Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৯৫

খান সাহেব পর্ব ৯৫

খান সাহেব পর্ব ৯৫
সুমাইয়া জাহান

সুমু আর শেরান ঘরে পা রাখতেই থমকে গেল। মেঝেতে বসে বাপ-বেটির ভোজ চলছে— চারপাশে চকোলেটের খোসা ছড়ানো, যেন কোনো যুদ্ধজয়ের ধ্বংসাবশেষ। সুমুকে দেখে শেরাজ আর সিমরান একযোগে তাকাল, দুইজনের মুখেই চকলেটের এমন মাখামাখি অবস্থা যে চেনা দায়। বিছানায় সুমুর ব্যাগটা অযত্নে পড়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে সে কপালে হাত দিয়ে হতাশ স্বরে বলল,
​“সব কটা আমার চকলেট ছিল! আমাকে একটা বারও না জানিয়েই আপনারা সব সাবাড় করে দিলেন?”

শেরাজ মোটেও লজ্জিত নয়, বরং ঠোঁটের কোণে চকলেটমাখা এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটিয়ে বলল,
​“আরে সুইটহার্ট, চকলেটের প্রতি আমার এই দুর্মর দুর্বলতার কথা তো তোমার অজানা নয়। এই আসক্তি কোনোদিন শেষ হবার নয়, এ এক অনন্ত উপাখ্যান।”
​বাবার কথার রেশ ধরে ছোট্ট সিমরানও মাথা দুলিয়ে সায় দিল,
“আমানও!”
শেরাজ, সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেরানকে ইশারায় কাছে ডাকল,
“চ্যাম্প, কাম!”

শেরান গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতেই শেরাজ ওকে সজোরে কোলে টেনে নিল। ছেলের কপালে আদরের পরশ দিয়ে গম্ভীর স্নেহমাখা গলায় বলল,
​“মাই লিটল চ্যাম্প! তোমাকে আমি ক্রিকেটার বানাব। আপাতত এই চকলেটে কামড় বসাও, মেরা বাচ্চা।”
​সুমুর বিরক্তিটা এবার চরমে পৌঁছাল। সে কপট রাগে তড়িৎবেগে এগিয়ে এসে বলল,
“খেয়েছেন ভালো কথা, কিন্তু বাচ্চাদের মতো এভাবে সারা মুখে মেখেছেন কেন? নিজের বয়সের দিকে অন্তত একবার তাকান!”

শেরাজ বড্ড অসহায়ভাবে সুমুর দিকে চাইল। তার সেই দোর্দণ্ড প্রতাপ যেন এই মুহূর্তে ফিকে হয়ে গেছে। সুমুর ধমক শুনে সিমরান আর নিজেকে সামলাতে পারল না, সে খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি। শেরাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে অপরাধীর সুরে বলল,
“সবই আমার প্রিন্সেসের রাজকন্যের কীর্তি। তার অকাট্য যুক্তি হলো—চকলেট নাকি এভাবে মুখে মেখে খেলে স্বাদে এক অন্যরকম মাত্রা যোগ হয়। আমি তো কেবল হুকুমের গোলাম!”

বাবার কথা শেষ হতে না হতেই সিমরান দুষ্টুমিভরা হাসিতে আবারও এক দলা চকলেট নিয়ে শেরাজের গালে লেপে দিল। প্রশ্রয়ের এক চিলতে হাসি শেরাজের ওষ্ঠাধরে খেলা করতে লাগল। সিমরান তার চকলেটমাখা ছোট্ট আঙুলটা বাবার সামনে ধরতেই শেরাজ পরম মমতায় মেয়ের আঙুল থেকে চকলেটের অবশিষ্টাংশটুকু মুখে পুরে নিল। বাবার এমন কাণ্ড দেখে সিমরান আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল। সে তড়িৎবেগে উঠে গিয়ে আইসক্রিমের বক্সটা খুলল। সুমু এতক্ষণ নিজেকে সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, এবার আর সেই সংবরণ ধরে রাখতে পারল না। মেয়ের অনুমতি নেওয়ার তোয়াক্কা না করেই সে এক ঝটকায় বক্সটা টেনে নিল এবং এক বড় চামচ আইসক্রিম নিজের মুখে পুরে দিল। ব্যস, মুহূর্তেই শান্ত ঘরে রণচণ্ডী মূর্তির উদয় হলো! মা আর মেয়ের মধ্যে শুরু হয়ে গেল এক লঙ্কাকাণ্ড।

সিমরান অভিমানে আকাশফাঁটা চিৎকারে কেঁদে উঠল। সুমু আইসক্রিমের স্বাদ নিতে নিতে জয়ী ভঙ্গিতে উঠে যেতে চাইতেই, সিমরান একহাতে মায়ের একগোছা চুল শক্ত করে টেনে ধরল। সে ডুকরে কাঁদছে আর চুল ধরে টানছে, কিন্তু সুমু নির্বিকার! সে যেন এক জেদি কিশোরীর মতো মেয়ের কান্না উপেক্ষা করেই আইসক্রিমের সদ্ব্যবহারে মগ্ন।
​মেয়ের এমন করুণ দশা আর আর্তনাদ দেখে শেরাজ এবার ধৈর্যের বাঁধ হারাল। সে সুমুর দিকে অত্যন্ত কড়া আর ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে বলে উঠল,
​“এসব কী হচ্ছে, সুইটহার্ট! কাণ্ডজ্ঞান কি বিসর্জন দিলে? একটা দুধের বাচ্চাকে এভাবে নাজেহাল করে কাঁদিয়ে তুমি দিব্যি আইসক্রিম খেয়ে যাচ্ছ? ওর প্রাপ্য ওকে সসম্মানে ফেরত দাও, বলছি!”
​সুমু বাধ্য হয়ে আইসক্রিমের বিতর্কিত বক্সটা মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল, কিন্তু অভিমানে চুরমার সিমরান এবার আর সেটা গ্রহণ করল না। তার ওইটুকু মুখে এখন রাজ্যের অবজ্ঞা। সুমু হাল ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
​“কোথায় যাচ্ছ, সুইটহার্ট?”
​সুমু পেছনের দিকে একবারও না তাকিয়ে গটগট করে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিল,
“বাচ্চাদের খাবার খাওয়াতে হবে তো!”

শেরাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে বেশ আয়েশ করে বসে নিচু স্বরে বলল,
“আমিও কি একটু পাব?”
সুমু মাঝপথে থমকে গিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী?”
​“ওই যে, বাচ্চাদের খাবার!”
​সুমু এবার কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তার কণ্ঠে ফুটে উঠল প্রচ্ছন্ন শাসন,
“খান সাহেব! বাচ্চাদের সামনে অন্তত আপনার এই অসভ্যতাটুকু বিসর্জন দিন। ওদের সামনে একদম অসভ্যতা করবেন না।”
​শেরাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে দুই হাত তুলে নিষ্পাপের মতো বলল,
“যাহ বাবা! আমি আবার কী অপকর্ম করলাম?”
​“আপনি কী করেছেন সেটা আপনার বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন। বাচ্চাদের খাবার খেতে চাইছেন কেন?”

শেরাজ অট্টহাসি হাসতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। সে অত্যন্ত গম্ভীর মুখ করে বলল,
“ইশশ! আমার বউটা এতো নেগেটিভ মাইন্ডেড। এই যে আমার ঘরনী, আপনি যে দিনকে দিন এতো নেতিবাচক চিন্তার অধিকারী হয়ে উঠছেন, তা তো আমার জানা ছিল না! আমি তো স্রেফ তোমার হাতে রান্না করা উপাদেয় খাবারের অংশ চেয়েছিলাম। তুমি কোন গভীর অতলে তলিয়ে গেলে, সুইটহার্ট?”
সুমু খানিকটা থতমত খেয়ে কাঁচুমাচু মুখে বলল,
“খান সাহেব, আমার বেশ কিছু জিনিসের দরকার ছিল।”
শেরাজ খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,
“সেসব আমি অনেক আগেই আনিয়ে রেখেছি। সময় করে একবার মিলিয়ে দেখে নিও।”

সুমু যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
“আনিয়ে রেখেছেন মানে? আমি তো আপনাকে মুখ ফুটে বলিনি যে আমার ঠিক কী কী লাগবে! আপনি জানলেন কী করে?”
​শেরাজ মৃদু হাসল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
“তুমি আমাকে বলবে, আর তারপর আমি বুঝে নেব যে তোমার কী প্রয়োজন—সম্পর্কটা কি এতটাই যান্ত্রিক? তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী। দিনরাত এক করে আমাদের সংসারের জন্য তুমি কতটা বিলিয়ে দাও, সেটা কি আমার অগোচরে থাকে? তোমার এই সামান্য খেয়ালটুকু যদি আমি না রাখতে পারি, তবে তো আমার স্বামী পরিচয়টাই বৃথা। নিজের স্ত্রীর অভাব আর ভালো-মন্দের খবর রাখাটা আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। বিশ্বাস করো সুইটহার্ট, তোমার না বলা কথাগুলোও আমি খুব স্পষ্ট পড়তে পারি।

