Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ১১

এই অবেলায় পর্ব ১১

এই অবেলায় পর্ব ১১
সুমনা সাথী

মেহেদি আর্টিসরা যখন একে একে বিদায় নিচ্ছিল, দিব্য তখনই তাদের কাছে অতিরিক্ত কোনো মেহেদি আছে কি না জানতে চেয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের কাছে আর কোনো টিউব অবশিষ্ট ছিল না। বরং উৎসবের ভিড়ে মেহেদি কিছুটা কমই পড়ে গিয়েছিল। হাজার হোক বিয়েবাড়ি। হিসেবের বাইরেও মানুষের কমতি থাকে না। দিব্য তখনই আর দেরি না করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। রাত অনেকটা হলেও শহরের দু-একটা দোকান তখনো খোলা ছিল। সেখান থেকেই এই মেহেদি সংগ্রহ করে মাত্রই ঘরে ফিরল। নবনীকে ওভাবে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দিব্য হয়তো তার মনের অবস্থাটা আঁচ করতে পারল। অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
‘আপাতত নিজেই কোনোভাবে ম্যানেজ করে নাও। এত রাতে মেহেদি পাওয়া গেলেও কোনো আর্টিস্ট পাওয়া যাবে না। তেমন কাউকে খুঁজে বের করাটাও একটু মুশকিল।’

নবনীর বুকের ভেতরটা এক নিমিষেই এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল। নিজের হাতে মেহেদি পরার চেয়েও যেন কয়েক গুণ বেশি আনন্দ হচ্ছে তার। এই কাঠখোট্টা মানুষটা তার জন্য মাঝরাতে গাড়ি নিয়ে বাইরে গিয়েছিল। ভাবতেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
‘দিব্য তালুকদারের কাছেও তাহলে কিছু কিছু কাজ মুশকিল লাগে?’
দিব্যর কান এড়ালোনা কথাটা। সাবলীলভাবে উত্তর দিল,
‘হ্যাঁ, সে-ও তো রক্তমাংসের মানুষ। রোবট নয় নিশ্চয়ই।’
নবনী চমকে মুখ তুলে চাইল। দেখল দিব্য সরাসরি তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার মানে কথাগুলো লোকটা শুনে ফেলেছে! লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় নবনী যেন কুঁকড়ে গেল। দিব্য আর কথা না বাড়িয়ে ধীরপায়ে বিছানায় উঠে বসল। শুতে যাওয়ার আগে শান্ত গলায় বলল,
‘এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি কোনো অন্তর্যামি নই। তবে তুমি মনের কথাগুলো এত জোরে বলো যে, শুধু আমি কেন; আশেপাশে যে কেউ থাকলে অনায়াসেই শুনে ফেলবে।’

দিব্য বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও নবনী এখনো ঘোরের মধ্যে। সে খাটের ওপর বাবু হয়ে বসে ফোন ঘেঁটে একটা ছিমছাম মেহেদি ডিজাইন বের করল। মেহেদির টিউবটা হাতে নিতেই কেন যেন ওর চোখের কোণ জোড়া ভিজে উঠল। মেয়েদের মন বোধহয় সত্যিই চৈত্র-বৈশাখের আকাশের মতো। এই মেঘ তো এই রোদ। কখনো সামান্য অবহেলায় ভেঙে চুরমার হয়ে যায় আবার কখনো এই সামান্য একটু যত্নে পাহাড় সমান আনন্দে ভরে ওঠে। নবনীর হঠাৎ মনে হলো, পুরোটা জীবনে কারো কাছ থেকে এতটুকু প্রচেষ্টা বা এফোর্ট সে পায়নি। ছোটবেলায় বাবা-মা অন্য ভাইবোনদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওকে অন্যের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে ভালোবাসা পেলেও ততদিনে ও বড় হয়ে গেছে; আলাদা করে আহ্লাদ করার সেই বয়সটা আর ছিল না। এরপর একজনকে ভালোবেসেছিল বুকভরা আশা নিয়ে। অসীমের ছোট ছোট সব জিনিসের খেয়াল রাখত নবনী কিন্তু বিনিময়ে ওপাশ থেকে তেমন কোনো গুরুত্ব মেলেনি। শুরুর দিককার সেই টানটুকু সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে গিয়েছিল। নবনীর ভাবনায় ছেদ পড়ল দিব্যর দিকে তাকিয়ে। দিব্য এক হাত আড়াআড়িভাবে চোখের ওপর রেখে শুয়ে আছে। নবনীর মনে হলো লোকটা আসলে ভেতর থেকে অনেক সুন্দর। ওর কথাগুলো হয়তো নিমপাতার মতো তেতো কিন্তু আদতে উপকারী। নবনীর মনেহলো ঘরের উজ্জ্বল আলোটা বোধহয় দিব্যর চোখে লাগছে। এক হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে খুব নিচু স্বরে ডাকল,

