Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫১

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫১

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫১
আয়াত বিনতে নূর

দেখতে দেখতে যেন, কেমন করেই যেন দিনগুলো কেটে গেলো। সেই রাতের পর পেরিয়ে গেছে আরও চৌদ্দটা দিন। সময় যেন নিজের মতো করেই সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে। সবকিছু এখন একদম স্বাভাবিক। চার-পাঁচটা সাধারণ পরিবারের মতোই সংসার করছে নিশিতা আর ফারিস। ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান সব যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে। বাড়ির সবার মুখে এখন হাসি, কারও মনে আর কোনো কষ্ট বা দূরত্ব নেই। সবাই মিলে একসাথে থাকছে, ঠিক যেন একটুকরো শান্তির ঘর।

কিন্তু এই শান্তির মাঝেই নতুন একটা চিন্তা এসে জড়ো হয়েছে কাল থেকেই শুরু নিশিতার পরীক্ষা।
নিশিতা একটু চিন্তিত। বুকের ভেতর হালকা চাপা দুশ্চিন্তা কাজ করছে পারবে তো ঠিকমতো? সব পড়া কি ঠিকভাবে মনে আছে? তবে এই চৌদ্দটা দিনে ফারিস যেন নিজেকে একদম বদলে ফেলেছে। যতটুকু সময় পেয়েছে, সবটাই দিয়েছে নিশিতাকে। কখনো পাশে বসে পড়িয়েছে, কখনো নিজের মতো করে বুঝিয়ে দিয়েছে কঠিন বিষয়গুলো। আবার কখনো শুধু চুপচাপ পাশে বসে থেকেছে যেন নিশিতা বুঝতে পারে, সে একা না।ফারিসের এই নিরব সাপোর্টটাই নিশিতার সবচেয়ে বড় সাহস হয়ে উঠেছে।
হয়তো পরীক্ষার ভয় এখনও আছেনকিন্তু সেই ভয়কে হারানোর জন্য এখন তার পাশে আছে একটা ভরসার মানুষ।
ফারিস প্রত্যেকটা সাবজেক্ট নিজে রিভাইজ করিয়ে নিশিতাকে দিয়ে। এতে অবশ্য নিশিতারও লাভ হয়েছে। ফারিস এতো সুন্দর করে বুঝিয়ে যে আর কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। আর আজ প্রথম দিনই নিশিতার অংক পরীক্ষা। বহু রাত জেগে নিশিতা সিলেবাস কম্পলিট করেছে, এতে অবশ্য ফারিস এক মুহূর্তও নিশিতার থেকে দূরে যাইনি নিজে গাইড করেছে সব কিছু।

এক সময় ফারিস বিরক্ত হয়ে নিশিতাকে পড়ার টেবিল থেকে জোর করে উঠিয়েছে।এক প্রকার মিষ্টি ধমক দিয়ে বলল,
“শুধু পড়াশোনাই করবি নাকি? তোর এই নিষ্পাপ স্বামীটার কথাও ভাববি। সবসময় পড়াশোনা, না না করে আমাকেও তো একটু ভালোবাসতে পারিস তুই, নাকি?”
নিশিতা ফারিসের কথার মানে বুঝতে পেরে লজ্জায় মাথা নিচু করে দিলো। ফারিস আর কিছু না বলে নিশিতার খুব কাছে চলে এল। কীই বা করবে এই অবুঝ মেয়েটাকে আজ খুব নিজের করে পেতে ইচ্ছে করছে তার। এতদিনের দূরত্ব, চাপা অনুভূতিগুলো যেন একসাথে এসে ভিড় করেছে মনে।
নিশিতাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল সে, যেন বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে চায়। এমনভাবে আগলে রাখতে চায়, যাতে কেউ কোনোদিন ওকে তার থেকে আলাদা করতে না পারে।

আর কোনো কথা না বলে, ধীরে ধীরে নিশিতাকে নিজের ভালোবাসার গভীরতায় ডুবিয়ে দিল ফারিস একটা নরম, মায়াময় অনুভূতির মধ্যে। যেখানে কোনো ভয় নেই, আছে শুধু দুজনের নিঃশব্দ কাছাকাছি থাকা।
নিশিতা প্রথমে লজ্জা, সংকোচে চুপ হয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে নিজেকে ছেড়ে দিল সেই অনুভূতির ভেতর। সে জানে এই মানুষটা তাকে কষ্ট দিতে না, ভালো রাখতে চায়। তাই কোনো কথা না বলে, শুধু চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে থাকল ফারিসের স্পর্শ, তার যত্ন, তার ভালোবাসা। এভাবেই কখন যে রাত কেটে গেল, কেউ খেয়ালই করল না।
শেষ রাতে, ফারিস ধীরে ধীরে নিশিতাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে নরম গলায় বলল,
“ঘুমা জান অনেক জ্বালিয়েছি তোকে। কাল আবার জ্বালাবো, আজকের মতো তোর ছুটি।”
নিশিতা কোনো উত্তর দিল না। লজ্জায় কান গাল গুলো আবারও লালটুকটুকে হয়ে গেল। একবার ফারিসের দিকে তাকুয়ে চুপচাপ মাথা রেখে দিল ফারিসের বুকে ফারিস আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে।আর সেই উষ্ণ বুকের ভেতরেই চোখ বুজে এলো নিশিতার একটা নিশ্চিন্ত, শান্ত ঘুমে।