বিকেল গড়াতেই সাজেকের আকাশটা নীলচে বেগুনি রঙ ধারণ করেছে। কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুমু তার তুরুপের তাস চালল। সে সিমরানকে নিচু স্বরে বুঝিয়ে বলল,
“মাম্মাজান, পাপার কাছে যাও। গিয়ে বলো—পাপা, আমি শুধু তোমার সাথে একা একা পাহাড় দেখতে যাব। পাপা যেন তোমাকে নিয়ে একটু দূরে ওই ভিউ পয়েন্টে যায়, ঠিক আছে?”
​সিমরান তার ডাগর ডাগর চোখে মাথা নেড়ে পাপার কাছে ছুটে গেল। মেয়ের আবদার বলে কথা! শেরাজ এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে সিমরানকে কোলে তুলে নিল। যাওয়ার সময় সুমুর দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হেসে বলল,
“দেখেছ? আমার মেয়েটা ঠিক আমার মতো হয়েছে, নির্জনতা পছন্দ করে।”
সুমু মনে মনে হাসল, কারণ এই নির্জনতার সুযোগেই যে বড় একটা ধামাকা হতে যাচ্ছে, তা শেরাজ ঘুণাক্ষরেও জানে না। ​শেরাজ আর সিমরান দৃষ্টির আড়ালে যেতেই পুরো কটেজ যেন সজাগ হয়ে উঠল। সুমু সবাইকে ডাকল,
“জলদি সবাই এসো! আমাদের কাছে মাত্র এক ঘণ্টা সময় আছে।”

শুরু হলো এক মহাযজ্ঞ। খোলা জায়গায় শেরাজের সারপ্রাইজ বার্থডে পার্টির জন‍্য সাজানো শুরু হলো। আইয়ুব আর রাহিন মই বেয়ে ওপরে উঠে মরিচবাতি আর নীল-সাদা বেলুন টাঙাচ্ছে। নিহাল, সাইফ আর অমিত মিলে চারপাশে রঙিন লণ্ঠন সাজাচ্ছে। রিয়াদ, ফাহিম আর রিসান ব্যস্ত চেয়ার-টেবিল গোছাতে। নাজমিন, সামিয়া আর ইনায়া মিলে কেকের টেবিলটা সাজাচ্ছে। সাদা-কালো বিশাল এক তিন তলা কেক, যার ওপরে ইংরেজিতে বড় বড় করে লেখা— “হ্যাপি বার্থডে টু আওয়ার কিং, এস.কে!”
​নতুন দম্পতিরা যে যার মতো দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে। পিয়াস আর ইফতিয়া ফুলের মালা গাঁথছে বারান্দার রেলিঙের জন্য। স্যান্ডি আর নাতাশা মোমবাতিগুলো জায়গামতো বসাচ্ছে। নয়ন আর মাইশা ব্যস্ত মিউজিক সিস্টেম চেক করতে, যাতে শেরাজ ঢোকার মুহূর্তেই তার প্রিয় কোনো টিউন বেজে ওঠে। অজান্তা আর রিফাত খাবারের মেনু তদারকি করছে।
​ওদিকে বাকিদের মধ্যে চিরচেনা খুনসুটি চললেও কাজে কোনো ফাঁকি নেই। আশিক আর ফারিন বেলুন ফোলানো নিয়ে ঝগড়া করছে। আশিক বলল,

“ফারিন, তুই তো দেখছি ফু দিয়ে বেলুন ফাটাস বেশি, ফোলাস কম!”
ফারিন রেগে গিয়ে একটা বেলুন আশিকের মাথায় ফাটাল। ​ফিরোজা আর রাইশা মিলে উপহারের প্যাকেটগুলো গুছিয়ে রাখছে। রিয়াজ আজ একটু বেশিই কর্মতৎপর। সে ফিরোজাকে সাহায্য করার উছিলায় বারবার তার পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিশা আর রাইফ মিলে কটেজের প্রবেশপথটা বুনো ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিল।
​সিমরান বাদে বাকি সব বাচ্চারা এক কোণে গোল হয়ে বসে আছে। শেরান, নিশান, রুহি, হাসফা আর আহিয়া মিলে ঠিক করছে তারা ‘হ্যাপি বার্থডে’ গানটা কোন সুরে গাইবে। আয়াস আর নাহিয়ান আজ সুবোধ বালক সেজে বসে আছে।
​সূর্যটা পাহাড়ের আড়ালে ডুবে যেতেই পুরো জায়গাটা নীল আর সোনালি আলোয় ঝলমল করে উঠল। সুমু বারবার ঘড়ি দেখছে। সবার চোখেমুখে এক চাপা উত্তেজনা। সুমু ফিসফিস করে বলল,
“সবাই পজিশন নাও! খান সাহেব আর সিমরান হয়তো এখনই চলে আসবে।”

সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। শুধু পাহাড়ের কোল থেকে বয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের শব্দ আর সবার হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে শেরাজ খানের পুরো রাজত্ব এখন শুধু তার আসার প্রতীক্ষায়।
​পাহাড়ের বাঁক থেকে যখন শেরাজ সিমরানকে নিয়ে কটেজের সামনে এসে দাঁড়াল, চারপাশটা তখন নিবিড় অন্ধকারে ডুবে আছে। শেরাজ কিছুটা অবাক হলো। সাজেকের এই সময়ে তো লোডশেডিং হওয়ার কথা নয়, আর কটেজের বাকিরা গেল কোথায়? পুরো বাড়িটা যেন নিঝুম হয়ে আছে।

শেরাজ অন্ধকারে বারান্দায় উঠে আসতেই তার কোলে থাকা ছোট্ট সিমরান হুট করে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“হ্যাপি বার্থডে পাপা!”
​সে শেরাজের গালে টুপ করে চুমু খেল। শেরাজ চমকে গিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই জাদুর মতো চারপাশের হাজারো নীল আর সোনালি মরিচবাতি একসাথে জ্বলে উঠল। অন্ধকারের বুক চিরে কটেজের চারপাশে আলোয় ভেসে গেল।

​“হ্যাপি বার্থডে শেরাজ!”— সমস্বরে চিৎকার করে উঠল আইয়ুব, রাহিন, পিয়াস, নয়ন থেকে শুরু করে উপস্থিত সবাই। ওপর থেকে ঝুরঝুর করে রঙিন কনফেটি আর ফুলের পাপড়ি পড়তে লাগল শেরাজের ওপর।
​শেরাজ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে সত্যিই ভুলে গিয়েছিল আজ চব্বিশে মে, তার জন্মদিন। পাহাড়ের এই নির্জনতায় তার জন্য এত বড় আয়োজন অপেক্ষা করছে, সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না। ​সবাই যখন তালি বাজিয়ে উইশ করছে, তখন পেছন থেকে এগিয়ে এলো সুমু। তার পরনে নীল রঙের একটা জর্জেট শাড়ি, যা রাতের সাজেকে তাকে ঠিক এক নীলপরীর মতো দেখাচ্ছে। সুমু শেরাজের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে অশ্রু আর মুখে হাসি। সে শেরাজের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব নরম আর আবেগী গলায় বলল,
“আজ চব্বিশে মে। আমার ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে পবিত্র দিন। কারণ এই দিনেই আমার জীবনের সবথেকে প্রিয় মানুষটা এই পৃথিবীতে এসেছিল। আমার স্বপ্নের পুরুষ, আমার সন্তানদের পাপা আর আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।”
​শেরাজ মুগ্ধ হয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে। সুমু আবারও বলতে শুরু করল,

“আপনি হয়তো ভাবেন আপনি খুব ডার্ক, খুব কঠিন। কিন্তু আমার কাছে আপনি সেই হাত, যে আমাকে আগলে রাখে। আজ এই পাহাড় আর মেঘেদের সাক্ষী রেখে বলছি—পরের প্রতিটা জন্মদিনেও আমি যেন এই দিনটাতে আপনার হাতটা এভাবেই ধরে থাকতে পারি। শুভ জন্মদিন, আমার ভালোবাসার রাজা!”
​তার কথাগুলো শেষ হতেই আইয়ুব পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল,
“ব্যস ব্যস! এবার ইমোশন থামিয়ে কেকটা কাট দোস্ত, পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে!”
​পুরো কটেজে হাসির রোলে ফেটে পড়ল। নিশান, রুহি, হাসফা আর বাকি বাচ্চারা শেরাজকে ঘিরে ধরল। আশিক আর ফারিন ঝগড়া ভুলে একসাথে তালি দিচ্ছে। শাহরুখ, রিয়াজ আর ফিরোজা শেরাজের জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানাচ্ছে। রাইফ আর তিশা কেকের মোমবাতিগুলো জ্বালিয়ে দিল।
​শেরাজ সিমরানকে কোল থেকে নামিয়ে সুমুর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠল। সে হাসিমুখে বলল,
“আমি সত্যিই আজ আবারও জানতে পারলাম— এই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী আর সুখী মানুষটা আমি, কারণ আমার কাছে এই পরিবারটা আছে।”
​কালো আর সাদা রঙের বিশাল কেকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল শেরাজ—সিমরান, শেরান আর সুমুর হাত ধরে সে কেকের ওপর ছুরি চালাল। কেক কাটার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই শুরু হলো উন্মাদনা, যা ছাড়া যেকোনো উৎসবই অসম্পূর্ণ।

