Home ডেসটেনি ডেসটেনি পর্ব ২৪ (২)

ডেসটেনি পর্ব ২৪ (২)

ডেসটেনি পর্ব ২৪ (২)
সুহাসিনি মিমি

সারারাতের বৃষ্টির পর পুরো গ্রামটা ধুয়ে-মুছে নতুন হয়ে উঠেছে। আকাশে রোদ উঠেছে ঠিকই, তবে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ এখনো ভাসছে বাতাসে বাতাসে। দূরে দূরে ধানক্ষেতের মাথায় বৃষ্টির পানি চিকচিক করছে তখনো। সরু মেঠোপথগুলো কাদায় থকথকে। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গর্তে জমে থাকা পানিতে জিপের চাকা ঢুকলেই ছপাৎ ছপাৎ শব্দ তুলে কাদা ছিটকে পড়ছে দুপাশে।একটা সবুজ রঙের জিপ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সেই গ্রামের ভেতরের আঁকাবাঁকা পথ ধরে।
ড্রাইভিং সিটে বসে আছে সেহরোজ। মুখভর্তি বিরক্তি। ভ্রু কুঁচকে আছে শুরু থেকেই। এই কাদা, ভাঙাচোরা রাস্তা, চারপাশের এতো অগোছালো পরিবেশ একটাও সহ্য হচ্ছে না তার। অথচ পিছনের সিটে বসা অর্ণব আর ফাহিমের হাবভাব এমন যেন দীর্ঘদিনের প্লানিং করে পিকনিকে এসেছে এরা।ফাহিম জানালা দিয়ে মাথা বের করে ভেজা বাতাস টেনে নিয়ে বলল,

“উফফ! ভাই, গ্রামের এই ওয়েদারটার জাস্ট প্রেমে পড়ে গেছি আমি!”
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
“ঢাকায় এই জিনিস খুঁজে পাবি? এই কাদা, এই ভিজা মাটির গন্ধ! একদম মিলেমিশে ক্ষীর!”
“তোরা চাইলে এখানেই নেমে কাদায় গড়াগড়ি খেতে পারিস।”
শেহরোজের কথায় অর্ণব হেসে বলল,
“তোর সমস্যা কী বলতো? মানুষ এত সুন্দর পরিবেশ পেলে কবিতা লিখে, আর তুই এমন মুখ করে বসে আছিস যেন যুদ্ধ করতে এসেছিস।”
সেহরোজ শুষ্ক গলায় উত্তর দিল,
“কারণ আমি ঘুরতে আসিনি।”
পাশেই বসা তার মা তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বললেন,
“এই রাস্তা তো আগে এমন ছিল না!”
সেহরোজ স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতেই বলল,
“আম্মু, তুমি নিশ্চিত তো ঠিক জায়গায় আসছি আমরা?”
“হ্যাঁ রে বাবু! এইদিকেই তো হওয়ার কথা। অনেক বছর আগে এসেছিলাম তো, ঠিক মনে পড়ছে না।”
“গ্রেট!”

চোয়াল শক্ত করে খিটমিট করে উচ্চারণ করল সেহরোজ।পথিমধ্যে জিপটা হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল। সামনের রাস্তা এতটাই সরু আর কাদামাখা যে আর ভেতরে নেওয়া অসম্ভব প্রায়।সেহরোজ গভীর একটা আহত শ্বাস ছাড়ল। তারপর ইঞ্জিন বন্ধ করে দরজা খুলে একলাফে নেমে গেল গাড়ি থেকে।
সাদা টি-শার্টের উপর জলপাই রঙের জ্যাকেট, নিচে সাদা ট্রাউজার আর সাদা স্নিকার্স। কিন্তু নামার সঙ্গে সঙ্গেই কাদায় “চপাস” শব্দ তুলে জুতোর অর্ধেকটা ডুবে গেল কাদায়।সেহরোজের মুখের ভাব দেখে অর্ণব আর ফাহিম পেছন থেকে হাসি চাপতে চাপতে আওড়াল,
“ভাই, তোর জুতার আত্মার মাগফিরাট কামনা করছি!”

