চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৭+১৮
আয়াত বিনতে নূর
রাতের ছাদ হালকা বাতাসে একটু একটু দুলছে। চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
এই শান্ত, নরম আলোকেই নিশি নাচছিলো—মন খুলে, চাপা কষ্ট ঝেড়ে ফেলে। তার প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন বুকের জমে থাকা দুঃখগুলো আকাশে উড়ে যাচ্ছে। ফারিস কিছুক্ষণ আগেই ছাদে উঠেছিলো।
দূর থেকে নিশিকে দেখে সে থমকে যায়—
যে মেয়েটি তার ভয়ে বহু বছর নাচেনি, আজ সে এত স্বাধীনভাবে নাচছে কেন? ফারিসের চোখে বিস্ময়। নিশির শরীরের প্রতিটি নড়াচড়া এত সুন্দর, এত মায়াবী—যেন সে নাচের মধ্যেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ নিশির চোখ ফারিসের ওপর পড়তেই—
তার নৃত্যবদন থমকে যায়। চোখে অবাক বিস্ময়।
মনে মনে সে বলে ওঠে—
“ফারিস ভাই… এতো রাতে ছাদে কি করছেন?”
চিন্তার ঘোরে পা যেন ঠিকমতো চলছে না।
পড়তে যাচ্ছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে—
ফারিস দৌড়ে এসে তাকে কোমর থেকে ধরে ফেলে। নিজের কাছে ঠেকিয়ে রাখে কিছুক্ষণ।
তার গলায় দুশ্চিন্তা আর রাগ মেশানো সুর—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“Are you mad?! Damn it!”
এতোটুকু বলে সে নিশিকে ছেড়ে দেয়,
তবুও চোখে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগ স্পষ্ট।
নিশি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
ফারিস নিজেকে যতই গম্ভীর দেখাক—
তার ভেতরে ভিতরে এখনো এলোমেলো ভাব।
সে কড়া স্বরে জিজ্ঞেস করে—
“এতো রাতে ছাদে কি করছিস তুই? ভূতে ধরেছে নাকি?”
নিশি নিচু গলায় বলে—
“রুমে ভালো লাগছিল না… তাই একটু ছাদে এলাম।
চাঁদটা সুন্দর, তাই…”
ফারিস গম্ভীর গলায় গর্জে ওঠে—
“মন খারাপ তাই নাচ করছিস? বাহ!”
নিশি চুপ।
কারণ সে জানে—ফারিস ওয়াল ফাংশনের কথা জেনে গেলে খুব রাগ করবে।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফারিস আরও বলে—
“যা। এখনই নিচে যা।
আবারও মার খেতে চাস নাকি?”
নিশি কিছু না বলে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটে।
নিচে নামার আগে একবার পিছনে তাকায়—
ফারিসের দিকে। কিন্তু ফারিস ইতোমধ্যেই চিন্তায় ডুবে গেছে। ছাদে রাখা সোফায় বসে সে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। সেই নাচের দৃশ্য বারবার তার মাথায় ফিরে আসে।
“যে মেয়ে আমার ভয়ে এত বছর নাচেনি…
হঠাৎ আজ কেন?”
এই প্রশ্ন ঘুরতেই থাকে।
তিনি আর বেশি ভাবতে পারলেন না—
ফোন বেজে উঠলো। তারপর ফারিস ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলো।
নিশিতা নিজের রুমে ফিরে গিয়ে আঁচল ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিছানায়। তার মধ্যে অস্থিরতা—
ফারিস ছাদে কেন ছিলো? তাকে ফলো করছিলো নাকি? ফাংশনের কথা জেনে ফেলেছে?
মাথা ঘুরপাক খেতে থাকে।
রাত ১১টা দেখে সে অবশেষে ঘুমাতে যায়।
ভোর আজানের সুরে ঘুম ভাঙতেই
নিশি দ্রুত উঠে পড়ে,
ওড়না গায়ে নিয়ে ওয়াশরুমে যায়, অজু করে নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে।
৭:৩০ বাজতেই ছাদে পানি দিতে যায়। হালকা রোদে দাঁড়াতেই তার ফর্সা ত্বক আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ছাদে তাদের সাজানো গাছগুলো—
যেগুলো বিশেষ করে নিশির জন্যই
আরাফাত চৌধুরী লাগিয়েছিলেন।
গাছগুলো ছুঁইতে ছুঁইতেই হঠাৎ মনে পড়ে—
আজ তাড়াতাড়ি কলেজ যেতে হবে।
তাড়াহুড়ো করে রেডি হয়ে চুল শুকিয়ে, হিজাব পরে
নিচে নেমে আসে।
চৌধুরী ভিলার নিচতলার বিশাল ডাইনিং হলটাতে তখনো ভোরের আলো পুরোটা ছড়িয়ে পড়েনি। বড় কাঁচের জানালাগুলোর ফাঁক দিয়ে হালকা রোদ টেবিলের উপর ছড়িয়ে পড়ে যেন সোনালি গ্লাস পেইন্টিং তৈরি করেছে। ঘরটা শান্ত, এতটাই যে চামচের টুংটাং শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়।
এমন সময় সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নিশি—হিজাব পরা, মুখভর্তি একটা হালকা ক্লান্তির ছাপ, তবুও তার উপস্থিতি পুরো ঘরকে আলোকিত করে ফেলে। চোখে নরম ঘুমঘুম ভাব, চুলগুলো ভেজা, তবুও পরিপাটি।
ডাইনিং টেবিলে তখন রিয়া চেয়ার টেনে বসছে।
নিশি বসতে বসতে বলল—
— “কি রে রিয়া? তুই এত তাড়াতাড়ি কবে থেকে উঠিস?”
রিয়া ভেংচি কাটল, খুবই নাটুকে ভঙ্গিতে।
— “এই! তুই কি আমাকে অলস ভাবিস নাকি? দু–একদিন দেরি হলেই কি আর মানুষ অলস হয়ে যায়? আমি তো রোজ সকাল সকালই উঠি।’’
তার কথার ধরণ এমন যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষ। রিয়ার সেই নাটুকে ভাব দেখে
নিশি হাসতে বাধ্য হলো।
— “আচ্ছা আচ্ছা, আমার মা… তাড়াতাড়ি খা। আজকে কিন্তু কলেজে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। রিহার্সাল আছে। মিস করলে কিন্তু আর ঠিক হবে না।”
নিশি কথা বলতে বলতে একটা পাউরুটিতে জ্যাম লাগিয়ে মুখে পুরে নিলো।
আজকে তার ক্ষুধাই নেই—মনটা অন্য কোথাও।
রিয়া সেটা বুঝতে পারে, তবুও কিছু বলে না।
রিয়া যখন খাবার শেষ করার চেষ্টা করছে, তখনই পাশের দিক থেকে তীক্ষ্ণ, কিন্তু স্নেহমাখা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “না খেয়ে একটাও বাইরে যাবি না বাসা থেকে!”
