ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৮
সাবিলা সাবি
পেন্টহাউসের সেই অগ্নিকাণ্ডের পর ঠিক একটা দিন পার হয়ে গেছে। পুরো মেক্সিকো শহর এখন শান্ত, কিন্তু জাভিয়ানের ভেতরের পৃথিবীটা এক শ্মশানে পরিণত হয়েছে। পুলিশের খাতায় সে এখন এক মৃত লাশ। কিন্তু তার চেয়েও বড় মৃত্যু ঘটেছে তার ভেতরের সেই প্রেমিকের, যে তার জিন্নীয়াকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত। সে আজ এসেছে মেক্সিকোর সেই পরিত্যক্ত সান রাফায়েল ব্রিজে। এই ব্রিজটা শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, নিচে বয়ে চলেছে এক উত্তাল অন্ধকার নদী। যখনই জাভিয়ানের মন খারাপ হয়, সে এই ব্রিজে এসে একাকী সময় কাটায়। কিন্তু আজকের মন খারাপের গভীরতা অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে আলাদা। আজ তার জীবনের সবচেয়ে দামী জিনিসটা হারিয়ে গেছে। সে ভেবেছিল তান্বী আর ইভানকে সে নিজের হাতে শেষ করে দেবে, কিন্তু এখন তার নিজের বুকের ভেতরের কষ্টের ভার এতটাই ভারী হয়ে উঠেছে যে, সেই প্রতিশোধের আগুনও এক নিঃঝুম বিষণ্ণতায় রূপ নিয়েছে। এই বেঁচে থাকার তীব্র যন্ত্রণা সে আর সইতে পারছে না।
তার পাশে পড়ে আছে একটা জীর্ণ কাপড়ের ব্যাগ। এই এক দিনে সে মেক্সিকোর পুরনো আস্তানায় গিয়েছিল, যেখানে তার মৃত ভাই রাহিয়ানের এর শেষ স্মৃতিগুলো ধুলোবালি মেখে পড়ে ছিল। সেখান থেকেই সে খুঁজে বের করেছে রাহিয়ানের শেষ স্মৃতি—সেই পুরনো কাঠের ক্লাসিক্যাল গিটারটা। এই গিটারের প্রতিটি তারে মনে হলো রাহিয়ানের স্পর্শ আর জাভিয়ানের ফেলে আসা নিষ্পাপ শৈশবের গন্ধ লেগে আছে। জাভিয়ান ব্রিজের রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসল। এক হাতে গিটারের কর্ডগুলো চেপে ধরে সে তারের ওপর আঙুল বোলাতেই এক বুকফাটা করুণ সুর বাতাসের বুকে আর্তনাদ করে উঠল। ভাঙা গলায় সে গেয়ে উঠল তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের গান “এমন কেন খেলো আমায় নিয়ে? পেয়ে হারাবার ব্যথা যাও কেন দিয়ে? জীবন যেন খেলছে এক নিঠুর খেলা, ভালোবাসা যায় ঢেকে, অবহেলায় হায় কেন এভাবে কাঁদাও? যেন ভালোবাসা কোনো হাসি-খেলা পুরনো.. ভালো লাগেনা….” গানের শেষ সুরটা যখন নদীর উত্তাল হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, তখন জাভিয়ানের চোখে আর কোনো দ্বিধা অবশিষ্ট রইল না। তান্বীর সেই তাচ্ছিল্য ভরা মুখ আর ইভানের বিছানায় তার শুয়ে থাকার দৃশ্যটা আবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
যে জিন্নীয়া তার রিচ আর হ্যান্ডসাম রূপকে ভালোবেসেছিল, তার এই সর্বহারা রূপে তো তার কোনো স্থান নেই। এই মিথ্যে দুনিয়ায় জাভিয়ানের আর বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।জাভিয়ান গিটারটা আলতো করে ব্রিজের মেঝেতে নামিয়ে রাখল। তারপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ব্রিজের উঁচু লোহার রেলিংটার ওপর উঠল। নিচে অন্ধকার নদীটি তাকে ডাকছে, এক লাফে সব যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে সে যখনই নিজের শরীরটা শূন্যে ছেড়ে দিতে উদ্যত হলো ঠিক তখনই, এক অলৌকিক ক্ষিপ্রতায় পেছন থেকে একজোড়া শক্তিশালী হাত এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার কোমর। প্রচণ্ড শক্তিতে জাভিয়ানকে পেছনের দিকে টেনে হিঁচড়ে ব্রিজের শক্ত পিচের মেঝেতে আছড়ে ফেলল সেই মানুষটি। “উন্মাদ হয়ে গেছেন স্যার?!” এক পরিচিত, গম্ভীর কণ্ঠস্বর বাতাসের বুক চিরে গর্জে উঠল। আকস্মিক পতনে জাভিয়ান যখন ঝাপসা চোখে ওপরের দিকে তাকাল, তখন চাঁদের আলোয় তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অতি পরিচিত মুখ। সে আর কেউ নয়… স্বয়ং রায়হান! জাভিয়ানের শূন্য চোখে তখন এক অদ্ভুত বিস্ময়। মেঝের ওপর আছড়ে পড়ে জাভিয়ান কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল।
তার চোখ দিয়ে তখনো টলমল করছে এক ফোঁটা অশ্রু কিন্তু ঠোঁটের কোণে লেগে আছে তাচ্ছিল্যের হাসি। সে রায়হানের দিকে তাকিয়ে ভাঙা, তীব্র ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল “আবার? আবার কেন বাঁচালে আমাকে রায়হান? আবারো কি আমাকে সেই পুরোনো সান্ত্বনা দিবে? বলবে—’স্যার, জীবন এখনো শেষ হয়ে যায়নি, গড আপনার জন্য ভালো কিছু রেখেছে’? কিন্তু রায়হান, গড আমার জন্য কিছুই রাখেনি! শুধু শূন্যতা রেখেছে। আমার যা কিছু ছিল আমার ক্ষমতা, আমার ভাই, আমার অনাগত সন্তান, আর আমার সেই জিন্নীয়া… সব আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে! এই শূন্য বুকে আমি কার জন্য বাঁচব?”
রায়হান জাভিয়ানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তার চোখে তখন কোনো সান্ত্বনা নয়, বরং এক অদম্য জেদ। সে জাভিয়ানের কাঁধে শক্ত করে হাত রেখে অত্যন্ত গম্ভীর ও প্রত্যয়ী গলায় বলল—”জীবনের শেষ একটা লড়াই লড়ুন স্যার! আমি সব জানি। মেইলস্ট্রোমের ওই পেন্টহাউসে কী নাটক হয়েছে, তার সব খবর আমার কাছে আছে। শুধু একটা কথা বলব স্যার—নিজের ওপর একটু বিশ্বাস রাখুন।”
জাভিয়ান এক ঝটকায় রায়হানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখের সেই অশ্রু এক লহমায় উধাও হয়ে সেখানে আবার ডার্ক ওয়ার্ল্ডের ‘নাইট রেভেন’ এর পৈশাচিক হিংস্রতা ভর করল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—”তুমি আমাকে বাঁচিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল করলে রায়হান! এখন আমার হাতে দুটো মা/র্ডার হবে। ওই ইভান আর তান্বী দুজনকেই আমি নিজের হাতে টুকরো টুকরো করব!”
