Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৭

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৭

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৭
মারিয়াম ফুল

মেহেরের গা গুলিয়ে উঠল, প্রচণ্ড বমি পেল তখন,মেডিসিনগুলো বমির সাথে বেরিয়ে আসার পর মেহেরের সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। সে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত পেতে সে আল্লার দরবারে শুকরিয়া জানাল।
পেটে আলতো করে হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল, “চিন্তা কোরো না লিটল চার্ম, মা তোমাকে কিচ্ছু হতে দেবে না। আমরা চলে যাব এখান থেকে অনেক দূরে, বহু দূরে… যেখানে কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”

সায়েদ কামিনী আর তার ছেলে সায়েদ মির্জা তখন বেশ নিশ্চিন্তে ছিল। তারা ভেবেছিল, তাদের দেওয়া বিষাক্ত বড়িগুলো মেহেরের ভেতরের নিষ্পাপ প্রাণটিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। কিন্তু ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’এই চিরন্তন সত্য যে তাদের আভিজাত্যের অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।
রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটায় দুটো বাজে। পুরো সায়েদ ভিলা যখন নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে, তখন মেঘলা আর নূর ভাবি মেহেরের ঘরে চুপিচুপি ঢুকল। নূর আর মেঘলা এখনো জানে না মেহেরের এই কঠিন লড়াইয়ের আসল কারণ।

তারা শুধু মেহেরের কান্নাকাটি আর তার অসহায়ত্ব দেখে তাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ভাবছে মেহের শুধু এই জোরপূর্বক বিয়ে আর অন্তুর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ভেঙে পড়েছে। নূর ভাবি প্রথমে মির্জার রাগের কথা ভেবে ভীষণ ভয় পাচ্ছিলেন, কিন্তু মেহেরের করুণ মুখ দেখে নিজের ভয়কে জয় করলেন। মির্জার ড্রয়ার থেকে অতি সাবধানে পেছনের গেটের চাবিটা সরিয়ে এনে মেহেরের হাতে দিলেন তিনি।
সদর দরজা দিয়ে পালানো অসম্ভব ছিল, কারণ সেখানে কড়া পাহারাদার। মেহের শেষবারের মতো মেঘলা আর নূর ভাবিকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিল। চোখের জল মুছে সে অন্ধকারের বুক চিরে পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। মেহেরের নিজের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সেটি নেওয়া সম্ভব ছিল না, কারণ গাড়ির শব্দে পাহারাদের চোখ পড়ে যেত।
মেহের দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর তার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল, শরীর আর দিচ্ছিল না। পথের ধারের একটা বিশাল গাছের পাশে দাঁড়িয়ে সে হাপাতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার কাঁধের ওপর কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করল সে। আতঙ্কে মেহেরের হৃৎপিণ্ড যেন থেমে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে ভয়ে ভয়ে পেছন ফিরে তাকাল। চাঁদের আবছা আলোয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে মেহেরের মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল—

“ভাই… ভাইয়া!”
মেহেরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সায়েদ মির্জা। তার চোখমুখ ভাবলেশহীন, কিন্তু চাহনিতে সেই পরিচিত নিষ্ঠুরতা। মেহেরের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।মির্জা কোনো কথা বলল না। তার চোয়াল শক্ত, দৃষ্টিতে এক পৈশাচিক স্থিরতা। মেহেরের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে সে হিড়হিড় করে টেনে গাড়ির দিকে নিয়ে চলল। মেহেরের পা পাথুরে মাটিতে ঘষা খেয়ে ছাল উঠে যাচ্ছে, কিন্তু সে যন্ত্রণার চেয়েও বড় এক অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
সে আর্তনাদ করে উঠল, “ভাইয়া,তুমি আমায় এভাবে মারছো কেন?মির্জা নির্বিকার… এক ঝটকায় মেহেরকে গাড়ির পেছনের সিটে ছুড়ে ফেলে সে তীব্র গতিতে গাড়ি ছোটাল।
শহর ছাড়িয়ে নিঝুম অন্ধকারের বুক চিরে গাড়িটা এসে থামল এক জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত গুদামের সামনে। লোনা ধরা দেয়াল আর ভ্যাপসা গন্ধে দম আটকে আসছিল মেহেরের। মির্জা তাকে একরকম চ্যাংদোলা করে ভেতরে নিয়ে ছুড়ে ফেলল। গুদামের এক কোণে তাকাতেই মেহেরের হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আবছা আলোয় সে দেখল, ধুলোবালি আর রক্তের জমাট বাঁধা স্তূপের ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কেউ একজন পড়ে আছে।
মেহের পাগলের মতো হামাগুড়ি দিয়ে কাছে গেল। সামনে পড়ে থাকা মানুষটির বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মেহেরের বুক চিরে এক অমানুষিক চিৎকার বেরিয়ে এল। এ অন্য কেউ নয়—এ হলো তার অন্তু!
যার বিরহে সে গত কয়েকটি দিন তিলে তিলে মরেছে। অন্তুর সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত, গায়ের শার্টটা রক্ত আর ময়লায় কালচে হয়ে গেছে। মেহের থরথর করে কাঁপা হাতে অন্তুর বিবর্ণ মুখটা তুলে ধরল।

