ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৫
রিক্তা ইসলাম মায়া
পাহাড় আর মেঘের রূপকথার রাজ্য—থানচি। দিগন্ত বিস্তৃত উঁচু-নিচু পর্বতের সারি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা ঝরনার অঝোর ধারা আর গাঢ় কালো মেঘের কোলঘেঁষে নেমে আসা রূপসী প্রকৃতিকে অনন্য করে তোলে। তখন হাত বাড়ালেই স্পর্শ করা যায় হিমেল শীতল মেঘের নরম পরশ—যে অনুভূতি এক নিমেষেই জুড়িয়ে দেয় মন।
নূরজাহান থানচিতে এসেছে আজ তিনদিন। নূরজাহানের শ্বশুর-শাশুড়ি ও বাড়ির সকলের সাথেই নিয়ম করে নূরজাহানের কথা হয় শুধু মারিদ ছাড়া। মারিদ সময় চেয়েছে আর নূরজাহান সময় দিচ্ছে। এখানে দুজনের আলাদা থাকার পিছনে মারিদের ইচ্ছা। নূরজাহান শুধু নীরবে মেনে নিচ্ছে সবকিছু। শেফালীর সঙ্গে দেখা করে শেফালীর বাড়ি থেকে বেরুতে নূরজাহানদের বেলা গড়ালো। আসরের পর মাগরিবের আযানে আগের সময়টাতে নূরজাহান অটোরিকশায় উঠলো। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ঢলে।
রশিদের অটোরিকশাটা পাহাড়ি কাঁচা রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। নূরজাহান নেকাবের আড়ালে পাহাড়ের চওড়ায় লাল আলোর উঁকি দেওয়া সূর্যটার দিকে তাকিয়ে রইল। শেফালী ও মর্জিনার সঙ্গে অনেক কথা বলা হয়েছে। শেফালীর শরীর ভালো তবে মেয়ের সাংসারিক ঝামেলায় শেফালীর মন ভালো নেই বিধায় সে কয়েকদিন ধরে সিকদার বাড়িতে কাজে যায় না। নূরজাহান বলেছে মর্জিনাকে নিয়ে কাল সিকদার বাড়িতে যেতে। মর্জিনা কয়েকদিন সিকদার বাড়িতে সবার সাথে বেড়ালে মেয়েটার মন হালকা হবে। মর্জিনা চেয়েছিল আজই নূরজাহানের সঙ্গে চলে আসতে কিন্তু শেফালী দেয়নি। মর্জিনার জামাই আসবে নাকি রাতে। দুজনের মিলমিশ করানোর চিন্তায় আছেন শেফালী। যদি মর্জিনাকে ওর জামাইর সাথে মিলমিশ করাতে পারে তাহলে মর্জিনাকে সকালে স্বামীঘরে পাঠিয়ে সে সিকদার বাড়িতে কাজে যাবে আর যদি মর্জিনার স্বামী মর্জিনাকে নিতে অস্বীকার করে তাহলে শেফালী মর্জিনাকে সাথে করে নিয়ে যাবে সিকদার বাড়িতে।
নূরজাহান এখানে বাধা দেয় না। একটা মেয়ের ভরসার আশ্রয়স্থলই হয় স্বামীঘর। অথচ স্বামীঘরে একটা মেয়ের জীবনটা দুষ্কর করে তোলে তার শাশুড়ি, ননদ ও ননাসরা। এই সমাজে মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু হয়। জামাই ঘরে বউদের অশান্তি স্বামী, শ্বশুর কিংবা ভাসুর করে না, করে শাশুড়ি, ননদ ও ননাস। মর্জিনার স্বামী ঘরে মর্জিনার স্বামী বা শ্বশুর অশান্তি করে না, করে শাশুড়ি ও ননদরা। ওরা মর্জিনার স্বামী ও শ্বশুরের কানপড়া দিলে তখন মর্জিনার স্বামী ওকে মারধর করে, অশান্তিতে রাখে। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। মেনে নেওয়া সহজ কিন্তু সওয়া ততই কঠিন। নূরজাহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাহাড় থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পাশে বসা বাবার দিকে তাকিয়ে বলে…
‘ হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজ কতদূর আব্বা?
হাসান নূরজাহানের সঙ্গে পিছনে বসলেও রশিদের সঙ্গে কথা বলছিল। মেয়ের কথায় হাসান পাশে তাকিয়ে কৃতজ্ঞ স্বরে বলে…
‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালোই চলতাছে কাজকাম। আর দুই-তিনডা মাস কাম করলে শেষ হইয়া যাইব ইনশাআল্লাহ। জামাই বাবাজি দুইহাতে ট্যাহা ঢালতাছে হাসপাতালটা বানানের লাইগা। গেরামের মানুও মেলা খুশি। গেরামের হুগলডি মানু আইয়া হাসপাতালে কাম দেইখা যায় আর জামাইরে দোয়া কইরা যায় হের লাইগা। যে কাম গেরামের মানুস সওদাগর বংশের লাইগা কখনো করবার পারে নাই, হেই কাম জামাই করতাছে তাও সওদাগর বংশের মানুষগোরে জিম্মা রাইখা। এই লইয়া কত প্রশংসা করে গেরামের মানু জামাইর লাইগা।
স্বামীর প্রশংসা শুনে নূরজাহানের চোখে-মুখেও আনন্দ ও গর্ববোধ দেখা গেল। নূরজাহান বলে…
‘ এখন কি হাসপাতালে প্রজেক্টের কাজ চলতেছে আম্মা? যাওয়া যাবে এখন?
