ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৫
মারিয়াম ফুল
আপনারা আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না নাকি বুঝতে পারছেন না? আমি বললাম না আমি প্রেগন্যান্ট! আমি যাব না…
মেহের বারবার আর্তনাদ করছিল…
মেহের যখন কান্নাভেজা চোখে পাশের ঘরের দরজার দিকে তাকালো, তার বুকটা যেন ফেটে আসছিল তার মনে হল।সেখানে তানিম আর তিন্নি দুটো ছোট প্রাণ একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। তাদের ছোট ছোট হাতগুলো ভয়ে কাঁপছে। মাত্র কয়েক মিনিট আগে তারা গভীর ঘুমে ছিল, অথচ এখন ঘুম থেকে উঠে তারা যা দেখছে, তা কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ংকর। যাকে ছাড়া তাদের এক মুহূর্ত চলে না—সেই মা নিথর হয়ে রক্তাক্ত মেঝেতে শুয়ে আছে।
৫ বছরের ছোট্ট তিন্নি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে তমিমের জামা খামচে ধরল। তার ভাঙা ভাঙা গলায় শুধু একটাই শব্দ বের হলো,
“তামিম… মাম্মা … রক্ত! মার গায়ে এত রক্ত কেন?” তামিম নিজেও ভয়ে পাথর হয়ে গেছে, তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, কিন্তু সে তার ছোট বোনকে আগলে রাখার চেষ্টা করছে। এই বীভৎস পরিস্থিতির মাঝখানেও এই দুটো নিষ্পাপ শিশু একে অপরের মধ্যে আশ্রয় খুঁজছে।
মেহেরের নিজের কথা নিজের অনাগত সন্তানের কথা সব এক নিমিষেই মাথা থেকে মুছে গেল যেন, বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে । সে দুই হাত বাড়িয়ে তাদের ডাকল, “তামিম… তিন্নি… ”
কিন্তু মেহেরের দিকে তাকাতেই তামিম এক ঝটকায় তিন্নিকে নিয়ে পিছিয়ে গেল। তার চোখে আতঙ্ক। সে চিৎকার করে বলতে লাগল,
“কাছে আসবে না আন্টি! আমাদের কাছে আসবে না! তুমি পচা… তুমি মার গায়ে রক্ত লাগিয়েছ…”
ঠিক সেই সময় ইন্সপেক্টর তাবিশ এক পৈশাচিক হাসি চেপে বাচ্চাদের পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল।
সে তিন্নির মাথায় হাত রাখতে গিয়ে বলল,
“হে, ডোন্ট ক্রাই। লক্ষ্মী সোনা, কেঁদো না।”
তিন্নি তাবিশের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার চোখে তখন অবুঝ প্রশ্ন, “আঙ্কেল… আঙ্কেল, মাম্মাকে ডাকুন না। মাম্মা কথা বলছে না কেন? শি ইজ স্লিপিং, রাইট?”
ছোট্ট মেয়েটা বুঝতেই পারছে না যে তার মা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে। সে ভাবছে একটু ডাকলেই মা তাকে কোলে তুলে নেবে।
তাবিশ তখন বাচ্চাদের সান্তনা দিয়ে বলল “কেঁদো না মা। তোমার মাম্মা একটু পর উঠে যাবে। তোমরা বরং এদিকে এসো।”
তিন্নির চোখগুলো তখন মেহেরের ওপর স্থির। সে তামিমের হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “যাব না! ওই আন্টি…
তাবিশ মেহরির দিকে একবার তাকালো তারপর আবার তামিম আর তিন্নিকে আশ্বাস নিয়ে বলল…
ওই আন্টি মারবে না সোনা। আমি আছি না?
আচ্ছা বলো তো , তোমরা সেখানে কী দেখেছো? আন্টি কি মাম্মার সাথে ঝগড়া করছিল?”
তামিম ভয়ে মেহেরের দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে ফেলল। তার ছোট ছোট নিঃশ্বাসগুলো ভারী হয়ে আসছে। তাবিশ তাকে আবারো বললাম “ভয় পেও না সোনা, আমি পুলিশ আঙ্কেল। বলো তো কী দেখেছো?”
“আঙ্কেল… উনি মায়ের গলায় ..”