দূর থেকে কোথাও ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। নিস্তব্ধ ভোরের বাতাসে সেই আজানের মিষ্টি সুর যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সুর কানে যেতেই ধীরে ধীরে ফারিসের গভীর নিদ্রা ভাঙে। আধখোলা চোখে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর মনে পড়তেই নিচে তাকায়। তারপর রাতের সব ঘটনাগুলো মনে করে মুচকি হাসে। তার বুকের উপর মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে নিশিতা। মুখটা শান্ত, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা যেন কোনো মিষ্টি স্বপ্ন দেখছে। ভোরের নরম আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে তার মুখে পড়েছে, তাকে আরও মায়াবী লাগছে।
ফারিস কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা। খুব আস্তে করে নিশিতার কপালের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়।
তারপর মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠে,

“পাগলীটা এভাবে বুকের উপর ঘুমালে তো আমি নড়তেই পারি না।”
কথাটা বললেও কণ্ঠে বিরক্তি নয়, বরং গভীর মায়া।
ফারিস সাবধানে এক হাত দিয়ে নিশিতার মাথাটা ধরে, আরেক হাত দিয়ে তাকে আলতো করে নিজের বুক থেকে তুলে নেয়। যেন একটুও ঘুম না ভাঙে তার। নিশিতা একটু নড়ে উঠে হালকা করে।
ফারিস থমকে যায়। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
“ঘুমের মধ্যেও ছাড়তে চাস না আমাকে ?”
খুব যত্ন করে তাকে পাশে বালিশে শুইয়ে দেয়। তারপর কম্বলটা টেনে তার গলা পর্যন্ত ঢেকে দেয়।
নিশিতা আবার শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ফারিস কিছুক্ষণ বসে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরে তখনো আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। ফারিস ধীরে নিশিতার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলে,
“ঘুমা আমি নামাজ পড়ে আসি।”

তারপর আস্তে করে বিছানা থেকে নেমে যায়, যেন তার প্রিয় মানুষটার ঘুম একটুও না ভাঙে। কাবার্ড থেকে পাঞ্জাবী আর পাজামা বের করে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। তারপর শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে আসে। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই ভোরের নরম আলোটা পুরো ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফারিস তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে একবার বিছানার দিকে তাকায়। নিশিতা এখনো ঠিক আগের মতোই শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। কম্বলের ভেতর আধা মুখ লুকিয়ে আছে তার। মাঝে মাঝে নিঃশ্বাসের সাথে চুলগুলো একটু নড়ে উঠছে।
ফারিস কাবার্ড খুলে সাদা পাঞ্জাবী আর পাজামা বের করে পরে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলগুলো একটু ঠিক করে নেয়। তারপর আবার একবার বিছানার কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে নিশিতার দিকে।
ভোরের আলোয় তাকে এতটাই নিষ্পাপ লাগছে যে ফারিসের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই অদ্ভুত নরম হয়ে যায়। সে ধীরে বিছানার কিনারায় বসে পড়ে। আলতো করে নিশিতার কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে ওঠে,

“কাল রাতে আমি-তো ঠিক করে তোকে ঘুমাতে দেইনি এখন ঘুমা, কেমন শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিস।”
নিশিতা হালকা নড়ে ওঠে, যেন কারও স্পর্শ টের পেয়েছে। কিন্তু চোখ খুলে না। বরং বালিশটা একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ফারিস মৃদু হেসে ওঠে।
তারপর ধীরে কম্বলটা আবার ঠিক করে দেয়, যেন ঠান্ডা না লাগে।
“ঘুমা পাগলী আমি আসছি।”
একবার শেষবারের মতো তাকিয়ে ফারিস উঠে দাঁড়ায়। দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকায়।
নিশিতা ঠিক আগের মতোই গভীর ঘুমে ডুবে আছে।

ফারিস আস্তে করে দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়, যাতে কোনো শব্দ না হয়। করিডোরটা তখন একদম নিস্তব্ধ। দূর থেকে এখনো ফজরের
আজানের শেষ সুরটা ভেসে আসছে। ফারিস ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায় নামাজ আদায় করার জন্য। এদিকে ঘরের ভেতর, জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলোটা আরও একটু উজ্জ্বল হয়ে বিছানার উপর এসে পড়ে। আর সেই আলোতেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে নিশিতা যেন তার পৃথিবীর সব নিরাপত্তা এখনো ফারিসের কাছেই রেখে দিয়েছে।
ফারিস সোজা মসজিদ চলে গেলো। চৌধুরী বাড়ি থেকে মসজিদ টা খুব একটা দূরে নয়।তাই কিছুক্ষণের মাঝেই ফারিস মসজিদে পৌঁছে গেলো। একে সব মুসলমান গণ দল বেধে মসজিদে প্রবেশ করলো। সকালের আবহাওয়া প্রতদিনের মতোই ঠান্ডা। কিছুক্ষণের মাঝেই নামাজ শুরু হলো সবাই সারি বেধে নামাজ পড়তে শুরু করলো।
নামাজ শেষে মোনাজাত করে করে সবাই ধীরে সুস্থে বের হয়ে আসলো। ফারিসও মোনাজাত করে উঠে দাড়ালো। এই সাত বছরের ফারিসের করা প্রতিটা মোনাজাতই ছিলো নিশিতা আর শুধুই নিশিতা। মানুষ যে একজনের প্রতি কতো অবসেসড হলে মোনাজাতেও তাকে চাই ।
এটাই হয়তো ঘোর লাগা আসক্তি। যা কখনো মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। ফারিস মসজিদ থেকে বের হয়ে সোজা চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্য হাঁটতে শুরু করলো। সকালের আবহাওয়া টা সকালে মন ছুয়ে যাওয়ার মতো। ফারিস চারদিকে তাকাচ্ছে আর হাঁটছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফারিস চৌধুরী ভিলার সামনে আসলো। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে দেখলো বাড়িটা একদম নীরব। চৌধুরী বাড়ির সবাই নামাজের জন্য উঠলেও কেউ রুম থেকে বের হয় না, সবাই যে যার ঘরে নামাজ পড়ে আবারও একটু রেস্ট নেয়, নাহলে ঘুমায়। ফারিস আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা উপরে চলে গেলো। আজকে নিশিতার এক্সাম আছে কথাটা ফারিসের মাথা থেকে যায়নি। ফারিস উপরে নিজের রুমে গিয়ে দেখতে পেলো নিশিতা এখনও বেঘোরে ঘুমিয়ে আছে। ফারিস মনে মনে বলল,
“ম্যাডামের এখনও ঘুম ভাঙেনি…”
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“নামাজের সময়টাও শেষ।”
ফারিস ধীরে ধীরে নিশিতার কাছে গিয়ে বসলো।
নিশিতার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

