চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৭
আয়াত বিনতে নূর
এদিকে ফারিসের যেন সময়ই লাগল না বুঝে উঠতে তার সাথে ঠিক কী হলো।আরিশা এভাবে তাকে জড়িয়ে ধরেছে এইটা চোখে পড়তেই তার ভেতরের সবকিছু এক মুহূর্তে বদলে গেল।
রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল, চোখ দুটো যেন আগুন ঝরাচ্ছে।
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, হাত দুটো মুঠিবদ্ধ শিরা-উপশিরা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।সে আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না।এক ঝটকায়, এক ধাক্কায় সরিয়ে দিলো আরিশাকে।ধাক্কার জোর এতটাই ছিল যে আরিশা সামলাতে পারল না হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল মেঝেতে।মেঝেতে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই তার মুখটা কুঁচকে গেল ব্যথায়।কনুইয়ে লেগেছে, পিঠে লেগেছে কিন্তু তার চেয়েও বেশি লেগেছে মনে।
আরিশ জামান এগিয়ে আসছিল তাকে তুলতে কিন্তু আরিশা হাত তুলে থামিয়ে দিলো।
সে নিজেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল ফারিসের সামনে।
কাঁপা গলায় বলল,
“কেনো এমন করছো ফারিস? তুমি কি সব ভুলে গেছো? আমাদের সেই বন্ধুত্ব সেই সম্পর্কগুলো?”
এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।
“কই আমি তো তোমাকে ভুলতে পারিনি কিন্তু তুমি?
এক নিমিষেই ভুলে গেলে আমাকে? কেনো ফারিস কেনো?”
চারপাশে সবাই নিঃশব্দ। হলঘর ভরে গেছে অদ্ভুত এক টানটান নীরবতায়। আরিশা আবার বলতে শুরু করল,
“তোমার এতো কিসের টান ওই মেয়েটার ওপর?
হ্যাঁ? এতো কেনো ভালোবাসো ওকে?
কেনো এতো আগলে রাখো?”
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে কেউ বুঝতে পারছে না কার কথা হচ্ছে। আরিশা থামল না, বরং আরো ভেঙে পড়ল কথার ভেতরেই।
“কই রিয়া আর তনয়াকে তো কখনো এতো ইম্পরট্যান্ট দিতে দেখিনি তোমাকে তাহলে ওই মেয়েটা নিয়ে এতো পাগলামি কেনো তোমার?”
একটু থামল। গভীর শ্বাস নিল।
তারপর সরাসরি তাকাল ফারিসের চোখে,
“তুমি নিশিতাকে ভালোবাসো তাই না ফারিস?”
এই কথাটা শুনেই চারপাশে চাপা গুঞ্জন।
আরিশার গলা এবার আরো ভেঙে গেল,
“কিন্তু কেনো?কি আছে ওই মেয়েটার মধ্যে যা আমার মধ্যে নেই?”
তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
“কেনো ভালোবাসলে না আমাকে ফারিস?
কেনো ওই নষ্ট মেয়েটাকে এতো ভালো লাগলো তোমার?”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই,ঠাস ! সজোরে একটা চর পড়লো আরিশার গালে। পুরো হলঘর কেঁপে উঠল সেই শব্দে।ফারিসের হাতের শক্ত থাপ্পড় গিয়ে পড়েছে আরিশার গালে। এক মুহূর্তে সব শব্দ থেমে গেল। সময় যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরিশার মুখটা একদিকে ঘুরে গেল ধাক্কায়। গালের ওপর সাথে সাথে লাল দাগ ফুটে উঠল। চোখ বড় বড় অবিশ্বাস, ব্যথা, অপমান সব একসাথে জমে আছে সেই দৃষ্টিতে। তার ঠোঁট কাঁপছে কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।চারপাশের সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে।
ফারিসের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ দুটো এখনো রাগে জ্বলছেকিন্তু সেই আগুনের নিচে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু অপরাধবোধ?
