Home ডার্কসাইড ডার্কসাইড পর্ব ২৩

ডার্কসাইড পর্ব ২৩

ডার্কসাইড পর্ব ২৩
জাবিন ফোরকান

অতিবাহিত হয়েছে প্রায় এক মাস।
ইতালির দিনগুলো কিভাবে কাটছে আসমানের? তাকে সত্যিকার অর্থে চেনে এবং জানে এমন কেউ তার দিনলিপি এবং কার্যকলাপ সম্বন্ধে অবগত হলে নিশ্চিত নিজ জীবনের সবচেয়ে বিশাল বিস্ময় অনুভব করতে বাধ্য হবে।

প্রথম ডেট?একটি লাইব্রেরী। নতুন পুরোনো কাগজের ভাঁজের মাঝে,নৈঃশব্দের আচ্ছাদনে, সাহিত্যের পংক্তিতে বিলিয়েছে দুটি হৃদয়।সাহিত্য এবং আসমান?হাস্যকর নয় কি?ব্যাপারটি অবশ্যই ঘটেছে, চিত্রলেখা নামক এক তন্দ্রাহরণী রমণীর প্রভাবমন্ত্রে। অতঃপরের গন্তব্য এক অপেরা থিয়েটার।বিদেশী সংস্কৃতির মূর্ছনায় আচ্ছাদিত দর্শকসারিতে বসে স্বয়ং আসমানও নিজেকে হারিয়েছে চিত্রর সুরেলা কণ্ঠে।উহুম,অপেরা নয়।বাঙালি নারীর কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, বাউল শাহ আবদুল করিমের অতি জনপ্রিয় “বন্দে মায়া লাগাইছে” গানটি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শুধুমাত্র আসমান নয়,বরং উপস্থিত দেশী বিদেশী বিস্তর নাগরিকদেরও তা ভাসিয়েছিল আবেগস্রোতে। মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল প্রতিটি অন্তর।এরপর থেমে থাকেনি আসমানের দিনগুলো।কখনো মেতেছে ইতালির প্রান্তে প্রান্তে স্থাপিত বারের জ্যায মিউজিকের তালে,পার্কে বসে সময় কাটিয়েছে সঙ্গীত শিক্ষায়;কখনো আবার রেমান গ্রুপের অধীনস্থ এক বিখ্যাত ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টের প্রধান রাঁধুনির নিকট হতে তালিম নিয়েছে রান্নার।সবকিছুর কেন্দ্রে যে রয়েছে,সেই মানুষটির নাম পরিণীতা রেমান চিত্রলেখা, এক অপরিচিতা।

এহেন মুহূর্তযাপনের উদ্দেশ্য?টার্গেট বিলাল রেমানের কন্যাকে বশ করা,তার সুযোগ গ্রহণ করে টার্গেটের নিকটবর্তী হওয়া থেকে সকল ধরনের তথ্য আহরণ— নিজের অন্তরকে এমনি বুঝ প্রদান করেছে কি*লিং মেশিন আসমান।অনুভূতিকে উপেক্ষা করতে চেয়েছে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায়,নিজের হাসি,আবেগ,সুখের ব্যাক্ষা দিয়েছে মিশনের প্রয়োজনীয়তা ব্যবহার করে।কিন্তু পাথর হতে ধীরে ধীরে পুষ্পবাগানে পরিণত হতে আরম্ভ করা এই অন্তর খুব ভালোমতই জানে এহেন কার্যকলাপের অর্থ।তবুও জোরপূর্বক অস্বীকৃতি জানায় মস্তিষ্ক।কারণ যে মুহূর্তে মস্তিষ্ক অনুধাবন করবে কিছুই স্বাভাবিক নেই,ঠিক ওই মুহূর্তেই নিজেকে আপনা আপনি গুটিয়ে নেবে,খোলসের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়া কচ্ছপের মতন।হারাবে সকল মুহূর্ত,সকল অনুভূতি,সকল সুযোগ। অবাধ্য অস্তিত্ব এই নরকমাঝে হঠাৎ করে লাভ করা এক টুকরো স্বর্গকে হারাতে রাজী নয়।শূন্য এই অন্তর এক ফোঁটা ভালোবাসার কাঙাল।

এই মুহূর্তে কিচেনের কেবিনেটের উপর বসে পা ঝোলাতে ঝোলাতে একটি আপেল কামড়ে চলেছে নিহাদ।তার বিস্মিত দৃষ্টি আপতিত কিছুটা দূরেই কর্মযজ্ঞে ব্যাস্ত আসমানের দিকে।কাটিং বোর্ডের উপর ছু*রি দিয়ে একটি পিঁয়াজ কে*টে চলেছে সে।কিছুটা অনভিজ্ঞ হলেও ভালোই চালু মনে হচ্ছে কাজে।ঝাঁঝে এক ফোঁটা জলও আসেনি তার নিগূঢ় মনোযোগী দৃষ্টিতে।অথচ ঝরঝর করে কেঁদেকেটে সব একসা করতে করতে টিস্যু নাকে চালাচ্ছে নিহাদ।