সিমরান কেক তুলে প্রথমেই তার পাপাকে খাইয়ে দিল। এরপর আইয়ুব তার চতুরতা দেখাল, সে শেরাজের কানে ফিসফিস করে উইশ করার ছলে এক গাল কেক ওর গালে লেপে দিল। শেরাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাহিন আর নিহাল দুই দিক থেকে তাকে চেপে ধরল। ব্যস! শুরু হয়ে গেল কেক মাখামাখির এক মহোৎসব। শেরাজ যে এই গ্যাং-এর ‘কিং’, সেই গাম্ভীর্য তখন ধুলোয় মিশে গেছে।
​শেরাজ হাসতে হাসতে সুমুর দিকে তাকাল। সুমু আলতো করে একটু কেক ওর মুখে তুলে দিতেই শেরাজ সুযোগ বুঝে সুমুর নাকে একটু ক্রিম ঘষে দিল। সুমু নাক কুঁচকে তাকিয়ে হাসতেই শেরাজ জড়িয়ে ধরল ওকে। ওদিকে বাচ্চাদের মধ্যে যেন আনন্দের বান ডেকেছে। নিশান, রুহি আর হাসফারা একে অপরের জামায় ক্রিম মাখিয়ে একাকার। সজীব আর শাহরুখ মিলে পিয়াস আর স্যান্ডিকে কেক মাখিয়ে একদম চিনে ওঠার উপায় রাখল না।
এতো খুশির মাঝে শেরাজ খান এখন যেন একদম অন্যরকম মানুষ। সে বসে পড়তেই সিমরান আর শেরান দুই দিক থেকে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শেরাজ দুই সন্তানকে দুই বাহুতে আগলে নিয়ে ওদের পেটে সুড়সুড়ি দিতে শুরু করল। শেরাজ সিমরানের কপালে চুমু খেয়ে ওকে শূন্যে উড়িয়ে আবার লুফে নিল। বাইরে যে মানুষটা রুক্ষ আর রহস্যময়, প্রিয়জনদের কাছে সে যে কতটা কোমল আর আদুরে এক বাবা—তা দেখে সুমুর চোখে আবারো অশ্রু চলে এলো।
​একটু পরেই আসরটা কিছুটা শান্ত হলো। শাহরুখ গিটারটা এগিয়ে দিল শেরাজের দিকে। সবাই গোল হয়ে বসল। শেরাজ গিটারের তারে টুংটাং আওয়াজ তুলে টিউনিং করে নিল। আগুনের কুণ্ডলী থেকে বের হওয়া মৃদু আলো ওর জ-লাইনে ছায়া ফেলছে, ওকে দেখাচ্ছে কোনো অপার্থিব রূপকথার নায়কের মতো। ​শেরাজ তার ভারী আর গম্ভীর কণ্ঠে গেয়ে উঠল,

​“না হ্যায় ইয়ে পানা,
না খোনা হি হ্যায়!
তেরা না হোনা জানে,
কিঁউ হোনা হি হ্যায়!”
​পুরো জায়গাটা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সুমু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে। গানের প্রতিটা শব্দ যেন শেরাজ, সুমুর হৃদয়ে খোদাই করে দিচ্ছে। সুমু আনমনেই বলল,
“আমার সর্বনাশের প্রথম কারণ যদি খুঁজতে যাই, তবে নির্দ্বিধায় আঙুল তুলব তার ওই চোখের তীক্ষ্ণ চাউনির দিকে। সেই চাহনিতে কোনো মায়া ছিল না, ছিল এক অমোঘ আকর্ষণ— যা আমায় তিলে তিলে ধ্বংসের কিনারে টেনে নিয়ে গেছে। আমি জানতাম, ওই দৃষ্টির গভীরে এক শান্ত আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে, তবুও পতঙ্গের মতো আমি বারবার সেই আগুনেই ঝাঁপ দিয়েছি। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, বুঝি— আমার পতনটা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং তার ওই চোখের মায়াবী হাতছানিতেই লেখা ছিল আমার যাবতীয় ধ্বংসের উপাখ্যান।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমার সর্বনাশের প্রথম কারণ ছিল, তার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।”
​গানের মাঝপথেই শেরাজ হঠাৎ গিটারটা পাশে রেখে সুমুর দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। সুমু কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে তাকাতেই শেরাজ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে টান দিল। মিউজিক সিস্টেমে তখন বাজছে শেরাজের গাওয়া গানটা,

“​আঁখো মে আঁখে তেরি,
বাহো মে বাহে তেরি!
মেরা না মুঝমে কুছ রাহা, হুয়া ক্যায়া?
বাতো মে বাতে তেরি,
রাতে সৌগাতে তেরি!
কিঁউ তেরা সাব ইয়ে হো গয়া, হুয়া ক্যায়া?”
শেরাজ এক হাত সুমুর কোমরে রাখল, অন্য হাতে সুমুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সুমু মাথা রাখল শেরাজের বলিষ্ঠ চওড়া বুকে। তারা ধীর লয়ে ঘুরতে শুরু করল। কোনো কোরিওগ্রাফি নেই, কোনো বাহ্যিক চাকচিক্য নেই—আছে শুধু দুটি আত্মার এক অদ্ভুত ছন্দ।
​বাকিরা সবাই তখন মন্ত্রমুগ্ধ। আইয়ুব লেন্সবন্দি করল এই সুন্দর মুহূর্ত। স্যান্ডি-নাতাশা আর পিয়াস-ইফতিয়ারাও সেই রোমান্টিক আবেশে হারিয়ে গেল।
সাজেকের এই মায়াবী রাতে যেখানে শেরাজ আর সুমুর প্রেম এক মহাকাব্যের রূপ নিয়েছে, সেখানেই কটেজের এক কোণে নিঃশব্দে রচিত হচ্ছিল আরও এক মায়াবী উপাখ্যান। কটেজের কাঠের রেলিং ঘেরা বারান্দার একদম শেষ প্রান্তটা বেছে নিয়েছে সারবাজ আর ইনায়া। চারদিকের হুল্লোড় থেকে কিছুটা দূরে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে যেখানে মেঘেরা এসে থমকে দাঁড়ায়, সেখানে তারা দুজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
​সারবাজ এক দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। পাহাড়ের শীতল হাওয়ায় ইনায়ার গায়ের চাদরটা বারবার খসে পড়তে চাইছিল। সারবাজ আলতো করে চাদরটা টেনে ইনায়ার কাঁধে তুলে দিল। তার হাতের আঙুলগুলো ইনায়ার ঘাড় ছুঁয়ে যেতেই ইনায়া একবার চোখ তুলে তাকাল। সেই চোখে আছে একরাশ মুগ্ধতা আর না বলা হাজারো অভিমানী প্রেম।
​সারবাজ খুব নিচু স্বরে বলল,

“সবাই তো পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত ইনায়া, অথচ আমি অবাক হয়ে ভাবছি—এই বিশাল পাহাড়ের চেয়েও তোমার ওই গভীর চোখের মায়া কেন আমাকে এতো বেশি টানে?”
​ইনায়া একটু ম্লান হেসে উত্তর দিল,
“পাহাড় তো পাথর আর মাটির স্তূপ সারবাজ, আর মানুষের চোখ হলো আত্মার আয়না। তুমি পাথর বাদ দিয়ে আমার চোখের আয়না দেখছ, এটা তো আমার ভাগ্য।”
​সারবাজ, ইনায়ার হাত দুটো নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। তার বলিষ্ঠ হাতের উষ্ণতা ইনায়ার শরীরের কাঁপুনি এক লহমায় থামিয়ে দিল। সারবাজ বলল,
“জানো ইনায়া! মেঘেরা যেমন পাহাড়কে ছাড়া অসম্পূর্ণ, আমার এই রুক্ষ জীবনটাও তোমাকে ছাড়া ঠিক ততটাই দিশেহারা। সাজেকের এই আকাশ যেমন আজ নীলচে মায়ায় ঘেরা, আমার পুরো পৃথিবীটাও তোমার অস্তিত্বে এভাবে বিলীন হয়ে গেছে।”

ইনায়া, সারবাজের বুকের ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
“এই মায়া যেন কোনোদিন না কাটে। আমি চাই এই পাহাড় আর মেঘেরা আমাদের এই নীরব মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকুক।”
​সারবাজ, ইনায়াকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল,
“পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সবাই আকাশের চাঁদ খোঁজে, কিন্তু আমার আকাশে তো তুমিই সেই ধ্রুবতারা—যাকে দেখলে আমি নামক পথ হারানো পথিক ঠিক ঘরে ফেরার রাস্তা খুঁজে পায়।”
“আমি যদি পথ হারানো মেঘ হই, তবে আপনি কি আমার আশ্রয়স্থল সেই গভীর অরণ্য হবেন? যেখানে হারিয়ে গেলে কেউ আর ফিরে আসার পথ খুঁজবে না?”
“আমি অরণ্য হবো কি না জানি না, তবে এটুকু জানি—তোমার হাত আমি কোনদিনও ছাড়ব না।”