‘ বিহাল পাঁচডার পর কাম বন্ধ হইয়া যায়। এই হাইনজালা প্রজেক্টের এরিয়ায় তালা লাগায় দেয় পাহারাদার। সোক্কাল আটটার আগে খুলব না। আমনে যাইতে চাইলে কাইল সোহালে লইয়া যামুনে। এহন তিন হাইনজা বেলা হইয়া গেছে। এহন যাইতে যাইতে এমনে মাগরিবের আযান রাস্তায় পইড়া যাইব। গেরামের আবহাওয়া আপনে তো জানেন আম্মা। হাইনজাবেলা বাইরে তাহন ভালা হইব না।
নূরজাহান হাসানের কথা মেনে নিয়ে সম্মতি জানায়। কিছুক্ষণ নীরবতা চেয়ে গেল। পাহাড় পেরিয়ে জমির মধ্যের রাস্তা দিয়ে রশিদ অটোরিকশা চালাচ্ছে। রাস্তার দুপাশের গর্তের দিঘীতে নতুন পানি থৈথৈ করছে। ধানক্ষেতগুলো আধা কাঁচাপাকা। রাস্তার পাশ ঘেঁষে কাশফুলের গাছ দেখা যাচ্ছে কিন্তু কাশফুল নেই। পাহাড়ি কাঁচা রাস্তায় মানুষের বড্ড অভাব। এদিকটায় বসতি নেই বললেই চলে। এইসব জমিজমা পাহাড়ি মানুষরা চাষবাস করে। পাহাড়ের দিকে তাকালে ছোট ছোট ঘর দেখা যায় রাস্তা থেকে। এই এলাকাটাও থানচিরই একটা অংশই। হঠাৎ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার কিছু ঝপাস শব্দ হলো। নূরজাহান দূর পাহাড়ের দিকে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে ছিল। আচমকা রশিদ গাড়ির হ্যান্ডেল চেপেই হৈ হৈ করে উঠলো….
‘ ঐ কেডারে তোরা? কি ফালাইছত পানিতে? ঐ? ঐ দাঁড়া তোরা।
রশিদ গাড়ির বেগ বাড়ায়। নূরজাহান ও হাসান দুজনেই চমকে উঠে গাড়ির দুপাশ থেকে মাথা বের করে সামনে তাকাতেই দেখলো একটা বড় কালো মাইক্রো গাড়িতে দুটো ছেলে ওদের দেখে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে গাড়িতে লাফিয়ে উঠে চলে যাচ্ছে। রশিদের চিৎকারে ছেলেদুটো হাতের বস্তাটা দীঘির পানিতে ফেলেই ভয়ে লাফিয়ে উঠে গাড়িতে করে চলে যায়। রশিদের অটোরিকশা মাইক্রো গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে না পেরে অপরিচিত ছেলেদের ফেলে যাওয়া বস্তার সামনে এসে গাড়ি থামে। রশিদ গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামতে নামতে বলে…
‘ কি জানি ফালাইয়া গেছে হালারা।
হাসান, নূরজাহান দ্রুত পায়ে গাড়ি থেকে নেমে রশিদের পাশাপাশি রাস্তায় দাঁড়ায়। দীঘির নতুন পানিতে ভাসছে একটা বস্তা। বস্তাটা এখনো পানিতে ঢুবে যায়নি। বস্তা থেকে মটকা গন্ধ নাকে লাগতেই হাসান ও রশিদ নাক চেপে ধরে থুথু ফেলে। নূরজাহান নেকাবের উপর দিয়েই নাক ধরেছে। হাসান বলে…
‘ এই পঁচা গন্ধডা এই বস্তা থেইক্কা আইতাছে রশিদ। বস্তাডা পানি থেইক্কা উপর লইয়া আয় দেহি হারামজাদারা কি ফালাইয়া গেছে পানিতে।
রশিদ হাঁটু পানিতে নামতে গিয়ে গলা পানিতে চলে যায়। দীঘির গভীরতা অনেক। রশিদ প্রথমে বুঝতে পারেনি তাই গলা পানিতে ডুবে যায়। বস্তাটা টেনে পাড়ে নিয়ে আসতে হাসান ধরাধরি করে বস্তাটা রাস্তায় তোলে। বস্তার দুর্গন্ধে শরীর গুলিয়ে রশিদ বমি করে ফেলে। হাসান নূরজাহানেরও পেট গুলিয়ে আসে বমিতে। দুজন নাক চেপে কয়েক কদম দূরে সরে যায়। রশিদ ভেজা শরীরে ওয়াক ওয়াক করে বলে…
‘ জানোয়ারের দল এই বস্তায় পঁচা কি জানি ফালাই গেছে। দুর্গন্ধে থাহন যাচ্ছা আর। এইডার মাইধ্যে কি আছে আর দেহন লাগব না। যাই তাহুকগা এমন পঁচা গন্ধ সয়া যাইতাছে না। এইডারে আবার পানিতে ফালাই দেয় চাচা।
হাসান নাক চেপে সম্মতি দেয়, ‘ দে ফালাইয়া। কি পঁচা গন্ধ ইশ।
নূরজাহান বাধা দিয়ে বস্তার দিকে এগিয়ে আসে। নাক চেপেও সওয়া যাচ্ছে না, পেট গুলিয়ে বমি আসছে। নাক চেপে বস্তার দড়ি ধরে টান দিয়ে নূরজাহান বলে,
‘ এত পঁচা গন্ধ কেন ছড়াচ্ছে এইটা দেখা দরকার আছে রশিদ ভাই। লোকগুলো বা কেন এই নির্জন এলাকায় এসে লুকিয়ে একটা বস্তা ফেলে যাবে? তাদের মনে ভয় ছিল বিদায় তারা আমাদের দেখে ভয়ে পালিয়েছে। বিষয়টা সন্দিহান। তাই আমাদের বস্তা খুলে দেখা দরকার কি আছে এতে।