গত এক মাসে একটু একটু করে আসমানের মাঝে আসা পরিবর্তনগুলো খুব ভালোভাবে খেয়াল করেছে সে।যে মানুষটাকে আগে একটি নিপুণ হাতে তৈরি অনুভূতিহীন পাথরের ভাস্কর্য ব্যতিত আর কিছুই মনে হতোনা,তার মাঝেই মানবিক গুণাবলীর উদ্ভাবন ঘটতে শুরু করেছে।বাড়িতে থাকাকালীন অধিকাংশ সময়েই গান শোনে আসমান।ইংরেজি কিংবা বাংলা উভয়েই।গত সপ্তাহে নিজের রুমের তাকটি ভর্তি করেছে বিভিন্ন ভাষার বই দিয়ে।ধীরে ধীরে ইটালিয়ান আয়ত্ব করছে। আরামকেদারায় দুলে দুলে ধূমপানের বদলে ইদানিং বই পড়তে দেখা যায় তাকে।তারপর আসলো এই রান্নাবান্নার প্রতি আগ্রহ।ইটালিয়ান পিৎজা,স্প্যাগেটি কিংবা ক্যান ফুডের উপর নির্ভর করে দিন কাটানো নিহাদ হঠাৎ করে ঘরে বানানো খাবারের স্বাদ পেয়ে খুশি।কিন্তু আসমানের এমন বিশাল এক পরিবর্তন তাকে বড্ড ভাবাচ্ছে।

বিলাল রেমানের মেয়ে চিত্রলেখার নিকটবর্তী হওয়া সম্পর্ককে আসমান বিশ্লেষণ করে নিজের চাল হিসাবে।টার্গেটের কাছাকাছি পৌঁছানোর সহজ একটি উপায়।কিন্তু তা বিশ্বাস হতে চায়না নিহাদের।যে মানুষটাকে দেখে সে বড় হয়েছে,যাকে সর্বদা নিজের পথপ্রদর্শক অনুধাবন করে এসেছে তার মাঝে এমন পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে সামান্য এক রমণী?সে কি অসীম ক্ষমতাবান?অবশ্যই নয়।সে সক্ষম হয়েছে কারণ আসমান নিজেকে পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে।নাহলে এই পৃথিবীর কারো সাধ্য নেই নিটল এই হিমালয়কে টলানোর।এর অর্থ কি?আসমান চিত্রলেখার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ছে।নিজেও বুঝতে পারছে অবশ্যই,তবুও অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।আনমনে ভাবে নিহাদ,কি হবে তার একমাত্র আপন মানুষটির পরিণতি?

– এটা কেমন হয়েছে?
আসমানের প্রশ্নে নিহাদের ভাবনায় ছেদ পড়ল।মাথা ঝাঁকিয়ে সে পাশে চাইলো।কেবিনেটের উপর প্রস্তুতকৃত গরম গরম চটপটির বাটির দিকে না চাইতেও লোভাতুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে বাধ্য হলো।এক লহমায় হাতে তুলে মুখে পুরলো এক চামচ।উষ্ম বাষ্পের পরোয়া করলোনা,জিভ পু*ড়লে পুড়ুক!
– উফ… মাইন্ড ব্লোয়িং ভাই!তুমি এত দারুণ রান্না করতে শিখলে কিভাবে?
– চিত্র শিখিয়েছে।ওর দাদীর স্পেশাল রেসিপি।
বাক্যগুলো উচ্চারণ করার সময় আসমানের অধরের মৃদু পরিতৃপ্তির হাসিটি নিহাদের দৃষ্টি এড়ালোনা।মৃদু শব্দ করে চটপটির বাটি নামিয়ে রাখলো সে।তাতে কেবিনেট টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে থাকা আসমান ভ্রু কুচকে শুধালো,

– কি ব্যাপার?লেবু বেশি হয়েছে বুঝি?
নিঃশব্দে মাথা নাড়ল নিহাদ।আধখাওয়া আপেলটাও দূরে সরিয়ে রাখলো।একটি শক্ত ঢোক গিলে দৃষ্টি তুলে আসমানের কৃষ্ণগহ্বরকে মোকাবেলা করলো।
– আগামী সপ্তাহে চ্যারিটি গালা।তুমি যে হারে এগোচ্ছো তাতে আমি নিশ্চিত রেমানের তরফ থেকে এক দাওয়াতনামা পাবেই।সেক্ষেত্রে….
– সেক্ষেত্রে ওইদিনই বিলাল রেমানকে শেষ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে আমায়।
নিহাদের বক্তব্য আনমনে সমাপ্ত করলো আসমান।তার উৎফুল্ল চেহারায় মুহূর্তেই নেমে আসা ঘন কালো মেঘপুঞ্জের আঁধার স্পষ্টত দৃষ্টিগোচর হলো নিহাদের।কেবিনেট থেকে লাফিয়ে নামলো নিচে।এগিয়ে গেলো কয়েক পা।

– আসমান ভাই,ইউ সিম টু মাচ হ্যাপি দিস ডেইয।
গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ অদূর জানালার পানে।যার কাচের আস্তরণ ভেদ করে বাইরের গুমোট প্রকৃতি ধরা দিচ্ছে মাধুর্যতার বহর নিয়ে।আরেকটু এগোলো নিহাদ,একটি হাত রাখলো কাধ বরাবর।
– আই ওয়ান্ট ইউ টু উইটনেস হ্যাপিনেস বাট…
নিঃশব্দ আসমান।নিহাদের আঙুলসমূহ তার কাঁধে দ্বিগুণ শক্তিতে চেপে বসলো।কপাল কুঁচকে এলো উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তায়।