ইনায়া আলতো হাসল। সারবাজ আবারও বলল,
“মেঘের দেশে পাহাড়ের কিনারে, আমাদের গল্প লেখা হোক নীরবতার ভাষায়। তুমি আমার সেই গল্প, যা আমি কাউকে শোনাতে চাই না, শুধু নিজের হৃদয় দিয়ে পড়তে চাই।”
রাত যখন গভীর হচ্ছে, উৎসবের কোলাহল ছাপিয়ে আরবাজ আর ইশিতা খুঁজে নিয়েছে নিজেদের এক চিলতে নির্জন কোণ। কটেজের পেছন দিকের সিঁড়ির ধাপে বসে তারা দুজনে তাকিয়ে আছে দূর পাহাড়ের আলোগুলোর দিকে।
হঠাৎ ​আরবাজ ইশিতার হাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ইশিতা তখন পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা কুয়াশার স্তর দেখছিল। আরবাজের হাতের স্পর্শ পেতেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ​আরবাজ ধীর স্বরে বলল,

“সবাই বলে সাজেক এলে নাকি মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে। কিন্তু জানো ইশিতা? আমি এখানে এসে নিজেকে হারানোর বদলে তোমাকে আরও নতুন করে খুঁজে পেলাম।”
​ইশিতা একটু লাজুক হেসে আরবাজের কাঁধে মাথা রাখল। সে নরম গলায় বলল,
“এই যে এতগুলো বছর আমরা একসাথে, তবুও কেন আপনার প্রতিটি কথা আজও আমার কাছে প্রথম দিনের মতো নতুন মনে হয়? কেন মনে হচ্ছে সাজেকের এই মেঘেরা আমাদের জন্যই আজ এতো নিচে নেমে এসেছে?”

আরবাজ, ইশিতার মাথায় নিজের চিবুক ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কারণ ভালোবাসা যখন খাঁটি হয়, তখন সময় আর বয়সের হিসেবে তা পুরনো হয় না। এই মেঘ যেমন পাহাড়কে আজ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে, ঠিক তেমনই আমার অস্তিত্বের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে তোমার নামটা লেখা হয়ে গেছে। তোমাকে ছাড়া এই আরবাজ কেবল একটা খোলস মাত্র।”
​ইশিতা, আরবাজের হাতের ওপর নিজের অন্য হাতটা রেখে চাপ দিল। সে অনুভব করল আরবাজের হৃদস্পন্দনের সেই চিরচেনা তাল, যা তাকে সবসময় এক অদ্ভুত নিরাপত্তা দেয়। আরবাজ, ইনায়ার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“ইশিতা, মেঘের এই দেশে দাঁড়িয়ে আমি তোমাকে কোনো দামী পাথর উপহার দিতে পারব না। তবে কথা দিচ্ছি, আমার এই শক্ত হাত দুটো তোমার জন্য সারাজীবন এক অভেদ্য দেয়াল হয়ে থাকবে।”
​ইশিতা মিষ্টি করে হেসে বলল,

“আমার কোনো হিরে-জহরত লাগবে না। আমি শুধু চাই, তুমি যখন খুব ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে, তখন যেন তোমার চোখের ওই শান্ত চাউনিটা আমার জন্য বরাদ্দ থাকে।”
আরবাজ ইশিতাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল,
“দুনিয়ার সব ঝড় একদিকে, আর তোমার ওই এক চিলতে হাসি একদিকে। বিশ্বাস করো, ওই হাসিটুকুর জন্য আমি মৃত্যুকেও হাসিমুখে আলিঙ্গন করতে পারি।”
দুজনের কথার মাঝে হঠাৎ ছোট্ট রুহি ধীর পায়ে হেঁটে এসে আরবাজের প্যান্টের কোণা ধরে টান দিল। ​আরবাজ নিচু হয়ে রুহিকে কোলে তুলে নিল। রুহির পরনে লাল রঙের একটা হুডি, কুয়াশার ঠাণ্ডায় ওর নাকটা ডাঁসা লিচুর মতো লাল হয়ে আছে। সে আরবাজের গলা জড়িয়ে ধরে আধো আধো গলায় বলল,
“বাবাই, দেথো! মেঘেরা আমাতে তুঁতে আততে!”

​আরবাজ রুহির কপালে একটা গভীর চুমু খেয়ে ইশিতার দিকে তাকাল। ইশিতা তখন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার জীবনের দুই অমূল্য সম্পদের দিকে। আরবাজ, ইশিতাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। এক হাতে মেয়ে, আর অন্য হাতে প্রিয়তমা স্ত্রী—আরবাজের মনে হলো এই মুহূর্তে সে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর সম্রাট। ​ইশিতা, রুহির গাল টিপে দিয়ে বলল,
“রুহি বেটা, দেখো তো তোমার বাবাইকে কেমন দেখাচ্ছে?”
রুহি, আরবাজের দাড়িগুলো টেনে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল,
“বাবাইকে অনেত কিউট দেখাচ্ছে।”

আরবাজ হাসল। ​ইশিতা আরবাজের কাঁধে মাথা রাখল। তারা তাকিয়ে রইল দূরের আকাশের চাঁদের দিকে।
সাজেকের আকাশে যখন রুপালি চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে, তখন কটেজের খোলা বারান্দায় এক কোণে বসে ছিল নয়ন আর মাইশা। তাদের মাঝখানে বসে আছে তাদের একমাত্র সন্তান, চঞ্চল আর ভীষণ মিশুক ছেলে নাহিয়ান। তাদের সংসারটা যেন এক সুতোয় গাঁথা একগুচ্ছ রঙিন পালক—যেখানে শাসন আছে, খুনসুটি আছে আর আছে পাহাড় সমান ভরসা।
​নয়ন তার ক্যামেরাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল দূর পাহাড়ের নাইট-শট নিতে। মাইশা পাশ থেকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“সারা জীবন তো এই লেন্সের ভেতরেই পৃথিবী দেখলে নয়ন! কখনো কি এই রক্ত-মাংসের মানুষটার দিকে লেন্স ছাড়া তাকাবে না?”
​নয়ন ক্যামেরাটা সরিয়ে হাসল। সে মাইশার কাঁধে হাত রেখে টেনে নিজের কাছে আনলো। তারপর নিচে বসে থাকা নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মাইশা! লেন্স দিয়ে যা দেখি তা হলো দৃশ্য, আর চোখ দিয়ে এখন যা দেখছি তা হলো আমাদের পূর্ণতায় ভরা জীবন। আর এই যে আমাদের নাহিয়ান—ও হলো সেই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ফ্রেম।”
​নহিয়ান তখন খুব মন দিয়ে বাবার মোবাইলে গেম খেলছিল। বাবার কথা শুনে সে মুখ তুলে বলল,
“পাপা, মাম্মা কি আবার ঝগড়া করছে তোমার সাথে? চিন্তা করো না, আমি বড় হয়ে মাম্মাকে পুলিশে দিয়ে দেব।”
​নাহিয়ানের কথা শুনে নয়ন আর মাইশা দুজনেই হেসে উঠল। মাইশা নাহিয়ানকে টেনে নিজের কোলে নিয়ে ওর কপালে একটা চুমু খেল। সে নয়নের দিকে তাকিয়ে মায়াবী স্বরে বলল,
“জানো নয়ন, নাহিয়ান ঠিক তোমার মতো হয়েছে। সেই একই রকম জেদ আর একই রকম মায়াবী কথা। মাঝে মাঝে ভয় হয়, ও বড় হয়ে তোমার মতো আমাকেও না আবার কথায় কথায় হার মানিয়ে দেয়। দেখো না, একদম বাপ কা বেটা। সবসময় বাবার সাপোর্ট নিয়ে কথা বলে।

নয়ন হেসে দিয়ে ছেলের সঙ্গে দুষ্টুমি করতে লাগল। তাদের দুজনের পাগলামী দেখে মাইশাও হেসে উঠল। চারপাশে তাদের এই প্রাণ জুড়ানো হাসি প্রতিধ্বনি হতে লাগল।
সাজেকের রাতটা তখন রূপকথার মতো মায়াবী। কুয়াশা আর মেঘের চাদর ফুঁড়ে থেকে থেকে জোনাকির মতো জ্বলছে কটেজের আলোগুলি। শাহরুখ আর ফারিয়া কটেজের এক কোণে ছোট একটা কাঠের ডিভানে বসে ছিল। তাদের মাঝখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে তাদের আদরের মেয়ে, ছোট্ট আহিয়া। শাহরুখের শান্ত স্বভাব আর ফারিয়ার চনমনে স্বভাবের মাঝে আহিয়া যেন এক জীবন্ত প্রাণভোমরা।

শাহরুখ ফারিয়ার চাদরটা টেনে দিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। ফারিয়া তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দূর পাহাড়ের পাদদেশে জ্বলা ছোট ছোট আলোগুলো দেখছিল। শাহরুখ নিচু স্বরে বলল,
“সবাই বলে সাজেক এলে নাকি মানুষ সব ভুলে যায়। অথচ আমি এখানে এসে বারবার ভাবছি—তোমাদের ছাড়া আমার অস্তিত্বটা কতটা অর্থহীন। ফারিয়া! এই পাহাড়ের বিশালতা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমার পৃথিবীটা আসলে অনেক ছোট, যা শুরু হয় তোমাতে আর শেষ হয় আহিয়াতে।”
​ফারিয়া আলতো করে মাথা রাখল শাহরুখের কাঁধে। আহিয়া তখন বাবার পাঞ্জাবির বোতাম নিয়ে খেলছিল। ফারিয়া মিটিমিটি হেসে বলল,
“মাঝে মাঝে ভাবি, এই মানুষটা এতো গম্ভীর থাকে কী করে? কিন্তু যখন দেখি আহিয়ার সামনে তুমি একদম গলে জল হয়ে যাও, তখন আমার সব অভিযোগ মেঘের মতো উড়ে যায়। তুমি আমাদের জন্য যে পাহাড়ের মতো ছায়া হয়ে আছো, এটাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া।”

