তাকদীর পর্ব ৩
নিরুর কল্পনারাজ্য
গতকাল গার্লফ্রেন্ডের সাথে ফূর্তি করতে গিয়ে বাবার কাছে ধরা খাওয়ার ফলস্বরূপ আজ এক বাচ্চার মাকে বিয়ে করেছে ঢাকার সম্রান্ত শাহরিয়ার পরিবারে এক এবং উশৃঙ্খল পুত্র যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার। শুধু কী উশৃঙ্খল? শহরের বখাটে সে। কি না করে সে! মদ্যপান; মারামারি; দাপট দেখানো; অহংকার সবই তার চরিত্রের একাগ্র বৈশিষ্ট্য। শাহরিয়ার পরিবারের সকলে ভীষণ ধার্মিক অথচ এই পুরুষকে যদি কুরআনের কোনো সূরা বলতে বলা হয় তাহলে বোধহয় সে তাও পারবেনা। আর আজ, তার মতো মেয়েবাজ, ক্রাশবয়কে কিনা বিয়ে করতে হয়েছে এক বাচ্চার মাকো!
জুনায়েদের গায়ে তার কিছু মুহূর্ত পূর্বের নিকাহ এর সবচেয়ে বড় প্রমাণস্বরূপ একটি শেরওানি রয়েছে। আপাতত সে ভীষণ স্পিডে হাইওয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সে চাইছে–তার অশান্ত বক্ষপিঞ্জর; তিক্ত মস্তিষ্ক এবং অসহ্যকর এই অনুভূতিটাকে দমাতে। তার মতে বিয়ে মানেই যেনো এক গাঁটবন্ধন। এই গাঁটবন্ধনে বাধার মতো পুরুষ সে নয়। তাই-তো ত্রিশ বছরে এসেও এখনও অব্দি সে বিয়ে করেনি। অথচ আজ…!
অতিরিক্ত জোরে বাইক চালানো আরম্ভ করলো সে। বিড়বিড়িয়ে নিজমনে আওড়ালো,
— ওই মহিলার জীবন আমি জাহান্নামে উপনিত করবো। যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ারকে বিয়ে করার শাস্তি তো তাকে পেতেই হবে।
সকালের সেই পুরুষটির ছবি নিজের দাঁড়িয়ে থাকা কক্ষের বিশালাকার স্থানজুড়ে দেখেই যেনো থমকে গেলো আয়রা। চোখদুটো যেনো জোরপূর্বক কোঠর হতে নির্গতমান অবস্থা। সে আনমনে নিজের ভাবনার মাঝে স্মৃতির বিচরণ ঘটিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে নিজের সাথেই যেনো কথা বলা আরম্ভ করলো,
— আল্লাহ! না, না। এ কিছুতেই হতে পারেনা আল্লাহ। এ’পুরুষ কখনো আমার তাকদীর হতে পারেনা। না-তো পারে আমার শেষ ঠিকানা হতে। এই পুরুষকেই কী তবে আমার সোহরের স্থানে লিখিত করা হয়েছে? হে আল্লাহ, এ কোন মুসিবতের দারকিনারায় এনে ফেললেন আপনি। আমার মেয়েটাকে এখানে এনে আমি কী সেবচেয়ে বড় ভুল করে ফেললাম?
আয়রা ভীতস্বতন্ত্র মনে আল্লাহতাপাকের করুণাময় রহমের জন্য দোয়া চাওয়া আরম্ভ করলো। এরই মাঝে বাচ্চাটি উঠে পড়লো। আমিরা, আল্লাহপাকের সৃষ্ট কোনো আশ্চর্যরকমের সৌন্দর্যের অধিকারীনি এই ছোট্ট সত্ত্বাটি। আদুরে মুখমন্ডল। মস্তিষ্কের তুখর বুদ্ধি সাথে বাধ্য সন্তান। সে উঠতেই কান্না করলো না। প্রথমে হাত দ্বারা চোখ কচলাতে কচলাতে আশপাশ নিগূঢ় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে বললো,
— মাশাল্লাহ! আম্মিজান, আপনাতে তো অন্নেত সুন্দর লাগছে!
আয়রা শত চিন্তার মাঝেও মেয়ের এমন কথাতে হেসে ফেলে। বলে,
— শুকরিয়া আম্মিজান! ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন আপনি? এখনও আজান দেয়নি।
— দেয়নি?
ভীষণ আদুরে ভঙ্গিতে দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে কন্যাটি শুধায়। অতঃপর দ্বিধান্বিত স্বরে বলে,
— আম্মিজান! আমরা কোথায়?