নূরজাহানের কথাটা যৌক্তিক বলে রশিদ ও হাসান দুজনই মেনে নিয়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু দুর্গন্ধে আবার পিছিয়ে যায় রশিদ বলে, ‘ তুমিই ঐ দেহো কি আছে বস্তার মাইধ্যে। আমি এই পঁচা গন্ধ সইতে পারতাছি না নূরজাহান।
হাসান মেয়েকে একা বস্তা নিয়ে টানাটানি করতে দেখে তিনি এগিয়ে আসলেন। বস্তার মুখের দড়ি ধরতে চাইলে নূরজাহান হাত উঠিয়ে নিষেধ করে সতর্কতার সাথে বলে…
‘ সরাসরি হাত দিয়ে এই বস্তা স্পর্শ করবেন না আব্বা। বলা যাচ্ছে না লোকগুলো বস্তায় করে কি ফেলে গেছে। তবে ভালো কিছু যে ফেলে যায় নাই আন্দাজ করতে পারছি। আপনি বা রশিদ ভাই আপাতত বস্তায় হাত দিয়েন না। আমি দেখছি বিষয়টা।
নূরজাহান মুখের নেকাব তুলে আশেপাশে খুঁজে তেমন কিছু পেল না। রশিদের অটোরিকশার কাছে গিয়ে সিটের উপর থাকা পাতলা আবরণের পলিথিনগুলো টেনে ছিঁড়ে নিয়ে বস্তার সামনে ফিরে আসে। রশিদ হায় হায় করে চিল্লাই নূরজাহান তার গাড়ির নতুন সিটগুলো নষ্ট করে ফেলেছে দেখে। নূরজাহান প্রতিক্রিয়া দেখালো না। পলিথিনগুলো হাতে পেঁচিয়ে বস্তার দড়ি খুলছে দেখে রশিদ থেমে যায়। হাসান ও রশিদের কৌতূহল ঘুরে যায় বস্তার দিকে। কি আছে এই বস্তায়? নূরজাহান টেনে বস্তার মুখ খুলতেই নূরজাহানের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল বিভৎস এক খণ্ডিত মাথা। কাটা মাথা দেখামাত্রই হাসান ও রশিদ ভয়ে ছিটকে সরে গেল। রশিদ তৎক্ষনাৎ চিৎকার করে…
‘ ও মাগো এইডা কি?
নূরজাহান পায়ের দিকে তাকায়। গড়িয়ে পড়া মাথাটার দিকে তাকিয়ে নূরজাহানের শরীর দুলে ওঠে। কিন্তু এতে নূরজাহানের অস্থির উত্তেজনা কিংবা বিচলিত ভাব দেখা গেল না। বরং অদ্ভুত সাহসী নূরজাহানের দেখা মিলল এই প্রথম। কাটা মাথাটার মুখটা ঝলসে থেঁতলে আছে। মুখের চামড়া পুড়ে ছিঁড়ে গেছে, চেনার উপায় নেই। ঠোঁটগুলো পুড়ে যাওয়ায় দুই দাঁতের মাঝে জিহ্বাটা কামড়ে আছে। নূরজাহান পায়ের জুতো দিয়ে মাথা হালকা নাড়িয়ে অল্প ঝুঁকে যায়। দেখার চেষ্টা করে মাথাটা ছেলের নাকি মেয়ের। মাথার ঘাড়ের অংশে ছোট ছোট চুল দেখে চট করে বুঝে যায় এটি একটা ছেলের কাটা মাথা। নূরজাহান বস্তা টেনে রাস্তায় ফেলে বলে…
‘ এটা ছেলের লাশ। খুব সম্ভবত আমাদের মান্নার বয়সী হবে ছেলেটা বয়স আব্বা।
নূরজাহানের সাহস, সমতা, নির্ভয় দেখে রশিদ ও হাসান দুজনেই অবাক হলো। যেখানে পুরুষ হয়ে বিভৎস পোড়া কাটা মাথা দেখে তাঁরা ভয় পাচ্ছে, সেখানে নূরজাহান বস্তা খুলে লাশের তদন্ত করছে। হাসান দ্রুত এগিয়ে আসে। বস্তায় লাশ দেখে তিনি ভয়ার্ত অস্থির হচ্ছে। কাটাকাটি, রক্ত, লাশ এসবে তিনি অভ্যস্ত নন। জীবন সংগ্রামে বাঁচতে বাধ্য হয়ে তিনি রানদা হাতে চলেন। নয়তো সওদাগর বংশের লোক উনাদের মেরে ফেলবেন। হাসান ভুলবশত আবার খালি হাতে লাশের বস্তায় হাত লাগাতে চাইলে নূরজাহান বাধা দিয়ে বলে…
‘ উহুম কোনো কিছুতে স্পর্শ করবেন না আব্বা। পুলিশ কেসের ঝামেলায় পড়বেন।
হাসান নূরজাহানের মতো করে রশিদের গাড়ির পলিথিন ছিঁড়ে হাতে পেঁচালো। বস্তার বাকি অংশের লাশটা রাস্তায় শোয়াতেই তিনজন বুঝতে পারলো এটা আসলেই ছেলের লাশ ছিল। লাশটাকে দুটো খণ্ডে কাটা হয়েছে। ছেলেটির গা ঝলসে যাওয়ার মতো কুঁচকানো। হয়তো কয়েক দিন আগে মারা হয়েছে সেজন্য লাশটা পঁচে দুগন্ধ ছড়াচ্ছে। রশিদ ভয়ে বাপ-বেটি থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে কিন্তু দৃষ্টি লাশের উপরই তাক করা। হাসান লাশটা দেখে বলে…
‘ আম্মা এই লাশডা মনে হয় এসিড দিইয়া পুড়ানো হইছে।
নূরজাহান ললাটে ভাঁজ ফেলে লাশটাকে বেশ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল। যেন কোনো কিছুর সন্ধান করছে লাশে। হাসানের কথায় নূরজাহান বাবার দিকে তাকিয়ে বলে…
‘ আপনি কিভাবে বুঝলেন লাশটাকে এসিডে পুড়ানো হয়েছে?
