Home চন্দ্রাস্ত চন্দ্রাস্ত পর্ব ১৪

চন্দ্রাস্ত পর্ব ১৪

চন্দ্রাস্ত পর্ব ১৪
ফারহানা কবীর মানাল

বেলা পড়ে এসেছে। রোদের তাপ ম’রে গেছে প্রায়। থানায় ঘরে ব’ন্দী কিছু ক্লান্ত শরীর। তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। দারোগা সাহেব চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। স্বাভাবিক গলায় বললেন, “মানিক মিয়া এখনও আসছেন না কেন? উনি এলে এই কে’সের যবনিকা টানতে পারি।”
হাবিব চেয়ারে বসে ছিল। সে বিরক্ত গলায় বলল, “অহেতুক আমাদের বসিয়ে রেখেছেন কেন? সজীবের স্বীকারোক্তির পর এখানে থাকার কি কোন মানে হয়?”
“অবশ্যই হয়। সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হলে আমরা কিছু করতে পারব না। পরবর্তীতে ঝামেলা হতে পারে।”
“আর কোন বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছেন? এখনও কি কিছু জানার বাকি আছে?”

“আমার একদমই মনে হচ্ছে না– সজীব সাহেব সত্য কথা বলছে। বরং উনি আমাদের দ্বিধায় ফেলে মজা নিচ্ছেন।”
সজীব আবারও হো হো করে হেসে উঠল। তখন থেকে সে শুধু হেসে যাচ্ছে। কথার জবাব দিচ্ছে না। প্রশ্ন করলে হাসছে। যেন দিশেহারা হয়ে পা’গ’ল হয়ে গেছে। দীর্ঘ দুই ঘন্টার অপেক্ষার পর মানিক মিয়া থানায় ঢুকলেন। সবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বললেন, “কি হয়েছে? কেন ডেকেছেন?”
দারোগা সাহেব বললেন, “আপনার মেয়ের খু’নি ধরা পড়েছে। এই সজীব সাহেব, উনিই খু’ন করেছেন। নিজের মুখে সব স্বীকার করেছেন।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তিনি সজীবের আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিলেন। অসম্ভব ক্লান্ত এবং অসহায় গলায় বললেন, “দু’টো ছেলে-মেয়ে ছিল। দু’জনেই আমার চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। এই দিন দেখতে না হলে হয়তো এত কষ্ট পেতে হতো না।”
কেউ তার কথার জবাব দিলো না। কি-ই বা বলত তারা? সন্তানহারা অসহায় বাবার আর্তনাদে কোন বাক্য দিয়ে স্বান্তনা দেওয়া যায়? কি সে-ই কথা? কোন জাদু কাঠির স্পর্শে এ কষ্ট স্তিমিত হয়ে আসবে? কেউ কি জানে সে কথা? জানলে বলুক। স্বান্তনা পাক এক অসহায় হৃদয়! সন্তান হারা পিতার হৃদয়!
নাইমার চোখ মুছল। জড়ানো গলায় বলল, “ভাইয়া বাড়িতে চলো। এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না।”
হাবিব নড়ল না। দারোগা সাহেব বললেন, “সজীব সাহেব, আমার প্রশ্নের জবাব পাইনি। আপনি এসব স্বীকার করে নিলেন কেন?”

সজীব বলল, “পালিয়ে কতদূর যেতাম? আপনারা ঠিকই আমাকে ধরে ফেলতেন। একটু খোঁজ খবর করলেই সব জেনে যেতেন। আমি পালাতে পারতাম না। তাই সেই চেষ্টা করিনি।” তার গলার স্বর একটু অন্যরকম শোনালো। বাদশা বলল, “পালাতে পারতেন না? কিন্তু কেন?”
“অফিসে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে। তারা আমার নামে কে’স করত। হয়তো ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তখন সবই বের হয়ে আসত। আর আজকের ঘটনার পর আপনারা আমায় নজরে নজরে রাখতেন। এত দুশ্চিন্তা মাথায় নিতে চাইনি।”
দারোগা সাহেব ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “পুলিশের চাকরি জীবনে আর কত কি দেখতে হবে আল্লাহই ভালো জানেন!”