– আর কত পালিয়ে বেড়াবে নিজের কাছ থেকে?তুমি এখন ভালো আছো,কিন্তু আর থাকবেনা।আমার ভয় হচ্ছে।ঠিক যেমন ঘূর্ণিঝড়ের আগমুহূর্তে প্রকৃতি থমথমে এক প্রশান্তি ধারণ করে,তোমার জীবনেও হঠাৎ করে যেন তেমন এক প্রশান্তির উদয় ঘটেছে।কি রয়েছে এই প্রশান্তির পর?নতুন সৃষ্টি?নাকি ধ্বংস?
নিহাদের কন্ঠস্বর আসমানের কর্ণকুঠরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো তার উভয় হাত।এতটাই জোরালোভাবে যে শ্বেতবর্ন ধারণ করলো তার ত্বক।চড়াও হয়ে উঠল শিরা উপশিরা এবং ধমনী।এতটাই স্পষ্ট তার অনুভূতি?

– দয়া করে আর বাহানা দিওনা যে তুমি রেমানকে শুধুমাত্র নিজের মিশনের ট্রাম্প কার্ড হিসাবে দেখো।
– শি ইজ মাই ট্রাম্প কার্ড নাথিং মোর।
– ওহ?
একগাল হাসলো নিহাদ।মুখোমুখি হলো গুরুর।বুকে উভয় হাত ভাঁজ করে প্রশ্ন ছুড়লো একের পর এক।
– তাহলে উত্তর দাও,কেনো তুমি গান ভালোবাসো?কেনো তুমি সাহিত্য ভালোবাসো?কেনো তুমি হাসতে শিখেছ?কেনো তুমি এতটা উৎফুল্ল থাকো?কোথায় তোমার সেই অনুভূতিহীন সত্তা?কোথায় সেই জীবন্মৃত অবস্থা?কোথায় সেই নৃশং*সতা,বর্ব*রতা?কোথায় হারিয়েছে সেই আসমান যার মানুষ মা*র*তে সামান্য হাত কাপেনা?যে ছু*রি ধম*নী কে*টে অভ্যস্থ সেই ছু*রি এখন কা*টে রান্নার উপকরণ…

– স্টপ ইট!
আসমানের বজ্রকন্ঠে শিউরে উঠলো নিহাদ,তবুও থমকালো না।
– স্বীকার করে নাও আসমান ভাই।তুমি বদলে গিয়েছ, তুমি আর আগের মত নেই।এক রমণী তোমাকে আপন সত্তা ভুলিয়েছে।পূর্বের পাথর ভাস্কর্য ভেঙে নরম কোমল মাটি দিয়ে পুনরায় গড়ে তুলছে একটু একটু করে।তুমি তাকে ভালোবাসো ভাই, ভালোবাসো!
– আই সেইড স্টপ ইট!
ক্ষিপ্র গতিতে নিহাদের কন্ঠে চেপে বসলো আসমানের হাত।আছড়ে ফেললো তাকে কেবিনেটের উপর।ক্রোধে কুঞ্চন ধারণ করেছে তার শিশুসুলভ চেহারা, তীব্র কাপুনি ধরিয়ে দেয়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে নিহাদের পানে।নিঃশ্বাস প্রশ্বাস থমকে গিয়েছে, দপদপ করছে মাথা,তবুও দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শক্ত রেখেছে নিহাদ।ঠোঁট কামড়ে সে র*ক্তপিপাসু দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে বললো,

– কনফেস ইট… ইউ আর ইন লাভ!শি ইজ নট জাস্ট আ মিশন টু ইউ এনিমোর…শি ইজ ইওর…
– বুলশিট!
তীব্র গতিতে আসমানের মুষ্টিবদ্ধ হাত নিজের মুখ বরাবর এগোতে দেখলো নিহাদ এক ঝলক।শক্তভাবে বুজে নিলো চোখের পাতা।অতঃপর….
ধাম!
কেঁপে উঠলো নিহাদ,নিজের খুব কাছেই ধ্বংসযজ্ঞ অনুভব করেছে সে।কিন্তু কোনো ব্যথা অনুভূত না হওয়ার দরুণ মিটমিট করে দৃষ্টি মেলে তাকালো।তার উপর ঝুঁকে রয়েছে আসমান, ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে বুক উঠানামা করছে অস্বাভাবিক গতিতে। হাতটি আ*ঘা*ত হেনেছে ঠিক নিহাদের মুখের পাশে কেবিনেটের উপর,দেবে গেছে কাঠের অংশ,ফাটল ধরেছে তাতে। ছোপ ছোপ রক্তিম দাগ পড়েছে ফাটলজুড়ে। যাতে দায়ী ক্ষীণ র*ক্তধারা চুঁইয়ে পড়ছে আসমানের আঙুলের উপরাংশ থেকে।হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে থাকল নিহাদ।তার হৃদস্পন্দন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।

পরমুহূর্তেই তার গলা ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালো আসমান।তার র*ক্তা*ক্ত হাত তখনো মুষ্টিবদ্ধ,এক নজর শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সে নিহাদের উদ্দেশ্যে।পরক্ষণেই এক টানে পরিধানের কিচেন অ্যাপ্রোনটি রীতিমত ছিঁড়ে ফেললো একপাশে।হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেলো কিচেন থেকে।তখনো কেবিনেটের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে থাকল নিহাদ।অমানিশার অশুভ নীরবতা গ্রাস করলো তাকে।
তবে অন্তরে বিন্দুমাত্র আফসোস হচ্ছে না তার।সে যা করেছে একদম সঠিক করেছে।দ্বিতীয়বার করতেও কখনো কুণ্ঠাবোধ করবেনা।
ভালোবাসা এবং আসমান?কিছুদিন আগেও বিষয়টি অসম্ভব হলেও বর্তমান সবকিছুকে পাল্টে দিয়েছে।পাথর হৃদয়েও জন্ম দিয়েছে জীবন্ত পুষ্পকলির।

