Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ১৬

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৬

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৬
মোনালিসা মেহরোজ

ইফতিয়া ফাতিহাকে তার ঘর দেখিয়ে নিজের কাজে চলে যান। আসিফ ফ্রেশ হয়ে ভাই-বোনদের সাথে বের হলে ফাতিহা নিজেও ফ্রেশ হয়ে এসে বারান্দায় বসে। আর বারান্দায় বসতেই দক্ষিণা দমকা হাওয়া এসে ছুঁইয়ে যায় তাকে। ফাতিহা চোখ বন্ধ করে নেয়। কাল শপিংমলে নিহাদকে এক নজর দেখলেও সেই মুখ ফাতিহা ভুলতে পারেনি। আজ হুট করেই ফের পুরুষটিকে এখানে দেখে কেমন জমে গেছিলো রমণী। নিহাদের চোখের চাহুনি খারাপ নয়, না-তো সেখানে লাল*সা দেখেছে ফাতিহা। বরং তার চোখে নিজের জন্য মুগ্ধতায় দেখেছে। কিন্তু এই মুগ্ধতা তো ফাতিহার জন্য থাকা উচিত নয়। ফাতিহা একজন বিবাহিত নারী, আসিফের স্ত্রী সে। তাতে আসিফ যতই অস্বীকার করুক না কেনো।

ফাতিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঘরে আসার পথে ফাতিহাকে দেখে কেমন মাথা নিচু করে নিয়েছিলো নিহাদ। হয়তো সে নিজেও বুঝতে পেরেছিলো ফাতিহা তার জন্য সম্পুর্ন হারাম। ফাতিহা মৃদু হাসে। এরমধ্যেই সেখানে এসে হাজির হয় নাজিয়া। সাথে আছে মুন্তাসির, তার চাচাতো ভাই।
—ভাবি, চলুন আম্মা নিচে আপনাকে ডাকছে।
ফাতিহা মৃদু হাসে। নাজিয়া নিজেও হেঁসে ভাবিকে জড়িয়ে ঘরের বাহিরে পা রাখে। অন্যদিকে বাহিরে বাগানে বসে আছে সকল ভাই-বোন। সায়না মির্জার চাচাতো ভাই-বোনদের ছেলে-মেয়েসহ এলাকার কিছু ছেলেপুলে। নাজিয়ার বিয়ে উপলক্ষেই এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে সকলে। বাগানে তারা ব্যাতীত কিছু ক্যাটারিং এর লোকজনও আছে।

আসিফ দূর থেকে সকলকে দেখতে পেয়ে গুটিগুটি পায়ে এসে থামে সেখানে। আসিফকে দেখেই সকলে হাসিমুখে ভালোমন্দ কথা বলতে থাকে। যুবক নিজেও চেয়ার টেনে বসে পরে সকলের মধ্যিখানে। সাথে আড়চোখে একবার তাকায় আপন মনে বসে থাকা নিহাদের পানে৷ না চাইতেও মনটা হুট করেই কেমন খঁচখঁচ করছে তার। নিহাদকে সে ভালো করেই চেনে। নিহাদ যেমন তেমন ছেলে না। যার তার প্রতি তার কোন আকর্ষণও কাজ করে না। অথচ এটা কি হলো? ফাতিহার দিকে তার ওই দৃষ্টি…..!
আসিফ তরিৎ নিজেকে সামলে নিলো। নিজের উপরেই নিজে কেমন বিরক্ত হলো পুরুষটি। এসব সে কেনো ভাবছে? আশ্চর্য!

—কি রে আসিফ! কি এতো ভাবছিস?
আসিফ চমকে উঠলো রনির কথায়। নিহাদ নিজেও এবার আড়চোখে তাকালো আসিফের পানে। আসিফ মৃদু হেঁসে আওড়ালো—
—নাহ্, কিচ্ছু না।
অতঃপর ফের নিহাদের দিকে ফিরে বললো—
—নিহাদ, আজ তো বৃহস্পতিবার। সপ্তাহে তিনদিন তো বাজারে ভালোই মানুষজন হয়। তো, যাবি না-কি? অনেকদিন ধরে যাওয়া হয়না। ঘুরে আসি চল।
ভাইয়ের কথায় এই পর্যায়ে খানিক হাসলো যুবক। পাশ থেকে রনি সিগারেট বের করে নিহাদের হাতে একটা দিলো, অন্যহাতে আসিফকেও দিতে দিতে আওড়ালো—-
—অবশ্যই যাবো। আজ এতো বছর বাদে শহুরে সাহেব এসেছে, তাকে নিয়ে যাবো না!
রনির কথার পাছে তার পেটে একটা কিল মে*রে দিলো আসিফ। নিহাদ চমৎকার হাসলো তাদের কান্ড দেখে। বসা হতে উঠে যেতে যেতে বললো–