রায়হানও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের অন্ধকারের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। সে ফিসফিস করে বলল—”স্যার, আপনি আবেগে অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। আপনি এখন আইনের চোখে অফিশিয়ালি ‘মৃত’। এই মুহূর্তে যদি আপনি মেক্সিকোর রাস্তায় কোনো ভুল পদক্ষেপ নেন, তবে যেকোনো সেকেন্ডে পুলিশের নজরে পড়ে যেতে পারেন। আর হ্যাঁ, আমার সোর্স থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী—মেইলস্ট্রোম মেক্সিকোতে আর থাকছে না। সে মিস গজদন্তিনীকে নিয়ে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে চলে যেতে পারে। কারণ মেক্সিকোর এই ধ্বংসস্তূপের পর ওর জন্য বাংলাদেশই এখন সবচেয়ে নিরাপদ আস্তানা।” ‘বাংলাদেশ’ নামটা শোনামাত্রই জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার জিন্নীয়াকে নিয়ে ইভান বাংলাদেশে পালিয়ে যাবে? রায়হান জাভিয়ানের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তার কোটের ভেতর থেকে একটা ভুয়া পাসপোর্ট আর জরুরি কিছু নথিপত্র বের করে জাভিয়ানের দিকে এগিয়ে দিল। সে এক চিলতে কুটিল হেসে বলল—”আমি আগে থেকেই জানতাম আপনি দমে যাওয়ার পাত্র নন স্যার। তাই আপনার জন্য মেক্সিকোর একটা সিক্রেট রানওয়েতে একটা প্রাইভেট জেট একদম রেডি করে রেখেছি, সম্পূর্ণ গোপনে। আপনি আইনের চোখে মৃত হয়েই বাংলাদেশে ল্যান্ড করবেন। এবার আড়াল থেকে শিকার করার পালা আপনার!” জাভিয়ান পাসপোর্টের দিকে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো তখন এক নতুন প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে।
মেক্সিকোর সীমানা ছাড়িয়ে রায়হানের সেই গোপন প্রাইভেট জেটটি যখন আকাশে ডানা মেলল, তখন ঘড়ির কাঁটা আর আন্তর্জাতিক টাইম জোনের হিসাব ওলটপালট হতে শুরু করেছে। মেক্সিকো থেকে ঢাকার আকাশপথের দূরত্ব প্রায় সাড়ে তেরো হাজার কিলোমিটার। জাভিয়ানের এই স্পেশাল জেটটি মাঝপথে মাত্র একবার ফুয়েল নেওয়ার জন্য টেকনিক্যাল হল্ট করেছিল।সব মিলিয়ে মাত্র ১৮ ঘণ্টার এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর রুদ্ধশ্বাস জার্নি শেষে বিমানটি যখন ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করল, তখন বাংলাদেশের আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। মেক্সিকো ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তের কথা জাভিয়ানের মনে পড়ল। রানওয়েতে দাঁড়িয়ে রায়হান তার দিকে একটা কালো চামড়ার ওয়ালেট এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, “স্যার, এই ওয়ালেটে বেশ কিছু ক্যাশ ডলার আছে, আর সাথে দুটো ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড—যেগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া নামে রেজিস্ট্রি করা। বাংলাদেশে আপনার এগুলো প্রয়োজন হবে।” কিন্তু জাভিয়ান অত্যন্ত ঠান্ডা চোখে রায়হানের হাতের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়েছিল। সে ওয়ালেটটা না নিয়ে নিজের পকেটে হাত দিয়ে বলেছিল, “লাগবে না রায়হান।
আলতিপ্লানো থেকে পালানোর সময় আমি আমার ইমার্জেন্সি ক্রিপ্টো-ওয়ালেটের যে পাসকোড ডিয়েগোকে দিয়েছিলাম, তার ব্যাকআপ আরও কয়েকটা সিক্রেট অ্যাকাউন্টে আমার ছড়ানো আছে। তাছাড়া আমার পকেটে যে পরিমাণ ক্যাশ আর মেক্সিকান গোল্ড কয়েন আছে, তা দিয়ে বাংলাদেশে কিছুদিন রাজকীয়ভাবে খরচ চলে যাবে। নাইট রেভেন কখনো অন্যের দয়ায় নিজের যুদ্ধ লড়ে না।” রায়হান আর জোরাজুরি করেনি, সে শুধু জাভিয়ানের এই রাজকীয় অহংকার দেখে মনে মনে এক অদ্ভুত ভরসা পেয়েছিল। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ আর মেক্সিকান পুলিশের ফাইল অনুযায়ী জাভিয়ান এখন মৃত। তাই বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় যখন সে তার ভুয়া পাসপোর্টটি অফিসারের দিকে এগিয়ে দিল, তখন তার ভেতরে কোনো ভয় ছিল না। কাঁচের ওপাশে থাকা অফিসারটি একবার পাসপোর্টের ভুয়া নামের দিকে তাকাল, আর একবার জাভিয়ানের সানগ্লাস পরিহিত চোখের দিকে। কিন্তু জাভিয়ানের ভাবভঙ্গির সেই গভীর শীতলতা দেখে অফিসারটি আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেল না; পাসপোর্টে সিল পড়ে গেল। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে জাভিয়ান একটা সাধারণ কালো ট্যাক্সি ভাড়া করল। গাড়ির জানালা নামিয়ে দিতেই তার মুখে এসে লাগল ঢাকার চেনা ধুলো আর চেনা বাতাসের গন্ধ। সে ট্যাক্সির সিটে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বুজল। তার মগজে তখন কেবল একটা নামই ঘুরপাক খাচ্ছে—তান্বী! ইভান যদি তান্বীকে নিয়ে এই শহরেই এসে থাকে, তবে সে খুব বেশিদিন আড়ালে থাকতে পারবে না। জাভিয়ান তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট ব্ল্যাকবেরি ফোন বের করল—যা সম্পূর্ণ আনট্র্যাসেবল। সে ডার্ক ওয়েবের লোকাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রায়হানকে একটা মেসেজ ড্রপ করল।
বাংলাদেশে পা রাখার পর টানা দুটো দিন পার হয়ে গেছে। জাভিয়ান তার আন্ডারগ্রাউন্ডের সমস্ত সোর্স আর ডার্ক ওয়েবের লোকাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও ইভান বা তান্বীর কোনো হদিস পেল না। মেইলস্ট্রৌম যেন ঢাকার বুকে এসে মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে। এদিকে জাভিয়ানের অহংকার এবার তাকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাল। সে ভেবেছিল তার ক্রিপ্টো-ওয়ালেটের ব্যাকআপ দিয়ে সে ঢাকার ডার্ক মার্কেট থেকে টাকা তুলে নিতে পারবে, কিন্তু বাংলাদেশে সাইবার সিকিউরিটির কড়াকড়ি এবং ইন্টারন্যাশনাল সার্ভার ট্র্যাকিংয়ের ভয়ে সে নিজের মূল অ্যাকাউন্টগুলো লগ-ইন করতে পারছিল না। কারণ একবার আইপি অ্যাড্রেস লিক হলে ইন্টারপোল জেনে যাবে সে বেঁচে আছে। হিসাব কষে দেখা গেল, তার পকেটে থাকা ডলার আর ক্যাশ টাকা এই দুদিনে ঢাকার বুকে সোর্সদের পেছনে খরচ করতে করতে প্রায় শেষ। এখন তার কাছে যা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বড়জোড় কোনোমতে মেক্সিকোতে ব্যাক করার একটা ওয়ান-ওয়ে টিকিট কেনা যাবে, কিন্তু এই মুহূর্তে ঢাকায় টিকে থাকার মতো আর একটা টাকাও তার কাছে নেই। ক্ষিধের চেয়েও তার ভেতরের প্রতিশোধের আগুন তাকে বেশি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। হতাশা আর ক্লান্তিতে গাড়িতে বসে থেকে থেকে জাভিয়ান হঠাৎ খেয়াল করল, তার গাড়িটা এসে থেমেছে পুরান ঢাকার এক শান্ত সরু গলির এলাকার পরিচিত একটা বাড়ির সামনে। গেটের নেমপ্লেটে বড় বড় অক্ষরে লেখা—’রেহমান প্রিয়াঙ্গন’। এটা তান্বীদের বাড়ি।
বাড়ির দিকে তাকিয়ে জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার মনে হলো, যে মেয়েটি নিজের সুখ আর নিরাপত্তার জন্য তাকে মাঝরাস্তায় ফেলে ইভানের হাত ধরেছে, তার আসল রূপটা তার বাবা-মায়ের জানা দরকার। তারা জানুক তাদের আদরের মেয়ে কতটা স্বার্থপর আর ধূর্ত! জাভিয়ান গাড়ি থেকে নেমে ধীরপায়ে রেহমান প্রিয়াঙ্গনের ভেতরে প্রবেশ করল। তার পরনে একটা কালো হুডি, চোখের নিচে দুদিনের না ঘুমানোর কালচে দাগ। ড্রয়িংরুমের দরজাটা খোলাই ছিল। জাভিয়ান কোনো নক না করেই ভেতরে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে তখন নীরবতা। সোফায় বসে আছেন তান্বীর বাবা আর মা। দুজনেরই চোখ দুটো কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে ফুলে গেছে, ঘর জুড়ে শুধু বিষণ্ণতার ছায়া। হঠাৎ ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এক বিশাল অবয়বকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তান্বীর বাবা চমকে উঠে চশমাটা চোখের ওপর ঠিক করলেন। আর তান্বীর মা জাভিয়ানের মুখের দিকে তাকানো মাত্রই আতঙ্কে ও বিস্ময়ে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাদের দুজনের চোখ যেন কপাল ছুঁল। তারা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তান্বীর বাবা কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “জা-জাভিয়ান?! তুমি?! এটা কীভাবে সম্ভব?”
