কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৬
তন্ময়ী তিতিক্ষা
নিজের সামনে এক বলিষ্ঠ পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থতমত খেয়ে গেল মেহর। এই লোকটাই কিছুক্ষণ পূর্বেই তাকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলেছে। মেহর ভ্রুঁ কুঁচকালো। লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছে। কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না। মাথায় আরেকটু চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ল। প্রহরের চাচাতো ভাই ছেলেটা। নাম আলভি। স্বাভাবিক হয়ে এলো মেহরের চোখ জোঁড়া। পুনরায় মনোযোগী হলো অনুষ্ঠানে। কিন্তু আলভির বোধহয় তা সহ্য হলো না। পুনরায় বলে উঠল,
“আপনার পুরো পরিচয়টা পেতে পারি মিস?”
মেহর বিরক্ত হলো। মনে মনে হাজারটা গাল মন্দ করলেও উপরে নিজেকে শান্ত রেখে বলে উঠল,
“না পারেন না। কারন আমার কোনো পরিচয় নেই।”
“আচ্ছা পরিচয় না থাক ফোন নাম্বারটা তো পেতে পারি মিস?”
মনে মনে প্রচন্ড তেঁতে উঠল মেহর। একে তো দেখছে সে বিরক্ত হচ্ছে তাও এই ছেলে ছ্যাঁচড়ার মতো ফোন নাম্বার খুঁজে যাচ্ছে অদ্ভুত। আর এখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করল না মেহর। জায়গা প্রস্থার করার সিদ্ধান্ত নিলো তৎক্ষনাৎ। যেতে যেতে লহুস্বরে বলে উঠল,
“পুরান পাগলের ভাত নাই। নতুন পাগলের আমদানি। যত্তসব!”
মেহরের অগ্নি, তেজী কন্ঠে ভরকে গেল আলভি। আস্তে বললেও সমস্ত কথাই কানে এসেছে তার। একহাতে মাথায় হাত বুলিয়ে থমথমে মুখে তাকিয়ে রইল মেহরের যাওয়ার পানে।
সকাল পেরিয়ে দুপুর প্রায়। মেয়েদের দল বসেছে নিজেদের আরও আকর্ষণীয় করে ফুঁটিয়ে তুলতে। কেউই যেন কারো থেকে কম নয়।সামান্য সাঁজেই যেন একেকজনের রূপ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে হতবাক আর্শি। কালো শাড়িতে যেন রূপ ঠিকরে পড়ছে তার। এই শাড়িটা আযরানের দেওয়া। একদম সিম্পলের মাঝে সাদা পাড়ের অসম্ভব সুন্দর একটা শাড়ি। নিজের সৌন্দর্যে যেন নিজেই মুগ্ধ হলো আর্শি। কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে আপনমনেই বিরবির করে বললো,
“কালো শাড়িতে বুঝি মেয়েদের এত অমায়িক লাগে? আগে কেন খেয়াল করিনি? খেয়াল করবোও বা কি করে আগে তো শাড়িই ছিল না।”
আনন্দপূর্ণ হাসি ফুঁটে উঠল আর্শির চোখে মুখে। চুলগুলো খোঁপা করে তিনটা গোলাপ গুঁজলো। চোখে কাজল টেনে দু’হাত ভর্তি করে চুড়ি পরে নিল আর্শি। হাত নাড়াচাড়া করতেই রিনঝিন শব্দে বেজে উঠল পুরোদমে। আনমনেই মুচকি হাসল আর্শি। হুট করে পিছন থেকে শোনা গেল রাইসার কন্ঠস্বর। পার্লার থেকে আসা মেয়েরা তাকে সাঁজাতে ব্যস্ত। তার ফাঁকেই এক চোখ খুলে আর্শিকে দেখলো রাইসা। উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল,
“তোকে কি সুন্দর লাগছে রে আর্শি। সিউর আজকে আমাকে বাদ দিয়ে সবাই তোকে দেখবে।”
অপ্রস্তুত হাসল আর্শি। ঘাড় ফিরিয়ে নিজেকে আরেকবার বন্দি করল চোখের পাতায়। উমম! মন্দ লাগছে না। কথাটা ভেবেই আনমনে হাসল সে। হুট করে দৃষ্টি গিয়ে আটকালো মেহরের উপর। মেয়েটা ড্যাবড্যাব করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তুলে তাকাতে দেখেই মিষ্টি হাসি উপহার দিলো তাকে। আর্শি হাতের ইশারায় মেহরকে ডাকলো নিজের কাছে। মেহর পরনের লেহেঙ্গাটা সামান্য উঁচু করে এগিয়ে এলো। আর্শি মনোযোগ দিয়ে আঁখিদ্বয় বুলালো মেয়েটার দিকে। শুভ্ররাঙা লেহেঙ্গায় অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগছে মেহরকে। মেহর এগিয়ে আসতেই আর্শি চোখের থেকে অল্প একটু কাজল নিয়ে মেহরের কানের পিছনে লাগিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল,
“মেহুকে আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। কারো যেন আবার নজর না লেগে যায়।”
হাসি খেলে গেল মেহরের ঠোঁটের কোণে। আর্শি পুনরায় নিচু স্বরে বলে উঠল,