আমেনা চৌধুরী।
চৌধুরী পরিবারের সেই মমতাময়ী অথচ শক্ত মানসিকতার মা। তার কথা শুনে নিশি আর রিয়া বাধ্য ছাত্রীদের মতো আবার বসে পড়ল।
নিশি মুখ বাঁকিয়ে বলল—
— “আম্মু, খেতে ইচ্ছে করছে না…”
— “ইচ্ছে না করলে কি হবে? শরীর তোমার, যত্ন আমার। চুপচাপ খেয়ে নাও।”
মায়ের চোখে এমন এক আদেশ থাকে যা অমান্য করা অসম্ভব। নিশি দুই–তিন চামচ খেলো, তারপর
মায়ের হাতে চুমু দিয়ে বলল—
— “আম্মু, আজকে হয়তো একটু লেট হবে। তুমি প্লিজ আমাকে কল দিও না। লাস্ট রিহার্সাল—মিস করতে চাই না।”
আমেনা চৌধুরী নিশির চুলে হাত বুলিয়ে একটা মমতাময়ী হাসি দিলেন।
— “ঠিক আছে। তবে খুব বেশি দেরিও করবি না। মা হয়ে সন্তানকে নিয়ে যে চিন্তা হয়, সেটা এখন বুঝবি না… একদিন নিজে মা হলে বুঝবি।”
নিশির মনে একটু নরম হয়ে এলো।
মাকে জড়িয়ে ধরলো আরও একবার।
তনয়ার আগমন ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো তনয়া—ব্যস্ত, ফ্যাশনেবল, কিন্তু ভীষণ ভ্রিলিয়েন্ট একজন মেয়ে।
হাত থেকে ব্যাগটা নামাতে নামাতে বলল—
— “চল আজ তোদের সাথেই যাবো। মজা হবে।”
তনয়া মানেই চৌধুরী ভিলার এনার্জি লেভেল দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া।
রিয়া খুশি হয়ে বলল—
— “চল, একসাথে যাই। তিনজন একসাথে গেলে কলেজে ঢুকতেই VIP ফিল আসবে।”
তাই তিনজনই গাড়িতে উঠলো। ড্রাইভার ইঞ্জিন চালু করতেই গাড়ি হালকা কম্পন নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। গাড়িতে ওঠার পর হইচই শুরু।
রিয়া একটু দুরন্ত সেই ভঙ্গিতে তনয়ার দিকে
তাকিয়ে বলল—
— “আপু, আমাদের দুলাভাই কি করে?”
তনয়া চমকে যাওয়ার ভান করল।
— “দুলাভাই? কোন দুলাভাই? তোদের কোনো দুলাভাই নাই।”
রিয়া মিটিমিটি হেসে বলল—
— “হ্যাঁ হ্যাঁ… এজন্যই তো সারাদিন ফোন নিয়ে বসে থাকো। কার সাথে কথা বলো, সেটা তো জানি না আমরা!”
তনয়া একটু লজ্জা পেয়ে চোখ ঘুরিয়ে উত্তর দিল—
— “ওহ আমার ফ্রেন্ড। তুই বেশি বুঝিস না, তোর এই ছোট মাথায় এতো চাপ নিতে হবে না ।”
তার কথার ধরণে একটা নরম আদর লুকানো ছিল।
রিয়া আর নিশি দু’জনেই হেসে উঠলো। গাড়ির ভেতর পুরোটা জুড়ে আনন্দের রোল পড়লো।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি কলেজের গেটের সামনে এসে থামলো। রিয়া আর নিশি নেমে দাঁড়ালো।
তনয়া হাত নেড়ে বলল—
— “বাই… তোরা ভালো থাক। আমি পরে আসছি।”
কিন্তু গাড়ি কিছু দূর এগোতেই তনয়ার চোখে পড়লো রাস্তার মোড়।
সে হঠাৎ বলল—
— “আজকে ভার্সিটিতে যাবো না। ড্রাইভার, গাড়ি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে নিন।”
ড্রাইভার কিছু না বলে গাড়ি ঘুরিয়ে দিলো।
তনয়ার মুখে তখন এক রহস্যময় শান্ত ভাব।
মনে হলো কোথাও খুব জরুরি একটা জায়গায় যাচ্ছে—যেটা কাউকে বলা যায় না।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রিয়া ফোন বের করে অহনাকে কল করতে থাকে। কিন্তু ফোন বারবার ব্যস্ত।
রিয়া মুখ কুঁচকে বলল—
— “এই মেয়ে কলেজে আসার আগেই কার সাথে এত কথা বলে?”
অবশেষে তারা দু’জন কলেজের ভেতরে প্রবেশ করতেই সামনে দেখা গেল অহনাকে।
অহনা হেঁটে আসছে—হালকা ক্লান্ত, চোখে বিস্ময়।
— “তোরা কোথায়? আমি তোকে কল দিচ্ছিলাম!”
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল—
— “তুই আমাকে কল দিছিস আর আমি তোকে কল দিচ্ছি। কে কারটা পাইছে? মাথা খারাপ!”
অহনা মাথায় হাত দিয়ে ‘আউচ’ বলে উঠলো—
এই দৃশ্য দেখে নিশি হেসে লুটোপুটি।
নাভিদের আবির্ভাব তারা ক্লাসরুমের দিকে যেতে না যেতেই নাভিদ সামনে এসে দাঁড়ালো।
তার চোখে অস্বস্তি… নিশি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার
চেষ্টা করতেই নাভিদ বলল—
— “প্লিজ দাঁড়া নিশি। আমার তোর সাথে কথা আছে।”
নিশি থামলো।
নাভিদ বলল—
— “দেখ… যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু আমি চাই না আমাদের ফ্রেন্ডশিপটা নষ্ট হোক। আমি আর তুই… সবসময় ফ্রেন্ড হয়ে থাকবো। প্লিজ এভাবে ইনগোর করিস না।”
সে খুব শান্ত, খুব ভাঙা গলায় বলল।
নিশি দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলল—
— “ঠিক আছে… কিন্তু শুধু ফ্রেন্ড। আর কিছু না।”
নাভিদ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
নিশি আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ক্লাসে ঢুকে গেলো।
ফারিস তখন নিজের রুমে ঘুমিয়ে। বড় ঘড়ির এলার্ম বেজে উঠতেই বিরক্ত হয়ে উঠে বসল।
— “শান্তিতে ঘুমাতেও দিবে না কেউ…”
ঠিক তখনই তার ফোনে কল—
নিহান, তার সেক্রেটারি।
নিহান বলল—
— “স্যার, আপনার ৩০ মিনিট পর মিটিং। আজকে ডিল সাইন করার লিস্টও আছে। ক্যান্সেল করবো?”
ফারিস চোখ কচলে বলল—
— “না। আসছি। রেডি হয়ে নিচে নামতেছি।”
ফারিস তাড়াহুড়ো করে শাওয়ার নিয়ে ফর্মাল স্যুট পরে নিচে নামলো। নিচে নেমে যায়, কিন্তু ড্রয়িং রুম ফাঁকা।নিশিতা নেই। ফারিসের বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক খালি অনুভূতি ছুঁয়ে গেল। সে নিজেই বুঝতে পারে না কেনো নিশিকে না দেখলে এভাবে অস্থির লাগে।
আমেনা চৌধুরী তাকে ডাকলেন—
— “ফারিস বাবা, কিছু খেয়ে যাবি না?”