আয়রা উত্তর দিতে পারলোনা মুহূর্তেই। সে কী বলবে? সে এখন তার সৎ বাবার কক্ষে উপস্থিত? তার আম্মিজান দ্বিতীয় বিয়ে করেছে? এটা বলবে সে? আয়রার থমথমে মুখে অশরুকণারা ভিড় করে। এমন নয় যে সে ফারিশের কর্মকান্ডে অবাক হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে তার মনে হলো—’জীবনে কেবল উত্তম সঙ্গীই নয়; উত্তম পিতাও নির্ধারণ করার চিন্তা-ভাবনা রাখা উচিত!’
আয়রাকে এভাবে থেমে যেতে দেখে আমিরা কিছু বুঝলোনা। হঠাৎ তার চোখে অশ্রুর দেখা পেয়ে আমিরা ব্যস্ত হলো। ছোট ছোট দু’হাতে স্পর্শ করলো তার দু’গাল। বললো,
— আম্মিজান, আমি কী ভুল কিছু বলে ফেলেছি? আমার ভুল মওকুফ করে দিন আম্মিজান, তবু কাঁদবেন না।
বাচ্চাটার মুখ কাঁদো কাঁদো হয়ে আসে। তা দেখে আয়রা ফিক করে হাসে। বলে,
— না, না আম্মিজান। আপনি কিছুই করেননি। চলুন, আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে দিই।
আয়রা মায়ের কাধে ঢে পড়লো। মায়ের কাধে থেকে অস্ফুট স্বরে শুধালো,
— আম্মি, আপনি দুলহান সেজেছেন?
আয়রা থমকে যায়। চোখের পানি সংবরণ করে বলে,
— আম্মিজান, ঘুমোন। এখন কোনো কথা নয়। ফজরের নামাজ আদায় করতে হবেনা?
— জ্বী আম্মিজান!
আমিরা কথা বাড়ালোনা। আয়রা ইতস্তত পায়ে বিছানার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়েকে নিয়ে এভাবে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকা যাবেনা। মনে মনে আওড়ালো সে,
— আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরত যে ওই লোকটি এই মুহূর্তে এখানে অনুপস্থিত!
আয়রা পা এগিয়ে মেয়েকে নিয়ে বিছানায় এগোয়। মেয়ে শুইয়ে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে। মেয়েকে বুকে মাঝে নিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বোলানো আরম্ভ করে। আমিরা চুপটি করে পড়ে রয় আয়রার বুকের মাঝে। আয়রা মেয়েকে বুকে নিয়ে গত এক বছরের সকল কথা ভাবলো একবার। আয়রা আর ফারিশের বিয়ের দু’বছরেও যখন বাচ্চা হচ্ছিলোনা তখন ফারিশ তাকে কতভাবে স্বান্তনা দিয়েছিলো। আল্লাহপাকের ওপর আস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছিলো প্রতি মুহূর্তে। অথচ আমিরা জন্মানোর দু’বছর পর সে জড়িয়ে পড়লো এক নাচনেওয়ালীর সাথে। কীভাবে অথবা কেনো! তা সে জানেনা। সে ধৈর্য্য ধরেছিলো। প্রতিটি মোনাজাতে সে ফারিশের জন্য দোয়া চেয়েছে। এমনকি ফারিশকেও বুঝিয়েছে। অতঃপর এর একবছর বাদে সে দ্বিতীয়বার নিকাহ করে নিয়ে এলো। আয়রা সকল কিছু ভাবতে লাগলো। সে ফারিশের জন্য প্রতিটি দোয়ায় আগে তার জন্য কামনা করেছে। অথচ তার তাকদীর থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এতে বিন্দুপরিমাণ সে অসন্তুষ্ট নয়। তার ঈমানী শক্তি এতোটা ঠুনকো নয় যে ভালোবাসার মানুষের সাথে আজীবন সংসার করতে না পারায় সে আল্লাহপাকের কাছে তার জন্য নালিশ জানাবে। তার ভাবনায় এখন এলো জুনায়েদ। ফারিশের মতো ব্যক্তিকে যদি তার জীবন থেকে উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েই থাকে তবে জুনায়েদের মতোই এমন একজন-ইবা কেনো তার তাকদীর হলো?
