Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ১

এই অবেলায় পর্ব ১

এই অবেলায় পর্ব ১
সুমনা সাথী

নিজের দুলাভাইকে বিয়ে করতে হচ্ছে নবনীকে। যে বিয়েটা এড়াতে সে সব ছেড়ে ছুটে গিয়েছিল নিজের পাঁচ বছরের ভালোবাসার মানুষের কাছে, সেই মানুষটিই আজ তাকে ফিরিয়ে দিল। নবনীর বড় বোন অবনী আর নেই। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দিব্য তালুকদার এখন একা। একা অবনীর সেই ছোট্ট শিশুটিও। তাই পরিবারের সবাই চায় নবনী যেন দিব্যকে বিয়ে করে বোনের সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখে। কিন্তু নবনী ভালোবেসেছিল অসীমকে। পাঁচ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, তিল তিল করে জমানো ভালোবাসা আর নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া, সবকিছুর পরিণতি আজ এমন এক অন্ধকার গলিদে গিয়ে ঠেকবে তা নবনী স্বপ্নেও ভাবেনি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে তাকিয়ে নবনীর আজ বড় অচেনা লাগছে। অসীম, যার জন্য সে আজ নিজের ঘর ছেড়েছে। যার পড়াশোনা আর হাতখরচের জন্য নিজের টিউশনির টাকাগুলো হাসিমুখে তুলে দিয়েছে। সেই অসীম আজ পাথরের মতো শীতল। নবনী ধরা গলায় শেষবারের মতো আকুতি জানালো,

‘দেখো অসীম, আমি তো কেবল তোমারই হতে চেয়েছিলাম। আজ যখন দুলাভাইয়ের সাথে আমার বিয়ের কথা হচ্ছে, তখন সব ছেড়ে তোমার কাছে ছুটে এলাম। এখন তো তোমার চাকরি হয়েছে, স্বচ্ছলতা এসেছে। তবে কেন আজ পিছিয়ে যাচ্ছ?’
অসীম নিরুত্তাপ। তার চোখে নবনীর জন্য কোনো মায়া নেই বরং এক ধরণের বিজাতীয় বিরক্তি। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
‘দেখো নবনী, আবেগ দিয়ে পৃথিবী চলে না। মা তোমাকে কিছুতেই মেনে নেবেন না। আর চাকরির কথা তুলছো? ওটা আমি আমার যোগ্যতায় পেয়েছি। বলতে দ্বিধা নেই, কিন্তু সত্যিটা হলো তোমার সাথে এখন আর আমাকে মানায় না।’
কথাটা শোনামাত্র নবনীর পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। যে মানুষটার জন্য সে শত শত ভালো সম্বন্ধ ফিরিয়ে দিয়েছে। নিজের বোনের শূন্যস্থানে বসার প্রস্তাব নাকচ করেছে। সেই মানুষটি আজ আভিজাত্যের দোহাই দিচ্ছে? পাঁচ বছরের আত্মত্যাগ কি তবে কেবল একটা ‘অযোগ্যতা’র গল্প ছিল? চোখের জল বাধা মানল না, তবে সেই জলের সাথে মিশে থাকল এক তীব্র ঘৃণা। নবনী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সপাটে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল অসীমের গালে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘বেইমান! ছিঃ অসীম, আজ নিজের ওপর লজ্জা হচ্ছে যে আমি তোমার মতো একটা মেরুদণ্ডহীন মানুষকে ভালোবেসেছিলাম। আমার পবিত্র ভালোবাসার যোগ্য তুমি কোনোদিনও ছিলে না। ঠিকআছে, তোমার যোগ্য কাউকে বেঁছে নাও তুমি। আজকে আমার সাথে তুমি যেটা করলে তার জন্য ভীষণ আফসোস করবে তুমি। ভীষণ আফসোস করবে, অসীম।’
অসীমকে ফেলে রেখে নবনী যখন বাড়ির পথে পা বাড়াল, তখন তার হৃদয়ে কেবল বোনের সেই ছোট্ট শিশুটির মুখটা ভাসছে। যে মাতৃত্বের দায়ভার এড়াতে সে পালিয়েছিল, আজ সেই দায়ই যেন তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের দুলাভাই দিব্য তালুকদারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াটা এখন আর কেবল সামাজিক চাপ নয়, বরং এক বিশ্বাসঘাতকের মুখে চপেটাঘাত করার জেদ।