“আচ্ছা আল্লাহ কি দুনিয়ার সব সুখ তোর মাঝেই দিয়ে ছিলো নিশি? তোকে দেখলেই কেন এতো মায়া লাগে? মনে হয় বুকের মধ্যে তোকে রেখে দিই, যেন কেউ তোকে আমার থেকে দূরে না করতে পারে সবসময় আমার হয়েই থাকিস।”
ফারিস আর কথা বাড়ালো না, একদৃষ্টিতে নিশিতার দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে বলল,
“এই বেপরোয়া, ছন্নছাড়া, অগোছালো, বদমেজাজি মানুষটাও এতোটা ছোট মেয়ের ভালোবাসায় আটকে গেলো নিজের ফিলিংসগুলোর কাছেই হেরে গেলো। হয়তো এটাই হওয়ার ছিল, আর এটাই হয়েছে। ”
কিন্তু ফারিস বরাবরই তার ফিলিংসগুলো প্রকাশ করতে ব্যর্থ… কেমন যেন ধোঁয়াটে মানুষটা। কারও কাছেই পরিষ্কার না মুখ দেখে কখনো বোঝার উপায় নেই, মনে কি চলে। মেজাজ তো সবসময়ই উগ্র-রাগী। এসব ভাবতে ভাবতেই ফারিস দেওয়ালে ঝুলানো ঘড়িটার দিকে তাকালো।
৬:৩০ বাজে। নিশিতাকে এখন না তুললে কলেজে যাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করবে। তাই বেশি কিছু না ভেবে নিশিতাকে ডাকলো,

“বউ ও বউ, শুনছেন? উঠে পড়ুন… সকাল হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে শাওয়ারটা করে নিন, নাহলে কলেজে যেতেও দেরি হয়ে যাবে। উঠুন, ম্যাডাম।”
কিন্তু এতেও নিশিতার কোনো হেলেদুল দেখা গেলো না। ফারিস একটু তাকালো নিশিতার দিকে।
নিশিতার ঘুম দেখে বুঝতে পারলো যে এতো সহজে ঘুম ভাঙবে না। তাই ফারিস একটু নিচে ঝুঁকল। নিশিতার মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে আস্তে করে ঠোঁট ছোঁয়ালো নিশিতার গালে। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল,

“এই যে মিসেস চৌধুরী উঠুন, নাহলে এবার কিন্তু পরীক্ষা মিস হয়ে যাবে। আর আপনার এখন শাওয়ার নেওয়া উচিত। কালকে রাতে কি হয়েছে মনে আছে তো, জান পাখি?”
নিশিতার কিছু ফিল হতেই চট করে চোখ খুলে ফেলল। ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি একটু ঘুমাবো প্লিজ, ফারিস ভাই আমাকে ঘুমাতে দেন। এমনি কালকে ঘুমাতে পারিনি।”
ফারিস নিশিতাকে এক প্রকার জোর করেই বেড থেকে উঠালো। ঘুমের মধ্যে বিরক্ত হয়ে নিশিতা বলল,
“ছাড়ুন না ফারিস ভাই আমার এখনও ঘুমাতে ইচ্ছে করছে।”
ফারিস হঠাৎ করে বলল,