এতসব কল্পনার মাঝে এবং গত সারে তিনমাসের সকল ক্লান্তি যেনো সে আজ অনুভব করলো। যার দরুণ তার মস্তিষ্ক অতিরিক্ত চিন্তাভাবনার পরিবর্তে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। ঘুমন্ত মা-মেয়েকে যেনো অভূতপূর্ব সুন্দর দেখালো।
তখন মধ্যরাত। যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার টলতে টলতে বাড়িতে প্রবেশ করছে। ততক্ষণে শাহরিয়ার বাড়ি সম্পূর্ণ ঘুমে আচ্ছন্ন। হুশে নেই একদমই। শুধু মনে মনে বিড়বিড়করে চলেছে,
— ওই মেয়ের লাইফকে আমি হেল বানিয়ে ছাড়বো!
এমন ভাবনা নিয়েই এগিয়ে যায় দোতলায় থাকা সবচেয়ে বড় এবং বিলাশবহুল কক্ষটির পানে। টলমল পা এবং জেদী মস্তিষ্কে সে ওপরে উঠে কোনোরকমে নিজ কক্ষে যায়। নিজ কক্ষের হাতলে চাপ দিতেই উন্মুক্ত হয় তার কক্ষটি। সে অবাক হয়, তার কক্ষ গোছানো? সে চোখ কচলে এগিয়ে যায়। শরীর হতে বিশ্রী এক মাদকের গন্ধ ভেসে আসছে। বিদঘুটে এবং সহ্য করা দায় তা। তার তীক্ষ্ণ গাঢ় নীল চোখ সকলদিকে নজর বোলায়। অবশেষে হুট করেই আটকে যায় বিছানায় শুয়ে থাকা দু’জন নারীর পানে। মেয়েটির বুকে একটি ছোট্ট বাচ্চা। যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার ওরফে ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় বখাটে পুরুষটি এই প্রথম থমকে যায় কোনো নারীর সৌন্দর্যে। যে সৌন্দর্যের মাধ্যমে সে অন্তরে অদ্ভুত রকমের এক শান্তি অনুভব করছে। মুখে হিজাব করা; গোটানো ঠোঁট; বাকানো পাপরিদ্বয়। যায়নাব জুনায়েদের মনে হলো—
‘সে দম আটকে মরে যাবে এই সৌন্দর্যের মায়ায়!’
জুনায়ের দম নিতে পারেনা। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নেয় সে। অস্ফুটস্বরে তার মুখ হতে ধ্বনিত হয়,
— সুবহানাল্লাহ!
জুনায়েদ অবাক হয়। এ কী হচ্ছে তার সাথে? কেনো হচ্ছে? সে তো গত পনেরো বছর ধরে নামাজ কী সেটা-ই ভুলে গিয়েছিলো। অথচ আজ? ওই মেয়েটির সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে সে এমন একটি বাক্য বলে ফেললো। এমনকি তার তো হুশ-ই নেই। জুনায়েদের ওখানে থাকা সম্ভব হলোনা। সে বেরিয়ে এসে ড্রইং রুমের সোফায় এসে বসে পড়লো। এ’মেয়েটা! সকালের সেই মেয়ে। জুনায়েদ শক্ত হয়ে বসলো সোফায়। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে সোফাতেই শুইয়ে পড়লো। জুতোগুলো খোলার অব্দি প্রয়োজন মনে করলোনা সে। তার সকালের কথা মনে পড়লো। জুনায়েদ যখন নিজের সর্বশেষ সীমা লঙ্ঘন করে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো তখন ফারিশের আব্বু এহমাদ শাহরিয়ার তা দেখে এতোটা হতবাক হন যে জুনায়েদ নিজেও ভাবেনি যে তার বাবা হুট করে এতোটা পরিবর্তন হয়ে যাবে। জুনায়েদ কেবল নীহারিকাকে তার বাড়ি দেখাতেই এনেছিলো। অথচ এহমাদ শাহরিয়ার বাড়িতে পরনারীর ছায়া লক্ষ্য করার পর তিনি জুনায়েদের ওপর এতোটা অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন যে তিনি তাকে সরাসরি বিয়ের কথা বলেন। এবং বিয়ে না করলে তার সকল বিলাশবহুল জীবন কাটানো তিনি বন্ধ করে দিবেন বলেন। জুনায়েদ তখনও জানতো যে তার সাথে কার নিকাহ হতে চলেছে। সে-তো তাকে রুহানি সৈয়দ নিকাহ কবুল করার পর জানিয়েছে এবং সেই মুহূর্তেই সে শেখ বাড়ি হতে বেরিয়ে এসেছিলো। আর এই মুহূর্তে যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার–বখাটে ছেলেটি সেই নারীর দর্শনে এতোটা উন্মাদ এবং উত্তাল হলো যে তার বর্তমানে ঘুম আসলোনা। সে চাইলো–তার ফ্রি মিক্সিং ধারণায় গিয়ে বাকি মেয়েদের চেহারা মনে করতে। তবে অদ্ভুত ভাবে তা হচ্ছেনা। বারংবার ওই রমণীর মুখমন্ডল তার মনস্পটে ভেসে উঠছে। তার বক্ষপিঞ্জর এতোটা উত্তাল যে–তার ইচ্ছে হলো সে আয়রাকে গিয়ে আরও একবার দেখবে।।তবু সে তা পারলোনা। অগত্যা সারারাত ওই সোফায় কঠিন আদলে ছটফট করতে রইলো সে। তার মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারলোনা, “এটার কারণ কী?”