‘ হেইদিন হাসিনার পোলাডারও ত এই কইরাই পুড়ানো আছিল। police কইছে এমন পুড়া শরীর নাকি এসিডে পুড়াইলে হয়। হের লাইগা আন্দাজে কইতাছি। আগুনে পুড়লে শরীর কালা কয়লার লাহান হইয়া যাইতো কিন্তু এইডা সিদ্ধ মাংসের মতো ক্যাচরা হইয়া রইছে এর থেইক্কা বুঝবার পারছি এই পোলাডারে এসিডে পুড়াইয়া মারছে আম্মা।
না কান্না, না ভয়, না আশঙ্কা, না উত্তেজনা বা হৈচৈ। কেমন বহুরূপী নূরজাহান। চোখের পাতা স্বাভাবিক। ললাটে হালকা ভাঁজ। বাবার কথায় লাশটার মাঝে কিছু খুঁজতে লাগলো আবারও। হাসান বলে, ‘ এমন কইরা লাশে কি খোঁজেন আম্মা?
লাশ পোস্টমর্টেম করা মহুরি যেমন দক্ষ হাতে নিভয়ে লাশ নিয়ে খেলা করে তেমনই নূরজাহান লাশ নিয়ে খেলছে যেন। নূরজাহানের দৃষ্টি, বাচন ভঙ্গিতে অদ্ভুত সংকল্প। নূরজাহান লাশটার হাতের-পায়ের আঙুল খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে বাম পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলের গোড়ায় খুবই সূক্ষ্ম ছোট অক্ষরে খোদাই করা পেল ” DBS-ON-365 ” লেখাটা দেখা মাত্রই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নূরজাহানের দৃষ্টিতে দেখা যায় অস্থিরতার গ্রাস। চঞ্চল দৃষ্টি এদিক-সেদিকে ঘুরায় নূরজাহান।
নূরজাহানের বিচলিত অস্থিরতা কয়েক সেকেন্ডের মাঝে স্বাভাবিক রূপে নেয়। নূরজাহান লাশ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রশিদকে বলে…
‘ লাশটাকে দ্রুত পানিতে ফেলে দিন রশিদ ভাই। নয়তো আশেপাশের কেউ আমাদের লাশ নিয়ে বসে থাকতে দেখলে বিপদ হবে। ভাববে আমরা লাশটাকে খুন করেছি।
হাসান বাধা দিয়ে বলে…
‘ তাইলে আমরা আগে পুলিশরে কল দেই? এইহানে কি ঘটছে তাই পুলিশরে খুইলা কমুনে নইলে?
নূরজাহান হাসানকে বাধা দিয়ে বলে…
‘ এমনি গ্রামের মানুষ আমাদের খারাপ বলে। এই লাশের খবর আমরা আগে পুলিশকে দিলেও গ্রামের মানুষ ভাববে অন্যকিছু। পিছনে কথা বানাবে, বলবে আমরাই খুন করে পুলিশের কাছে ভালো সাজতে কল দিয়েছি। তার উপর সওদাগর পরিবারের মানুষ এইটার জের ধরে আমাদের হেনস্তা করতে চাইবে। এর থেকে ভালো বস্তাটা যেভাবে ছিল সেভাবে বেঁধে পানিতে ফেলে দিন, কারও না কারও চোখে বস্তাটা এমনই পড়বে তখন তারাই না-হয় পুলিশকে খবর দিবে। আমরা এখন ভালো করতে গেলে এই লাশের দায় আমাদের কাঁধে চলে আসতে পারে আব্বা।
নূরজাহানের কথাটা যৌক্তিক, রশিদও হৈ হৈ করে সম্মতি দিয়ে বলে, ‘ হ নূরজাহান হাছাই কইছে। যেই এহন এই লাশের খবর পুলিশরে দিব হেই ফাঁসব। এর থেকে লন চাচা তাড়াতাড়ি লাশডারে বস্তা ভইরা দিঘিতে ফালাই দিয়া বাইত্তে জাইগা। এমনে আমার কলিজা কাপতাছে ভয়ে।
হাসান, রশিদ ও নূরজাহান তিনজন দ্রুত লাশটাকে বস্তায় ভরে পানিতে ফেলে দেয়। নূরজাহান বুদ্ধি করে গাড়ি থেকে পানির বোতল এনে পুরো রাস্তা ভিজিয়ে দেয় যে অংশে ওরা দাঁড়িয়ে ছিল। হাতের পলিথিনগুলো সঙ্গে করে নিয়ে গেল যাতে পুলিশ কিংবা অন্য কেউ তাদের খোঁজ না পায়।
মাগরিবে আযান পড়ছে চারপাশে তখন রশিদের অটোরিকশা থামে বটগাছের নিচে। নূরজাহান, হাসান ও রশিদ তিনজনই ভিজে গিয়েছে লাশটা পানিতে ফেলতে গিয়ে। রশিদ ভয়ে বারবার ঘাবড়ে যাচ্ছে। বেচারা এসব লাশের চক্করে কখনো ফাঁসেনি, এই প্রথম। হাসান পুরো রাস্তায় রশিদকে বুঝিয়েছে আজ যা হয়েছে তাতে তাদের কোনো দোষ নেই। তারা কেবল ওই লাশটার সাক্ষী ছিল, কয়েকজন লোক লাশটাকে দিঘিতে ফেলে গেছে সেটার। রশিদ হাসানের কথা বোঝে তারপরও ভয় পাচ্ছে যদি পুলিশ তাদের খোঁজে আসে এখান?। হাসান ও নূরজাহান গাড়ি থেকে নামতেই রশিদ ভয়ে কাঁচুমাচু করে বলে…
‘ এই লাশটা আমাগো গেরামে কেডায় ফালাইতে পারে চাচা? কার এত ক্ষমতা থাকবার পারে যে দুইদিন পরপর মানু মাইয়া লাশ আমাগো গেরামে ফালাই যায়?