সকাল সকাল কফি তৈরী করে মগের উপরে হুইপড ক্রিম দিয়ে একটি ফুলের দৃশ্য ফুটিয়ে তুললো চিত্র।একগাল বিস্তর হেসে নিজের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে পাশে রাখা ফোনের দিকে তাকালো।একটি মেসেজ ভেসে উঠেছে।
ব্রোকেন হার্ট: “ মর্নিং ”
চিত্রর হাসি দ্বিগুণ বিস্তৃতিলাভ করলো।ফোন তুলে ফিরতি মেসেজ পাঠালো সে।
চিত্র:“ গতকাল সারাদিন কোথায় ছিলে?একটা মেসেজেরও রিপ্লাই নেই যে? ”
ব্রোকেন হার্ট:“ সরি ”
চিত্র:“ ইনভাইটেশন দিয়েছি,পেয়েছ? ”

ব্রোকেন হার্ট:“ হুম ”
চিত্র:“ আসবে নিশ্চয়ই।তোমাকে বাবার সাথে দেখা করাবো। ”
ব্রোকেন হার্ট:“ আচ্ছা ”
চিত্রলেখার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।ছেলেটার ব্যবহার অদ্ভুত লাগছে।এমনিতে খুব চাপা স্বভাবের হলেও এতটা নয়।
চিত্র:“ কি ব্যাপার?আর ইউ অলরাইট আসমান? ”
ব্রোকেন হার্ট:“ হ্যাঁ। ”
চিত্র:“ শিওর? ”
ব্রোকেন হার্ট:“ পরে কথা বলবো। ”

এটুকুই। চিত্র মেসেজ করলেও এরপর আর উত্তর করা হলোনা।একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ট্রেতে কফি আর চকলেট কুকি সাজিয়ে নিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো দুইতলায়।করিডোর পেরিয়ে দরজা খুলে কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করতেই একটি বিশাল ডেস্কের ওপাশে চেয়ারে বসে ফাইলে মনোযোগরত ব্যক্তিকে নজরে পড়ল।এগিয়ে গেলো চিত্র।কফির ট্রে পাশে রেখে দিয়েই ঝুঁকে কপালে চুমু খেলো।
– গুড মর্নিং ড্যাড।
– আহ্,মর্নিং মাই বেইবি।

পাল্টা সন্তানের কপালে আদুরে চুমু আকলেন বিলাল।কফির দিকে চেয়ে একগাল হাসলেন।তার চেয়ারের হাতলে হেলান দিলো চিত্র।পিতার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি কফিতে চুমুক দিলেন।
– তোমার হাতের যেকোনো কিছুই অসাধারণ বেইবি।
হাসলো চিত্র।তারপর বিড়বিড় করলো,
– তোমাকে একটা কথা বলার ছিল ড্যাড।
– হুম।অবশ্যই।কিছু লাগবে তোমার?
– না না কিছুই লাগবেনা।শুধু…ইয়ে মানে…

ভ্রু উঁচু করে কৌতূহলী দৃষ্টিতে মেয়েকে একনজর দেখলেন বিলাল।পরমুহুর্তে চেয়ারে হেলান দিয়ে অমায়িক হাসলেন,যেন উৎসাহ প্রদান করছেন।তাতে চিত্র কিছুটা লজ্জাবোধ অনুভব করলো।
– ওকে….চ্যারিটি গালাতে আসতে বলেছি।তোমার সঙ্গে দেখা করাতে চাই।
এক মুহুর্ত থমকালেন বিলাল।তার অধরের হাসি কিঞ্চিৎ হ্রাস পেলো।কি যেন ভাবলেন আপনমনে।তারপর জানালেন,

– সব মেয়েকেই একদিন পিতা মাতাকে ছেড়ে পরের ঘরে যেতে হয়।কিন্তু তোমার এতই তাড়া বুঝি?
– উফ্ ড্যাড,কি বলছো!আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না,কোনোদিন না!
বিলালের ঘাড় জড়িয়ে কাঁধে মুখ ডোবালো চিত্র।তাতে হাসলেন পিতা।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
– আচ্ছা আচ্ছা সব বুঝেছি আমি।আমার মেয়েটা ভালোমতই প্রেমের জালে ফেঁসেছে, তাইতো?
– ড্যাড!
– হাহা,লজ্জা পাওয়ার কি আছে?প্রেমে পড়া কোনো খারাপ ব্যাপার নয়।সকলের প্রেমে পড়ার বিয়ে করার অধিকার রয়েছে।
– তুমি আমাকে জ্বালাতন করছ কিন্তু!

