কেউ কেউ আবার ফোনের ক্যামেরা উঁচিয়ে তা ক্যাপচারও করতে শুরু করল! এমন পাবলিক প্লেসে সারিমকে তার জুতার ফিতা বেঁধে দিতে দেখে অরি ভীষণ লজ্জায় পরে গেলো। সে ইতস্তত করে নিচু স্বরে সারিমকে বলল,
“সারিম! কী করছেন এসব? লোকজন কেমন হাঁ করে দেখছে আমাদের, খেয়াল আছে?”
সারিম ধীরস্থিরে জুতার ফিতা বেঁধে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। এরপর অরির শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে দিতে দিতে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“দেখুক গে যার ইচ্ছে সে! আমার বউ, আমি যা খুশি করব। তাতে কার কী?”
অরি মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“সেজন্য এভাবে সবার সামনে, পাবলিক প্লেসে?”
সারিম অরির চোখের দিকে তাকিয়ে গমগমে গলায় বলল,
“তোমাকে আগলে রাখার জন্য আমার কাছে প্রাইভেট আর পাবলিক প্লেস বলে আলাদা কিছু নেই। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ শুধু তুমি।”
অরি চোখ উল্টে বলল,
“হয়েছে হয়েছে, বুঝেছি! অত ঢং করতে হবে না। তা একটা কথা বলুন তো-প্লেনে এতবার জিজ্ঞেস করলাম, তাও তো বললেন না!”
অরি একবার আশেপাশে নজর বুলিয়ে নিল। তারপর দু-কোমরে হাত দিয়ে বেশ কায়দা করে সারিমকে বলল,

“এখন আমি যা জিজ্ঞেস করব, সোজা তার উত্তর দেবেন! কোনো চালাকি নয়।”
সারিম ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে রেখে বলল,
“ঠিক আছে বলো, আপনার কী জানার আছে চন্দ্রিমা?”
অরি এবার আইব্রো নাচিয়ে বলল,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫১

“সারিম ব্রো! আপনি আমাকে ঠিক কোথায় নিয়ে এসেছেন বলুন তো?”
অরির মুখে ‘ব্রো’ ডাক শুনে সারিম না হেসে পারল না। চোখের সানগ্লাসটা একটু নিচে নামিয়ে, অরির একদম কাছাকাছি হয়ে বলল,
“কেন বউ? উগান্ডা তোমার পছন্দ হয়নি বুঝি?”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৩