“অন্তু…অন্তু তাকাও আমার দিকে! আমি এসেছি”
মেহের পাগলের মতো অন্তুর বাঁধন খোলার চেষ্টা করতে লাগল। অন্তু অতি কষ্টে একবার চোখ মেলল। তার ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল,
“মে-হে-র… পালাও… তুমি এখান থেকে পালাও… ওরা তোমাকে শেষ করে দেবে।”
মেহের ঘুরে দাঁড়িয়ে মির্জার পা জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, “ভাইয়া, তুমি এত নিষ্ঠুর কী করে হলে তুমি? তুমি আমার আপন ভাই হয়ে আমার স্বামীকে এভাবে এত দিন ধরে আটকে রেখে তিলে তিলে মারছিলে? ভাইয়া, ওকে ছেড়ে দাও না… তুমি দয়া করে ছেড়ে দাও। আমি ওকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। ওভাইয়া, দয়া করে ওকে ছেড়ে দাও…”

মেহেরের কান্নার গতি তীব্র হচ্ছিল। ?
মির্জা এক ঝটকায় মেহেরকে সরিয়ে দিল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু আভিজাত্যের অন্ধ দম্ভ। সে পাশ থেকে একটা ভারী লোহার রড তুলে নিয়ে সজোরে অন্তুর মাথায় আঘাত করল। মেহেরের চোখের সামনে অন্তুর কপাল চিরে টাটকা রক্তের ধারা নেমে এল।
“না-আ-আ! ভাইয়া থামো! তুমি ওকে মারলে আমায় আগে মেরে ফেলো তুমি!”
মেহের পাগলের মতো অন্তুর নিথর হতে যাওয়া দেহটাকে নিজের বুক দিয়ে আড়াল করল। কিন্তু মির্জা তখন মানুষ নয়, এক পিশাচ। সে কোমর থেকে একটা ধারালো শিকারি চাকু বের করল।
মেহেরের চোখের দিকে তাকিয়ে মির্জা শীতল কণ্ঠে বলল, “সায়েদ বংশের মেয়ের কোনো ভুল থাকতে নেই মেহের। আর কলঙ্ক মুছে ফেলার এটাই একমাত্র পথ।”

কথাটা বলেই মির্জা মেহেরকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল। মেহেরের চোখের সামনেই সেই ধারালো চাকুটা অন্তুর পেটে আমূল বসিয়ে দিল সে। একবার, দুবার, বারবার। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে এক ভয়াবহ বজ্রপাত হলো। প্রকৃতিও যেন এই নিষ্ঠুরতা সইতে পারল না। শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। গুদামের ফাটা চাল দিয়ে বৃষ্টির জল আছড়ে পড়তে লাগল মেঝের ওপর।
অন্তুর শরীর থেকে বের হওয়া রক্ত বৃষ্টির জলের সাথে মিশে এক লাল নদের সৃষ্টি করল। মেহের পাগলের মতো অন্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার দুহাত দিয়ে অন্তুর পেট থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত চেপে ধরার চেষ্টা করল সে। তার সাদা ওড়না মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল।

“অন্তু, ওঠো! তুমি না বলেছিলে আমাদের বাচ্চার নাম রাখবে? তুমি না বলেছিলে আমরা একটা ছোট ঘর বাঁধব? ওঠো না অন্তু… কথা বলো আমার সাথে!” মেহের বৃষ্টির জল আর রক্তে মাখামাখি হয়ে অন্তুর নিথর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। অন্তুর চোখের মণি তখন স্থির হয়ে গেছে আকাশের দিকে। তার শেষ নিশ্বাসটুকু মেহেরের হাতের ওপর এক বুক হাহাকার রেখে মিলিয়ে গেল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৬

মেহেরের গগনবিদারী চিৎকার বৃষ্টির শব্দের নিচে চাপা পড়ে গেল। সে অন্তুর রক্তাক্ত মুখে বারবার চুমু খাচ্ছিল আর ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল। তার নিজের ভাই তার চোখের সামনেই তার সবটুকু জগতকে চিরে ফালি ফালি করে দিল। মেহেরের সেই আর্তনাদ শুনলে আজ খোদ বিধাতার আরশও হয়তো কেঁপে উঠত। কিন্তু মির্জা নিস্পৃহ ভঙ্গিতে চাকুর রক্ত মুছে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। মেহেরের জন্য শুধু অবশিষ্ট রইল বৃষ্টির পৈশাচিক গর্জন আর প্রিয়তমের নিথর দেহ।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৮