শব্দ করে হাসলেন বিলাল।অতঃপর একটি নিঃশ্বাস নির্গত হলো তার বক্ষ থেকে। চিত্রকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কপোলে স্নেহ বুলিয়ে বিচক্ষণ দৃষ্টিতে বিড়বিড় করলেন,
– একটা কথা বলবো বেইবি?কথা দাও আমার সঙ্গে রাগ করবেনা।
কিছুটা বিহ্বল হয়ে পিতার দিকে তাকিয়ে থাকলো চিত্র।এমন অভিব্যক্তি কিছুটা বেমানান ঠেকছে তার কাছে।
– তুমি বড্ড সরল আমার চিত্র,এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করোনা কখনো কেমন?তাকেই বিশ্বাস করবে, যার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা সম্ভব।

– তুমি….কি বলতে চাইছো ড্যাড?
– উহুম,কিছুই না।তোমাকে শুধুমাত্র একটা লাইফ লেসনের কথা বললাম।বিশ্বাস অমূল্য। কাচের মতন।একবার ভেঙে গেলে পুনরায় জোড়া লাগানো অসম্ভব।
মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন বিলাল।তার আলিঙ্গনে নিজেকে বিলিয়ে চিত্রর হৃদয় বিচলিত হয়ে উঠল এক অজানা আশঙ্কায়।কেনো এমন অনুভূতি হচ্ছে তার?বুঝতে পারলোনা কোনোক্রমে।
– ডোন্ট ওয়ারি বেইবি, আই উইল প্রোটেক্ট ইউ।
অন্তিম মুহূর্তে এটুকুই কর্ণগোচর হলো তার।

– প্রস্তুতি কতদূর?
– এভরিথিং রেডি।
– ওকে।ডু ইট।
– হুম।
– আমি যেকোনো প্রকারে সফলতা চাই।

ফোনের লাইন কেটে যেতেই যন্ত্রটি হাত থেকে নামিয়ে রেখে আয়নায় চাইলো আসমান।নিজেকে নিজেরই বড্ড অচেনা ঠেকে তার আজকাল।এ কি আদও সে?নাকি তার স্থানে ভিন্ন কাউকে স্থাপন করা হয়েছে।রয়েল ব্লু বর্ণের সুট এবং ফরমালে নিজেকে সাজানোর বাসনা এর আগে জাগেনি তার অন্তরে।উপেক্ষিত চুলের গুচ্ছও আজ পরিপাটি করে আঁচড়ানো,জেলের সাহায্য গ্রহণ করতে হয়েছে।শ্বেতবর্ণের ত্বকের সঙ্গে দারুণভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে তার অবয়ব। কিসের জন্য এত আয়োজন?সম্পর্কের প্রারম্ভে? নাকি সম্পর্কের ইতিতে।আজকের পর কি আর কোনোদিন ওই মায়াবী অস্তিত্বের সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়া সম্ভব হবে তার পক্ষে?

না।কোনোদিন না।
উধাও হয়ে যাবে আসমান, চিত্রলেখার জীবন থেকে।যেন কোনোকালে তার কলুষিত জন্মের অস্তিত্ব রমণীর পবিত্র জীবনে ছিলোনা।পাপ সে,অশুভ সে; কোনো অধিকার নেই পবিত্রতাকে ছোঁয়ার।
ভাইব্রেশনের শব্দে ফোনের দিকে তাকালো আসমান।একটি মেসেজ এসেছে।কখনোই রিপ্লাই করা হয়না।তবুও প্রতিদিন অন্তত একটি মেসেজ হলেও আসবেই।
“ অল দ্যা বেস্ট মাই ডগি…”
বিষন্ন হাসিতে আচ্ছাদিত হলো আসমানের অধর।মানুষ যেমন করে নিজের পালিত কুকুরকে ভালোবাসে,রাফাও তেমন করেই তাকে ভালোবাসে।ভালোবাসা?উহুম।অপমান করা উচিত নয় চমৎকার শব্দটিকে।বলা উচিত আসক্তি।চরম পর্যায়ের আসক্তি।মাথা ঝাড়া দিয়ে নিজেকে সংযত করলো আসমান।তারপর বেরিয়ে পড়লো।

চ্যারিটি গালা রোমের উত্তর প্রান্তের এক বিস্তৃত ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থানে আয়োজিত হয়েছে।বিলাসবহুল জীবনযাপন উপভোগ করা মানুষমাত্রই এসব আনুষ্ঠানিক গালাতে অংশগ্রহণ করে।কে কত বিশাল অংকের ডোনেশন প্রদান করতে পারে, তা নিয়ে আগ্রহ আলোচনা থাকে তুঙ্গে।আসমানের বুগাটি কাইরন যখন অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলো তখন সময় সন্ধ্যা ৭ টা ২০ মিনিট।
গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এদিক সেদিক তাকালো সে।নতুন কোনো মুখকে পৌঁছতে দেখে আমন্ত্রিত অতিথিগণ ফিরে ফিরে তাকালো।সকলেরই আগ্রহ হচ্ছে পরিচিতির।কোথাও কোনো পরিচিত মুখের অস্তিত্ব না পেয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করে আসমান হাতঘড়ির দিকে তাকালো আবারো।পকেটে হাত ভরলো ফোন বের করার আশায়।ঠিক তখনি আচমকা তার পিঠে কারো হাতের অস্তিত্বে ঈষৎ শিউরে উঠে ঘুরে তাকালো।বিস্তৃতি হাসি নিয়ে তার দিকে চেয়ে রয়েছে সুদর্শনা।