নাকি ভয়? তার হাতটা এখনো মাঝ আকাশে
যেন সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে কী করেছে। আরিশার চোখ থেকে ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা অশ্রু নিঃশব্দে।
সে কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল ফারিসের দিকে এমন এক দৃষ্টিতে, যেখানে ভাঙা ভালোবাসা, অপমান, আর শেষ আশাটুকুর মৃত্যু—সব একসাথে লেখা। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কেউ নড়ল না, কেউ কথা বলল না।শুধু সেই থাপ্পড়ের শব্দটা
এখনো যেন দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছে।
ফারিসের এতক্ষণ জমে থাকা রাগটা যেন বিস্ফোরিত হলো এবার। তার হাতের রগ ফুলে উঠেছে, পেশিগুলো শক্ত হয়ে গেছে। চোখ দুটো রক্তবর্ণ মনে হচ্ছে আগুন জ্বলছে ভেতরে।
আরিশা আবারও এগিয়ে এসে কিছু বলতে চাইতেই ফারিসের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
বাড়ির সবাই স্তব্ধ।
কেউ কোনো কথা বলছে না। শুধু ভারী নিঃশ্বাস আর উত্তেজনার গুমোট পরিবেশ। নিশিতার নাম উচ্চারিত হতেই যেন সময় থমকে গেল।
ফারিস দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“কাকে নষ্ট মেয়ে বলছিস তুই জানিস?
ওই মেয়েটা আমার বউ ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরীর বিয়ে করা বউ।ছোটবেলা থেকে ও আমার শুধু আমার।আর তুই ওকে নষ্ট বলছিস?”
তার কণ্ঠে এমন এক হিংস্রতা ছিল যে ঘরের সবাই কেঁপে উঠল।
“তোকে দেখে ঘৃণা লাগছে। তোর কোনো যোগ্যতা নেই আমার ওয়াইফির পায়ের নখের ময়লা হওয়ারও না।দ্বিতীয়বার আমার বউকে নিয়ে কিছু বলার সাহস করলে জিভ টেনে ছিড়ে ফেলতে আমার টু মিনিটও সময় লাগবে না মাইন্ড ইট।”
ফারিস এক পা এগিয়ে এল,
“এতদিন যে ফারিসকে দেখেছিস ওটা আমার আসল রূপ না।ওর জন্য আমি কাউকে মেরে ফেলতেও পারি দরকার হলে নিজেও মরে যাব।”
এই কথাগুলো শুনে আরিশার চোখ দিয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না ফারিস সত্যিই বিয়ে করেছে।
এই সময় পর্যন্ত চুপ থাকা আরাফাত চৌধুরী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে ঠাস করে ফারিসের গালে চড় বসালেন।
ঘরের ভেতর শব্দটা প্রতিধ্বনির মতো বাজল।
কিন্তু ফারিসের মুখে ব্যথার কোনো চিহ্ন নেই।
উল্টো ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল। এই হাসিটাই যেন আরাফাত চৌধুরীর রাগ আরও বাড়িয়ে দিল।
তিনি চিৎকার করে উঠলেন,
“এই দিনের জন্য জন্ম দিয়েছিলাম তোকে?
নিজের বোনকে বিয়ে করতে লজ্জা করল না?
সমাজ কি বলবে? আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী সবাইকে মুখ দেখাবো কীভাবে?”