আহিয়া হুট করে মুখ তুলে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল,
“মাম্মা তুমি তিন্তু এতদম পাপার সাথে ঝগনা তলবে না। আমি তিন্তু পাপান দনে।”
​শাহরুখ হেসে আহিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে ওর নাকে নিজের নাক ঘষল। সে ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখেছ? আমার মেয়ে কিন্তু তোমাকে একদম ঠিক চিনেছে।”
​ফারিয়া নিজের রাগ সামলে বলল,
“আমি যদি মরে যাই, তাহলে তুমি কী করবে?”
শাহরুখ গম্ভীর মুখে বলল,
“বিশ্বাস করো ফারিয়া, আমিও তোমার সাথে মরে যাব!”
ফারিয়া আবেগপ্লুত হয়ে বলল,
“ওহ জান! তুমি আমাকে সত্যিই এতো ভালোবাসো?”
শাহরুখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ধুর পাগলী! এতো বড় খুশির খবর কি আর আমি সইতে পারব? আমি তো খুশিতে আমি হার্ট অ্যাটাক করে মরে যাব!”

ফারিয়া রেগে গিয়ে অন‍্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। শাহরুখ তার রাগ বুঝতে পেরে আলতো হাসল। একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে অন‍্যহাতে আবারও ফারিয়াকে কাছে টেনে এলে নিজের সাথে মিশিয়ে রাখল।
সাজেকের রাত যত গভীর হচ্ছে, চারপাশের কুয়াশা যেন তত বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। কটেজের কাঠের ডেক-এ একটি আরামকেদারায় বসে ছিল রিফাত আর অজান্তা। তাদের পায়ের কাছে বসে ছোট একটা ড্রোন নিয়ে কারিকুরি করছে তাদের ছেলে আয়াস। ​রিফাত, অজান্তার চুলে আলতো করে হাত রেখে পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা মেঘের স্তূপ দেখাচ্ছিল। অজান্তা, রিফাতের কাঁধে মাথা রেখে খুব নিচু স্বরে বলল,
“রিফাত, মানুষ কেন এত দূরে আসে জানো? এই এক টুকরো শান্তির জন্য। কিন্তু আমার শান্তি তো এই সাজেকে নেই, আমার শান্তি সবসময় তোমাদের সাথে থাকে।”
​রিফাত মৃদু হেসে অজান্তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সে শান্ত গলায় বলল,
“শান্তি তো জায়গাতে থাকে না অজান্তা, শান্তি থাকে মানুষের সাথে। আমি এই ভিড়ের মাঝেও যখন তোমার দিকে তাকাই, মনে হয় আমার চারপাশের সব কোলাহল থেমে গেছে। আর এই যে আয়াস—ও আমাদের সেই শান্তিরই এক জীবন্ত প্রতিধ্বনি।”

আয়াস তার ড্রোনটা ওড়ানোর চেষ্টা করতে করতে মুখ তুলে বলল,
“পাপা, আমি যদি এই ড্রোনটা সিমরানকে দেই, তবে কি ও আমার সাথে বন্ধুত্ব করবে?”
রিফাত আর অজান্তা দুজনেই হেসে উঠল আয়াসের কথা শুনে। অজান্তা, আয়াসকে কাছে টেনে নিয়ে ওর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“আয়াস সোনা! বন্ধুত্ব বিশ্বাস থেকে হয়, আর ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে সারাজীবন আগলে রাখা যায়। তোমার পাপা যেমন আমাদের রাখে। সিমরানের বন্ধু হতে গেলে আগে ওর মন জয় করো, ওর বিশ্বাস অর্জন করো।”
কটেজের এক কোণে নীল আর সোনালি আলোর মিটিমিটি আভার নিচে বসে ছিল সামিয়া আর রাহিন। তাদের মাঝখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে তাদের কলিজার টুকরো, ছোট্ট হাফসা। রাহিনের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব আর সামিয়ার স্নিগ্ধ মমতার মাঝে হাফসা যেন এক চিলতে পবিত্র পূর্ণতা।
​রাহিন তার চওড়া বাহু দিয়ে সামিয়াকে আগলে ধরে ছিল। সামিয়া হাফসার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। রাহিন পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে আসা হিমেল হাওয়ার দিকে তাকিয়ে গভীর স্বরে বলল,

“জানো সামু, এই পাঁচ বছরে পৃথিবীটা অনেক বদলে গেছে। কিন্তু সাজেকের এই পাহাড়ের মতো তোমার প্রতি আমার এই নির্ভরতাটা একদম অটল রয়ে গেছে। যখনই তোমাদের এই মুখ দুটো দেখি, মনে হয় দুনিয়ার সব লড়াই লড়ার শক্তি আমি পেয়ে গেছি।”
​সামিয়া, রাহিনের কাঁধে মাথা রেখে ম্লান হেসে বলল,
“সবাই হয়তো রাজপ্রাসাদ খোঁজে, কিন্তু আমার রাজপ্রাসাদ তো আপনার এই বাহুডোরেই বন্দি। আপনি আর হাফসা পাশে থাকলে আমার মনে হয় আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী।”
​হাফসা তখন তার ছোট্ট পুতুলটা নিয়ে খেলছিল। বাবার কথা শুনে সে আধো আধো গলায় বলে উঠল,
“পাপা! দেথো, মেঘেরা তেমন উনে বেনাচ্ছে! চনো আমলা মেঘ ধনি।”
​রাহিন হাফসাকে কোলে তুলে নিয়ে ওর লাল হয়ে থাকা গালে একটা গভীর চুমু খেল। সে হাসিমুখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মাম্মাম এখন মেঘ ধরলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। আমরা কাল মেঘ ধরব।”
হাফসা বাবার কথা শুনে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বাবার কাঁধে মাথা রাখল। ​রাহিন, সামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই মেঘের রাজ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে সময়টা যদি এখানেই থমকে যেত! তুমি, আমি আর আমাদের এই ছোট্ট হাফসা—ব্যস, আমার পৃথিবীটা তো এখানেই পূর্ণ।”
​সামিয়া আলতো হেসে বলল,
“কিন্তু সময় তো থমকাবে না, মিস্টার।”

হাফসা আবারও বলে উঠল,
“পাপা! তুমি আল মাম্মা তুধু দল্পই তলবে? চনো না আমলা মেঘেন দেশে দিয়ে নুকোচুনি থেলি!”
​রাহিন আর সামিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল। দুজনেই একসাথে মেয়ের গালে চুমু খেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল।
সাজেকের রাত তখন মাঝগগনে। উৎসবের হুল্লোড় কিছুটা কমে আসলেও আইয়ুবের আড্ডার মেজাজ তখনও তুঙ্গে। তবে কটেজের বারান্দার এক কোণে আসতেই আইয়ুবের সেই চঞ্চল রূপটা যেন মুহূর্তেই পাল্টে গেল। সেখানে একটি মোড়ায় বসে ছিল নাজমিন, আর তার কোলের কাছে মাথা রেখে বসে আকাশ দেখছিল তাদের ছেলে নিশান।
​আইয়ুব ক্যামেরাটা একপাশে রেখে নাজমিনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। নাজমিনের কাঁধে আলতো করে হাত রাখতেই নাজমিন একটু চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। ​আইয়ুব নিচু স্বরে বলল,
“সারাদিন তো সবাইকে লেন্সবন্দি করলাম ব্রাউন গার্ল, কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ল্যান্ডস্কেপটা তো এই কোণেই বসে আছে।”
​নাজমিন ম্লান হেসে আইয়ুবের হাতটা নিজের হাতের ওপর রাখল। সে নরম গলায় বলল,

“সারাক্ষণ তো ক্যামেরা আর বন্ধুদের নিয়ে মেতে থাকেন, এখন হঠাৎ এই কাব্যি কোত্থেকে এলো? নিশান দেখছে তো এসব!”
​নিশান তখন আকাশের এক কোণে মিটমিট করা একটা তারা দেখছিল। বাবার কথা শুনে সে মুখ তুলে চটপটে গলায় বলল,
“পাপা, তুমি মাম্মাকে পতাচ্ছ তেন? তুমি তি মাম্মার আইতত্রিম থেয়ে ফেনেছ? তাই এথন মাম্মার বতা থাওয়ার ভয়ে মাম্মাতে পতাচ্ছ?”
​আইয়ুব হো হো করে হেসে নিশানকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। নিশানের চিবুক ধরে বলল,
“তোমার মাম্মা হলো এই কটেজের সিবিআই। তাকে পটিয়ে রাখা ছাড়া তো তোমার পাপার উপায় নেই। তোমার মাম্মা অলওয়েজ এটোম বোমা হয়ে থাকে। এই বোমাটা যেন যখন তখন না ফাটে, তাই একটু তেল মারছি আর কি।”
​নাজমিন মুগ্ধ চোখে আইয়ুবের এই রূপটা দেখছিল, আজ আর ঝগড়া করতে ইচ্ছা করল না তার। এই মানুষটা বাইরে যতটা হাসি-খুশি আর চঞ্চল, ভেতরে সে তার পরিবার নিয়ে ঠিক ততটাই আবেগপ্রবণ। নাজমিন উঠে দাঁড়িয়ে আইয়ুবের বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,