“ছাড়ার জন্য ধরিনি তোকে। যা, তাড়াতাড়ি গিয়ে শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে আয়। আবারও একটু রিভাইজ দিবি।”
নিশিতা এবার আর জোর করলো না। ঘুম ঘুম চোখ কচলাতে কচলাতে শাওয়ার নেওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। আজকে অবশ্য পরীক্ষার জন্য নিশিতারও বেশ চিন্তা হচ্ছে। যদিও সিলেবাস কমপ্লিট, তারপরও পরীক্ষা জিনিসটাতে সবাই একটু না একটু নার্ভাস হয়ে পড়ে।
কিন্তু নিশিতার ওপর ফারিসের পুরোপুরি বিশ্বাস আছে ও ভালোই কিছু করবে। তবে মাঝে মাঝে ফারিসও একটু চিন্তা করছে, তা প্রকাশ্যে আনছে না। কারণ তার চিন্তা দেখা গেলে নিশিতাও চিন্তিত হয়ে পড়বে। তাই এগুলো ওর সামনে না বলাই শ্রেয়।
এর মধ্যে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশিতা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসলো। চুলগুলো ভেজা, মাথায় টাওয়াল জড়ানো। ঘুমের রেশটা এখন আর নেই নিশিতাকে দেখে বেশ প্রাণবন্ত লাগছে।
ফারিস নিশিতাকে ওয়াশরুম থেকে বের হতে দেখে নিশিতার কাছে এগিয়ে গেলো। একবার নিশিতার দিকে তাকালো। তারপর নিশিতার হাত ধরে আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে বসালো।
নিশিতা এমন কাণ্ডের আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারলো না। হুট করে তাকে এভাবে আয়নার সামনে বসানোর কারণই বা কি তাও বুঝতে পারলো না। ফারিস নিশিতার কোনো কথার জবাব না দিয়ে হেয়ার ড্রায়ারটা বের করলো। নিশিতার চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে ভালো করে মুছে দিলো।
তারপর হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুলগুলো শুকাতে শুরু করলো। হঠাৎ এমন কাণ্ডে নিশিতা কিছুই বুঝতে পারলো না।
একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
কি করছেন?”
“কি করছি, সেটা একটু পরেই নিজেই দেখতে পাবি। এখন আপাতত চুপচাপ বস।”
ফারিসের প্রতিউত্তরে নিশিতা বলল,

“বাবা বাহ কেয়ারিং হাসবেন্ড!”
ফারিস আর কিছু বলল না। চুপচাপ চুল গুলো শুকিয়ে তা দিয়ে নিখুঁত হাতে বেনী করে দিলো নিশিতা লম্বা চুল গুলো তে। যেই চুল গুলো কোমর ওব্দি সেই চুল গুলোই এখন প্রায় হাটু ছুঁই ছুই। ঘন
কালো হালকা কার্লি চুল গুলো বেশ সুন্দর দেখা যায়। এর আগে বড় হলে অবশ্য নিশিতা নিজেই পার্লার গিয়ে কেটে আসতো কিন্তু এখন ফারিসের জন্য আর যায় হোক চুল গুলো কাটার সাহস পায় না। আর নিশিতা তো জানে ফারিস তার এই চুল গুলো কতোটা পছন্দ করে। এর মাঝেই ফারিস একদম নিখুঁত ভাবে নিশিতার চুল গুলো গুছিয়ে বেণী বেধে দিলো। নিশিতা একটু অবাক হলোএতো সুন্দর করে চুলগুলো বাঁধা দেখে। নিশিতা অবাক দৃষ্টিতে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি সব দিক দিয়েই কি পারফেক্ট, ফারিস ভাই? এতো সুন্দর করে বেণী করলেন কিভাবে? আপনি কি সব পারেন?”
ফারিস স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“পারফেক্ট কি না জানি না, তবে তোর জন্য এতোটুকু করতেই পারি। আর সব থেকে বড় কথা এমন কোনো কাজ নেই যা ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী পারে না।”
নিশিতা আর কিছু বলল না। নিশিতা মাঝে মাঝে নিজেই ভেবে পায় না এই মানুষটা এতটা পারফেক্ট কেমন করে? সব কিছুর মাঝেও কতটা খেয়াল রাখে তার। এসব ভাবনা ভাঙলো ফারিসের কথায়। ফারিস বলল,
“আয়, এবার একটু রিভাইজ দিবি। তারপর একটু রেস্ট নিস। তোর টাইম সিডিউল আমি ফিক্সড করে রেখেছি।”
আবারও বলল,
এখন পড়তে বসছি এখন বাজে ঠিক ঠিক ৭:০০।
“একেবারে ৭:০০ থেকে ৮:৩০ পর্যন্ত পড়বি। তারপর রেডি হয়ে নিচে গিয়ে নাস্তা করে আমার সাথে ৯:৩০-এ বের হবি। পরীক্ষা যেহেতু ১০:৩০।”
নিশিতা অবাক হয়ে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে শুধু একটা কথাই চলছে এই লোকের এতোকিছু কিভাবে মনে থাকে? আমার থেকে তো দেখি আমার পরীক্ষা নিয়ে উনারই বেশি চিন্তা! ফারিস আবারও বলল,

“কি রে পড়তে বসবি না?”
নিশিতা মাথা নাড়ালো। ফারিস বই-খাতা আবারও নিশিতার সামনে এনে রাখলো। ফারিস অংক বুঝাচ্ছে, কিন্তু নিশিতা? এখনও ফারিসের দিকে মুগ্ধতার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। ফারিস তা দেখে বিরক্ত হলো। সে নিজে তার এতো কাজ ফেলে এই মেয়েটার পরীক্ষার জন্য এতো কিছু করছে, আর সে কি করছে? এভাবে ফারিসকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে!
ফারিস বিরক্ত হয়ে চরম পর্যায়ে গিয়ে বলল,
“এই তুই কি পড়বি, নাকি আমি লাঠি আনবো? এভাবে নিজের বরের দিকে তাকাতে লজ্জা করে না তোর?”
নিশিতা সেই মুহূর্তে ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। সত্যিই তো আজকাল সে কি রকম বেহায়া হয়ে যাচ্ছে! ভাবতেই নিজেই কেমন যেন লজ্জা পেল। কারণ অকারণে শুধু ফারিসের দিকেই তাকিয়ে থাকে। নিশিতার এই অবস্থা দেখে
ফারিসের বিরক্তিটা কিছুটা কমলো। তারপর নরম কণ্ঠে বলল,
“এদিকে আয়।”
নিশিতা আর কথা বাড়ালো না। চেয়ার থেকে উঠে ফারিসের সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো।
ফারিস নিশিতাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কোলে বসিয়ে নিলো। নিশিতার কোমর আঁকড়ে ধরে নিজের সাথে আরও চেপে ধরে বলল,
“যা বোঝাচ্ছি বুঝে নে। এই অংকগুলো পরীক্ষায় আসবেই।”
নিশিতা হালকা করে মাথা নাড়ালো। তারপর ফারিস একের পর এক অংক বোঝাতে থাকলো।এবার নিশিতা মনোযোগ দিয়ে সব বুঝে নিলো।