নূরজাহান অটোরিকশা থেকে নেমে রশিদের কথার জবাবে বলে…
‘ আমার মনে অই সওদাগর পরিবারের কেউ হইব। আমাগো গেরামে ওরা ছাড়া আর কারোর এত ক্ষমতা নাই যে মানু খুন করব।
‘ কিন্তু চেয়ারম্যান বাড়ির পোলারা হুগলেই তো জেলে চাচা। তাইলে এহন মারব কেডা?
রশিদের কথাটাও যৌক্তিক। ফেলে দেওয়ার মতো না। সওদাগর পরিবারের সবাই জেলে হলে আডলেই মারবে কে? এর মাঝে নূরজাহান বলে…
‘ সওদাগর পরিবারের সবাই জেলে হলেও হারুন সওদাগর কিন্তু জেলে না। চেয়ারম্যান পরিবারের সকল ক্ষমতার উৎসই হচ্ছে হারুন সওদাগর। আর হারুন সওদাগরের জন্য এমন পাঁচটা লাশ রোজ নদীতে ভাসিয়ে দিলে কেউ উনার অবধি পৌঁছাতে পারব না রশিদ ভাই।
এবার নূরজাহানের কথায় হাসান ও রশিদ দুজনেই সম্মতি দিল। কথা আসলেই সত্যি। সওদাগর পরিবারের লোকগুলো যত ক্ষমতা পায় তার সকল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে এই হারুন সওদাগর। হারুন সওদাগর আছে বলেই আজও সওদাগর পরিবারের একটা ইটও কেউ বাঁকা করতে পারে না। রশিদ ঘৃণায় একদলা থুথু ফেলে বলে….
‘ হারামজাদা, হালার পুত, শয়তানের হাড্ডি গুলো একটাও মরে না। গেরামডাও আর শান্তি হয় না। আইচ্ছা চাচা এহন যাইগা আমি। আপনেরাও সাবধানে থাইকেন। আইজকা যে লাশ দেখছি ডরে আমার কইলজা কাপতাছে। আইজ আর বাইত থেইক্কা বাইর হমু না। ঘরের দরজা খিল দিইয়া ঘরেই থাহুম বউ-বাচ্চাগো লইয়া।
রশিদ চলে গেল। হাসান বিশ কদমের বাড়ির পথের রাস্তা ধরে সামনে হাঁটছে। নূরজাহান পিছনে। আযান মাত্রই শেষ হয়েছে। নূরজাহান বটগাছটা পেরুতেই হঠাৎ পিছন থেকে ডাকে কেউ…
‘ খুনি নূরজাহান।
নূরজাহান চমকে পিছনে তাকাতেই একজন বৃদ্ধা মহিলাকে লাঠি হাতে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নূরজাহানের চকমকানো মুখশ্রী স্বাভাবিক হয়। যেন বৃদ্ধা মহিলাটির সঙ্গে নূরজাহান পূর্বপরিচিত। তাই নূরজাহান বৃদ্ধা মহিলাটিকে দেখেও না দেখার মতো করে সামনে ঘুরে চলে যেতে চাইলে বৃদ্ধা মহিলাটি চোখের পলকে নূরজাহানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। নূরজাহান খানিকটা চমকালেও পর মুহূর্তে বিরক্ত হয়। বৃদ্ধা মহিলা নূরজাহানের মুখের নেকাব টেনে মাথার উপর উঠিয়ে বিদ্রুপ করে বলে…
‘ পোলাডারে ক্যান মারছত?
নূরজাহান বেশ বিরক্ত হয়। অনীহা নিয়ে বৃদ্ধা মহিলাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে বলে…
‘ বিরুক্ত করো না। তুমি চলে যাও।
‘ নূরজাহানের আরেক নাম ছলনাময়ী।
‘ মনগড়া কথা বানিও না। আমি তোমার কথা শুনব না বুঝেছ?
‘ তুই শেষমেশ রক্তের লগে নিমকহারামি করলি? কেমনে পারলি নিজের মায়ের লগে বেইমানি করতে নূরজাহান? বুক কাঁপল না?
বৃদ্ধা মহিলাটি নূরজাহানের পিছন থেকে ডেকে কথাগুলো বলে। নূরজাহান হঠাৎ ঘুরে তাকিয়ে বলে,
‘ এই জগতে কেউ কারও নয়। আর না আমি আমার মায়ের মতো বোকা। আমি আগে নিজের স্বার্থ দেখব তারপর মৃত মানুষের কথা ভাবব। আমার মা মরে গেছে। মৃত মানুষের সাথে আবার কিসের বেইমানি? আমি কারও সাথে বেইমানি করিনি। আমি শুধু নিজের প্রাপ্য সুখ বুঝে নিচ্ছি। আমার বাবা আমাকে বিয়ে দিয়েছেন। আমি এখন সুখে আছি, তুমি আমাকে আর জ্বালাতন করতে এসো না। যাও।
‘ সাবধান হইয়া যা নূরজাহান। এহনো সময় আছে ভুল শুধরাইয়া লও। পরে কিন্তু কাইন্দা কুল পাবি না।
‘ জ্ঞান দিও না। তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। যাও তুমি।
নূরজাহান বিরক্ত বোধ করে। হঠাৎ হাসান উচ্চ শব্দে নূরজাহানকে ডেকে বলে…
‘ আম্মা আপনে কার লগে কথা কন?