বলতে বলতে তামিম আর কথা শেষ করতে পারল না। তার ছোট্ট বুকটা কান্নায় ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। সে আর সহ্য করতে না পেরে তিন্নির কাঁধে মুখ লুকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল।
তাবিশ তখন মাথা উঁচু করে হামজা চৌধুরীর দিকে তাকালো। তার বাঁকা হাসিতে স্পষ্ট —
মেহেরকে বাঁচানোর আর কোনো রাস্তা নেই। সে গম্ভীর গলায় বলল, “মিস্টার চৌধুরী! এখন তো নিজের কানেই শুনলেন। বাচ্চারাই সাক্ষী দিচ্ছে। এটা একটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস! আপনি সংসদ সদস্য হোন বা প্রধানমন্ত্রী, আইন তার কাজ করবেই। উনাকে আজ আমাদের সাথে যেতেই হবে।”
তাবিশের ইশারায় মহিলা কনস্টেবল মেহেরের দুই হাতে শক্ত করে হাতকড়া পরিয়ে দিল। লোহার সেই শীতল পরশ মেহেরের হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। সে পাগলের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করতে লাগল, “আমি কিচ্ছু করিনি! তমিম, বিশ্বাস কর .. আমি তোমার মাকে মারিনি!”
হামজা চৌধুরী তার পরিবারের এই পতন সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি গর্জে উঠে বললেন,
“পুলিশ অফিসার সীমা লঙ্ঘন করবেন না, আমিও দেখে নিব কিভাবে আপনারা আমার পুত্রবধূকে এভাবে আটকে রাখতে পারেন। ”
তাবিশ কিংবা পুলিশের কোন বাহিনী হামজা চৌধুরীকে কোন কিছু বলার প্রয়োজন বোধ মনে করল না তারা কান্নারত মেহেরকে হিড়হিড় করে টেনে-হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল।
রুদ্রকে দেওয়া পেইনকিলার আর কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব বেশ জোরালো ছিল। ফলস্বরূপ, গত রাতে থেকে সে টানা বেশ কয়েক ঘণ্টা অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে ছিল । যখন তার ঘুম ভাঙল, তখন ঘড়িতে বিকাল ২টা বেজে গেছে।
হাসপাতালের কেবিন থেকে বের হয়ে ডিসচার্জ প্রসিডিউর শেষ করে যখন সে করিডোর দিয়ে মেইন গেটের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হাসপাতালের লাউঞ্জে চলতে থাকা বড় এলইডি টিভির দিকে তার চোখ আটকে গেল।
পর্দায় লাল হরফে স্ক্রোল হচ্ছে—
ব্রেকিং নিউজ। সংবাদ পাঠিকার চড়া গলা লাউঞ্জে প্রতিধ্বনিত হলো, “সংসদ সদস্য হামজা চৌধুরীর…”
কথাটা রুদ্রর কানে পৌঁছানো মাত্রই সে তার পা থামাল, কিন্তু সে পুরো খবরটা শোনার আগেই হাসপাতালের একজন ম্যানেজমেন্ট কর্মী রিমোট চেপে চট করে চ্যানেল বদলে অন্য বিনোদনমূলক চ্যানেলে চলে গেলেন।
রুদ্রর সেই ব্যক্তি কে বলল “প্লিজ আগের চ্যানেলটা আবার দিন… এক্ষুনি!”
ওই কর্মী তড়িঘড়ি করে আবার আগের নিউজ চ্যানেলে ফিরে গেলেন। স্ক্রিনে তখন রিনি শেখের একটি হাসিমুখের ছবি ভেসে উঠেছে। নিচে লেখা
“ব্রেকিং নিউজ, রাজধানীর এক ফ্যাশন ডিজাইনার রিনি শেখের লাশ উদ্ধার। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রিনি শেখ নামে এক জনপ্রিয় ফ্যাশন ডিজাইনারের লাশ পাওয়া গেছে তাঁর নিজেরই অ্যাপার্টমেন্টে। প্রাথমিক ও প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে এমপি হামজা চৌধুরীর পুত্রবধূকে। পুলিশ জানিয়েছে, এমপি হামজা চৌধুরীর পুত্রবধূকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়েছে…”
খবরটা শোনার সাথে সাথে রুদ্রর মাথাটা মুহূর্তের মাঝে তীব্র বেগে ঘুরে উঠল। তার মনে হলো সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে, যা শুনছে তা সম্পূর্ণ ভুল!