সেহরোজ পাত্তা দিল না সেসবের। বিরক্ত মুখে সামনে এগিয়ে গেল সরু একটা গলির দিকে।চারপাশে টিনের ঘর। কোথাও কোথাও আবার মাটির দেয়াল। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে এখনো টুপটাপ পড়ছে চালের কার্নিশ থেকে। পুরো পথজুড়ে কাদা আর জমে থাকা পানি থকথক করছে।সেহরোজ যত ভেতরে যাচ্ছে, সাদা জুতো আর ট্রাউজার তত কাদায় মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে তার। ঠিক তখনই সামনের মোড় ঘুরে আচমকা একটা কিশোরী মেয়ে দৌড়ে এসে প্রায় বুকের সঙ্গে ধাক্কা খেলো তার। মেয়েটার দুহাত ভর্তি কাঁচা পেয়ারা। ওড়নার কোঁচড়েও গাদা গাদা পেয়ারা বাঁধা।মেয়েটার অবচেতনে দৌড়ানোর দরুন কাদার পানি ছিটকে এসে সেহরোজের পুরো ট্রাউজার আর জুতোর উপর লেপটে গেল। বেচারা সেহরোজ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে।তারপরই, টের পেল কেউ একজন হুট করে পেছন থেকে ওর শার্ট খামচে ধরেছে। চমকে ঘুরে তাকাতেই দেখল সেই মেয়েটাই ওর পেছনে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তখন। মেয়েটার ডাগর ডাগর চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট। অমনি সামনের দিক থেকে একটা মোটা গলার চিৎকার শুনতে পেলো দুজনে,
“ঐইই! আজকে ধরতে পারলে তোর খবর আছে মাইয়া!”

একজন মধ্যবয়স্ক লোক লাঠি হাতে তেড়ে আসছে এদিকটায় । পরনের লুঙ্গিটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে কাঁচা মারা। মুখ রাগে থমথম করছে।মেয়েটা আরও শক্ত করে সেহরোজের শার্ট আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“আংকেল আমারে বাঁচান প্লিজ! ওই লোকটা আজকে আমারে পাইলে আর আস্ত রাখবো না!”
“আংকেল?”
চোখ কুঁচকে তাকাল সেহরোজ। তবে ঘুরলো না। লোকটা ততক্ষনে সামনে এসে লাঠি উঁচিয়ে বলল,
“সরে যান ভাই! এই মাইয়াডারে আজকে আমি..
সেহরোজ শান্ত, ঠান্ডা চোখে তাকাল লোকটার দিকে।
একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেভি অফিসারের সেই স্থির চাহুনি এমনিতেই সাধারণ মানুষকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।গভীর গলায় বলল সে,

“কি করেছে?”
লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আমার বাগানের সব পেয়ারা চুরি করছে! রোজ রোজ করে!”
পেছন থেকে মেয়েটা ছোট করে বলল,
“দুইডা নিছিলাম শুধু”
“চুপ!”
লোকটা আবার তেড়ে উঠতেই সেহরোজ হাত তুলে থামাল।
“ঠিক আছে। কত টাকার পেয়ারা?”
“জি?”
সেহরোজ ওয়ালেট বের করে কিছু টাকা এগিয়ে দিল।
“এতে হবে?”
লোকটা টাকার দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। লাঠিটা নামিয়ে নিয়ে গলা খাঁকারি দিল।
“আরে না মানে,আপনের লোক নাকি বুঝি?”
সেহরোজ নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“না। কিন্তু এখন চলে যান।”
লোকটা আর কিছু বলল না। টাকা নিয়ে বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল সেখান থেকে।লোকটা চোখের আড়াল হতেই মেয়েটা ধীরে ধীরে সেহরোজের পেছন থেকে উঁকি দিল। তারপর নিশ্চিত হয়ে বেরিয়ে এলো।ওড়নার কোঁচড় খুলতেই সব পেয়ারা গড়িয়ে পড়ল কাদায়।মেয়েটা একটুও বিচলিত না হয়ে নিচে বসে একটা পেয়ারা তুলে নিল। তারপর নিজের ওড়নায় ঘষে মুছে দিব্যি “কচাৎ” করে কামড় বসাল তাতে। হতভম্ব সেহরোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখল সেসব। পরোক্ষণেই মুখ বিকৃত করে উঠল সে। যেন জীবনে এরচেয়ে ভয়ংকর কিছু দেখেনি।

“ইউক!”
মেয়েটা চোখ পিটপিট করে তাকাল।
“কি হইছে?”
সেহরোজ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে বলল,
“ওটা কাদায় পড়েছিল মেয়ে! ক্লিন করে করেই খাওয়া শুরু করে দিয়েছো? ডু ইউ হেভ এনি আইডিয়া ওখানে কত জার্মস আছে?”
মেয়েটা নির্বিকারভাবে আরেক কামড় দিয়ে বলল,
“জার্মস আবার কি?”
সেহরোজ বিরক্তিতে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“নাথিং!”

