Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২
মারিয়াম ফুল

এয়ারপোর্টে নামতেই রুদ্রের ফোনে কল এল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আদিল মির্জার কাছ থেকে।
“সামনের ক্যাফেতে আয়। লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি, হোয়াটসঅ্যাপ চেক কর।”
আদিলের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামে। কাজের সূত্রে মাঝেমধ্যেই সে এখানে আসে। বর্তমানে সে ঢাকাতেই থাকে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসে যুক্ত থাকার কারণে প্রায়ই বিদেশে যেতে হয় তাকে—কখনো ব্যবসার কাজে, কখনো ওয়ার্কশপ বা মিটিংয়ের জন্য। ভাগ্যক্রমে দীর্ঘদিন পর আবার মুখোমুখি হলো দুই বন্ধু। সময়ের আর দূরত্বের কারণে আগের মতো আর দেখা করার সুযোগ হয়ে ওঠে না তাদের। এবার যেন কাকতালীয়ভাবে দু’জনই একসাথে দেশে এসেছে। আদিলের
বেশিরভাগ সময় দেশেই কাটলেও, রুদ্র দেশের বাইরেই বেশি থাকে।
ক্যাফে শপে বসতেই আদিল সরাসরি বলল ,“তুই সিরিয়াস- হ।”

“কোন বিষয়ে?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।
আদিল একটু থেমে বলল,
“তুই নিজেই জানিস আমি কী নিয়ে কথা বলছি। মানুষের জীবনে ভুল হতেই পারে। তার মানে এই না যে সেই ভুল আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। ওই দিন যা হয়েছিল, সেটা শুধু একটা অ্যাক্সিডেন্ট।”
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হাতে থাকা কফির মগে হালকা চুমুক দিয়ে বলল,
“আর কিছু?”
আদিল দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল।“আমরা শুধু তোকে হাসিখুশি দেখতে চাই।আর কবে ফিরছিস?”
রুদ্র পাল্টা বলল,
আমাকে দেখে অসুখী মনে হচ্ছে তোর?
“নেক্সট ফ্লাইটে,”
আদিল একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলল।
— তোকে বলাই ভুল…
রুদ্ররের তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। বরং সে আরও আয়েশ করে গা এলিয়ে দিল চেয়ারে। ধীর ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক বসাতেই আদিল আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই রুদ্রর ফোনের রিংটোন বেজে উঠল চারপাশে।

“মা” এই সময়?
ওপাশ থেকে রেহানা চৌধুরীর কণ্ঠ শোনা গেল,
বাবা, তুই ঠিক আছিস?টিভিতে দেখলাম… তোকে। এই বিষয়ে আমরা পরে কথা বলব বাবা, আগে তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।
রুদ্র খানিকটা ঘাবড়ে গেল। সে দ্রুত রেহানা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করল,
— হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি । কিন্তু কী হয়েছে মা?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রেহানা আবার বললেন,
“তোর দাদি…”হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। উনি তোকে দেখতে চান।”
“আমি এখনই আসছি,” বলেই ফোন কেটে দিল রুদ্র।
ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে চারটা।
কেউ একজন তাড়াহুড়ো করে প্লেনের উইন্ডো সিটে এসে বসল। পাশের সিটে হেলান দিয়ে থাকা আগন্তুকের দিকে তাকানোরও সময় পেল না সে।
প্লেন টেক-অফ করার সময় হঠাৎ রুদ্র অনুভব করল কেউ তার হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে।
ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠে কেউ বলে উঠল,

“Sorry, sorry… I have aerophobia. আমি প্লেনে উঠলে খুব ভয় পাই।”
রুদ্র নিচে তাকিয়ে দেখল, তার হাতে চারটি নখের দাগ বসে গেছে।তার মুখে কালো মাস্ক, চোখে Cutler and Gross-এর কালো সানগ্লাস। গত কয়েক ঘণ্টার মিডিয়া হাইপ আর মানুষের ভিড় এড়াতে সে নিজেকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছিল যেন কেউ সহজে চিনতে না পারে। বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি, কিন্তু বিজনেস ক্লাসের কোনো টিকিট পাওয়া যায়নি।
রুদ্র বিরক্ত চোখে পাশে বসা সাদা ড্রেস আর বাদামি হিজাব পরা মেয়েটির দিকে তাকাল।
“Stupid।”
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“Excuse me, I am not stupid. Sorry বললাম তো।”
এই বলে নিজের ব্যাগ থেকে একটি ব্যান্ডেজ বের করে রুদ্রের হাতে লাগিয়ে দিল। তার ললাটের রগ স্পষ্ট হয়ে উঠল।