—বিকেল তো হয়ে এলো। বাজারে যখন যাবে তাহলে আগে চলো খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে ফেলি।
সকলে সম্মতি জানালো তার কথায়। সাথে ঠিক করলো তিনজন তারাতাড়ি করে বাজার থেকে ফিরে নাজিয়ার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যোগ দিবে। বাড়িতে আরো অনেক পুরুষ আছে, তাই আশা করা যায় এক-দু ঘন্টা তারা না থাকলে কিচ্ছু হবে না। আসিফ তো আর রোজ রোজ আসবে না। এতোবছর বাদে যখন এসেছে তাহলে তাকেও একটু সময় দেওয়া উচিত। বলা যায় না, এবার গেলে পরে আবার কতবছর বাদে আসবে।

বসার ঘরে পা রেখেই খেয়াল করল, পুরো বাড়িটা যেন গায়ে হলুদের আমেজে রঙিন হয়ে উঠেছে। একপাশে বড় বড় থালায় কলাপাতা বিছিয়ে তার ওপর সাজানো হচ্ছে নানা রকমের মিষ্টি—রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ, লাড্ডুসহ অনেক ধরনের মিষ্টান্ন। অন্যদিকে আপেল, আঙুর, কমলা, কলা আর ডালিম দিয়ে ফলের থালা সাজিয়ে রাখছেন বাড়ির মহিলারা। মাঝখানে হলুদ, সরিষার তেল, আতর, ফুলের পাপড়ি আর সুগন্ধি গোলাপজল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গায়ে হলুদের ডালা। কয়েকজন পান-সুপারির বাটা সাজাতে ব্যস্ত, কেউ আবার হলুদের তত্ত্বের কাপড়গুলো গুছিয়ে রাখছেন। চারদিকে হাসি-আড্ডা আর ব্যস্ততার এক মিষ্টি কোলাহল লেপ্টে আছে।
এসব দেখে মৃদু হাসল নিহাদ। আসিফ আর রনিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেল ভেতরের দিকে। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই নিহাদের পদক্ষেপ থেমে গেল। চুলার সামনে মাথায় ওড়না টেনে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা এক রমণী। নিহাদের ভ্রু কুঁচকে গেলো তা দেখে। রমণীটি বড় ডেকচিতে ধীরে ধীরে নেড়ে দিচ্ছে পায়েস।
ইফতিয়া তাকে বারবার বারণ করছেন কাজ না করতে। তবে নাছোড়বান্দা মেয়েটা তা শুনতে নারাজ। খানিকবাদে মায়ের আচরণে নিহাদ বুঝতে পারলো এটা ফাতিহা, আসিফের স্ত্রী। যে মৃদু কন্ঠে ইফতিয়াকে বলছেন—-

—আমি পারবো মামী, চিন্তা করবেন না। আপনি বরং ওদিকটা সামলান।
বলেই ফাতিহা আপনমনে পায়েস নেড়ে চললো। কপালের পাশে নেমে আসা কয়েকটি চুল ঘামে ভিজে গাল ছুঁয়ে আছে। মাঝেমধ্যে আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে আবার কাজে মন দিচ্ছে রমণী। রান্নাঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অজান্তেই নিঃশব্দে রমণীটির দেহ অবয়বের পানে তাকিয়ে রইল নিহাদ। তার দৃষ্টিতে ছিল না কোনো অশোভনতা, ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর একরাশ মুগ্ধতা। রমণীটির মুখ দেখার সৌভাগ্য নিহাদের না হলেও তার আপসোস নেই। না-তো আসিফের স্ত্রী বলে তার কোন হিংসা আছে। তবে নিজের মনের সুক্ষ্ম অনুভূতিকে ধামাচাপা দিতে রাজি নয় যুবকটি।
ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল আসিফ। নিহাদের স্থির দৃষ্টি অনুসরণ করে তার চোখও গিয়ে পড়ল ফাতিহার ওপর। পরক্ষণেই আবার নজর ফিরল নিহাদের মুখে। এক মুহূর্তের জন্য অকারণেই কুঁচকে উঠল আসিফের ভ্রু। কেন এমন হলো, সে নিজেও জানে না। শুধু বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তির একটা সূক্ষ্ম রেখা টের পেল পুরুষটি। অথচ পরক্ষণেই নিজেকে কেমন ধমক দিল৷ বড় বড় পা ফেলে রান্নাঘরের দিক থেকে বেড়িয়ে সিঁড়িতে উঠতে উঠতেই বিড়বিড় করে আওড়ালো—-
—আমি এসব কী ভাবছি? যার সঙ্গে আমি কোনো সম্পর্কই রাখতে চাই না, তাকে নিয়ে অন্য কারও দৃষ্টিতে আমার অস্বস্তি কেন হবে?
নিজের ভাবনাতেই বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল আসিফ। অন্যদিকে নিহাদও যেন হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। কোনো কথা না বলেই ধীর পায়ে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল সে।

—খেয়েছেন কিছু?
ফতিহা ঘরে এসে আসিফকে বিছানায় বসে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে করে বসলো প্রশ্নটা। অন্যদিকে ফাতিহাকে দেখে তীব্র বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো আসিফ। হাতে ফোন তুলে চাপাচাপি করতে লাগলো তা। আসিফের থেকে এহেন উপেক্ষায় কপালের ভাজ গাঢ় হলো রমণীর। ফের একই স্বরে আওড়ালো—-
—কথা বলছেন না যে?
—ইচ্ছে নেই তাই।
ফাতিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে আওড়ায়—-
—আপনার এই ইচ্ছেটা যেইদিন হবে সেইদিন হয়তো আর আমি থাকবো না। তখন এতো এতো বিতৃষ্ণা কার উপর দেখাবেন শুনি?