মেয়েটা দিব্যি পেয়ারায় কচাৎ কচাৎ করে কামড় বসাতে বসাতে এবার সেহরোজকে আগাগোড়া ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল।সাদা কাপড়চোপড় কাদায় মাখামাখি।হাতে দামি ঘড়ি। পরিষ্কার শেভ করা মুখ। চুলগুলোও সেট করা। দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটাও আলাদা। দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থেকেই মুখ কুঁচকে নিল মেয়েটা।এই লোকটাকে কোনো দিক দিয়েই গ্রামের মানুষ মনে হচ্ছে না। একেবারে শহুরে বাবু টাইপ লাগছে দেখতে।ওদিকে সেহরোজও অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে।
বয়স বড়জোর তেরো-চৌদ্দ হবে হয়তো। পরনে সবুজ রঙের থ্রি-পিস। শরীরটা একদম শুকনো পাটকাঠির মতো। মুখে ঘাম লেপ্টে আছে, চুলগুলো এলোমেলো করে বাধা। গ্রামের সাধারণ মেয়েদের মতোই একদম সাদাসিধে চেহারা। মেয়েটা পেয়ারা চিবাতেই চিবাতেই হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“আংকেল কি এখানে নতুন নাকি? কোন বাড়িতে আসছেন?”
আবারও “আংকেল”!সেহরোজের বিরক্তির মাত্রা এবার আকাশ ছুঁয়ে গেল।তাকে কোন দিক দিয়ে আংকেল মনে হচ্ছে এই মেয়ের?তবুও নিজেকে কন্ট্রোল করল সে। বুঝতে পারছে, বাচ্চা একটা মেয়ে। সেই হিসেবেই বলছে।চোয়াল শক্ত করে শান্ত গলায় বলল,

“দেলোয়ার বাড়ি কোনটা জানো?”
নামটা শুনতেই মেয়েটার মুখের ভাব বদলালো এবার।
চোখ সরু করে আবারও উপরে নিচে দেখল সেহরোজকে। এবার যেন একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করল।
“বাবু ! কার সাথে কথা বলছিস?”
সেহরোজ ঘুরে তাকাতেই দেখল তার মা এগিয়ে আসছে অর্ণব আর ফাহিমকে নিয়ে। তবে তাকে আরও আশ্চর্য করে দিয়ে মেয়েটা তার মাকে দেখতেই লাফিয়ে উঠল প্রায়,
“আরে সুমি আন্টি!আপনি এখানে?”
সেহরোজের মা চশমাটা ঠিক করে তাকালেন মেয়েটার দিকে। তারপর অবাক হয়ে বললেন,
“মেহরিণ না ? এমা তুই এখানে?ও মা, কত বড় হয়ে গেছিস! মাশাআল্লাহ কত সুন্দর হইছিস দেখতে!”
বলে আদর করে মেয়েটার গাল ছুঁয়ে দিলেন তিনি।
সেহরোজ কপাল কুঁচকে তাকাল দুজনের দিকে।বলল অতিব আশ্চর্যে,