রুদ্র কোনো উত্তর দিল না, দু’জনই দু’দিকে ফিরে বসল। পঞ্চাশ মিনিটের ফ্লাইটে আর কেউ কারও দিকে ফিরে তাকাল না।
পঞ্চাশ মিনিটে প্লেন চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে
পৌঁছাল। ল্যান্ড করার সময় পাশের মেয়েটি তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে সিটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সরাসরি রুদ্রের কোলের ওপর এসে পড়ল। ভয় পেয়ে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
রুদ্র হতবাক হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই মেয়েটি দৌড়ে প্লেন থেকে নেমে গেল।তারপর রুদ্রও বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। এয়ারপোর্ট কাছেই হলেও ট্রাফিকের কারণে সময় লাগল। তিন মাস পর সে বাড়ি ফিরল। কাজের প্রয়োজনে দেশে আসলে সে বেশিরভাগ সময় ঢাকার নিজের ফ্ল্যাটে থাকে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াতের কারণে ফ্ল্যাটেও ঠিকমতো থাকা হয় না।বাড়ির দারোয়ান গেট খুলে দিল। ড্রাইভিং সিট থেকে রুদ্র তাকাল তিনতলা বিশিষ্ট আলিশান চৌধুরী নিবাসের দিকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়,বাড়িতে ঢুকে বাড়ির ভেতরে কাউকে দেখা গেল না।সবাই কোথায়?
ভেতরের এক সার্ভেন্টকে সে জিজ্ঞেস করল,

“বাড়ির সবাই কোথায়?”
“ছোট সাহেব, সবাই দোতলায়। বড় ম্যাডামের কাছে।”
রুদ্র চোখের ইশারায় সার্ভেন্টকে বুঝিয়ে দিল, তাকে আর প্রয়োজন নেই। সে যেন আবার নিজের কাজে ফিরে যায়।রুদ্র দোতলায় উঠে দাদির ঘরে ঢুকল। দেখল সবাই সেখানে জড়ো হয়ে বসে আছে।
এই বাড়ির বড় কর্তা সুলতানা চৌধুরী, রুদ্রের দাদি। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে হামজা চৌধুরী পেশায় একজন রাজনীতিবিদ। তিনি বর্তমান সংসদের একজন এমপি। তার স্ত্রী রেহানা চৌধুরী এবং তাদের দুই সন্তান। তাদের বড় ছেলে রেদওয়ান চৌধুরী, যিনি আট বছর আগে মারা গেছেন।রাইহাম চৌধুরী রুদ্র তাদের ছোট ছেলে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বলা চলে, এখন সেই-ই তাদের একমাত্র ছেলে।
রুদ্রের কাছে পৃথিবী মানে কখনোই শুধু নিয়ম আর বাঁধাধরা জীবন নয়। তার বিশ্বাস, জীবনটা একটা অ্যাডভেঞ্চার যেখানে ঝুঁকি নেই, প্রশ্ন নেই, সেখানে জীবনেরও কোনো দাম নেই।
আগামীকাল, পরকাল কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা….এসব তার কাছে গৌণ। আজকের মুহূর্তটাই আসল। যে মানুষ যত দূর যেতে পারে, যত ভয়কে জয় করতে পারে, তার জীবন ততটাই অর্থপূর্ণ। আর এই বিশ্বাসই তাকে সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে।
দাদার দ্বিতীয় ছেলে হানিফ চৌধুরী, যিনি যুক্তরাজ্যে থাকেন। তার স্ত্রী মিলা চৌধুরী এবং তাদের তিন সন্তানও সেখানে থাকেন। মেয়ে সালমা চৌধুরী তার দুই সন্তানসহ আমেরিকায় থাকেন।
রুদ্র ঘরে ঢুকতেই দেখল নিস্তব্ধতা। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অসুস্থ সুলতানা চৌধুরীকে দেখে সে কাঁপা গলায় বলল,

“দাদা…”
কিন্তু সুলতানা চৌধুরী তার দিকে তাকালেন না।সুলতানা চৌধুরীর চোখেমুখে অভিমানের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
রুদ্রের রাগ চেপে বসল।
“যদি কিছু বলবে না, তাহলে ডাকলে কেন? আমি চলে যাচ্ছি।”
সুলতানা চৌধুরী অভিমানভরা গলায় বললেন,
“চলে যা। মরলেও দেখতে আসবি না। আমরা যদি তোর কেউ হতাম, তাহলে মাসের পর মাস আমাদের থেকে দূরে থাকতিস না।”
রুদ্র দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল,পাশে থাকা চেয়ারটা টেনে দাদির বিছানার পাশে এনে বসল রুদ্র। রেহানা চৌধুরী তখনও নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে রুদ্র ভ্রু তুলে ইশারায় জানতে চাইল, কী হয়েছে?
তার মা ধীর স্বরে বললেন,
— তুই কথা বল।
রুদ্র দাদির হাতটা আলতো করে নিজের মুঠোয় নিয়ে নিল, যেন আশ্বাস দিল তাকে।
— এবার বলো, কী হয়েছে?কি চাও, দাদা?
দাদি দুর্বল কণ্ঠে বললেন,

