উপসংহারে তুমি পর্ব ১
রুহানিয়া ইমরোজ
প্রেম করার অপরাধে এক বাচ্চার বাবার সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো চিত্রলেখার। পাত্র অন্য কেউ নয় বরং তারই বড় চাচার বড় ছেলে নাওয়াফ শিকদার। যার কি-না তিন বছর বয়সী একটা ছেলেও আছে।
চিত্রাকে এমন এক অপরাধের শাস্তি দেওয়া হয়েছে যেটা সে করেনি। এ কথা কেউ বিশ্বাস করলে তো? বহু বার বলার এবং বোঝানোর চেষ্টা করছে সে৷ বিনিময়ে অকথ্য গালাগাল আর অমানুষিক অত্যাচার ছাড়া কিছুই জুটেনি কপালে।
মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এই কীর্তি শুনে হার্ট এট্যাক করে তার দাদু আরসালান শিকাদার। নির্দোষ চিত্রাকেই বহন করতে হয় সেই অসুস্থতার দায়। বড্ড কনজার্ভেটিভ ফ্যামিলি তার। সন্তানের চেয়ে সম্মানের ভয়টা বড় তাদের কাছে।
এই সম্মানে আঁচ পড়াই চিত্রা হয়ে উঠে তাদের চোখের বিষ। কলঙ্কিত নারী হিসেবে আখ্যা পায় সবার নিকট। তাইতো অষ্টাদশী চিত্রাকে সঁপে দেওয়া হয় তার থেকে দ্বিগুণ বয়সী এক পুরুষের কাছে। লোকমুখে বাঘ হিসেবে বিরাট খ্যাতি তার। গোটা রাজধানী জুড়ে বিদ্যমান তার সমালোচনা।
ঘরোয়া আয়োজনে বিয়েটা সম্পন্ন হতেই নাওয়াফের হাতে চিত্রাকে তুলে দিয়ে আশিকুর শিকদার বলেন,
–” এখন থেকে তোমার স্ত্রী এই মেয়ে। আর কোনো দ্বিতীয় পরিচয় নেই তার। সন্তান হিসেবে ত্যাজ্য করা হলো তাকে। আপদ নিয়ে বিদায় হও..
বদমেজাজী নাওয়াফ কথা গুলো শুনে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার সদ্য হওয়া শ্বশুরের পানে। কোলে ছেলে ঘুমিয়ে আছে বিধায় বাড়তি কিছু বলে না। চাপা স্বরে হুংকার ছেড়ে ধীর গলায় বলে,
–” আপনার সন্তান ছিল বলে কথাগুলো হজম করে নিলাম। বর্তমানে সে আমার স্ত্রী। সুতরাং তার বিরুদ্ধে কথা বলার আগে শতবার ভাববেন। নয়তো আপনার গায়ে হাত উঠাতে একবারও ভাবব না আমি।
ছেলের অসংলগ্ন আচরণ দেখে পেছন থেকে ধমকে উঠেন আশরাফ শিকদার। নাওয়াফ তার কথা অমান্য করে ক্ষ্যাপাটে সুরে বলে,
–” বিয়ে করে ছেলের দায়িত্ব পালন করে করেছি।এবার এই মহামারী কে নিজ বাসায় তুলে ধন্য করো আমায়। খবরদার আব্বা, যদি ওকে আমার ফ্ল্যাটে পাঠিয়েছ। কসম খোদার, তোমার বাড়ি ডোনেশনে দিয়ে তবেই দম নিব আমি। মাইন্ড মাই ওয়ার্ডস।
বলেই নাওয়াফ গটগটিয়ে হেঁটে চলে যায় বাইরে। এদের ডিজগাস্টিং নাটক দেখার সময় নেই তার। সালিশ করতে এসে শাস্তি পেতে হবে জানলে কখনোই রংপুরে পা রাখত না নাওয়াফ। মাথা মগজ পুরোই আউট অব কন্ট্রোল হয়ে গেছে তার। যখন তখন দু’একটা খুন হয়ে যেতে পারে৷ কাজে ডুবে থাকলেই কেবল এই সমস্যার সমাধান মিলবে। তার জন্য আগে ঢাকা ফিরতে হবে। বহু কাজ বাকি..
ছেলের কথা শুনে মহা চিন্তায় পড়ে যান আশরাফ শিকদার। চিত্রলেখার আতঙ্কিত মুখপানে চেয়ে বিষন্ন হয়ে ওঠে উনার মন। পরিস্থিতি সামলাতে বিয়ে তো করিয়ে দিয়েছেন কিন্তু জীবন বাঁচাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেননি তো বাচ্চা মেয়েটার ?
ওদিকে নরম মনের অধিকারী চিত্রা ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলে এসব তর্ক-বিতর্ক দেখে। সহজ সরল মানুষ সে৷ এত প্যাঁচ তার ছোট্ট মাথায় ঢুকে না। বাবাকে কিছু বলার সাহস নেই বিধায় ব্যকুল হয়ে চায় পর্দার আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকা মায়ের পানে। করুন চোখে চেয়ে বোঝাতে চায়,
–” ও মা.. মা গো! বিশ্বাস করো, তোমার চিত্রা নির্দোষ। কিচ্ছু করেনি সে। অহেতুক এই কথার আঘাত, মারের ব্যথা সইতে পারছে না তোমার বোকা ফুল। একবার বুকে টেনে নাও না তাকে, আদর দিয়ে ভুলিয়ে দাও সব ব্যথা৷
মেয়ের আকুল চাহুনি দেখে তৎক্ষনাৎ সরে যান চৈতী বেগম। নিজের সংসার বিসর্জন দিয়ে মেয়েকে বাঁচান সম্ভব নয় উনার পক্ষে। গত পঁচিশ বছর ধরে কোনো মতে টিকিয়ে রেখেছেন সংসারটা। স্বামীর ঘর ছাড়া হলে আর যে কোথাও ঠাঁই মিলবে না তার। নিজেরও কোনো পরিচয় নেই। না তো আছে কোনো আয়ের উৎস। বুড়ো বয়সে কার বাড়ি ভিক্ষা করে খাবেন?