‘শুনছেন? আপনার কি আলোতে প্রবলেম হচ্ছে? আমি কি মেইন লাইটটা অফ করে দেব? আপনি ঘুমান। আমার ফোনের ফ্ল্যাশেই কাজ চলে যাবে।’
দিব্য হাতের আড়ালে থেকেই খুব সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
‘দরকার নেই। তুমি কাজ চালিয়ে যাও। তবে সম্ভব হলে একটু দ্রুত শেষ করে শুয়ে পড়ো। কাল ভোরেই হয়তো উঠতে হতে পারে।’
নবনী আর কথা বাড়াল না। মনোযোগ দিয়ে নিজের হাতে মেহেদির সূক্ষ্ম আলপনা আঁকতে শুরু করল। অনেকটা সময় পার হওয়ার পর হঠাৎ তার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেল। দেখল ঘরের পানির জগটা একদম খালি। দিব্য ততক্ষণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নবনী আর তাকে বিরক্ত না করে খালি জগটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাড়িতে মেহমান অনেক বেশি হওয়ায় জায়গার বড্ড অভাব। তাই অনেককেই হয়তো ড্রয়িং রুমে বা অন্য কোথাও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। পুরো বাড়ি এখন নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। নবনী অন্ধকারে সাবধানে পা টিপে রান্নাঘরে ঢুকল। কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই আচমকা তার পায়ের নিচে নরম কিছুর স্পর্শ লাগল। মুহূর্তেই এক পুরুষালি কণ্ঠের আর্তনাদে রান্নাঘর কেঁপে উঠল,

‘আহ্! ও মাগো!’
নবনী ভয়ে আঁতকে উঠে ছিটকে সরে এল। তার নিজের গলা দিয়েও একটা অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এল। অন্ধকারে সে শুধু অনুভব করল মেঝে থেকে কেউ একজন ধড়ফড় করে উঠে বসছে। নবনী দ্রুত হাত বাড়িয়ে দেয়ালের সুইচ টিপে আলো জ্বালালো। আলোর ঝিলিক চোখে পড়তেই সে দেখল। কালো টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা এক যুবক। ছেলেটা তখন যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে নিজের এক হাত দিয়ে অন্য হাতটা চেপে ধরেছে। নবনী বুঝতে পারল, সে যে বস্তুটির ওপর পা দিয়েছিল তা আসলে এই ছেলেটির হাত। ছেলেটা হাত ঝাড়া দিতে দিতে চরম বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘আমার হাতের হাড় বোধহয় আজই শেষ হয়ে গেল! আপনি কি চোখে দেখেন না? আস্ত একটা মানুষ শুয়ে আছে। আপনার নজরে পড়ল না?’
নবনী এক মুহূর্তের জন্য বোকা বনে গেল। সে এই ছেলেটিকে আগে কখনো দেখেনি। বাড়িতে এত মেহমান যে কে কার আত্মীয় তা বোঝাই দায়। কিন্তু রান্নাঘরের মেঝেতে কেউ এভাবে শুয়ে থাকতে পারে। তা তার কল্পনাতেও ছিল না। নিজের ভুল বুঝতে পারলেও ছেলেটির অহেতুক মেজাজ দেখে নবনীও কিছুটা দমে না গিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,