– ওয়েলকাম আসমান! ডিড ইউ মিসড মি?
আসমানের কোমরে জড়িয়ে গেলো তার উভয় হাত।আলিঙ্গন করলো আলতোভাবে।এক মুহুর্ত স্তব্ধ হয়ে থেকে পরক্ষণে সুদর্শনাকে দূরে ঠেলে আসমান ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করলো,
– ইউ আর নট চিত্র।
তীর্যক হাসলো চারুলতা।পার্টিতে পরিবারের আগেই সে পৌঁছেছে আলাদাভাবে। চিত্রলেখা এবং বিলাল আসবেন একসাথে,কোম্পানিতে গিয়েছে তারা কোনো এক জরুরী মিটিংয়ের কাজে।তাই নিজের বোনের প্রিয় পুরুষটিকে সামান্য পরখ করে দেখছিলো।কিন্তু প্রথমবারেই এমন ধরা পড়ে যাবে ভাবেনি।এত দ্রুত চারুলতা এবং চিত্রলেখাকে আলাদা করার কর্মটি একমাত্র বিলাল রেমান ব্যাতিত করতে এর পূর্বে কেউ কোনোদিন সক্ষম হয়নি।

হয়ত ভুল মানুষকে পছন্দ করেনি তার সহোদর।
আসমানের কাধ চাপড়ে দিলো চারুলতা।
– গুড জব ম্যান,গুড জব।
– আপনি…চারুলতা?
রহস্য করে হাসলো চারুলতা।দীর্ঘ চুলরাশি পিছনে এলিয়ে মাথা কাত করে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো আসমানকে।
– হুম,এবং আপনি… দি গ্রেট আসমান।
নীরব থাকলো আসমান।পুনরায় তাকালো হাতঘড়িতে তাকাতেই হাসলো চারুলতা।
– খুব বেশি ব্যস্ত মানুষ নাকি? আপু বলেছে বিজনেস আছে গাড়ির?এজন্যই বুঝি বুগাটি পছন্দ?
এক নজর দূরে পার্কিং লটে রাখা গাড়ির দিকে তাকিয়ে আসমান চারুলতায় দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলো।যথারীতি নিরুত্তর থাকলো।

– একি?আপু যে বললো আপনি নাকি খুবই… ফ্রেন্ডলি?এ তো দেখছি ফার্মের মুরগীর থেকেও খারাপ।একটা বটগাছের সাথে আলাপ করছি নাকি?
– চিত্র কোথায়?
– আহারে আসবে আসবে,একটু ধৈর্য্য ধরুন মশাই।এমন ছটফট করতে লজ্জা লাগেনা?আমি আপনার হবো হবো শালী হই,একটু তো…

চারুলতার উপর সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে আসমান ঘুরে দাঁড়ালো।পাশের টেবিল থেকে একটি জুসের গ্লাস তুলে চুমুক দিলো।যেন কথোপকথন না করতে হয়।তাতে ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো চারুলতা।এমন কঠোর পুরুষমানুষ সে দেখেনি।কিসের কঠোর?এ তো রীতিমত রুড!প্রথম দর্শনে বিশেষ কিছু মনে না হলেও বর্তমানে এই অদ্ভুত পুরুষটিকে ঘিরে তার হৃদয়ে কিঞ্চিৎ আগ্রহ জাগ্রত হয়েছে।চুল এলিয়ে ভাব দেখিয়ে উল্টো ঘুরল সে,তারও এত ঠেকা পড়েনি কারো সঙ্গে এভাবে যেচে যেচে আলাপ করতে।

প্রায় এক ঘন্টা পেরিয়ে গেলো তারপর।চ্যারিটি গালা আরম্ভ হলেও বিলাল রেমান কিংবা চিত্রলেখার দেখা পাওয়া গেলোনা।ক্রমেই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে উঠল আসমান।ব্যাপার কি?এতটাও দেরী হওয়ার কথা নয়। আনমনে আশেপাশে চারুলতার দিকে তাকালো। মেয়েটিকেও কিছুটা বিচলিত লাগছে।পায়চারি করছে চারদিকে,কানে ফোন।যখন কি করা উচিত ভাবছে আসমান তখনি তার নিজের ফোন ভাইব্রেট করে উঠলো।দ্রুত ফোন তুলে নিহাদের নম্বর লক্ষ্য করতেই তার ভ্রুজোড়া কুচকে এলো।

– প্ল্যান ফেইল্ড।
তবুও নীরব থাকলো আসমান।নিহাদের অতি উত্তেজিত কন্ঠস্বর ধ্বনিত হয়ে চলেছে।
– তিনটি জ্বীপ,দুইটি ল্যাম্বরগিনি এস ভি জে।তুলে নিয়েছে, ফাইভ বডিগার্ড ডাউন।বুকে পেঁচার মোহর।টেইলিং দ্যাম।
জীবনে বহুবছর পর ভীতি অনুভব করলো আসমান, চরম ভীতি!আশঙ্কা,অনুশোচনা এবং ক্রোধ!সংমিশ্রিত অনুভূতিতে তার শরীরজুড়ে প্রকম্পন খেলে গেলো। তীব্র কন্ঠে আদেশ করলো,
– কিপ টেইলিং,লোকেশন পাঠাও।
– অন ইট।