ফজরের আজান পড়ার সাথে সাথে আয়রার ঘুম ভেঙে গেলো। স্বভাবগত কারণেই। সে উঠে প্রথমেই চলতে থাকা আজানের জবাব দিলো নিম্ন স্বরে,
— আল্লাহু আকবর!
অতঃপর সে সুমিষ্ঠ কন্ঠে আয়রাকে ডাকলো।
— আম্মিজান, ফজরের নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছে। আপনি উঠুন।
আমিরা হেলা করেনা। প্রথম ডাকে না উঠলেও পরক্ষণেই দ্বিতীয় ডাকে ঝটপট উঠে পড়ে। তখনও আজান চলমান। তাই আয়রা মেয়েকে শিখিয়ে দিলো। আজানের জবাব দিতে,
— আম্মিজান, নামাজের জবাবটা দিন।
আমিরা ওপর-নিচ মাথা নেড়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
— আল্লাহু আকবর!
অতঃপর আয়রা আমিরাকে কোলে উঠিয়ে নিলো। যেতে যেতে বললো,
— চলুন আম্মু, অযু করে আসি!
আমিরাকে অযু করিয়ে সে তাকে বসিয়ে খিমার পড়িয়ে দিলো। এতোটা আদুরে লাগলো তখন তাকে। খিমার পড়ানোর আগে নিজেও একটি পড়ে নিলো বোরকা। সাথে আমিরাকেও পড়ালো। অতঃপর তারা ফজরের নামাজের জন্য জায়ানামজের অভাববোধ করলো। সারাকক্ষ খুঁজেও জায়ানামাজের সন্ধান তাদের মিললোনা। সে অবাক হলো সাথে মনঃক্ষুণ্ন ও হলো। এতে বিড়বিড় করলো সে,
— এ কেমন পুরুষ সে যে সালাত-ই আদায় করেনা?
অতঃপর আয়রার মনে পড়লো তার বাবার বাড়ি হতে আনা কাপড়-চোপড়ের মাঝে জায়ানামাজও আছে। সে দেড়ি না করে সেটি খোঁজা আরম্ভ করলো। গতকাল তা সাড়ভেন্টরা এখানেই তো রেখে গিয়েছিলো। অবশ্য বেশি খোঁক করতে হয়না। দরজার কোণে পড়ে থাকা ছোট লাগেজখানা সে দেখতে পায়। বলে,
— শোকর আল্লাহ!
অতঃপর সে সুনিশ্চিন্তভাবে জায়ানামাজ বের করে এনে তার মেঝে বিছালো। নামাজ আদায় করতে বসলো মা মেয়ে। আমিরাকে সেখানো গুটিকতক সূরা সে অনর্গল বলে গেলো। একসময় আয়রা নামাজ শেষে মোনাজাতে বসলো। সেসময় আমিরার নামাজ আদায় করা শেষ বিধায় সে টুক করে বেরিয়ে গেলো। ছোট ছোট পায়ে ড্রইং রুমে পৌঁছে গেলো। আশপাশটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা আরম্ভ করলো। এটা তাদের বাড়ি নয় তা সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারে। সে অনুসন্ধান চালালো, এটা কার বাড়ি হতে পারে? তখনই তার নজর গেলো নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াতে থাকা জুনায়েদের দিকে। তার কাছেও সেই ধোঁয়া অংশবিশেষ আসছে। সে কাশতে কাশতে জুনায়েদের দিকে পা বাড়ালো।
— আসসালামু আলাইকুম!
জুনায়েদ বাচ্চার মিষ্টি এক কন্ঠে মুহূর্তেই বসে পড়লো। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখতে পেলো এক স্নিগ্ধ আদল। যা সে গতকাল দেখেছিলো। একদম মায়ের মতো, হুবহু। জুনায়েদ মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। ততক্ষণে আমিরা ছোট ছোট ছোট স্বর ভেসে আসে,
— সালামের উত্তর দিতে অয় আঙ্তেল!