তারা দুজনেই স্তম্ভিত, কারণ গত দুদিন ধরে বাংলাদেশের প্রতিটা নিউজ চ্যানেল আর সোশ্যাল মিডিয়ায় মেক্সিকোর সেই পেন্টহাউসের অগ্নিকাণ্ডের খবর প্রচার হচ্ছে। আর সেই আন্তর্জাতিক নিউজে স্পষ্ট বলা হয়েছে—*আলতিপ্লানো কারাগার থেকে পালানো আন্তর্জাতিক আসামি জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী মেইলস্ট্রোমের বাড়িতে আগুনে পুড়ে মারা গেছে। যে ছেলেকে তারা গত দুদিন ধরে মৃত ভেবে ওপারে তাঁর আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করছিলেন, সেই মানুষটা আজ জীবন্ত রক্ত-মাংসে গড়া শরীর নিয়ে তাদের ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে! রেহমান প্রিয়াঙ্গনের বাতাসে তখন হাড়হিম করা স্তব্ধতা নেমে এল।
জাভিয়ানকে জীবন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তান্বীর মা আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো ছুটে এসে জাভিয়ানের হাত দুটো চেপে ধরলেন। তাঁর চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে জল পড়ছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন—”বাবা! তুমি বেঁচে আছো? আল্লাহ… আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না! তুমি এখানে কীভাবে এলে বাবা? আমার… আমার তান্বী কোথায়? আমার মেয়েটা কেমন আছে? ও কি ওই তোমাদের বাড়িতেই রয়ে গেছে? ও ভালো আছে তো বাবা?” মায়ের এই আকুলতা দেখে জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক বিষাক্ত, হিমশীতল হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত শক্ত গলায় নিজের হাতটা মায়ের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল—”আপনার মেয়ে যথেষ্ট ভালো আছে, মা। মেক্সিকোর ওই বিলাসবহুল পেন্টহাউস পুড়লেও আপনার মেয়ের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগেনি। সে এখন অনেক সুখে আছে। সে আমাকে অফিশিয়ালি ডিভোর্স দিয়ে আমারই আরেক ভাই—ইভানের সাথে চলে গেছে। কারণ ইভানের এখন সব আছে; টাকা, ক্ষমতা, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাম্রাজ্য—সব! একজন ফেরারি, ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিস্টের সাথে থাকার চেয়ে একজন ক্ষমতাধর মাফিয়া কিং এর ঘরে থাকাই তো বুদ্ধিমানের কাজ, তাই না? আমি এই ঢাকা শহরে ওকেই খুঁজতেই এসেছি।” জাভিয়ানের মুখে এই চরম নিষ্ঠুর কথাগুলো শুনে তান্বীর বাবা-মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তারা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে তাদের একমাত্র মেয়ে, যে জাভিয়ানের জন্য পাগল ছিল, সে এমন চরম স্বার্থপরের মতো কাজ করতে পারে! তান্বীর বাবা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “না জাভিয়ান, এটা হতে পারে না! তান্বী তোমাকে ভালোবাসত…”
“ভালোবাসত না, সে আমার ক্ষমতা আর রিচ স্ট্যাটাসকে ভালোবাসত!” জাভিয়ান গর্জে উঠল। এরপর সে টেবিলের ওপর ছুড়ে দিল সেই ডিভোর্স পেপারের কপি। এক পর্যায়ে জাভিয়ান যখন সব খুলে বলল, তখন কাগজের বুকে তান্বীর নিজের হাতের সই আর ‘এমিলিও চৌধুরী’ নামটা কেটে কুটি কুটি করার দাগ দেখে তাদের বিশ্বাসের শেষ দেয়ালটুকু ভেঙে গেল।তান্বীর বাবা-মার বুক চিরে এক তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভ বেরিয়ে এল। তান্বীর মা নিজের কপাল চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন—”ছিহ্ তান্বী! তুই আমাদের মাথা এভাবে হেঁট করে দিলি? নিজের স্বামীর এই বিপদের দিনে তুই টাকার লোভে অন্য পুরুষের হাত ধরলি? আমার সেই আদুরে ভালো মেয়ে এলিনা না মরে, সেদিন এই তান্বী কেন মরে গেল না? ও বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াও আমাদের জন্য অনেক ভালো ছিল!”
ড্রয়িংরুম জুড়ে তখন এক ভারী নীরবতা। জাভিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বিগত দুদিনের ক্লান্তি, না ঘুমানো এবং পকেটের শূন্যতা তাকে ভেতর থেকে শুষে নিয়েছে। তান্বীর মা চোখ মুছে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “বাবা, তুমি তো মনে হয় অনেক ক্লান্ত। তোমার চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে। বসো একটু, আমি তোমার জন্য শরবত নিয়ে আসছি।” জাভিয়ান সোফায় বসতে গিয়েও থামল। সে শূন্য চোখে শাশুড়ির দিকে তাকাল। যে ‘নাইট রেভেন’ মেক্সিকোর ডার্ক ওয়ার্ল্ড কাঁপাত, যার এক ইশারায় শত শত কোটি টাকা এদিকওদিক হতো, সে আজ অত্যন্ত অসহায়, অবোধ এক শিশুর মতো নিচু গলায় বলল—”মা… আমার খুব খিদে পেয়েছে। ঘরে কি একটু ভাত হবে?”
‘ভাত হবে?’ এই দুটো শব্দ রেহমান প্রিয়াঙ্গনের বাতাসে আছড়ে পড়ামাত্রই তান্বীর বাবা-মায়ের বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তাদের চোখ দিয়ে আবার নতুন করে কান্নার বন্যা বয়ে গেল। যে ছেলের অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে তারা খুব ভালো করে জানে, যে মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র কিংপিন, যার ডাইনিং টেবিলে দুনিয়ার সবচেয়ে দামী খাবার সাজানো থাকত—সে আজ ক্ষুধার জ্বালায় এক থালা ভাতের জন্য হন্যে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! তান্বীর এই নোংরা বিশ্বাসঘাতকতা তাদের জামাইকে আজ মেক্সিকোর রাজপ্রাসাদ থেকে ঢাকার এই সাধারণ ড্রয়িংরুমের মেঝেতে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তান্বীর মা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতেই রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলেন, “আসছি বাবা… আমি এক্ষুনি তোমার জন্য গরম ভাত বেড়ে আনছি!” জাভিয়ান ড্রয়িংরুমের জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের ঢাকার রোদটা বড্ড কড়া। পকেটে তার এক টাকাও নেই, কিন্তু এই এক থালা ভাতই হয়তো তাকে মেইলস্ট্রৌমের সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য নতুন করে শক্তি যোগাবে।
রেহমান প্রিয়াঙ্গনে জাভিয়ানের আরও একটা দিন কেটে গেল। তান্বীর বাবামা এই দুদিনে তাকে একপ্রকার নিজের আপন ছেলের মতোই আগলে রেখেছিলেন। কিন্তু মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের কালো ছায়া ঢাকার আকাশেও এসে পড়েছে। বিকেলের দিকে জাভিয়ানের সেই আনট্র্যাসেবল ফোনে রায়হানের একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজ এল। রায়হান জানিয়েছে—পুরান ঢাকার এক গোপন আস্তানায় ইন্টারপোলের বিশেষ কমান্ডোদের কিছু সন্দেহজনক নড়াচড়া দেখা গেছে। কমান্ডোরা কোনোভাবে জেনে গেছে যে নাইট রেভেন আসলে মরেনি, সে জীবিত এবং এই মুহূর্তে বাংলাদেশেই কোথাও আত্মগোপন করে আছে।
খবরটা পাওয়ামাত্রই জাভিয়ানের পাথুরে মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে তান্বীর বাবামাকে ডেকে সবটা খুলে বলল—আইনের হাত তার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, আজ রাতের মধ্যেই তাকে এই বাড়ি ছেড়ে, এই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবে। তান্বীর মা চোখ মুছে শক্ত গলায় বললেন, “পালাবে ঠিকই বাবা, কিন্তু খালি পেটে এই রাতে তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেব না। রাতে দুটো খেয়েদেয়ে তারপর যাবে। আমি তোমাকে পেছনের দরজা দিয়ে পার করে দেব। আমাদের চেনা এলাকার বিশ্বস্ত রহিমের ট্যাক্সি ডাকানো থাকবে, ওই তোমাকে নিরাপদ কোনো জায়গায় নামিয়ে দিয়ে আসবে।”
রাত তখন একটা। ড্রয়িংরুমের সব আলো নিভিয়ে জাভিয়ান ডাইনিং টেবিলে খেতে বসল। ঠিক তখনই তান্বীর মা ঘর থেকে একটা পুরনো কাঠের বাক্স এনে জাভিয়ানের সামনে রাখলেন। বাক্সটি খুলতেই দেখা গেল তার ভেতরে কিছু ভারী সোনার গয়না চকচক করছে। তিনি গয়নাগুলো জাভিয়ানের হাতকড়ার দাগ পরা শক্ত হাতটার ওপর তুলে দিয়ে অত্যন্ত আর্দ্র গলায় বললেন, “এগুলো রাখো বাবা। আমার শাশুড়ি আমাকে দিয়েছিলেন বিয়ের সময়। আমি জানি তোমাকে এখন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে। আর তোমার কাছে এখন একটা টাকাও নেই। এগুলো নাও, বিপদের সময় বিক্রি করে কাজে লাগাতে পারবে।”
জাভিয়ান একপলকে সেই সোনার গয়নাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মতো একজন অহংকারী সম্রাট, যে কোনোদিন কারো দান গ্রহণ করেনি, সে আস্তে করে গয়নাগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “আমি এগুলো নিতে পারব না, মা। এগুলো আপনার শাশুড়ির স্মৃতি, আপনার আমানত। আমি কোনোভাবেই এগুলো নিতে পারব না।”
তান্বীর মা জাভিয়ানের গালে হাত দিয়ে বললেন, “বাবা, আমি তো তোমার মায়ের মতোই। তোমার নিজের মা হলেও কি আজ এই বিপদে তোমাকে এগুলো দিত না?”