‘আপনি কে? আর এভাবে অন্ধকারে রান্নাঘরের মেঝেতে শুয়ে আছেন কেন? অন্ধকারে আস্ত মানুষ শুয়ে আছে নাকি হাতি-ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে, সেটা বোঝা কি অতই সহজ?’
ছেলেটি রাগে গজগজ করতে করতে নবনীর দিকে তাকাল। রান্নাঘরের হট্টগোল আর আর্তনাদ শুনে ড্রয়িং রুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল কাব্য। মেহমানদের চাপে ঘরের সংকুলান না হওয়ায় কলরব, অনন্ত আর শান্তর সাথে কাব্যও ড্রয়িং রুমেই বিছানা পেতেছিল। সবেমাত্র ঘুমে চোখ লেগেছিল তার। এমন সময় চিৎকার শুনে সে আর স্থির থাকতে পারল না। দ্রুত রান্নাঘরে ঢুকে নবনীকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘নবনী! কী হয়েছে? মাঝরাতে এভাবে চিৎকার করছো কেন?’
কায়েফ ততক্ষণে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে কাব্যর কাছে ছুটে গেল। নিজের বাঁ হাতটা কাব্যর চোখের সামনে তুলে ধরে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলল,
‘ভাই, তুই তো ডাক্তার। আগে দেখ আমার হাতটা আস্ত আছে কি না! দুই-তিনটা আঙুল মনে হয় একেবারেই গেছে। এই মেয়েটা তো অন্ধকারে আমাকে রীতিমতো পিষে মারার আয়োজন করেছিল। আর একটু হলেই শেষ হয়ে যেতাম!’

নবনী অপলক চোখে কায়েফের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তখনো বুঝতে পারছে না এই ছেলেটা আসলে কে। কাব্য একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কায়েফের দিকে কড়া চোখে তাকাল। বিরক্তির স্বরে বলল,
‘কায়েফ, কী সব উল্টোপাল্টা বকছিস? উনি তোর ভাবি হন, দিব্য ভাইয়ের স্ত্রী।’
নবনীর পরিচয় পাওয়া মাত্রই কায়েফের চোখেমুখে আকাশ ভেঙে পড়ার মতো আতঙ্ক ফুটে উঠল। সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে অস্ফুট স্বরে বলল,
‘এ্যাঁহ!’
কাব্য গম্ভীর মুখে সায় দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ!’
নবনীর মনে পড়ে গেল কাব্যর ছোট ভাইয়ের নাম কায়েফ। এই নামটা সে আগে বাড়ির আলোচনায় শুনেছে। কায়েফকে এভাবে অপ্রস্তুত হতে দেখে নবনী কিছুটা সহজ হয়ে মৃদু স্বরে বলল,
‘সরি, আসলে অন্ধকারে আমি একদমই খেয়াল করিনি। কিন্তু আপনি এভাবে রান্নাঘরের মেঝেতে কেন শুয়ে আছেন? আর আসলেনই বা কখন?’
কায়েফের চঞ্চল চেহারায় এবার কিছুটা লজ্জার ছাপ ফুটে উঠল। সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে কাঁচুমাচু মুখে জবাব দিল,