এদিকে ঘড়ির কাটায় আটটা বেজে চল্লিশ মিনিট।
নিচে বাড়ির সবাই একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসা। মেইডরা একের পর এক খাবার এনে পরিবেশন করছে।রিয়া আর তনয়া বসে বসে গল্প করছে। রিয়া একেবারে রেডি হয়ে নিচে এসেছে, যাতে অযথা সময় নষ্ট না হয় নাস্তা করেই বের হয়ে যেতে পারে। আর তনয়াও রোজকার মতো ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে এসেছে।
রাজীব, আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী একে অপরের সাথে কথা বলছে। আর বাড়ির দুই গিন্নি সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।কথার মাঝেই আরাফাত চৌধুরী বললেন,
“আফিয়া, তোমার ছেলে আর বউ মা কোথায়? আজকে তো নিশির পরীক্ষা আছে। এখন নাস্তা না করে যাবে নাকি? তাড়াতাড়ি কাউকে পাঠাও ওদের ডেকে আনতে।”
আফিয়া চৌধুরী মাথা নেড়ে রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

“রিয়া, মা! যা, তো তোর ভাইয়া আর ভাবিকে ডেকে নিয়ে আয়। একটু পরে বের হলে তোদের আবারও লেট হয়ে যাবে।”
রিয়া চেয়ার থেকে উঠে মনে মনে বলল,
“হু… নিশিকে নাকি আমি আবারও ভাবি বলবো।”
বলেই সিঁড়ির দিকে যেতে গেলেই দেখলো নিশিতা আর ফারিস নেমে আসছে।রিয়া এগোতে গিয়ে হঠাৎ ফিরে এসে চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
“ওই দেখো, আম্মু, ভাইয়া আর ভাবি আসছে।”
বলেই একটা চিলতে হাসি দিলো দুষ্টুমি মাখা।
তনয়া রিয়ার কানে কানে বলল,
“সারারাত মনে হয় বিগ ব্রো আমার বোনটাকে ঘুমতে দেয়নি রে।”

রিয়া ফিসফিস করে হেসে ফেলল, তবে জোরে নয়। নাহলে বাড়ির তনয়া আর রিয়াকে আচ্ছা করে বকে দিবে।নিচে নিশিতা আর ফারিস নেমে আসলো। পাশাপাশি দুটো চেয়ার টেনে বসলো। আগে সাধারণত নিশিতা আর ফারিস আলাদা চেয়ারে বসতো, তবে এখন ফারিস নিশিতাকে দূরে কোথাও বসতে দেয় না নিজের পাশেই বসায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে খাওয়ার পর্ব শেষ হলো। সবাই সবার মতো কাজে বের হয়ে গেল। বাড়ির দুই কর্তা গাড়ি নিয়ে তাদের অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ফারিস আজকে নিশিতা আর রিয়াকে কলেজে ড্রপ করতে যাবে, তাই রাজীবকে আগেই বলে দিয়েছে। জানো, রাজীব আজকে ফারিসের অফিস সামলে নিলো। ফারিসের অফিসে যেতে যেতে, নিশিতাদের ড্রপ করতে করতে বেশ দেরি হবে তার।

এদিকে ফারিসের কালো মার্সিডিসটা থামলো নিশিতাদের কলেজের ঠিক সামনে। পুরো রাস্তা ধরে রিয়া আর নিশি চুপচাপ বসে ছিল, কারণ তাদের মনে পরীক্ষা নিয়ে একটু ভয় তো আছেই।
ফারিস অবশ্য নিশিতাকে অনেকবার বুঝিয়েছে—ভয় পেও না, ভালো করে পরীক্ষা দাও। তার জোরেই নিশিতা সাহস সঞ্চয় করে এতদূর এসেছে।
ফারিস গাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিলো। রিয়া আর নিশিতা বের হয়ে এলো। গাড়ি থেকে বের হতেই ফারিস রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কলেজের ভিতরে যা, আর ভালো করে পরীক্ষা দাও। তোকে নিয়ে আমি চিন্তিত পাশ করতে পারবে কি না।”
কথাটা শুনে রিয়ার একটু রাগ হলো, তবে প্রকাশ না করে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়া, নিশুও তো যাবে আমার সাথে!”
রিয়া কথা শেষ করার আগেই ফারিস বলল,
“তুই যা, আমার বউ যাচ্ছে, ওর সাথে আমার কথা আছে।”