— “নাহ ছোট আম্মু… বাইরে খেয়ে নিবো।”
বলে তাড়াতাড়ি বাইরে চলে গেলো।
পঞ্চম পিরিয়ড শেষ হতেই পুরো কলেজ যেন একসাথে দৌড় মেরে চলে এলো অডিটোরিয়ামের দিকে। আজ বার্ষিক সাংস্কৃতিক আজকেই শেষ রিহার্সাল। অডিটোরিয়ামের বিশাল হলরুম আলো–সাউন্ড–মিউজিকে শোরগোল করে উঠেছে।
মঞ্চের দুই পাশে ছেলে–মেয়েরা ছুটোছুটি করছে।
কেউ মাইক ঠিক করছে, কেউ স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে ডায়ালগ প্র্যাকটিস করছে, কেউ আবার নাচের পোশাক পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লাস্ট মুহূর্তের স্টেপ দেখে নিচ্ছে।
এই বিশাল বিশৃঙ্খলার মাঝেও একটা মুহূর্ত আসে—
যখন নিশি মঞ্চে উঠে দাঁড়ায়।
মিউজিক বাজতেই হলরুম যেন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে থাকে।
তার হাতের নরম আন্দোলন…
পায়ের মৃদু তাল…
গলার লাটিমের মতো ঘুরে যাওয়া ভঙ্গি…
সব কিছুই এমন নিখুঁত যে মনে হয়—
এই মেয়েটার জন্মই নাচের জন্য।
রিয়া আর অহনা দুই কোণায় দাঁড়িয়ে পুরো মনোযোগ দিয়ে ফলো করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী—নিশির নাচ যেন তাদের স্তব্ধ করে দেয়।
রিয়া ফিসফিস করে অহনাকে বলল,
— “তুই ওর মতো নাচবি? এ জন্মে না, পরের জন্মেও না।”
অহনা ঠোঁট কামড়ে বলল,
— “ঠিক আছে, পারবো না। কিন্তু আমি চেষ্টা করব!”
দুজনেই হাসল।
এভাবেই কাটতে লাগল তাদের শেষ রিহার্সালের ব্যস্ত সময়।
ঘণ্টাখানেক নাচ, গান, নাটকের রিহার্সালের পর সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। জল খেয়ে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তিনজন বের হয়ে আসে কলেজের গেটের দিকে।
নিশিতা বলল,
— “অহনা, তোকে গাড়িতে নিয়ে যাই। রিকশায় যাচ্ছিস কেন?”
রিয়া মাথা নেড়ে জুড়ে দিল,
— “হ্যাঁ রে, আমরা তো রোজই যাই! একদিন গেলে কী হয়?”
অহনা একটু লজ্জা পেল, একটু গর্বও—
— “না না, আমার বাবা সরকারি চাকরি করে।
আমরা এতটা লাক্সারি লাইফে অভ্যস্ত না।
রিকশাই ঠিক আছে। আমি রোজই এভাবেই যাই।”
তার চোখে অদ্ভুত এক আত্মসম্মান ঝিলিক দিল।
নিশি আর রিয়া আর জোর করল না।
তারা জানে—অহনা সংগ্রামী, নিজের জায়গা নিজে তৈরি করতে চায়। অহনা হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে রিকশায় উঠে চলে গেল।
অফিস থেকে বের হয়ে রাজীব প্রতিদিনের মতোই গাড়িতে উঠেছে। ঢাকার ট্রাফিক তো আগের মতোই অসহ্য— গাড়ি না এগোলে মানুষ, মানুষ না এগোলে ভাবনা এগোয় না! রাজীব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। বর্মন রোডের হালকা বিকেল—হাওয়া একটু নরম, একটু ক্লান্ত, একটু শান্ত।
এমন সময়…
তার চোখ আটকে গেল এক রিকশায় বসা মেয়ের দিকে। অহনা।
তার কোঁকড়ানো বেবি হেয়ার বাতাসে উড়ে যাচ্ছে।
মুখে কোনো সাজ নেই, তবুও সে দারুণ সুন্দর।
অদ্ভুতভাবে সুন্দর।
রাজীবের হৃদয়ের ভেতর হঠাৎ একটা অদৃশ্য ঝড় বয়ে গেল—
“এই মেয়েটা… এতো সুন্দর কেন?”
“আমি… আমি কি পছন্দ করে ফেললাম?”
“না… পছন্দ না… মনে হচ্ছে বিয়েই করে ফেলতে পারি।”
ভাবনার মধ্যেই সে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিল।
ড্রাইভার অবাক হলেও গাড়ি থামাল।
রাজীব নামল।
রিকশার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
— “এই, শোনো… নামো। আমি ড্রপ করে দিই।”
অহনা চমকে তাকাল।
তার মনে হলো—এ তো কলেজের সিনিয়রদের মতো দেখাচ্ছে। কিন্তু এমন ধরণের সাহায্য সে নেয় না।
সে বিনয়ের সাথে বলল,
— “না ভাইয়া… আমার যেতে সমস্যা হবে না।
রিকশাতেই কমফোর্টেবল আমি।”
“ভাইয়া”—এই শব্দটা যেন রাজীবের বুকে ছুরি হয়ে ঢুকে গেল।
সে হঠাৎ হাসতেও পারল না, বলতে চাইলেও মুখে কথা এল না। অহনা ভাড়া দিয়ে নেমে অন্য রিকশায় উঠে চলে গেল।
রাজীব দাঁড়িয়ে রইল রাস্তার মাঝখানে, সোজা হয়ে, স্তব্ধ হয়ে।
একজন পথচারী গাড়িওয়ালা চিৎকার করে উঠল,
— “ভাই, দাঁড়ায়া আছেন কেন মাঝ রাস্তায়?
আত্নহত্যা করবেন নাকি?
রাজীব ধীরে ধীরে চোখ ফেরাল।
মাথায় তখন ঘুরছে একটাই চিন্তা—
**“ও আমাকে… ভাইয়া বলল?
আমি?
যাকে দেখলে মেয়েরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে?
আমি—ভাইয়া?”**
এ যেন তার পুরুষ-ইগোতে সরাসরি আঘাত।
সে ভারী পায়ে নিজের গাড়িতে ফিরে গিয়ে বসল।
গাড়ির দরজা বন্ধ করার শব্দটা যেন তার বুকের ভেতরের আওয়াজকে ঢেকে দিল।
সেদিন জ্যামে আটকে থেকে গাড়ির জানালা দিয়ে আর কোনো কিছুকেই দেখতে পেল না সে।
তার মাথায় তখন শুধু একটাই শব্দ গুনগুন করছে—
“ভাইয়া…”
একটা শব্দ,
যা রাজীবের জীবনের হিসেবটাই বদলে দেবে।
আর কিছু না ভেবে বাড়ির দিকে গাড়ি ঘুরালো…….