‘আরে না ভাবি, আপনি সরি বলবেন না। সম্পর্কে তো আমি আপনার ছোটই হই। কলরব আর আমি তিনদিনের ছোট-বড়। আসলে ওই জন্য কলরব আমার ভাইয়ের থেকে বন্ধু বেশি। ওর বিয়ে হচ্ছে আর আমি আসব না তা কি হয়? ওকে সারপ্রাইজ দেব বলে কাউকে না জানিয়েই হুট করে চলে এসেছি। শুধু ভাইয়াকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু মাঝরাতে এসে সবাইকে জাগাতে খুব অস্বস্তি লাগছিল। তাই ভাবলাম সকাল পর্যন্ত এখানেই কাটিয়ে দিই। জায়গার সংকট দেখে ভাইয়াই তো আমাকে বলল এখানে…।’
কাব্য এবার দাঁতে দাঁত চেপে কায়েফের দিকে কড়া চোখে তাকাল। বিরক্ত হয়ে বলল,
‘গাঁধা কোথাকার! আমি তোকে বলেছিলাম রাতটুকু রান্নাঘরে ম্যানেজ করে নিতে কিন্তু তুই একেবারে দরজার মুখেই শুয়ে পড়লি কেন? ভেতরে তো আরও জায়গা ছিল।’
‘আসলে বুঝতে পারিনি এত রাতেও কেউ রান্নাঘরে আসবে! ভেবেছিলাম এখানেই নিরাপদ থাকব।’
কাব্য ঝাড়ি দিয়ে বলল, ‘তা কেন বুঝবি? এটা বিয়ে বাড়ি। যে কেউ যেকোনো সময় আসতে পারে। এই সামান্য কমনসেন্সটুকুও কি তোর নেই?’

‘ভাইয়া, প্লিজ স্টপ! তুমি আমার পুরো সারপ্রাইজটাই মাটি করে দিলে। ধ্যাৎ!’
কাব্য যখন আরও কিছু কড়া কথা শোনাতে যাবে তখনই সে খেয়াল করল কায়েফ দরজার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন থমকে গেছে। কাব্য পেছন ফিরতেই দেখল দরজায় কলরব, অনন্ত আর শান্ত সবাই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। রান্নাঘরের শোরগোল শুনে ওরাও চলে এসেছে। কায়েফ এক সেকেন্ডের জন্য থমকালেও পরক্ষণেই সব জড়তা ঝেড়ে ফেলে এক গাল হাসি নিয়ে কলরবের দিকে ছুটে গেল। ‘সারপ্রাইজ!’ বলে ও কলরবকে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তে রান্নাঘরের সেই গম্ভীর পরিবেশ বদলে গিয়ে আড্ডার আমেজ তৈরি হলো। নবনী একপাশে দাঁড়িয়ে ওদের এই বাঁধভাঙ্গা উল্লাস দেখছিল। এতটুকু বুঝলো এদের বন্ধুত্বটা আসলে অনেক গভীর। কলরব আর কায়েফ একই ক্লাসের পড়তো। কলরব এইচএসসিতে ফেল মারলো আর কায়েফ পাড়ি জমিয়েছিল বিদেশে। কায়েফ পড়াশোনায় বেশ ভালো। দুইজনের দুরুত্ব বাড়লেও তাদের টানটুকু এখনো এক ফোঁটাও কমেনি। নবনী আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সমীচীন মনে করল না। ঝগড়াঝাঁটি মিটে গিয়ে যখন হাসাহাসি শুরু হয়েছে। সে পানির জগটা ভরে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।

সকাল হতেই তালুকদার বাড়িতে এলাহি কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। আজকের সকালের খাবার বাবুর্চি করছে। উঠোনে বিশাল বিশাল ডেকচিতে বাবুর্চিরা সকালের নাস্তার জন্য খিচুড়ি আর ডিম ভুনা চড়িয়েছে। একটু পরেই কনের বাড়ি থেকে হলুদের জন্য লোক আসবে। তাই সবার ব্যস্ততা তুঙ্গে। নিযানা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শেষবারের মতো দেখে নিল। হলুদ স্কার্ট আর কালো টপে এক টুকরো রোদের মতো দেখাচ্ছে ওকে। কাঁধের ওপর এলিয়ে থাকা খোলা চুল আর গলায় পেঁচানো হলুদ ওড়নাটা ওর সাজে পূর্ণতা দিয়েছে। এক হাতে স্কার্টের ঘেরটা সামলে নিয়ে নিযানা ঘর থেকে বেরোলো। কুহুর ওপর ওর বেশ অভিমান হয়েছে; মেয়েটা ওকে না ডেকেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে! হলঘর পেরিয়ে বাহিরে বের হতেই আচমকা এক ঝুড়ি গোলাপের পাঁপড়ি হাতে সামনে এসে দাঁড়াল শান্ত। নিযানা ধাক্কা খেতে খেতেও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। শান্ত ওর দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল,
‘সরি, কিন্তু তোমার একটু দেখে হাঁটা উচিত ছিল!’