মা হলেও শব্দটা শুনে জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে শূন্য চোখে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “ভুল বললেন মা… আমার নিজের মা হলেও এই কাজটা কোনোদিন করত না। সে কোনোদিন আমাকে ভালোইবাসেনি।” একটুকরো দীর্ঘশ্বাসের মতো এই নির্মম সত্যটা শুনে তান্বীর মায়ের বুকটা যেন ফেটে গেল। মেক্সিকোর এই প্রতাপশালী সম্রাটের আড়ালে যে কতটা অবহেলিত আর একা একটা সন্তান লুকিয়ে আছে, তা ভেবে তাঁর চোখ আবার জলে ভরে উঠল। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে ভাতের প্লেটটা জাভিয়ানের দিকে এগিয়ে দিলেন।জাভিয়ান প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “আমি খাব না মা… আমার খিদে নেই। আমি এখন না গেলেও ভোরবেলা একবারে চলে যাব।”
“একদম চুপ!” তান্বীর মা এবার এক মায়ের অধিকারে তীব্র একটা ধমক দিয়ে উঠলেন, “খিদে নেই বললেই হলো? আমি খাইয়ে দিচ্ছি তোমাকে।” তিনি আর কোনো কথা না শুনে নিজের হাত দিয়ে এক লোকমা ভাত মেখে জোর করে জাভিয়ানের মুখে তুলে দিলেন। জাভিয়ান অবোধ বালকের মতো সেই ভাতের লোকমাটা মুখে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রান্নাঘর থেকে একটা শব্দ এল। চুলায় বসানো দুধ বলক এসে উছলে পড়ে যাচ্ছে। তান্বীর মা ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “তুমি খাও বাবা, আমি দুধের চুলাটা নিভিয়ে আসছি।” তিনি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই ডাইনিং রুমে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেল। বিগত প্রাপ্ত বয়স্ক জীবনে যে জাভিয়ান কোনোদিন চোখের জল ফেলেনি, রিমান্ডের থার্ড ডিগ্রি টর্চার তান্বীর ডিভোর্স দেয়ায় যার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি বের করতে পারেনি আর আজ তান্বীর মায়ের মেখে দেওয়া সেই ভাতের লোকমাটা থাকা অবস্থাতেই তার ভেতরের সবটুকু বাঁধ ভেঙে গেল। তার চোখ ভেঙে অবাধ্য অশ্রুর বন্যা নেমে এল। সে মুখ চেপে ধরে নিঃশব্দে, বুক কাঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। তার চোখের জল টপটপ করে পড়তে লাগল ভাতের প্লেটের ওপর। মায়ের হাতের সেই এক লোকমা ভাত যেন তার জীবনের সব একাকীত্ব, সব যন্ত্রণা আর তান্বীর দেওয়া সব আঘাতকে এক নিমেষে গলিয়ে দিল। ভাতের প্লেটে নিজের চোখের জল মিশিয়ে সে গোগ্রাসে গিলতে লাগল তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সেই খাবার।
রান্নাঘর থেকে তান্বীর মা ফিরে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে জাভিয়ান তার হুডির হাতা দিয়ে ঝটপট চোখ দুটো মুছে ফেলল। সে চায় না কেউ তার এই দুর্বলতা দেখুক। ঠিক তখনই তান্বীর বাবা ঘর থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন। জাভিয়ানের এই ছন্নছাড়া, বিপন্ন অবস্থার দিকে তাকিয়ে তিনি অত্যন্ত চিন্তিত গলায় বললেন, “বাবা… এই মাঝরাতে তুমি কোথায় যাবে? এই অবস্থায় কোথায় তুমি নিরাপদ থাকবে বলো তো? আমার বড্ড চিন্তা হচ্ছে।”
জাভিয়ান ততক্ষণে নিজের চোখের জল লুকিয়ে আবার সেই পাথুরে, আত্মবিশ্বাসী নাইট রেভেন এ রূপ নিয়েছে। সে হুডির ক্যাপটা মাথায় টেনে দিয়ে তান্বীর বাবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল—”চিন্তা করবেন না বাবা। যে মানুষ আইনের চোখে অলরেডি মৃত, তাকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কোনো কমান্ডোর নেই। আমি ঠিক নিজের রাস্তা খুঁজে নেব।”
রাতের শেষ প্রহরে, যখন পুরো ঢাকা শহর এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখন জাভিয়ান তার কালো হুডির ক্যাপটা মাথায় টেনে দিয়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। বিদায়ের কোনো আনুষ্ঠানিকতা সে রাখেনি, তান্বীর মায়ের বলে দেওয়া পেহনের সেই সরু কাঠের দরজাটি দিয়ে সে বাইরের অন্ধকার গলিতে বেরিয়ে গেল।
সকাল তখন সাড়ে সাতটা। রেহমান প্রিয়াঙ্গনের জানালার পর্দা গলে ভোরের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে ডাইনিং টেবিলের ওপর। তান্বীর মা ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে সোজা ডাইনিং রুমের দিকে ছুটে এলেন। তাঁর মনে এক অদ্ভুত আশঙ্কা—ছেলেটা ঠিকঠাক বের হতে পারল তো? কিন্তু ডাইনিং রুমে পা রাখতেই তাঁর পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরটা একদম শূন্য, নিথর। টেবিলের ওপর জাভিয়ানের রাতের খাবারের প্লেটটা পরম যত্নে ধুয়ে উল্টে রাখা। আর তার ঠিক পাশেই রাখা আছে সেই পুরনো কাঠের বাক্সটি, যা তিনি কাল রাতে জোর করে জাভিয়ানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।তান্বীর মা কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্সটি খুলে দেখলেন তার ভেতরের প্রতিটি সোনার গয়না ঠিক আগের মতোই চকচক করছে।
জাভিয়ান সেখান থেকে এক রতি সোনাও ছোঁয়েনি, একটা গয়নাও নিজের সাথে নেয়নি। নিজের চরমতম সংকটে, পকেটে একটা টাকা না থাকা অবস্থাতেও সে মায়ের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেয়নি। সে কেবল সাথে নিয়ে গেছে কাল রাতের সেই এক লোকমা ভাতের ঋণ। গয়নাগুলো অক্ষত দেখে তান্বীর মায়ের চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠল। ঠিক তখনই তান্বীর বাবাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে টেবিলের শূন্য বাক্সটার দিকে তাকালেন। তান্বীর মা বাক্সটি বুকে জড়িয়ে ধরে ডাইনিং রুমের মেঝেতে বসে পড়লেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন—”ও চলে গেছে… আমাদের না বলেই ছেলেটা ভোর হওয়ার আগে চলে গেছে। আর দেখো, একটা গয়নাও ও হাত দেয়নি। ও তো মেক্সিকোর রাজা ছিল, অথচ আজ এই ঢাকা শহরের রাস্তায় ও একবারে খালি পকেটে ঘুরে বেড়াবে! ও কীভাবে বাঁচবে, কোথায় থাকবে… আল্লাহ তুমি ওকে রক্ষা করো!”
তান্বীর বাবাও শূন্য চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
ঢাকার ধুলোবালি আর শূন্য পকেটের সেই অগ্নিপরীক্ষা পার হয়ে, নিজের কাছে থাকা শেষ সম্বলটুকু দিয়ে জাভিয়ান আবার ফিরে এসেছে মেক্সিকোর মাটিতে। যে ‘ভিলা এস্পেরেন্জায়’ একসময় তার সাম্রাজ্যের প্রতীক ছিল, আজ আইনের চোখে মৃত জাভিয়ান সেখানে প্রবেশ করল এক অদৃশ্য ভূতের মতো। জাভিয়ান যখন ভিলার সদর দরজা ঠেলে লিভিং রুমে এসে দাঁড়াল, তখন ঘরের ভেতরের বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল। সোফায় বসে থাকা তার মা জাভিয়ানকে দেখা মাত্রই চিৎকার করে উঠলেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে তিনি দৌড়ে এসে জাভিয়ানকে শক্ত করে বুকে জাপটে ধরলেন। তাঁর শরীর তখন কাঁপছে, চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। “জাভি! তুই বেঁচে আছিস বাবা?! গড… তুই বেঁচে আছিস! মেক্সিকোর সেই পেন্টহাউসের নিউজ দেখার পর থেকে আমি আর তোর বাবার যে কী অবস্থা হয়েছিল তুই তা কল্পনাও করতে পারবি না! আমরা ভেবেছিলাম তুই আর আমাদের মাঝে নেই। তুই কোথা থেকে এলি বাবা? এতগুলো দিন কোথায় ছিলি তুই?”
মায়ের এই বুকফাটা কান্না আর বুকের উষ্ণতাও আজ জাভিয়ানের পাথুরে হৃদয়কে গলাতে পারল না। তান্বীর মায়ের সেই এক লোকমা ভাতের মায়া যার চোখ দিয়ে জল বের করেছিল, আজ নিজের মায়ের জড়িয়ে ধরাতেও সে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ, শীতল। সে আলতো করে মাকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে বরফশীতল গলায় বলল—”মম, আমার হাতে বেশি সময় নেই। আমি এখানে কোনো আড্ডা দিতে আসিনি। নিজের জরুরি কিছু জামাকাপড় আর জিনিসপত্র নিতে এসেছিলাম, এগুলো নিয়েই আমি এক্ষুনি বেরিয়ে যাব।”
মায়ের চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল, “বেরিয়ে যাবি মানে? কোথায় যাবি তুই এই অবস্থায়?”
জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে উঠে গেল। নিজের ঘরের দরজাটা খুলতেই জাভিয়ানের বুকের ভেতরটা এক তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। ঘরের প্রতিটি কোণায়, বিছানার চাদরে, ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় যেন তার জিন্নীয়ার, তার তান্বীর শরীরের সুবাস আর স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে। এই সেই ঘর, যেখানে তান্বী তার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত। ঘরের এই বাতাস জাভিয়ানকে এক সেকেন্ডে শ্বাসরুদ্ধ করে দিল। সে বেশিক্ষণ থাকতে পারল না। আলমারি খুলে কোনোমতে কয়েকটা শার্ট আর প্যান্ট টেনে একটা ব্যাগে ভরেই সে ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নিচে নামতেই জাভিয়ান দেখল লিভিং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা, সায়েম চৌধুরী। যিনি মেক্সিকোর এই সংকটের শুরুতে জাভিয়ানকে একপ্রকার ত্যাজ্য করেছিলেন। জাভিয়ানকে দেখে তাঁর চোখে স্বস্তি ফুটলেও গলার স্বর ছিল আগের মতোই কঠোর আর বাস্তববাদী।
সায়েম চৌধুরী জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি বেঁচে আছো জেনে ভালো লাগল। তবে এভাবে দিনের আলোয় ভিলা এস্পেরেন্জায় ঢুকে তুমি চরম বোকামি করেছ। পুলিশ বা ইন্টারপোল যদি কোনোভাবে টের পায় যে নাইট রেভেন মরেনি, তবে পুরো মেক্সিকান ফোর্স এই বাড়ি ঘিরে ফেলবে।” জাভিয়ান ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে তার বাবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে অত্যন্ত তীব্র ও অহংকারী গলায় বলল—”চিন্তা করবেন না, মিস্টার চৌধুরী! আমার মতো একজন ‘মৃত’ মানুষের জন্য আপনারা কোনো আইনি বিপদে পড়বেন না। এই বাড়ি থেকে আমি আমার অস্তিত্ব চিরতরে মুছে নিয়ে যাচ্ছি।” কথাটা বলেই জাভিয়ান যখন দরজার দিকে পা বাড়াল, তখন সায়েম চৌধুরী পিছন থেকে গম্ভীর গলায় ডাকলেন, “দাঁড়াও জাভি!” জাভিয়ান থামল, কিন্তু পিছন ফিরে তাকাল না। সায়েম চৌধুরী তাঁর পকেট থেকে মোটা একটা ক্যাশ ডলারের বান্ডিল বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। তিনি বললেন “তুমি এখন ফেরার। এই অবস্থায় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে আইপি ট্র্যাকিংয়ে ধরা খেয়ে যাওয়ার ১০০% সম্ভাবনা আছে। তাই এই ক্যাশ টাকাগুলো সাথে রাখো। বাইরে সারভাইভ করতে তোমার এগুলো কাজে লাগবে।”
জাভিয়ান এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তার বাবার দিকে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো তখন অহংকারে চকচক করছে। সে টাকাগুলোর দিকে একপলক তাকিয়ে অত্যন্ত অবহেলার সুরে বলল “আপনার দয়ার কোনো জিনিসের প্রয়োজন আমার নেই, মিস্টার চৌধুরী। নাইট রেভেন নিজের যুদ্ধ নিজের জোরেই লড়তে পারে।”
জাভিয়ান ভিলার শেষ সীমানা পার হতে যাবে, তখন তার মা কিচেন থেকে হন্তদন্ত হয়ে একটা পাত্র হাতে ছুটে এলেন। জাভিয়ানের প্রিয় ভুট্টা পুড়িয়ে বা শুকিয়ে তিনি কিছু একটা তৈরি করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত আকুল হয়ে বললেন—”বাবা, একটু দাঁড়িয়ে যা! তোর প্রিয় ভুট্টা শুকানোটা একদম রেডি হয়ে গেছে। তুই তো এটা খেতে বড্ড ভালোবাসতিস বাবা, অন্তত কিছুটা মুখে দিয়ে যা!” জাভিয়ান দরজার হ্যান্ডেলে হাত রেখে একবার মায়ের দিকে তাকাল। রেহেমান প্রিয়াঙ্গনের সেই রাতে তান্বীর মা যখন তাকে ধমক দিয়ে খাইয়ে দিচ্ছিল, তখন সে কেঁদেছিল। আর আজ নিজের মায়ের এই অনুরোধের জবাবে তার মুখে কোনো আবেগ ফুটল না। সে কেবল তার সেই চিরপরিচিত গম্ভীর, অহংকারী টোনে দুটি শব্দ উচ্চারণ করল—”নো নিড ”
কথাটি বলেই সে ভিলা এস্পেরেন্জার দরজাটা দড়াম করে টেনে দিয়ে মেক্সিকোর তপ্ত রোদের মাঝে মিলিয়ে গেল। নিজের ঘর, নিজের বাবা-মা আর অতীতের সব মায়া পেছনে ফেলে সে এবার তৈরি হলো এক নতুন যুদ্ধের জন্য।
বাংলাদেশ থেকে মেক্সিকোতে ফিরে আসার পথটা জাভিয়ানের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। অহংকারের বশে রায়হানের দেওয়া ক্রেডিট কার্ড আর ক্যাশ টাকা সে ফিরিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মেক্সিকোর ওয়ান-ওয়ে টিকিট কাটার মতো টাকাও তার পকেটে ছিল না। ঢাকার এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে সে তার হাতের শেষ দামী জিনিস—সেই রাজকীয় ডায়মন্ডের ব্রেসলেটটা পানির দামে ব্ল্যাকে সেল করে দিয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে টিকিট কেটে, মেক্সিকোর মাটিতে পা রাখা পর্যন্তই যা হওয়ার হয়েছিল। এখন সে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, পুরো নিঃস্ব! ভিলা এস্পেরেন্জা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রায়হানের গোপনে ব্যবস্থা করে দেওয়া একটা মাঝারি মানের আন্ডারগ্রাউন্ড হোটেলে গিয়ে উঠেছিল জাভিয়ান। কিন্তু ভাগ্য তার সাথে আরও এক নিঠুর খেলায় মেতে উঠল। ভিলা এস্পেরেন্জায় তার আকস্মিক অনুপ্রবেশের খবর কোনোভাবে লিক হয়ে যায়। মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশ আর ইন্টারপোল নিশ্চিত হয়ে যায় যে—নাইট রেভেন মরেনি, সে জীবিত! হোটেলের রুমে বসে জাভিয়ান যখন টিভির রিমোটটা চাপল, তখনই স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ ফ্ল্যাশ হলো—
“মেগা অ্যালার্ট: আলতিপ্লানোর পলাতক কয়েদি জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী জীবিত! মেক্সিকো সিটিতেই লুকিয়ে আছে নাইট রেভেন। ইন্টারপোলের হাই-অ্যালার্ট জারি।”
নিউজটা দেখামাত্রই জাভিয়ান আর এক সেকেন্ডও সেখানে বসল না। হোটেলের পেছনের ফায়ার এক্সিট দিয়ে সে সোজা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। মাথার ওপর কালো হুডিটা টেনে দিয়ে, চোখে একটা সানগ্লাস পরে সে মেক্সিকোর ব্যস্ত, ধূসর রাজপথের ভিড়ে নিজের বিশাল অবয়বটা লুকিয়ে চোরের মতো ঘুরতে লাগল। আইনের চোখে মৃত মানুষটি আজ আবার এক ফেরারি আসামি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, বিকেলের আলো নিভে মেক্সিকোর বুকে রাত নেমে এল। টানা কয়েক ঘণ্টার এই অবিরাম পথচলা আর মানসিক যুদ্ধ জাভিয়ানের শরীরকে ভেতর থেকে ভেঙে দিল। তার পেটের ভেতর তখন তীব্র খিদের আগুন জ্বলছে। মেক্সিকোর কনকনে ঠান্ডা বাতাসে তার পুরো শরীর কাঁপছে, অথচ পকেটে হাত দিয়ে সে দেখল একটা সস্তা মেক্সিকান কয়েনও সেখানে অবশিষ্ট নেই।