এই বলে নিশিতার হাতটা ধরলো।রিয়া আর কিছু না বলে বিরক্তি নিয়ে হেটে গেল, বিড়বিড় করে বলল,
“হ্যাঁ বোন, চোখে পড়ে না, আর বউ এতো কাছে থাকলেও চোখ হারায়। কি ভালোবাসা ? বউয়ের সিলেবাস কমপ্লিট হয়নি বলে রাত জেগে বউকে পড়ানো, আর এদিকে বোন কি পারলো না পারলো দেখার সময় নেই। আর কথায় কথায় ‘বউ বউ’ বলে অধিকার খাটানো। ভাইয়ার বউ কি আমি নিয়ে যাচ্ছি? হু তাতে আমার কি যায়।”
রিয়া কথা গুলো বিড়বিড় করলেও নিশিতার কানে গেল। রিয়ার কথা শুনে নিশিতা হালকা একটু হাসলো। ফারিস রিয়ার কথায় কান না দিয়ে নিশিতার আরও কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। গালে হাত রেখে বলল,
“ভালো করে পরীক্ষা দিবি। যা যা শিখিয়েছি সব মনে রাখবি, আর এক্সট্রা প্যানিক করবি না। পরীক্ষা শেষে আমি নিতে আসবো। মন দিয়ে পরীক্ষা দিবি ওকে?”

নিশিতা সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লো। ফারিস নিশিতার কপালে গাঢ় করে একটা চুমু দিলো। ফারিসের এহেন কান্ডে নিশিতা লজ্জা পেলো। চারিদিকে একবার তাকালো কে আছে কি না দেখতে।ফারিস বলল,
“কি দেখছিস? যা ভিতরে, যা তুই ভিতরে গেলে, আমিও যাবো।”
নিশিতা ছোট করে মাথা নাড়িয়ে কলেজের ভিতরে চলে গেলো। ফারিসও গাড়িতে উঠে বসলো।
নিশিতা কলেজের ভিতরে গিয়ে ক্লাসে গিয়ে বেঞ্চে বসলো। দেখলো, আগে থেকেই রিয়া আর অহনা গল্প করছে।
ঘড়ির কাটায় ৯ বেজে ৩৫ মিনিট মানে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যাররা চলে আসবেন। তাই এই সুযোগে রিয়া আর অহনা গল্প করছে।
নিশিতাকে দেখে রিয়া দুষ্টু হাসি রেখে বলল,

“কি ভাবি, বরের আদর নেওয়া হয়েছে? আমাকে তো ভাইয়া তাড়িয়ে আপনাকে আদর করার জন্য।”
রিয়ার কথায় অহনা ফিসফিস করে হেসে ফেলল।
কিন্তু নিশিতা বিরক্ত হয়ে বলল,
“রিয়ু, একদম জ্বালাবি না। তোর কপাল খারাপ আছে আজকে। এমনিতেই পরীক্ষার চিন্তায় আমার অবস্থা খারাপ, তারপর তুই আবার এগুলো শুরু করছিস।”
এবার রিয়াও চুপ হয়ে গেল। পরীক্ষার কথা মাথায় আসতেই রিয়া আর অহনার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।রিয়া আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লাসে দুইজন স্যার এলো। সবাইকে খাতা দেওয়া হলো। পুরো ক্লাস একদম নীরবতায় ছেয়ে গেল। সবাই সবার মতো কেউ খাতায় দাগ টানছে, কেউ প্রয়োজনীয় কলম বা পেন্সিল বের করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘন্টা পড়তে শুরু করলো। সবাইকে প্রশ্ন দেওয়া হলো।

এবার শুধু লেখার পালা। নিশিতার হাতে প্রশ্ন আসতেই সে প্রশ্নগুলো পড়তে শুরু করল।
এবং অবাক করা কান্ড ফারিস বেছে বেছে যে অংকগুলো পড়িয়েছে, ঠিক সেই অংকগুলোই হুবহু পরীক্ষায় দেওয়া হলো। নিশিতা যেন,এতক্ষণে চিন্তামুক্ত হয়ে গেছে। সব কমন পেয়ে আর সময় নষ্ট না করে লেখা শুরু করলো।
২টায় পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। নিশিতা, রিয়া আর অহনা একসাথে প্রশ্ন মিলাচ্ছে। কার কোনটা হয়েছে, কার হয়নি সবকিছু একে একে যাচাই করা হচ্ছে।রিয়া বলল,
“নিশু রে, আমি এবার নিশ্চিত ফেল করবো। আমার ভাইয়াকে পেয়ে তুই তো টপ করবি, কিন্তু আমি কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না রে।”

নিশিতা রিয়ার কথা শুনে হেসে ফেলল। তারপর একটু সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বলল,
“আরে না চিন্তা করিস না। ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরীর বোন তুই। তোর মুখে এগুলো কি মানায় বলতো আমার কাছে।”
নিশিতার কথা শুনে অহনা হাহা করে হেসে উঠল। নিশিতাও একটু হেসে ফেলল। রিয়া বিরক্ত হয়ে, আসহায়ের মতো মুখ করে বলল,
“তোরাও আমাকে নিয়ে মজা নিচ্ছিস। আচ্ছা নে, তবে একদিন আমারও দিন আসবে। ওই দিন তোদের মজা দেখাবো আমি।”
নিশিতা রিয়ার কথায় পাত্তা দিল না। চারপাশে তাকিয়ে দেখল, সব স্টুডেন্টও একে একে বাড়ি চলে যাচ্ছে। কেউ বা দাড়িয়ে দাড়িয়ে গল্প করছে, কেউ পাশের দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করছে।
শেষ হয়েছে অনেক আগে, কিন্তু ফারিস এখনও আসেনি। তা নিয়ে নিশিতা বেশ চিন্তায় আছে। ফারিস তো বলেছিলো তাড়াতাড়ি চলে আসবে। হয়তো কোনো কাজে আটকে গেছে নাহলে এতোক্ষণে তো চলে আসতো। এসব ভাবনার ছেদ পড়লো হঠাৎ চেচামেচি শুনে। সবাই দৌড়ে পালাচ্ছে। নিশিতা তখনও বুঝতে পারলো না কী হয়েছে। হঠাৎ দেখলো, সামনে কিছু ছেলে একটা ছেলেকে ধরে মারছে, বাজে ভাবে।