দিব্য তালুকদারের ধন-সম্পদের কোনো অন্ত নেই। শহরের প্রথম সারির ব্যবসায়ীদের একজন সে। কিন্তু প্রাচুর্যের এই জৌলুস নবনীকে কোনোদিনও টানেনি। উল্টো মানুষটাকে দেখলেই নবনীর ভেতরটা তেতো হয়ে উঠত। তার বিরক্তির মূলে ছিল দিব্যর গায়ের রং। বিয়ের আসরে যেদিন প্রথমবার দিব্যকে দেখেছিল, নবনী সেদিনই তার বাবাকে সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছিল,
‘এমন একটা কালো লোকের সাথে আমার চাঁদের মতো সুন্দরী আপুর বিয়ে কিছুতেই হতে পারে না।’
অবনী ছিল সত্যিই অপরূপা। যেন শরতের শুভ্র মেঘের মতো তার গায়ের রং। সেদিন নবনীর কথা শুনে তার বড় ফুফু ধমক দিয়ে বলেছিলেন,
‘তুই ছোট মানুষ, এসব কী বুঝিস? সোনার আংটি বাঁকা হলেও তার দাম কমে না। ছেলে মস্ত বড়লোক, তার বাবাও নামকরা ব্যবসায়ী। হাজার খুঁজলেও তোদের এই কুঁড়েঘরে এমন রাজপুত্র আর আসত না।’
ফুফুর সেই কথাগুলো নবনীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। অভিমানে সে সেদিন বাড়ি ছেড়ে মামার বাড়ি চলে গিয়েছিল। এমনকি অবনীর বউভাতেও পা রাখেনি। অবনী যখন বাপের বাড়ি আসত, নবনী সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখত। দিব্য তালুকদার লোকটাকে সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ লোকে বলত অবনী রাজসুখে আছে। শ্বশুরবাড়ির লোক তাকে মাথায় করে রাখে। দিব্য তাকে আগলে রাখে চোখের মণি করে। দিব্য নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করেছিল অবনীকে। কিন্তু নিয়তি সব সমীকরণ পাল্টে দিল এক নিমেষে। আজ সেই অপছন্দের মানুষটির সাথেই নবনীর জীবনের সুতো বাঁধা হতে চলেছে। চারপাশের গুঞ্জনের মাঝে হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো কাজি সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠ,

‘মা, বলো কবুল।’
বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল নবনীর। অসীমের দেওয়া সেই বিষাক্ত আঘাত আর পাঁচ বছরের ভালোবাসার অপমৃত্যু তাকে পাথর করে দিয়েছে। চারিদিকের মানুষ তাড়া দিচ্ছে। অবশেষে নিজের অবাধ্য নিয়তিকে মেনে নিয়ে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে নবনী উচ্চারণ করল,
‘কবুল।’
ছোটখাটো ঘরোয়া আয়োজনেই সম্পন্ন হলো বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। আনন্দহীন এক যান্ত্রিক বিয়ে। একটু পরেই বিদায়ের পালা। নবনী যখন নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার শাশুড়ি অলেখা বেগম চার বছরের ছোট্ট দিয়াকে কোলে নিয়ে নবনীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। কালো রঙের একটা ছোট্ট ফ্রক পরেছে দিয়া। মাথার দুপাশে দুটো ঝুটি। কী ভীষণ মিষ্টি আর আদুরে লাগছে মেয়েটাকে! অবিকল তার মা অবনীর প্রতিচ্ছবি। গায়ের রঙটাও পেয়েছে মায়ের মতোই দুধে-আলতা। দিয়ার সাথে নবনীর সখ্যতা খুব একটা নেই। ছোটবেলা থেকেই নবনী মামার বাড়িতে বড় হয়েছে। আর অবনী বিয়ের পর সংসার আর দিব্যর ব্যস্ততার কারণে বাপের বাড়ি আসার তেমন সুযোগ পায়নি। অলেখা বেগম দিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে নরম সুরে বললেন,