ছুটলো আসমান,রীতিমত ঊর্ধ্বশ্বাসে।পার্টিতে উপস্থিত সকলে হতচকিত হয়ে চেয়ে থাকল,কোনো পরোয়াই করলোনা।কানে গুজলো এয়ারপিস। বুগেটির ভেতর চেপেই ইঞ্জিনের গর্জন তুলে গ্লাভস ঢোকালো হাতে।শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো স্টিয়ারিং।ছোটালো নিজের বাহন।রোমের সড়ক ধরে ছুটে চললো, স্পিডমিটার তিন মিনিটের মাথায় ছাড়ালো একশো কিলোমিটার পার আওয়ার,ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকলো তা।বুকের ভেতর ঘূর্ণিপাক,অন্তরে ক্রোধ এবং মস্তিষ্কে শুধুমাত্র একজনের মুখচ্ছবি।কোনো মিশনের টার্গেটের নয়।এক মায়াবিনী অপরিচিতার।নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলা এক অপ্সরার।
একের পর এক গাড়িকে ওভারটেক করে ছুটে চললো আসমানের দুর্বার বাহন।পরোয়া করলোনা বিপদসংকেতের কিংবা পুলিশি সাইরেনেরও।

তীব্র গতিতে নিজের বাইক ছুটিয়ে চলেছে নিহাদ।কিছুক্ষণ আগেই তাকে অনুসরণ করতে খেয়াল করেছে তৃতীয় পক্ষ।তাদের জ্বীপগাড়ি থেকে পি*স্ত*ল তাক করা হয়েছে।হ্যান্ডেলে জোর হাত চাপিয়ে ইঞ্জিনের হুংকার তুলে বায়ুর ঘূর্ণি কেটে ছুটলো সে।কালো বর্ণের ড্রাগন অংকিত হেলমেটের উইন্ডোর আড়ালে তার টানা টানা চোখজোড়া মনোযোগে আচ্ছন্ন।
থপ…থপ…
মৃদু শব্দ তুলে গু*লি ছুঁড়তে আরম্ভ করা হলো।তীব্র বাক কাটলো,চাকার কর্কশ আর্তনাদে প্রকম্পিত হয়ে উঠল চারিপাশ। বাইক হেলে গেলো একদিকে,তার হাঁটু গিয়ে ঠেকলো সড়কে প্রায়,মাত্র এক ইঞ্চির ফারাক।
– ড্যাম ইট!

আপনমনে বিড়বিড় করে পুনরায় বাইক পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনলো।সহসাই ঢুকলো বিপরীত সড়কে।বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা।
কোম্পানি থেকে বিলাল রেমান এবং চিত্রলেখাকে অনুসরণ করার কাজ ছিল তার।কিন্তু এর মাঝে এই পেঁচাবাহিনী কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে ধারণা করতে পারছেনা।এখন সে কেনো ছুটছে এদের পিছনে?টার্গেটকে হাতিয়ে নিয়েছে,হাতিয়ে নিয়েছে আসমানের চিত্রলেখাকেও।এদের কবর খুঁ*ড়ে তবে আজ শান্ত হবে মন।
বিপরীত সড়ক ধরতেই পেঁচাবাহিনীর জ্বীপদের অনুসরণ লক্ষ্য করে বাঁকা হাসি ফুটলো নিহাদের অধরে।ভালোই তো।তাকে রেসে হারাতে চায়?বেশ তবে দেখা যাক রেস কত প্রকার ও কি কি!

– গেট রেডি পেঁচার গুষ্টি!
এক টানে বাইক ঘুরিয়ে উল্টো ছুটলো নিহাদ।মুখোমুখি!সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছে ড্রাইভার।তাতে উত্তেজনার পারদ চড়চড় করে ঠেকলো আকাশে।মুহুর্মুহু গু*লি*বর্ষন সে এড়ালো,একবার বামে আরেকবার ডানে হেলিয়ে।একেবেকে এমনভাবে এগোচ্ছে যে রাতের আঁধারের মাঝে শুধুমাত্র হেডলাইটের আভায় তাকে টার্গেট করা সম্ভব হচ্ছে না।

ভ্রুম… ভ্রুম!
স্পিড দ্বিগুণ করলো নিহাদ। অপর প্রান্তের জ্বীপে চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে স্পষ্ট টের পাচ্ছে।গতি কমিয়ে পিছিয়ে যেতে চাইছে তারা।হাসি বিস্তৃত হলো নিহাদের।পৌঁছে গিয়েছে সে প্রায়,সংঘর্ষ হলো বলে… একেবারে অন্তিম মুহূর্তে বাক কাটলো,চাকার আর্তনাদে কান চি*রে এলো যেন।এক হাতে হ্যান্ডেল চেপে ভিন্ন হাতে তুললো নিজের রিভ*লভার, গু*লি ছুঁড়লো জ্বীপের নিচের গ্যাসট্যাঙ্ক বরাবর।পাশাপাশি অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার আগে জ্বীপবাসির অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে অধর কুঞ্চিত করে হাসলো।
– গুডবাই…পাপি’স!
রিভলভার সম্বলিত হাত তুললো পিছনে।হতবাক হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকলো বাকিরা।এক আঙ্গুল,দুই আঙ্গুল, তিন আঙুল তুললো নিহাদ…ঠিক তার পরেই।
ধামাকা!