সজীব অত্যন্ত সহজ গলায় বলল, “অপকর্মের শা’স্তি পেতেই হয়। আজ নয়তো কাল, কাল নয়তো পরশু, নয়তো জীবনের কোন একদিন। দিনটা আমার জন্য এত তাড়াতাড়ি আসবে বুঝতে পারিনি।”
“অর্থাৎ আপনি সব সত্যি বলছেন?”
“কোন সন্দেহ আছে? সন্দেহ থাকলে তদন্ত করুন।”
দারোগা সাহেব সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি সজীবের কথা অবিশ্বাস করতে পারছেন না। আর ঠিক বিশ্বাসও হচ্ছে না।

তাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা মিলিয়ে গেল। ভাই-বোন ক্লান্ত ভঙ্গিতে নিজেদের ঘরে ঢুকল। নাইমা চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তার মন অনেক ভারী হয়ে আছে। থানায় গোটা ঘটনা শোনার সময়টাতে মানিক মিয়া মাথা নিচু করে ছিলেন। ক্রমাগত চোখের পানি মুছচ্ছিলেন। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন। তার দিকে তাকিয়ে নাইমার চোখও ভিজে উঠছিল। বাবারা এত ভালো হয় কেন? কেন হাজার অন্যায় করার পরও সন্তানকে মন থেকে ঘৃ’না করতে পারেন না? কেন মনের কোথাও না কোথাও স্নেহ লুকিয়ে রাখেন?
কেউ এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে?

নাইমার চোখের পানি মুছল। থানা থেকে বের হবার পর রাফিয়া তার হাত ধরে বলেছে, “তুমি খুব বুদ্ধিমতী। পাকা গোয়েন্দাদের মতো করে জিজ্ঞেসাবাদ করো। বয়সের সাথে সাথে নিশ্চয়ই বড়সড় গোয়েন্দা হবে।”
নাইমা তার কথায় খুশি হতে পারেনি। সে আর কোন ঝামেলা চায় না। চায় না তার পরিবারে অশান্তি আসুক। কেউ আবার নতুন করে হারিয়ে যাক। অন্য কোন পরিবারের সুখ নষ্ট হয়ে যাক তা-ও চায় না। সে তার হৃদয়কে নিষ্পাপ রাখতে চায়। যে হৃদয় চাঁদের জোছনার মত কোমল এবং স্নিগ্ধ। যে হৃদয় কখনো কারো অনিষ্ট চায় না। সর্বদা ভালোবাসা ছড়ায়।
হাবিবের মুখে সব ঘটনা শুনে নববী আৎকে উঠল। স্বামীর হাত চেপে ধরে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। হাবিব বলল, “দুশ্চিন্তা করো না। সবকিছু ঠিক যাবে। অপরাধী নিজের দোষ স্বীকার করেছে। আরও কিছু থাকলে সময়ের সাথে বেরিয়ে আসবে।”
“তবুও আমার খুব ভয় করছে। এসব কিছু আর ভালো লাগছে না।”
“ওহ আচ্ছা তাই? কিছু ভালো না লাগা তো খারাপ লক্ষন। খুব খারাপ লক্ষন!”