সে রিমোটটা নিজের হাতে এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে একের পর এক অন্য চ্যানেলে যেতে লাগল। এক, দুই, তিন… এভাবে টানা ৮-১০টা নিউজ চ্যানেল বদলালো সে। কিন্তু সবখানেই একই খবর, একই ফ্ল্যাশ !
“হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন!”
রুদ্র ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল। সে কাঁপানো হাতে পকেট থেকে ফোন বের করে তার বাবাকে কল দিল, কিন্তু হামজা চৌধুরী তখন চরম ব্যস্ততা আর অস্থিরতার কারণে ফোন ধরলেন না।
অন্যদিকে, আদিল তখন নিজের বাসায় বসে টিভিতে এই নিউজ দেখছিল। স্ক্রিনে মেহেরের নাম আসতেই সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে তক্ষুনি অস্থির হয়ে রুদ্রকে কল দিল। রুদ্র একহাতে বাইক স্টার্ট দিয়ে ফোনটা কানের আর হেলমেটের মাঝে চেপে ধরে এক্সিলারেটরে মোচড় দিল।
ওপাশ থেকে আদিল বলল,
“রুদ্র, তুই কোথায়? টিভিতে এইমাত্র যা দেখলাম… এসব কি সত্যি? মেহের ভাবি কীভাবে…”
রুদ্র তীব্র গতিতে বাইক চালাতে চালাতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি কিচ্ছু জানি না আদিল! আই ওয়াজ অ্যাডমিটেড ইন হসপিটাল। এসব কখন, কীভাবে হয়েছে আমি কিচ্ছু জানি না। আমাকে এক্ষুনি অ্যাপার্টমেন্টে যেতে হবে। তুই কল রাখ”
কয়েক মিনিটের মধ্যে রুদ্র তার ১০০০ সিসি বাইক নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে পৌঁছাল। তার পরনের শার্ট কুঁচকানো, একহাতে সাদা ব্যান্ডেজ, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক তাকে চরম অগোছালো লাগছিল।
অ্যাপার্টমেন্টের নিচে এসে রুদ্র থমকে দাঁড়াল। পুরো বিল্ডিংজুড়ে যেন বিশৃঙ্খলার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে মিডিয়া কর্মী, ক্যামেরা আর রিপোর্টাররা পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ঘিরে রেখেছে। কয়েকটি পুলিশের গাড়ি সামনে দাঁড়িয়ে, লাল-নীল বাতির আলো বারবার চারপাশে ঝলসে উঠছে। সাধারণ কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ ইতোমধ্যে লাউডস্পিকারে ঘোষণা করেছে—
” তদন্তাধীন থাকার কারণে ১০৪ নম্বর
অ্যাপার্টমেন্ট কর্ডন করা হয়েছে। মামলা চলাকালীন এই ক্রাইম সিনের আশেপাশে কেউ যেতে পারবে না, ফ্ল্যাটটি সিলগালা করা হয়েছে।’
রুদ্র পুলিশ ও মিডিয়ার ভিড় ঠেলে কোনোমতে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকে গেল। লিফট থেকে বের হতেই সে শুনতে পেল ভেতর থেকে তার মায়ের বুকফাটা চিৎকারের শব্দ ….
রেহানা চৌধুরী ঘরের ভেতর ডুকরে কাঁদছেন আর চিৎকার করে বলছেন,
“হামজা, কিছু একটা করো। আমাদের রুদ্ররের বাচ্চার কী হবে? ”
হামজা চৌধুরী নিজের সমস্ত ধৈর্য হারিয়ে এবার স্ত্রীর ওপর মারাত্মক রেগে গেলেন।
“তোমার ছেলের বাচ্চার কী হবে সেটা ভাবলে রেহানা? অথচ আরেকটা মেয়ের যে ফুলের মতো জীবনটা শেষ হয়ে গেল, সেটা তুমি একবারও ভাবছ না?”