“এই পাগলামিগুলো আছে বলেই আমাদের সংসারটা এমন প্রাণবন্ত মিস্টার। নিশান যেন আপনার মতো এমন বড় মনটা পায়, এই দোয়াই করি।”
​আইয়ুব একহাতে নাজমিনকে ধরে বলল,
“লেন্স দিয়ে আমি হাজারো দৃশ্য দেখি, কিন্তু দিনশেষে আমার সব ফোকাস তো তোমার ওই মায়াবী চোখের ওপরেই এসে স্থির হয়।”
নিশান তার মাম্মা-পাপার দিকে ড‍্যাবড‍্যাব করে তাকিয়ে রইল। ছেলেকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাজমিন আইয়ুবকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
কুয়াশা যেন নিবিড় হয়ে জড়িয়ে ধরছে পাহাড়কে। কটেজ থেকে একটু দূরে, যেখানে হিমেল বাতাসের ঝাপটা সরাসরি এসে লাগে, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এই টিমের সবচেয়ে নবীন এবং মিষ্টি দম্পতি— স্যান্ডি আর নাতাশা।
​স্যান্ডি তার জ্যাকেটটা খুলে নাতাশার কাঁধের ওপর জড়িয়ে দিল। নাতাশা শীতে কিছুটা কুঁকড়ে ছিল, স্যান্ডির হাতের উষ্ণতা পেতেই সে আলতো করে স্যান্ডির বাহু জড়িয়ে ধরল। চারপাশের হইহুল্লোড় থেকে দূরে এই নির্জনতায় তারা দুজনে যেন এক ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা।

স্যান্ডি, নাতাশার কপালে আলতো করে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“জানো নাতাশা, আজ তোমাকে পাশে নিয়ে এই মেঘগুলোর দিকে তাকালে মনে হচ্ছে—আমার সারা জীবনের সব অপেক্ষার ফল আমি এক নিমেষে পেয়ে গেছি।”
​নাতাশা লাজুক হেসে স্যান্ডির বুকের ওপর হাত রাখল। সে মায়াবী স্বরে বলল,
“সবাই বলে নিউ কাপলদের প্রেম নাকি খুব অল্প সময়ের জন্য রঙিন থাকে। কিন্তু স‍্যার, আপনি কি পারবেন আমাদের এই রঙগুলো পাহাড়ের এই নীলচে কুয়াশার মতো সারাজীবন ধরে রাখতে?”
​স্যান্ডি নাতাশার হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে একটা আলতো চুমু খেল। তার চোখের ভাষায় তখন একনিষ্ঠ অঙ্গীকার। সে ধীর স্বরে বলল,

“পাহাড় যেমন হাজার বছর ধরে তার গাম্ভীর্য হারায় না, তোমার প্রতি আমার এই মুগ্ধতাও কোনোদিন কমবে না।”
​কটেজের কাঠের ঝুলন্ত বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এই টিমের আরেক নতুন দম্পতি— পিয়াস আর ইফতিয়া। তাদের বিয়ের রেশও এখনো কাটেনি। ইফতিয়ার হাতে লেগে থাকা মেহেদির রঙ যেন সাজেকের এই হালকা কুয়াশায় আরও গাঢ় দেখাচ্ছে। পিয়াস সবসময় একটু শান্ত আর গোছানো, আর ইফতিয়া তার ঠিক উল্টো— চঞ্চল আর ভীষণ আবেগি।
​পাহাড়ি ঠাণ্ডা বাতাস ইফতিয়ার শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছিল। পিয়াস পেছন থেকে এসে ইফতিয়ার দুই কাঁধে হাত রাখল। ইফতিয়া একটু শিউরে উঠে পিয়াসের দিকে তাকাতেই পিয়াস তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। সে ইফতিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“সবাই সাজেক আসে মেঘ ধরতে, আর আমি সাজেক এসেছি আমার জীবনের মেঘবতীকে নিয়ে। ইফতিয়া, এই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে কেন জানি মনে হচ্ছে, তোমাকে পাওয়ার পর আমার আর কোনো আকাশ ছোঁয়ার শখ নেই। আমার আকাশ যেন এখন তোমার ওই দুচোখেই সীমাবদ্ধ।”

ইফতিয়া, পিয়াসের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে একটু আড়চোখে তাকাল। মায়াবী হেসে সে বলল,
“বিয়ের আগে যখন একবার আপনার সাথে ঘুরতে পাহাড়ে আসার কথা হয়েছিল, আপনি বলেছিলেন—পাহাড় নাকি মানুষকে একা থাকতে শেখায়। আজ এই ট্রিপে এসে কী মনে হচ্ছে? এখনো কি একা থাকতে ইচ্ছে করছে?”
​পিয়াস, ইফতিয়ার চিবুক ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে গভীর স্বরে বলল,
“ভুল বলতাম! পাহাড় একা থাকতে শেখায় না, পাহাড় শেখায় একজনকে আগলে ধরে কীভাবে পুরো দুনিয়া ভুলে যাওয়া যায়।”
​ইফতিয়া পিয়াসের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজল। তার মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেছে, শুধু পিয়াসের হৃদপিণ্ডের ধকধক শব্দটাই তার কানে বাজছে।
​সাজেকের রাত গভীর আবেশে আচ্ছন্ন। একদিকে যুগলদের প্রেমে মাখামাখি মুহূর্ত, আর অন্যদিকে কটেজের মাঝখানের খোলা চত্বরে জ্বলছে বিশাল এক আগুনের কুণ্ডলী। সেই আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে একঝাঁক ‘চিরকুমার’ বা আপাতত ‘একাকী’ যোদ্ধারা—নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রিসান, শাহরুখ, আশিক আর সজীব।

তাদের সামনে সাজানো ধোঁয়া ওঠা কফি আর ঝলসানো মুরগি, কিন্তু চারপাশের রোমান্টিক আবহে সেই খাবারেও যেন নোনতা বিষাদ মিশে আছে। হঠাৎ ​নিহাল কফিতে একটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর পাশেই বসা সাইফের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দোস্ত, এদের রোমান্স দ‍েখে আমার মনে হচ্ছে, পাহাড়ের এই চূড়া থেকে এখনই একটা লাভ ডাইভ দেই। আমাদের কি কোনোদিন কোনো গার্লফ্রেন্ড বা বউ জুটবে না রে?”
​সাইফ আগুনের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“তোর তো তাও ড্রিম গার্ল আছে, আমার তো শালার কপালে নীল-সাদা মেঘ ছাড়া আর কেউ নেই। ডানে তাকালে পিয়াস-ইফতিয়া, বামে তাকালে আরবাজ-ইশিতা। আমরা কি এখানে শুধু ওদের ল্যান্ডস্কেপ হওয়ার জন্য এসেছি?”
​অমিত আর রিয়াদ তখন আগুনের তাপে হাত সেঁকছিল। অমিত হঠাৎ বলল উঠল,
“এইসব বড়লোকি ব‍্যাপার-স‍্যাপার! গরীবের আবার বউ-গার্লফ্রেন্ড, মেয়ে মানুষ দেখিতে পাই এইটাও অনেক।
​সকলের রোমান্টিক দৃশ্য দেখে শাহরুখ একটু বেশিই ইমোশনাল হয়ে পড়ল। সে গম্ভীর মুখে বলল,
“নামে শাহরুখ হলে কী হবে, আমার জীবনে তো কোনো কাজলের এন্ট্রি হলো না। সবাই কাপল ড্যান্স করছে, আর আমরা এখানে আগুনের ছাই দেখছি।”
​ওদিকে ফাহিম আর রিসান মিলে নিজেদের কপাল চাপড়াচ্ছে। রিসান বলল,

“রিসান নামের মানে নাকি ‘সুন্দর ও দয়ালু’। কিন্তু বিধাতা কি আমার প্রতি একটুও দয়া দেখাবে না? একটা গার্লফ্রেন্ড থাকলে এখন অন্তত এই ঠাণ্ডায় কারো হাত ধরে বলতে পারতাম, ‘মেঘেরা তোমার মতোই সুন্দর’।”
​আশিক একটু বেশিই ছটফটে। সে সজীবের পাঞ্জাবি টেনে ধরে বলল,
“ভাইয়া, তুমি তো সবসময় বলতে সিঙ্গেল লাইফ ইজ দ্য বেস্ট লাইফ। এখন দেখো! তোমার ছোটভাই শাহরুখও বউ নিয়ে আদিখ্যেতা করছে, আর তুমি এখানে মুরগির লেগ পিস চিবোচ্ছ। আমাদের কি কোনো সম্মান নেই? তুমি বিয়ে করোনা কেন? তুমি বিয়ে করলে তো আমার লাইনটা ক্লিয়ার হয়ে যায়।”
​সজীব এক টুকরো মুরগি চিবোতে চিবোতে উদাস গলায় বলল,
“শান্ত হ আশিক! আমাদের ভালোবাসা হলো ওই কুয়াশার মতো—সবাই দেখে, কিন্তু কেউ পায় না। আমরা হলাম সাজেকের সেই অভিশপ্ত পাথর, যার ওপর দিয়ে সবাই রোমান্স করে চলে যায়, কিন্তু কেউ ঘরে নিয়ে যায় না। তাহলে বিয়ে কীভাবে করব, বল?”
​নিহাল হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
“হে সাজেকের পাহাড়! আমাদের আর্তনাদ শোনো! পরবর্তী সাজেক ট্রিপে যেন আমাদের পাশেও একটা করে হাত থাকে, যে হাত ধরে আমরাও বলতে পারি— ‘হুয়া ক্যায়া’!”