‘আজ থেকে ওটাই তোমার আম্মু। যাও মা, আম্মুকে হ্যালো বলো।’
ছোট দিয়া বড় বড় চোখ পিটপিট করে তাকাল। তার শিশুতোষ মনে এটা যেন এক মস্ত বড় বিস্ময়। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তার ছোট্ট কোমল হাতটা নবনীর গালে রাখল। সেই স্পর্শে যেন নবনীর বাঁধভাঙা কান্না বেরিয়ে এল; কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গালে। দিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি আমার মাম্মা? কাঁদছো কেন তুমি? তোমাকে কি কেউ বকেছে?’
নবনী কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু মাথা নেড়ে বোঝাল যে কেউ তাকে বকেনি। আদর করে মেয়েটার গালে চুমু খেতে যাবে ঠিক তখনই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কেউ দিয়াকে চট করে কোলে তুলে নিল। চমকে তাকিয়ে নবনী দেখল, দিব্য তালুকদার। দিব্যর মুখাবয়ব গম্ভীর। সেই ব্যক্তিত্বের সামনে নবনী যেন কুঁকড়ে গেল। দিব্য গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
‘আমাদের দেরি হচ্ছে আম্মু। সব ঝামেলা চটপট শেষ করে চলে এসো। আমি দিয়াকে নিয়ে গাড়িতে যাচ্ছি।’
এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না দিব্য। দিয়াকে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। নবনী বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার যাওয়ার পথের দিকে। লোকটার রুক্ষতা যেন ঘরের বাতাসকে ভারী করে দিল। অলেখা বেগম পরিস্থিতির সামাল দিতে জোর করে একটু হেসে বললেন,
‘তাড়াতাড়ি চলো মা। আমাদের পৌঁছাতে অনেক সময় লাগবে।’

নবনী বাসর ঘরে বসে। তার বুকের ভেতরটা অপমানে আর অনিশ্চয়তায় ঢিপঢিপ করছে। চারপাশের রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস তার কাছে বিষাক্ত মনে হচ্ছে। যে মানুষটাকে সে সারাজীবন ঘৃণা করে এসেছে আজ তার ঘরেই সে নববধূর সাজে বসে আছে। অসীমের দেওয়া ক্ষতটা এখনো টাটকা। সব মিলিয়ে নবনী এক পাথর হয়ে বসে রইল। দিয়াকে অলেখা নিজের সাথে নিয়ে গেছে। মেয়েটা অবশ্য আসতে আসতে গাড়িতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। দরজা খোলার শব্দে নবনী আড়ষ্ট হয়ে গেল। দিব্য ঘরে ঢুকেছে। লোকটা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নবনীর ঠিক সামনে দাঁড়াল। নবনী মাথা নিচু করে রইল, কিন্তু তার সমস্ত শরীর কাঁপছে। সে ভেবেছিল দিব্য হয়তো তার সেই রুক্ষ মেজাজটাই দেখাবে। কিংবা জোর করে কোনো অধিকার ফলাতে চাইবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে দিব্য খুব শান্ত এবং মোলায়েম গলায় বলল,

‘দেখো নবনী, তখনকার ব্যবহারের জন্য আমি সরি। আমি জানি আজ তোমার মনের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তুমি হয়তো এই পরিস্থিতিটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলে না। আমিও ছিলাম না৷ অবনীর মুখে তোমার কথা অনেক শুনেছি। কিছুটা আন্দাজ ও করতে পারি তুমি আমাকে ঠিক পছন্দ করো না। তবে বিশ্বাস করো দিয়ার মুখের দিকে তাকিয়েই আমাকে এই সিদ্ধান্তটা নিতে হয়েছে। এর বাহিরে কিছুই না।’
দিব্যর গলার স্বর এতটাই ভদ্র এবং মার্জিত যে নবনী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা তুলে তাকাল। দিব্য তার দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,

‘তুমি অনেক ক্লান্ত। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও। নিজের ঘর মনে করে নিশ্চিন্তে ঘুমাও। তোমাকে কেউ বিরক্ত করবে না।’
নবনীর মনে হলো লোকটা যতটা কুৎসিত সে ভেবেছিল তার ব্যবহারটা ঠিক ততটাই সুন্দর। কিন্তু এই মুগ্ধতা স্থায়ী হলো না মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। নবনীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দিব্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

এই অবেলায় পর্ব ২