নিশিতা আবাক হয়ে দেখলোকেউ এগিয়ে গেল না। সবাই দূর থেকে তা দেখছে। মানুষ কি এতোটা খারাপ যে এসব দেখে কেউ এগিয়ে গিয়ে আটকাচ্ছে না! নিশিতা দেখলো, রিয়া ভয়ে অহনার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অহনা নিশিতাকে বলল,
“এদিকে আস, নিশি। এরা ভালো না। এক একজন বখাটে ছেলেদের দল।”
নিশিতা মনে মনে বলল,
“একজন এভাবে মারছে আর সে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে? না, কিছুতেই এটা হতে পারে না। ছেলেটাকে থামাতে হবে।”
কিন্তু নিশিতার কানে কথা গেল কি গেলো না, তার ঠিক নেই। এরপর নিশিতা একপ্রকার দৌড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে চিৎকার করে বলল,
“থামুন! যা করছেন তা কি হ্যাঁ? একটা ছেলেকে এভাবে মারছেন? ও যদি মরে যায়, তাহলে কি হবে ভাবছেন? দূরে সরুন ওর থেকে, বেয়াদব!”

তিন-চার ছেলের মাঝ থেকে একজন নিশিতার দিকে এগিয়ে গেলো। নিশিতাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বলল,
“এই মেয়ে, তোর সমস্যা কোথায়? আমরা ওকে মারছি, তোর কি? শুনেছি তুই চৌধুরী বাড়ির মেয়ে, তাই এসবের মধ্যে ঢোকা লাগবে না।”
নিশিতার রাগ আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেলো।
রাগে চিৎকার করে বলল,
“এই তোর সাহস কিভাবে হয়! এভাবে একা পেয়ে একটা ছেলেকে মারার? তোরা মানুষ নাকি যানুয়া? এভাবে মারছিস ছেলেটাকে!”
নিশিতা একবার চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনারা কি মানুষ? একজন ছেলেকে এভাবে মারছে আর সবাই তা শুধু দেখছে!”
নিশিতা যে এমন কাজ করবে, রিয়া তা ভাবতেও পারেনি। অহনা আর রিয়া হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যখন বুঝলো ঝামেলা আরও বাড়তে পারে, তখন রিয়া আর অহনা দৌড়ে গেল নিশিতার কাছে। কিন্তু তার আগেই বখাটে ছেলেটা নিশিতার ডান হাত চেপে ধরলো।রাগে কটমট করে বলল,
“তোকে না বলছিলাম এসবের মধ্যে ঢুকবি না, তারপরও তোর এতো সাহস আসে কোথা থেকে?”
নিশিতা কেমন জানো গা ঘিন ঘিন করে উঠলো।
একটা ছেলে এভাবে তাকে স্পর্শ করবে সেটা সে কিছুতেই মানতে পারলো না। কান্না করতে করতে লোকটার দিকে ক্ষোভ নিয়ে তাকিয়ে বলল,

“যানুয়ার, আমার হাত ছাড়!”
নিশিতার কথায় ছেলেটা হেসে বলল,
“আজকে কাকে কি বলেছিস, তাই তুই বুঝবি।”
বলেই নিশিতাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলো। দূর থেকে রিয়া আর অহনা এসব দেখলো। রিয়া কিছু বলতে পারলো না, ভয়ে। কিন্তু অহনা চুপ থাকতে পারলো না। নিজের বান্ধবীকে বাঁচাতে ছেলেটার কাছে গেলো। নিশিতার হাত টান মেরে ছাড়িয়ে দিলো। তারপর ছেলেটাকে কিছু বলার আগেই ফারিসের শক্ত-পক্ত হাতের ঘুষি এসে থুবড়ে পড়লো ছেলেটার মুখে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা ছিটকে পড়লো। নিশিতার কান্না এখনও থামেনি, কিন্তু ফারিসকে এভাবে হঠাৎ এসে দেখলে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
নিশিতাকে কান্না করতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে নিশিতাকে অহনার থেকে টান মেরে নিজের বুকে চেপে ধরলো। নিশিতার কান্না আরও বেড়ে গেলো।
ফারিস নিশিতাকে কিছু না বলে ওই ছেলেগুলোকে দেখলো পালিয়ে যেতে, আর যাকে মারলো সে আর উঠে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা নেই।
ফারিস রাগে কটমট করে বলল,