নূরজাহানের কথার শব্দে হাসান দাঁড়িয়ে যায়। নূরজাহানকে একা একা দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে তিনি এগিয়ে এসে প্রশ্নটা করেন। নূরজাহান আশেপাশে সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ফুস করে শ্বাস ফেলে বলে…
‘ কারো সঙ্গে না আব্বা। বাড়িতে চলুন।
হাসান দেখেছে নূরজাহান একা একা কথা বলছে অথচ নূরজাহান উনাকে কিছু বলতে চাচ্ছে না। হাসান নূরজাহানকে জোরাজোরি না করে নূরজাহানের কথা মতো বাড়ির পথে হাঁটে। পিছন ফিরে আর তাকালো না। হঠাৎ নূরজাহানের কানে কারও ফিসফিস শব্দ আসে…
‘ তোর এই স্বার্থপরতা একদিন তোরে ধ্বংসের দুয়ারে দাঁড় করাইব নূরজাহান।
সুখের ফোনটা নূরজাহানের পড়ার টেবিলে বাজছে। সুখ, রাদ ও আশনূর নূরজাহানের সঙ্গে বসার ঘরে বসে ছক্কা খেলছে। এখানে আসার পর থেকে রাদ ও সুখের উল্লাসের শেষ নেই। আশনূরের সঙ্গে বেশ ভাব হয়েছে সুখের। নূরজাহানের অনুপস্থিতিতে সারাদিন আশনূরের সঙ্গেই দেখা যায় সুখ আর রাদকে। বসার ঘরে সোফার সামনে খালি জায়গাটায় মাদুর বিছিয়ে আশনূর, নূরজাহান, রাদ, রাতুল, নুহাশ ও নদী একত্রে বসে লুডু খেলছে। তারানূর খাটে দুপা তুলে পানের বাটা নিয়ে পান চিবোচ্ছে। সঙ্গে সখী ফুলবানু আজ উনার সাথে বসে কথা বলছেন। ফুলবানু প্রায়শই তারানূরের সঙ্গে রাত্রিযাপন করেন, আজও তাই। আজ শুক্রবার হওয়ায় সাজিদ ও মাজিদ দুই ভাই একত্রে বাড়ি ফিরেছে। মাজিদ সপ্তাহের ছুটিতে বাড়ি ফিরলেও সাজিদ এসেছে বিশেষ উদ্দেশ্যে। তার পছন্দ আছে। সেটা হাসানের কানে মাজিদকে দিয়ে অলরেডি দেওয়া হয়েছে। কাল সাজিদের জন্য মেয়ে পক্ষের বাড়িতে পাত্রী দেখতে যাবে হাসান, মাজিদ, সাজিদ ও তারানূর। শাহানা যাবে কিনা আপাতত বলা যাচ্ছে না। তবে ছেলের বিয়ে নিয়ে শাহানা অসন্তুষ্ট। সাজিদ উনার পছন্দের ছেলে। আশনূরের বিয়ের আগে সাজিদকে বিয়ে করিয়ে বউ তুলবেন শাহানা। আর এজন্য হাসান ও মাজিদ দৌড়াদৌড়ি করে পাত্রী পক্ষের সকল খোঁজ-খবর নিচ্ছে। খেলা ছেড়ে সুখ দৌড়ে আসে। ফোনের স্ক্রিনে রাদিল নামটা দেখে লাজুক হাসে। সেদিনের পর সুখের রাদিলের সঙ্গে কথা হয়নি। দুই পরিবারের কাছে নিজের প্রেমের মিথ্যা বলেই সুখ গায়েব। লজ্জায় আর রাদিলকে ফোন দেয়নি, কথাও হয়নি এতদিন। আজ তিনদিন পর রাদিল নিজেই সুখকে কল দিয়েছে। সুখ খানিকটা অস্বস্তিতে কল রিসিভ করে সালাম দিল, ‘ আসসালামু আলাইকুম রাদিল ভাই।
রাদিল সালামের উত্তর দিয়ে গমগমে আওয়াজে বলে…
‘ তুই ঢাকা আসবি কবে?
‘ আসব না।
‘ কেন?
‘ এমন ভাবে বলছ যেন তুমি আমার অপেক্ষাতেই বসে আছো?
‘ হতেও তো পারে।
রাদিলের সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তিতে সুখ অস্বস্তি ও লজ্জায় পরে যায়। এলোমেলো দৃষ্টিতে এদিক-সেদিক তাকায়। খাটের কিনারায় বসে বলে…
‘ তাহলে থানচিতে চলে আসো রাদিল ভাই। আমার এখানে অনেক ভালো লাগছে। এখানের পরিবেশ এত সুন্দর, জাস্ট পাগল করার মতো। তালোই, আশনূর আপু, মান্না রোজ আমাকে আর রাদকে নিয়ে ঘুরতে যায়। কি যে সুন্দর এই থানচি এলাকাটা। তুমি চলে আসো সবাই মিলে মজা করব।
রাদিল নিজের চেম্বারে বসা। আজ শুক্রবার। তার সাপ্তাহিক রোগী দেখার দিন। বিকাল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা সে রোগী দেখে। মাঝেমধ্যে রোগীর চাপ বেড়ে গেলে তখন রাত এগারোটা-বারোটাও বেজে যায়। আজ রোগীর চাপ বেশি, হয়তো আজ রাত বারোটা বাজতে পারে সে ফ্রি হতে হতে। এখন সন্ধ্যা সাতটা। বিশ মিনিট সময় বিরতি পেয়েছে নাস্তার জন্য। এই ফাঁকেই সে সুখকে ফোন করেছে। সুখকে আজকাল বড্ড মিস করছে। এক ঝলক দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে আছে অথচ মেয়েটা ঢাকায় নেই। তাকে আগুনে ফেলে থানচিতে গিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঢাকায় থাকলে রাদিল কাজের বাহানা দিয়ে হলেও ওই বাড়িতে গিয়ে সুখকে দেখে আসতো। রাদিল বিদ্রুপ কণ্ঠে বলে…
‘ আমার ডিউটি আছে আসতে পারব না। তাছাড়া আমি অন্যের শ্বশুরবাড়িতে যাই না। নিজের শ্বশুরবাড়ি হলে ভাবতাম।
‘ তুমি তোমার শ্বশুরবাড়িতে যেতে চাও রাদিল ভাই?