দাদু, ভাই—কথা দে, এবার কথা রাখবি।
রুদ্র মাথা নেড়ে হ্যাঁসূচক সম্মতি জানালো।
দাদি আবার বলতে শুরু করলেন,
এই বাড়িতে কোনো বাচ্চার হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ নেই। কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আগের মতো আবার হৈ-হুল্লোড় করে উঠুক না এই বাড়ি। আমি চাই, তুই একটা বিয়ে কর । আমি আর বাঁচবই বা কয়দিন দাদুভাই… বড়জোর এক-দুই বছর। তার আগে অন্তত এই বাড়িটাকে আবার প্রাণ ফিরে পেতে দেখতে চাই।
রুদ্রের মা পাশে থেকে বললেন,
“দুইবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তোর দাদার। আমি আর কিছু বলব না তোকে।”
এমন না যে এর আগে তাকে বিয়ের জন্য জোর করা হয়নি,বরং এসবের চাপে একসময় সে ঠিকমতো বাড়িতে আসাই বন্ধ করে দিয়েছিল।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতিটা অন্যরকম। দাদিকে সত্যিই খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে। বাড়িতেই তার সবরকম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।রুদ্রের দাদি আজ পর্যন্ত তার কোনো আবদার অপূর্ণ রাখেননি। ছোটবেলা থেকেই এই মানুষটার কাছে সে ছিল ভীষণ আদরের। তাই মাঝেমধ্যে মজা করেই রুদ্র হামজা চৌধুরীকে বলত,
“বাবা, দেখেছ? তোমার মা কিন্তু তোমার থেকেও আমাকে বেশি ভালোবাসে।”
রুদ্র অতীতের কথা মনে করে চোখ বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রুদ্র তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর হঠাৎই বলে উঠল—

“শর্ত আছে।”
“কি শর্ত?” দাদি জিজ্ঞেস করলেন।
“বিয়ে করব। কিন্তু দশ দিনের মধ্যে। শুধু ফ্যামিলির ভেতর। বাইরে কেউ জানবে না।”
দাদি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। রুদ্র রাজি হয়েছে, এটাই অনেক। “কিন্তু এত কম সময়ে কীভাবে সম্ভব?”
আমি জানি না, বলে রুদ্র দাদির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
অন্যদিকে, বাড়ির পেছনের গেটটা নিঃশব্দে ঠেলে ভেতরে ঢুকল কেউ একজন। চারপাশ একবার সতর্ক চোখে দেখে ধীরে ধীরে একটা মই বেয়ে ওপরে উঠল সে। তারপর অন্ধকারে ঢাকা বারান্দা পেরিয়ে নিঃশব্দেই নিজের রুমে প্রবেশ করল। ঘরে ঢুকতেই একটি কণ্ঠ ভেসে এল,
“মেহের—”
সে ভয় পেয়ে গেল। তবে পরিচিত কণ্ঠ শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল । নিজের পরনের ব্রাউন হিজাবটা ছুড়ে মারল বিছানার ওপর।
তখন রাগে ফুঁসতে থাকা মেঘলা জিজ্ঞেস করল…
“মেহের, তুই কোথায় ছিলি? তোর ইউনিভার্সিটিতে কল দিয়েছি, সবাই বলেছে তুই ক্লাসে যাসনি।”
“এই হইচই করিস না,আস্তে কথা বলো… হুশ.. কেউ শুনে ফেললে বিপদ হয়ে যাবে।মেহের বলল।”
“কিন্তু কোথায় গিয়েছিলি? বড় আম্মু রেগে
আছে।”

—“কি বলেছিস! আমি ইউনিভার্সিটিতে যাইনি”
—”তাহলে”?
— “সকালে চট্টগ্রামের ফ্লাইটে গিয়ে বিকেলে ফিরে এসেছি?”
“এ্যা,” অবাক স্বরে বলল মেঘলা। এ্যা না, হ্যা—যা শুনেছিস, ঠিক শুনেছিস।
মেঘলা চোখ বড় করে বলল,“বড় আব্বু বা বড় আম্মু জানলে?”
— “না, জানবে না। যদি তুই না বলিস।”
“ঠিক আছে। এখন চল, খেতে আয়। রাতে কথা বলব এই বিষয়ে।”
সায়েদ ইমরান সাহেবের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে সায়েদ মির্জার বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। মেজো ছেলে সায়েদ মাশফি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অনার্স পড়ছে। ছোট মেয়ে সাওয়াজ সায়েদ মেহের, সদ্য সাস্টে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে।

সায়েদ ইমরানের ছোট ভাইয়ের সায়েদ শফিকের দুই মেয়ে। একজন সায়েদ মেঘলা, কাজিন হওয়ার পাশাপাশি মেহেরের ক্লাসমেট ও বেস্ট ফ্রেন্ড। আরেকজন সায়েদ মিনহা, সে এবার এসএসসি দেবে।
সায়েদ ইমরান একজন প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। দেশের ভেতর ও বাইরে তার বিস্তৃত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক রয়েছে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি একজন হিসেবে পরিচিত।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১

তার বড় ছেলে সায়েদ মির্জা পারিবারিক ব্যবসার সাথে যুক্ত এবং বাবার কাজে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে। ধীরে ধীরে সে দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
সায়েদ ইমরানের স্ত্রী সায়েদ কামিনী একজন আত্মপ্রত্যয়ী নারী। তিনি পরিবার ও সামাজিক পরিসরে নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে চান এবং প্রায়ই নিজের ক্ষমতা প্রকাশের চেষ্টা করেন।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here