নিযানা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল, ‘ইটস ওকে। আসলে আমারই ভুল। আসলেও দেখে হাঁটা উচিত ছিল।’
শান্ত আবার কী একটা বলতে যাবে। এমন সময় আচমকা পেছন থেকে দুটো হাত এসে নিযানার চোখ টিপে ধরল। নিযানা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এই স্পর্শটা কুহুর হাতের মতো লাগছে না কিন্তু এই ভিড়ভাট্টায় কেউ একজন যে ওর সাথে ইয়ার্কি করছে তা স্পষ্ট। শান্তর চোখের সামনে দৃশ্যটা মোটেও সুখকর ঠেকলো না। সে দেখল, কায়েফ হাসি মুখে নিযানার চোখ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শান্তর মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। কায়েফ নিযানার আত্মীয় বা ভাই যাই হোক না কেন; সকাল সকাল নিযানার সাথে এই ঘনিষ্ঠতা শান্তর ইগোতে গিয়ে লাগল। নিযানা হাসতে হাসতে বলল,

‘কে? কুহু তো? দেখ, আমি কিন্তু তোর ওপর খুব রেগে আছি। এভাবে চোখ বন্ধ করে রাগ ভাঙানো যাবে না একদম। তুই আমাকে না ডেকে একা একা নিচে এলি কেন বল তো?’
কায়েফ গলা খাঁকারি দিয়ে একটু শব্দ করতেই নিযানা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। এ তো কোনো মেয়ের কণ্ঠ নয়! কাজিনদের মধ্যে এমন দুঃসাহস কার হতে পারে। ভেবে সে কূলকিনারা পেল না। বিরক্তি আর অস্বস্তি নিয়ে নিযানা বলে উঠল,
‘আরে কে এটা? এটা কেমন ব্যবহার! এতক্ষণ কেউ এভাবে চোখ ধরে রাখে? আমার চশমার চাপে চোখ ব্যথা করছে তো!’
কথাটা শোনামাত্র কায়েফ হাত সরিয়ে নিল। ‘সরি, সরি, ভেরি সরি নিযানা ম্যাডাম! আপনার চশমার কথা একদম মাথায় ছিল না।’
নিযানা ঝট করে পেছন ফিরে কায়েফকে দেখে বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,

‘তুমি? তুমি কখন এলে?’
কায়েফ দুই হাত পকেটে পুরে বলল, ‘কাল রাতেই ল্যান্ড করেছি। তবে তোর রাগ ভাঙানোর জন্য আমার কাছে আরও দারুণ সব উপায় আছে। শুধু এই চোখ ধরা নয়!’
নিযানা হাসতে হাসতে বলল, ‘আমি তো কুহু ভেবে বকা দিচ্ছিলাম। তবে তোমার ওপরও রাগ করা উচিত। কাল না হোক তার আগের রাতেও তো ফোনে কথা হলো। একবারও তো বললে না যে আসছ!’
‘আরে, বলে দিলে কি আর সারপ্রাইজ থাকত?’
কায়েফ চোখ টিপে বলল। নিযানা মাথা নেড়ে সায় দিল,
‘তা অবশ্য ঠিক বলেছ।’
‘ইয়া! ওই দেখ, ভাবির বাড়ির লোকজন বোধহয় চলে এসেছে। চল, ওদিকে যাই!’
কায়েফ আর নিযানা বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। শান্ত সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। অনন্ত পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শান্তর কাঁধে একটা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
‘কী ভাই? কোথাও কি কিছু পুড়ছে? গন্ধ পাচ্ছি কেন?’
শান্ত ক্ষুব্ধ চোখে অনন্তর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘এই মালটা মাঝখান থেকে কোত্থেকে টপকাল বল তো? উটকো ঝামেলা! তবে যাই হোক। ভাই হয় তো। এর বেশি কিছু না।’
অনন্ত যেতে যেতে টিপ্পনী কাটল, ‘হুম, আমারও তাই মনে হয়। তবে এসব ভাইদের নজর ইদানীং বড্ড বেশি তীক্ষ্ণ থাকে। সাবধানে থাকিস!’