এদিকে নিশিতা আর রিয়া বাড়ি চলে আসলো।
চৌধুরী ভিলার সামনে এসে ধীরে ধীরে থামলো নিশিতা আর রিয়ার গাড়ি। বাড়িটা আজ অদ্ভুত নীরব, অথচ সেই নীরবতার ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক ধরনের ঠাণ্ডা চাপ, গাম্ভীর্য, ক্ষমতার অহঙ্কারী প্রভাব। চৌধুরী বংশের প্রতিটি সদস্য যেন নিজেদের ছায়ার মতো নয়, বরং বিশাল কোনো দেয়ালের মতো চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকে—কখনো রক্ষা দেয়, কখনো শ্বাসরুদ্ধ করে।
গাড়ির দরজা খুলতেই ঝাঁঝালো শীতের হাওয়া নিশির মুখে জমে থাকা মৃদু ঘামটাকে শুকিয়ে দিলো।
রিয়া গাড়ি থেকে নেমে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
—”আহ! অবশেষে বাড়িতে এলাম! আমার এখন শুধু খাবার চাই।”
কিন্তু নিশি গাড়ি থেকে নামতেই থমকে গেল।
তার বুকটা কেমন যেন হঠাৎ ধক করে উঠলো।
এই ভিলার ভেতরে ঢুকলেই যেন তাকে কিছু একটা আঘাত করে, টেনে ধরে, সামনে ফেলে দেয়—যার মুখোমুখি হওয়া এখন তার পক্ষে অসম্ভব, অথচ সেই মানুষটির কাছ থেকে দূরে থাকাও অসম্ভব।
ফারিস। ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী। দরজার ভেতর প্রবেশ করতেই ড্রয়িং রুমের বড় ঝাড়বাতির আলো চোখে পড়লো। আর সেই আলোতেই সোফায় বসে থাকা তিনজন মানুষ স্পষ্ট হয়ে উঠলো—আরাফাত চৌধুরী, আলতাফ চৌধুরী নিশিতার বাবা , আর ফারিস ভাই ।
ব্যবসার হিসাব-নিকাশ, জমি, নতুন প্রকল্প—সব নিয়ে তাদের আলোচনার আওয়াজ ধীরে ধীরে কানে আসছিলো। কিন্তু সে আওয়াজই হঠাৎ মিলিয়ে গেল নিশির কাছে।
তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল ফারিসের চোখে।
ফারিস কথা বলা থামিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার চোখ দুটো এমনভাবে নিশিকে ভেদ করছিলো যেন সে প্রত্যেকটা শ্বাস-প্রশ্বাস গুনে ফেলতে পারে। তার ভেতরের অস্থিরতা, সংকোচ, না বলা কথা—সব যেন ফারিস নিঃশব্দে ধরে ফেললো।
আর নিশিতা?
সে পুরোপুরি বরফ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
হাতটা ব্যাগের স্ট্র্যাপে আলতোভাবে ধরা, চোখ স্থির, নিশ্বাস ধীর হয়ে এলো।
এমন নয় যে সে ফারিসকে দেখবে আশা করছিল না… বরং সে সবচেয়ে ভয় পাচ্ছিল ঠিক এটাকেই—ফারিসের সামনে পড়ে যাওয়া, তার সেই গভীর দৃষ্টি দেখে নিজের থাকা-না-থাকা ভুলে যাওয়া।
ফারিসের ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে আছে।
তার চোয়ালের লাইনটা আরও কঠিন হয়ে উঠলো—সেটা রাগ? ব্যথা? আকাঙ্ক্ষা?
নিশি ঠিক বুঝে উঠল না।
দু’জনের মাঝখানে এতটাই নীরব উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লো যে রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলেই ফেললো,
—“ওই! বরফের মানুষ, হাঁটবি নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে স্টাচু হয়ে থাকবি ?”
রিয়া নিশির হাত ধরে টেনে নিতে লাগলো।
—“কি রে? কি হলো তোর? চল উপরে। খিদায় পেট মোচড় দিচ্ছে। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না।”
কিন্তু নিশি নড়লো না।
মনে হলো তার পা মাটির সাথে লেগে গেছে।
অদৃশ্য কিছুর শিকল পা জড়িয়ে ধরেছে—আর সেই শিকলের নাম ফারিস।
রিয়া বিরক্ত হয়ে আবারও টান দিলো।
—“আরে চল তো! নাটক করবি না!”
এইবার তাদের টানাটানি দেখে আরাফাত চৌধুরী ভ্রূ কুঁচকে গম্ভীর গলায় বললেন,
—“হচ্ছেটা কি রিয়া? তুমি নিশিকে এভাবে টানছো কেন? মেয়েটা বাইরে থেকে এসেছে, একটু ঠিকঠাক দাঁড়াতেও দাও। এভাবে ঝাঁকুনি দিচ্ছো কেন?”
আরাফাত চৌধুরীর কণ্ঠে এমন একটা কর্তৃত্ব থাকে যা শুনলেই সবার ভেতর অদ্ভুত ভীতি জন্মায়।
রিয়া তো সাথে সাথে চুপসে গেলো। চোখ নামিয়ে রাখলো নিচের দিকে।
আর নিশির ধ্যান ভাঙলো যেন হঠাৎ কারো ঝাঁকুনিতে।
সে তড়িঘড়ি করে বললো,
—“না না বড় আব্বু… দয়া করে রাগ করবেন না। ওর কোনো দোষ নেই। আমি-ই… আমি একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কিছু না, আপনি চিন্তা করবেন না।”
আরাফাত কিছু না বলে শুধু মাথা নেড়ে আবার আলোচনায় মন দিলেন, যদিও তার চোখের কোণা দিয়ে ফারিস–নিশির অস্বাভাবিক পরিস্থিতি স্পষ্ট দেখেই ফেলেছিলেন।
এই সময় রান্নাঘর থেকে আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী বেরিয়ে এলেন। ওদের মুখে উদ্বেগ আর ব্যস্ততার ছাপ।
আফিয়া বললেন,
— তোরা দুইজন যা, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আস। সবাই না খেয়ে বসে আছে শুধু তোদের জন্য।”
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বললো,
—“হ্যাঁ , সে তো জানি। কিন্তু নিশিটাকে তো আগে নাড়াতে হবে! দেখ তো কেমন জমে গেছে!”
রিয়া মজা করে বললেও নিশির হৃদপিণ্ড তখনও যেন ধুকপুক করছে ভীষণ জোরে।
সে চোখ সরাতে পারছে না ফারিসের দিক থেকে…
আর ফারিসও না। দু’জনের মাঝখানে শব্দহীন একটা তীব্র টান ছড়িয়ে আছে—যা অন্য কেউ হয়তো খেয়ালই করে না, কিন্তু ওরা দু’জন ঠিকই বুঝতে পারে।
ঠিক তখনই সামনের প্রধান দরজাটা খুলে গেল ক্লিক করে।রাজীব ভেতরে ঢুকলো, মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কপালের ঘামে চুলগুলো একটু সামনে নেমে এসেছে। অফিসের ব্যাগটা এক হাতে ঝুলছিল, আর অন্য হাত দিয়ে জামার কলার একটু ঠিক করছিল।
আফিয়া চৌধুরী ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে কিছুটা বিরক্ত হাসি দিয়ে তাকালেন।
— “কি রে এত দেরি হলো কেন ফিরে আসতে? ফারিসের মতো দুই-দুইটা অফিস সামলাস নাকি তুইও আবার?”