নববী জবাব দিলো না। বেজার মুখে তাকিয়ে রইল। সত্যি বলতে মিলির মৃ’ত্যুতে তার সামান্য এতটুকু কষ্ট লাগেনি। যে মেয়ে তার থেকে তার স্বামীকে কেঁড়ে নিতে চায়, তার মৃ’ত্যুতে আর যাইহোক শোক পালন করা সাজে না। তবে মানিক মিয়া আর তার বউয়ের কথা ভেবে নববীর খুব কষ্ট হচ্ছে। সন্তান হারানোর বেদনা তার থেকে ভালো আর কে বুঝবে? কেউ বুঝতে না। সে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস গোপন করল। হাবিব অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “প্রিয়তমা আমার, তোমার মানসিক অবসাদ দূর করার জন্য কি করতে পারি বলো। আমার সাথে সমুদ্র দেখতে যাবে? সমুদ্রের নীল পানি ছুঁয়ে তোমার ক্লান্তি দূর করবে? পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সতেজ নিঃশ্বাস নেবে? রাতের নিঝুম স্তব্ধ পরিবেশে আমার হাত ধরে হাঁটবে নাকি এক কাপ চায়ের উষ্ণতা ভাগাভাগি করে নেবে? কি করবে বলো?”
নববী জবাব দিলো না। শুধু হাসল। স্নিগ্ধ, কোমল, লজ্জা মেশানো হাসি।
রাতে খাবার সময় শরিফা বেগম বললেন, “যাক বাবা, অবশেষে খু’নি ধরা পড়েছে। যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।”
মহিউদ্দিন সাহেব তার দিকে তাকালেন। কিন্তু কিছু বললেন না। হাবিব বলল, “তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। আদালত সজীব ভাইয়ের কথাও যাচাই করে দেখবে। তবে আমার মনে সে সত্যি কথা বলছে।”

“এ কথা বলছিস কেন?”
“অফিসে ঝামেলা হচ্ছে, আব্বা। আগেরদিন সবাই মিলে ওই কাগজপত্র খোঁজ করেছি। মালিক প্রায় পাগল হয়ে গেছিল।”
“হওয়াটাই স্বাভাবিক। যুগ জামানা কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। আনুগত্য আর মনুষ্যত্ব ভুলে গিয়ে মানুষ সম্পদের নেশায় পড়েছে। টাকার গোলামী করছে।”
নাইমার পাত খালি হয়ে গেছে। শরিফা বেগম তার পাতে আর একটু ভাত দিলেন। নাইমা বলল, “আমার মন বলছে সজীব ভাইয়ের সব কথা স্বীকার করে নেবার পিছনে অন্য কারণ আছে। কর্ম ফলটল কিছুই না।”
হাবিব বলল, “তা হতেই পারে। ভীষণ ঘু ঘু লোক। চোখে মুখে মনে তিন রকমের কথা নিয়ে ঘোরে।”
“তবে যা-ই বলো না কেন! রাফিয়া আপুর কথা ভেবে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। একা মেয়ে মানুষ অতদূর চলে গেছে। শুধু স্বামীর সাথে কোন মেয়ে আছে কি-না নিশ্চিত হতে! এমন মহিলা নিয়ে আসলেই সংসার করা যায় না। সারাক্ষণ সন্দেহ করলে আর কি হলো!”

হাবিব জবাব দিলো না। আঁড়চোখে নববীর দিকে তাকাল। নববী নিজের মতো করে খাবার খাচ্ছে। তার চোখে-মুখে উৎফুল্ল ভাব ফিরে এসেছে।
পরদিন সকালে, মানিক মিয়া মহিউদ্দিন সাহেবকে কল দিলেন। বললেন, “থানা থেকে মিলির লা’শ ফেরত দিবে আজ। জানাজা পড়িয়ে মাটি দিয়ে দেব।” সামান্য দু’লাইন কথা। তবুও ঠিকভাবে বলতে পারেনি। বারবার গলা ধরে এসেছে।
মহিউদ্দিন সাহেব তাকে স্বান্তনা দেবার ভাষা খুঁজে পাননি। শুধু চোখের পানি ছেড়ে দোয়া করেছেন– তার যেন এমন দিন দেখতে না হয়। কোন সন্তান যেন হারিয়ে না যায়। তিনি তার দোয়া শেষ করতে পারেননি। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছেন।