“তুমি একে চেনো?”
“চিনবো না কেন? এটাই তো মেহরিণ!”
এক সেকেন্ড থামলেন তিনি।তারপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
“যার সঙ্গে তোর বিয়ে ঠিক করেছি।এর সঙ্গে বিয়ে দিতেই তো এনেছি তোকে!”
বিনা মেঘে বড়োসড়ো একটা বজ্রপাত আছড়ে পড়ল সেহরোজের মাথায়। শূন্য মস্তিষ্কটা বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় তার।বিস্ময়ে হা হয়ে গেল চোয়াল। অস্ফুট গলায় কোনোরকম টেনেটুনে উচ্চারণ করল,
“হোয়াট?”
মিসেস সুমি দিব্যি হেসেই চলেছেন তখনো।
“তোকে তো এই মেয়ের সঙ্গেই বিয়ে দিতে এনেছি আমরা। দেখ না, কত সুন্দর মানাবে তোদের!”
সেহরোজ এবার ঘুরে তাকাল মেয়েটার দিকে।মেয়েটাও পেয়ারা হাতে দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকারভাবে।
একবার ওর দিকে তাকাচ্ছে, আবার পেয়ারা খাচ্ছে।
সেহরোজের চোখ উপরে থেকে নিচে নামল।এই বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করেছে ওর মা?একদম কাঁচা গ্রামের মেয়ে। শরীরে হাড় ছাড়া কিছুই আছে বলে মনে হয় না। দেখে মনে হচ্ছে জোরে ধাক্কা লাগলে উড়ে যাবে। সেহরোজের মাথা ভনভন করে উঠল।

অসম্ভব। এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালো অর্ণব আর ফাহিম।দুজনেই কিছুক্ষণ পরিস্থিতি বুঝে চুপ করে থাকলেও একটা সময় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল অর্ণব।
“ভাই তোর বাচ্চা বউটা কিন্ত সেই! আমাদের কিন্ত একদম মনে ধরেছে আমাদের ভাবিকে।বিয়ে তো এইবার আমরা তোকে করিয়েই ছাড়বো। এবারের মিশন সেহরোজ সরোয়ার এর বিয়ে খাওয়ার মিশন। এবারের মিশন, এই মেয়েটাকে আমাদের ভাবি বানানোর মিশন!”
“নো ওয়েইইই!”
চিৎকার দিয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসল সে।বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কপাল, গলা, বুক— সব ঘামে ভিজে গেছে।মোবাইলের একঘেয়ে অ্যালার্ম তখনও একটানা বাজছে পাশে।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল,
সকাল সাতটা। কয়েক সেকেন্ড হাঁপাতে হাঁপাতে বসে রইল সেহরোজ একইভাবে।স্বপ্ন।তার মানে এটা একটা স্বপ্ন ছিল? স্বপ্ন নয় ঠিক, এটা দুঃস্বপ্ন! এরকম ভয়াবহ স্বপ্ন জীবনে আর দুটো দেখেছে কিনা সন্দেহ।
সঙ্গে সঙ্গে এমন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক থেকে, যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফিরেছে মাত্রই।
একহাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ বসে থেকে বিড়বিড় করে উঠল,
“ড্যাম!”
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।তাড়াতাড়ি পাশের বোতলটা তুলে ঢকঢক করে দু ঢুক পানি খেলো।
তবুও বুকের ধরফড়ানি কমছে না পুরোপুরি। জীবনে অনেক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে সে। সমুদ্রের ঝড়, অস্ত্র, বিপদ— সবকিছুর সামনে ঠান্ডা মাথায় দাঁড়িয়েছে কিন্তু আজ একটা স্বপ্ন এভাবে নড়িয়ে দিয়েছে তার অস্তিত্ব! বিষয়টা সত্যিই প্রচন্ড হরিবল!

নাস্তা শেষ করে সবেই রুমে এসেছে পাভেল। পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে বেজে উঠল তখনি। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসাতে। গ্রীন কালার ফোনের অপশনে প্রেস করে কানে চেপে ধরলো ফোনটা। শুনতে পেল অপরিচিত কোনো পুরুষালি কণ্ঠস্বর। ওপাশ থেকে কি শুনতে পেল কে জানে তবে কথাটা শুনতেই খানিকটা থতমত খেয়ে বসল পাভেল। কৌতূহল চেপে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দা দিয়ে নিচে তাকাতেই চোখ আটকালো বাড়ির ঠিক গেটের সামনে একটা বড় কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
ফোন রেখে তৎক্ষণাৎ ঘরে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করল যথাসম্ভব।গায়ের শার্টটা একবার টেনে গুছিয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে।গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই গাড়ির দরজা খুলল। একজন পুরুষ নেমে এল সঙ্গে সঙ্গেই।
গায়ে সম্পূর্ণ কালো ইউনিফর্ম, কালো শার্প বুট, গলায় হেডসেট। কানে ছোট কালো ব্লুটুথ ডিভাইস।লোকটা নেমেই এক পা সামনে এগিয়ে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল তাকে।
“গুড মর্নিং, স্যার।”
পরপর ইউনিফর্ম পরা লোকটা একটা ব্র্যান্ডেড শপিং ব্যাগ হাতে এগিয়ে এলো তার সামনে। ব্যাগটা ছিল বেশ ভারী তারউপরে সুন্দর করে রিবন বাঁধা।গলায় স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রেখেই জানাল,
“স্যার পাঠিয়েছেন এটা ম্যামের জন্য।”