কথাটা রাগ করে বলা হলেও তার ভিতরে একটা
মায়া, চিন্তা, আর খোঁজ—এই তিনটার মিশেল ছিল।
মায়ের মুখের ভাব দেখে রাজীব একটু সংকোচ নিয়ে মাথা চুলকালো। মুখে সেই বহুল পরিচিত বি
রক্তি—কিন্তু কণ্ঠস্বর পুরো শান্ত, বিনয়ী।
— “নাহ আম্মু, জ্যামে আটকে গেছিলাম। সে জন্যই দেরি হলো।”
তারপর আবার কিছুটা নরম স্বরে বলল—
— “আম্মু, আমি আগে ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
আফিয়া চৌধুরী কথার উত্তরে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
তিনি জানেন—রাজীব এমনিই, রেগে থাকা টাইপ না… তবে ক্লান্ত থাকলে কথায় একটু ছোট হয়ে যায়।
রাজীব আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো। তার পায়ের শব্দটাই যেন লিভিং রুমে একমাত্র শব্দ হিসেবে প্রতিধ্বনিত হলো।
ফারিসের দৃষ্টি তখনও বদলালো না।নিশি বুঝতে পারলো—সে যত পালাতে চাইবে, ফারিস তাকে ততখানি ধরে ফেলবে, প্রতিবার। এ যেন এক অদৃশ্য নিয়ম।
—
উপরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে রিয়া বললো,
—“নিশি, কি সমস্যা হচ্ছে? তুই তো ঠিক মতো হাঁটছিসও না।”
নিশি খুব ধীরে বললো,
—“না, কিছু হয়নি।”
কিন্তু রিয়া হাসলো,
—“মিথ্যে বলিস না। তোর চোখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে। আবার জমে গেছিস। তোর শরীর বরফ, মুখ গরম, চোখ কাচ!”
নিশি রিয়ার হাত চেপে ধরলো,
—“চুপ! কেউ শুনে ফেলবে!”
রিয়া আরও জোরে হাসলো,
—“কেউ তো আছে যে বাইরে থেকে তোকে যে চোখে দেখছিল—বলো কি চোখ! মনে হলো যেন ওকে ছাড়া পৃথিবীর কিছুই দেখছে না!”
নিশি রিয়ার মুখ চিপে বললো,
—“আর একটুও না! থাম!”
কিন্তু নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই নিশির বুকের ভেতর যেন আবার কেঁপে উঠলো।
ফারিসের সেই দৃষ্টি তার মাথার মধ্যে ঘুরছে।
প্রতিটা মুহূর্ত যেন আবারও সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।
সে জানালার দিকে এগিয়ে দাঁড়ালো।
গভীর নিশ্বাস নিলো। কিন্তু কোথাও যেন শান্তি নেই।
“কেন এমন হচ্ছে ?”
মনে মনে প্রশ্ন করলো নিশি।
“কেন ওকে দেখলেই আমার শরীরের রক্ত জমে যায়, আবার একই সাথে দৌড়ে গিয়ে ওনার কাছে দাঁড়াতে ইচ্ছে হয়?”
তার চোখে তখনও ভাসছে ফারিসের সেই দৃষ্টি—
নিঃশব্দ, গভীর, অদ্ভুত শক্তিশালী।
মনে হলো যেন ফারিস কথায় না বলেও বলে দিচ্ছে—“আমি আছি।”
“তুই পালাতে পারবি না।” নিশি চোখ বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু সে জানে… ফারিস থেকে সে সত্যিই কখনো পালাতে পারে না।
নিশির উপরে চলে যাওয়ার পরও ফারিসের চোখ স্থির হয়ে ছিলো সিঁড়ির দিকে।
যেদিকে কিছুক্ষণ আগেই নিশি অদৃশ্য হয়ে গেল।
আলতাফ চৌধুরী বললেন,
—“বাবা, মনোযোগ দে। মিটিং এর কাগজপত্র তোকে দেখাতে হবে।”
ফারিস ধীর গলায় বললো,
—“হুম।”
কিন্তু তার মনোযোগ কোথাও নেই।
আরাফাত চৌধুরী সবই লক্ষ্য করছিলেন।
নিজের ছেলের চোখে এমন দৃষ্টি তিনি বহুবার দেখেছেন—বাঁধাহীন আকর্ষণ, দমিয়ে রাখা আবেগ, আর গভীর রাগ।
আরাফাত মনে মনে বললেন,
“এর মাঝে কি চলছে?” ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে।
কিছু একটা হয়েছে —এটা তিনি নিশ্চিত।
সোফায় বসা ফারিস কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিল। টেবিলের উপর রাখা ফাইলগুলো একটু গোছালো, তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে অদ্ভুত একটি ভার—দায়িত্বের ভার, রাগের ভার, আরো কিছু অজানা অনুভূতির ভার।
সে সিঁড়ির দিকে হাঁটার জন্য ঘুরে দাঁড়ানো মাত্রই…….
আফিয়া চৌধুরীর ডাক শুনলো।
— “কোথায় যাচ্ছো ফারিস বাবা? খেয়ে যাও।
সকালেও বাসা থেকে কিচ্ছু না খেয়ে বের হয়েছিলে… এখন আবার উপরে চলে যাচ্ছো?”