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নবনী তড়িঘড়ি করে হলুদ শাড়িটার কুঁচি ঠিক করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সবাই কলরবের হবু শ্বশুরবাড়িতে যাবে হলুদের তত্ত্ব নিয়ে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দিব্য তার পাশে এসে দাঁড়াল। কালো একখানা পাঞ্জাবিতে তাকে বেশ চমৎকার লাগছে। কিন্তু নবনী একটু অবাকই হলো। সবাই যেখানে হলুদ আর লালের ভিড়ে রঙিন হয়ে আছে। সেখানে এই লোকটার চিরন্তন কালো প্রীতি যেন এক মুহূর্তের জন্যও কমছে না। দিব্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিপুণ হাতে চুলে জেল দিতে শুরু করল। নবনী এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো আঁচড়াতে আঁচড়াতে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চুলগুলো সুন্দর করে বাঁধতে শুরু করলো। হাত ওপরে তুলতেই শাড়ির অবাধ্য আঁচল সরে গিয়ে তার ফর্সা সুগঠিত উদর উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। আয়নার প্রতিবিম্বে সেই দৃশ্য দিব্যর নজর এড়াল না। সে অদ্ভুত এক অস্বস্তিবোধ করল। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখার চেষ্টা করল সে। একটু পরেই দিব্য বেশ নিরস আর গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,

‘হলুদ দিতে গেলেই শাড়ি পরতে হবে; এমন কোনো অলিখিত নিয়ম আছে নাকি?’
নবনী কাজ থামিয়ে অবাক হয়ে দিব্যর দিকে তাকাল। দিব্য তখনো আয়নায় নিজের চুল ঠিক করতে ব্যস্ত। যেন সে খুব সাধারণ একটা কথা বলেছে। নবনী শান্ত স্বরে জবাব দিল,
‘না, তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা তো নেই। তবে আমি তো বরাবরই শাড়ি পরি। আর এই শাড়িটা মৌনিতা দিয়েছে। বলছে যে, বাড়ির সব মেয়েরা আজ একই রঙের আর একই ডিজাইনের শাড়ি পরবে।’
নবনী তাড়াতাড়ি চুলটা বেঁধে আঁচলটা কাঁধে পিন দিয়ে ভালো করে আটকে নিল। দিব্য পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
‘তোমার সব সময় শাড়ি পরার লজিকটা ঠিক কী?’

নবনীর মেজাজটা একটু খিঁচড়ে গেল। এত কথা কেনো তাকে জানতে হবে। শাড়ি নিয়ে লোকটার সমস্যা কি। শাড়ি নবনীর যে খুব প্রিয় এমন নয়।অলেখা ওকে বুঝিয়েছিল যে শাড়ি পরলে ওকে বয়সের তুলনায় একটু বেশি পরিণত দেখাবে। এতে করে বাড়ির সবার চোখে আর বাইরের মানুষের কাছে ওকে দিয়ার ‘মা’ হিসেবে মানিয়ে যাবে বেশি। নবনী মনেপ্রাণে চায় দিয়া বড় হয়েও যেন কোনোদিন বুঝতে না পারে যে সে ওর জন্মদাত্রী নয়। কিন্তু এই গভীর আবেগের কথা দিব্য তালুকদারকে বোঝানো আর পাথরের দেয়ালে মাথা কোটা একই কথা। লোকটা নির্ঘাত এটাকে নাটক মনে করে আবার ঝগড়া বাঁধিয়ে দেবে। নবনী নিজেকে সামলে নিয়ে একটু তিব্র স্বরেই বলল,
‘সবকিছুতে এত লজিক খোঁজার কী দরকার? মাঝে মাঝে কি কোনো কারণ ছাড়াই নিজের ভালোলাগাকে প্রাধান্য দেওয়া যায় না? আমার শাড়ি পরতে ভালো লাগে, ব্যস! কেন বলুন তো? শাড়ি পরলে কি আমাকে খুব বিশ্রী দেখায়?’