পুরো কটেজ কাঁপিয়ে, শেরাজ-আইয়ুবদের রোমান্টিকতায় জল ঢেলে দিয়ে তারা সমস্বরে গেয়ে উঠল,
​“এ মনের সেল ফোনে চার্জার কেন জোটে না?
বেকার বলে কি কোনো গার্লফ্রেন্ড আজও পটে না!”
​সাইফ আর অমিত একে অপরের কাঁধে হাত রাখল। তাদের গলার স্বরে এক বুক হাহাকার আর এক চিলতে দুষ্টুমি মেশানো। তারা শেরাজের দিকে আঙুল উঁচিয়ে সুর তুলল,
​“বাইকের ব্যাকসিটে… আলতো ছোঁয়া পিঠে,
কেন রং রুটে প্রেম জোটে না?”
​গানের এই পর্যায়ে এসে শাহরুখ আর রিসান অভিনয় করে কপাল চাপড়াতে লাগল। ফাহিম আর রিয়াদ তখন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে, আবার পরক্ষণেই নিজেদের একাকিত্বের কথা ভেবে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। গানের শেষ কলিটা যখন তারা গাইল, তখন মনে হলো সাজেকের পাহাড়ের প্রতিটা কোণ থেকে তাদের এই আর্তনাদ প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে,

“মামু এভাবেই কাটবে কি তবে..?
​ওদের হয়েছে কবে… আমাদেরও হবে?”
​গান শেষ হতেই পুরো চত্বরে হাসির রোল পড়ে গেল। আইয়ুব দূর থেকে ক্যামেরা তাক করে বলল,
“দোস্ত তোদের এই হাহাকারের ভিডিও যদি ইউটিউবে দেই, ভিউ দেখে তোরা কোটিপতি হয়ে যাবি, তখন আর গার্লফ্রেন্ডের অভাব হবে না।”
অমিত আগুনের পাশ থেকে তেড়ে গিয়ে বলল,
“রাখ তোর ভিডিও! তোরা যখন ভাবিদের হাত ধরে মেঘ দেখিস, তখন আমাদের মনে হয় পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে শহীদ হয়ে যাই।”

শেরাজ এতক্ষণ সুমুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ওদের পাগলামি দেখছিল। সে একটু এগিয়ে এসে গম্ভীরভাবে বলল,
“চিন্তা করিস না তোরা, তোদের জন্য সাজেকের মেঘেদের কাছে আমি সুপারিশ করে দেব।”
​সিঙ্গেলরা সবাই মিলে এবার শেরাজকে ঘিরে ধরল। নিহাল বলল,
“ভাই! শুধু সুপারিশে হবে না, আমাদের জন্য আলাদা করে একটা ‘সিঙ্গেল স্পেশাল’ ট্রিট দিতে হবে। নাহলে তোদের আর কোনো রোমান্স আমরা করতে দিব না।”
এই ‘চিরকুমার’ দলের হাহাকার দেখে এবার ময়দানে নামল ফিরোজা, রিয়াজ, তিশা, রাইফ, রাইশা আর ফারিন। তাদের ধারালো কথা আর হাসাহাসি যেন সিঙ্গেলদের ক্ষতস্থানে নুনের ছিটা দিতে শুরু করল। ​সবচেয়ে আগে মুখ খুলল ফিরোজা। সে সাজেকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“শোনো ভাইয়ারা, তোমাদের ফোনের চার্জার জুটবে কী করে? তোমাদের ব্যাটারিই তো ড্যামেজ হয়ে গেছে! সারাদিন গেম আর আড্ডা দিলে কি আর গার্লফ্রেন্ড জোটে?”
​তার কথার পিঠে রিয়াজ ফোড়ন কেটে বলল,

“একদম ঠিক বলেছিস, ফিরোজা! এরা হলো সাজেকের সেই প্রাচীন পাথর, যাদের ওপর দিয়ে পর্যটকরা হেঁটে যায় কিন্তু কেউ ফিরেও তাকায় না। তোমাদের ‘রং রুটে’ প্রেম জোটার কোনো চান্সই নেই, কারণ তোমাদের রুটটাই তো ভাঙাচোরা।”
​তিশা হেসে বলল,
“আরে ভাইয়েরা আমার, মেয়ে পটাতে হলে আগে বিবাহিত ভাইয়াদের মতো একটু জেন্টল হতে হবে, রোমান্টিক হতে হবে।”
রাইশা ভ্রু কুঁচকে অমিত আর ফাহিমকে বলল,
“তোমরা যখন ‘ওদের হয়েছে কবে, আমাদেরও হবে’ বলে গানটা গাইলে, তখন মনে হলো সাজেকের মেঘেরাও তোমাদের দুঃখে নিচে নেমে আসছে। চু চ‍্যাড ব‍্যাপার-স‍্যাপার।”
​ফারিন, আশিককে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আশিক ভাইয়া, তোমার তো বাইকই নেই, ব্যাকসিটের চিন্তা করে কী লাভ? তুমি বরং সাইকেলে করে গিয়ে কোনো মেয়েকে পটানো চেষ্টা করো। যদিও মেয়ে পটানো তোমার কর্ম নয়। তোমার ওই বাঁদরের মতো মুখ দেখলে যেকোনো মেয়ে এমনিতেই ভয়ে পালিয়ে যাবে।”

রাইফ গম্ভীর মুখে সিঙ্গেলদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমাদের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে। তোমাদের গানটা হিট হতে পারে, কিন্তু তোমাদের লাইফটা তো ‘ফ্লপ’ হয়ে গেল। তোমরা বরং কফি খাও আর বড় ভাইদের রোমান্স দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলো।”
​ফিরোজা হেসে বলল,
“চাঁদ যেমন একা, তোমরাও তেমন একা। তফাৎ শুধু একটাই— চাঁদকে সবাই দ‍্যাখে, আর তোমাদের দেখলে সবাই পাশ কাটিয়ে চলে যায়!”
​রিয়াজও তাল দিয়ে বলল,
“আরে বাদ দাও তো তোমাদের ওই হাহাকার। তোমাদের যা চেহারা, তোমাদের সেল ফোনের চার্জার তো দূর, পাওয়ার ব্যাংকও তোমাদের সাথে কানেক্ট হবে না।”
​ফারিন হেসে বলল,
“গান গেয়ে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। কাল সকালে যখন কাপলরা সানরাইজ দেখবে, তোমরা তখন কম্বল মুড়ি দিয়ে নাক ডেকে ঘুমিও, এটাই তোমাদের নিয়তি।”
তিশাও আবার ওদের সাথে তাল মেলালো,
“প্রেম দেখে হাহাকার করা ছাড়া যাদের আর কোনো কাজ নেই, তাদের জন্য এক বালতি সমবেদনা। আমাদের আড্ডার প্রাণ তো এই সিঙ্গেলরা!”

রাইশা, তিশাকে চোখ মেরে বলল,
“গল্পে যেমন ভিলেন লাগে, আড্ডায় তেমন সিঙ্গেল লাগে।”
সিঙ্গেলরা সকলে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। বিবাহিত পুরুষেরা সকলে একসাথে চেঁচিয়ে বলল,
“সিঙ্গেলদের আর্তনাদে যখন সাজেকের আকাশ ভারী হয়, তখন আমাদের কাজ হলো তাদের একটু বাস্তবতা মনে করিয়ে, যে বেচারার দলেরা আসলেই সিঙ্গেল। তাদের বউও নেই, গার্লফ্রেন্ডও নেই। আসলে তাদের কপালে মেয়ে-ই জুটে না। কোনো মেয়ে তাদের দিকে তাকায় না।”