বিনা বাক্যয় ব্যাগটা হাতে নিল পাভেল।লোকটা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সেখানে। দায়িত্ব শেষ করে আবার চুপচাপ ঘুরে গাড়িতে উঠে পড়ল। মুহূর্তেই গাড়িটা সরে গেল গেটের সামনে থেকে।পাভেল ব্যাগটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কীয়তক্ষণ। একটা অস্বস্তিকর কৌতূহল নিয়ে ব্যাগের দিকে তাকাল সে। বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে এটা সাধারণ কিছু না। অত্যন্ত এক্সক্লুসিভ, বিদেশি ব্র্যান্ডের প্যাকেজিং।প্রচন্ড কৌতূহলে ব্যাগটা উল্টে পাল্টে দেখল আবার।
ব্যাগটা বেশ বড়োসড়োই। পাভেল ব্যাগটা নিয়ে সোজা চলে এলো নিজ রুমে।রুমে মিতালী নেই। মায়ের সঙ্গে একটু বাড়ির আশেপাশে হাঁটতে বেরিয়েছে নাস্তা শেষে। মিনিট খানেক সময় নিয়ে কিছু একটা ভেবে অবশেষে নিজেই আগেভাগে ব্যাগটা খুলল সে। প্রথমেই চোখে পড়ল,একটা হালকা অ্যাসিমেট্রিক সি-কালারের গাউন। নিখুঁত কাট ও প্রিমিয়াম ফেব্রিকে আবৃত গাউনটা এক দেখাতেই নজর আটকাতে সক্ষম। পাভেল স্বয়ং ছেলে হয়েও হা করে তাকিয়ে থাকলো কয়েক সেকেন্ড। তার সাথে মিলিয়ে এক জোড়া হাই হিল জুতোও আরেক পাশে ছোট ও অত্যন্ত এলিগ্যান্ট একটা ব্যাগ ও রাখা। সবকিছুর নিচে রাখা একটা ছোট কার্ড।পাভেল সেটার দিকে তাকাতেই চোখ আটকালো আরেকদফা।প্রাইস দেখতেই কেশে উঠল খুক খুক করে। দামের জায়গায় লেখা—ডলার ফিগার। বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে কয়েক লাখের কাছাকাছি! কয়েক লাখ!
গ্রাউন, জুতো অবশেষে ব্যাগ প্রত্যেকটার নিচে থাকা কার্ডগুলো ছিঁড়ে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সে।
তারপর ব্যাগটা আবার গুছিয়ে বন্ধ করল।অবশেসে দু চোখ বন্ধ করে বড়োসড়ো একটা হাফ ছাড়ল

দুপুর গড়িয়ে তখন প্রায় একটার কাছাকাছি।
ড্রয়িং রুমটা একদম রেডি হয়ে বসে আছে পাভেল। অপেক্ষা করছে স্ত্রী আর বোনের জন্য। শাড়ির আঁচল গায়ে পেচাতে পেচাতে নিচে নেমে এলো তখন মিতালী।জাম রঙা একটি জর্জেট এর শাড়ি পড়েছে আজ সে। তারউপর আবার ছোট ছোট স্টোনের কাজ করা। ফর্সা গায়ের সঙ্গে মানিয়েছে বেশ। পাভেল হা করে তাকিয়ে থাকল নিজে স্ত্রীর পানে। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে পুনরায় তাড়া দিয়ে জানাল,
“প্রিয়র হয়নি? ডেকেছো ওকে?”