প্রচণ্ড বি*স্ফো*রণে ছিটকে গেলো জ্বীপ,দাউদাউ আ*গু*নে ছেয়ে গেলো।বাইকের প্রান্ত উঁচিয়ে সেই অগ্নিকুন্ডের মাঝ থেকে বেরিয়ে এলো নিহাদ। মুখজুড়ে তার পরিতৃপ্তির হাসি।
একটা টায়ার ছিটকে আসতেই মাথা হেলিয়ে তা এড়িয়ে উচ্চশব্দে হেসে উঠলো।তারপর নজর দিলো দ্বিতীয় জ্বীপের দিকে। তৃতীয়টিও এগোচ্ছে, একইসাথে।নিহাদ স্পিড কমালো,ছুটে গেলো ল্যাম্বরগিনির দিকে। ওটাকে দৃষ্টির আড়াল হতে দিলে বেকায়দায় পড়ে যাবে।ওখানেই চিত্রলেখা আর বিলাল রেমান রয়েছে।নিহাদ আন্দাজও করার সময় সুযোগ পায়নি যে ভিতর থেকে বসে পিছনে চলমান ধ্বংসযজ্ঞের সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করে চলেছে রেমান পরিবার।
হঠাৎই ঘটলো বিপত্তিটা। সুঁচালো কিছু জিনিস সড়কে ছুঁড়ে দিয়েছে পেঁচাবাহিনী। সেসব এড়াতে গিয়ে নিহাদ ভারসাম্য হারালো।সুযোগ গ্রহণ করে উভয় প্রান্ত থেকে তাকে চেপে ধরলো দুই জ্বীপ,মাঝখানে সে স্যান্ডউইচ হয়ে পড়েছে।
– সুদা*নির ফুঁয়ারা….

ইতালির সড়কে ইটালিয়ান গুন্ডাবাহিনী তার চট্টগ্রামের বিখ্যাত অশ্রাব্য শব্দের অর্থ অনুধাবন করতে পারলোনা।গতি বাড়িয়ে ফাঁদ এড়াতে চাইলো নিহাদ, তথাপি সম্ভব হলোনা।
তার দিকে তাক করা হয়েছে সবগুলো পি*স্ত*ল, উভয় পাশ থেকে।ঝাঁঝরা হয়ে যাবে সে সম্পুর্ণ।একটি ঢোক গিললো নিহাদ, ভয়ে নয়, ব্যর্থতার আশঙ্কায়।তবে কি সে আসমানের কথা রাখতে পারবেনা?ঠিক যে মুহূর্তে ট্রি*গার টানা হচ্ছিল ওই মুহূর্তেই যেন স্বয়ং দেবদূতের আগমন ঘটলো।

তীব্র গতিতে আধার কেটে বেরিয়ে এলো একটি বুগাটি, যেন বায়ু থেকে আবির্ভূত হয়েছে এই জগতে।ভয়ংকর দানবের ন্যায় অগ্রসর হলো, জ্বীপের পিছনে জোর ধাক্কায় ধাতব কর্কশ শব্দ তুললো চারপাশে।বাম পাশের জ্বীপটি ধাক্কার জোরে আছড়ে পড়লো সড়কের ধারে।নিহাদের বাইকের পাশে বনবন করে ঘুরে গেলো বুগাটি।ভেতরের মানুষটিকে এক মুহূর্তের জন্য নজরে পড়ল নিহাদের।না চাইতেও টলটল করে উঠলো তার দৃষ্টি।উভয় হাত স্টিয়ারিংয়ে চেপে বনবন করে ঘুরিয়ে চলেছে আসমান,দৃষ্টি উন্মত্ত, তীব্র বায়ুর ঝটকায় এলেমেলো উড়ে চলেছে সজ্জিত কেশগুচ্ছ।
এক সেকেন্ডের মাঝে দৃষ্টি বিনিময় হলো উভয়ের।মাথা হেলালো নিহাদ।এগিয়ে গেলো সামনে,পুনরায় বাক কেটে লাথি বসালো জ্বীপগাড়িতে।পাশের বুগাটির জানালা থেকে রিভ*লভার তাক করলো আসমান।এক হাতে স্টিয়ারিং এবং অপর হাতে অ*স্ত্র।

ঠাস ঠাস ঠাস!
মুহুর্মুহু বু*লে*ট ঠু*কে গে*লো জ্বীপের গুণ্ডাবাহিনীর শরীরে।সবার প্রথমে ধরাশায়ী হলো ড্রাইভার। একে একে বাকিরা।ততক্ষণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেই জ্বীপ ধাক্কা দিলো দ্বিতীয়টিকে।পুনরায় বি*স্ফো*রণে কম্পিত হলো রোমের বুক।

জ্বীপবাহিনী ধরাশায়ী। ল্যাম্বরগিনির দিকে দৃষ্টিপাত ঘটলো উভয় পিশাচের। তাকালো একে অপরের পানে।নিঃশব্দ আদেশ বিনিময়।পাশাপাশি এলো শিষ্য এবং গুরু। শিষ্যের বাইক এবং গুরুর বুগাটি উভয় ধাবিত হলো শত্রুপক্ষের বিনাশে। চেহারায় তাতে প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টি,তীব্র মনোযোগ এবং চরম ক্রোধ।

ডার্কসাইড পর্ব ২২ (২)

ল্যাম্বরগিনির পিছনের সিটে হাত পা আবদ্ধ অবস্থায় বসে কাচ ভেদ করে অসম্ভব দৃশ্যটির পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো চিত্রলেখার অব্যক্ত অনুভূতিতে পরিপূর্ণ নয়নজোড়া।সহস্র প্রচেষ্টার পরেও সে বুগাটির ড্রাইভিং সিটে থাকা শুভ্র অথচ অশুভ পুরুষটির উপর থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারলোনা।এগিয়ে আসছে সে, ভক্ষক হয়ে নাকি রক্ষক হয়ে?

ডার্কসাইড পর্ব ২৪