আফিয়া চৌধুরীর কণ্ঠে অভিমান আর উদ্বেগের
মিশ্রণ। তার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে যখনই সে দেখে ফারিস ঠিকমতো খায় না, ঘুমায় না, আর সবসময় কাজ—কাজ—আর কাজ।
ফারিস একটু থেমে পিছনে তাকালো… চোখদুটো ভারী, ক্লান্ত, গভীরে জমে থাকা চাপ স্পষ্ট।
গম্ভীর, ঠান্ডা, কিন্তু সম্মান রেখে বলল—
— “আমার ক্ষুধা নেই আম্মু। তোমরা খেয়ে নাও। আমাকে একটু পরেই আবার বেরোতে হবে।”
কথাটা বলার পর মুখের অভিব্যক্তিতে আর কোনো আবেগ রইলো না।
ঠিক যেন একটা যন্ত্র, যাকে অনুভূতি প্রকাশ করতে নেই। আমেনা চৌধুরী তাকিয়ে রইলেন তার দিকে… অনেক কথা বলতে চাইলেন, কিন্তু কিছুই বললেন না।
কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন—
ফারিস কাউকে শোনে না।
তার জেদ, তার নিয়ম, তার জীবন—সবকিছু সে নিজের মতো করে চালায়।
ফারিস ঘুরে সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো…
আলো-ছায়ার খেলার মধ্যে তার লম্বা ছায়া সিঁড়িতে পড়েছে। কোনো শব্দ নেই, শুধু তার ধীর পায়ের শব্দ—টাপ… টাপ… টাপ…
এইদিকে নিশিতা রুমের দরজা বন্ধ করলেই যেন পুরো ঘরটা তার একান্ত। বাইরে বাগানের হালকা হাওয়া আসছে জানালার ফাঁক দিয়ে, আর সূর্যের প্রথম কিরণ ভিজে আসছে। নিশি ধীরে ধীরে নিজের ব্যাগটা খুলে রাখল, মনে মনে ভাবছিল, আজ কলেজের দিনটা কতটা ব্যস্ত হবে, তা তার খুব ভালোভাবে জানে। ব্যাগ থেকে বই এবং
নোটবুক বের করে রাখার সময় সে ভাবল— “কালকের দিনটা সহজ হবে না, কিন্তু আমাকে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে।”
তারপর নিশি আয়নার সামনে দাঁড়ালো। কলেজের বোরকা আর হিজাব ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলল। হালকা সিল্কের বোরকা হাতে নিয়ে শেষবার নিজের রিফ্লেকশন দেখল। চুলগুলো তার কোমরের ওপর থেকে মসৃণভাবে পড়ছিল, ফর্সা ত্বকের সঙ্গে কালো চুলের মিল যেন আরেকধরনের সৌন্দর্য তৈরি করছে।
নিশি নিজেকে আয়নায় দেখে মৃদু হেসে বলল— ——”আমি প্রস্তুত।”
তারপর সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। হাতের কাছে টাওয়েল নিয়ে নিজের শরীরের ক্লান্তি মুছে ফেলতে লাগল। গরম জলের সোঁদা ঝাপসা স্পর্শে শরীরের প্রতিটি কোণায় প্রাণ ফিরে এল। নিশি টাওয়েল দিয়ে চুল মুছে নিল, হালকা হাওয়া তার গায়ে লাগল। মনে মনে সে ভাবল, এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাকে শক্তি দেয়।
ওয়ারড্রব থেকে বের করল সাদা রঙের চুড়িদার। চুড়িদার তার ফর্সা ত্বকের সঙ্গে এক অদ্ভুত মিল তৈরি করছে। নিশি ধীরে ধীরে সেটি পরল, চোখে খুশির ঝলক। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস লাগাল এবং মুখে ক্রিম দিয়ে ত্বককে উজ্জ্বল করল। এরপর চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিল। কোমরের ওপর থেকে গিয়ে কালো সিল্কি চুলগুলো খোঁপা করে ঢিলা ঢিলা করে বাঁধল।
মাথায় উড়না নিয়ে নিশি রুম থেকে বের হলো। আজ যেন তার প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিয়ার রুমে যাওয়ার সময় মনে মনে সে ভাবল,
“বিয়াকে নিয়ে তারপর খেতে যাই ।”
রিয়ার রুমে ঢুকতেই নিশি দেখল রিয়া বেডে বসে আছে, কলেজের ড্রেস বদলায়নি।
নিশিতা হেসে বলল—
“কি রে রিয়া, এতক্ষণ আবদি ড্রেস বদলাস নি? আবার এইভাবে বসে আছিস কেন?”
রিয়া হালকা হেসে বলল, “আচ্ছা মেরি মা, যাচ্ছি।” এরপর আলমারি থেকে জামা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। নিশি বেডে চুপচাপ বসে রিয়ার ফ্রেশ হয়ে আসার অপেক্ষায় থাকে। কিছুক্ষণ পর রিয়া ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসে। দুজন একসাথে নিচে নামে। ডাইনিং টেবিলে সবাই আছে, কিন্তু ফারিস নেই। নিশিতার মনটা কেমন জানো খারাপ হয়ে গেল।
সে চুপচাপ রিয়ার পাশে চেয়ারে বসে।
এর মধ্যে আরাফাত চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন—
“আফিয়া, ফারিস কোথায়?”
আফিয়া চৌধুরী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন—
“তোমার ছেলে খাবে না, তাই উপরে চলে গেছে।” আরাফাত চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন—
“আরও মাথায় তোলো ছেলেকে। দিন দিন অবাধ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সবসময় শুধু কাজ আর কাজ। আমাদের এত বড় ব্যবসা থাকলেও নিজে নিজের মতো ব্যবসা করছে।”
আফিয়া চৌধুরী রেগে বললেন—
“আমার ছেলেকে একদম কিছু বলবে না। নিজের যোগ্যতায় নিজের ব্যবসা সামলাচ্ছে। তুমি কি পেরেছো এতো বছর ব্যবসা করে টপ ৫ বিজনেসম্যানদের মধ্যে জায়গা করতে? আমার ছেলে তা পেরেছে। আবারও সবসময় আমার ছেলেকে দোষ দাও। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি তোমার ব্যবসা দেখছে, আর কি চাও তুমি?”
আরাফাত চৌধুরী রেগে গিয়ে বললেন—
“আমাদের ব্যবসা মানে? আমাদের ব্যবসায় ৭০% মালিক তোমার ছেলে, তাহলে আমাদের ব্যবসা কি করে হয়? তোমার ছেলের দায়িত্ব থাকা উচিত এই ব্যবসায়, আর সে সেই দায়িত্ব পালন করছে।”
আফিয়া চৌধুরী কিছু বলত যাবার আগেই
আলতাফ চৌধুরী হস্তক্ষেপ করলেন—
“আচ্ছা তুমি থামো ভাইয়া, বাচ্চাদের সামনে এগুলো কি শুরু করেছো?”
আরাফাত চৌধুরী চুপ হয়ে গেল। এ সময় রাজীব নাম নিচে নেমে আসে। একটি চেয়ার টেনে চুপচাপ খেতে বসে। বাকিরা সবাই খাওয়ায় মনোযোগ দিল। কিন্তু নিশি প্লেটে চুপচাপ অঙ্গুল ঘোরাচ্ছে।
আমেনা চৌধুরী লক্ষ্য করলেন
—“কি রে নিশি? না খেয়ে এভাবে অঙ্গুল ঘোরাচ্ছ কেন?”