জুনায়েদ ফিক করে হেসে ফেললো। অতঃপর মনে পড়লো এটা নিশ্চয় ওই হিজাবীনির-ই মেয়ে? তাহলে সামনে উপস্থিত থাকা গম্ভীরমুখো বাচ্চাটি নিশ্চয় তার সৎ মেয়ে। জুনায়েদ নিজেকে গম্ভীর করে ফেললো মুহূর্তেই। বললো,
— কে তুমি?
— আমি আমিরা, আমিরা জোয়ার্দার!
আচানক জুনায়েদের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। বিড়বিড় করে বলে,
— মেয়েটি আমার সৎ মেয়ে!
— আঙ্তেল, সিগারেট খাওয়া এতদমই ভালো না। এটা তো হারাম।
জুনায়েদ না চাইতেও ধমকে ফেলে বাচ্চাটাকে,
— তোমাকে বলতে বলেছি? বাচ্চা মেয়ের এতো ফটর ফটর কিসের?
মুহূর্তেই আমিরার মন খারাপ হয়ে যায়। সে আড়ষ্ট মুখে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই জুনায়েদ তাকে,
— এই পিচ্চি, এদিকে এসো।
আমিরা নতমস্তকেই বলে,
— আম্মিজান বলেছে অচেনা লোকদের কাছে না যেতে।
আম্মি? অর্থাৎ ওই মেয়েটা। জুনায়েদ বলে,
— তাই নাকি? চকলেট দিলেও আসবেনা?
আমিরা ডানে-বায়ে মাথা নাড়ে। অতঃপর দু’হাতে মুখ চেপে ধরে। তাতে জুনায়েদ সিগারেটটি ফেলে দেয়। পায়ে পিষতে পিষতে বলে,
— এতো ভোর ভোর কী করছো?
— আম্মির সাথে সালাত আদায় করতে উঠেছি আঙ্তেল।
আবারও তার মেয়েটির কথা মনে পড়ে গেলো। মেয়েটা উঠে গিয়েছে? জুনায়েদ বুঝলোনা, সালাত মানে কী? সে কিছু জিজ্ঞেস লরার আগেই আমিরা ফের বললো,
— আঙ্তেল, বাড়ি টা কী আপনার?
জুনাদেয় গম্ভীর স্বরে জবাব দেয়,
— হ্যাঁ, কেনো?
— আসলে আমি নানুবাড়ি থিলাম তো। তাপর তী করে যেনো এখানে চলে এলাম।
জুনায়েদ খেয়াল করলো আমিরার কথা-বার্তা তার উচ্চতার তুলনায় বহু স্পষ্ট। সে জিজ্ঞেস করে,
— পছন্দ হয়েছে?
— এত্তুও না, আব্বুজানের তাছে যাবো।
ব্যাস! বাচ্চাটির এ’কথার প্রেক্ষিতে জুনায়েদের মস্তিষ্ক আবারও খারাপ হয়ে যায়। তার মনে পড়ে সে যাকে বিয়ে করেছে তার আগেও সংসার ছিলো। সে উঠে গেলো। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। আমিরা পেছন থেকে তাকে ডেকে বললো,
— ফি আমানিল্লাহ, আঙ্তেল!
জুনায়েদ একবার পিছু ফিরলো। অতঃপর কিছুপল তাকিয়ে থেকে গটগট পায়ে চলে গেলো। তখনই আয়রা এলো আমিরাকে খুঁজতে খুঁজতে। আমিরাকে নিচে হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে অবাক হয়ে শুধায়,
— আম্মিজান, আপনি আমাকে না বলে চলে এলেন কেনো? আমি আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি না?
— আম্মিজান, এত্তুনি একতা আঙ্তেলের সাথে দেখা হলো। তার সাথে কথা বলতিলাম তো, তাই। এটা নাকি ওনার-ই বাড়ি।
আয়রার ভ্রু কুঁচকে গেলো। কে না কে? নতুন জায়গায় কার সাথে সাক্ষাৎকার হলো আবার তার মেয়ের? বললো,
তাকদীর পর্ব ২
— কে সে, আম্মু?
আমিরা গুলুমুলু একহাত উঁচিয়ে জুনায়েদের পানে দতাক করে। জুনায়েদ তখন সদর দরজার সম্মুখে গিয়ে পৌঁছেছে। আয়রা ভ্রু কুঁচকে সেদিকপানে তাকাতেই সে কেবল দেখতে পেলো একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ; শেরওায়নি গায়ে! হাঁটাচলার ভঙ্গিমায় অন্য রকমের তেজ। আয়রা কপাল ভাঁজ করে মনে মনে বিড়বিড় করে,
— জুনায়েদ?