খিদের তীব্রতা যখন সহ্যসীমার বাইরে চলে গেল, তখন সে রাস্তার মোড়ের একটা অত্যন্ত সাধারণ, সস্তা লোকাল রেস্তোরাঁয় গিয়ে ঢুকল। চারপাশের নোংরা পরিবেশ, কর্কশ মেক্সিকান মিউজিক—কোনো কিছুর দিকে তাকানোর মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না। সে শুধু একটা টেবিলে বসে ইশারায় কিছু সাধারণ খাবার আর রুটি অর্ডার করল। খাবারের শেষ লোকমাটা মুখে তোলার সময় জাভিয়ানের আবার মনে পড়ল পুরান ঢাকার সেই রাতের কথা। তান্বীর মা তাকে ভালোবেসে ধমক দিয়ে খাইয়ে দিয়েছিল, আর আজ সে মেক্সিকোর এক সস্তা হোটেলে বসে খিদের জ্বালায় একাকী লড়াই করছে। খাওয়া শেষ হতেই টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল নোংরা অ্যাপ্রন পরা ওয়েটার, হাতে বিলের কাগজ। জাভিয়ান নিজের শূন্য পকেটে আর হাত বাড়াল না। সে অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু এক অদ্ভুত আভিজাত্যের সাথে তার বাঁ হাতের কব্জি থেকে খুলে ফেলল কোটি টাকা মূল্যের সেই লিমিটেড এডিশন ‘রোলেক্স’ ঘড়িটা’। সে ঘড়িটা ওয়েটারের দিকে এগিয়ে দিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “বিলের বদলে এটা রাখো। বাকি চেঞ্জটুকু টিপস হিসেবে রেখে দিও।” ওয়েটারটি ঘড়ির নিখুঁত কারুকাজ দেখে চোখ বড় বড় করে হা হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারল না, এক প্লেট সাধারণ খাবারের বিল দিতে কেউ মেক্সিকোর একটা রাজকীয় সম্পত্তি এভাবে ফেলে যেতে পারে! রেস্তোরাঁ থেকে যখন জাভিয়ান আবার মেক্সিকোর অন্ধকার গলিতে পা বাড়াল, তখন তার দুই হাত সম্পূর্ণ খালি। হাতে কোনো ব্রেসলেট নেই, কব্জিতে কোনো ঘড়ি নেই, পকেটে কোনো টাকা নেই। মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের যে সম্রাট একসময় কোটি কোটি টাকার ডিল এক তুড়িতে ওড়াতো, সে আজ এই রাতের অন্ধকারে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে ফুটপাতে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তার চোখের সেই ‘নাইট রেভেন’ এর হিংস্র আলোটা এখনো নেভেনি।
সবাই যখন ভাবছিল মেইলস্ট্রোম ওরফে ইভান তান্বীকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে, তখন আসলে তারা মেক্সিকো সিটির সীমানা ছাড়িয়ে ‘সিয়েরা মাদ্রে’ পাহাড়ের কোলে এক প্রত্যন্ত ও সুরক্ষিত ফার্মহাউসে আশ্রয় নিয়েছিল। এই গোপন ফার্মহাউসের হদিস ইভান ছাড়া পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের আর কোনো জীবন্ত মানুষ জানত না। আর আইনের চোখ ফাঁকি দিতে এটাই ছিল ইভানের সবচেয়ে বড় এবং নিরাপদ বাঙ্কার।
কিন্তু আজ সেই নিস্তব্ধ ফার্মহাউসের সামনে এসে থামল একটা কালো রঙের বুলেটপ্রুফ এসইউভি। গাড়ি থেকে নেমে ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল ইভানের ভাই মার্কো।
লিভিং রুমের কাঁচের দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে ইভান আর মার্কো যখন হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল, তখন দোতলার সিঁড়ির আড়ালে অন্ধকারের মাঝে এক অদৃশ্য ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল তান্বী। নিচতলা থেকে তাদের ফিসফিসানি কথাগুলো ভেন্টিলেশন ডাক্ট দিয়ে সোজা তান্বীর কানে এসে পৌঁছাচ্ছিল। মার্কো গ্লাসে একটা বড় চুমুক দিয়ে কুটিল হেসে বলল, “অভিনন্দন ইভান ব্রো! তোমার চালটা সত্যিই নিখুঁত ছিল।” ইভান এক পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি হাসল, “অবশ্যই মার্কো। জাভিয়ানকে মানসিকভাব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য ওই দৃশ্যটার খুব প্রয়োজন ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের ডিল তো এটাই ছিল! তুই আমাকে জাভিয়ানের সবচেয়ে বড় সম্পদ এনে দিয়েছিস, আর তার বিনিময়ে মেক্সিকোর এই বিশাল আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরবর্তী একমাত্র সম্রাট বা কিংপিন আমি তোকে বানিয়ে দিচ্ছি। আর আমার পাওনা? আমার পাওনা ছিল তান্বী! যাকে আমি নিজের করে পেয়ে গেছি।”
সিঁড়ির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তান্বীর সারা শরীর তখন কাঁপছিল। ঘৃণায় তার ভেতরের আত্মাটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, জাভিয়ানকে বাঁচানোর জন্য সে যে বিছানায় শোনার অভিনয়টুকু করেছিল—তা আসলে ইভানের আগে থেকেই সাজানো একটা কুৎসিত ব্লুপ্রিন্ট ছিল! কিন্তু নাটকের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি ছিল। মার্কো আবার জিজ্ঞেস করল, “সবই তো বুঝলাম ব্রো। কিন্তু তান্বী তো এখনো ভাবছে তুমি আইনি পথে জাভিয়ানকে এই ইন্টারন্যাশনাল কেস থেকে পুরোপুরি খালাস করে দেবে? ও যদি সত্যিটা জেনে যায়?”
ইভান এক বিকট শব্দে হেসে উঠল। তার সেই শান্ত দেবদূতের মুখোশটা ছিঁড়ে গিয়ে বেরিয়ে এল এক হিংস্র মাফিয়ার রূপ। সে বলল—”খালাস করে দেব? আর ইউ ক্রেজি মার্কো?! জাভিয়ান চৌধুরীকে এই ইন্টারন্যাশনাল কেস থেকে ছাড়ানোর ক্ষমতা স্বয়ং মেক্সিকান প্রেসিডেন্টের গুদামেও নেই। আর আমি কেন ওকে ছাড়াব? ও জেলের ভাত খাক, আর না হয় রাস্তায় কুকুরের মতো ঘুরুক—তাতে আমার কী? আমি তান্বীকে পাওয়ার জন্য ওকে মিথ্যে কথা দিয়েছিলাম। আমি কখনোই জাভিয়ানকে এই কেস থেকে ছাড়াতে পারব না, আর কোনোদিন ছাড়াবও না! ও চিরকাল আইনের চোখে একজন দাগী আসামি হয়েই শেষ হয়ে যাবে।” আড়াল থেকে কথাগুলো শোনা মাত্রই তান্বীর পায়ের তলার মাটি যেন এক নিমেষে সরে গেল। তার চোখের সামনে এতক্ষণ যে ইভানকে সে জাভিয়ানের উদ্ধারকর্তা ভাবছিল, সে আসলে এক বিষাক্ত সাপ! যে জাভিয়ানকে রক্ষা করার জন্য সে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিল, নিজের ভালোবাসার মানুষের চোখে অপরাধী হলো—আজ সে জানল, ইভান তাকে কোনোদিনও মুক্তি দেবে না। তান্বী নিজের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরল যেন তার বুকফাটা চিৎকার বাইরে বেরিয়ে না আসে। তার চোখের সেই কৃত্রিম পাথুরে চাতুর্য গলে গিয়ে সেখানে এবার জমা হলো এক লেলিহান প্রতিশোধের আগুন। সে মনে মনে বলল, “জাভিয়ান…তুমি যেখানেই থাকো না কেনো তোমার জিন্নীয়া আবার ফিরে আসবে তোমার কাছে!”
নিচতলায় যখন ইভান আর মার্কো নিজেদের জয় উদযাপনে মগ্ন, ঠিক তখনই দোতলার অন্ধকারে তান্বী তার জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটি খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার চোখের সব অশ্রু শুকিয়ে আজ সেখানে হিংস্রতা ভর করেছে। জাভিয়ানকে তারা তিলে তিলে শেষ করেছে, আর তার জন্য দায়ী সে নিজে! না, এই অন্যায়ের প্রতিশোধ তাকে নিতেই হবে। জাভিয়ানের কাছে তাকে পৌঁছাতেই হবে—তাতে যদি মেক্সিকোর এই পুরো মাফিয়া সাম্রাজ্যের রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে হয়, তান্বী আজ তা-ই করবে। তান্বী আলমারি থেকে একটা কুচকুচে কালো রঙের হুডি টেনে নিয়ে নিজের শরীরের ওপর জড়িয়ে নিল। মাথায় হুডির ক্যাপটা এমনভাবে টেনে দিল যাতে তার মুখের অবয়ব সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যায়। ঠিক তখনই তার মনে পড়ে গেল অতীতের এক জ্বলন্ত অধ্যায়ের কথা—ভ্যালেরিয়া! সেই দুর্ধর্ষ মেয়েটি কীভাবে এক লহমায় মেইলস্ট্রোমের কড়া পাহারা ভেদ করে তাকে নরক থেকে বের করে এনেছিল। ভ্যালেরিয়ার সেই ক্ষিপ্রতা আজ তান্বীর ধমনীতে ভর করল।
সে ড্রয়ার থেকে একটা ধারালো, চকচকে কিচেন নাইফ (ছুরি) হাতে তুলে নিল। ছুরির স্টিলের ফলায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তান্বী দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “জাভিয়ান… তোমার কাছে যাওয়ার পথে আজ যদি আমাকে খুনীও হতে হয়, আমি হবো। কিন্তু আমি আসছি।”*