নিশি চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমার খেতে ইচ্ছে নেই আম্মু। তোমরা খাও।” আমার আবার পড়া আছে।
এইবলে তারপর উপরে চলে গেল এবং রুমের দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরে হঠাৎ এক ধরণের নিঃশব্দতা নেমে আসে। জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো আসছে। নিশি জানালা খুলে হালকা হাওয়া প্রবেশ করতে দেয়। সেই হাওয়া যেন তার মনকে প্রশান্তি দিচ্ছে। নিশি অনুভব করে, এই মুহূর্তগুলোই তার জন্য এক ধরনের মুক্তি।
সে ডেস্কে বসে কলেজের নোটবুক খুলল। ফারিসের কথা লেখা আছে সেখানে। নিশি হালকা
হেসে মনে মনে ভাবল,
“ফারিস সত্যিই আমার জন্য সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। ওনার সাথে আমি প্রতিটি মুহূর্ত আমার করতে চাই।”
রাত হতে শুরু করে। নিশি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকায়। চাঁদের আলো ঘরে ভেসে আসে। নিশি মনে মনে ঠিক করে, আগামীকাল নতুন শক্তি নিয়ে ফারিসকে সমর্থন করবে। সে জানে, ফারিস শুধু ব্যবসার মানুষ নয়, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববানও।
ঘরে ধীরে ধীরে শান্তি নেমে আসে। নিশি বিছানায় বসে বুকের ভেতরে শান্তি অনুভব করে। মনে মনে ঠিক করে, আজকের দিনটা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু সে তার অনুভূতি, তার ভালোবাসা এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কখনো হারাবে না।
নিশি জানে, ফারিস তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজকের সকালে তার অনুপস্থিতি তাকে ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু সে বিশ্বাস করে, ফারিসের ভালোবাসা ও তার সঙ্গ সবসময় থাকবে। নিশি হালকা করে চোখ বন্ধ করে, নতুন দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে।
রাতের আকাশ গাঢ় হয়ে আসছিল। বাইরে হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। শহরের আলো ক্ষীণ হয়ে আসছে। কিন্তু চৌধুরী ভিলার ভিতরে যেন অদ্ভুত এক ব্যস্ততা চলছে। ড্রয়িং রুম থেকে শুরু করে রান্নাঘর, সব জায়গায় এক ধরনের উত্তেজনা ও অব্যক্ত উদ্বেগের ছাপ।
আমেনা চৌধুরী সেই সময় রান্নাঘরের পাশে টেবিল গুছাচ্ছিলেন।
তিনি তার পরিচিত নিখুঁত স্বভাব অনুযায়ী প্রতিটি জিনিস ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা করছিলেন। চেয়ারগুলো সোজা করে টেবিলের পাশে সাজাচ্ছিলেন, প্লেট ও গ্লাসগুলো তাদের যথাযথ স্থানে রাখছিলেন। তিনি সবসময়ই চাইতেন, বাড়ি যেন শান্ত ও পরিপাটি দেখায়।
এই ব্যস্ততার মধ্যে দরজার কড়া ধাক্কা দিয়ে খুললো।
তনয়া বাসায় প্রবেশ করল। ছোট্ট পা টিপে বাড়িতে ঢোকার সেই অদ্ভুত ধীরগতির ভঙ্গি, যা শিশু-কিশোরদের স্বভাবসুলভ, কিন্তু তনয়া যেন বড় মেয়ের মতো ভদ্রতা ও সযত্নতা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।
আমেনা চৌধুরী তনয়াকে দেখে কিছুটা রেগে গেলেন। তিনি তনয়ার দিকে চোখের ধারালো দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন তিনি দেখতে চাইছিলেন,
এই বড় মেয়েটি সত্যিই কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ—
“এতো বড় মেয়ে হয়েছিস আর বাসায় ফেরার ঠিক নেই তোর। এটা ভুলে যাস না তুই বাড়ির বড় মেয়ে। তোকে দেখে ছোটরা কি শিখবে।
” তিনি বললেন কণ্ঠে একটি চাপা বিরক্তি ও কঠোরতার মিশ্রণ।
তনয়া একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। তার চোখ মাটিতে পড়ে গেল। হাতে খালি কিছু ধরতে ধরতে তিনি আলতোভাবে বলল—
“না, মানে… আসলে, আম্মু, আজকে এক্সট্রা ক্লাস ছিলো। সরি।”
আমেনা চৌধুরী একটু নরম হয়ে চোখ নাড়লেন। “আচ্ছা হয়েছে, যাও এবার উপরে।
গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো,”
তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, যদিও সামান্য রেগের ছাপ ছিল।
তনয়া হালকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল এবং ধীর পায়ে উপরে চলে গেল। তার পায়ের শব্দ যেন সিঁড়ি ধরে হালকা প্রতিধ্বনি তুলে দিচ্ছিল।
আমেনা চৌধুরী একা থেকে ভাবতে লাগলেন। তিনি নিজেই বললেন—
“আজকালকার ছেলে মেয়ে গুলো এমন কেনো… নিশিও না খেয়ে চলে গেলো। কেউ কারও কথা শুনে না। এদের হবেটা কি।”
তিনি এক ধরনের হতাশা ও দুশ্চিন্তা অনুভব করছিলেন। জীবনের প্রতিটি অভ্যাস, নিয়ম, শৃঙ্খলা – এইসব কিছু যেন আজকের শিশু-কিশোররা আর মানতে চায় না।
তাঁর কথায় যেন এক ধরনের নিঃশব্দ আত্ম-আলাপ ছিল। টেবিলের পাশে হাত দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন, চোখে অজানা চিন্তার ছাপ। ঘণ্টার কাঁটা এগোতে লাগল।
দেখতে দেখতে রাত ১০টা বাজে গেল। পুরো পরিবার খেতে বসেছে। কিন্তু ফারিস আর নিশিতাও এখনও খায় নেই । খালি প্লেটগুলো টেবিলের উপর, খাবারের গন্ধ কিন্তু বাতাসে ভেসে যাচ্ছে।
ফারিস সেই ছয়টার সময় বাসা থেকে বের হয়েছিল। বাড়িতে আসার কোনো খবর নেই। আরাফাত চৌধুরী, যিনি সবসময় সন্তানের প্রতি কঠোর থাকতেন, এবার বেশ বিরক্ত লাগছিলেন। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। মনে মনে হয়তো তিনি জানতেন, যে কোনো কথাই যদি বলেন, ফারিস হয়তো রাগ করবে। তাই তিনি শান্ত থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন।
প্রত্যেকে তার মতো খেয়ে রুমে চলে গেল। কিন্তু আফিয়া চৌধুরী ড্রয়িং রুমে বসে রইলেন। চোখ বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল, যেন তার ছেলে যেকোনো মুহূর্তে দরজার কড়া ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়বে। তার হাতগুলোর মধ্যে অস্থিরতা স্পষ্ট। সে নিজের হাতে কাপটা ধরল, আর চিন্তা করল—”হাজার হোক মা তো…” তিনি যেন মনে মনে নিজেকে ধৈর্য ধরতে বলছিলেন।
ঘন্টা কেটে গেল, কিন্তু ফারিস আসল না। নিশি-ও নেই। আফিয়ার চোখের দিকে ক্রমেই হতাশা জমতে লাগল। মাঝে মাঝে সে তার ফোন হাতে নিয়ে বারবার দেখছিল, কোনো মেসেজ এসেছে কি না।
ড্রয়িং রুমের বাতি ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসল। বাইরে শহরের আলো মিলিয়ে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। আফিয়া চৌধুরী বসে বসে মনে মনে ভাবতে লাগলেন, তার সন্তানরা কি সত্যিই বড় হওয়ার পথে এমনই আত্মনির্ভর হয়ে গেছে? নাকি আজকের এই শৈশবের চাপ তাদের এমন করেছে যে তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে পারছে না?