দিব্য এবার একটু থতমত খেল। ও কি করে বলবে যে শাড়ি পরলে নবনীকে একটু বেশিই স্নিগ্ধ আর মায়াবী লাগে। বিশ্রি নয় বরং আরএকটু বেশি সুন্দর লাগে কিন্তু সেই প্রশংসা করার মতো পুরুষ দিব্য এখনো হয়ে ওঠেনি। নিজের অস্বস্তি ঢাকতে গম্ভীর গলায় বলল,
‘বিশ্রী দেখাবে কেন? আমি তো স্রেফ তোমার সুবিধার কথা ভেবে বলছি। শাড়ি সামলে এত সব কাজ বা ঘোরাঘুরি করতে তোমার অসুবিধা হয় কি না, তাই আর কি।’
নবনী অবাক হয়ে দিব্যর দিকে তাকাল। এই লোকটা ওর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে এত ভাবছে কেন? ঝগড়া করাতে তো বেশ পারে আবার পরক্ষণেই ছোট ছোট বিষয়ে এত খেয়াল রাখে। দিব্য তালুকদার চরিত্রটা নবনীর কাছে দিন দিন আরও বেশি ধোঁয়াশা হয়ে উঠছে। নবনী প্রসঙ্গ ঘোরাতে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
‘আর আপনি কেন হলুদ পাঞ্জাবি ছেড়ে এই কুচকুচে কালো পরেছেন? বাড়ির সবাই যেখানে হলুদ পরেছে, আপনি সেখানে এমন শোকের পোশাক পরেছেন কেন? হলুদ পছন্দ না হলে অন্তত লাল বা সাদা পরতেন!’
দিব্য পাঞ্জাবির হাতাটা ঠিক করতে করতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকাল। আসলে দিব্যর মনের গহিনে যে এক অদ্ভুত সংকোচ লুকিয়ে আছে, তা নবনী জানে না। দিব্য কেন যেন মনে করে উজ্জ্বল হলুদ বা লাল রঙে তাকে মানায় না বরং তার গায়ের রঙকে আরও মলিন দেখায়। এই জন্য সে কালো পরে। তবে এগুলো তো আর বলতে পারবে না। বলল,

‘কেনো? কালো তে কোনো সমস্যা আছে?’
দিব্যর কণ্ঠ স্বর মাত্রারিক্ত গম্ভীর। নবনীর মনে হলো সে রেগে যাচ্ছে বোধহয়। মৃদু হেঁসে বলল,
‘না, সমস্যা থাকবে কেন? আসলে আপনি একা কালো পরেছেন তো তাই ভিড়ের মধ্যে আপনাকে সবার থেকে একটু আলাদা মনে হবে। এটাই বলছিলাম।’
দিব্য আলমারির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবলেশহীন মুখে বলল,

এই অবেলায় পর্ব ১০

‘তাহলে তো আরও ভালো। দিব্য তালুকদার সব সময় সবার থেকে আলাদাই থাকে। এটাই তার বিশেষত্ব ধরে নাও।’
নবনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নায় মনোযোগ দিলো। কী অদ্ভুত আর দেমাগি লোক রে বাবা! একটু আগে যে মানুষটার সূক্ষ্ম খেয়াল রাখা দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলো এখন তার ইগো দেখে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। ও আয়নার দিকে তাকিয়ে মনে মনে দিব্যকে একটা ভেংচি কাটল। বিড়বিড় করে বলল,
‘আলাদা লাগবে না ছাই! অনেকগুলো উজ্জ্বল শস্য ফুলের মধ্যে একটা কালো ভোমরার মতো লাগবে আপনাকে।’
দিব্য আলমারি থেকে নিজের ঘড়ি আর পারফিউম বের করে নিল। নবনী দ্রুত হাতে নিজের কানের দুলজোড়া পরে নিল।

এই অবেলায় পর্ব ১২