‘ হ্যাঁ! বউ থাকলে অবশ্যই যেতাম।
রাদিল কথাটা বলে চেয়ারের গায়ে এলিয়ে দেয়। চোখে-মুখে তার দুষ্টুমির রেশ। সুখ তাকে কতভাবে জ্বালিয়েছে, এখন সুযোগ তার এসেছে, এবার সেও বোঝাবে রাদিল চৌধুরীও কম না। রাদিলের কথায় সুখ লজ্জায় মাথা নুইয়ে যায়। মুখে লাজুক হাসি। পা দিয়ে ফ্লোরে আঁকিবুঁকি করে সুখ বলে….
‘ তাহলে আমাকে একটা মিনিট সময় দাও রাদিল ভাই। আমি পাঁচ মিনিট পর আসতেছি।
সুখ এক মিনিট সময় চাওয়াতে রাদিল বিচলিত হয়ে উঠে বসল। এই সুখের এক মিনিট সময় মানে রাদিলের জন্য গজব। রাদিল তাড়াহুড়ো করে সুখকে থামিয়ে বলে…
‘ ক্ষমা কর বইন। তোর এই এক মিনিট সময় আমার বুক ব্যথা বাড়িয়ে দেয়। তোর জন্য এমনই আমি হার্টের রোগী হয়ে যাচ্ছি দিন দিন।
‘ তুমি একটা যাতা, আমার মন বুঝো না। খালি উল্টো বুঝো।
‘ তোর মন বুঝতে গিয়ে আমি কাউকে আর মুখ দেখাতে পারি না সুখ। তুই আমাকে বড়দের মাঝে ফাঁসিয়ে দিয়েছিস। আমার বাড়ি তোর বাড়ি যেখানেই যাই সবাই খালি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর নয়তো মিটমিট হাসে। কিছু না করেও তোর জন্য চোরের মতোন ঘুরে বেড়ায়। আর তুই ওইখানে বসে মজা নিচ্ছিস?
সুখ হাসে। দুপা দোলাতে দোলাতে দুষ্টুমি করে বলে…
‘ তাহলে আমি একটা সমাধান দেয় রাদিল ভাই। এখন আমি সবাইকে ফোন করে বলি, যে আমি তোমাকে নিয়ে মজা করেছি। আসলে আমাদের মাঝে তেমন কোনো সম্পর্কই নেই। সব মিথ্যা নাটক।
রাদিল বিরক্ত হয়। পুনরায় চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়ালের এসিটার দিকে তাকিয়ে কপালের চুলগুলো ঠেলে পিছনে দিতে দিতে বলে…
‘ আমাকে মাঝপথে এনে তুই চলে যাবি সেটা তো হবে না সুখ। আমি তা মানব না। তুই বউ হলে আমারই হবি। রাদিল চৌধুরীর সুন্দর বউ।
এই প্রথম রাদিল নিজে থেকে সুখকে বউ ডেকেছে। সুখ দুষ্টু হলেও এসব কথায় অভ্যস্ত নয়। দুজনের অদৃশ্য সম্পর্কটাও নতুন নতুন। সুখ লাজ-লজ্জায় ঠাস করে কল কেটে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। বালিশে মুখ গুঁজে চোখ-মুখ খিঁচে নেয়। সুখের জীবনে হঠাৎ এত লজ্জা কোথা থেকে আসলো? আশ্চর্য।
বিগত দুদিন ধরে তনিমা কলেজ শেষে রিফাতের কাছে পড়তে আসে। কলেজের ভিতর স্টুডেন্ট পড়ানোর নিয়ম নেই। কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে কলেজ কমিটির। তাছাড়া তনিমাকে টিচার্স কক্ষে বসিয়ে পড়ানোটাও দৃষ্টিকটু, তাই রিফাত তনিমাকে কলেজ লাইব্রেরিতে বসিয়ে পড়ায়। বিগত দুইদিন তনিমাকে পড়িয়ে রিফাত যতটুকু বুঝেছে, মেয়েটি পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী। রিফাতের পড়ানোর সময় শুধু পড়াশোনা নিয়েই থাকে, আশেপাশেও তাকায় না। মনোযোগও নষ্ট করে না। স্টুডেন্ট ভালো আর মনোযোগী হলে সকল টিচার্সই সেই স্টুডেন্টকে পড়িয়ে আরাম পায় যায়। তনিমা এক সাবজেক্ট শেষ করে অপর সাবজেক্ট খুলে বসে পড়তে। পড়তে বসলে স্বামী হিসাবে তখন রিফাতের দিকে ফিরেও তাকায় না তনিমা। আর তনিমার এই দিকটা বেশ ভালো লাগে রিফাতের, কিন্তু এই একটা কারণ তনিমাকে রিফাতের মনে ঠাঁই দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। গোল টেবিলে দুপাশে বসে দুজন। তনিমা খাতায় লিখছে। অপর পাশে চেয়ারে বসে রিফাত তা দেখছে। রিফাতের লুকোচুরি দৃষ্টি বারবার ঘুরে যাচ্ছে তনিমার ক্লান্ত মুখে।
তনিমার মনোযোগ খাতায় থাকলেও সে টেবিলের নিচ দিয়ে পা নাড়াচ্ছে। সেই পা বারবার বাড়ি খাচ্ছে রিফাতের পায়ের সঙ্গে। তনিমা স্বভাববশত কাজটা করছে। রিফাত ঘাড় বেঁকিয়ে টেবিলের নিচে তনিমার পা নাচানো দেখে সে আস্তে করে নিজের পা সরিয়ে নেয়। তনিমাকে পড়ানোর সময় এই একটা সমস্যার ফেস করে রিফাত। কখনো বই, খাতা, কলম দেওয়া নেওয়া নিয়ে দুজনের হাতে হাতে স্পর্শ লেগে যাচ্ছে। আবার তনিমা নিজের অজান্তে কখনো কখনো রিফাতের পায়ে পা রেখে দিচ্ছে। পরে অবশ্য বুঝতে পারলে সরি বলে হাত দিয়ে সালামও করে। এখন আবার পা নাচাচ্ছে তার পায়ের সঙ্গে বাড়ি দিয়ে। কিছুক্ষণ আগে রিফাত তনিমার খাতায় লিখে কেমিক্যাল ফর্মুলা বুঝিয়েছিল তনিমাকে।
ছোট টেবিল হওয়ায় মাঝের জায়গায় কম, তাই দুজনেই টেবিলের বইখাতার উপর ঝুঁকে ছিল। রিফাত স্বাভাবিক ভাবেই ঝুঁকে খাতায় লেখছিল, যতটা ঝুঁকে খাতায় লিখতে হয় ততটুকুই, কিন্তু তনিমা টেবিলের উপর দু-হাত রেখে একটু বেশিই ঝুঁকে যায় যার জন্য তনিমার মাথা রিফাতের কপালে বাড়ি খায়। বিষয়টা অনাকাঙ্ক্ষিত। তনিমা কয়েকবার সরিও বলে ফেলেছে। কিন্তু রিফাত বিভ্রান্তিতে পড়েছিল কাল। রিফাত হঠাৎ তনিমাকে ডেকে বলে…
‘ আজকে আপনার সাথে ক্লাসে বসা ছেলেটি কে ছিল তনিমা?