বলতে না বলতেই এবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতে দেখা গেল প্রিয়ন্তীকে। সে সময় বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকছিলো তাজধীর। সেই সকালে কোনো একটা ইম্পরট্যান্ট কাজে বাড়ির বাইরে বের হয়েছিল সে।ফিরলো এখুনি।এক হাতে কানের পাশে চেপে ধরে রাখা ফোন। কোনো একটা বিষয়ে অর্ণবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঢুকছিল সে। কথা বলার ব্যস্ততায় ডুবে থাকলেও একদম হুট্ করেই চোখ আটকালো সিঁড়ির দিকে।
অমনি মিস করল বোধহয় কয়েকটা হার্টবিট। হৃদযন্ত্রটা কেমন থমকে গেল। অ্যাসেন্ট-সি কালারের গাউনে থাকা রমণীটা ঠিক মাঝ সমুদ্রে ডুবে থাকা কোনো রূপকথার ভবনমোহিনী মৎসকন্যার মতোই লাগছে। কানে শোভা পাচ্ছে ম্যাচিং করা একজোড়া দুল। গলায় ওড়না আলতো করে রাখা। অনেক্ষন যাবৎ বন্ধুর থেকে কাক্ষিত রেসপন্স না পেয়ে ফোনের ওপাশ থেকে অর্ণব অধৈর্য হয়ে বলে উঠল,

“হ্যা হ্যালো, কিরে ভাই রেসপন্স করছিস না কেন? কোথায় তুই? হ্যালো তাজধীর শুনছিস?”
অর্ণবের গলার টানটান বাক্যদয়েও ধ্যান ভাঙেনা লোকটার। সিঁড়ির দিকে চেয়েই গমগমে সরে উত্তর করে কেবল,
“এক টুকরো সমুদ্রের সামনে!”
ওপাশ থেকে মুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠল অর্ণব,
“এ্যা? কি বললি? কই তুই?!
অর্ণবের উঁচু বাক্যর চোটে ধ্যান ভাঙল তাজধীরের। নড়েচরে দাঁড়ালো খানিকটা।মহাকষ্টে চোখ সরিয়ে নিলেও বেহায়া চোখ দুটো ঘুরেফিরে পুনরায় গিয়ে আটকালো সেই রমণীতে। মুখ একদম স্বাভাবিক করে ফোনটা নামিয়ে আনল।একটু থেমে বলল,
“বাদ দে, পরে কথা হবে।”
বলেই কল কে টে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। সোজা চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে উপরে। তবে যাওয়ার আগমুহূর্তেও একবার তাকাতে ভুলল না সে।

ওদিকে প্রিয়ন্তীকে এই ভেসে দেখে তাজধীরের সাথে সাথে থমকালো আরেকজন ও। সেটা হলো মিতালী। প্রথম মুহূর্তে মেয়েটা সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজের ননদকে এত সুন্দর লাগছে দেখে চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল যেন। কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ধীরে ধীরে ভ্রু কুঁচকে গেল মিতালীর। চোখে ভেসে উঠল সন্দেহ আর বিস্ময়। নিজের চোখের দেখাকে অবিশ্বাস প্রমান করতে আরেকবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল প্রিয়ন্তীর ড্রেসটা। ততক্ষণে উঠে বাইরে চলে গেছে পাভেল। যেতে যেতে বলে গেল,
“আমি বাইরে আছি, তোমরা আসো।”
ড্রয়িং রুমে রয়ে গেল শুধু মিতালী আর প্রিয়ন্তী। এর মাঝেই এগিয়ে এসে দাঁড়ালো প্রিয়ন্তী। বলল প্রচন্ড উচ্ছাস নিয়ে,

“ড্রেসটা সুন্দর না ভাবি?”
“হ্যাঁ, অনেক সুন্দর।”
তারপর একটু থেমে, চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল,
“কই পেলে এটা? কবে নিলে?”
প্রিয়ন্তী স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল,
“ ভাইয়া এনেছে সকালে। বলেছে এটা পড়েই রেডি হতে!”
“তোমার ভাই?”
অবাক হয়ে বলল মিতালী।প্রিয়ন্তী জবাব দিলো,

ডেসটেনি পর্ব ২৪

“হ্যাঁ, আর কে দিবে? আমার খুব পছন্দ হয়েছে জানো? এত সুন্দর গাউনটা! ইশ!”
বলতে বলতেই নিজের গাউনের কাপড়টা আলতো করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগল।তবে মিতালী কেন যেন চেয়েও স্বাভাবিক থাকতে পারছেনা। কারণ ততক্ষণে
তার মাথার ভিতর একটার পর একটা হিসেব মিলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ডেসটেনি পর্ব ২৫