“তোমার এখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
“একদমই হচ্ছে না আপু।”
আর্শি মৃদু হাসল। পরক্ষণেই নীলা আর মেহরের পিছু পিছু বেরিয়ে এলো বাইরে। নিচে নামতেই চারপাশ অবলোকন করে যেন তারা বেশ অবাক হলো। সকালের উৎসবমুখর পরিবেশটা এখন নেই। আর্শি বুঝার চেষ্টা করল ব্যাপারটা। নিচে থাকা প্রত্যেকটা মানুষের মুখ অন্ধকারে ছেঁয়ে আছে। এমনকি আযরানও মিহির আর প্রহরের সাথে এককোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তিনজনের মুখই গম্ভীর। যা সচারাচর দেখা যায় না। চিন্তিত হলো আর্শি। হয়েছে টা কি এখানে? আর্শি কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এই থমথমে অবস্থার কারন কি সেটাও বুঝতে পারছে না কিছুতেই। আর্শি এদিক সেদিক দৃষ্টি ঘুরালো। তারপর এগিয়ে গেল তার থেকে কিছুটা দূরত্বে অবস্থানরত রাইসার কাজিন রুমাইসার কাছে। অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
“সবাই এভাবে মনমরা হয়ে বসে আছে কেন আপু?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুমাইসা। আর্শি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রুমাইসা কিছুটা সময় থেমে হতাশভরা কন্ঠে বলে উঠল,
“রাইসার হবু বর নাকি অন্য মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। আরাফুল বিয়েতে রাজি ছিল না। ওর মা বাবার জোরাজুরিতেই বাধ্য হয়ে বিয়েতে মত দিয়েছিল। কিন্তু একটু আগে নাকি সে বিয়ে করে ফেলেছে।”
হতভম্ব আর্শি। হতভম্ব তার দৃষ্টি। কিছুক্ষণ পর বিয়ে আর এখনই কিনা এই ঘটনা? রাইসার কথা মাথায় আসতেই বুক ধ্বক করে উঠল তার। একটা মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাওয়া মানে অনেককিছু। সেখানে রাইসা নিজেও কত খুশি ছিল। কিন্তু এখন এইগুলো শুনলে কিভাবে স্বাভাবিক থাকবে মেয়েটা?
রাতের প্রায় শেষ প্রহর চলছে। বাইরে বইছে নির্মল পবন। এ যেন কেবল নির্মল নয় সুখেরও বটে। দিনভর যে বাড়িটা হতাশায় মোড়া ছিল। সেই বাড়িতেই বয়ে চলেছে সুখময় হাওয়া। রুমের পর্দা মৃদু মৃদু উড়ে চলেছে হাওয়ার দাপটে। রুমের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে ফুলের সুবাস। কি মনোমুগ্ধকর মিষ্টি গন্ধ! ডাঁগর ডাঁগর আঁখি মেলে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল আর্শি। ফুলসজ্জার ঘর সাজানো হচ্ছে। আযরান, মিহির আরও কয়েকজন মিলে রুম সাজাচ্ছে। তবে সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় খাটের মাঝে নতুন বঁধুর পরিবর্তে বসে আছে সয়ং বর নিজেই। আর কনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুলসজ্জার খাট কিভাবে সাজাবে তার নির্দেশনা দিচ্ছে। এমন অদ্ভুত কান্ড কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটলো আর্শির। সকলের দিকে একবার তাকিয়ে বিরবির করল,
“ভালো থাকুক ভালোবাসার মানুষেরা।”
প্রহর তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাইসার দিকে। নাকের পাটা ক্রমশ ফুলছে আবার চুপসে যাচ্ছে। সামনে দাঁড়ানো বঁধু রূপের মেয়েটাকে ভষ্ম করে দিতে পারলে মন্দ হতো না। হতাশ হলো প্রহর। ঠাস করে হাত পা মেলে শুয়ে পড়ল খাটে। তার এক্ষুনি হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। বান্ধুবীর বিয়ে খেতে এসে সেই বান্ধুবীর সাথেই বিয়ে হয়ে যাবে এমনটা ইহজন্মেও দেখেনি। মনে মনে বড় দুঃখ পেল প্রহর। মনমরা হয়ে বলে উঠল,
“তোরা বন্ধু নামের হারামি রে। কি সুন্দর আমাকে ফাঁসিয়ে বলির পাঠা বানিয়ে দিলি।”
সকলের দৃষ্টি এসে থামল প্রহরের উপর। মিহির দাঁত ক্যালালো। এগিয়ে এসে হুট করে থাবা বসালো প্রহরের পেটে। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল প্রহর। পেটে হাত দিয়ে চোখ পাঁকিয়ে মিহিরের দিকে তাকাতেই মিহির বত্রিশ পাটি বের করে বলল,
“দূর বেডা। দেখ কি সুন্দর করে বাসর সাজাচ্ছি। এই রাতের বলির পাঠা হলেও বা মন্দ কি?”