তনিমার স্বাভাবিক উত্তর এলো তক্ষুনি। খাতা থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে মনোযোগ সহকারে লিখতে লিখতে বলে….
‘ আমার ফ্রেন্ড পলাশ।
‘ এই ছেলেটাই ছিল না সেদিন? যেদিন মারিদ আপনার ভাইকে রাস্তায় মেরেছিল?
তনিমা রিফাতের কথা শুনছে তবে মনোযোগ দিচ্ছে না। তনিমা মাথা নাড়িয়ে ছোট উত্তরে সম্মতি দিয়ে বলে…
‘ হুম। ওই ছিল সেদিন।
‘ আপনারা কি স্কুল থেকে পরিচিত?
‘ না, আমরা একই এলাকার মানুষ। পাশাপাশি বাড়ি। প্রতিবেশী বলতে পারেন।
‘ আপনি যে বিবাহিত, ছেলেটা জানে?
‘ না।
‘ আপনার বন্ধু অথচ আপনার বিয়ের কথাটা জানে না, আশ্চর্য?
‘ ও জানলে রিস্ক। আমার সংসার ভাঙতে চাইবে ফাজিল পোলা।
রিফাতের কপাল কুঁচকে গেল। তনিমার দিকে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। অথচ তনিমা রিফাতকে দেখছে না। সে লেখায় মনোযোগী, খুব স্বাভাবিক ভাবে রিফাতের কথার উত্তরও দিচ্ছে। রিফাত যে তনিমার বন্ধু পলাশকে নিয়ে মাইন্ড করতে পারে সেই খেয়ালও করছে না। রিফাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে…
‘ আপনার বন্ধু আপনার সংসার ভাঙতে চাইবে কেন? ওর কি লাভ এতে?
‘ ও আমাকে পছন্দ করে সেজন্য আমার বিয়ে হোক ও চায় না। বলেছে এই বছরই নাকি আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে।
রিফাত ভারি আশ্চর্য হচ্ছে। হতবাক গলায় বলে..
‘ আর আপনি কি বলেছেন?
‘ আমি বলেছি আপনার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে।
‘ আমার কাছে?
‘ হুম, বিয়ের পর মেয়েদের অভিভাবক তার স্বামীই হয়। বর্তমানে আমার অভিভাবকও আপনি। সেজন্য ওকে বলেছি আপনার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে।
রিফাত নড়েচড়ে বসে। তনিমার কথা গুলো তার ভালো লাগছে না। অস্বস্তিকর লাগছে। রিফাত বলে..
‘ আপনি কি চান তনিমা? আপনার বন্ধুকে পছন্দ করেন?
‘ আমার পছন্দ-অপছন্দ কিংবা চাওয়া এখানে ম্যাটার করে না। যদি করতো তাহলে আমি আজ স্বামীর ঘরেই থাকতাম। বাপের বাড়ি নয়।
তনিমা সরাসরি খোঁচাটা রিফাতকে দিয়েছে, সেটা বুঝতে দেরি হয়নি রিফাতের। এতক্ষণ রিফাতের পলাশকে নিয়ে কথা বলতে যে অস্থিরতা ভিতরে কাজ করছিল, তনিমার খোঁচায় সেটা ভালো লাগছে। তনিমা রিফাতকে খোঁচা দিয়ে হলেও সে পলাশকে নয় বরং রিফাতকে নিজের জন্য বেচে নিচ্ছে। রিফাত এবার খানিকটা শান্ত হয়ে বসে…
‘ আমি তো আমার বউ বিয়ে দিব না তনিমা।
এবার তনিমার মনোযোগ নড়েছে। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়। রিফাত আজ দৃষ্টি সরায় না। তনিমা কয়েক সেকেন্ড রিফাতের সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। খাতার দিকে তাকিয়ে ছোট গলায় বলে..
‘ তাহলে ওইটা ওকে বলে দিয়েন।
‘ আমার যা বলার সেটা আমি দেখে নিব। আপনি আজকের পর আপনার কোনো ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা করবেন না তনিমা।
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৪
‘ কেন?
‘ আপনার স্বামীর পছন্দ নয় তাই।
এবার লজ্জা ও অস্বস্তি ছেয়ে গেল তনিমার চোখ-মুখ জুড়ে। একটা অনিশ্চিত সম্পর্ক অবশেষে নিশ্চিতের পথে হাঁটছে। তনিমা মাথা নুইয়ে সম্মতি দেয়, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। রিফাত দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখে তনিমার সেই লাজ-লজ্জিত মুখটা।