রুদ্র ডোরবেল না টিপেই সজোরে ধাক্কা দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকল এবং ড্রয়িংরুমে বাবা-মায়ের এই উচ্চস্বরের ঝগড়া স্পষ্ট শুনতে পেল।
রেহানা চৌধুরী স্বামীর ধমক খেয়েও কান্নাভেজা গলায় আবার বলে উঠলেন, “আমি ওসব কিচ্ছু জানি না হামজা! তুমি সারাজীবন জনগণের কাছে সৎ থেকেছ। নিজের পরিবারকেও তুমি তোমার এই রাজনীতির জন্য কোনোদিন সময় দিতে পারোনি।
কিন্তু আজ আমার কোনো সততা-নীতি দেখতে চাই না! এখন প্রয়োজন হলে নিজের ক্ষমতা, পদের জোর ব্যবহার করে হলেও আমার ছেলের বউকে ফিরিয়ে এনে দেবে… আমার কাছে রুদ্র আর তার সংসার ছাড়া কিচ্ছু ম্যাটার করে না। আমার ছেলের ভবিষ্যৎ কী হবে, একবার ভেবে দেখেছ?”
হামজা চৌধুরী রেহানা চৌধুরীকে শান্ত হতে বললেন।যেটাই হোক মায়ের মন।
ঠিক তখনই রুদ্র ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।হামজা চৌধুরী নিজের ছেলেকে এই অগোছালো অবস্থায় সামনে দেখেই তীব্র রাগে ফেটে পড়লেন, “এখানে কী করছ তুমি ?”
রুদ্র বাবার এই রূপ দেখে কিছুটা থতমত খেয়ে বলল,
“বাবা! হোয়াট ডু ইউ মিন? তুমি জানো বাইরে কী হচ্ছে? মেহেরের কী হয়েছে?”
“তুমি কাল রাত থেকে উধাও!”
হামজা চৌধুরী এক পা এগিয়ে এসে রুদ্ররের দিকে ।
“তোমার স্ত্রী আর তোমার অনাগত সন্তানকে পুলিশ মার্ডার কেসে ধরে নিয়ে গেছে।আর তুমি এখন এসে জিজ্ঞেস করছ কী হয়েছে?”
রুদ্র নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে উঠল, “বাবা, আমার গত রাতে এক্সিডেন্ট হয়েছিল। আমি হাসপাতালে ছিলাম। যখন টিভিতে নিউজটা শুনলাম…”
“কী শুনলে? খুশি হও নি তুমি। ”
হামজা চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কপালের রগগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠেছে। তিনি নিজের ছেলের দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন সামনে সম্পূর্ণ অচেনা কাউকে দেখছেন…
“মেহেরের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তোমার মতো ছেলেকে বিয়ে করা। তুমি ছেলে হিসেবে যতটা যোগ্য , একজন স্বামী হিসেবে তুমি তার থেকেও অযোগ্য। ”
বাবার মুখ থেকে এমন অপমানজনক কথা শুনে রুদ্রর উচ্চস্বরে বলে উঠল,
” বাবা..আমি কী জানি? ও কাকে মেরে ফেলেছে? কে মরলো আর কে জেলে গেল—তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। মেহের যদি অপরাধ করে থাকে, তবে ও শাস্তি পাবে!”
ছেলের মুখ থেকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা শুনে হামজা চৌধুরী রাগের বসে ছেলেকে চড় মেরে বসলেন , এই প্রথমবার নিজের ছেলের ওপর হাত তুলছেন তিনি । চড়ের তীব্রতায় রুদ্রর মুখটা একপাশে ঘুরে গেল, তার ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো।
হামজা চৌধুরী হাপাচ্ছেন রাগে। তিনি বললেন,
“ সায়েদ বাড়িতে মুখ দেখাবো কীভাবে আমরা? তারা আমাদের বিশ্বাস করে মেয়ে দিয়েছিল”
হামজা চৌধুরী রাগে ও ক্ষোভে ধুপধাপ করে পা ফেলে নিজের ঘরের চলে গেলেন।
রুদ্র নিজের গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।সামান্য একটা মেয়ের জন্য তার বাবা তার উপর হাত তুল্ল। যে মেয়েকে সে কোনোদিন নিজের স্ত্রী বলে মেনে নিতে পারেনি, সেই মেয়ের জন্য?