ফাতিহা ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা আঁটকে দিলো। অন্যদিকে রমণীর কথাগুলোয় আচমকা থমকে গেলো আসিফ। ধক করে উঠলো বুকটা। হাত থেকে আপনা-আপনি ফোনটা খসে পরলো। তার কপালে সৃষ্টি হয়েছে বেশ কয়েকটা ভাজ। গলা কেমন শুকিয়ে এলো যুবকটির।
আসিফ শুকনো ঢোক গিললো। অজানা এক আশংকায় বুকটা দুরুদুরু করে উঠলো তার। ঘাড় ঘুড়িয়ে আস্তে করে ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার পানে তাকালো। অতঃপর সিগারেটে পোড়া কালচে ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো—-
—কি বলতে চাইছে এই মেয়েটা?

বাজারের পথে তখন মানুষজনের তীব্র কোলাহল। গ্রামের কাঁচা রাস্তার দু’পাশ জুড়ে সবুজ ধানের ক্ষেত, কোথাও পাটের জমি, কোথাও বা তাল-খেজুরের সারি। দূরে গরুর গাড়ি ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে, আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে রাখালের বাঁশির সুর। বৃহস্পতিবারের হাট বলে চারদিকেই মানুষের ছোটাছুটি—কেউ মাথায় ঝুড়ি তুলে যাচ্ছে, কেউ ভ্যানে করে শাকসবজি নিয়ে যাচ্ছে।
আসিফ, নিহাদ আর রনি পাশাপাশি হাঁটছে সেই কাঁচা রাস্তা ধরে। রনির কাঁধে হালকা একটা গামছা ঝুলছে, আর মুখে তার চিরচেনা দুষ্টু হাসি। আসিফ দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাঁটলেও মাঝেমধ্যে আশপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। সাথে মুখটাও বেশ গম্ভীর তার। ফাতিহার তখনকার বলা কথাটা অজান্তেই ভিষন বিরক্ত লেগেছে তার৷ অন্যদিকে নিহাদ নীরবে গ্রামের বিকেলটা উপভোগ করছে।

—কি শহুরে সাহেব! বাজারে যাচ্ছেন, বউয়ের জন্য তাঁতের শাড়ী নিবেন না?
কথাটা বলেই রনি হো হো করে হেসে উঠল। ভ্রু কুঁচকালো আসিফ। বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে আওড়ালো—
—ও এসব পড়ে না।
—বাহিরের লোকেদের সামনে হয়তো পরে না। তোর সামনে তো পড়তেই পারে। আপত্তি কি?
আসিফ অজান্তেই আড়চোখে একবার নিহাদের দিকে তাকালো। তবে যুবকের মুখে কোন বিশেষ পরিবর্তন নেই। আসিফ চোখ ফিরিয়ে আওড়ালো—-
—চুপচাপ চল, নইলে জিহ্বা কে*টে হাতে ধরিয়ে দিবো।

কথা বলতে বলতেই তিনজন বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। দূর থেকেই ভেসে আসছে মানুষের কোলাহল, দোকানিদের হাঁকডাক আর ভাজা পেঁয়াজুর গন্ধ। বাঁশের খুঁটি আর রঙিন ত্রিপল দিয়ে সাজানো সারি সারি দোকান, একপাশে মাছের বাজার, অন্যপাশে সবজি, কাপড়, মাটির জিনিসপত্র আর মসলার দোকান। পুরো হাট যেন এক জীবন্ত উৎসব।

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৫

হাটের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে নিহাদ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। অন্যদিকে আসিফের ঠোঁটের কোণায় এক চিমটি হাসি ফুটে উঠলো। শহরের জীবনে এই ধরনের জিনিসগুলো তার রুটিনের বাহিরে। সকলের চোখে আসিফ মির্জা একজন অহংকারী লোক। বড়োলোক বাবার পয়সাওয়ালা বিগড়ে যাওয়া ছেলে হলেও গ্রামের এই সহজ-সরল মানুষগুলোর স্পর্শে সে হয়ে ওঠে নিদারুণ এক যুবক। যেখানে টাকা পয়সার অহংকারের চেয়ে বেশি বন্ধু-বান্ধাব, ভাই-বোনদের খাঁটি ভালোবাসা আছে।

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৭