ফার্মহাউসের চারপাশ তখন এলিট গার্ডদের কড়া নজরদারিতে অবরুদ্ধ। প্রধান দরজা দিয়ে বের হওয়া মানেই নিশ্চিত ধরা পড়া। তান্বী তাই ভেন্টিলেশন ডাক্টের পেছনের এক সরু প্যাসেজ আর ফায়ার এক্সিট ব্যবহার করে অত্যন্ত সাবধানে, বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে নিচতলার পেছনের দিকে নেমে এল। পেছনের সীমানার ঠিক অন্ধকার কোণটায় একটা জিপ গাড়ির পাশে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল ইভানের এক বডিগার্ড। তান্বীর পুরো শরীর তখন ভয়ে আর উত্তেজনায় কাঁপছিল, কিন্তু তার অবদমিত ক্রোধ সেই ভয়কে ছাপিয়ে গেল। সে হুডির আড়াল থেকে বের হয়ে বিড়ালের মতো ক্ষিপ্রতায় গার্ডটার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
গার্ডটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তান্বী তার পুরো শক্তি দিয়ে হাতের ধারালো ছুরিটা বসিয়ে দিল গার্ডের ঘাড়ে! এক চাপা আর্তনাদ করে গার্ডটি মাটিতে লুটিয়ে পড়তে চাইল, কিন্তু তান্বী তার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরে তাকে গাড়ির আড়ালে ফেলে দিল। গার্ডের ছটফট করতে থাকা শরীর আর ঘাড় থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া গরম রক্ত তান্বীর হাতে, মুখে এসে লাগল। জীবনের প্রথম করা এই খু/নের নৃশংস/তা তার শরীরকে এক মুহূর্তের জন্য কাঁপিয়ে দিল, কিন্তু জাভিয়ানের রক্তাক্ত মুখটা মনে পড়তেই তার হাত আর কাঁপল না।
ফার্মহাউসের পেছনের সীমানার কাঁটাতার গলিয়ে তান্বী এক ঝটকায় বাইরে বেরিয়ে এল। সামনেই ধূসর, আদিম জঙ্গল আর খাড়া পাহাড়ের চড়াই-উতরাই। কোনো রাস্তা নেই, কেবল বুনো লতাপাতা আর পাথুরে অন্ধকার। পেছন থেকে হঠাৎ অ্যালার্ম বাজার তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এল—ফার্মহাউসের গার্ডরা ততক্ষণে টের পেয়ে গেছে যে খাঁচার পাখি পালিয়ে গেছে! দূর থেকে সার্চলাইটের তীব্র আলো আর ইভানের ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বরের চিৎকার বনের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
তান্বী আর পিছন ফিরে তাকাল না। পায়ের জুতো ছিঁড়ে পাথর লেগে রক্ত বের হতে লাগল, বুনো কাঁটায় ছিঁড়ে গেল হুডির কিছু অংশ, কিন্তু সব চড়াই-উতরাই পার করে সে অন্ধের মতো সোজা জঙ্গলের গভীরে দৌড়াতে লাগল। মেক্সিকোর এই কুয়াশাচ্ছন্ন বুনো অন্ধকার আজ তাকে গ্রাস করে নিল। সে জানে না জাভিয়ান মেক্সিকোর কোন কোণায় লুকিয়ে আছে, কিন্তু সে এও জানে—এই জঙ্গল পার হতে পারলেই সে তার জাভিয়ানকে খুঁজে বের করার শেষ লড়াইটা শুরু করতে পারবে।
ফার্মহাউসে সাইরেন বাজার সাথে সাথেই ইভান আর মার্কোর পুরো বাহিনী অ্যাকশনে নেমে পড়ে। ইভান তার স্বভাবসুলভ অহংকার দিয়ে ধরে নেয়—তান্বী ভিতু মেয়ে, সে কখনোই এই বিপজ্জনক পাহাড়ি জঙ্গলে ঢুকবে না, সে নিশ্চয়ই মেইন রোড বা হাইওয়ের পথ ধরেই পালিয়েছে। ইভান তার সমস্ত ফোর্স নিয়ে হাইওয়ের দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দেয়। কিন্তু চতুর ও ধূর্ত মার্কো জানত, তান্বী জাভিয়ানের জন্য সব করতে পারে। সে এত সহজে সোজা পথে ধরা দেবে না। তাই মার্কো তার কাউকেই না জানিয়ে, সম্পূর্ণ একাকী হন্যে হয়ে ছুটতে শুরু করে সেই নিকষ কালো জঙ্গলের দিকে। এদিকে জঙ্গলের চড়াই-উতরাই আর বুনো লতাপাতার সাথে লড়াই করতে করতে তান্বী এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। চারদিকে শুধু বড় বড় পাইন গাছ আর অন্ধকার পাহাড়। কোন দিকে গেলে রাস্তা আর কোন দিকে বিপদ—কিচ্ছু বুঝতে না পেরে সে হাঁপাতে হাঁপাতে একটা পাথরের আড়ালে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ায়। এই অবিরাম দৌড় আর উত্তেজনায় তার পরনের ভারী হুডিটার ভেতরে শরীর গরমে সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। দম বন্ধ করা সেই অস্বস্তি সইতে না পেরে তান্বী এক ঝটকায় হুডিটা খুলে মাটিতে ফেলে দেয়। তার গায়ে তখন রয়ে যায় কেবল একটি সাধারণ, পাতলা টপস। কিন্তু তার সেই স্বস্তির মুহূর্তটুকু দীর্ঘস্থায়ী হলো না। শুকনো পাতার মচমচ শব্দ হতেই তান্বী চমকে তাকিয়ে দেখল—অন্ধকারের বুক চিরে এক জ্যান্ত পিশাচের মতো তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মার্কো! তার ঠোঁটে পৈশাচিক, বিজয়ী হাসি।
তান্বী ভয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল। তার হাতপা কাঁপতে শুরু করল। সে আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষবারের মতো কাকুতি-মিনতি করে বলল “মার্কো ভাইয়া! প্লিজ আমাকে যেতে দিন, আমি হাত জোড় করছি আপনার কাছে। আপনি ইভানের সাথে হাত মিলিয়ে নিজের ভাইয়ের সাথে এমন কেন করছেন? জাভিয়ানও তো আপনার ভাই, আপনার নিজের রক্তের…”
“চুপ কর তান্বী!” মার্কো এক চিলতে কুটিল হেসে তার হাতের রিভলভারটা পকেটে পুরে বলল, “ব্রাদারহুড? রক্তের টান? ওসব সস্তা সিনেমার ডায়ালগ আমার সামনে দেবে না। ইভান আমার আপন ভাই, আর জাভিয়ান আমার চাচাতো ভাই। সো, ইক্যুয়েশনটা খুবই সিম্পল। আমার কার পক্ষে যাওয়া উচিত, সেটা কি আর বুঝিয়ে বলতে হবে?”
তান্বী এবার তার ভেতরের সমস্ত ভয় ঝেড়ে ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন আগুন। সে চেঁচিয়ে বলল—”মুখোশটা খসিয়ে দিন মার্কো ভাইয়া! আমি সিঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে আপনাদের সব কথা নিজের কানে শুনেছি। আপনার কাছে আপন ভাই বা রক্তের টান কিচ্ছু ম্যাটার করে না। আপনি শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে, মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাট হওয়ার লোভে ইভানের পা চাটছেন!”
নিজের কুৎসিত সত্যটা তান্বীর মুখে শুনেও মার্কো বিন্দুমাত্র লজ্জিত হলো না, বরং তার চোখ দুটো আরও সরু হয়ে গেল। সে এক কদম এগিয়ে এসে বলল, “বাহ্! জেনেই যখন গিয়েছো তাহলে তো আর কোনো লুকুছুরি নেই। তুমি এখন পালাতে গেলে আমার পুরো ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে তান্বী। আমার হাতে এখনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতা আসেনি। তুমি যদি আজ ইভানের খাঁচা থেকে পালিয়ে যাও তবে ওই খ্যাপা শেয়াল ইভান জীবনেও আমাকে একটা সুঁই পরিমাণ কিছু দেবে না। তোমাকে ইভানের হাতে তুলে দেওয়াই আমার রাজসিংহাসনের একমাত্র টিকিট।”
তান্বী এবার আর কোনো উপায় না পেয়ে মার্কোর সামনে প্রায় হাঁটু গেড়ে বসার মতো ভঙ্গি করল, “মার্কো ভাইয়া, আমি আপনার পায়ে পড়ছি… প্লিজ আমাকে একটু সাহায্য করুন। আমাকে জাভিয়ানের কাছে নিয়ে চলুন। জাভিয়ান আপনাকে এর চেয়েও বড় রাজত্ব দেবে, আমি কথা দিচ্ছি…” কিন্তু মার্কোর পাথুরে মন এক চুলও গলল না। সে তান্বীকে ধরার জন্য হাত বাড়াতেই তান্বী নিজের শেষ শক্তি দিয়ে এক ঝটকায় ঘুরে জঙ্গলের ওপাশে থাকা হাইওয়ের ঢালু রাস্তার দিকে অন্ধের মতো দৌড় দিল। কিন্তু এক চিলতে পিচঢালা রাস্তার আলো চোখে পড়ার আগেই, পেছন থেকে মার্কো এক জংলি বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তান্বীর ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। “ছাড়ুন আমাকে!