রুদ্রও রাগে চোয়াল শক্ত করে নিজের রুমে চলে গেল । তার মনে মনে কেবল একটা কথাই ঘুরছিল—
“বাবা কীভাবে আমাকে মারল? সামান্য একটা মেয়ের জন্য! কিন্তু রাগের মাঝেও বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছিল তার।”
অন্যকদিকে, সিলেট সায়েদ বাড়িতে…
মির্জা আর নুরের ঘর আলো করে পুত্র সন্তান আসার কারণে পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ চলছিল। আজ ছিল সেই নবজাতকের আকিকা ও নাম রাখার অনুষ্ঠান। সকাল থেকেই সায়েদ বাড়ি আত্মীয়-স্বজনে লোকারণ্য। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত, কেউ রান্নাবান্না তদারকি করছে, কেউ মেহমানদারিতে ব্যস্ত। ফলে সকাল থেকে বাড়ির কেউই টিভি দেখার সময় পায়নি , এমনকি ব্যস্ততার কারণে কেউ সোশ্যাল মিডিয়াতেও ঢোকেনি।
মেঘলার ছোট বোন মিনহা তখন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে একটু ফুসরত পেয়ে রিলস দেখার জন্য ফোনটা হাতে নিয়েছিল। ফেসবুক স্ক্রল করতেই হঠাৎ একটা নিউজ ফিডের ব্রেকিং নিউজে তার চোখ আটকে গেল। স্ক্রিনে মেহেরের ছবি আর নিচে পুলিশের হাতকড়া পরানোর দৃশ্য দেখেই মিনহার কলিজা শুকিয়ে গেল।
সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, “বাবাই! মা! বড় মা! বড় বাবা! তোমরা সব কোথায়? জলদি এসো!”
মিনহার এই চিৎকার শুনে মেঘলা রান্নাঘর থেকে হাতের কাজ ফেলে ছুটে এলো। সে এসে বলল,
“কী হয়েছে মিনহা? এভাবে চিৎকার করছিস কেন? বাড়িতে মেহমানরা আছে। ”
মিনহা কাঁপতে কাঁপতে, কান্নাভেজা কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা শব্দে বলল,
“আপু… মেহু আপুকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে!”
সায়েদ ইমরান তখন ড্রয়িংরুমে ঢুকছিলেন। তিনি মিনহার কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন,
“কোন আপু? কী বলছ মামনি ? ঠিক করে বল মা!”
মিনহা কেঁদে ফেলে
“আমাদের মেহের আপু…মিনহা কথা বলার সময় বারবার কথা গুলিয়ে ফেলছিল। মিনহা একটু থেমে বলল, বড় বাবা আপুকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।”
সায়েদ কামিনী তখন পিছন থেকে শুনলে মিনহার দিকে এগিয়ে আসেন… মিনহা এসব কি বলছিস?
“বড় মা, আমি একটুও মিথ্যে বলছি না! তোমরা নিজের চোখে দেখো!” মিনহা কাঁপতে কাঁপতে তার ফোনটা সায়েদ ইমরানের দিকে এগিয়ে দিল।
কয়েক ঘন্টা আগের লাইভ টেলিকাস্ট হয়েছিলো .. মেহেরকে পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছে,
“সংসদ সদস্য হামজা চৌধুরীর পুত্রবধূকে পেনাল কোডের ধারা অনুযায়ী পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে…”
সম্পূর্ণ নিউজ শোনার পর মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরের ভেতরে থাকা সমস্ত আত্মীয়-স্বজন আর পরিবারের সদস্যরা একে অপরের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকাতে লাগল। উৎসবের আলো ঝলমলে থাকা বাড়িটা যেন এক সেকেন্ডের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
খবরটা নিজের চোখে দেখে সায়েদ ইমরান শকড হয়ে হাত থেকে মিনহার ফোনটা মেঝেতে ফেলে দিলেন,স্ক্রিনটা চুরমার হয়ে গেল।
সায়েদ ইমরান পাশে থাকা একটা কাঠের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়লেন। তাঁর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। তিনি দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ভাঙা গলায় বলতে লাগলেন,
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৪
“আমার মেহের… আমার মেয়ে এসব করতেই পারে না।এসব সম্পূর্ণ মিথ্যে। ”
সেখানে উপস্থিত সায়েদ বাড়ির কোনো সদস্যেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, মেহেরের মতো মেয়ে, যে কোনোদিন একটা পিঁপড়ে পর্যন্ত মারেনি, সে কীভাবে কোনো মানুষকে এমন বীভৎসভাবে খুন করতে পারে?