ফারিস ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
“লজ্জা কেনো করব? ও কি আমার মায়ের পেটের বোন? আমি যাকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করেছি।
এই সমাজকে আমি কেয়ার করি না।”
সে আরও কঠিন স্বরে বলল,
“আমার বউ নিয়ে কেউ বাজে কথা বলবে—আমি সহ্য করব না। সমস্যা থাকলে বলে দিন আমি আমার বউকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।
কিন্তু এসব ননসেন্স আর শুনব না, আব্বু।”
আরাফাত চৌধুরী রাগে কাঁপতে লাগলেন। চোখে বিস্ময়, অপমান আর অজানা ভয়। ড্রয়িং রুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠলমনে হচ্ছিল ঝড় আসার আগের নীরবতা।আফিয়া চৌধুরী ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে থমথমে গলায় বললেন,
“কেনো করলি এমন ফারিস? ও তো তোর নিজের বোন না হলেও তোর বোনের মতোই ছি”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফারিস হঠাৎ গর্জে উঠল,
” সাট আপ আম্মু! জাস্ট সাট আপ! ও আমার বউ, বোন না। আর আমি চাই না বাইরের মানুষের সামনে এসব নিয়ে কোনো কথা হোক।”
ঘরের ভেতর যেন মুহূর্তেই বরফ নেমে এলো।
কারো নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল।
আরাফাত চৌধুরী ধীর দৃষ্টিতে আরিশ জামানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনারা এখন যেতে পারেন।”
আরিশ জামান আর কোনো কথা বললেন না।
নীরবে আরিশাকে কোলে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ওদের চলে যেতে দেখে আফিয়া চৌধুরীর চোখ ভিজে উঠল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
“আচ্ছা মানলাম কিন্তু তুই কি আমাদের কথাও ভাববি না ফারিস? তোর মা–বাবার কথা একবারও মনে পড়ল না?সমাজ, লোকজন কি বলবে একবার হলেও যদি ভাবতি, তাহলে আজ এই দিনটা দেখতে হতো না।”
ফারিস ধীরে মাথা তুলল।
চোখে কঠিন এক জেদ আর অদ্ভুত শান্তি।
” আম্মু, আমার কাছে নিশিতার আগে আর কেউ না। তুমি না, এই পৃথিবীর কেউ না—আমি নিজেও না।সমাজের লোকজনের জন্য আমি নিজের জীবন শেষ করতে পারব না।এতে যদি আমি বেপরোয়া, অবাধ্য হই তাহলে তাই সই।
নিশিতা থাকলে আমার আর কাউকে লাগবে না।”
আফিয়া চৌধুরী আর কিছু বললেন না।
নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন শব্দ হারিয়ে ফেলেছেন। দূর থেকে সবকিছু শুনছিলেন আলতাফ চৌধুরী। নিশিতার জন্য ফারিসের অটুট ভালোবাসা দেখে তাঁর বুকটা নরম হয়ে গেল। তিনি ধীরে আরাফাত চৌধুরীর কাছে এসে বললেন,
“ভাইয়া যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন এগুলো নিয়ে পড়ে না থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভালো।
ছেলে মেয়ে যদি সুখে থাকে, তাতেই তো আমাদের শান্তি। বিয়ে যখন হয়ে গেছে, এখন আর কিছু বদলানো সম্ভব না।”
আরাফাত চৌধুরী গভীর নিশ্বাস ফেললেন।
মাথা নাড়িয়ে ফারিসের দিকে তাকালেন,
” তোমাদের বিয়েটা আমরা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এখন এটা কাউকে বলার দরকার নেই। বিষয়টা এই চার দেওয়ালের মাঝেই থাকবে। আশা করি সবাই বুঝতে পারছো।”
ফারিস কিছু বলার জন্য ঠোঁট খুলতেই ওপর থেকে রিয়ার আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এলো,,
” ভাইয়া! তাড়াতাড়ি উপরে এসো! নিশিতা নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, খুলছে না কোনো সাড়াশব্দ নেই!”
মুহূর্তেই সবার মুখের রং বদলে গেল।
ফারিসের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।
সে এক মুহূর্ত দেরি না করে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল পেছনে পেছনে বাকিরাও।ফারিসের যেন মনে হলো বুকের ভেতর থেকে কেউ তার প্রাণটাই টেনে বের করে নিচ্ছে। এসি চলছে তবুও কপাল ভিজে গেছে ঘামে। হাত কাঁপছে শ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
সময় নষ্ট না করে সে দৌড়ে উপরে উঠে গেল।
নিশিতার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুকটা ধক করে উঠল।
“নিশিতা দরজা খোল। ”
নক করল।আবার করল। আরও জোরে করল।
ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই। ভিতরে নিশিতা বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছে। কান্নায় বালিশ ভিজে গেছে।গলা ধরে গেছে তবুও থামছে না।
হঠাৎ কান্নার মাঝেই ভাঙা গলায় গেয়ে উঠল,
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৬
“এ হৃদয়ে জ্বলছে..
এক জাদুর মোমবাতি✨
তুমি আগুন হয়ে পুড়ছো আমায়
সারা দিবারাত্রি ”🪄
গলাটা কাঁপছে সুর ভেঙে যাচ্ছে
তবুও গাইছে। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ফারিস থমকে গেল। প্রতিটা শব্দ যেন ছুরি হয়ে বুকের ভেতর ঢুকছে।