ক্ষিপ্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করল প্রহর। চক্ষুদ্বয় রাঙিয়ে মিহিরের তাকিয়ে আশেপাশে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল। হুট করে দৃষ্টি আঁটকালো রাইসার উপর। এই প্রথম গভীর দৃষ্টিতে নজর বুলালো রাইসার দিকে। মেরুন রঙের লেহেঙ্গা পরে আছে মেয়েটা। বউয়ের সাঁজে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। আকস্মিক হুশ ফিরল প্রহরের। সাথে সাথে মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনা গুলোকে বিদায় দিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকালো। রাইসাকে উদ্দেশ্য করে খোঁচা মেরে বলল,
“দেখ তোরা দেখ। এমন নির্লজ্জ বউ দুইটা দেখছিস? কই লজ্জা পাবে তা না। উল্টো ডাইনির মতো হাসছে।”
রাইসা ভ্রুঁ উঁচু করল। আঁখিদ্বয় কটমট করে তাকাতেই চুপসে গেল প্রহর। রাইসা দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“চুপ কর শালা। পরিস্থিতির চাপে আমাকে বিয়ে করতে পারছিস তোর ভাগ্য। নাহলে তোর মতো গাধার কপালে বউ জুটতো না।”
প্রহরের অসহায় দৃষ্টি আরও করুণ হলো। বিয়ে হয়ে গেছে ব্যাপারটা হজম হচ্ছে না কিছুতেই। এই মেয়ের সাথেই কেন বিয়ে হলো? প্রথমত নিজের বরকে ডাকছে তুই, তার উপর আবার শালা। এই ডেঞ্জারাস মেয়ের সাথে সংসার করবে কি করে? বুকে হাত চেপে ধরল প্রহর। নাটকীয় ভঙ্গিতে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল,
“এই মেয়েকে কেউ নিয়ে যা ভাই। আমি এই বিয়ে মানি না।”
আযরান ফুলের মালা ঠিক করতে করতে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“কাবিন হয়ে গেছে। এখন মানো আর না মানো, লাভ নাই।”
নিমিষেই ক্রুদ্ধ রূপ ধারণ করল প্রহরের চোখ জোঁড়া। রাগী দৃষ্টিতে তাকালো আযরানের দিকে। এই ছেলের জন্যই সব হয়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই চুপ কর। সব নষ্টের মূল তুই।”
“আমি কি করলাম?”
শান্ত ভঙ্গিতে ভ্রুঁ নাঁচালো আযরান। চক্ষুদ্বয় ছোট ছোট করে চাইলো প্রহর। একজনের চোখে ফুঁটে আছে রহস্য তো অপরজন আছে সেই রহস্যের সন্ধানে। আকস্মিক আযরান ঠোঁট কাঁমড়ে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে তুললো ওষ্ঠের কোণে। নিমিষেই ঘাবড়ে গেল প্রহর। বুঝলো না হাসির মানে। সূক্ষ্ণ একটা ঢোক গিলে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করল আযরানের কর্মকান্ড। আযরান এগিয়ে আর্শির হাত মুঠোয় পুরে নিলো। সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“সকলে এবার নতুন বর- কনেকে বিদেয় দেও। যতই হোক আজ তাদের বাসর। রাতটা নষ্ট হতে দেওয়া যাবেনা।”
কথাটা বলেই বাঁকা হাসল আযরান। সকলে বেরিয়ে যেতেই ভ্রুঁ নাঁচিয়ে প্রহরকে কিছু একটা ইশারা করল। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কিংকর্তব্যবিমুঢ় প্রহর। ছুটে গিয়ে আযরানকে বাঁধা দিবে এরপূর্বেই বাইরে থেকে দরজা আঁটকে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকালো প্রহর। হাসফাঁস করে উঠল ভিতরটা। ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো মিহিরের ফিচেল স্বর। কিছুটা উচ্চস্বরেই শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৫
“বাঘিনী শিকার করেই মুখ দেখাস বন্ধু। ভয়ে বেঁহুশ টেহুশ হয়ে গিয়ে পুরুষ জাতির নাম বদনাম করিস না আবার।”
দরজার ধাক্কাতে ধাক্কাতে প্রহর মনে মনে হাজার খানেক গালি দিল। বন্ধু নামক হারামীদের সে দেখে নিবে। কিন্তু এখন কি করবে? কথাটা ভেবেই শুকনো ঢোক গিলে পিছনে ফিরল প্রহর। দু’হাত বুকে বেঁধে রাগী দৃষ্টিতে তারই দিকে তাকিয়ে রাইসা। বুকে থু থু ছিটিয়ে ঠোঁট ভিজালো সে। আকস্মিক রাইসাকে নিজের দিকে এগোতে দেখে ঘাবড়ে গেল বেচারা। কপাল ঘামতে শুরু করল। দরজার সাথে একদম মিশে গিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,
“দেখ রা..রাইসা। তুই আমার বোইন লাগোস। ইজ্জতে হা..হাত দিবি না কইলাম। কাছে আসোস কেন? দূরে যা লুইচ্চা ছেড়ি।”