সাজেকের নিস্তব্ধতা তখন আরও প্রগাঢ় হয়েছে। কটেজের বাইরের আগুনের কুণ্ডলী এখন কেবল কিছু ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা ছাই, আর পাহাড়ি বাতাসে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে সুর ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ক্লান্ত শরীর আর বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে শেরাজ যখন নিজের রুমের দরজায় হাত রাখল, তখনও তার মাথায় ঘুরছে আজকের কাটানো সেই ম্যাজিক্যাল মুহূর্তগুলো।
​কিন্তু দরজাটা খোলার সাথে সাথেই শেরাজের বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। রুমে পা রাখতেই নাকে এলো এক তীব্র অথচ স্নিগ্ধ বুনো কামিনীর সুবাস। অন্ধকার ঘরটা আজ ইলেকট্রিক আলোয় নয়, বরং কয়েক ডজন মাটির প্রদীপের মৃদু শিখায় আলোকিত। পুরো খাটের ওপর সাদা আর লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে এক নিপুণ কারুকাজ করা হয়েছে। জানালার ভারী পর্দাগুলো হালকা বাতাসে দুলছে, সেখান দিয়ে সাজেকের রুপালি চাঁদ আর কুয়াশার ধোঁয়াটে চাদরটা ঘরের ভেতর উঁকি দিচ্ছে। বারান্দার কাছের কোণটায় ধূপের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠছে।
​শেরাজ দরজায় হাত দিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে হাতে একটা জ্বলন্ত প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ— সুমু। কিছুক্ষণ আগের সেই নীল শাড়িটা এখন অতীত। সুমুর পরনে এখন পাতলা লাল রঙের সিল্কের শাড়ি। প্রদীপের আলো যখন সেই শাড়ির লাল আভায় প্রতিফলিত হচ্ছে, সুমুকে দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়ের বুকে ফুটে থাকা কোনো রক্তগোলাপ। শাড়ির আঁচলটা অবাধ্য হয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে আছে, আর তার খোলা চুলের সুবাস জানান দিচ্ছে সে এই বিশেষ মুহূর্তের জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করেছে।

শেরাজ নিজে আজ শুভ্রতায় মোড়ানো। সাদা শার্টের হাতা দুটো কিছুটা গুটানো, পরনে সাদা প্যান্ট আর পায়ে সেই সাদা স্নিকার্স। এই সাদা আর লাল—দুজনের এই বৈপরীত্য যেন এক পূর্ণতা খুঁজে পেল এই নিঝুম ঘরে। শেরাজ ধীর পায়ে সুমুর কাছে এগিয়ে গেল। সুমুর চোখের ভাষায় একরাশ গভীর ভালোবাসা। শেরাজ সুমুর একদম কাছে এসে ওর কোমরে হাত রেখে কাছে টেনে নিল। সুমুর তপ্ত নিঃশ্বাস শেরাজের সাদা শার্টের ওপর দিয়ে ওর বুকে গিয়ে লাগল। শেরাজ খুব গভীর আর নিচু স্বরে বলল,
“আমি তো ভেবেছিলাম আজকের সারপ্রাইজগুলো বাইরেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তুমি যে নিজের ভেতর আরও বড় এক মায়াজাল বুনে রেখেছ, তা তো ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি।”
​সুমু প্রদীপটা সরিয়ে রেখে শেরাজের শার্টের কলারটা আলতো করে ঠিক করতে করতে লাজুক স্বরে বলল,
“রাজত্বের রাজা আপনি হতে পারেন খান সাহেব, কিন্তু ঘরের সীমানায় আমি সেই সাম্রাজ্ঞী যে আপনাকে বন্দি করতে জানে।”
​শেরাজ সুমুর কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। প্রদীপের শিখার মতো ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। সে বলল,
“এই যে তুমি আজ রক্তলাল শাড়িতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, মনে হচ্ছে সাজেকের সব সৌন্দর্য আজ তোমার এই এক চিলতে হাসির কাছে ম্লান।”
​সুমু শেরাজের বুকে মুখ লুকাল। শেরাজ তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ​রুমের মাঝখানে থাকা ছোট কাঠের টেবিলটির ওপর রাখা একটি ছোট্ট, নিখাদ সাদা ভ্যানিলা কেক। কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো মোমবাতির আস্ফালন নেই—শুধু কেকের ওপর ক্রিম দিয়ে লেখা একটি ছোট্ট শব্দ: “মাইন”।

শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। সুমু আলতো করে শেরাজের হাতটা ধরল। সে ড্রয়ার থেকে একটি ছোট ছুরি বের করে শেরাজের হাতের মুঠোয় দিল। তারপর নিজের হাতটা রাখল শেরাজের হাতের ওপর।
​“বাইরে তো সবাই ছিল খান সাহেব,” সুমু খুব নিচু স্বরে বলল, “কিন্তু এই কেকটা আমার সেই মানুষটার জন্য, যাকে দুনিয়া চেনে না—যাকে শুধু আমি চিনি।”
​দুজনে মিলে ধীরলয়ে কেকটা কাটল। শেরাজ ছোট এক টুকরো কেক সুমুর মুখে তুলে দিতেই সুমু সেটা খেয়ে নিয়ে শেরাজের আঙুলে আলতো করে কামড় দিল। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে হাসল, তারপর সুমু এক টুকরো কেক নিয়ে শেরাজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিল।
​শেরাজ কেকটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রেখে সুমুকে দুই হাতে নিজের কাছে টেনে নিল। সুমুর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে ওর চোখের গভীরে তাকিয়ে বলল,
“এই যে ‘মাইন’ লেখাটা দেখলে, এটা কি কেবল কেকের ওপরের কোনো শব্দ? নাকি অন্য কোনো দাবি?”
​সুমু শেরাজের চুলে আঙুল বুলিয়ে বলল,
“এটা দাবি নয় খান সাহেব, এটা আমার অস্তিত্বের স্বীকারোক্তি। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি হয়তো কিং, কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতরে আপনি কেবলই আমার সেই আশ্রয়, যেখানে আমি নিঃশঙ্ক।”

শেরাজ তার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো। সুমু চোখ বুজে সেই স্পর্শটা অনুভব করল। শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“সাদা শার্টের এই শুভ্রতা যেমন আজ তোমার লালে মিশে যাচ্ছে, আমার জীবনটাও ঠিক এভাবেই তোমাতে বিলীন হয়ে গেছে। এই কেক কাটা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয় সুমু, এটা আমাদের একসাথে হাজারো বছর বেঁচে থাকার অঙ্গীকার।”
​সুমু ওর বুকে মাথা রেখে শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে খেলতে বলল,
“সবাই আপনাকে ভয় পায়, সবাই আপনাকে সমীহ করে। কিন্তু আমি এই মুহূর্তে আপনার ওই দ্রুত চলা হৃদস্পন্দনটা শুনতে পাচ্ছি। এই মানুষটাকে আমি কোনোদিন কারো সাথে ভাগ করব না।”
শেরাজ তাকে জানালার পাশের কাঠের ডিভানে বসিয়ে নিজে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সুমুর লাল শাড়ির আঁচলটা মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে, আর শেরাজের সাদা শার্টের হাতা গোটানো বলিষ্ঠ বাহু দুটো সুমুর দুপাশে স্থির। সুমু শেরাজের চোখের গভীরে তাকিয়ে এক মায়াবী হাসি দিল। শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে বেডের কাছে যেতেই সুমু দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে খুব নিচু কণ্ঠে গেয়ে উঠল,
​“ইয়ে হাসিন ওয়াদিয়াঁ, ইয়ে খুলা আসমাঁ
আ গ‍্যায়ে হাম কাঁহা, অ্যায় মেরে সাজনা?
ইন বাহারোঁ মেঁ দিল কি কালি খিল গেয়ি
মুঝকো তুম জো মিলে, হার খুশি মিল গেয়ি…”

সে গাইতে গাইতে সামনে এগিয়ে এসে শেরাজের গালে হাত রাখল। শেরাজ চোখ বুজে সেই স্পর্শের গভীরতা অনুভব করল। গানটা শেষ হতেই শেরাজ সুমুর হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল। ​সে সুমুর পিঠের ওপর দিয়ে নিজের হাতটা নিয়ে ওকে আরও কাছে টেনে এনে কানে ফিসফিস করে গেয়ে উঠল,
​“তেরে হোঁঠোঁ পে হ্যায় হুসনে কি বিজলিয়াঁ
তেরে গালোঁ পে হ্যায় জুলফ কি বাদলিয়াঁ
তেরে দামান কি খুশবু সে মহেকে চামান
সঙ্গমার মার কে জ্যায়সা ইয়ে তেরা বাদান…”
​গাইতে গাইতে শেরাজ সুমুর অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিল। ওর আঙুলের স্পর্শ সুমুর ঘাড়ে আর কানে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“এই পাহাড়, এই মেঘ—সবই তো ধন্য হয়ে গেছে তোমার এই রূপের ছোঁয়ায়। আমি তোমাকে যত দেখি, ততই মনে হয় তোমার এই সৌন্দর্যের বিজলী আমাকে সারাজীবনের জন্য ভস্ম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।”
​সুমু শেরাজের বুকে মাথা রেখে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৯৪

“আর আমি আপনাকে সারাজীবন আমার কাছে বন্দি করে রাখতে চাই।”
​শেরাজ সুমুর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। তাদের দুজনের নিঃশ্বাস তখন একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে। শেরাজ নিচু হয়ে তার কপালে এক দীর্ঘ আর উষ্ণ স্পর্শ এঁকে দিল। প্রদীপের শেষ শিখাটুকু নিভে যাওয়ার আগেই শেরাজ সুমুকে কোলে তুলে নিল। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আজ কোনো দুষ্টুমি নয়! আজ আমি একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই।”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“যেই নারীর রোমান্টিক স্বামী আছে, তার রাতে শান্তিতে ঘুমানোর কথা চিন্তা করাটা অনেক বড় বিলাসিতা। এতো বড়লোকের বউ তুমি নও, যে এত বিলাসিতার জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখবে।”

খান সাহেব পর্ব ৯৫ (২)