একটি হালকা বাতাসের ঝাপটা জানালা দিয়ে প্রবেশ করল। আফিয়ার চোখে অজানা উজ্জ্বলতা। মনে হলো, হয়তো সে বাইরে থেকে ফিরে আসছে। আবারও সে তার হাতগুলো একত্র করল, যেন প্রার্থনা করছে, “হে আল্লাহ, আমার সন্তানরা নিরাপদে ফিরে আসুক।”
বাড়ির কক্ষে যেন এক ধরনের নিঃশব্দ প্রতীক্ষা। ঘরের প্রতিটি কোণে আফিয়ার দৃষ্টি। তার মন নানা ভাবনার মধ্যে ভেঙে পড়ছে। একদিকে মা হিসেবে উদ্বিগ্নতা, অন্যদিকে সন্তানদের প্রতি ভালবাসা।
তারপর অপেক্ষা করতে করতে তিনি ঘুমিয়ে গেলেন।
দেখতে দেখতে রাত ১২:৩০ বেজে গেছে। চৌধুরী ভিলার সমস্ত আলো নিভে গিয়েছে, কেবলমাত্র লিভিং রুমের মৃদু আলো সোফায় হেলান দিয়ে বসে থাকা আফিয়া চৌধুরীর মুখোমুখি আলো ফেলে দিচ্ছে। ঘরটা শান্ত, শুধু ঘড়ির টিকটিকি এবং দূরের রাস্তার নীরবতা শোনা যাচ্ছে। আফিয়া চৌধুরীর চোখ বন্ধ, শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে গুমরে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে সময়ও যেন থেমে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিলার সামনে থেমে যায় ফারিসের কালো মার্সিডিজ। গাড়ির ইঞ্জিনের হালকা গুঞ্জন বাতাসে মিলেমিশে যায়, তারপর পুরোপুরি নিভে যায়। ফারিসের পা ধীরে ধীরে পেছনের ডোর থেকে বেরোয়। ক্লান্তি স্পষ্ট, কিন্তু তার চোখের সেই গভীর গম্ভীরতা ক্লান্তিকে ছাপিয়ে গেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন স্বামীলোকের দৃঢ়তা প্রকাশ পায়।
ফারিস গাড়ি থেকে বের হয়ে সরাসরি মেইন দরজার দিকে এগিয়ে যায়। হাতে আছে বাড়ির এক্সট্রা চাবি। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে তিনি দেখি, মা আফিয়া চৌধুরী সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছেন।
ফারিস ধীরে ধীরে মা’র কাছে এগিয়ে যায়। হাতের স্পর্শ দিয়ে মৃদু সতর্কতা দেখায় যেন ঘুম ভেঙে গেলেও তিনি শান্ত থাকতে পারেন। আফিয়া চৌধুরী চোখ মেলে তাকালেন, মুখে হাসি আর চোখে মায়াময় স্নেহ।
— “কি রে বাবা? এতো রাত করলি কেন? মায়ের তো চিন্তা হয় না তোমার জন্য?”
ফারিস হাঁটু গেড়ে বসে মা’র হাতে হালকা চুমু দিল। তারপর শান্ত স্বরে বলল—
— “কাজ ছিল, আম্মু। তুমি জেগে আছো কেন? আমি তো বলেছিলাম আমার জন্য জেগে থাকবে না।”
আফিয়া চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন—
— “এতো যখন চিন্তা মায়ের জন্য, তবে একটা বউ আনলেই তো পারিস।”
ফারিস একটু হেসে বলল—
— “আনবো তো, আম্মু… কিন্তু তোমার বউ মা এখনো ছোট। আর একটু বড় হলে আনবো।”
আফিয়া চৌধুরী কৌতূহল ভরা চোখে জিজ্ঞেস করলেন—
— “আমার ছেলের কি পছন্দ আছে নাকি?”
— “হুম,” ফারিস সংক্ষেপে উত্তর দিল। কিছুক্ষণ মৃদু নীরবতা বিরাজ করল। তারপর তিনি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন
— “এখন ঘুমোও, আম্মু, অনেক রাত হয়ে গেছে।”
আফিয়া চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন, কিন্তু হাসি মুখে—
— “দাড়া, না খেয়ে একদম উপরে যাবি না। তোরা ভাই-বোন কি শুরু করছিস? বলতো।”
নিশি, কিছু না খেয়ে, তার রুমে চলে গেছে। আফিয়া চৌধুরী নিশিকে দেখে বললেন—
— “তুই কি কিছু খেয়েছিস?”
ফারিস কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল—
— “তুমি খাবার রেডি করো। আমি নিশিকে ডেকে আনি।”
ফারিস উপরে নিশির রুমে গেল। দরজায় নক করল। বুঝতে পারল দরজা খোলা। ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকল।
নিশি পড়ার টেবিলে মাথা দিয়ে গভীর ঘুমে। ছেড়ে দেওয়া চুল মুখের উপর ছড়িয়ে, বেবি হেয়ার কানের পাশে ভেসে আছে। নিস্পাপ, ছোট্ট বাচ্চার মতো শান্তভাবে ঘুমাচ্ছে। ফারিস কাছে গিয়ে যত্নে চুলগুলো সরিয়ে কানের পিছনে গুজে দিল। ধীরে
ধীরে বিড়বিড় করে বলল—
— “কবে বড় হবে জান আমার?”
নিশিকে ডাকল। নিশি পুরুষালি কণ্ঠ শুনে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল।
ফারিসকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বলল—
— “আপনি এখানে?”
ফারিস গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
— “নিচে খেতে আয়। আর একবার জানো ডাকা ল না লাগে ।”
নিশি মাথায় উড়না দিয়ে নিচে নামল। আফিয়া চৌধুরী ফারিসের জন্য খাবার সাজাচ্ছেন। নিশি চুপচাপ ফারিসের সামনে বসে পড়ল।
আফিয়া চৌধুরী নিশিকে দেখে বললেন—
— “আয় মা, খেতে বস। কি হয় তোদের মাঝে মাঝে বলতো?”
নিশি চুপ করে রইল। আফিয়া চৌধুরী তার প্লেটে খাবার বাড়ালেন। নিশি চুপচাপ খেতে শুরু করল। ফারিস বারবার নিশির দিকে নজর রাখল।
ফারিসের চোখে সামান্য উদ্বেগ, একটু কৌতূহল—মনে হচ্ছিল, নিশি কি তাকে কিছু লুকাচ্ছে? মনে হচ্ছিল, এ ছোট্ট মুহূর্তগুলিতে সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে।
আফিয়া চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল—
— “আম্মু, তুমি ঘুমোও। অনেক রাত হয়েছে।”
আফিয়া চৌধুরী কিছু বলার আগেই ফারিস বলল—
— “যাও, আম্মু। তোমার এতো রাত জাগা উচিত নয়।”
মুচকি হেসে আফিয়া চৌধুরী চলে গেলেন। নিশি দ্রুত খাওয়া শেষ করল। ফারিস বিরক্ত হলেও কিছু বলল না।
নিশি উঠে যেতে গেলে ফারিস বলল—
— “তুই কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছিস, নিশি?”
নিশি থতমত খেয়ে বলল—
— “কি লুকাবো, ফারিস ভাই?”
ফারিস শান্ত সুরে বলল—
— “কিছু না… গিয়ে ঘুমো।”
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৫+১৬
নিশি দ্রুত রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। অনেক পরিশ্রমের পরে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে গভীর ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল।কাল এমনিতেই অনেক কাজ আছে কাল কলেজে অনুষ্ঠান।তাই ঘুমিয়ে পরলো। ফারিসও খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিজের রুমে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ল…………