জাভিয়ান…” তান্বী পাগলের মতো হাত-পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। মাঝরাস্তায় এই ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে, মার্কোর হিংস্র টানের চোটে তান্বীর পরনের পাতলা টপসের একপাশের কাঁধের কাপড়টা ছিঁড়ে নিচে নেমে গেল। মুহূর্তের মধ্যে বনের অন্ধকার আর চাঁদের আলোয় তার ফর্সা অনাবৃত দেহের এক অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। আকস্মিক এই ঘটনায় তান্বী স্তব্ধ হয়ে গেল। সে এক হাত দিয়ে কোনোমতে তার ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক টেনে নিজের শরীর ঢাকার চেষ্টা করতে লাগল। লজ্জায়, অপমানে আর তীব্র আতঙ্কে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এই দৃশ্যটা মার্কোর চোখের মণি দুটোকে এক লহমায় বদলে দিল। চাঁদের আলোয় তান্বীর উন্মুক্ত ফর্সা ত্বক আর তার এই অসহায় রূপ দেখে মার্কোর ক্ষমতার লোভী মস্তিষ্কে হঠাৎ করেই এক অন্যরকম, নিষিদ্ধ ও পৈশাচিক লালসা চাড়া দিয়ে উঠল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাম্রাজ্য, ইভানের ডিল—সব যেন এক সেকেন্ডে তার মাথা থেকে উধাও হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখ দুটো কামুক পশুর মতো চকচক করে উঠল। সে তান্বীর ঢাকার চেষ্টা করা হাতটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে তার আরও কাছে এগিয়ে এল। বনের নিশাচর পাখিরাও যেন এই আসন্ন পাশবিকতার আভাস পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
মার্কোর ভেতরের সুপ্ত পশুটা যখন পুরোপুরি জেগে উঠল, তখন সে তান্বীর কোনো প্রতিরোধ বা কান্নার তোয়াক্কা করল না। এক ঝটকায় সে তান্বীকে পাঁজকোলা করে নিজের কাঁধে তুলে নিল। তান্বী বাতাসের বুকে পা ছুড়ে, পিঠে কিল মেরে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু মার্কোর সেই পেশীবহুল শরীরের সামনে তার শক্তি ছিল অতি সামান্য। মার্কো ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা জং ধরা, পরিত্যক্ত এক্সিডেন্টেড পুরোনো গাড়ির বনেটের ওপর তান্বীকে সজোরে আছড়ে ফেলল। লোহার কর্কশ শব্দে তান্বীর পিঠের চামড়া ছিলে গেলেও সে দমে গেল না। মার্কো যখনই তার ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো—নিকষ কালো বনের নীরবতা চিরে এক তীব্র চড়ের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো। তান্বী নিজের শেষ শক্তিতে ডান হাতটা বাতাসে ঘুরিয়ে মার্কোর গালে এক চরম থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছে।
তান্বী নিজের ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক এক হাত দিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে, অন্য হাতে মার্কোর দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীব্র ঘৃণায় চিৎকার করে উঠল “লম্পট! চরিত্রহীন কোথাকার! আমি ভেবেছিলাম তুই ক্ষমতার লোভী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাট হওয়ার জন্য ইভানের পা চাটছিস। কিন্তু তুই তো একটা পশুর চেয়েও অধম! তুই এতটা নিচ, এতটা চরিত্রহীন?”
চড়ের আঘাতে মার্কোর মাথাটা একপাশে ঘুরে গিয়েছিল। সে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের কোণে জমা হওয়া রক্তটুকু মুছে নিল। তার চোখ দুটো এবার লালসা ছাড়িয়ে এক ভয়ানক, হিংস্র প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠল। সে নিজের জ্বলন্ত গালটা চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চিপে বলল—”চুপ কর! একদম মুখ বন্ধ রাখ তোমার! তুমি চরিত্রহীনের কী জানো তান্বী? এই যে থাপ্পড়টা মারলে না? মনে আছে তোমাকে রিভলবার চালানো শেখানোর জন্য জাস্ট তোমার হাতটা আমি একটু ধরেছিলাম বলে… তোমার ওই অহংকারী স্বামী জাভিয়ান আমাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল! মনে আছে তোমার? সায়েম চৌধুরী আর চাচির সেই অ্যানিভার্সারির রাতের কথা? মেরুদণ্ডের হাড় ফ্র্যাকচার হয়ে আমি প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলাম তান্বী! মাসের পর মাস আমাকে হুইলচেয়ারে কাটাতে হয়েছিল।”
মার্কো একটা হিংস্র পশুর মতো তান্বীর আরও কাছে ঝুঁকে এল। তার নিঃশ্বাসের গরম বাতাস তখন তান্বীর মুখে লাগছে। সে পৈশাচিক হেসে আবার বলল— “জাভিয়ান চৌধুরী আজীবন নিজেকে মেক্সিকোর গডফাদার ভেবে এসেছে। নিজের খুব ক্ষমতা দেখিয়েছে আজীবন, তাই না? তাহলে আরেকটা কথা শুনে রাখো তোমাদের সন্তান পৃথিবীতে না আসার কারন আমি আমি ইভানের কথাতেই তোমার মিসক্যারিজ করেয়েছি। সেদিন রাতে দুধ খেয়েছিলে না? আজ আমি জাভিয়ানের সবচেয়ে দামী সম্পত্তিতে আমি হাত দেব। আজ তোমাকে আমি পুরো ছুঁয়ে দেব, দেখি আজ ওই শালা জাভিয়ান এসে কী করে! সে তো এখন কুত্তার মতো মেক্সিকোর রাস্তায় রাস্তায় না খেয়ে ঘুরছে। ক্ষমতা তো দূর, এক থালা ভাত কেনার যোগ্যতাও আজ ওর নেই। আজ তোমাকে বাঁচানোর মতো কোনো হাত এই দুনিয়ায় বেঁচে নেই তান্বী!” মার্কো আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে তান্বীর দুটো হাত একসাথে ধরে গাড়ির বনেটের সাথে চেপে ধরল। তান্বীর চোখ দিয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার মন চিৎকার করে ডাকছে একটাই নাম—জাভিয়ান! মেক্সিকোর এই অন্ধকার রাতে, এক পুরোনো অপমানের প্রতিশোধ নিতে মার্কো যখন তান্বীর সমস্ত অস্তিত্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে উদ্যত, ঠিক তখনই বনের ভেতরের অন্ধকার থেকে একটা ভারী বুটের আওয়াজ এগিয়ে আসতে শুরু করল।
মার্কো কিছু বুঝে ওঠার আগেই—একটা শক্ত বুটের লাথি এসে সরাসরি আছড়ে পড়ল মার্কোর পাঁজরে। প্রচণ্ড আঘাতে মার্কো তান্বীর ওপর থেকে ছিটকে গিয়ে রাস্তার শক্ত পিচের ওপর পড়ে কয়েকটা ডিগবাজি খেল।
“কোন কুত্তার বাচ্চা রে?!” মার্কো চিৎকার করে উঠে নিজের পকেট থেকে রিভলভার বের করতে গেল। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেওয়া হলো না। অন্ধকারের ছায়া ভেদ করে যে মানুষটি এসে দাঁড়াল, চাঁদের আলো তার মুখের ওপর পড়তেই মার্কোর হাতের রিভলভার কেঁপে উঠল। লম্বা অবয়ব, চোখে চশমা, আর ডান হাতে জ্বলছে এক মরণঘাতী সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল। সে আর কেউ নয়… স্বয়ং রায়হান! সিংহের বিশ্বস্ত সেনাপতি। রায়হান শান্ত পায়ে এগিয়ে এসে মার্কোর বুকের ওপর নিজের ভারী বুটটা চেপে ধরল। পিস্তলের নলটা সরাসরি মার্কোর কপালে ঠেকিয়ে সে বরফশীতল গলায় বলল—”নিজের লিমিট ভুলে গেছিস মার্কো? সম্রাট মেক্সিকোর রাস্তায় না খেয়ে ঘুরছে বলে তুই ভেবেছিস তাঁর সাম্রাজ্য শেষ হয়ে গেছে? ভুলে যাস না, সিংহ খাঁচায় বন্দি হলেও বনের শেয়ালরা কখনো রাজা হতে পারে না। স্যারের আমানতে হাত দেওয়ার সাহস তোকে কে দিল?”
মার্কো বুকের ব্যথায় ছটফট করতে করতে রায়হানের দিকে তাকাল। সে জানত, রায়হানের নিশানা কখনো মিস হয় না। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “রায়হান… তুই? তুই তো হসপিটালে ছিলি…”
“আমি সবসময় আমার স্যারের ছায়ার সাথে থাকি,” রায়হান দাঁতে দাঁত চেপে বলল। সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে পিস্তলের বাঁট দিয়ে মার্কোর মাথায় এক প্রচণ্ড আঘাত করল। মার্কো কোনো আর্তনাদ করার সুযোগ না পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তান্বী তখনো গাড়ির বনেটের ওপর কুঁকড়ে বসে কাঁপছিল। নিজের ছিঁড়ে যাওয়া পোশাকটা কোনোমতে বুকে জড়িয়ে সে ঝাপসা চোখে তাকাল রায়হানের দিকে। রায়হান নিজের গায়ের দামী ব্লেজারটা খুলে অত্যন্ত সম্মানের সাথে তান্বীর কাঁধের ওপর জড়িয়ে দিল। সে তান্বীর সামনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল—
“মিস গজদন্তনী, আপনি ঠিক আছেন? আমি দুঃখিত, আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। মেক্সিকোর ডার্ক ওয়েবের লোকাল সিগন্যালে ইভানের ফার্মহাউসের সাইরেন ট্র্যাক করেই আমি এই জঙ্গলের দিকে ছুটে এসেছিলাম।”
তান্বী রায়হানের ব্লেজারটা শক্ত করে ধরে কেঁদে উঠল। সে রায়হানের হাতটা চেপে ধরে বলল, “রায়হান ভাইয়া… জাভিয়ান! জাভিয়ান কোথায়? ও বেঁচে আছে আমি জানি! ইভান আর মার্কো ওর সাথে প্রতারণা করেছে। ও আমাকে ভুল বুঝছে রায়হান ভাইয়া, ও ভাবছে আমি ইভানের টাকা আর ক্ষমতার জন্য ওকে ছেড়েছি। প্লিজ আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলুন!”
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৭
তান্বী নিজের মুখ থেকে ইভান আর মার্কোর পুরো ষড়যন্ত্রের কথা এক নিঃশ্বাসে রায়হানকে বলে দিল। রায়হান তান্বীকে গাড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “চলুন ম্যাডাম। স্যার এখন মেক্সিকোর রাস্তায় এক নিঃস্ব পঙ্গুর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর ভেতরের মরে যাওয়া প্রেমিকটাকে বাঁচানোর জন্য আপনার এই সত্যটার খুব প্রয়োজন।”