“বাস্টার্ড, মাদারফাকার, তোর সাহস কিভাবে হয় আমার পবিত্র ফুলটাকে ছোয়ার? তোকে আমি জানে মেরো ফেলবো, জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ্।”
ফারিসের রাগ কিছুতেই কমলো না, ছেলেটাকে এভাবে মারার পর।বলেই সঙ্গে সঙ্গে নিহানকে ডেকে বলল,
“ নিয়ে যাও, ওর সাথে একটুপর একে জমের সাথে দেখা করতে হবে।”
নিহান আর কিছু বলল না। চুপচাপ স্যারের কথা শুনে অজ্ঞান হওয়া ছেলেটাকে গাড়িতে করে নিয়ে চলে গেল।ফারিস রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“রাজীবও এসেছে, তোরা ওদের সাথে চলে যা। আমি একটু পরে আসছি।”
অহনা দেখলো রাজীব গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রিয়া আর অহনা কোনো কথা বলল না। চুপচাপ মাথা নেড়ে গাড়িতে উঠে বসলো। এই মুহূর্তে যা হলো, তা সবই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে রিয়া আর অহনার। হঠাৎ করে ফারিস কোথা থেকে এলো, তাই বুঝতে পারছে না। আসলে আজকে ফারিসের নিশিতাকে নিয়ে যাওয়ারও কথা ছিল, আর সাথে তার একটি মিটিংও ছিল। ফারিস মিটিং থেকে ফেরার পথে ভেবে ছিল যে নিশিতাকে নিয়ে যাবে, আর সেই জন্যই সব কিছু ছেড়ে নিশিতার কাছে ছুড়ে চলে এসেছিল।
নিহানকে অন্য একটি গাড়িতে পাঠাতে বলল,

রিয়া রাজীবের সাথে যেতে পারে। কিন্তু এখানে এসে হঠাৎ এসব দেখে ফারিস নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ছেলেটাকে মারলো।
ছেলেটাকে মারার পরও রাগ কমলো না। কিন্তু নিশিতার সামনে এভাবে থাকলে সে আরও ভয় পাবে, তাই ফারিস নিজের যথাসম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করলো। নিশিতার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“শান্ত হ, জান, আমি আছি। তোকে সব কিছুর থেকে রক্ষা করার জন্য। তুমি শুধু আমার পাশে থাক, আমি পুরো দুনিয়ায় বিপক্ষে গিয়ে তোকে রক্ষা করবো। শুধু আর শুধু আমার একান্ত, সব চাইতে পবিত্র, সুন্দর ব্ল্যাকরোজটার দিকে হাত বাড়ানোর সাহস করবে আমি তাকে একদম মুছে ফেলবো। আই রিপিট, মুছে ফেলবো।”
নিশিতা কিছু বলল না, তবে এবার কিছুটা শান্ত হলো। ফারিস আর সময় নষ্ট না করে নিশিতাকে কোলে তুলে নিলো। নিশিতাও কিছু বলল না, চুপচাপ। ফারিসও আর নিশিতাকে কিছু বলল না। কোলে তুলে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।
নিশিতার মন-মেজাজ এমনিতেই খারাপ ছিল। এর মাঝে হঠাৎ চোখ পড়লো কলেজের কিছু মেয়ের দিকে ফারিসকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। জানো, এমন সুন্দর পুরুষ সে আগে কখনো দেখেনি।
আর ফারিস আর নিশিতাকে এতোটা কাছে দেখে মেয়েগুলো কেমন আচরণ করছে তা নিশিতার রাগকে চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিলো।
ফারিসের দিকে আগুনদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

“নামান আমাকে! যাবো না, আমি আপনার সাথে। অসহ্য লোক।”
ফারিস কিছুই বুঝতে পারলো না যে হঠাৎ করে নিশিতার কী হলো।বিরক্ত হয়ে বলল,
“কি হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”
নিশিতা রাগে কটমট করে বলল,
“আমি বুঝিনা, সব মেয়েরা শুধু আপনার দিকেই কেন তাকিয়ে থাকবে?”
কথাটা বলেই নিশিতা মুখ ঘুরিয়ে নিলে। ঠোঁট ফুলে আছে, চোখে একরাশ অভিমান তা দেখে ফারিস একটু হেসে কাছে এগিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে নিশিতার থুতনিটা আঙুল দিয়ে তুলে বলল,
“সবাই তাকায় নাকি? আমার তো খেয়ালই থাকে না। কারণ আমি তো শুধু এক জনকেই দেখি।”
নিশিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কাকে?”
ফারিস আরেকটু কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“যে এখন রাগ করে আছে আর ভাবছে আমি নাকি অন্যদের দিকে তাকাই।”
তুমি মুখে রাগ দেখানোর চেষ্টা করলে, কিন্তু চোখের কোণে হাসি লুকাতে পারলে না।
“রাগ করেছিস?” ফারিস জিজ্ঞেস করল,
নিশিতা আস্তে করে বললে,
“হুম একটু।”
“তাহলে শাস্তি কী?”
“আপনাকে সারাদিন শুধু আমার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে আর কারো দিকে না।”
ফারিস হেসে বললাম,

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫০

“এই শাস্তি আমি সারা জীবনের জন্য মেনে নিতে রাজি।”
নিশিতার রাগ তখন গলে নরম হয়ে গেছে,
আর তারপর আস্তে করে বলল,
“এইবার ঠিক আছে আমার রাগ অভিমান যা ছিলো সব উরে হাওয়া হয়ে গেছে।”
ফারিস বলল,
আচ্ছা এইবার তাহলে চলুন বাড়ি যাই। ”
তাই বলে নিশিতাকে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসিয়ে সিরবেল্ট বাঁধে নিজে উঠে বসলো। রওনা হলো চৌধুরী ভিলার উদ্দেশ্যে।।।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫২

1 COMMENT

Comments are closed.