মিলির শেষ বিদায়ের আয়োজন শেষ। হাঁড়িতে গরম পানি সাথে বরই পাতা ফুটছে। কয়েকজন মহিলা পর্দা টানাতে ব্যস্ত। সেখানে মিলির লা’শ গোসল দেওয়া হবে। চারদিকে এক ধরনের ভারী, গম্ভীর ও বিষণ্ণ অনুভূতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েকজন মহিলা জটলা হয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে। মিলি তার জীবনে কি কি করেছে তার ফর্দ তৈরি করছে। যেন মিলির আমলনামা তৈরির দায়িত্ব তাদের ওপর এসে পড়ছে! হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের মধ্যে নীরবতা ও শোকের ছায়া দেখা যাচ্ছে। ঘরের ভেতর থেকে মিলির মায়ের গলা শোনা যাচ্ছে। সে চিৎকার করে কাঁদছে। মাঝেমধ্যে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।

নাইমা সব কোলাহল থেকে সরে যেতে চাইল। খানিকটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। আনমনে বলে উঠল, “ম’রা বাড়ির এই পরিবেশ শুধুমাত্র শোকের নয়, বরং মানুষের জীবনের নশ্বরতা, সম্পর্কের গভীরতা ও বিদায়ের অনিবার্যতার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। অল্প সময়ের পৃথিবীতে কর্মই জীবনের সব থেকে বড় সত্য। যা মানুষকে মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখে। শুধু কি তাই? বিশ্বাসীদের বিশ্বাস জীবনের সব কাজের জন্য আখিরাতে হিসাব দিতে হবে। তখন তারা কিভাবে বলবে? আমি এই এই অন্যায় কাজ করেছি!
মৃ’ত মানুষের জন্য সময় অপেক্ষা করে না। বরং বেশ দ্রুত চলে। বিকেলের মধ্যেই লা’শ ক’ব’রে রাখা শেষ। লোকজন কমে এসেছে। প্রায় নেই বললেই চলে। মাটি দেবার পরই সবাই বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। হাতেগোনা কয়েকজন মিলির মায়ের পাশে বসে আছে। শরিফা বেগম তাদের একজন। তার মনটাও ভীষণ ভারী হয়ে আছে। গাল গড়িয়ে চোখের পানি পড়ছে। এ কান্নার সবটুকু মিলির জন্য নয়। কয়েকদিন বাদে তার মেয়েও দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে। তার ফাঁ’সির আদেশ এসেছে। স্বামীকে খু’ন করার দায়ে কনকের ফাঁ’সি হচ্ছে।

বাড়ি ফেরার আগে নাইমা একবার মিলির ক’ব’রের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলল, “সত্যি বলছি– আমি তোমাকে পছন্দ করতাম না। তোমার গায়ে পড়া স্বভাব কোন কালেই আমার ভালো লাগেনি। এই ভালো না লাগার তিক্ততা বহুগুণে বেড়ে গেছে যখন জেনেছি তুমি ভাইয়াকে পছন্দ করো। সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষেরা বিবাহিত ছেলেদের দিকে অন্য মেয়ে লোকের আর্কষণ, আসক্তি পছন্দ করে না। কিন্তু তুমি তা করতে। বিবাহিত জানার পরও ভাইয়াকে পছন্দ করতে। তাকে নিজের করে পেতে চাইতে। ভাইয়া পছন্দ করতে বিধায়ই ভাবীকে সহ্য করতে পারতে না। আমার এসব ভালো লাগত না। মনের ওপর জোর খাটানো যায় না– এ ধরনের বায়বীয় কথায় আমি বিশ্বাস করি না। বিবেক দিয়ে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই মানুষের কাজ।

চন্দ্রাস্ত পর্ব ১৩

তবে সত্যিই আজ তোমার জন্য কষ্ট হচ্ছে। কেউ-ই তার প্রিয় মানুষের ভাগ দিতে রাজি হয় না। কখনো পারেও না। তুমিও হয়তো তা করতে পারোনি। দুনিয়ায় অনেক কষ্ট পেয়েছ। আল্লাহ যেন তোমাকে মাফ করে দেন।
নাইমা খানিকক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। শান্ত হাতে চোখের পানি মুছল। এতক্ষণ যেসব এলোমেলো কথা বলছিল সেসব ভেবে তার একটু লজ্জা লাগতে শুরু করল। ভাবল– আসলেই কি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

চন্দ্রাস্ত শেষ পর্ব