তার চেয়েও বড় কথা, চিত্রা ভালো থাকবে ওখানে। নাওয়াফ রাগী হলেও মনের দিক দিয়ে ভালো। তার বড় মেয়ের জামাই ছিল ছেলেটা। তাইতো ভরসা পাচ্ছেন একটু-আধটু। বড় মেয়েটার মুখে কখনো অভিমানের ছায়া পড়তে দেখেননি তিনি৷
আফসোস! পোড়াকপালির ভাগ্যে সহ্য হয়নি এত সুখ। মারাত্মক এক এক্সিডেন্টে মৃত্যু ঘটে তার। মাত্র তিন দিনের নবজাতক ছেলেকে রেখে পাড়ি জমায় পরপারে। প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যুর শোকে কয় মাস পাগলই ছিল নাওয়াফ। এরপর হুট করে হয়ে উঠল রগচটা।
এতক্ষণ বহু কষ্টে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন আশিকুর শিকদার কিন্তু নাওয়াফ বেরিয়ে যেতেই চিত্রার চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে হিঁচড়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন বাড়ির বাইরে। মেয়েটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে সিঁড়ির উপর। শরীরে তেমন একটা আঘাত না পেলেও নাকে ব্যথা পায়।
গলগলিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত। পাড়া শুদ্ধ মানুষ মজা দেখে কিন্তু এগিয়ে আসে না। আশরাফ শিকদার হৈ হৈ করতে করতে এগিয়ে গিয়ে ধরেন ভাতিজীকে। চাপা গলায় ভাইকে ধমকে বলেন,
–” পাগল হয়ে গেছিস? মেয়েটা মরে যাবে তো।
আশিকুর শিকদার চিৎকার করে বলেন,
–” মরে যাক ওই মেয়ে। ধ্বংস হোক তার সুখ৷ আজীবন কষ্ট পাক পরের ঘরে। যে মেয়ে বাপের সম্মান নিলামে তুলে তার বেঁচে থাকার অধিকার নেই। পৃথিবীর বোঝা এরা..
বাবার বলা প্রত্যেকটা কথা কলিজা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয় চিত্রার। বোকা মেয়েটা হাভাতের মতো চেয়ে থাকে বাবার দিকে। জন্মের পর থেকেই তিরস্কার শুনে আসছে। আজ নতুন নয়। দোষ তার একটাই, মেয়ে হয়ে জন্মানো।
যদিও ওটা চিত্রার হাতে ছিল না তবুও মেয়েটা মেনে নিয়েছে তার অপরাধ। জীবনের ১৭ টা বসন্ত পার হয়েছে কিন্তুু বাবার আদর কী রকম হয় সেটা উপলব্ধি করার সৌভাগ্য হয়নি তার। আজীবন এই ভালোবাসা পাওয়ার লোভে কতকিছু করল কিন্তু দিন শেষে ওই বাবাই তাকে অভিশাপ দিতে পিছু হটলো না।
এবারে ভীষণ অভিমান হলো চিত্রার। তার কিশোরী মনে বাসা বাঁধল অদ্ভুত জেদ। এতক্ষণ সবাইকে বোঝাতে চাইলেও এবার হাল ছেড়ে দিল। বড় বাবার দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলল,
–” তোমার বাসায় একটু জায়গা দেবে আমায়? সব কাজ করে দিয়ে মূল্য চুকিয়ে দিব না-হয়। দিনে দুই বেলা খেতে দিলেই চলবে।
আশরাফ শিকদারের মনের ভেতরটা হুঁ হুঁ করে ওঠে। বাচ্চা একটা মেয়ে যাকে কোলেপিঠে মানুষ করেছেন সেই কি-না দু মুঠো ভাতের জন্য এমন কাতর গলায় অনুনয় করছে..এই দৃশ্য সহ্য করা যায়? তিনি রুমাল বের করে চিত্রলেখার সরু নাকে ধরে বলেন,
–” এমন করে বলে কেউ? ওটা তো তোরও বাসা মা। চল উঠ.. আর এক মুহূর্ত না এখানে। মিছে সম্মান আর সম্পত্তি ধুয়ে পানি খাক তোর বাপ।
চিত্রার নরম হৃদয় হাহাকার করে উঠল কিন্তু মেয়েটা কাঁদল না। আনমনে বলল,
–” ওটা আমার বাসা নয় বড় বাবা। আমি শুধুমাত্র আশ্রিতা..
অতঃপর তারা রওনা দিল। জীবনে প্রথমবার রংপুরের ছোট্ট গ্রামের সীমানা পেরোলো মেয়েটা। ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে গেল অচেনা গন্তব্যে। এরপর কী হবে? সুখ মিলবে নাকি শোকের ছায়ায় মরণ হবে? বাবার অভিশাপেই কী ধ্বংস হবে মেয়েটা? নাকি কারও আগমনে সজ্জিত হবে তার জীবন?
